অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৩৬)
সোফিয়া_সাফা
হেলিকপ্টারের উইন্ডো দিয়ে বাইরের অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রকৃতি দেখছিল ফুল। তার চোখজুড়ে বিস্ময়ের ছড়াছড়ি। কাচের তৈরি ঠান্ডা গ্লাসে হাত রেখে কৌতূহলী রমণী বাইরের সেই দৃশ্য উপভোগ করছে। তার সামনের সিটে অনিলা বসে আছে। অনিলার পাশে অনি, তারপর লুহানের উপস্থিতি। ফুলের পাশের সিটে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে উদ্যান। তার কোলের ওপর ল্যাপটপ, কানে এয়ারপিস গোঁজা। পেছনের সিটে নাদিয়া, রুমাসহ বেশ কয়েকজন মেইড রয়েছে। মেলো আর সোহম সেখানেই থেকে গেছে। এস্টেটে ফিরেছিল উদ্যান আর অনি।
“তোমাকে খুব খুশি দেখাচ্ছে ফুল। আমার মনে হচ্ছে তুমি হেলিকপ্টার রাইড এনজয় করছো।” অনিলার কথায় ফুল মুখ ফেরায় তার দিকে। ফুলের মুখাবয়বে তখনও হাসি লেগে আছে। “হ্যাঁ আপু, আসলে লাইফে ফার্স্ট টাইম হেলিকপ্টারে উঠলাম তো, তাই ভীষণ রোমাঞ্চকর লাগছে। মনে হচ্ছে কোনো মিশনে যাচ্ছি।”
তার কথার প্রেক্ষিতে অনি, লুহান কাজ বাদ দিয়ে একনজর দেখে নিল তাকে। উদ্যান অবশ্য শুনতে পায়নি তার কথা। অনিলা গালে হাত ঠেকিয়ে ভাবুক গলায় বলল, “তুমি শিওর যে এটাই তোমার জীবনের ফার্স্ট হেলিকপ্টার রাইড?”
ফুলের কপালে ঈষৎ চিন্তার ভাঁজ পড়ল। ঠোঁটের বাঁক হালকা প্রসারিত করে বলল, “হ্যাঁ, আমি সত্যিই আর কখনো হেলিকপ্টারে উঠিনি।”
অনিলা মৃদু হাসল। মনে পড়ে গেল, সেদিন কীভাবে উদ্যান ফুলকে তাড়াহুড়ো করে হেলিকপ্টারে উঠিয়েছিল। পাশ থেকে অনির কণ্ঠ ভেসে এল। “তুমি এর আগেও হেলিকপ্টারে উঠেছো। যেদিন তুমি নিজের পেটে কাচ ঢুকিয়ে দিয়েছিলে, সেদিন তেহ তোমাকে হেলিকপ্টারে করেই হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিল।”
ফুল থম মেরে গেল। ধীরে ধীরে ঘাড় বাঁকিয়ে উদ্যানের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। লোকটা হয়তো খুব ব্যস্ত, এই পর্যন্ত একটা কথাও বলেনি। মুখ না চললেও হাতের আঙুলগুলো অবিরত চলছে কি-বোর্ডের ওপর। ফুল ড্যাবড্যাব করে সেদিকে চেয়ে আছে। মনের দরজায় একটা প্রশ্নই কড়া নাড়ছে—কী করছে লোকটা এত মনোযোগ দিয়ে? ফুল স্ক্রিনে চোখ বুলানোর উদ্দেশ্যে মুখ বাড়িয়ে দিল। আর একটু কসরত করলেই হয়তো সে দেখতে সক্ষম হয়ে যেতো, কিন্তু তার আগেই উদ্যান ল্যাপটপ ঘুরিয়ে নিল। ফুলের ঠোঁটের ফাঁক গলে অস্পষ্ট বিরক্তির শব্দ বেরিয়ে এল। যেন উদ্যান মাত্রই তার পছন্দের খাবার সরিয়ে নিয়েছে। সে চোখ তুলে তাকাতেই উদ্যানের গাঢ় বাদামী চোখের সান্নিধ্য লাভ করল। উদ্যান ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ফুল মেকি হেসে বলল, “আপনি ভুল ভাবছেন উন্মাদ, আমি মোটেও আপনার ল্যাপটপের স্ক্রিন দেখতে যাচ্ছিলাম না।”
ফিক করে হেসে ফেলল অনিলা। অনি নিজের কাজে মন দিলেও লুহান হালকা কেশে উঠল। ফুল বুঝতে পারল সে অতিরিক্ত নাটকীয়তা করে ফেলেছে। ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পেরে সে চোখ খিঁচিয়ে জিভের অগ্রভাগ কামড়ে ধরল। উদ্যান তার প্রতিক্রিয়া দেখে এক কানের এয়ারপিস খুলে প্রশ্ন ছুড়ল, “হোয়াট ডিড ইউ সে?”
ফুল তড়াক করে চোখ মেলে বড়সড় ঢোক গিলল। বুঝতে পারল এই প্রথম দানবটা তার কথা শোনেনি। সে আবারও মিছেমিছি হেসে বলল, “বললাম আপনি যে হেলিকপ্টারে করে আমাকে হসপিটালে নিয়েছিলেন, এই কথা কখনো বলেননি কেন?”
উদ্যানের দৃষ্টি তীক্ষ্ণতা আর দৃঢ়তার মিশেলে প্রখর হয়ে উঠল। কেমন যেন সন্দিহান কণ্ঠে বলল, “তোমার ঠোঁটের নড়াচড়া দেখে মোটেও মনে হয়নি তুমি এসব বলেছো।”
ফুল হকচকিয়ে গেল, অনিলার হাসিও বাধাগ্রস্ত হলো। উদ্যান কীভাবে ঠোঁটের নড়াচড়া দেখেই ফুলের এই সামান্য মিথ্যা ধরে ফেলল, ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। ফুল ধরা পড়ে গাইগুই করার বদলে উল্টো উদ্যানের ওপর চড়াও হয়ে গেল। “আপনার নজর এত খারাপ! আপনি আমার ঠোঁটের নড়াচড়া লক্ষ্য করছিলেন?”
উদ্যান তখনও নিগূঢ় চোখে চেয়ে আছে ফুলের দিকে। এদিকে উদ্যানকে বিব্রত করতে গিয়ে ফুল নিজেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে ভুলেই গিয়েছিল আশেপাশে উদ্যান ব্যতীত ডজনখানেক মানুষ উপস্থিত আছে। সে দৃষ্টি নামিয়ে উইন্ডোর দিকে ঘুরে বসল। সবার অস্বস্তিকর চাহনির বৈপরীত্যে ফের মনোযোগ স্থাপন করল বাইরের মনভোলানো দৃশ্যপটে। উদ্যান কতক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে ছিল তার ইয়ত্তা রইল না।
“ল্যান্ড করার সময় এসে গেছে।” পাইলটের নির্দেশ মতো সবাই সোজা হয়ে বসল যার যার স্থানে।
উদ্যান নিজ হাতে ফুলের সিটবেল্ট ভালোভাবে লাগিয়ে দিয়ে বলল, “শক্ত হয়ে বোসো। হালকা ঝাঁকুনি লাগতে পারে, ভয় পেয়ো না।”
ফুল বুঝদারের মতো মাথা দোলায়। রিনরিনিয়ে আওড়ায়, “এই ঘন জঙ্গলের মাঝে কীভাবে ল্যান্ড করবে? কোনো ফাঁকা জায়গাও তো চোখে পড়ছে না, আমার জানামতে হেলিকপ্টার জঙ্গলে ল্যান্ড করানো যায় না।”
উদ্যান প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল, “একটু পরেই দেখতে পারবে।”
হেলিকপ্টার গর্জন তুলে ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করল। জানালার বাইরে ঘন অন্ধকারের বুক চিরে হঠাৎ কয়েকটা ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠল। ফুল অবাক হয়ে চোখ বড় করল। এতক্ষণ যে অরণ্যকে অজেয় মনে হচ্ছিল, তার মাঝখানেই যেন মানুষের হাতের তৈরি একটা নিদর্শন ফুটে উঠেছে।
ফুল হা হয়ে তাকিয়ে থেকে অবচেতন মনে উচ্চারণ করল, “ওটা কী?”
উদ্যান উত্তর দিল না। হেলিকপ্টারটা আরও নিচে নামতেই আলোগুলো স্পষ্ট হলো; পাথর আর কংক্রিটে তৈরি গোলাকার প্ল্যাটফর্ম, পাহাড় কেটে সমতল করা। চারপাশে লো-লাইট গাইড, যেন অন্ধকারের মাঝেও নিজের অবস্থান নিশ্চিত করছে।
ফুল এতটাই বিভোর ছিল যে কখন বাকি সবাই নেমে গেছে টেরই পায়নি। উদ্যান নিচে নেমে শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিল। ফুলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “পেটাল, নিচে নেমে এসো।”
ফুল ঝাঁকুনি খেয়ে উঠে দাঁড়াল। উদ্যানের এগিয়ে দেওয়া হাত সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে নেমে আসতে চাইল। কিন্তু উদ্যান উপেক্ষিত হতে অভ্যস্ত ছিল না। সে একপ্রকার থাবা বসিয়ে ফুলের বাহু চেপে ধরল। ঘটনার আকস্মিকতায় ফুল ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে নিলে উদ্যান আরেক হাতে তাকে স্থির থাকতে সাহায্য করল।
ফুল নিজেকে সামলে নিয়ে দুটো কড়া কথা বলার জন্য মুখ খুলতেই উদ্যান তাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল। ফুলের এলোমেলো দৃষ্টি সামনে যেতেই সে থমকে গেল। পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল হাভেলি। কালচে পাথরের দেয়াল, প্রাচীন স্থাপত্যের ছাপ। তবু যেন ভয়ংকরভাবে আধুনিক। হাভেলির সঙ্গে সংযুক্ত টেরেসটাই হেলিপ্যাড; বাড়িরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাভেলির মূল ফটকের সমুখে এসে ফুল আর হাঁটতে পারল না। হাঁটু যেন অবশ হয়ে আসছে ক্রমশ।
ফটকের পাশে থাকা এক বড়সড় কালচে পাথরের গায়ে শ্বেত অক্ষরে লেখা ‘Estate of PETAL’। উদ্যান তখনও তার বাহু ধরে টানছে। অবশ্য সে জোরপ্রয়োগ করছে না, কেবল বোঝাতে চাইছে বাড়ির ভেতরে যেতে হবে। ফুল আনমনা হয়ে বাহুর ওপর রাখা উদ্যানের হাত স্পর্শ করল। আঙুল উঁচিয়ে অত্যন্ত নিচু গলায় বলল, “ওখানে পেটাল লেখা কেন? পেটাল বলে তো আপনি আমাকে ডাকেন।”
ফুলের নরম হাতের স্পর্শে উদ্যান মুহূর্তের জন্য থম মেরে গেল। ঘাড় খানিক বাঁকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “এই বাড়িটা আমি তোমার নামে কিনেছি। তাই ওখানে ‘পেটাল’ নেমপ্লেট বসানো হয়েছে। ওয়েলকাম টু পেটাল এস্টেট মাই ডিয়ার ওয়াইফি।”
ফুলের শরীরে অজানা শিহরণ বয়ে গেল। আবারও সেই হৃৎস্পন্দনের শব্দতরঙ্গ কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। মুগ্ধ নয়নজোড়া ঘুরে বেড়াতে লাগল হাভেলির এদিক-সেদিক।
“ভেতরে যাবে না পেটাল? রাত কিন্তু অনেক হয়েছে।” উদ্যানের হস্তক্ষেপে ফুলের মাঝে ভাবাবেগ ঘটল। কথা বলতে চেয়ে বুঝতে পারল গলা আর ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
সে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কোনোমতে আওড়াল, “আপনি বলেছিলেন আমরা ঘুরতে যাচ্ছি, কিন্তু জায়গাটা দেখে মোটেও কোনো রিসোর্ট কিংবা পর্যটন কেন্দ্র বলে মনে হচ্ছে না। কোথায় এসেছি আমরা?”
উদ্যান চোখ সরিয়ে ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বলল, “তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা হয়েছিল। প্রথমে ভাবলাম সেন্টমার্টিন যাব। কিন্তু তুমি অনেকগুলো মাস কক্সবাজারে কাটিয়েছো। তাই আর সমুদ্রপাড়ে যাইনি। নিয়ে এলাম পাহাড় দেখাতে; আমরা বর্তমানে আছি বান্দরবানে।”
ফুলের মুখাবয়ব উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যেন আকাশের বুকে থাকা নিঃসঙ্গ চাঁদটি রমণীর চোখেমুখে ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়ে যোগ করছে অন্যমাত্রার স্নিগ্ধতা। যেই স্নিগ্ধতা উদ্যানকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করছে। ফুলের পরণে ব্লাশ পিঙ্ক রঙের লং ম্যাক্সি ফ্রক। শ্রান্ত বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে দুলছে স্যাটিন ফ্যাব্রিকের ফ্রকটা। বারবার মাথার ওড়না সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে মেয়েটা। সবকিছুই উদ্যান নিখুঁতভাবে মস্তিষ্কে গেঁথে রাখছে। ফুল উচ্ছ্বসিত হয়ে উদ্যানের দিকে দৃষ্টি ফেরাতেই দেখল উদ্যানের চোখ তার ওপরেই আটকে আছে। দানবটার চোখের গভীরে জমে থাকা অচেনা তৃষ্ণা আর সংযত আকাঙ্ক্ষাগুলো ফুলের নাজুক হৃদয়কে প্রবলভাবে কাঁপিয়ে তুলল। এই প্রথম সে উদ্যানের চোখের ভাষা পড়তে পেরেছে। যেই ভাষাতে কামুকতা ছাড়া আর কিচ্ছু খুঁজে পায়নি সে… কিচ্ছু না। ফুল চোখ নামিয়ে শুকনো ঢোক গিলল। ফুলের এই কিঞ্চিৎ প্রতিক্রিয়াও উদ্যানের নজরবন্দী হলো।
ফুলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে উদ্যান বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া কোনো সাধারণ সিদ্ধান্ত নয়, এটা নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার মতো। সে জানে, একবার চোখ সরাতে পারলেই সংযমটা টিকে যাবে, বরং না পারলেই তার ভেতরের ধ্বংসাত্মক কামনাগুলো একটু একটু করে সাহস পেয়ে যাবে। তবুও সে তাকিয়েই থাকে, কারণ এই দুর্বলতাটুকু স্বীকার করাই এখন তার কাছে সবচেয়ে ভয়ংকর আর প্রয়োজনীয় সত্য।
“আপনি আমার দিকে এভাবে তাকান কেন? মাত্রই চার্লসের সঙ্গে আপনাকে গুলিয়ে ফেলেছিলাম আমি। দয়া করে এভাবে তাকিয়ে আমাকে ভয় দেখাবেন না।” ফুল জানে না এটুকু কথা বলতে গিয়ে তার শরীর কয়বার কম্পিত হয়েছে। সে শুধু জানে উদ্যানের দৃষ্টিতে ভালোবাসা নামক কোনো অনুভূতির অস্তিত্বও নেই।
উদ্যান কয়েক পা ফেলে ফুলের ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলল, “আমার চোখে তুমি যা দেখেছো তা নিতান্তই তোমার বিভ্রম ছিল। ভুলে যাও সব।”
ফুল অস্ফুট স্বরে আওড়াল, “আমি ভুল দেখিনি, কিন্তু আপনি ভুল পথে চলে যাচ্ছেন। সেই পথে গিয়ে আপনি কখনো আমার মনের নাগাল পাবেন না।”
উদ্যানের ঠোঁটের কোণে দুর্বোধ্য হাসির রেখা ফুটে উঠল। হাস্কিটোনে বলল, “তাহলে তুমিই হয়তো চাও না আমি তোমার মনের নাগাল পেয়ে যাই।”
এই কথার অর্থ ফুলের ঠিক বোধগম্য হলো না। উদ্যান দু পা পিছিয়ে গিয়ে তার চোখে চোখ রেখে বলল, “আমি নিজ ইচ্ছায় সেই পথে চলে যাইনি পেটাল। সেই পথে মূলত তুমিই আমাকে আহ্বান জানিয়েছো। সেদিন বাইকে ওঠার পর তুমি এমন কিছু করেছিলে যা তোমার করা উচিত হয়নি।”
ফুলের মানসপটে ভেসে উঠল সেদিন রাতের মোহাচ্ছন্ন ঘটনার টুকরো টুকরো অংশ। বাইকে বসার পর উদ্যানের শরীরের সেই ঘ্রাণ, উষ্ণতা, হৃৎস্পন্দনের ধকধক শব্দ। না না… ফুল আর মনে করতে চায় না সেসব। সে মাথা ঝাঁকিয়ে ভাবনাগুলো দূরে ঠেলে দিল। উদ্যান হঠাৎ আফসোসের সুরে বলল, “তুমি ভাবনাগুলো তাড়িয়ে দিতে পারলেও আমি একদমই পারি না পেটাল। শুধুমাত্র আমি মনস্টার বলে এখন পর্যন্ত নিজেকে সংযত রাখতে পেরেছি। সাধারণ মানুষের পক্ষে এত জোরালো আকাঙ্ক্ষাগুলো দমিয়ে রাখা নেহাতই অসম্ভব ছিল। সর্বোপরি আমি তোমাকে আ’ত্ম’হ’ত্যার দোরগোড়ায় দাঁড় করাতে চাই না।”
ফুলের শরীর থরথর করে কাঁপছে। হৃদয় সংকুচিত হয়ে আসছে। আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। অনুভূতিগুলো নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাওয়ার আগেই নিজেকে আড়াল করে নেওয়া অত্যাবশ্যক। একবার উদ্যানের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দিলে সে নিঃস্ব হয়ে নিঃশেষিত হয়ে যাবে। নিজের বলতে তখন আর কোনো কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। ফুল উদ্যানের দিকে তাকানোর দুঃসাহস করল না। এলোমেলো হয়ে যাওয়া অনুভূতিগুলো বুকের ভেতর চাপা দিয়ে একছুটে হাভেলির ভেতর চলে গেল।
ফুলের পায়ের শব্দটুকু মিলিয়ে যাওয়ার পরও উদ্যান নড়ল না। যেন এখনো সে ফুলের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ঘাড় চেপে ধরে সে গভীর নিঃশ্বাস টেনে নিল। অতঃপর পকেট হাতড়ে নৈঃশব্দ্যে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করল। প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ সে নিজের প্রতি, আজ সম্পূর্ণ ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের বাসনাগুলোর কথা স্বীকার করে নিয়েছে সে। এতটা অবাধ্য কেন হয়ে যাচ্ছে সে? সিগারেটের শলাকায় আগুন ধরিয়ে এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল উদ্যান। আজ প্রথমবার সে সিগারেটের তিক্ত স্বাদ অনুভব করতে পারল। অদ্ভুত ব্যাপার, এর আগে কখনো তার মনে হয়নি এই সিগারেট তেতো স্বাদের। তার ফেবারিট ব্র্যান্ডের সিগারেট হঠাৎ তেতো কেন লাগছে?
উদ্যান চোখ বন্ধ করে ধোঁয়া নিঃশ্বাসের সঙ্গে টেনে নিল। পোড়া তামাকের তিক্ততা গলা বেয়ে নামতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। বুঝতে পারল ফুলকে ঘিরে তৈরি হওয়া তার আকাঙ্ক্ষাগুলো ফুলের জন্য যতটা না ধ্বংসাত্মক, তার চেয়েও অধিক ধ্বংসাত্মক তার নিজের জন্য।
চলবে,,,
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২২
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৪