#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা
[পর্ব ৯৭] (প্রথম অংশ)
#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম
( দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয় এবং প্রাপ্তমনস্কদের জন্য উন্মুক্ত)
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
[দ্বিতীয় খন্ড]
বার্সেলোনার সেই গোপন গবেষণাগারজুড়ে তখন নেমে এসেছে মৃ’ত্যুসম স্তব্ধতা।
সাদা আলোয় আলোকিত বিশাল ল্যাবরুমের মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে র’ক্তের ক্ষীণ দাগ। ধাতব গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ।মারুফুল হকের নিথর দেহটা পড়ে রয়েছে মেঝের উপর। গ’লদেশ চিরে নিরবধি র’ক্তস্রোত বেয়ে পড়ছে সাদা টাইলসের গায়ে।
সেই দৃশ্যের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন মুস্তাক এহসান।
চোখে অবিশ্বাস। মুখে প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত মানুষের নিস্তব্ধতা। ঠিক তখনই মেহমুনা আহমেদ ঠোঁট বাঁকিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার চোখেমুখে কোনো অনুশোচনা নেই। বরং অদ্ভুত এক উন্মাদনা।
মুস্তাক কর্কশ কণ্ঠে বলে উঠলেন,
“আমি কখনো ভাবিনি তুমি এতটা লোভী, মেহমুনা!”
তার গলায় ঘৃণা আর বেদনার মিশ্রণ।
“ভালো হয়েছে তোমার বোন আজ তোমার এই জঘন্য রূপটা দেখেনি! নয়তো সে কোনোদিন বিশ্বাসই করতে পারত না তুমি তার র’ক্তের সম্পর্ক!”
মেহমুনা অদ্ভুতভাবে হেসে উঠল। সেই হাসিতে ছিল শীতল নিষ্ঠুরতা। সে মিস্টার আলবার্টের দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গের সুরে বলল,
“দেখলেন, মিস্টার আলবার্ট? আমার দুলাভাই কত বড় সৎ মানুষ!”
তার চোখে বিদ্রূপের ঝিলিক।
“আফসোস, আমরা ওনার মতো হতে পারলাম না!”
কথা শেষ করেই খিলখিল করে হেসে উঠল সে।
ঠিক সেই মুহূর্তে মিস্টার আলবার্ট চোখের ইশারায় নির্দেশ দিল। পরক্ষণেই দুই বলিষ্ঠ লোক মারুফুলের গলায় আরও গভীরভাবে ধারালো ছুরি চালিয়ে দিল।
“নোওওওও!”
মুস্তাক এহসানের গর্জন যেন পুরো ল্যাব কাঁপিয়ে তুলল। তিনি ছটফট করে উঠলেন।
“নো! নো প্লিজ!”
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
মারুফুল হকের দেহটা কেঁপে উঠল কয়েকবার।
তারপর সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ। একজন পিতার প্রাণ থেমে গেল। একজন অসহায় কন্যা পৃথিবীতে এতিম হয়ে গেল। মুহূর্তেই মেহমুনা ক্ষিপ্তস্বরে বলে উঠল,
“ফাইলটা দিয়ে দিন, দুলাভাই! নয়তো আপনিও বাঁচবেন না!”
মুস্তাকের চোখে তখন শুধুই ঘৃণা। তিনি তাকিয়ে আছেন দুই বিকৃত আত্মার দিকে। একজন মিস্টার আলবার্ট। একসময় তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
যার সঙ্গে অসংখ্য রাত গবেষণায় কাটিয়েছেন।
আর অন্যজন মেহমুনা আহমেদ। নিজের স্ত্রীর ছোট বোন। যাকে তিনি আপন বোনের মতো আগলে রেখেছিলেন। আজ সেই দু’জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে তার সম্মুখে র’ক্তপিপাসু জানোয়ারের রূপে।
মিস্টার আলবার্ট হিসহিসিয়ে বলল,
“তোমার সময় শেষ, মুস্তাক! বল ফাইলটা কোথায়?”
মুস্তাক নিঃশব্দে হেসে উঠলেন। সেই হাসিতে ছিল তীব্র অবজ্ঞা।
“পাবে না।”
ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন তিনি।
“ওটা কোনোদিনও পাবে না তোমরা অন্তত আমি বেঁচে থাকা পর্যন্ত নয়!”
পরক্ষণেই,
“তাহলে আপনি মরে যান!”
মেহমুনার কণ্ঠ বজ্রাঘাতের মতো আছড়ে পড়ল মুস্তাক স্তব্ধ হয়ে তাকালেন তার দিকে। মেহমুনা ধীরে শাড়ির ভাঁজের নিচ থেকে একটি রিভলভার বের করল। তার চোখে তখন অস্বাভাবিক উন্মত্ততা। কিন্তু মিস্টার আলবার্ট দ্রুত বলে উঠল,
“নো, মেহমুনা! এভাবে নয়।”
সে চারপাশে তাকাল। তারপর ল্যাবের এক কোণে রাখা বিশাল কাঁচের সিসার দিকে দৃষ্টি স্থির হলো।
সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে ভয়ংকর শক্তিশালী এসিড। যার সংস্পর্শে মুহূর্তেই গলে যেতে পারে জীবন্ত মানবদেহ।
আলবার্ট ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সেদিকে।
তারপর একটি ধারালো সার্জিক্যাল অস্ত্র তুলে নিল হাতে। সেই মুহূর্তে দু’জন লোক শক্ত করে চেপে ধরল মুস্তাক এহসানকে। মুস্তাক প্রাণপণে ছটফট করছেন।
“আলবার্ট! ভুল করছো তুমি!”
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
“বড্ড বড় ভুল করছো!”
কিন্তু আলবার্টের মুখে ফুটে উঠল ভয়ংকর নিষ্ঠুর হাসি। লোভ ইতোমধ্যে মানুষটাকে পশুতে পরিণত করেছে। সে ধীরে মুস্তাকের মুখের কাছে ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ইউ শুড হ্যাভ জয়েন্ড আস, মাই ফ্রেন্ড।”
তারপর ধারালো অস্ত্রটা নির্মমভাবে বসিয়ে দিল মুস্তাকের দেহে। আর্তচিৎকারে কেঁপে উঠল ল্যাব।
“আআআআআহহহ!”
মুস্তাকের শরীর যন্ত্রণায় কাঁপছে। র’ক্ত ছিটকে পড়ছে চারদিকে। তিনি মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন কিন্তু পারছেন না। আলবার্ট যেন উন্মাদের মতো হয়ে গেছে।
একের পর এক আঘাত। নিষ্ঠুর। অমানবিক। পৈশাচিক। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছিল মুস্তাক এহসানের শরীর। কিন্তু শেষ মুহূর্তেও তিনি ফাইলের অবস্থান জানাননি। শেষ নিঃশ্বাসের পূর্বমুহূর্তে তার রক্তাক্ত ঠোঁট কেঁপে উঠল,
“আ,,ফ,,রিদ,,,
নিজের সন্তানের নাম উচ্চারণ করেই নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছেন ক্রমশ!
*************
অন্যদিকে,
“নো ওয়ে! আমি এখনই পাপার কাছে যাবো, মম!”
আফরিদ জেদ ধরে বসেছে। তার নিষ্পাপ চোখদুটো জলে টলমল করছে। মাইমুনা অসহায়ভাবে বললেন,
“কিন্তু বেটা,পাপা এখন ল্যাবে কাজ করছে। ওখানে গেলে পাপা রাগ করবে।”
কিন্তু আফরিদ মানল না।
“নো! আমি যাবোই! প্লিজ, মম!”
শেষ পর্যন্ত ছেলের জেদের কাছে হার মানলেন মাইমুনা। তিনি ক্লান্ত কণ্ঠে ড্রাইভারকে বললেন,
“ল্যাবের দিকে গাড়ি নিন।”
গাড়ি ছুটে চলল। বিশ মিনিট পর গাড়ি এসে থামল গবেষণাগারের সামনে।
কিন্তু আজ অদ্ভুতভাবে কোথাও কোনো সিকিউরিটি নেই। মাইমুনার বুকের ভেতর কেমন অজানা আতঙ্ক জন্ম নিল। এদিকে আফরিদ উচ্ছ্বাসে গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে।
“পাপাআআ!”
ছুটতে ছুটতে এগিয়ে গেল সে।
কিন্তু ল্যাবের দরজা খোলা। ভেতরে প্রবেশ করতেই সময় যেন থেমে গেল। আফরিদের ছোট্ট দেহটা মুহূর্তেই জমে গেল। তার সামনে র’ক্তে ভেসে পড়ে রয়েছে মুস্তাক এহসানের ছিন্নভিন্ন দেহ!
চারদিকে র’ক্ত। ভাঙা কাঁচ। আর সেই ভয়ংকর দৃশ্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মিস্টার আলবার্ট এবং মেহমুনা আহমেদ!
আফরিদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।
তার ছোট্ট চোখদুটো বিস্ফারিত।
“পা…পাপা!”
ঠোঁট কাঁপছে। কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছে না।
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেতরে ঢুকলেন মাইমুনা এহসান। আর দৃশ্যটা দেখামাত্রই তার সমগ্র পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেল।
“মুস্তাআআআআক!”
আর্তচিৎকারে যেন পুরো ল্যাব কেঁপে উঠল। তিনি ছুটে গিয়ে রক্তাক্ত দেহটা জড়িয়ে ধরলেন।
কাঁপতে লাগলেন পুরো শরীর।
“না, না, এটা মিথ্যে!”
তার কান্না ছিল হৃদয়বিদারক।
“মুস্তাক! চোখ খোলো! প্লিজ!”
কিন্তু মুস্তাক আর কোনোদিন চোখ খুললেন না।
আফরিদ স্থির দাঁড়িয়ে আছে। তার ছোট্ট পৃথিবীটা ঠিক সেই মুহূর্তে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।

বার্সেলোনার সেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গবেষণাগারজুড়ে তখন কেবল মৃ’ত্যুর গন্ধ।
জ্বলে যাওয়া রাসায়নিকের তীব্র দমবন্ধ গন্ধে ভারী হয়ে আছে সমগ্র পরিবেশ। দেয়ালের কাঁচ কালচে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে গলিত ধাতব অংশ, র’ক্তের দাগ আর ভাঙাচোরা যন্ত্রপাতি।
ভয়ংকর শক্তিশালী করোসিভ কেমিক্যালের বিক্রিয়ায় ল্যাবের অনেক ধাতব অংশ পর্যন্ত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গিয়েছে। সেই রাসায়নিক এতটাই বিধ্বংসী ছিল যে, মানুষের দেহ তো দূরের কথা লোহার পাত পর্যন্ত গলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
মুস্তাক এহসানের নিথর দেহের পাশে বসে পাগলের মতো কাঁদছিলেন মাইমুনা এহসান। তার কণ্ঠ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে কান্নায়।
“এটা কি করলে তোমরা?! আমার মুস্তাক আমার মুস্তাককে তোমরা এভাবে শেষ করলে?”
তার বুকফাটা আর্তনাদে মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠেছিল পুরো ল্যাব। মেহমুনা আহমেদ কাঁপছিল। এই প্রথম বোধহয় নিজের কৃতকর্মের বিভীষিকা উপলব্ধি করতে শুরু করেছে সে।
তবুও ভয়ে কিছু বলতে পারছিল না। সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল মিস্টার আলবার্টের দিকে। অপরদিকে আলবার্টের চোখে তখনও নির্মম হিসাবনিকাশ।
সে ধীরে হিসহিসিয়ে বলল,
“এদের বাঁচিয়ে রাখা মানে নিজেদের মৃ’ত্যুকে ডেকে আনা।”
কথাটা শুনেই মাইমুনা এহসানের বুক হিম হয়ে গেল।
পরক্ষণেই তিনি হাউমাউ করে চিৎকার করে উঠলেন,
“আফরিদ! বেটা পালাও! রান বেটা রান!”
ছোট্ট আফরিদ তখনও স্থবির হয়ে তাকিয়ে ছিল নিজের বাবার বিকৃত দেহটার দিকে। তার শিশুমন পুরো ঘটনাটা বুঝে উঠতে পারছে না। খালামণি প্রিয় আলবার্ট আঙ্কেল এরা এমন কেন?
তার বুকের ভেতর আতঙ্ক জমাট বাঁধতে লাগল।
পরক্ষণেই সে দৌড়ে পালাতে শুরু করল।
কিন্তু কয়েক কদম যেতেই আবার পেছনে ফিরে তাকাল বাবার দিকে। আর সেই দৃশ্য
রক্তা’ক্ত, ক্ষ’তবিক্ষত, নিষ্পন্দ মুস্তাক এহসান
শিশুটার মস্তিষ্ক আর সহ্য করতে পারল না।
“পা…পাপা?”
ক্ষীণ স্বর বেরোল তার ঠোঁট থেকে। তারপরই লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। চেতনা হারাল আফরিদ।
“আফরিদদদদ!”
দ্বিতীয়বারের মতো বুকফাটা চিৎকার করে উঠলেন মাইমুনা এহসান।
*******************
কয়েক ঘণ্টা পর,,
ভাঙাচোরা গবেষণাগারের ভেতর পিটপিট করে চোখ খুলল ছোট্ট আফরিদ। তার মাথা প্রচণ্ড ভারী লাগছে।
সমগ্র শরীর কাঁপছে। চেতনায় ফিরতেই অনুভব করল সে একজন নারীর কোলে শুয়ে আছে।
একজন স্প্যানিশ নারী পুলিশ তাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। মহিলাটি ক্রমাগত কিছু বলছে স্প্যানিশ ভাষায়। কিন্তু আফরিদ কিছুই বুঝতে পারছে না।
হঠাৎ করেই তার স্মৃতিতে ভেসে উঠল পাপার মুখ।
র’ক্তাক্ত, নিশ্চল।
“পাপা?”
হঠাৎ চিৎকার করে উঠল সে।
“আমার পাপা?”
পুলিশ নারীটি তাকে শক্ত করে ধরে বললেন,
“নিনো… স্টপ! প্লিজ স্টপ!”
কিন্তু আফরিদ থামল না। হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে।
“আমি ভেতরে যাবো! আমার পাপা! আমার মম!”
সে ধস্তাধস্তি করে নারীর হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
***********************
ল্যাবের ভেতরে তখন পুলিশ, ফরেনসিক টিম এবং মেডিক্যাল ইউনিটের ব্যস্ততা। চারপাশে ফ্ল্যাশলাইটের আলো। কিন্তু সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে অনেক অভিজ্ঞ অফিসার পর্যন্ত স্তম্ভিত। মেঝের উপর পড়ে রয়েছে দু’টি বিকৃত, রাসায়নিকদগ্ধ দেহাবশেষ।
ভয়ংকর করোসিভ এসিডের প্রভাবে দেহগুলোর অধিকাংশ অংশ গলে গিয়ে বিকৃত মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়েছে। শুধু মাথার কিছু অংশ অক্ষত।
বাকি শরীর যেন ধীরে ধীরে গলিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাসায়নিকের বিক্রিয়ায় চারপাশের টাইলস পর্যন্ত ক্ষয়ে গেছে। ভয়ংকর সেই দৃশ্য দেখেই থমকে গেল আফরিদ। তার ছোট্ট চোখদুটো বিস্ফারিত। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।
“পা…পাপা!”
তার ঠোঁট কাঁপছে। পরক্ষণেই হাউমাউ করে চিৎকার করে উঠল সে,
“পাপা! পাপা আমার পাপা!”
চারপাশের পুলিশ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গেল সেই দেহাবশেষগুলোর দিকে। তারপর সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে দুই হাতে সেই গলিত অংশগুলো জড়ো করতে শুরু করল।
কাঁদতে কাঁদতে বলছে,
“আমার পাপা গলে গেছে?! আমার পাপাকে ঠিক করে দাও!”
তার কণ্ঠ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে কান্নায়।
“ও পাপা! আমি তোমাকে জোড়া লাগিয়ে দেব!”
একজন অফিসার চোখ মুছল চুপিচুপি। আরেকজন মুখ ফিরিয়ে নিল। কারণ একটা শিশু তার বাবার গলিত দেহ নিজের ছোট্ট হাতে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছে। এর চেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য আর কি হতে পারে? আফরিদ কাঁদছেই।
“পাপা! উঠো না! প্লিজ উঠো!”
ঠিক তখনই কর্ণকুহরে ভেসে এলো ক্ষীণ, কাঁপা কণ্ঠস্বর।
“আফরিদ!”
শিশুটি থমকে গেল। ধীরে ধীরে পেছনে ফিরল।
আর পরক্ষণেই তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
“মম?”
র’ক্তাক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন মাইমুনা এহসান।
তার শরীর জখমে ভরা। মুখে শুকনো র’ক্তের দাগ।
কিন্তু তিনি জীবিত।
আফরিদ দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল।
মাইমুনাও শক্ত করে বুকে চেপে ধরলেন নিজের সন্তানকে। মা ছেলে দু’জনই হাউমাউ করে কাঁদছে।
আফরিদ কাঁপতে কাঁপতে বলছে,
“মম, আমার পাপা, আমার পাপা!”
*******************
বর্তমান,,,,
ন্যান্সি শিউরে উঠল। সমগ্র শরীরজুড়ে যেন বরফশীতল স্রোত বয়ে গেল তার।
চোখের কোণ বেয়ে টুপটাপ গড়িয়ে পড়ল অশ্রুবিন্দু।
বিশাল রিসার্চ সেন্টারজুড়ে তখন গাঢ় স্তব্ধতা। নিস্তব্ধ, ভারী, দমবন্ধ করা এক নৈঃশব্দ্য। চারপাশে কেবল মৃদু যন্ত্রের শব্দ। আর সেই শব্দের মাঝখানে ছড়িয়ে রয়েছে বহু বছর আগের এক বিভীষিকাময় ইতিহাসের প্রতিধ্বনি। সেখানে এখন কেবল দু’জন মানুষ। ন্যান্সি। আর আফরিদ এহসান।
এতক্ষণ যাবত আফরিদের বলা প্রতিটি বাক্য যেন ন্যান্সির মস্তিষ্কের ভেতর তীব্রভাবে আছড়ে পড়ছে।
কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটার কথা বলতে গিয়ে আফরিদের চোখ ভিজে উঠেছিল যাকে “পাপা” বলে চিৎকার করে কেঁদেছিল ছোট্ট একটা শিশু,
সেই মানুষটিই পরবর্তীতে হয়ে উঠল ভয়ংকর এক মাফিয়া? কিভাবে? কেন? ন্যান্সির মস্তিষ্ক যেন উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না। অন্যদিকে আফরিদ তখনও চেয়ারে বসে আছে। মাথাটা সামান্য নিচু। চোখদুটো অস্বাভাবিক রক্তিম। দেখলেই বোঝা যায় ভেতরে জমে থাকা যন্ত্রণাগুলো আজও পচে পচে তাকে শেষ করে দিচ্ছে। কিন্তু সে কাঁদবে না।
না। কান্না নামক দুর্বলতাটা বহু আগেই হত্যা করেছে আফরিদ এহসান। ঠিক বারো বছর আগে। যেদিন সে নিজের বাবার গলিত দেহ হাতে তুলে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেছিল। ধীরে ধীরে প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করল সে। আঙুলের ফাঁকে আটকে লাইটার জ্বা’লাল।
টিক। আ’গুনের ক্ষু’দ্র শিখাটা এক মুহূর্তের জন্য আলোকিত করল তার নিষ্ঠুর মুখচ্ছবি।
অতঃপর সিগারেটটা ঠোঁটে গুঁজে নিয়ে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দীর্ঘ টান দিল। ধোঁয়া বেরিয়ে এলো তার ওষ্ঠ ফাঁক দিয়ে। ধূসর ধোঁয়াগুলো যেন তার অতীতের দগদগে স্মৃতির মতো পুরো ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল।
ন্যান্সি অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
“অ্যাডভোকেট আফরিদ এহসান, মাফিয়া কেন হয়ে গেল। মুস্তাক এহসানই বুঝি তার কারণ?”
মুহূর্তেই থেমে গেল আফরিদের হাত।সিগারেটটা এখনো জ্বলছে। ধোঁয়া পাক খেয়ে উপরে উঠছে। কিন্তু মানুষটা স্থির। অস্বাভাবিক স্থির।
ধীরে ধীরে দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকাল মেঝেতে বসে থাকা ন্যান্সির দিকে। তারপর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল ভয়ংকর তাচ্ছিল্যের হাসি। সেই হাসিতে ছিল শূন্যতা। অভিমান। আর বহু বছরের পুঞ্জীভূত ঘৃণা।
আফরিদ ধোঁয়া ছেড়ে নিচু স্বরে বলল,
“মুস্তাক এহসান!”
কথাটা উচ্চারণ করতেই তার কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে পুনরায় বলল,
“আফরিদ এহসানের পুরো পৃথিবী ছিলরে বান্দি!”
তার চোখের ভেতর ক্ষণিকের জন্য ঝলসে উঠল ছোট্ট এক শিশুর মুখ। যে প্রতিদিন বাবার আঙুল ধরে স্কুলে যেত। যে বাবার বুকে মাথা রেখে ঘুমাত। যে বিশ্বাস করত তার পাপা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ।
আফরিদ নিঃশব্দে হেসে উঠল।সেই হাসি ছিল ভাঙাচোরা।
“বাবা ভক্ত ছেলে ছিলাম আমি!”
দীর্ঘ টান দিল আবার সিগারেটে। তার কণ্ঠ হঠাৎ কর্কশ হয়ে উঠল।
“কিন্তু ওইদিন? ওইদিন নিজের চোখের সামনে দেখলাম একটা সৎ মানুষ এই পৃথিবীতে কতটা অসহায়।”
চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে আফরিদ এহসানের!
“আমি চিৎকার করেছিলাম, কেঁদেছিলাম, পুলিশের পা জড়িয়ে ধরেছিলাম!”
তার চোখ দুটো ধীরে ধীরে আরও লাল হয়ে উঠল।
“কিন্তু কেউ আমার পাপাকে বাঁচাতে পারেনি।”
ন্যান্সির বুক কেঁপে উঠল। আফরিদ এবার ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল।
“জানিস বান্দি সেদিন আমি একটা জিনিস বুঝেছিলাম।”
অন্ধকার দৃষ্টিতে তাকাল ন্যান্সির দিকে। ন্যান্সি স্থির নেত্রে তার দিকে চেয়ে আছে।
“এই পৃথিবীতে সৎ মানুষরা শুধু মরার জন্য জন্মায়।”
ন্যান্সির শ্বাস আটকে এলো। এ যে চরম সত্যি!”
আফরিদ নিচু স্বরে বলল,
“তাই আমিও বদলে গেছি।”
আফরিদ এহসানের কণ্ঠস্বর এখন বরফশীতল।
“যে দুনিয়া আমার বাবাকে গলিয়ে মেরেছে, আমি সেই দুনিয়াকেই আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে নিজেই এক আ’গ্নেয়গিরির লা’ভা হয়ে নিজেকে গড়ে নিলাম!”
*************************
অতীত….
আইন।মাত্র তিন অক্ষরের একটি শব্দ।কিন্তু এই তিন অক্ষরের শব্দটার উপরই অগাধ বিশ্বাস ছিল ছোট্ট আফরিদ এহসানের।তার বিশ্বাস ছিল অন্যায় যত বড়ই হোক না কেন, একদিন না একদিন আইন তার বিচার করবে।তাই তো সে উকিল হতে চেয়েছিল।
কালো কোট গায়ে চড়িয়ে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সত্যের পক্ষে লড়তে চেয়েছিল।
কিন্তু মাত্র বারো বছর বয়সেই তাকে নির্মমভাবে শিখিয়ে দেওয়া হলো বাস্তবতা বইয়ের পাতার মতো সুন্দর নয়।
*****************
মুস্তাক এহসানের মৃত্যুর পর পুরো বার্সেলোনা জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল।পুলিশ তদন্ত শুরু করেছিল।
সংবাদমাধ্যম সরব হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এতকিছুর পরেও মিস্টার আলবার্টকে গ্রেফতার করা হলো না। বরং ঘটল সম্পূর্ণ উল্টো। যারা সেদিন গবেষণাগারের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল, তারা সবাই একে একে আদালতে দাঁড়িয়ে একই বক্তব্য দিল।
“মিস্টার আলবার্ট সেদিন ল্যাবে এসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনি বেরিয়ে যান।”
“আমরা নিজ চোখে তাকে চলে যেতে দেখেছি।”
“এরপর একজন মহিলা আসেন, যিনি নিজেকে মাইমুনা এহসান বলে পরিচয় দেন।”
“আরও কিছুক্ষণ পর আবার মাইমুনা এহসান আসেন।”
একেকটি সাক্ষ্য যেন একেকটি বিষাক্ত তীর হয়ে বিদ্ধ করছিল সত্যকে। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়।
ল্যাবের সিসিটিভি ফুটেজ
উধাও। সেই সময়কার প্রতিটি রেকর্ডিং রহস্যজনকভাবে মুছে ফেলা হয়েছে।
কেউ জানে না কিভাবে। কেউ জানে না কার নির্দেশে।
ফলাফল প্রমাণহীন এক মামলা।আর প্রমাণহীন মামলায় সত্যও অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ে।
*********************
আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মাইমুনা এহসান কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন,
“সব মিথ্যা! আমি যখন ছেলেকে নিয়ে সেখানে পৌঁছাই, তখন ল্যাবে কেউ ছিল না। সিকিউরিটি গার্ড ছিল না। আমি আত্মরক্ষার জন্য মেহমুনাকে আ’ঘাত করেছি। আমার স্বামীকে আমি ভালোবাসতাম। আমি কেন তাকে হ’ত্যা করব?”
তার কান্নাভেজা কণ্ঠ আদালতজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। কিন্তু সন্দেহের কালো মেঘ কিছুতেই সরে যাচ্ছিল না।
*************
আদালতের পেছনের সারিতে বসে ছিল ছোট্ট আফরিদ। তার দুই পা মাটিতে ঠিকমতো পৌঁছায় না।
তবুও সে বসেছিল। নিঃশব্দে। স্থিরভাবে।
সে দেখছিল কিভাবে সত্যকে বিকৃত করা যায়।
কিভাবে মিথ্যাকে প্রমাণে পরিণত করা যায়।
কিভাবে অপরাধীরা হাসিমুখে আদালত ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারে। আর কিভাবে নির্দোষ মানুষ সন্দেহের ভার নিয়ে বেঁচে থাকে। সেদিনই প্রথমবারের মতো আফরিদের বিশ্বাসে ফাটল ধরেছিল।
****************
মিস্টার আলবার্ট? তিনি মুক্ত। মিখাইলের অর্থ, ক্ষমতা এবং প্রভাবের ছায়ায় নিরাপদ। অপরদিকে মাইমুনা এহসান প্রতিদিন সমাজের প্রশ্ন, সন্দেহ এবং অপমানের ভার বইছেন।
******************
“অভ্র, তুমি তো জানো আমি আমার বোন আর মুস্তাককে কতটা ভালোবাসতাম!”
মাইমুনার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। তার সামনে বসে থাকা অভ্র মাথা নিচু করে ফেলল।
হঠাৎ করেই তার চোখ ভিজে উঠল।
“আপু!”
কথা বলতে গিয়েও গলা আটকে গেল তার।
“আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, মেহমুনা এমন কিছু করতে পারে।”
পুরুষ মানুষ হয়েও সে কেঁদে ফেলল। কারণ কখনো কখনো শোক পুরুষ-নারী চেনে না।
শুধু মানুষকে ভেঙে দেয়। অভ্র দুহাতে মুখ ঢেকে বলল,
“আমার ছেলে দুটোর কি হবে এখন? সাব্বির, নীলাদ্রি? ওরা কিভাবে বাঁচবে ওদের মাকে ছাড়া?”
মাইমুনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে অভ্রের কাঁধে হাত রাখলেন।তার কণ্ঠ ক্লান্ত, তবুও দৃঢ়।
“এত চিন্তা করো না। আমি তো আছি। সাব্বির আর নীলাদ্রি শুধু তোমার সন্তান নয়। ওরা আমারও সন্তান।”
অভ্র স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। কথা খুঁজে পেল না।
*******************
বাড়ির এক কোণে বসে আছে আফরিদ। চারপাশের কেউ খেয়াল করছে না। ছেলেটা নিঃশব্দে কাঁদছে।
তার প্রতিটি অশ্রুবিন্দুর সঙ্গে ভেসে উঠছে মুস্তাক এহসানের মুখ।ফিসফিস করে বলল সে।
“পাপা তুমি তোমার চ্যাম্পকে এভাবে একা রেখে গেলে?”
ছোট্ট ছেলেটা ছোট্ট বুকটা কেঁপে উঠল।
“পাপা, ওই আইনজীবীরা ভালো না। আমি আর কখনো কালো কোট পরব না। কখনো না!”
হঠাৎ করেই উঠে দাঁড়াল আফরিদ! তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো আশেপাশে! দৌড়ে গেল আলমারির দিকে।
সেখানে যত্ন করে রাখা ছিল জন্মদিনে পাওয়া উকিলের পোশাক। যেটা মুস্তাক নিজ হাতে কিনে দিয়েছিলেন। আফরিদ সেটি তুলে নিল।
কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর ক্রো’ধ, শোক আর অসহায়তার উ’ন্মত্ত মিশ্রণে পোশাকটিতে আগু’ন ধরিয়ে দিল।
দাউদাউ করে জ্ব’লে উঠল কালো কোটটি!
আ’গুনের লেলিহান শিখা কক্ষজুড়ে নাচতে লাগল।
ঠিক তখনই ছুটে এলেন মাইমুনা এহসান।
“আফরিদ!”
তিনি দ্রুত আ’গুন নেভানোর চেষ্টা করলেন।
তারপর ছেলেটাকে শক্ত করে বুকে টেনে নিলেন।
“বেটা! আমার বেটা!”
আফরিদ আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
“আই হেট মিস্টার আলবার্ট, মম! ওরা আমার পাপাকে নিয়ে গেছে! ওরা আমার সবকিছু শেষ করে দিয়েছে!”
আফরিদের কণ্ঠ জুড়ে ছিল অসহনীয় যন্ত্রণা।
মাইমুনা ছেলেকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
তার নিজের চোখ থেকেও অশ্রু ঝরছে।
কিন্তু তিনি শুধু একটি কথাই বললেন,
“না, বেটা, ঘৃণা মানুষকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে দেয়। তোমার পাপা চাইতেন তুমি মানুষ হও। ওনার মতো মাথা উঁচু করে বাঁচো।”
কিন্তু সেই রাতে মায়ের বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে থাকা ছোট্ট আফরিদের হৃদয়ে প্রতিশোধ, শোক আর ভাঙা বিশ্বাসের যে বীজ রোপিত হলো সেটাই একদিন তার সমগ্র জীবনকে বদলে দিতে চলেছিল।
********************
ইসাবেলা অস্থির হয়ে ঘরের ভেতর পায়চারি করছে।
তার চোখে স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ। কিছুতেই মন স্থির করতে পারছে না সে।
আলবার্ট তার স্বামী সেদিনের পর থেকে আর ফেরেনি। ফোনেও কোনো উত্তর নেই।
রোসা বারবার এসে ডাক দিয়েছে খাওয়ার জন্য, কিন্তু ইসাবেলা একবারও প্লেটের দিকে হাত বাড়ায়নি।
ক্ষুধা নয় তার ভেতরটা ভরিয়ে আছে অজানা আশঙ্কায়।
সবকিছু কেমন এলোমেলো, জটিল, বিভ্রান্তিকর হয়ে যাচ্ছে। মুস্তাক এহসানের সেই পার্টিতে হঠাৎ বিস্ফোরণের মতো রাগ, তারপর আলবার্টের আচমকা ভুল স্বীকার এরপর ল্যাবের সেই বিভীষিকাময় ঘটনা
মুস্তাক এহসান, মারুফুল হক, আর মেহমুনা আহমেদের মৃ’ত্যু সব মিলিয়ে বাস্তবতা যেন এক জটিল ধাঁধা।
ইসাবেলা মাথা চেপে ধরে বসে পড়ে।
“কী হচ্ছে এসব!”
ঠিক তখনই দরজায় ক্ষীণ নক পড়ে। ছোট্ট ইভেলিনা ভেতরে ঢুকল।তার কণ্ঠ কোমল,
“মে আই কাম ইন, আন্টি?”
ইসাবেলা এক মুহূর্তের জন্য মৃদু হাসল। এই নিষ্পাপ কণ্ঠই যেন তাকে একটু স্বস্তি দিল।
“এসো ইভেলিনা আন্টির ঘরে ঢুকতে আবার পারমিশন লাগে নাকি, মামুনি?”
ইভেলিনা ধীরে এগিয়ে এসে ইসাবেলার সামনে বসে পড়ল। তার দৃষ্টি স্থির ইসাবেলার পেটের দিকে।
ভিতরে বেড়ে ওঠা নতুন জীবনের দিকে।
সে কৌতূহলী স্বরে বলল,
“আমাদের ছোট্ট ফেয়ারির নাম কী রাখবে, আন্টি?”
ইসাবেলা মৃদু হেসে ইভেলিনার থুতনি ছুঁয়ে দিল।
“উমম, কী রাখা যায় বলো তো?”
ইভেলিনা কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর হঠাৎ বলে উঠল,
“ইলা!”
ইসাবেলা হেসে ফেলল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য মায়া ঝিলিক দিল।
“আর যদি ছেলে হয়?”
ইভেলিনার মুখটা হালকা ম্লান হয়ে গেল।
এই দিকটা সে ভাবেনি। সে কিছুটা থেমে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে কী রাখবে আন্টি?”
ইসাবেলা ধীরে ধীরে ভাবতে লাগল। ঘরের নীরবতা আরও গভীর হয়ে উঠল। কয়েক মুহূর্ত পর সে বলল,
“ইলহাম ন্যান্সি।”
তার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত স্থিরতা।
“মেয়ে হলে ইলহাম ন্যান্সি। আর ছেলে হলে শুধু ইলহাম।”
ইভেলিনার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
“ও গ্রেট! দারুণ নাম!”
********************
অন্যদিকে এহসান প্যালেসের চারপাশ ঘিরে ফেলেছে পুলিশ বাহিনী। নীল আলো, সাইরেন, আর হাই-রেডিও নির্দেশে পুরো এলাকা এক অস্বাভাবিক উত্তেজনায় কাঁপছে। বারান্দায় পড়ে আছে অভ্রের নিথর দেহ।
ফরেনসিক টিম ব্যস্তভাবে কাজ করছে। সাক্ষীদের জেরা চলছে। চারপাশে প্রশ্নের ঝড়। প্রাথমিক তদন্তে সন্দেহের আঙুল উঠেছে
মাইমুনা এহসান ও তার পরিবারের দিকে।
তারপর থেকেই পুরো পরিবারকে “ফেরারি” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আফরিদ, নীলাদ্রি, সাব্বির সবাই নিখোঁজ। খবরটি দ্রুত পৌঁছে যায় মিডিয়া এবং বিভিন্ন সংস্থার কাছে।
****************
এই খবর যখন আলবার্টের কানে পৌঁছায় সে ধীরে ধীরে হেসে ওঠে। একটি শীতল, হিসেবি হাসি।
তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই। শুধু তৃপ্তি।
সে ধীরে বলে ওঠে।
“তাহলে শুরু হয়ে গেছে! কতদিন পালাবে ওরা? একদিন না একদিন ধরা তো পড়বেই।”
তার কণ্ঠে নির্মম আত্মবিশ্বাস।
“পুলিশ এখন আমার কাজটা সহজ করে দেবে।”
সে চেয়ারে হেলান দেয়। হালকা শ্বাস ফেলে।
তারপর ধীরে যোগ করে,
“আফসোস, কষ্ট আমাকে করতে হলো না।”
কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখ কুঁচকে যায়। মুখে আসে অস্বস্তির ছায়া।তার কণ্ঠ নিচু হয়ে আসে।
“ফর্মুলার ফাইল! ওটা এখনো পাওয়া গেল না।”
তার দৃষ্টি দূরে স্থির হয়ে যায়।
ল্যাবের সেই রহস্যময় ফাইল যার জন্য এত র’ক্ত, এত মৃ’ত্যু, এত ষড়যন্ত্র তা এখনো অধরা।
আর সেটাই আলবার্টের ভেতরের অস্থিরতার একমাত্র কারণ হয়ে উঠছে।
চলবে……………।
(অনেক বড় গল্প, চেষ্টা করেও এক পর্বে দিতে পারিনি,আরো একটা অংশ আছে।)
আমি আবারো সতর্ক করছি, আপনারা যদি রেসপন্স করতে কার্পন্য করেন তাহলে আমিও সত্যি বলছি গল্পটা অফ করে দেব। তারপর যত ইচ্ছে সমালোচনা করুন।আই ডোন্ট কেয়ার…)
#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা
[পর্ব ৯৭] (শেষাংশ)
#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম
( দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয় এবং প্রাপ্তমনস্কদের জন্য উন্মুক্ত)
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
[দ্বিতীয় খন্ড]
বাংলাদেশ।
অসংখ্য নদীনালা, সবুজ শ্যামল প্রকৃতি আর কোলাহলময় শহরের দেশ। কিন্তু আফরিদ এহসানের কাছে এই দেশ ছিল নির্বাসনের ভূমি।
স্পেনের বার্সেলোনা থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে আসার পর থেকেই তাদের জীবনটা আর স্বাভাবিক থাকেনি।
প্রতিটি দিন কাটত আতঙ্কে। প্রতিটি রাত কাটত অজানা আশঙ্কায়। মুস্তাক এহসানের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে মাইমুনা এহসান, আফরিদ, সাব্বির, ফাহমিদা এবং নীলাদ্রিকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন।
নিজস্ব প্রাইভেট জেটের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি।
যদিও মুস্তাকের সঙ্গে তার পরিচয় খুব বেশি দিনের ছিল না, তবুও বন্ধুত্বের মর্যাদা রাখতে তিনি পিছপা হননি। অথচ বহু বছরের বন্ধু আলবার্টই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়ংকর বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠেছিল।
ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! যে মানুষটাকে মুস্তাক ভাইয়ের মতো বিশ্বাস করতেন, সেই মানুষটাই তার মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সময় ধীরে ধীরে গড়াতে লাগল। কিন্তু পরিস্থিতি বদলালো না।
বরং আরও জটিল হয়ে উঠল। মাইমুনা এহসানের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ জমা হতে লাগল।
আগে অভিযোগ ছিল মুস্তাক এহসান, মারুফুল হক এবং মেহমুনা আহমেদের হত্যাকা’ণ্ড।
এবার যুক্ত হলো আরেকটি মামলা। অভ্রের মৃত্যুর অভিযোগও চাপিয়ে দেওয়া হলো তার কাঁধে।
ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি কার্যত পলাতক অভিযুক্ত। আর সেই পরিচয় নিয়েই বাঁচতে হচ্ছে তাদের।
*****************
বছর গড়াতে লাগল। ছোট্ট আফরিদ বড় হতে লাগল।
কিন্তু তার শৈশব আর বড় হলো না। সেটা আটকে রইল বারো বছর আগের সেই রক্তা’ক্ত ল্যাবে।
নতুন স্কুলে ভর্তি করা হলো তাকে। সেখানে অন্য ছেলেমেয়েরা হাসত, খেলত, বন্ধুত্ব করত।
কিন্তু আফরিদ? সে যেন অন্য জগতের মানুষ।
সবসময় গম্ভীর। সবসময় নীরব। কেউ কথা বললে ছোট্ট উত্তর দিত। সকলে তাকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখল।তার ভিন্ন চোখের দিকে তাকাতো। আলোচনা সমালোচনা করতো। আফরিদ শুনতো,চুপ থাকত!তারপর আবার নিজের জগতে ফিরে যেত। কারণ তার মাথার ভেতর সর্বদা একটা দৃশ্য ঘুরপাক খেত। একটাই দৃশ্য।
মুস্তাক এহসানের র’ক্তাক্ত মুখ। তার বাবার শেষ মুহূর্ত।
প্রতিটি রাত। প্রতিটি সকাল। প্রতিটি নিঃশ্বাসে সেই স্মৃতি। ধীরে ধীরে ছেলেটার ভেতরে জন্ম নিতে লাগল এক অন্ধকার। একটা ঠাণ্ডা, নিষ্ঠুর, বিপজ্জনক অন্ধকার।
*****************
আরও কয়েক বছর পর আফরিদ কলেজে পা রাখল।
দেখতে সুদর্শন। লম্বা। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। কিন্তু ভীষণ রুক্ষ। মুখে সর্বদা নির্লিপ্ত ভাব। চোখদুটো অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। যেন পৃথিবীর কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারে না। কলেজের অনেক ছাত্রই তাকে অপছন্দ করত। বিশেষ করে কিছু সিনিয়র।
কারণ আফরিদ কখনো কাউকে তোষামোদ করত না।
মাথা নত করত না। কাউকে ভয়ও পেত না।
তাই সুযোগ পেলেই তাকে খোঁচাখুঁচি করত তারা।
অপমান করত। উস্কানি দিত। কিন্তু আফরিদ কখনো উত্তর দিত না। নীরবে সব সহ্য করত।
**************
সেদিনও কলেজ ছুটির পর ওয়াশরুমে গিয়েছিল সে।
মুখে পানি ছিটিয়ে বাইরে বেরোতেই থমকে দাঁড়াল।
সামনে চারজন ছেলে। সেই পরিচিত মুখগুলো।
যারা প্রতিনিয়ত তাকে বিরক্ত করে। আফরিদ কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল।
ঠিক তখনই একটা হাত শক্ত করে তার কলার চেপে ধরল। ছেলেটা বিদ্রূপের হাসি দিয়ে বলল,
“নিজেকে কী মনে করিস, হ্যাঁ? আমরা তোর সিনিয়র। সেটা ভুলে গেছিস?”
মুহূর্তেই জমে গেল পরিবেশ।আফরিদের দৃষ্টি ধীরে ধীরে নেমে এলো সেই হাতটার দিকে। যে হাত তার কলার চেপে ধরেছে।তারপর অকস্মাৎ মস্তিষ্কে ভেসে উঠল মুস্তাক এহসানের মুখ।
বাবার কণ্ঠস্বর যেন কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হলো
“সবসময় ছেড়ে দিতে নেই, চ্যাম্প। কিছু মানুষকে সময়মতো জবাব দিতে হয়। নাহলে তারা তোকে পিষে ফেলবে।”
ব্যস। কিছু একটা ভেঙে গেল আফরিদের ভেতরে। পরের মুহূর্তেই ধাম! সজোরে ঘুষি বসিয়ে দিল ছেলেটার মুখে। এত দ্রুত আঘাত এসেছিল যে কেউ প্রস্তুতই ছিল না। ছেলেটা ছিটকে গিয়ে ওয়াশরুমের দরজায় আছড়ে পড়ল। তার নাক ফেটে র’ক্ত বেরিয়ে এলো।বাকি তিনজন ক্ষিপ্ত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল আফরিদের দিকে।কিন্তু একা চারজনের সঙ্গে লড়া সহজ নয়।কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তারা সংখ্যার জোরে তাকে চেপে ধরতে শুরু করল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো এক কণ্ঠস্বর।
“এই! চারজন মিলে একজনের উপর?”
সবাই ঘুরে তাকাল।একজন যুবক দ্রুত এগিয়ে আসছে।উচ্চতা প্রায় ছয় ফুট।
চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি।সে কোনো কথা না বলে সরাসরি আফরিদের পাশে দাঁড়াল।
তারপর বলল,
“চলো ভাই, একটু শিক্ষা দেওয়া যাক।”
আফরিদ প্রথমবারের মতো বিস্মিত হলো। সে লোকটাকে চেনে না। তবুও ছেলেটা তার পাশে দাঁড়িয়েছে। এরপর দুজনে মিলে পরিস্থিতি সামাল দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যে চারজনের সাহস কোথায় যেন উবে গেল।
*************
ঘটনার পর যুবকটি আফরিদের বাহু ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগল।
“চল, এখান থেকে কেটে পড়ি।”
আফরিদ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কেন?”
ছেলেটা হেসে উত্তর দিল,
“কারণ ওদের নামে প্রিন্সিপালের কাছে এমনিতেই ট্রাকভর্তি কমপ্লেইন জমা আছে। আজ আবার মারামারি হয়েছে। এখন ধরা পড়লে ঝামেলা বাড়বে।”
সে একটু থামল। তারপর হাত বাড়িয়ে বলল
“বাই দ্য ওয়ে আমার নাম…”
তার ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
“আমার নামটা পরে বলব। আগে এখান থেকে বের হই।”
প্রথমবারের মতো আফরিদ এহসানের ঠাণ্ডা চোখে ক্ষীণ কৌতূহলের ঝলক দেখা দিল। হয়তো বহু বছর পর এই প্রথম কেউ তার জীবনের অন্ধকার দরজায় কড়া নাড়ল।
****************
দেয়ালের গা ঘেঁষে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বসে আছে অপরিচিত যুবকটি। তার দুই পা সামনের দিকে প্রসারিত, আঙুলের ফাঁকে ধরা আধপোড়া সিগারেট থেকে ধূসর ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে আকাশের দিকে উঠছে। আর তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে আফরিদ এহসান। চিরচেনা সেই গম্ভীর মুখাবয়ব।
নিষ্প্রভ অথচ ভয়ংকর স্থির দুটি চোখ।
যেন অনুভূতি নামক বস্তুটির সঙ্গে বহু আগেই বিচ্ছেদ ঘটেছে তার। ক্লান্ত স্বরে ছেলেটা বলল,
“বাই দ্য চৌরাস্তা, আমার নাম এলেন। এলেন দ্য ছাপড়ি!”
অন্য কেউ হলে হয়তো হাসত।আফরিদ হাসল না।তার মুখের পেশী পর্যন্ত নড়ল না।এলেন ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“তোমার নাম আফরিদ। আফরিদ এহসান। ঠিক বললাম?”
আফরিদ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল,
“হুঁ।”
এলেন সিগারেটে টান দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল,
“ওরা এতদিন ধরে তোকে বিরক্ত করছে। তুই চুপ থাকিস কেন?”
আফরিদের ঠোঁট বেঁকে উঠল।তাচ্ছিল্য মাখা স্বরে বলল,
“ইঁদুর মেরে হাত নষ্ট করি না আমি।”
কথাটা শুনে এলেন কয়েক সেকেন্ড নির্বাক হয়ে রইল।
এমন ঔদ্ধত্য সে সচরাচর দেখে না।সিগারেট ধরা হাতটা শূন্যে থমকে গেল।পরক্ষণেই আফরিদ সিগারেটটা তার হাত থেকে নিয়ে ঠোঁটে গুঁজে দিল।এলেন এবার সত্যিই কৌতূহলী হয়ে উঠল।
“তুই এমন গম্ভীর কেন?”
“আমি এমনি।”
এর বেশি একটি শব্দও ব্যয় করল না আফরিদ।
ঘুরে নিজের পথে হাঁটতে শুরু করল।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এলেনও তার পিছু নিল।সেই দিন থেকেই শুরু হয় এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব। একজন নীরব ঝড়।আরেকজন বিশৃঙ্খল হাসির কারিগর।
*************
মাস গড়াল।মাস পেরিয়ে বছর।ধীরে ধীরে নিজের চারপাশে নির্মিত লৌহপ্রাচীর ভাঙতে শুরু করল আফরিদ।প্রথমবারের মতো কাউকে বলল নিজের গল্প।বার্সেলোনার সেই র’ক্তা’ক্ত রাত।মুস্তাক এহসানের মৃ’ত্যু।মেহমুনার বিশ্বাসঘাতকতা।
মিস্টার আলবার্ট। মিখাইল। আর আইনের নির্মম ব্যর্থতা। সব শুনে এলেন দীর্ঘক্ষণ নিশ্চুপ বসে ছিল।
তারপর নিচু স্বরে বলেছিল,
“তোর প্রতিশোধ আমি নেব না, আফরিদ।”
আফরিদ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছিল। এলেন হেসেছিল।
“কিন্তু তোর পাশে দাঁড়াব।”
************
এক সন্ধ্যায় বাড়ি না ফিরে শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি গোপন ফ্ল্যাটে গেল আফরিদ।
জায়গাটি নির্জন।চারদিকে পরিত্যক্ত গুদামঘর।
বাতাসে ধুলো।মানুষের আনাগোনা প্রায় নেই বললেই চলে।এলেন ভেতরে ঢুকতেই থমকে গেল।
একটি বিশাল বোর্ড দেয়ালজুড়ে টাঙানো। তার উপর কালো কাপড় ঢাকা।
আফরিদ ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে একটি বাটন চাপল।
সঙ্গে সঙ্গে কাপড়টা সরে গেল।এলেনের চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল।পুরো বোর্ডজুড়ে একটাই নাম।
মিস্টার আলবার্ট।অসংখ্য ছবি।অসংখ্য নোট।মানচিত্র।তারিখ।সম্পর্ক।যোগাযোগ।পারিবারিক তথ্য।ব্যবসায়িক লেনদেন।কোথায় যায়।
কার সঙ্গে দেখা করে।কখন বের হয়।
কখন ফেরে।প্রতিটি পদক্ষেপ যেন অদৃশ্য কোনো শিকারির নজরদারিতে বন্দি।এলেন হতবাক।
“মিস্টার আলবার্ট!”
আফরিদ টেবিলের উপর উঠে বসে পা দোলাতে লাগল। তার ঠোঁটে শীতল হাসি।
“মিস্টার আলবার্ট। সন অফ আ বিচ।”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। এলেন ধীরে ধীরে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কী করতে চাস তুই?”
আফরিদ উত্তর দিল বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়াই,
“ওর পতন দেখতে চাই।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর আরও নিচু স্বরে যোগ করল,
“নিজ চোখে।”
********
এলেনের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।প্রথমবারের মতো সে বুঝল এটা কেবল প্রতিশোধ নয়।
এটা বহু বছরের জমে থাকা ক্ষত। বহু বছরের অগ্নিদাহ। আফরিদ অস্থির কণ্ঠে বলল,
“আমি একা পারব না। অনেক দরজা আছে যেগুলো আমার জন্য এখনো বন্ধ। অনেক তথ্য আছে যা আমার নাগালের বাইরে।”
এলেন কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
অতঃপর মৃদুস্বরে বলল,
“তুই জানিস, আমার যোগাযোগ আছে।”
আফরিদ ভ্রু তুলল।এলেন সাধারণ কলেজপড়ুয়া নয়।
ছোটবেলা থেকেই সমাজের অন্ধকার প্রান্তসীমা, অপরাধচক্র, ছায়াময় লেনদেন আর ক্ষমতার গোপন করিডোরের সঙ্গে পরিচিত সে।কালো দুনিয়ার লোকজন তাকে চেনে।আর সেও চেনে তাদের। এলেন হাত বাড়িয়ে দিল।
“বন্ধুর জন্য এতটুকু করতে পারব না?”
আফরিদ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
অতঃপর হাত বাড়িয়ে ধরল।দুই হাত এক হলো।
সেই মুহূর্তে হয়তো তারা বুঝতে পারেনি তাদের জীবন আর কখনো আগের মতো থাকবে না।
****************
মাইমুনা এহসান বদলে গেছেন। সপ্তাহে দু’দিন তিনি নিজের মতো করে থাকেন।সেই দু’দিন যে দু’দিন মুস্তাক এহসান তার জীবনে এসেছিল এবং চলেও গেছে।
আফরিদ শুধু তাকে দেখে,আর নীরবে প্রতিজ্ঞা করে,তার সুন্দর পরিবার নষ্ট করে দেওয়া মানুষটিকে সে জী’বন্ত পু’ড়িয়ে দেব!শেষ করবে তার পরিবার!
এরপর শুরু হলো নতুন অধ্যায়।এক অন্ধকার অধ্যায়।যেখানে আফরিদ ধীরে ধীরে প্রবেশ করল ক্ষমতা, ভয়, গোপন লেনদেন, ছায়াময় নেটওয়ার্ক এবং অপরাধপ্রবণ মানুষের জগতে।
কিন্তু তার কাছে এগুলোর কোনোটাই লক্ষ্য ছিল না।
লক্ষ্য ছিল একটাই।মিস্টার আলবার্ট। আর প্রতিবার যখন মাইমুনা এহসান ছেলের সামনে বসে মুস্তাক এহসানের শেষ দিনের কথা বলতেন প্রতিবার যখন তার চোখ ভিজে উঠত প্রতিবার যখন আফরিদ শুনত নিজের বাবার মৃ’ত্যুর গল্প তার হৃদয়ের মানবিক অংশটুকু আরও একটু করে নিভে যেত। আর জেগে উঠত এক নতুন আফরিদ। ভয়ংকর।
নির্মম।প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যে নিজের কাছে শপথ করেছিল,
“এই পৃথিবী ভুলে গেলেও আমি ভুলব না। মিস্টার আলবার্টকে আমি কখনো ক্ষমা করব না।”
**********************
“হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, ইলহাম! মাই লিটল প্রিন্সেস!”
বাক্যটি উচ্চারণ করেই দু’বাহু প্রসারিত করে ক্ষুদ্রকায় কন্যাটিকে আপন বক্ষে আবদ্ধ করে নিলেন ইসাবেলা আলবার্ট।
মাতৃস্নেহের উষ্ণ পরশে আপ্লুত হয়ে ছয় বসন্তের ক্ষুদে ইলহাম ন্যান্সি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল,
“থ্যাংক ইউ, মাম্মা!”
শিশুটির চোখেমুখে তখন নিখাদ সরলতা ও নিষ্কলুষ আনন্দের দীপ্তি। অতঃপর চারপাশে কৌতূহলী দৃষ্টি বুলিয়ে সে মৃদুস্বরে প্রশ্ন করল,
“মাম্মা, পাপা কোথায়?”
কন্যার মুখে স্বামীর প্রসঙ্গ উচ্চারিত হতেই ইসাবেলার মুখাবয়বে নেমে এলো এক অদৃশ্য বিষণ্নতার ছায়া। মুহূর্তেই যেন উজ্জ্বল মুখমণ্ডল আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল তমসাচ্ছন্ন গাম্ভীর্যে।
তিনি কীভাবে বুঝিয়ে বলবেন মিস্টার আলবার্ট আজও বাড়িতে অনুপস্থিত?
মানুষটা দিনদিন যেন অপরিচিত হয়ে উঠছে। অর্থ, প্রভাব-প্রতিপত্তি আর কর্মব্যস্ততার অন্তহীন গোলকধাঁধায় নিজেকে এমনভাবে নিমজ্জিত করেছে যে সংসার, স্ত্রী কিংবা কন্যার জন্য অবসর বের করা যেন তার পক্ষে দুরূহ হয়ে উঠেছে।
বহু বৎসর পূর্বের সেই আলবার্টের কথা মনে পড়ে ইসাবেলার যে মানুষটি অগাধ মমতা ও অকৃত্রিম ভালোবাসায় আগলে রাখত তাদের।
আজ সেই মানুষটি যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।
কন্যার কোমল চিবুক স্পর্শ করে ইসাবেলা স্নিগ্ধ কণ্ঠে বললেন,
“আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে, ন্যান্সি।”
ন্যান্সি নির্বাকভাবে মাথা দোলাল।তবুও তার ক্ষুদ্র হৃদয়খানি যেন অভিমানে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। পিতা সর্বদাই ব্যস্ত তার জন্য সময় নেই, অবসর নেই।
এই বোধটুকুই ছোট্ট মেয়েটির মনে অদ্ভুত এক শূন্যতার জন্ম দেয়। ইসাবেলা পুনরায় বললেন,
“চলো, আমরা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে আসি।”
ন্যান্সি কোনো উত্তর দিল না। নিঃশব্দে মায়ের অনুগামী হলো।সে এখনো শেখার বয়সে রয়েছে। মা যা শেখান, সেটাই তার কাছে সত্য। নতুন করে প্রশ্ন তোলার মতো বয়স কিংবা অভিজ্ঞতা কোনোটাই তার হয়নি।
স্কুলে যাওয়া শুরু হয়েছে সবে মাত্র।এখন তার পৃথিবী মানেই মা, বাবা আর কিছু সরল স্বপ্ন।
**********************
“ড্যাড, তুমি বলেছিলে আজ স্কুলের ফাংশনে যাবে। কিন্তু গেলে না! আজ অন্তত আমি তোমাদের সঙ্গে পার্টিতে যাবো। প্লিজ!”
শিশুসুলভ আবদারে মুখর হয়ে উঠেছিল ন্যান্সি।
কিন্তু তার কথায় বিরক্ত হয়ে উঠলেন মিস্টার আলবার্ট। ভ্রূকুটি করে উচ্চস্বরে ধমকে উঠলেন,
“স্টপ ইট, ইলহাম!”
পিতার এমন রূঢ় উচ্চারণে ভেতরের কক্ষ থেকে দ্রুত বেরিয়ে এলেন ইসাবেলা। কন্যার প্রতি স্বামীর এই অপ্রত্যাশিত কঠোরতা দেখে বিস্মিত স্বরে বললেন,
“হোয়াটস গোয়িং অন, আলবার্ট? ওর সঙ্গে এভাবে চিৎকার করছ কেন?”
আলবার্ট বিরক্তি দমনের কোনো প্রয়াস না করেই বললেন,
“তোমার মেয়ে জেদ ধরেছে ওকেও সঙ্গে নিতে হবে।”
ইসাবেলা অসহায় দৃষ্টিতে তাকালেন কন্যার মুখপানে।
আজ তাদের উপস্থিত থাকতে হবে এক বিশাল আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে। সেখানে উপস্থিত থাকবে আলবার্টের সহকর্মী, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি। আলবার্ট পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছেন ন্যান্সিকে আজ সঙ্গে নেওয়া হবে না।
তার যুক্তি, ন্যান্সি এখনো শিশু। সেখানে গিয়ে যদি কোনো অনভিপ্রেত আচরণ করে বসে?
তদুপরি অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্য কেউই সন্তানদের সঙ্গে আনবে না। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ন্যান্সিকে রেখে যাওয়া হবে আলবার্টের ভাইয়ের স্ত্রী রোসার কাছে।
আর ইভেলিনা তো আছেই সে ন্যান্সির সঙ্গ দেবে।
কিন্তু শিশুমন যুক্তি বোঝে না।
সে কেবল বুঝে সে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতে চায়।
ইসাবেলা ধীর কণ্ঠে বললেন,
“আলবার্ট, কোনোভাবেই কি ওকে সঙ্গে নেওয়া যায় না? মেয়েটা এখনো খুব ছোট।”
আলবার্টের চোখদুটি ক্রোধে দীপ্ত হয়ে উঠল।
স্পষ্টতই তিনি এ বিষয়ে আর কোনো আলোচনা করতে রাজি নন। অগত্যা ছয় বছরের নিষ্পাপ ইলহাম ন্যান্সিকে গৃহেই রেখে বেরিয়ে যেতে হলো তাদের।
প্রস্থানকালে ছোট্ট ন্যান্সি অঝোরে কেঁদেছিল।
দুই হাত বাড়িয়ে বারবার বলেছিল,
“আমি যেতে চাই, আমি তোমাদের সঙ্গে যেতে চাই!”
কিন্তু তার কান্নাভেজা আর্তি সেদিন কারও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেনি। দরজাটি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটির চোখে তখন জমে উঠেছিল অবহেলার প্রথম বেদনাময় অশ্রুবিন্দু।
**********************
রাত গভীর। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ যেন পুরো নীরবতাকে ছেদ করে দিচ্ছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই বাড়ির পশ্চাৎ ফটক দিয়ে নিঃশব্দে প্রবেশ করল দুইজন অজ্ঞাত পুরুষ।
মুখমণ্ডলে শক্ত কালো মাস্ক। চোখে কোনো মানবিকতার ছায়া নেই শুধু প্রশিক্ষিত শীতলতা।
বাইরে অপেক্ষমাণ গাড়ির ইঞ্জিন নিভে আছে, যেন মৃত্যুর পূর্বের নিস্তব্ধতা।
প্রধান ফটকে দু’জন নিরাপত্তা সিকিউরিটি সতর্ক অবস্থানে।
কিন্তু ভেতরের এই অনুপ্রবেশ তারা টেরও পেল না।
দু’জন যুবক প্রবেশ করতেই সিসি ক্যামেরার নজরে ধরা পড়ল।এক মুহূর্ত।একটি নীলাভ দৃষ্টি।তীক্ষ্ণ, স্থির, অমানবিকভাবে শান্ত। পরক্ষণেই
ঝনঝন শব্দে ক্যামেরা ছিন্নভিন্ন হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
*************
ড্রয়িং রুমে তখনো হালকা আলো জ্বলছিল।
হঠাৎ শব্দে চমকে উঠল সবাই। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটেছে লোডশেডিং। জেনারেটর এখনো চালু হয়নি।
রোসা তড়িঘড়ি করে মেয়েকে ডাকল,
“ইভেলিনা, মা ডোন্ট গো আউট ইন দ্য ডার্ক! স্টে উইথ ইউর সিস্টার!”
ঠিক তখনই ছায়ার মতো বেরিয়ে এলো দুইজন।
হাতে ছোট রিভলভার। শীতল নিঃশ্বাস।
নির্বাক মৃ’ত্যু-ঘোষণা। রোসার ভাই সামনে এগিয়ে চিৎকার করল,
“হু আর ইউ? হাউ ডেয়ার ইউ ইনট্রুড হিয়ার?”
কিন্তু তার বাক্য শেষ হওয়ার আগেই এক ঝটকায় এগিয়ে এলো এলেন। এক সেকেন্ডও দেরি না করে ধাক্কা। সোজা মাথায় আঘাত।
লোকটি মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। জ্ঞান হারাল। রোসা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল কিন্তু শব্দটা বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আরেকটি আঘাত।
এলেন নিঃশব্দে রোসাকেও অচেতন করে দিল।
মৃ’ত্যুর গন্ধ যেন দেয়ালে দেয়ালে লেপ্টে গেল।
*************
ঠিক তখনই রোসার চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল ছোট্ট ইলহাম ন্যান্সির।
অপরিচিত শব্দে বিচলিত হয়ে সে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো। দেয়ালঘড়ির কাঁটা তখনও নির্মম নির্লিপ্ততায় সময় গণনা করে চলেছে।
কতগুলো বছর ধরে অপেক্ষা করছিল সে। শেষমেষ আবারো স্পেনের মাটিতে পা রেখেছে সে।
কতগুলো দিন ধরে আলবার্ট পরিবারের প্রতিটি গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছে আফরিদ। আজ সে নিশ্চিত হয়েছে মিস্টার ও মিসেস আলবার্ট একটি পার্টিতে গিয়েছেন, আর তাঁদের কন্যা বাড়িতেই রয়েছে। এই সুযোগ সে হাতছাড়া করবে না।
প্রতিশোধের দাবানল বহুদিন ধরেই তার অন্তরে জ্বলছে। এলেন ইতোমধ্যে অজ্ঞান দম্পতিকে টেনে-হিঁচড়ে গাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সামান্য অসাবধানতাও বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
নিরাপত্তারক্ষীরা এখনো জেনারেটর সচল করার কাজে ব্যস্ত।
কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।ঠিক তখনই কচি কণ্ঠে ভেসে এলো প্রশ্ন,
“হেই! হু আর ইউ?”
দুই বোনের মধ্যে বড়টি, ইভেলিনা, ভয়ে বিবর্ণ মুখে ছোট বোনকে নিজের পেছনে সরিয়ে নিল।
স্প্যানিশ ভাষায় ফিসফিসিয়ে বলল,
“ইলহাম! পালাও!”
কিন্তু সে সুযোগ আর মিলল না।আফরিদের বৃহৎ করতল মুহূর্তেই ইভেলিনার বাহু আঁকড়ে ধরল।
রিভলবারের কালো নল তার মুখের সামনে উঠতেই কিশোরীটি আতঙ্কে জমাট বরফের ন্যায় স্থবির হয়ে গেল।
গভীর, শীতল এবং হিংস্র কণ্ঠে আফরিদ উচ্চারণ করল,
“আর এক পা এগোলেই গু’লি করব।”
ভয়ে ইভেলিনার সমগ্র দেহ কাঁপতে লাগল।
অথচ তার ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট ন্যান্সি বিস্ময়ভরা চোখে অপহরণকারীর দিকে তাকিয়ে আছে। আফরিদের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
এই সেই র’ক্ত আলবার্টের র’ক্ত।
তার বহু বছরের ঘৃণা ও প্রতিশোধস্পৃহা যেন মুহূর্তেই চোখের মণিতে প্রতিফলিত হলো। কিন্তু শিশুটির নিষ্পাপ মুখশ্রী সেই কঠোরতায় অদ্ভুত এক বিচ্যুতি সৃষ্টি করল। গোলাপি আভাযুক্ত গাল, এলোমেলো চুল, সরল বিস্ময়ে ভরা দু’টি চোখ মেয়েটি যেন ভয় কাকে বলে তা-ই জানে না।
আফরিদের হাতে থাকা রিভলবারটির দিকে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করল,
“ইটস আ টয় গান?”
প্রশ্ন শুনে আফরিদ ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল।
এরপর এক টানে মুখোশ সরিয়ে ফেলল।
পূর্ণ মুখাবয়ব উন্মোচিত হতেই শিশুটি কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর ছোট্ট আঙুল তুলে আফরিদের নীলাভ চক্ষুযুগলের দিকে বাড়িয়ে তা স্পর্শ করে। নরম স্পর্শে ক্ষণিকের জন্য দৃষ্টি বুঁজে এলো যুবকের। ইঙ্গিত করে বলল,
“ইউ হ্যাভ প্রিটি আইস।”
কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার বলল,
“মাম্মা বলে সন্দর (সুন্দর)”
ভুল বাংলা শুনে এক অদ্ভুত অনুভূতি ক্ষণিকের জন্য আফরিদের কঠিন মুখচ্ছবিতে তরঙ্গ তুলল। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট বাঁক ফুটে উঠল।
সে ধীরস্বরে প্রশ্ন করল,
“হোয়াট ইজ ইয়োর নেম?”
এদিকে এলেন আবার ফিরে এসেছে। আরও একজনকে নিয়ে যেতে হবে।পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে ইভেলিনা কান্নায় ভেঙে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আফরিদ রিভলবার উঁচিয়ে শীতল স্বরে গর্জে উঠল,
“চুপ! একটা শব্দও না। নইলে গু’লি করব।”
কিশোরীটি সঙ্গে সঙ্গে নীরব হয়ে গেল।
ঠিক তখনই ন্যান্সি হাসিমুখে উত্তর দিল,
“আই অ্যাম ইলহাম ন্যান্সি। হোয়াট ইজ ইয়োর নেম?”
আফরিদ কোনো জবাব দিল না। তাকিয়ে রইল ক্ষণকাল। শিশু সুলভ ওই কন্ঠস্বর ভীষণ মিষ্টি। যুবক রিভলবারটি সামনে এনে ধীর কণ্ঠে বলল,
“লেটস প্লে আ গেম।”
শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে ন্যান্সির চোখ জ্বলে উঠল।
“ইয়া! আই উইল প্লে!”
আফরিদের চোখে তখন অদ্ভুত এক অন্ধকার ছায়া।
সে ফিসফিস স্বরে বলল,
“ওপেন ইয়োর মাউথ।”
ন্যান্সি বিনা দ্বিধায় মুখ হা করল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ইভেলিনার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো দেয়ালের কোণে স্থাপিত নিরাপত্তা অ্যালার্মের উপর। তার বুকের ভেতর ঢাকের মতো শব্দ তুলছে হৃদস্পন্দন।
শুধু একটিবার মাত্র একটিবার যদি আফরিদের মনোযোগ বিচ্যুত হয় তাহলেই সে অ্যালার্ম চাপবে।
আর তারপর শুরু হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দুঃস্বপ্ন।
আবারও নিষ্পাপ ভঙ্গিতে আফরিদের দিকে তাকিয়ে রইল ন্যান্সি। আফরিদ ধীরে ধীরে ন্যান্সির মুখে রিভলবারের নলটা ঢুকিয়ে দিল।
ন্যান্সি পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতেই পারছে না।
তার কাছে সবকিছু যেন অদ্ভুত এক খেলা। ন্যান্সি থমকে গিয়ে মুখ থেকে নলটা বের করে ফেলল।
ন্যান্সি মৃদুস্বরে বলল,
“আই অ্যাম স্কেয়ার্ড, ব্যথা পাবো না তো?”
প্রশ্নটা শুনে মুহূর্তের জন্য থমকে গেল আফরিদ।
এত বছর ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা ক্রোধ, ঘৃণা আর প্রতিশোধস্পৃহা তাকে এখানে নিয়ে এসেছে।
কিন্তু তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটি সে তো আলবার্ট নয়। সে তো সেই মানুষটাও নয়, যে মুস্তাক এহসানের জীবন ধ্বংস করেছিল।
ন্যান্সি আবার বলল,
“ইটস আ গেম, রাইট?”
আফরিদ কোনো উত্তর দিল না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ তার স্মৃতিতে ভেসে উঠল আরেকটি মুখ। ছোটবেলার আফরিদ।আর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মুস্তাক এহসান।
“চ্যাম্প, কখনো নিরপরাধ মানুষের উপর রাগ ঝাড়বে না।”
বাবার কণ্ঠ যেন কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হলো।
আফরিদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।তার হাত মুঠো হয়ে গেল।এলেন দূর থেকে সব দেখছিল।
সে বুঝতে পারছে, আফরিদের ভেতরে এক ভয়ংকর যুদ্ধ চলছে।
“ইয়েস। ইটস্ আ গেম!”
অবশেষে বলল আফরিদ। তা শোনা মাত্রই ন্যান্সি আবারো নিজ থেকে রিভলবারের নল মুখে ঢুকিয়ে ফেলল ন্যান্সি। অপেক্ষা করতে লাগলো গেম খেলার জন্য। অথচ সে ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারল না ঠিক কি খেলা চলছে! আফরিদ ট্রিগারে হাত রাখল। দৃষ্টি তার তখনো ন্যান্সির গোল গোল নয়ন মানে!যা তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে!
চলবে………….।
(কোন কোন জায়গায় ভুল রয়েছে কমেন্টে জানাবেন। আমি কি কি মিস দিচ্ছি সেটাও বলবেন।)
Share On:
TAGS: অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা, ফারহানা নিঝুম
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪৩
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৭৭
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৩৫(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ১৮
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৯২
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৩
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৫২
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৯১
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪৭
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪২