Golpo romantic golpo অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা

অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৯২


#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা

[পর্ব ৯২]

#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম

(🚫 দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)

(🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

(নোট: এলার্ট আজকের পর্ব ঠিক তারাই পড়বেন যাদের স’হ্য ক্ষমতা আছে। নয়তো স্কিপ করুন।)

[দ্বিতীয় খন্ড]

ক্লান্ত শ্রান্ত ন্যান্সি বহু কষ্টে আয়াশকে নিদ্রার অতল গহ্বরে তলিয়ে দিয়ে সবে মাত্র নিজের দেহটাকে শয্যার উপর এলিয়ে দিয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজার আড়াল থেকে সতর্ক দৃষ্টিতে উঁকি দিল স্মাইলি। অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত রমণীটি কিছুক্ষণ দোদুল্যমান হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ভেতরে প্রবেশ করবে কি করবে না, সেই সংশয় যেন তার পদযুগলকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছিল। অবশেষে মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনকে উপেক্ষা করে ধীর অথচ সঙ্কুচিত পদক্ষেপে কক্ষে প্রবেশ করল সে।

••”স্বাগতম তোমায় আমার রণাঙ্গনে,

এখানে আবেগের নয়, কথা বলবে কেবল অস্ত্র আর কৌশল।

মনে রেখো, এবার প্রতিপক্ষ তোমার সমকক্ষ নয়,

তোমার শেষ চালটুকুও আমি আগেই পড়ে রেখেছি।

দাবার বোর্ডটা সাজাও…

কারণ এবার ‘চেকমেট’ বলার অধিকার শুধু আমার।”••

**

বিকেলের ঘড়িতে তখন সাড়ে চারটা প্রায় স্পর্শ করতে চলেছে। অন্যদিকে কল্পনা যেন সম্পূর্ণরূপে বাকরুদ্ধ ও স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। সাব্বিরের প্রতিটি উচ্চারিত বাক্য তার কর্ণকুহরে তীক্ষ্ণ শলাকার ন্যায় বিদ্ধ হচ্ছে।

এত বিশাল প্রতারণা! এত নৃশংস ছলনা! অথচ সে কিনা এতদিন নিজের স্বামীর হ’ত্যাকারীর সঙ্গেই নির্দ্বিধায় সখ্যতা বজায় রেখেছে!

চিন্তার বিষা’ক্ত দহন ক্রমশ বক্ষগহ্বর জুড়ে বিস্তার লাভ করল কন্যার। রক্তিম হয়ে উঠল আঁখিপল্লব। অন্তর্গত ক্ষোভ, ঘৃণা ও হতাশার তীব্র অভিঘাতে তার সমগ্র সত্তা যেন কেঁপে উঠল।

অতঃপর ধীর পদক্ষেপে করিডোর বেয়ে ন্যান্সির কক্ষের দিকে অগ্রসর হতে লাগল সে।

**

হঠাৎ করেই তীব্র চমকে নিদ্রা ভাঙল ন্যান্সির। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল কন্যা। কপালজুড়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘামবিন্দু জমে উঠেছে। বক্ষপিঞ্জরের অন্তরালে হৃদপিণ্ড যেন দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছে।

সে স্পষ্ট শুনেছে তার সন্তানের কান্না।আয়াশের আর্তস্বরে মুহূর্তের মধ্যেই তন্দ্রাচ্ছন্নতা সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়ে গেল।

আতঙ্কিত দৃষ্টিতে পাশে তাকাতেই সমগ্র শরীর হিম হয়ে এলো তার। শয্যার ডান পার্শ্ব সম্পূর্ণ শূন্য। ছোট্ট আয়াশ এহসানের কোনো অস্তিত্ব নেই সেখানে!

চক্ষুদ্বয় আতঙ্কে বিস্ফারিত হয়ে উঠল। মুহূর্তেই রক্তশূন্য হয়ে পড়ল মুখমণ্ডল। কাঁপা কণ্ঠে প্রায় আর্তনাদের সুরে চেঁচিয়ে উঠল ন্যান্সি,

“আয়াশ? আয়াশ বাবা?”

কোনো সাড়া নেই।হন্তদন্ত হয়ে শয্যা ত্যাগ করল সে। মনের অন্তস্তলে যুক্তির ক্ষীণ সান্ত্বনা ভেসে উঠল হয়তো সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল, সেই সুযোগে আয়াশের নিদ্রা ভেঙে গেছে। হয়তো তিতলি, মাইমুনা এহসান কিংবা বাড়ির অন্য কেউ তাকে নিচে নিয়ে গেছে।

তবুও অজানা আশঙ্কার এক শীতল স্রোত ক্রমাগত বয়ে চলল তার সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে।

ন্যান্সি ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হতেই মাইমুনা এহসান দৃষ্টি তুলে তার দিকে তাকালেন। বরাবরের ন্যায় অদ্ভুত অনমনীয় কন্ঠে বললেন,

“এ কি তুমি আয়াশকে একা রেখে চলে এসেছো? ইলহাম তোমার কি কান্ড জ্ঞান বলতে কিছু নেই?”

মাথায় উপর ছাদটা যেনো ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়ল ন্যান্সির! উৎকন্ঠিত হয়ে বলল,

“মানে কি মা? আয়াশ তো রুমে নেই! আমি ভাবলাম বোধহয় ও উঠে গেছে আর আপনাদের মধ্যে কেউ নিয়ে এসেছেন!”

ন্যান্সির এহেন কথায় বিরক্তিতে কপাল কুঞ্চন করে ফেললেন মাইমুনা এহসান। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তীর্যক কন্ঠে হেও করলেন,

“আমি মোটেও যাইনি তোমার রুমে। যাও দেখো বোধহয় তিতলি আর নয়তো স্মাইলি আয়াশকে নিয়ে গেছে!”

ন্যান্সি শুষ্ক ঢোক গিলল, যেই না সে তিতলির রুমের দিকে পা বাড়ায় ওমন সময় ফোনে কথা বলতে বলতে বাড়িতে প্রবেশ করল আফরিদ আর ইদ্রান।

ফোনালাপ শেষ করে আফরিদ ইদ্রানকে কিছু একটা বলছিল খুবই গম্ভীর কন্ঠে!

ইদ্রান তার কথায় সামান্য মাথা দুলিয়ে সম্মতি প্রকাশ করল,

অতঃপর ধীর গতিতে সামনে এগুতে লাগলো দু’জনে।

আফরিদ দৃষ্টি তুলে নিচের ঘরের দিকে ন্যান্সিকে ওমন হন্তদন্ত পায়ে যেতে দেখে মাইমুনা এহসানের উদ্দেশ্যে বলল,

“আয়াশ কোথায় মম?”

মাইমুনা এহসান ধীর ভঙ্গিতে গ্লাসভর্তি পানি এগিয়ে দিলেন আফরিদের দিকে। অতঃপর পূর্বের ন্যায় বিরক্তি মাখা কণ্ঠে বললেন,

“তোমার স্ত্রী তো ঘুমাচ্ছিল। আয়াশকে তিতলি নিয়ে গেছে।”

আফরিদ নির্বিকার চাহনিতে গ্লাসে চুমুক দিল। ঠিক তখনই ঝড়ের বেগে নিচে নেমে এলো ন্যান্সি। তার পশ্চাতে আতঙ্কগ্রস্ত মুখে বেরিয়ে এলো তিতলি।

ন্যান্সির কণ্ঠ মুহূর্তেই প্রকম্পিত করে তুলল সমগ্র বাড়ি।

“স্মাইলি? স্মাইলি কোথায় তুমি? নিচে এসো!”

এহেন উন্মত্ত আচরণে উপস্থিত সকলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল।

আফরিদের ভ্রুদ্বয় সংকুচিত হয়ে এলো। গ্লাসটা নামিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেল সে।

“কি হয়েছে তোর? এত বিচলিত হচ্ছিস কেন?”

ন্যান্সির শ্বাসপ্রশ্বাস অস্বাভাবিক দ্রুত। মুখমণ্ডল ঘামে সিক্ত। চক্ষুযুগলে স্পষ্ট উৎকণ্ঠার ছায়া।

“আয়াশ! আমার ছেলেকে পাচ্ছি না!”

কথাটা শুনে মুহূর্তেই পরিবেশের ভার যেন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেল।

ঠিক তখনই ভেতরে প্রবেশ করল স্মাইলি। তাকে দেখামাত্র ন্যান্সির দৃষ্টি ভয়ংকর রূপ নিল। প্রায় ছুটে গিয়ে দাঁড়াল তার সম্মুখে।

“আমার ছেলে কোথায়? আয়াশ কোথায় স্মাইলি?”

স্মাইলি বিস্মিত নয়নে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করল। পরিস্থিতি অনুধাবনের চেষ্টা করে ধীরস্বরে বলল,

“কি হয়েছে?”

পরবর্তী মুহূর্তেই ক্ষিপ্ত বাঘিনীর ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ল ন্যান্সি। দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরল স্মাইলির কলার।

“আমার ছেলেকে কোথায় রেখে এসেছো তুমি? বলো! কোথায় আমার ছেলে?”

রাগ, ভয়, উদ্বেগ সব মিলিয়ে সম্পূর্ণ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছে সে।

স্মাইলি নিজেকে ছাড়ানোর প্রয়াস চালিয়ে বলল,

“কি সব বলছো তুমি, ইলহাম? আমি তো আজ সকাল থেকে আয়াশকে কোলে নিইনি!”

ইদ্রান তৎক্ষণাৎ দৌড়ে এলো। ন্যান্সির হাত সরানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,

“কি করছো তুমি ইলহাম? প্রিন্সেসকে ছাড়ো!”

পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে সরে যাচ্ছিল। আফরিদও এগিয়ে এলো। কিন্তু ন্যান্সি তখন প্রায় উন্মাদের ন্যায় চিৎকার করে উঠল,

“আপনার বউকে বলুন আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে!”

আফরিদ দৃঢ় হাতে ন্যান্সির কবজি চেপে ধরে তাকে নিজের দিকে টেনে আনল। কন্যার চক্ষু রক্তাভ। ঠোঁট কাঁপছে অসহায়তায়।

পরক্ষণেই শিশুর ন্যায় ভেঙে পড়ল সে।

“আফরিদ… আমার ছেলেকে পাচ্ছি না… আমার আয়াশকে পাচ্ছি না।”

মাতৃত্বের আত’ঙ্ক যে কতটা নির্মম হতে পারে, তা যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল মুহূর্তটায়।

আফরিদ দুহাতে ন্যান্সির সিক্ত মুখাবয়ব তুলে ধরল।

“রিল্যাক্স জানকি বাচ্চা।”

অতঃপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল বাকিদের দিকে।

“তিতলি, আয়াশ কোথায়?”

তিতলি থরথর করে কাঁপছে। তার মুখের রঙ বিবর্ণ হয়ে গেছে। ঈশান এগিয়ে এসে কঠোর স্বরে বলল,

“আয়াশ কোথায়?”

তিতলির কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

“আমি জানি না ভাই। সত্যি বলছি আমি জানি না। আমি তো এতক্ষণ নিজের রুমেই ছিলাম!”

কথাটা শুনে আফরিদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখে জ্বলে উঠল ভয়ংকর কঠোরতা।

ন্যান্সি হুহু শব্দে কেঁদে উঠল। আফরিদের হাত দুটো শক্ত করে ধরে বলল,

“আমার ছেলেকে পাচ্ছি না আফরিদ।ওকে এনে দিন।”

এক মুহূর্ত সময় অপচয় না করে সে দ্রুত উপরের রুমের দিকে অগ্রসর হলো আফরিদ এহসান। তার পিছু পিছু ছড়িয়ে পড়ল বাড়ির সকলে।

সমগ্র বাড়িজুড়ে তখন শুধু একটাই নাম প্রতিধ্বনিত হচ্ছে,

“আয়াশ! আয়াশ! বাডি কোথায় তুমি?”

আফরিদ কক্ষে প্রবেশ করেই থমকে দাঁড়াল।

রুম ফাঁকা।আয়াশ নেই।পরবর্তী মুহূর্তেই দ্রুত ল্যাপটপ খুলে বসল সে। বাড়ির প্রতিটি কোণায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা। কে প্রবেশ করেছে, কে বেরিয়েছে সবকিছু ধরা পড়বে।

নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর শুধুমাত্র ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

হঠাৎ স্ক্রিনে ভেসে উঠল এক শীতল বিভীষিকা।

কালো পোশাকে আবৃত এক অজ্ঞাত সত্তা নিঃশব্দে প্রবেশ করল আফরিদের কক্ষে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত সম্পূর্ণ কৃষ্ণবর্ণ আবরণে ঢাকা তার অবয়ব। নারী না পুরুষ নির্ধারণ করাও অসম্ভব।

মানুষটি কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ঘুমন্ত ন্যান্সির দিকে।

অতঃপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ছোট্ট আয়াশের দিকে।

পুরো ঘরজুড়ে তখন চাপা আতঙ্কের দমবন্ধ নীরবতা।

সেই ব্যক্তি বাহু থেকে ক্ষুদ্র কোনো বস্তু বের করল। তারপর শিশুটির হাতে কিছু একটা পুশ করল।

সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠল আয়াশের ক্ষুদ্র দেহ। ঠোঁট ফাঁক করে বেরিয়ে এলো চাপা আর্তনাদ।

ন্যান্সি আঁতকে উঠে চিৎকার করে উঠল,

“আমার ছেলে! ওটা,,, ওটা কি পুশ করল?”

কণ্ঠে আতঙ্ক এতটাই তীব্র ছিল যে উপস্থিত সকলে শিউরে উঠল।

অন্যদিকে আফরিদ সম্পূর্ণ নির্বাক। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে স্ক্রিনে। চোখের গভীরে জমাট বাঁধছে অশুভ ক্রোধ।

অতঃপর সেই অজ্ঞাত ব্যক্তি অবলীলায় আয়াশকে কোলে তুলে নিল।

যেন পুরো বাড়ির নিরাপত্তাকে উপহাস করছে সে।

দরজার নিকটে পৌঁছে আচমকা থেমে গেল মানুষটি।

ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো সোজা সিসি ক্যামেরার দিকে।

তারপর নিঃশব্দে হাত উঠিয়ে “হাই” দেখাল।

সকলের দমবন্ধ হয়ে আসছে! দপ করে নিচে বসে পড়ল ন্যান্সি! হুহু করে কেঁদে উঠলো! তার কেন ঘুম ভাঙ্গল না? সে কেন আগে উঠল না? তার ছেলে কোথায়?

“আফরিদ মহিলা,,,ওই মহিলা সেদিন আমাকে আঘা’ত করেছিল?”

আফরিদ থমকানো ন্যান্সির হাতটি মুঠোয় ধরে শুধোয়,

“কোন মহিলা?”

সেদিন ন্যান্সির পিঠে এই নারীই তো আঘাত করেছিল।এই নারীকেই তো সে দেখেছিল!

ন্যান্সি ফুঁপিয়ে বলল,

“আমার ছেলেকে শেষ করে দেবে। আমার ছেলেকে এনে দিন! এখুনি এনে দিন!”

*****************

“আফরিদ এহসানের উত্তরাধিকার!”

শব্দদ্বয় কর্ণগহ্বরে প্রতিধ্বনিত হতেই স্তব্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল আলিয়াজ। নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে সে সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা আবৃত অবয়বটির দিকে চেয়ে রইল। অন্য সকলের নিকট রহস্যময় আগন্তুক হলেও, এই কৃষ্ণবস্ত্রে আবৃত সত্ত্বাটিকে আলিয়াজ অতি সুপরিচিতভাবেই চিনে!

গভীর স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল সে,

“এই শিশুটি… আফরিদের র’ক্তধারা?”

আবৃত অবয়বটি আর কেউ নয় এক নারী! সেই দুর্বোধ্য, প্রতিহিংসাপরায়ণা নারী, যার একমাত্র লক্ষ্য আফরিদ এহসান এবং ইলহাম ন্যান্সি অ্যাঞ্জেলিনার সর্বনাশ সাধন।

নারীটি ধীর ,শীতল কণ্ঠে উচ্চারণ করল,

“হ্যাঁ, আফরিদ এহসানের সন্তান!”

আলিয়াজের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। হিসহিসে স্বরে বলল,

“এহসান তোমাকে ধূলিসাৎ করে দেবে! তার প্রাণাধিক সন্তানকে তুমি এখানে টেনে এনেছ?”

নারীটি বোধহয় হাসল। অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে সেই হাসি যেন বিভীষিকার ন্যায় প্রতিধ্বনিত হলো। অতঃপর কর্কশ কণ্ঠে বলল,

“তার পূর্বেই আমি তাকে শেষ করব, ডিয়ার! আর তোমার সেই লিটল মাউস? সে তো ইতোমধ্যেই মানসিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত। তাকে নিঃশেষ করতে আমার দুই মিনিটও প্রয়োজন হবে না!”

ঠাস! ঠাস!তুড়ির তীক্ষ্ণ শব্দে কক্ষের নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ হয়ে উঠল। হঠাৎই নারীটি বিষমাখা কণ্ঠে বলল,

“তোমার সম্মুখে তোমার স্বীকারোক্তি রেখেছি, ডিয়ার! মনে আছে তো নিজের সন্তানের পরিণতির কথা?”

মুহূর্তেই অতীতের র’ক্তাক্ত স্মৃতি আলিয়াজের চেতনায় ঝড় তুলল।

নারীটি নির্মম ভঙ্গিতে শিশুটিকে বরফশীতল মেঝেতে শুইয়ে দিল। চার মাস বয়সী ফুটফুটে শিশুপুত্রটি যেন নিষ্পাপ সৌন্দর্যের এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি! তার কোমল মুখাবয়ব দর্শনমাত্র যে কারো হৃদয় অবধি শীতল হয়ে আসতে বাধ্য।

ধীর পদক্ষেপে পশ্চাতে সরে গেল নারীটি। আফরিদ প্রতিবার এই গোপন কক্ষে প্রবেশ করে যে সিংহাসনসদৃশ চেয়ারটিতে বসতো সে, আজ সেখানে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে গিয়ে বসল সেই রহস্যময়ী নারী।

আলিয়াজ হঠাৎই ঝাঁপিয়ে পড়ে শিশুটিকে বক্ষের কাছে টেনে নিল। ক্ষুদ্র দেহখানি তার বিশাল কর্কশ করতলে যেন অসহায় এক পাখিশাবকের ন্যায় কেঁপে উঠল। মুখে শক্তভাবে আবদ্ধ টেপের কারণে শিশুটির আর্তনাদ কণ্ঠনালীতেই রুদ্ধ হয়ে আছে। নিঃশ্বাস নিতে পর্যন্ত কষ্ট হচ্ছে তার। সবেমাত্র চার মাস বয়সী কোমল প্রাণ এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর অন্ধকার এখনো যার চেতনার অতলে পৌঁছায়নি।

আলিয়াজ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শিশুটির দিকে। নিষ্পাপ দুটি চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে আছে তার মুখপানে। সেই দৃষ্টিতে ছিল আতঙ্ক, অসহায়তা আর মায়ের জন্য অব্যক্ত আকুতি। ছোট্ট দেহটি বারবার কেঁপে উঠছে। সে বুঝতে পারছে না কেন এই ভয়ংকর মানুষটি তাকে এভাবে আঁকড়ে ধরেছে।

হঠাৎই আলিয়াজ তার ক্ষুদ্র, তুলতুলে হাতখানি নির্মমভাবে চেপে ধরল।

ক্ষুদ্র শরীরটা ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল। রুদ্ধ কণ্ঠে অস্ফুট গোঙানি বেরিয়ে এলো শিশুটির। সেই শব্দ এতটাই করুণ ছিল যে পাষাণ হৃদয়ও মুহূর্তে বিদীর্ণ হয়ে যেতে বাধ্য।

আলিয়াজের ঠোঁটে বিকৃত তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।

“আজ আফরিদ এহসান তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর শাস্তি পাবে। নিজের র’ক্তের আর্তনাদ শুনে ও ভেঙে পড়বে ধ্বংস হয়ে যাবে!”

অদূরে বসে থাকা কৃষ্ণবস্ত্রাবৃত নারীটি নির্বিকার ভঙ্গিতে ফোন উঁচু করে দৃশ্যটি ধারণ করতে ব্যস্ত। যেন কোনো মৃত্যুযজ্ঞের নীরব দর্শক সে। তার চোখেমুখে অনুশোচনার লেশমাত্র নেই; বরং প্রতিশোধস্পৃহায় উন্মত্ত এক বিকৃত প্রশান্তি।

কক্ষজুড়ে তখন শুধুই শিশুটির দমবন্ধ গোঙানি আর অশুভ নৈঃশব্দ্যের ভারী আবরণ।

ছোট্ট আয়াশ ছটফট করছে। মায়ের উষ্ণ বক্ষের পরিবর্তে আজ তাকে ঘিরে আছে নিষ্ঠুরতার বরফশীতল অন্ধকার। ধীরে ধীরে তার ক্ষুদ্র নিঃশ্বাসগুলো দুর্বল হয়ে আসছে। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দুগুলো কাঁপছে ক্ষীণ আলোয়। যখন ওই লম্বা নখদ্বয় বক্ষ ছিঁড়ে হৃদয় খামচে ধরে ওমনি নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে শিশুটির! চিরদিনের জন্য থমকে গেল সে! অশ্রু ধারা শেষবারের মতো কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল তার! চক্ষু্দ্বয় অতি বিস্ময়ে বড় আকৃতির হয়ে উঠল! অতঃপর এক পিশাচের সম্মুখে ছোট্ট প্রাণটি পৃথিবী ত্যাগ করল!

আহ্ কি নির্মম মৃত্যু তার! কতই বা বয়স? কতটুকুইবা সে বুঝতো? সে যে এক কোমল প্রাণ! সেই প্রাণকে যে কেউ নিষ্ঠুরভাবে নিঃশেষ করতে পারে তা এই দৃশ্যটা না দেখলে কল্পনা করা অসম্ভব!

চলবে………….।🥺

(আজকের পর্ব লিখতে গিয়ে কি পরিমান হাঁসফাঁস করেছি, অস্থির হয়েছি একমাত্র আমিই জানি। কিন্তু অনেকেরই মনে হবে ইচ্ছে করে পাঠকদের অনূভুতি নিয়ে খেলেছি। কিন্তু এটা ভুল। আমি গল্পের প্লট লিখার আগে পুরো গল্প সাজিয়ে নেই।কি ঘটবে না ঘটবে সব! আয়াশের মৃত্যু লিখতে গিয়ে আমার যে ঠিক কেমন লেগেছে……)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply