অর্ধাঙ্গিনী( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)
নুসাইবা_ইভানা
পর্ব -২৯
জিয়ান নয়নাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “ভালোবাসি তোমাকে। আমাকে কোনোদিন ছেড়ে যেয়ো না। কথা দাও, আমাদের মধ্যে যা কিছু হয়ে যাক, কখনো বিচ্ছেদ যেন না আসে।”
নয়না ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে কখন চোখ লেগে গেছে খেয়াল নেই। বুকটা ধড়ফড় করছে। বেডসাইড সুইচ টিপে রুমের লাইট অন করল। ওয়াটার পট থেকে ঠকঠক করে পানি খেল। হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। পৃথিবীতে ভালোবাসা সবচেয়ে অসহায় বস্তু। মানুষ কেবল ভালোবাসার মানুষের কাছেই দুর্বল। মানুষ যাকে ঘৃণা করতে পারে, তার প্রতি কোনোদিন ভালোবাসা ছিল না। আর যাকে শত চেষ্টার পরেও ঘৃণা করা যায় না, সেই হলো সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষ। জিয়ানের প্রতি এত রাগ, অভিমান, অভিযোগ। কিন্তু নয়নার হৃদয়ে জিয়ানের জন্য বিন্দু পরিমাণ ঘৃণা নেই। সে চাইলেও জিয়ানকে ঘৃণা করতে পারে না। জিতেও বারবার হেরে যায় ভালোবাসার কাছে।
বিছানার একপাশ খালি। ওই শূন্যস্থান এজন্মে আর পূর্ণ হবে না। এই বেডের অপূর্ণ স্থানের মতোই তার হৃদয় জুড়ে আজীবন বয়ে চলবে শূন্যতা। না-পাওয়ার যন্ত্রণার চেয়ে পেয়ে হারানোর যন্ত্রণা বেশি পীড়া দেয়। নয়না বালিশে মাথা রেখে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্যানের ঘূর্ণিতে ছায়া নাচছে দেয়ালে। আলো-ছায়ার খেলা মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। ছায়াগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হলো, মানুষও বোধহয় ছায়ার মতো—আলো থাকলে পাশে থাকে, অন্ধকারে নিঃসঙ্গ করে দেয়।
নয়না বেডসাইড টেবিল থেকে নিজের ফোনটা হাতে নিল। “মেঘ বৃষ্টির মিলন” আইডি থেকে জিয়ান রেজা চৌধুরী নামটা সার্চ করল। যদিও সার্চবারের সবার উপরে এই নামটা থাকে। তবে সেদিন মুছে দিয়েছিল সার্চ অপশন থেকে। জিয়ানের আইডি চোখের সামনে ভেসে উঠতেই আঙুল থমকে গেল নয়নার। সার্চ করলে কী হবে? কিছু তো বদলাবে না। আমরা তো আর কোনোদিন এক হতে পারব না।
“জানো, তোমার নাম সার্চ করে তোমার আইডি ঘাঁটা আমার জন্য বড্ড বেদনার। তুমি এখন আর আমার নেই—এটা মেনে নেওয়া মৃত্যুর মতো।”
তবু মানুষ কেন জানি নিজেকে কষ্ট দেওয়ার সুযোগ ছাড়তে পারে না। তাই তো বেহায়ার মতো বারবার তোমার আইডিতে আসি।
লোডিং ঘুরে জিয়ানের প্রোফাইল চোখের সামনে চলে এল। নয়না খেয়াল করল, জিয়ান ডিপি বদলেছে—আকাশের ছবি দেওয়া। ছবিটা মনোমুগ্ধকর। প্লেনের ডানার ফাঁক দিয়ে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। ইংরেজিতে ক্যাপশন দেওয়া…
“Some journeys are long. Some silences longer.”
কতক্ষণ প্রোফাইল ঘেঁটে জিয়ানের পোস্টগুলো দেখল। ডিপি চেঞ্জ করা ছাড়া নতুন কিছুই নেই। পোস্টগুলো প্রায় তার সব মুখস্থ। তবুও মনের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বারবার চলে আসে।
নয়না ফোনটা উল্টে বালিশের পাশে রেখে দিল। চোখ ভিজে উঠেছে। কান্নার সাথে যেন অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক গড়ে উঠেছে নয়নার।
🌿 জিয়ান বিমানের সিটে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। দীর্ঘ তিন বছর পর বাংলাদেশে যাচ্ছে। অথচ মনের মধ্যে কেমন অস্থিরতা, চাপা কষ্ট। যেখান থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, তার মুখোমুখি হতে হলে কীভাবে নিজেকে কন্ট্রোল করবে! আমি যে তোমার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারব না। তোমার দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলানোর যোগ্যতা আমার নেই। আমি কাপুরুষ, তোমার অযোগ্য। পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যর্থ পুরুষ। আমি যে নিরুপায় ছিলাম। অথবা নিরুপায় হওয়া কেবল বাহানা।
জিয়ানের চোখের সামনে ভেসে উঠল সেদিনের সেই অভিশপ্ত রাতের কথা।
অতীত……
“আম্মু, আমি কিছুতেই এমন কিছু করব না। আর সুনয়নাকে তো এসব বলার প্রশ্নই ওঠে না। অন্যায়ের সাথে কোনো আপোষ নেই আম্মু।”
“আমি আমার দুধের ঋণের শোধ চাই। আমি আমার মাতৃত্বের ঋণের শোধ চাই। দুই দিনের বউ তোর কাছে আপন, আর যে মা তোকে দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করল, লালন-পালন করল, সে কিছুই না?”
“আম্মু, তুমি এতটা নিচে নামছ?”
“হ্যাঁ, নামছি। আমার সন্তানের জন্য আমি এর চেয়েও নিচে নামতে পারি। আমি বেঁচে থাকতে আমার ছেলের লাশ দেখতে পারব না। তুই বউ গেলে বউ পাবি, কিন্তু আমার সন্তান চলে গেলে আমি সন্তান পাব কোথায়? আমার জাহিন, আমার কলিজার টুকরো ফাঁসির দড়িতে ঝুলে আর্তনাদ করে মারা যাবে আর আমি মা হয়ে সে-সব চুপচাপ সহ্য করব!”
মিতা বেগম নিজের শাড়ির আঁচল পেতে দিয়ে জিয়ানের পায়ের সামনে বসে বলে, “আমাকে আমার ছেলের জীবন ভিক্ষা দে। আমার আঁচলের তলা থেকে আমার সন্তানকে কেড়ে নিস না বাবা। তোর বউকে ফেরত দে। আমার বুক খালি করিস না। শুধু আমার কোল না, তুই একজন অনাগত সন্তানের থেকে তার পিতাকেও কেড়ে নিচ্ছিস। আমি জানি জাহিন অন্যায় করেছে। ওর জীবনটা ভিক্ষা দে, আমি কথা দিচ্ছি আর কোনোদিন জাহিন কারো কোনো ক্ষতি করবে না। জাহিনকে আমি বাইরের দেশে পাঠিয়ে দেব।”
মেহনুরের পেটের ওপর হাত রেখে বলে, “এই অনাগত সন্তানের কী দোষ বল? কেন পৃথিবীতে আসার আগেই তাকে পিতৃহারা করবি?”
জিয়ান চুপচাপ নিজের মায়ের রুম থেকে বের হয়ে গেল।
নয়না শুয়ে ছিল। জিয়ান নয়নার পায়ের কাছে মাথা নিচু করে বসে আছে।
নয়না জিয়ানের গালে চুমু দিয়ে বলে, “কী গো, তোমার মনে হঠাৎ আমাবস্যা নেমে এলো কেন!”
জিয়ান কোনো কথার উত্তর না দিয়ে নয়নার ঠোঁটে আকড়ে ধরল। নয়নাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দু’জনেই হারিয়ে গেল ভালোবাসার উত্তাল উন্মাদনায়।
মধ্যরাতে জিয়ান উঠে বসে আছে। নয়না গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আজ ইচ্ছে করেই জিয়ান নয়নার গলার কাছটায় লাভবাইট দিয়েছে। নয়নার কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। জিয়ানের চোখের কোণে ততক্ষণে নোনাজল চিকচিক করছে।
জিয়ান উঠে বারান্দায় চলে এল। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমার মায়ের জন্য আমি আমার জীবনের সবটুকু সুখ বিসর্জন দিলাম। এরপর হয়তো আমি বেঁচে থাকব, কিন্তু আমার জীবনে কোনো সুখ থাকবে না। আমি জানি, সুনয়না, তুমি কিছুতেই পিছপা হবে না। তোমাকে আমি এইটুকু চিনি। তবুও পারলে আমার জন্য থেমে যেয়ো। নইলে আমি সারাজীবনের জন্য তোমাকে হারিয়ে ফেলব। তোমাকে হারিয়ে ফেলা মানে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা।”
হঠাৎ বিমানের ঝাঁকুনিতে জিয়ানের চোখ খুলে গেল। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বিমান ল্যান্ড করেছে বাংলাদেশে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
মনে মনে বলল, “তুমি কি কোনোদিন জানবে, নয়না, তোমাকে ছেড়ে যাওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শাস্তি। তুমি কি এখনো আগের মতো আছ? নাকি এখন অন্য কারো গল্পে ব্যস্ত? ভুলে গেছ তোমার প্লেন ড্রাইভারকে? নাকি অভিমানে আর ঘৃণায় বাঁচিয়ে রেখেছ?”
এই প্রশ্নটাই জিয়ানকে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দেয়।
🌿 সকাল-সকাল ঘুম থেকে উঠেছে নয়না। বিষাদময় রাত কাটানোর পরেও মনটা কেমন হালকা লাগছে আজ! নয়না ফজরের নামাজ পড়ে নিজের কিচেনে গেল। নিজের জন্য মনমতো এক কাপ ক্যারামেল মসলা চা বানাল। চা খেয়ে ফটাফট রেডি হয়ে জাহানারা বেগমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
পেছন থেকে জাহানারা বেগম বলল, “কী হয়েছে তোর? এত সকাল-সকাল সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছিস?”
“ভাইয়ার সাথে লং ড্রাইভে যাচ্ছি। শাড়িটাতে আমাকে কেমন লাগছে, আম্মু?”
“পরী লাগছে। ডানা থাকলে উড়ে যেতে পারতি। এত সাজগোছ করার কোনো দরকার ছিল না।”
“আম্মু, সাজলাম কই! শুধু শাড়িটা পরেছি, এই তো।”
জাহানারা বেগম দোয়া পড়ে নয়নার মাথায় ফুঁ দিয়ে বলে, “কারো নজর না লাগুক।”
নয়না হাত পেতে বলে, “টাকা দাও।”
জাহানারা বেগম নয়নার হাতে দুই হাজার টাকা গুঁজে দিয়ে বলে, “নাফীর সাথে বের হচ্ছিস, টাকা লাগবে কেন?”
“এটা ভাইয়ার ভাগের টাকা। আসি।” বলেই নয়না সিঁড়ির দিকে হাঁটা শুরু করল।
জাহানারা বেগম ডেকে বলল, “আসার সময় আমার ছেলেটাকে সাথে করে নিয়ে আসবি। তোরা কিন্তু একা আসবি না। আমার নাতনি আর বৌমাকেও সাথে করে নিয়ে আসবি। নইলে দুটোর একটাকেও ঘরে ঢুকতে দেব না।”
মাহবুব তালুকদার তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। জাহানারা বেগম দরজা বন্ধ করে কিচেনে চলে গেল নাস্তা বানানোর জন্য। কবে যে বাপ-ছেলের মান-অভিমান ভাঙবে আর কবে যে ছেলেটা ঘরে ফিরবে—সারাক্ষণ যেন সেই দিনের অপেক্ষায় থাকে জাহানারা বেগম।
নয়না নিচে এসে দেখে অনিকেত গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নয়না অনিকেতের পাশে বসে বলে, “আমরা এয়ারপোর্টে যাচ্ছি কেন?”
“একজন স্পেশাল মানুষ আসবে, তাকে রিসিভ করতে।”
নয়না গাড়ির পেছনের সিটে তাকিয়ে বলে, “ভাবী জানে! না মানে, এত বড় ফুলের তোড়া নিয়ে তুমি কোন মেয়েকে ওয়েলকাম করতে যাচ্ছ?”
“মুখ বন্ধ কর। গেলেই দেখতে পাবি।”
চলবে
বিঃদ্র প্রিয়তমা বইটি অর্ডার করুন আপনার পছন্দের যেকোনো বুকশপে। ডাক্তার ফুয়াদ মির্জা ও তাহার প্রিয়তমা কে নিয়ে অসাধারণ কিছু আসছে বইয়ের পাতায়।
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৬
-
অর্ধাঙ্গিনী গল্পের সকল পর্বের লিংক সিজন ২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৯
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৪
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২০+২১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৪