Golpo কষ্টের গল্প পদ্মপ্রিয়া

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৫


পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৫

পর্ব_৫

ঈশিতারহমানসানজিদা

লাইসেন্স হাতে পাওয়ার প্রথম দিনেই পুলিশের হাতে পড়ে গেছে নূর। বিষয়টা খুবই আশ্চর্যের, সে তো সবাধানেই ড্রাইভ করছিল। কোন রুলস ব্রেক করেনি। অথচ পুলিশ দুজন সন্দেহের চোখে ওদের কেই দেখছে। গাড়ি থেকে সবাইকে বের করে দিয়ে চেক করেছে কিছুক্ষণ, কিছুই পাওয়া যায়নি। এখন তারা মন দিয়ে নূরের কাগজপত্র দেখছে, স্মার্ট লাইসেন্স কার্ড নেই, অনলাইন ফটোকপি দেখে কাগজ চেক করতে সময় নিচ্ছে। নূর আর ফারিন দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের সামনে। আজমাঈন ইশারায় অনুভব কে কাছে ডাকে। বলে,’নাম কি?’

‘অনুভব।’

‘আচ্ছা, লাইসেন্স এর অনলাইন ফটোকপি নিয়ে গাড়ি চালাতে এসেছে কেন তোমার বোন? তাও আমার সাথে গাড়ি চালিয়ে পাল্লা দিচ্ছে। একে তো পুঁচকে মেয়ে,,,,।’

কথা শেষ করতে পারে না আজমাঈন, তার আগেই অনুভব জেঁকে ধরে,’এক্সকিউজ মি!! সে আমার বোন নয়, ফুপি হয়। আর সে এভাবে গাড়ি চালিয়েছে আমার কথায়। তার কোন দোষ নেই।’

ফয়েজ, আজমাঈন তব্দা খেয়ে গেল। নূর আর অনুভব কে দেখে নিলো আরেকবার। নাহ, এদের এই সম্পর্ক মানাচ্ছে না। অনুভব ওদের মনের কথা চট করেই বুঝতে পারলো,’বিশ্বাস হচ্ছে না তো? কেউই করে না। কিন্তু দাদু বলে গড গিফট।’

অনুভবের মুখের ভঙ্গি অন্যরকম দেখা গেল। খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে নিজেদের সম্পর্কে বলছিল সে। এবার সে প্রস্তুত হলো বাকি কথাগুলো বলতে। তার আগেই নূর ইশারায় ডাকতেই চলে গেল। ফয়েজ বললো, ‘বেশ ইন্টারেস্টিং গল্প তাই না? ভালোই লাগছিলো। এজন্য ছোট মেয়েকে একটু বেশিই আদর করেন দাদু। দেখছিস না এই বয়সেই কত কিছু শিখিয়ে ফেলেছে। আমার বাপের মুখেও বেশ কয়েকবার ওর কথা শুনেছি।’

‘দেখি, এখন আমার বাড়ির কাজ কেমন করে?’

‘খারাপ হবে না বোধহয়।’

পুলিশ কোথাও কোন অবৈধ প্রমাণ না পেয়ে ওদের ছেড়ে দিলো। নূর নেকাবের আড়ালে অনুভবের দিকে কড়া চোখে তাকায়। এই ছেলের কথায় তাল হারিয়ে ফেলেছিল। এখন আর এই ভুল করা যাবে না। নাহলে যেতে দেরি হয়ে যাবে।
পার্কিং এরিয়াতে পরপর দু’টো গাড়ি ঢুকলো, আজমল শিকদার গাছে পানি দিচ্ছেন। আজমাঈনের গাড়ি দেখে পাইপ ফেলে মোটর বন্ধ করে এগিয়ে এলেন। ফারিনের ঘুম ভেঙ্গেছে কিছুক্ষণ হলো। নেমেই আগে ওদের বাড়ির ভেতরে গেল। ছেলের পিছন পিছন সেও বাড়িতে ঢুকলো। আজমাঈন আগে বাড়ির প্রতিটি কোণা ঘুরে দেখায় এবং নিজের পছন্দের কিছু ফার্নিচার রাখার বর্ণনা দেয়। ফারিন সবকিছু নোট করছে, নূর নিজেও দেখে নিয়ে কিছু ছবি তুলে নিলো। তবে সে প্রথমে যে ছবিগুলো দেখেছিল তার থেকে বাড়িটার ভেতরে আরো কিছু ভিন্নতা পেয়েছে। ফারিন আইপ্যাডে কিছু রং এর বর্ণনা করছিল। কোনটা ভালো হবে, আজমল শিকদার কাছে এগিয়ে এসে বলেন,’কেমন কি খরচ হবে?’
নূর চমকে তাকায়, কখন যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতেই পারেনি। মাথা নেড়ে বলে,’সেটা তো আপনাদের দেওয়া বাজেট বলে দেবে আঙ্কেল। আমি তো এখনও বাজেট শুনিনি।’

আজমল শিকদার মাথা নাড়েন। যখন যাকে সামনে পান তাকে নিজের অসহায়ত্বের গল্প শোনান। মানুষ না পেলে আকাশ, পাখি, গাছপালা কেউই বাদ যায় না। আজও ছাড়লো না। শুরু করে দিলো নিজের কৃতিত্ব অর্জন আর ছেলের বিপথগামীর কথাবার্তা, ‘খুবই খারাপ অবস্থায় আছি বুঝলে মা, এই যে ছেলেকে দেখছো, একটা কথা যদি শোনে। আমার সব টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে, এখন আমি নিশ্ব। এই বাড়িটাই শেষ সম্বল।’

‘আপনার গার্মেন্টসে কতজন কর্মী আছে আঙ্কেল?’

‘এতো গুনে দেখিনি, দুই ফ্লোর মিলিয়ে কত আর হবে?’ মনে মনে গুনতে শুরু করে দিয়েছেন তিনি। একটু থেমে তাকিয়ে দেখে ফয়েজ দাঁড়িয়ে আছে। এ ছেলে ওনার গুণধর পুত্রের চেয়ে কোন অংশে কম না। তিনি চুপচাপ অন্য পাশে সরে এসে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে বলেন,’এই দেওয়ালে লাইট গ্রিন কলারের রং দিলে ভালো হবে বুঝেছিস, তোর আন্টি এই রং টা পছন্দ করে।’
আজমাঈন আসার আগেই নিজের ভোল পালটে ফেলেছেন। মাঝে মাঝে একটু আধটু ভয় ও পায়। প্রায় ঘন্টাখানেক সবকিছু চেক করার পর সবকিছু নোট করে নিলো নূর। তারপর প্রথম আজমাঈনের সাথে কথা বললো,’আপনার বাজেট এর বিষয়ে আব্বুর সাথে কথা বলে নেবেন, আগামী সপ্তাহে লোকজন সব পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’

‘বাজেট লিমিটলেস, আপনি শুধু কাজ করিয়ে দিন।’

ফারিন ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিলো। বললো,’আজ তাহলে আসি, এবার আমারা একাই চলে যেতে পারব।’

আজমাঈন বাঁধ সাধলো,’মা আপনাদের বাসায় ডেকেছেন।’
কথাটা শুনে তৎক্ষণাৎ অনুভব কে খুঁজল নূর। কিছুক্ষণ আগে ছেলেটা আশেপাশে ছিলো। এখন নেই, নিশ্চয়ই বাসার ভেতরে চলে গেছে। আসার সময় বারবার করে বলা সত্ত্বেও কথা শুনলো না। বাড়িতে তেমন খাওয়া দাওয়া করে না, কোথাও খেলে খাওয়া রুচি বেড়ে যায়। অগত্যা ওদের যেতে হলো। অনুভব বেশ আয়েশ করে বসে খাচ্ছে, তাহমিনার রান্নার প্রশংসা করছে। এতে খুশিতে গদগদ হয়ে বেশি বেশি মাংস তুলে দিচ্ছেন তিনি। আজমল শিকদার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন। ওনার অগোচরে এতসব আয়োজন করার হয়েছে। অথচ কেউ একটি বার জানানোর প্রয়োজন বোধ করলো না। দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে আছেন উনি। তাহমিনা আরেক পিস রোস্ট দিতে গেলেই হইহই করে বলে ওঠেন,’আরে আরে করো কি? বাচ্চা মানুষ এতো খেতে পারে নাকি?’
আজমাঈন কড়া চোখে তাকায়, হাত চেপে ধরে নিচু গলায় বলে,’আরেকটা কথা বলবে তো তোমার বাড়িতে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেব।’
তিনি থতমত খেয়ে বলেন,’না না, আমি ওমন কিছু ভেবে বলিনি। বাচ্চা ছেলে, আগের প্লেটের গুলো খেয়ে শেষ করুক তারপর ধীরে সুস্থে দিবে।’

আইশা এগিয়ে এসে চেয়ার টেনে বসতে বললো নূর আর ফারিনকে। নূর বেশ অপ্রস্তুত, অপরিচিতদের সাথে তেমন কথা বলতে পারেনা। ওর জগৎ একটাই, তা হলো রাশেদ সাহেব। সেই ছোটবেলা থেকেই তার সাথে ঘোরাঘুরি করছে। বাংলাদেশের সকল টুরিস্ট স্পট ঘোরা শেষ ওর। এমন কোন জায়গা নেই যেখানে যায়নি। ছোটবেলা থেকে স্নেহ ভালবাসা না পাওয়া মেয়েকে একটু খানি খুশি রাখতে কি-না করেছেন রাশেদ সাহেব। তবুও মেয়ে তার বেশিরভাগ সময় মনমরা হয়ে থাকে। পরিবারের সান্নিধ্য না পেয়ে নূর কাজের বাইরে কথা বলতে পারে না। সৌজন্যমূলক কথাবার্তা বলতে গেলেও মুখে বাঁধে। এজন্য সবসময় ফারিন কে ওর সাথে পাঠানো হয়। মেয়ে তার মাথা ঝাঁকানো ছাড়া তো কোনে বাক্য তেমন বলতে পারে না।
ফারিন মাথা নেড়ে বসতে বলে নূরকে। আজমাঈন কে উদ্দেশ্য করে বলে,’যদি কিছু মনে না করেন তাহলে কিছু সময়ের জন্য বাহিরে যাবেন?’

বিষয়টা বুঝতে পেরে আজমাঈন তার বাবাকে টেনে বাইরে নিয়ে এলো যাতে ওদের কোন সমস্যা না হয়। তবে তারপরও নূর শরবত আর ফল ব্যতীত কিছুই খেল না। নিকাব একটু উঁচু করে খেয়ে রেখে দিয়েছে সব‌। জার্নি করার সময় ওর রুচি থাকে না খাওয়ার। একেবারে বাসায় গিয়েই খেয়ে নেবে।
ফিরতি পথে ওদের সাথে আজমাঈন ও ফয়েজ যাবে না। এখন একাই যেতে পারবে ওরা। নূরের বেশ তাড়া, এখানে আর থাকতে ইচ্ছে করছে না। ফারিন ব্যাগপত্র গাড়িতে রাখছে, অনুভব গাড়িতে বসে আইসক্রিম খাচ্ছে যেটা আসার পথে তাহমিনা ধরিয়ে দিয়েছেন। মোট কথা বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছে দুজনের মধ্যে, অনুভব পাকনামো করে তাদের সবাইকে নিজের বাড়িতে দাওয়াত করে এসেছে। নূর একপাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে, রাশেদ সাহেব বারবার ফোন করে মেয়ের অবস্থান জেনে নিচ্ছে। ফোন কেটে পেছন ফিরতেই দেখলো আজমাঈন দাঁড়িয়ে। চমকে উঠলো সে। আজমাঈন বিনীতভাবে বললো,’সরি সরি, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য। একটা জিনিস দেওয়ার ছিলো আপনাকে।’

কথা শেষ করে আংটিটা বের করতেই বেশ চমকায় নূর। এটা তো ওর সেই হারিয়ে যাওয়া আংটি। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রোদে চিকচিক করা আংন্টির দিকে। অবিশ্বাস্য তার চাহনি, অবশ্য চোখজোড়া ও নেকাবের আড়ালে তবুও আজমাঈন বোধহয় বুঝতে পারলো। সে মৃদু হেসে বললো,’ওইদিন এটাই খুঁজে পাচ্ছিলেন না বোধহয়।’
কথা বের হচ্ছে না নূরের মুখ থেকে। আংটি টা ধরতেও পারছে না, এতটাই বিস্মিত হয়েছে সে। আজমাঈন বাড়ানো হাত গুটিয়ে নিলো, পাশেই বড় গোলাপ গাছ, ফুটন্ত লাল গোলাপের উপর আংটিটি গেঁথে রেখে চলে গেল। নূরের ভেতরে প্রলয় শুরু হলো, ছেলেটা বুঝলো কিভাবে যে ওর হাত থেকে নিতে অস্বস্তি হচ্ছে!! মাথা নিচু করে ওর কাঙ্খিত জিনিসটা নিয়ে গাড়ির দিকে এগোয়। আজমাঈন দাঁড়িয়ে ছিলো, ওদের গাড়ি গেইট পেরিয়ে চলে যেতেই বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।
আজমল শিকদার সোফায় বসে গজগজ করছেন। তাহমিনা বিরক্ত হয়ে বলেন,’এখনও তোমার কিপ্টেমি গেল না? বলি টাকা পয়সা কি সব কবরে নিয়ে যাবে?’
তেতে উঠলেন তিনি,’এসব কথা পরে, আগে তোমার ছেলের কথা শোনো। ওই বোরকা পরা মেয়েটার সাথে তোমার ছেলের ইটিশ পিটিশ চলছে সেটা জানো কি?’

আজমাঈন কেবল ঘরের দরজায় পা রেখেছে। বাপের মুখের কথা শুনে থ হয়ে গেল। এই লোকের মাথার তার কি সবগুলো ছিঁড়ে গেছে। না জেনে বুঝে কি সব ভুলভাল বকছে! তাহমিনা বিরক্ত হয়ে বলে, ‘তাতে তোমার কি? আমার ছেলে ইটিশ পিটিশ করুক বা বিয়ে করে নিয়ে আসুক তাতে তোমার কি?’

‘তুমি যে তিনতলার আন্টির সাথে ছাদে গিয়ে লুডু খেলো তা কি বলেছি আমি?’

আজমল শিকদার দাঁড়িয়ে পড়লেন। তেড়ে আসার ভঙ্গিতে হেঁটে এলেন আজমাঈনের দিকে,’কথা ঘোরাবি না, আমি নাহয় লুডু খেলি। তুমি তো আংটি দিচ্ছো বাপ। তাও ডায়মন্ডের আংটি। আমার জমি খেয়ে কি এসব করা হচ্ছে?’


নূর এখনও ফেরেনি, কিছুক্ষণ আগে ফোনে জানিয়েছে যে আধঘন্টা লাগবে। রাশেদ সাহেব আজ বাসায় তাড়াতাড়ি এসেছেন। বিকেলে মেয়ের সাথে নাস্তা করবেন। তাছাড়া আজকে তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করেছেন, ইদানিং শরীর ভালো যাচ্ছে না তার। নূরকে সাথে নিয়ে চেকআপে যেতে হবে। তিনি ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে পেপার পড়ছেন, আজ সকালে অর্ধেক পড়েই বেরিয়ে পড়েছিলেন, এখন পুরোটা শেষ করতে হবে। এমন সময় সাইমন এলো, নিজ রুমে না গিয়ে বাবার মুখোমুখি সোফায় বসে হাঁফ ছাড়ল। আজ বড্ড গরম পড়েছে। অন্যসময় হলে রুমে গিয়ে এসির নিচে বসে পড়তো। আজ কিছু দরকারি কথা বলার আছে বাবার সাথে। এজন্য শত বিরক্তি থাকা সত্ত্বেও বসেছে। রাশেদ সাহেব পেপার রেখে বললো,’কি ব্যাপার? আজ এতো তাড়াতাড়ি এসেছো?’

‘এমনিই, বাইরে যা গরম। তাছাড়া এখন সব কিছু সাতটার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। ভাবলাম তাড়াতাড়ি ফিরি আজ।’

‘আচ্ছা, ব্যবসা কেমন চলছে? নতুন মাল কিনেছো নাকি এখনো সেই পুরোনো গুলো নিয়েই ঘাঁটাঘাঁটি করছো?’
সাইমন নিজেকে কিছুটা শিথিল করলো। গলায় নমনীয়তা ঢেলে দিয়ে বললো,’সেই ব্যাপারে কিছু কথা বলতে চাচ্ছি।’

‘আচ্ছা, বলো।’

‘আজকাল ফার্নিচারের ব্যবসায় আর কতই লাভ, তেমন কিছুই হচ্ছে না। ভাবছিলাম তোমার ব্যবসাটা হাতে নিব। ওটাতে ভালো লাভ হবে, তাছাড়া তোমার তো বয়স হয়েছে। এখন অবসরে যাওয়াই ভালো।’

ছেলে তার ভালোমানুষী দেখাচ্ছে, ইনিয়ে বিনিয়ে এই ব্যবসাটাও হাত করতে চাইছে। রাশেদ সাহেব অন্তত নিজের ছেলের মনোভাব বুঝেন। সে বলেন,’তোমার বর্তমান ব্যবসাও আমার হাতেই ছিলো, আমিই সব গুছিয়ে দিয়েছি। ফার্নিচারের নকশাসহ সবকিছু আমি ঠিক করতাম। তোমার হাতে ব্যবসা তুলে দেওয়ার পরেও আমি তোমাকে সব শিখিয়ে পড়িয়ে দিতে চেয়েছি কিন্তু তুমি রাজি হওনি। বন্ধুদের সাথে শেয়ারে ব্যবসা বড় করেছো, তারপর লসের পর লস করেছো। তবুও আমি লস ঠেকাতে টাকা ঢেলেছি তোমার পেছনে। তারপরও কোন উন্নতি করতে পারোনি। এখন আমার এই ব্যবসার দিকে নজর দিয়েছো! নাহ, আমি তো তোমার উপর ভরসা করতে পারছি না।’

সাইমনের মাথা গরম হলো, তবুও সে মাথা ঠান্ডা রাখলো,’তোমার কথা না রাখার জন্য আমি দুঃখিত আব্বু, আর কখনো অবাধ্য হব না। আরেকবার সুযোগ দেওয়া যায় না?’

রাশেদ সাহেব বেশ শান্ত গলায় বললেন,’না যায় না। কারণ আমি এই ব্যবসা অলরেডি নূরের হাতে তুলে দিয়েছি। ও আমার সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। গত তিন বছর ধরে আমার সাথে হাতে হাত লাগিয়ে কাজ করেছে সে। ছোটবেলা থেকেই ইন্টেরিয়র ডিজাইন সম্পর্কে পড়িয়েছি, যতগুলো বই এনে দিয়েছি সবগুলো পড়েছে সে। বাবার কথা মান্য করলে যে অতি শিঘ্রই সাফল্য আসে তার উদাহরণ আমার ছোট মেয়ে। তুমি যেহেতু আমার কথা শোনোনি তাই আমিও তোমার কথা রাখতে পারছি না। খুব শীঘ্রই আমি আমার ব্যবসা নূরের হাতে তুলে দিব। ও আরেকটু বড় হোক তারপর।’

একথা শুনে আর চুপ থাকতে পারেনা সাইমন। এক প্রকার চেঁচিয়ে ওঠে,’আমি আপনার ছেলে, বাবার সব সম্পত্তির উপরে আমার অধিকার সবচেয়ে বেশি। ও মেয়ে মানুষ কি ব্যবসা সামলাবে? বিয়ে দিলেই তো চলে যাবে। রাহাকে তো ফ্ল্যাট দিয়েছেন ওকেও দিবেন। তাহলেই তো ঝামেলা মিটে যায়। ব্যবসা দেওয়ার কি দরকার?’

‘তোমাকে অনেক বেশি দেওয়া হয়েছে, তুমি তা ধরে রাখতে পারোনি। এই ব্যবসা কিছুতেই তোমাকে দেওয়া যাবে না। আমার মেয়ে আছে এই ব্যবসার শেয়ারে। সে কাজ করেই টাকা উপার্জন করছে, তার বুদ্ধি বিবেচনা তোমার থেকেও তীক্ষ্ণ। বেঁচে থাকতে আমার ব্যবসার ধস দেখতে পারব না।’

সাইমনের স্বর আরো উঁচু হয়,’আমি অতো কিছু জানতে চাইনা, আমার ব্যবসাটা দরকার, আপনি দিবেন। আমার ছেলে মেয়ের ভবিষ্যৎ আছে এতে। ওদেরও হক আছে।’

‘ওদের হক তোমার সম্পত্তিতে, আমার নয়। তুমি তোমার ভাগের জিনিস ক্ষয়‌ করে ফেলেছ, এখানে আমার কিছু করার নেই।’

কথা বলতে বলতে হাঁপিয়ে গেছেন রাশেদ সাহেব। ডক্টর তাকে উত্তেজিত হতে বারণ করে দিয়েছেন। তা সাইমন জানা সত্ত্বেও থামছে না। সে বলেই যাচ্ছে, ‘আমি আমার ভাগের সবকিছু চাই। আপনি দিতে বাধ্য।’
ছেলের এমন উগ্র আচরণে উঠে দাঁড়ালেন রাশেদ সাহেব,’তোমাকে আর কিছুই দিব না আমি, যা করার করে নাও।’
বুকে হাত চেপে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন রাশেদ সাহেব। চেঁচামেচি তে রেহানা, অনুপমা চলে এসেছে। রেহানা দ্রুত স্বামীকে ধরলেন,’বাবার সাথে এমন ব্যবহার করছিস কেন তুই? জানিস না মানুষ টা অসুস্থ?’
সাইমন হুঁশ ফিরে পেলো, এতোটা চেঁচিয়ে বলা উচিত হয়নি তার। ভালোভাবে বুঝিয়ে বললেই হতো। কিন্তু মাথা গরম ছিলো। ব্যবসায় প্রতিদিন লস করতে থাকলে কার মাথা ঠিক থাকে। এজন্য রাগের মাথায় উল্টাপাল্টা বলে ফেলেছে।
নূর দরজায় পা রাখতেই দেখতে পেলো রাশেদ সাহেব হাপাচ্ছেন। সে দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরলো। নেকাব খুলতেই ওর চিন্তিত চেহারা দেখা গেল। কি হয়েছে জানে না, তবে আপাতত বাবাকে শান্ত রাখতে হবে। রাশেদ সাহেবের বুকে হাত বুলিয়ে বললো,’শান্ত হও আব্বু, ডক্টর তোমাকে সবসময় শান্ত থাকতে বলেছে। রুমে চলো, ওষুধ দিচ্ছি।’

ওরা রুমে যেতেই অনুপমা চেপে ধরলো সাইমনকে, ‘এভাবে বাবার সাথে চেঁচামেচি করছো কেন? জানো না উনি অসুস্থ?’
সাইমন ঠান্ডা মাথায় সবটা খুলে বললো। অনুপমা নিজেও চিন্তিত হয়ে পড়লো। খানিকক্ষণ ভেবে বললো,’এতো সহজ নাকি? তুমি খামোখা মাথা গরম করতে গেলে কেন? নূরকে বিয়ে দিলেই তো সব সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে। তখন রাহার মতোই ফ্ল্যাট দিবেন বাবা। ছোট মেয়েকে বেশি ভালোবাসেন ঠিক, হয়তো একটু বেশি দিবেন। কিন্তু এত বড় ব্যবসা তো দিবেন না। তোমার মাথায় কি এই সহজ কথা ঢুকলো না? খালি চেঁচামেচি করতেই পারো?’

সাইমন ভেবে দেখলো কথা ঠিক বলেছে অনুপমা। এসব তো ভেবে দেখেনি! স্ত্রী কে বাহবা দিয়ে বলে, ‘ভালো কথা বলেছ তুমি? কিন্তু আব্বুর হাবভাব ভালো না, এক কাজ করি। এখনই ভালো সময় নূরকে বিয়ে দেওয়ার। বিয়ের বয়সও হয়েছে, আব্বু না করবেন না।’

‘ছেলে পাওয়া কি এতো সহজ হবে? তোমার বোন ধার্মিক, বাবা ধার্মিক ছেলে ছাড়া নূরের বিয়ে দিবে না বলেছেন। এখন এমন ধার্মিক এবং ভালো ছেলে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তোমার বাবা যা খুঁতখুঁতে স্বভাবের, এতো সহজে ছেলে পছন্দ হবে না।’

হঠাৎ সাহারার কথা মনে পড়তেই সাইমন বলে উঠলো,’আমাদের সাহারার আগে কি নূরকে বিয়ে দিতে রাজি হবে আব্বু?’
অনুপমার মনে পড়ে গেল বছর দুয়েক আগের কথা। রাশেদ সাহেব বলেছিলেন যে, বিয়ের বয়স হলেই নূরকে ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিবেন। তখন অনুপমা ঘোর বিরোধ করেছিল। তার মেয়ের আগে নূরকে বিয়ে দিতে দিবেন না। মেয়েকে অনেক পড়াবেন, চাকরি করাবেন। তাছাড়া সাহারার আগে নূরকে বিয়ে দিলে কি তার মেয়ের ভালো জায়গায় বিয়ে হবে? এমনিতেই ভাইঝির চেয়ে ফুপি ছোট, একথা শুনলে ভালো সম্বন্ধ আসবে না। তার উপর নূরের আগে বিয়ে হলে তো সাহারার বিয়েই হবে না। এসব ভর্ৎসনা করেছিল শ্বশুরের সামনে। তখন রাশেদ সাহেব কথা দিয়েছিলেন, যে সাহারার আগে তিনি নূরের বিয়ে দিবেন না। এখন একথা তুললে আবার না জানি কি হয়।
অনুপমা শুকনো ঢোক গিলে বলে,’দরকার পড়লে সাহারার বিয়ে আগে দিব।’

চলবে,,,,,,

অসুস্থ ছিলাম বিধায় গল্প দিতে দেরি হয়েছে, তখন সবাই কত কিছু বললো, দেরিতে দিলে পড়ার আগ্রহ থাকে না, প্রতিদিন গল্প দিন ইত্যাদি আরো কত কথা। অথচ গল্প দিলে নাইস নেক্সট লিখেই আপনাদের দায়িত্ব শেষ। দুই লাইনে অনুভূতি লিখলে আমি কত খুশি হই এটা কি আপনারা জানেন?
গ্রুপে যারা যুক্ত আছেন তারাও দুয়েক লাইন লিখে পোস্ট করেন না। উৎসাহ না পেলে কি লিখতে ইচ্ছে করে?
ভালো কথা না লিখতে পারেন অন্তত ভুল ধরিয়ে দিন, সমালোচনা করুন। আমি সবকিছু পজেটিভ ভাবেই নিব। শুধু ভাষা মার্জিত থাকা দরকার।
আজ থেকে আমার গ্রুপেও আপনারা আমার গল্পের সমালোচনা করতে পারবেন, আপনাদের জন্য উন্মুক্ত করা হলো। সুন্দর মার্জিত ভাবে গল্পের ভালো, খারাপ দিকগুলো তুলে ধরবেন। আমি খুশি হব। অন্তত দুই লাইন লিখে গেলে সত্যি খুশি হব।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply