Golpo romantic golpo অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা

অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ১০০ সমাপ্ত (প্রথমাংশ+শেষাংশ)


#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা

[পর্ব ১০০] প্রথম অর্ধেক

#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম

(🚫 দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয় এবং প্রাপ্তমনস্কদের জন্য উন্মুক্ত)

(🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

সময়ের প্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে ন্যান্সি নামটির পাশে যুক্ত হলো আরেকটি পরিচয় একটি নতুন অভিধা, একটি নতুন ছায়া।

ইলহাম ন্যান্সি থেকে তার পরিচয় বিস্তৃত হয়ে দাঁড়াল ইলহাম ন্যান্সি অ্যাঞ্জেলিনা।

এই নামটি দিয়েছিলেন মামুন হায়দার। নাম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকল তার জীবনও। অচেনা এক শিশুর মতো শুরু হওয়া সেই নতুন অধ্যায় ধীরে ধীরে তাকে টেনে নিয়ে গেল হায়দার পরিবারের অন্তর্লীন পরিসরে। সময়ের নিরন্তর স্রোতে সে যেন নিজেকে গড়ে তুলল নতুন করে বাংলাদেশের মাটিতে, নতুন ভাষায়, নতুন সংস্কৃতিতে।

ধীরে ধীরে বাংলা ভাষার উচ্চারণ আয়ত্ত করতে লাগল সে। শব্দের ভাঙা টুকরো জুড়ে তৈরি করল নিজের যোগাযোগের জগৎ। একসময় যে মেয়েটি ছিল স্মৃতিহীন এক শূন্য ক্যানভাস, সে-ই হয়ে উঠল পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

হায়দার পরিবারের কন্যা তন্বীর সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে উঠল র’ক্তের চেয়েও গভীর বন্ধনে। দুইজন যেন একে অপরের ছায়া। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না‌সবকিছুই ভাগ করে নেয় তারা।

কিন্তু তার ভেতরের নীরবতা কখনোই পুরোপুরি নিঃশেষ হয়নি। মাঝে মাঝে গভীর রাতে সে চমকে উঠে বসত বিছানায়। বুকের ভেতর অজানা আতঙ্ক, চোখে ঘন অন্ধকারের ভয়াল ছবি। সে চিৎকার করে উঠত, কিন্তু পরক্ষণেই সবকিছু মিলিয়ে যেত কুয়াশার মতো।

স্বপ্নে সে কাউকে দেখত।কিন্তু কে?মুখ স্পষ্ট নয়।

কণ্ঠস্বর অস্পষ্ট। দূর থেকে ভেসে আসা ভাঙা ডাক, যেন কোনো অতীত তাকে ডেকে নিচ্ছে বারবার।

তবুও স্মৃতির দরজা খুলত না। না কোনো অতীত মনে পড়ত, না কোনো পরিচয়।

শুধু এক অদ্ভুত শূন্যতা তার অস্তিত্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকত। সময়ের কঠিন বাস্তবতা ধীরে ধীরে তার কোমলতাকে ভেঙে দিল।

অভাব, অনটন আর দারিদ্র্যের নির্মমতা তাকে জীবন সম্পর্কে কঠিন শিক্ষা দিল। কখনো কখনো নিজের অস্তিত্বই তার কাছে বোঝা মনে হতো। তবুও সে থেমে যায়নি। শিক্ষাজীবনের প্রথাগত পথ সম্পূর্ণ না করেই তাকে নামতে হলো জীবিকার যুদ্ধে।

পরিবারের হাল ধরতে সে কাজ নিল এক বেকারিতে “ইয়াম্মি কেক”। ময়দার গন্ধ, ওভেনের তাপ, আর ক্লান্ত হাতের শ্রমে দিন কাটতে লাগল তার।

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্ন পরিশ্রম।

কিন্তু সেই ক্লান্তির ভেতরেও তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত স্থিরতা যেন সে নিজের অতীতকে জানে না, তবুও জীবনকে থামতে দেবে না।সে ধীরে ধীরে ভুলে যেতে লাগল সে কে ছিল? কোথা থেকে এসেছিল?

তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা গল্পটা কতটা রক্তা’ক্ত ছিল।

******************************

বর্তমান……

থরথর করে কাঁপতে থাকা ন্যান্সি হঠাৎই হেসে উঠল। কিন্তু সে হাসি ছিল না আনন্দের ছিল ভাঙচুর হয়ে যাওয়া এক আত্মার উন্মত্ত আর্ত’নাদ। হাসতে হাসতেই সে কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল,

“আমি… আমি মুসলিম নই, আফরিদ এহসান? আমার… আমার ধর্ম, আমার পরিচয়, আমার পুরো জীবনটাই তাহলে মিথ্যে?”

কথাগুলো শুনে যেন বুকের গভীরে কেউ ধারালো শলাকা বিদ্ধ করল আফরিদকে। এতক্ষণ ধরে যে মানুষটি অতীতের প্রতিটি রক্তা’ক্ত অধ্যায় বর্ণনা করছিল, তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই মোচড় দিয়ে উঠল।

ন্যান্সির সমগ্র শরীর কাঁপছে। শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে বুকে জমে থাকা যন্ত্রণা তার নিঃশ্বাস কেড়ে নিচ্ছে।

আফরিদ আর স্থির থাকতে পারল না। সবকিছু ভুলে সে ছুটে এলো। ন্যান্সির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। দু’হাতে তার কাঁপতে থাকা বাহু আঁকড়ে ধরে ব্যাকুল কণ্ঠে বলল,

“শোন, পরাণ! তুই মুসলিমই আছিস। তখন তুই অবুঝ ছিলি। তোকে যা শেখানো হয়েছে, তুই তাই শিখেছিস। এত বছর ধরে তুই নিজেকে মুসলিম জেনে বড় হয়েছিস, নিজের সবটুকু দিয়ে ইবাদত করেছিস। তোর বিশ্বাস, তোর রবের প্রতি ভালোবাসা‌ সেগুলো কোনোদিন মিথ্যে হতে পারে না!”

কিন্তু আজ কোনো যুক্তি শুনতে রাজি নয় ন্যান্সি।

সে হুহু করে কেঁদে উঠল।

“না… না! আমার কিছু নেই। কোথাও আমার কিছু নেই!”

কন্যার চক্ষু্দ্বয় রক্তা’,ভ হয়ে উঠেছে।

সে কাঁপতে কাঁপতে আঙুল তুলল আফরিদের দিকে।

“মিথ্যেবাদী! জানোয়ার! আমি বিশ্বাস করি না আপনাকে… আপনাদের কাউকেই না! আমার বাবা… আপনি… সবাই মিলে আমার জীবন শেষ করে দিয়েছেন!”

রমণীর নিঃশ্বাস যেন রুদ্ধ হয়ে আসছে, তবু সে থামল না।

“আপনি আমার শৈশব কেড়ে নিয়েছেন… আমার পরিচয় কেড়ে নিয়েছেন… আমার জীবন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন!”

কণ্ঠটা হঠাৎ ভেঙে গেল। অশ্রুসিক্ত চোখে সে চিৎকার করে উঠল,

“আমার… আমার দুধের শিশুটাকেও তো ফিরিয়ে দিতে পারবেন না! পারবেন?”

আফরিদের শরীর মুহূর্তেই পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল।

ন্যান্সি কাঁদতে কাঁদতে তার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দু’হাতে তার জামা মুঠো করে ধরে অসহায় কণ্ঠে বলল,

“কে কেড়ে নিয়েছে আমার আয়াশকে? বলুন! কে? আমার ওইটুকু শিশুর কী অপরাধ ছিল? কী দোষ ছিল তার?”

তার প্রতিটি শব্দ যেন ছু’রির ফলার মতো বিদ্ধ হতে লাগল আফরিদের অন্তরে।

কিয়ৎক্ষণ নীরব থেকে আফরিদ এক অদ্ভুত, বিষণ্ন হাসি হাসল।

তারপর ফিসফিস করে বলল,

“আর আমার শৈশব, বান্দির বাচ্চা? আমার শৈশবটা যে তোর বাবা নিজের হাতে শেষ করে দিয়েছিল, তার হিসেব কে দেবে?”

ন্যান্সি থেমে গেল। ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল সেই নীলাভ চোখদুটোর দিকে। সেই চোখে আজ আর ক্রোধ নেই। নেই প্রতিশোধের আ’গুন। আছে কেবল বহু বছরের অবসন্ন ক্লান্তি আর এক সাগর সমান না-বলা বেদনা।

আর ন্যান্সির দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে এলো। মনে হলো এই মানুষটিও বোধহয় কোনো একদিন ঠিক তার মতোই সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল।

থরথর করে কাঁপতে থাকা ন্যান্সির দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে এলো। বুকের ভেতর যেন কেউ একমুঠো জ্বলন্ত অঙ্গার চেপে ধরেছে। এই মানুষটিও কি কোনো একদিন ঠিক তার মতোই সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল? এই নীলচোখের দানবটাও কি কোনো একদিন অসহায় এক শিশু ছিল?

আফরিদ নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অতঃপর ধীর পায়ে মিস্টার আলবার্টের নিথর দেহটার দিকে তাকিয়ে কর্কশ কণ্ঠে বলল,

“বিশ্বাস কর, এই জানোয়ারটাকে আমি নিজের হাতে মা’রতে চেয়েছিলাম! শুধু আমার জীবন না,এটা তোর মাকেও শেষ করেছে। আমার শৈশব ছিনিয়ে নিয়েছে, তোর পৃথিবীটাও পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে।”

ন্যান্সির সমগ্র শরীর ঘৃণায় কেঁপে উঠল। তার দৃষ্টি গিয়ে থামল মৃতদেহটার উপর। এই মানুষটা তার বাবা?

বাবারা তো মেয়েদের মাথার মুকুট বানিয়ে রাখে। বুকের পাঁজরে লুকিয়ে রাখে। তাহলে তার বাবা তাকে বিক্রি করতে চেয়েছিল কেন? মৃ’ত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল কেন?

হঠাৎই ন্যান্সির দৃষ্টি গিয়ে থামল আফরিদের ডান হাতের ঈগল-পাখির আংটিটার দিকে। কতবার এই আংটিটা সে দেখেছে! কতবার সেই হাত তাকে আদর করেছে!

আজ সেই হাতটাই তার কাছে রক্তে রঞ্জিত মনে হচ্ছে।

কষ্টে কাঁপতে কাঁপতে সে বলল,

“আমার… আমার পালিত মা-বাবাকে… আপনিই মেরে’ছেন, তাই না আফরিদ?”

প্রশ্নটা শুনে যেন পৃথিবী থমকে গেল। আফরিদের চোখ দুটো ধীরে ধীরে বুজে এলো। ঠোঁট কেঁপে উঠল।

অবশেষে সে মাথা নত করল।

“মিথ্যে বলব না। আজ আর একচুলও মিথ্যে বলব না। জানি সত্যি বললেও তোকে পাব না। তবুও মিথ্যে দিয়ে তোকে আর বেঁধে রাখতে চাই না।”

ন্যান্সির শরীর দুলে উঠল। তার ঠোঁট ফেটে কান্না বেরিয়ে এলো। নিজেকে উন্মাদ মনে হচ্ছে রমণীর। এই পশুকে সে ভালোবেসেছিল?

“কেন মেরেছেন ওদের?ওরা কি দোষ করেছিল?”

আফরিদের ওষ্ঠোদ্বয় কেঁপে ওঠে, ধরাশায়ী গলায় বলল,

“ভয় পেয়েছিলাম। তোকে হারানোর ভয়! ওরা তোকে আমার থেকে কেড়ে নেবে সেই ভয় পেয়েছি। মামুন হায়দার কয়েক বছর পর জেনেছেন তুই আসলে কার মেয়ে ছিলি!আর,,, আমি যখন তোর কাছে পোঁছেছি,তখন তিনি এটাও জেনেছিলেন আমি কে! আমি ভয় পেয়েছিলাম তোকে সবকিছু জানিয়ে দেওয়ার!”

ন্যান্সি স্তব্ধ বাকরুদ্ধ,

“ত,,, তাহলে কেন আগুন্তক সেজে আমাকে এগুলো জানিয়েছিলেন? মিথ্যের মধ্যেই রাখতে পারতেন!”

আফরিদ ক্লান্ত হাসলো,

“মিথ্যের পর্দায় তোকে রেখে ভালোবাসতে বড্ড কষ্ট হচ্ছিল। চেয়েছিলাম তোকে অর্ধ সত্য জানাতে কিন্তু তার আগেই তুই সব জেনে গিয়েছিস,,,,

“এই হাতে… এই হাতে আপনি আমাকে দিয়ে খু’ন করিয়েছেন? আমি… আমি নিজের হাতে আমার মানুষ শেষ করেছি?”

আফরিদের বুকটা যেন হাজার টুকরো হয়ে গেল।

সে দ্রুত এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

তার কণ্ঠ কাঁপছে।

“শোন না, তুই চাইলে আমাকে মেরে ফেল। চাইলে আমার র’ক্ত দিয়ে এই পাহাড় রাঙিয়ে দে। কিন্তু আমাকে ঘৃণা করিস না। তোর ঘৃণা আমি সহ্য করতে পারব না। পৃথিবীর সব শাস্তি মেনে নেব, শুধু তোর চোখের এই ঘৃণাটা না!”

ন্যান্সির নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে।বুকের ভেতরটা মোচড় দিচ্ছে।হঠাৎ সে উঠে দাঁড়াল।এই চার দেওয়ালের ভেতর সে দম বন্ধ হয়ে ম’রবে।

সে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এল।

পাহাড়ি সেই অঞ্চলটা নিস্তব্ধ। দূরে কৃষ্ণবর্ণ আকাশ, মাথার উপর ম্লান চাঁদ। উঁচু পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে পড়ল ন্যান্সি। তার এলোমেলো চুল বাতাসে উড়ছে।

আফরিদ পিছন পিছন ছুটে এসে থমকে দাঁড়াল।

তার বুক কাঁপছে।সে ভয় পাচ্ছে। এই প্রথম সত্যিকারের ভয়। যদি ন্যান্সিও তাকে ছেড়ে চলে যায়?

তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।

“আজকে তুইও যদি আমাকে ছেড়ে যাস আমি সত্যিই জানোয়ার হয়ে যাবো, পরাণ! আমি আর বাঁচতে পারব না।”

ন্যান্সি পেছন ফিরে তাকাল না। আফরিদ কাঁপা গলায় বলল,

“হ্যাঁ, আমি খু’নি। আমি পাপী। অর্থের কাছে মাথা নত করেছি, ক্ষমতার কাছে নিজেকে বিক্রি করেছি। মানুষের জীবন নিয়ে খেলেছি। কিন্তু একটা জিনিসে কখনো মিথ্যে ছিলাম না!”

আফরিদ এহসানের চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। জীবনের প্রথম ভয়ের কাছে পরাজিত হয়ে কেঁদে উঠলো সে,

“আমি তোকে ভালোবেসেছি, ন্যান্সি! ভীষণ ভালোবেসেছি!”

ন্যান্সির চোখের কোণ বেয়ে টুপটাপ অশ্রু ঝরছে।

আফরিদ আরও এক পা এগিয়ে এল।

“তুই জানিস? আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন একদিনেই আমার পৃথিবী শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম এরপর আর কাউকে ভালোবাসব না। কাউকে নিজের বলতে পারব না।”

ন্যান্সি নির্বিকার, পুরুষটির কণ্ঠ ভেঙে গেল।

“তারপর তুই এলি। অন্ধকার জীবনের মাঝখানে একফোঁটা আলো হয়ে এলি।”

সে বুকের উপর হাত রাখল।

“এখানে,,এখানে শুধু তুই আছিস।”

ন্যান্সি ফুঁপিয়ে উঠল। আফরিদ আবার বলল,

“সবাই আমাকে মাফিয়া কিং বলে, জানোয়ার বলে, খু’নি বলে। কিন্তু তোর কাছে আমি শুধু আফরিদ হতে চেয়েছিলাম তোর মানুষটা হতে চেয়েছিলাম।”

ন্যান্সি কেঁপে উঠল।

“কেন করলেন এসব? কেন করলেন আপনি? কেন আমাকে এভাবে শাস্তি দিলেন? এরচেয়ে মেরে ফেলতেন! বাঁচিয়ে রেখে কেন শেষ করে দিলেন? জীবিত অবস্থায় মে’রে ফেললেন আমাকে!”

প্রশ্নটা এতটাই অসহায় ছিল যে আফরিদের চোখ ভিজে উঠল। সে ফিসফিসিয়ে বলল,

“প্রতিশোধ মানুষকে প্রথমে আ’গুন দেয়, তারপর সেই আগুনেই মানুষটা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আমি পুড়ে গেছি, পরাণ অনেক আগেই পু’ড়ে গেছি।”

সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। একজন মাফিয়া নয়, একজন ভেঙে পড়া মানুষ।

“তুই যদি আজ চলে যাস আমার পৃথিবীতে আর কিছু থাকবে না। ক্ষমতা না, অর্থ না, সাম্রাজ্য না,কিছুই না।”

তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো।

“আমি জন্ম থেকেই নিঃস্ব ছিলাম। তারপর তোকে পেয়ে ধনী হয়েছিলাম। তুই যদি চলে যাস আমি আবার সেই বারো বছরের এতিম ছেলেটা হয়ে যাব, যে নিজের বাবার লাশের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতেও ভুলে গিয়েছিল।”

বাতাস হুহু করে বয়ে যাচ্ছে। দুইজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের চূড়ায়। একজনের পৃথিবী ভেঙে গিয়েছে। আরেকজন বহু আগেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। শুধু রাতটা নীরবে সাক্ষী হয়ে রইল দুইটা ভগ্ন আত্মার আর্তনাদের।

**************************

পরণে কৃষ্ণবর্ণ ওভারসাইজ হুডি, পদযুগলে দীর্ঘ ফিতেয় হাঁটুর অবধি জড়িয়ে থাকা হিল জুতো। মুখাবয়ব আবৃত কালো মাস্কে, মস্তকে টানা ক্যাপ। ডান হস্তে দৃঢ়ভাবে চেপে ধরা রিভলবার।

নিশীথের নিস্তব্ধতা চিরে ধীর, মাপা পদক্ষেপে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে উঠে আসছে আগন্তুক সেই নারী।

চূড়ায় উঠতেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি ভগ্ন অস্তিত্বের উপর।একটি প্রেম, যা র’ক্তে রঞ্জিত।

একটি সম্পর্ক, যা সত্যের নির্মম অভিঘাতে ভস্মীভূত।

নারীটি নিঃশব্দে একটি পাথরের আড়ালে সরে দাঁড়াল। নিবিড় দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল দুজনকে।

মাস্কের অন্তরালে ঢাকা ওষ্ঠযুগলে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক রহস্যময়, দুর্বোধ্য হাস্যরেখা।

ন্যান্সি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আফরিদের সম্মুখে বসে পড়ল।

এত কাছে থেকেও যেন মানুষটিকে আজ অচেনা লাগছে। এই সেই পুরুষ, যার বুকে মুখ লুকিয়ে সে কেঁদেছে?এই সেই মানুষ, যার চোখে নিজের জন্য ভালোবাসা খুঁজেছিল? তার সামনে বসে আছে এক রক্তাক্ত অতীত, এক নরকসম সত্য।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে করুণ, ভাঙা কণ্ঠে বলল,

“ভালোবাসা? আপনার মতো জানোয়ারও কাউকে ভালোবাসতে পারে?”

প্রশ্নটা যেন বিষাক্ত শলাকার ন্যায় বিদ্ধ করল আফরিদের অন্তঃকরণ।সহসাই মুখ তুলে তাকাল সে।

নীলাক্ষী যুগল র’ক্তাভ, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত।

সেই চোখে আজ ক্ষমতা নেই, অহংকার নেই, ভয়ংকর মাফিয়া কিংয়ের নিষ্ঠুরতা নেই।

শুধু আছে অসীম ক্লান্তি আর এক অসহনীয় যন্ত্রণা।

ন্যান্সি তীব্র তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে উঠল।

সেই হাসিতে কান্না মিশে আছে। ঘৃণা মিশে আছে।

নিজের উপর প্রবল ক্ষোভ মিশে আছে।

“নিজেকে পাগল মনে হচ্ছে আমার। সত্যিই পাগল আমি! আমার চোখের সামনেই একটা জানোয়ার ঘুরে বেড়িয়েছে, অথচ আমি চিনতেই পারিনি!”

কণ্ঠ কেঁপে উঠল রমণীর

“মানুষের মুখোশ পরে থাকা এক নরপশুকে আমি ভালোবেসেছি,,, তার হাত ধরে ভবিষ্যৎ দেখেছি,,

আফরিদের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

ন্যান্সি দু’হাতে নিজের চুল খামচে ধরল।

যেন মাথার ভেতর জমে থাকা সমস্ত যন্ত্রণা ছিঁড়ে ফেলতে চায়।

তারপর হঠাৎই ভেঙে পড়া কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,

“বলুন! আমার ছেলের র’ক্ত হাতে নিয়ে আপনি কিভাবে ঘুমিয়েছেন?”

আফরিদ নিথর দৃষ্টিতে তাকালো।

“কিভাবে শান্তিতে শ্বাস নিয়েছেন আপনি, এহসান?”

কলার চেপে ধরে পুরুষটির।

“রাতে চোখ বন্ধ করলে কিছুই দেখেন না? কিছুই না?”

এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে।

“আমার ছোট্ট আয়াশের মুখটা ভেসে ওঠে না?”

সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

“ও তো খুব ছোট ছিল,খুব ছোট! পৃথিবীটা দেখারও সুযোগ পায়নি।

মেয়েটার কাঁধ কাঁপছে। ছেড়ে দিল কলার কথাগুলো আর স্পষ্ট বেরোচ্ছে না।

“ওর কী দোষ ছিল? বলুন! কী দোষ ছিল আমার শিশুটার? সে কি আপনার কোনো ক্ষতি করেছিল?”

আফরিদের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো। ন্যান্সির প্রতিটি শব্দ যেন তার বুকে ধারালো ছুরি হয়ে বিঁধছে।

ন্যান্সি কাঁদতে কাঁদতে নিজের বুকে আঘাত করতে লাগল।

“আমার বুকটা জ্বলে যায়, প্রতিদিন জ্বলে যায়! আমি ওর মুখটাও ঠিকমতো মনে করতে পারি না। শুধু মনে আছে, আমার একটা ছোট্ট বাচ্চা ছিল ,আমার বুকের ধন ছিল! ওকে আমি ঠিকমতো ভালোই বাসতে পারলাম না তার আগেই ছিনিয়ে নেওয়া হলো কেন?”

সে হঠাৎ দু’হাতে আফরিদের শার্ট খামচে ধরল আবারো।

“কেন করলেন এসব? কেন?”

তার কণ্ঠে এমন আর্তনাদ ছিল, যা পাথরকেও কাঁদিয়ে দিতে পারে।

“আপনি আমার অতীত কেড়ে নিয়েছেন।আমার মা কেড়ে নিয়েছেন, আমার পরিচয় কেড়ে নিয়েছেন আমার সন্তানটাকেও কেড়ে নিয়েছেন!”

সে ফুঁপিয়ে উঠল।

“আমার জন্য আর কী বাকি রেখেছেন আপনি, এহসান? কী আছে আমার?”

আফরিদের ঠোঁট কাঁপল।কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না। আজ তার সমস্ত ক্ষমতা, সমস্ত প্রতাপ, সমস্ত নিষ্ঠুরতা এক নারীর অশ্রুর সামনে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। শুধু নীলাক্ষী যুগল থেকে নীরবে গড়িয়ে পড়ল দুটি অশ্রুবিন্দু। আর সেই অশ্রুতে যেন ডুবে গেল এক জানোয়ারের সমগ্র অহংকার।

আফরিদ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

রাত্রির শীতল বাতাসে তার এলোমেলো কেশরাশি উড়ে উঠছে। চোখ দুটো রক্তাভ, অথচ আশ্চর্যরকম শান্ত।সে কয়েক কদম সামনে এগিয়ে গেল।

অতঃপর পকেট থেকে একটি সিগারেট বের করল।

কাঁপতে থাকা আঙুলে আগুন ধরিয়ে দীর্ঘ এক টান দিল।

তারপর ধোঁয়াটা আকাশের দিকে ছেড়ে দিয়ে ঠোঁটের কোণে এক তীব্র তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলল,

“ছেঃ শালার জীবন! এত ভালোবাসলাম, আর সেই ভালোবাসাটাও বিশ্বাস করাতে পারলাম না!”

কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

মনে হলো মানুষটা আর দাঁড়িয়ে নেই; দাঁড়িয়ে আছে এক বিধ্বস্ত আত্মা।

ন্যান্সি অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে রইল।

এই মানুষটাকে সে ঘৃণা করে। আবার এই মানুষটাকেই সে ভালোবাসে। কী ভয়ংকর এক দ্বন্দ্ব!

আফরিদ তার দিকে তাকাল।

চোখদুটোতে এমন এক অসহায়ত্ব, যা কোনোদিন দেখা যায়নি। সে ধীরে ধীরে বলল,

“একটাবার সুযোগ দে, পরাণ। সব ছেড়ে দেব আমি। এই ক্ষমতা, এই সাম্রাজ্য, এই র’ক্তের পৃথিবী সব।”

কণ্ঠ ভেঙে গেল কন্যার।

“শুধু তুই থেকে যা। আমার হয়ে দেখ, আমি দুনিয়াটা তোর পায়ের নিচে এনে দেব।”

ন্যান্সি কষ্টভরা এক হাসি হাসল। সেই হাসিতে ছিল হাজারটা কান্না।

“দুনিয়া দিয়ে আমি কী করব, আফরিদ?”

গলা রুদ্ধ হয়ে এলো কান্না গিলে নিচ্ছে কন্যা!

“আমার ছেলেটাকে তো আর ফেরত পাব না!”

চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

“আপনার সাথে থাকলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসবে। প্রতিটা মুহূর্তে আমার অতীত আমাকে তাড়া করবে। আমার আয়াশের মুখটা ভেসে উঠবে, আমি পাগল হয়ে যাব!”

কথাগুলো যেন ছুরির ফলার মতো বিদ্ধ করল আফরিদকে।সে এক পা পিছিয়ে গেল।আরও এক পা। তার পেছনে অতল খাদ।কিন্তু সে যেন কিছুই অনুভব করছে না। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস টেনে মৃদু হেসে বলল,

“এক জনমে তোকে চাইতে গিয়ে সব হারিয়ে ফেললাম, বউ!”

চোখের কোণ ভিজে উঠল নির্দয় পুরুষের!

“তুই আমার হয়েও কোনোদিন আমার হইলি না,,

ন্যান্সির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।

সে হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠল।

“এই এক জনমে আপনাকেও ভালোবেসে আমি যে পাপ করেছি, তার খেসারত জীবন দিয়েও শোধ হবে না!”

কণ্ঠ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। বুকের ডান দিকটা ব্যথায় চিড়বিড়িয়ে উঠেছে।

“চাইলেও আমি আপনাকে ভালোবাসা থেকে মুক্তি পাব না এটাই আমার সবচেয়ে বড় শাস্তি!”

কথাটা শুনে আফরিদের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো।

সে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরল। তবুও চোখের জল আটকে রাখতে পারল না। অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। তারপর ভাঙা কণ্ঠে বলল,

“তাহলে কেন ছেড়ে দিচ্ছিস আমাকে?”

আরও এক পা পিছিয়ে গেল সে।

“তুই ছাড়া অক্সিজেনও আমার কাছে বি’ষের মতো লাগবে, পরাণ!”

তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। ব্যথাতুর কন্ঠে বলে উঠে,

“দম বন্ধ হয়ে মরে যাব আমি!”

ন্যান্সির হাঁটু কাঁপছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীটা দুলে উঠেছে।

ঠিক তখনই আফরিদ আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

“আজকে যদি তোকে সত্যিই হারিয়ে ফেলি তাহলে একটা জিনিস চাইব তোর রবের কাছে।”

ন্যান্সি অসহায় চোখে তাকাল।

আফরিদ তার দিকে চেয়ে খুব শান্ত কণ্ঠে বলল,

“আমার হয়ে আমিন বলবি?”

ন্যান্সির বুক কেঁপে উঠল। আফরিদ দূরের তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

❝তোর, আমার আবার দেখা হোক,

প্রণয় ঘটুক,

যেখানে থাকবে না পাপ পূণ্যের হিসাব,

না থাকবে বিচ্ছেদ নামক বিবাধ❞

কথাগুলো বলেই আফরিদ চোখ বুজে ফেলল।

মনে হলো সে আর কোনো মানুষের কাছে কিছু চাইছে না। সে শুধু ভাগ্যের কাছে একটি অসম্ভব প্রার্থনা করছে।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে, পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ন্যান্সি বুঝতে পারল কিছু কিছু ভালোবাসা কখনো পূর্ণতা পায় না। তবু মৃ’ত্যুর শেষ প্রহর পর্যন্ত তারা হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর স্থানে র’ক্তক্ষরণ ঘটিয়ে যায়।

ন্যান্সি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।দুর্বল শরীরটা আজ আর তার কথা শুনছে না। হাঁটু কাঁপছে, শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। তবুও সে দাঁড়িয়ে রইল। কারণ আজ ভেঙে পড়ার দিন নয়। আজ হিসাব চুকানোর দিন। লম্বা এক নিঃশ্বাস টেনে সে আফরিদের দিকে তাকাল।

চোখ দুটো কান্নায় ফুলে উঠেছে, তবুও সেই দৃষ্টিতে আজ এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।

অতঃপর রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,

“এতই সহজ, আফরিদ এহসান?”

আফরিদ নির্নিমেষ তাকিয়ে রইল।ন্যান্সি আরও এক পা এগিয়ে এলো।

“কী ভাবছেন? এখান থেকে ঝাঁপ দিয়ে সব শেষ করে দেবেন? সব পাপ, সব অপরাধ, সব র’ক্তের দায় থেকে মুক্তি পেয়ে যাবেন?”

তার কণ্ঠ ক্রমশ কেঁপে উঠল। নিজেকে আজ আর ধরে রাখল না কন্যা।

“মৃত্যু এত সহজ না, এহসান! এত সহজ না!”

আফরিদ কিছু বলল না।শুধু তাকিয়ে রইল।

ওই চোখ দুটোতে যেন হাজার বছরের ক্লান্তি।

অথচ তাদের অগোচরে, অন্ধকারের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা আগন্তুক নারীটি ধীর গতিতে রিভলবার তুলে ধরল।

তার আঙুল ট্রিগারের উপর স্থির।নিশানা ঠিক ন্যান্সির পিঠ বরাবর।আর মাত্র এক মুহূর্ত। আর মাত্র এক চাপ।সব শেষ হয়ে যাবে। এদিকে কিছুই টের পেল না ন্যান্সি।

দুর্বল পায়ে দু’কদম এগিয়ে এলো সে।পরণের দীর্ঘ গোল পোশাকটি ধুলো আর মাটিতে মলিন হয়ে গেছে। এলোমেলো চুল, অশ্রুসিক্ত মুখ, র’ক্তশূন্য ঠোঁট আজ তাকে কোনো রাজকন্যা নয়, বরং যুদ্ধশেষে বেঁচে যাওয়া এক ভগ্ন সৈনিকের মতো দেখাচ্ছে।

সে কিছুক্ষণ আফরিদের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব ধীরে বলল,

“আপনার সবচেয়ে বড় শাস্তি কী জানেন, আফরিদ এহসান?”

আফরিদের বুকটা কেঁপে উঠল। ওই ভয়ংকর রমণীর অশ্রুসিক্ত নয়নে নয়ন রেখে। ন্যান্সি চোখের জল মুছে বলল,

“আমার সঙ্গে বেঁচে থাকা।”

চারদিক স্তব্ধ। শুধু পাহাড়ি বাতাস বয়ে যাচ্ছে।

ন্যান্সি কাঁপা কণ্ঠে বলে চলল,

“হ্যাঁ, আপনি আমার সঙ্গে সংসার করবেন।”

আফরিদের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। অস্ফুট স্বরে কিছু বলতে চাওয়ার আগেই, ন্যান্সির ঠোঁটে বিষণ্ন এক হাসি ফুটে উঠল।

“প্রতিটা সকাল আপনি আমার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠবেন। আর প্রতিবার আমার দিকে তাকিয়ে আপনার বুকের ভেতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে।”

তার চোখ আবার ভিজে উঠল। একপ্রস্থ অশ্রু গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে।

“প্রতিবার মনে পড়বে,কোনো না কোনোভাবে আপনি আমার সন্তানের মৃ’ত্যুর কারণ।”

আফরিদের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

ন্যান্সি আরও কাছে এগিয়ে এলো। এতটাই কাছে যে সে আফরিদের কাঁপতে থাকা নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারছে।

“এই এক জীবনে আপনাকে ভালোবেসে আমি যতটা যন্ত্রণা পেয়েছি,তার দ্বিগুণ যন্ত্রণা আপনি ভোগ করবেন।”

এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

“আমার সঙ্গে সংসার করে ভোগ করবেন।”

আরেক পা এগিয়ে এসে সে ফিসফিস করে বলল,

“আপনি ম’রতে পারবেন না, আফরিদ। আপনাকে বাঁচতে হবে। আমার চোখের সামনে বাঁচতে হবে। আমার প্রতিটা কান্না দেখতে হবে। প্রতিটা দুঃস্বপ্নের সাক্ষী হতে হবে। আমার ভাঙা হৃদয়ের শব্দ শুনতে হবে।”

থমকে গেল ন্যান্সি, ঠোঁট কাঁপছে তার।

“পুরো একটা জীবন!”

সে কষ্টে হাসল।

“পুরো একটা জীবন আপনি আমার অপরাধী হয়ে থাকবেন। আমার পাপ হয়ে থাকবেন। আমার শাস্তি হয়ে থাকবেন।”

তারপর কণ্ঠটা আরও নরম হয়ে এলো।

“আর,,,,

সে চোখ তুলে সরাসরি আফরিদের নীল চোখে তাকাল।

“আমার আস্বামী হয়ে থাকবেন।”

শব্দগুলো শুনে আফরিদ যেন শ্বাস নিতে ভুলে গেল।

তার চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে এলো। এ কেমন শাস্তি?

এ কেমন ক্ষমা? এ কেমন ভালোবাসা? যেখানে ঘৃণাও আছে, অভিমানও আছে, তবু ছেড়ে যাওয়া নেই।

ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা আগন্তুক নারীর আঙুল ট্রিগারের উপর আরও শক্ত হয়ে উঠল।

তার রিভলবারের নল এখনো স্থির।

নিশানা ইলহাম ন্যান্সির হৃদপিণ্ডের ঠিক পেছনে।

মনে হলো তার সমস্ত অহংকার, সমস্ত প্রতাপ, সমস্ত নিষ্ঠুরতা আজ এই এক নারীর সামনে পরাজিত হয়েছে।

সে ব্যথা গিলে নিল। অতঃপর জড়ানো, ভাঙা কণ্ঠে বলল,

“এ কেমন শাস্তি দিচ্ছিস, জান?”

প্রথম বারের মতো শাস্তিতে ভয় পাচ্ছে নির্দয় মাফিয়া। ঠোঁট কাঁপছে তার!

“তোর থাকতে গিয়ে রোজ মরতে হবে আমায়। প্রতিদিন তোর চোখে নিজের অপরাধ দেখব, প্রতিরাতে তোর কান্নার কাছে হেরে যাব!”

সে কষ্টের হাসি হাসল।

“এ তো মৃ’ত্যুর চেয়েও কঠিন শাস্তি, পরাণ।”

ন্যান্সি নিশ্চুপ।আজ তার হৃদয় ক্লেশে পাথর হয়ে গেছে।কান্নাও যেন আর বেরোতে চায় না।

সে দীর্ঘক্ষণ অপলক তাকিয়ে রইল আফরিদের দিকে।

এই মানুষটাকে সে ভালোবেসেছিল।এই মানুষটাই তাকে ভেঙে চুরমার করেছে।

ধীরে ধীরে তার ঠোঁট কাঁপল।

তারপর খুব শান্ত, খুব নিঃস্ব এক কণ্ঠে বলল,

“জানেন, জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি কী?”

আফরিদ মুখ তুলে তাকাল।ন্যান্সির চোখে তখন অশ্রুর সমুদ্র।

“যাকে নিজের পৃথিবী ভেবে আগলে রাখি, একদিন দেখা যায় সে-ই আমাদের সমস্ত পৃথিবীটা ভেঙে দিয়েছে।”

বাতাস হুহু করে বয়ে গেল। সে আবার বলল,

“আপনাকে আমি এতটাই নিজের ভেবেছিলাম যে আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথাও কোনোদিন ভাবিনি।”

তার ঠোঁটে বিষণ্ন এক হাসি ফুটে উঠল।

“অথচ দেখুন,,,

একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

“আমার হয়েও আপনি আর আমার রইলেন না।”

কথাটা বলেই সে চোখ নামিয়ে নিল। আর সেই একটি বাক্য যেন ধারালো তরবারির মতো বিদ্ধ করল আফরিদের সমগ্র অস্তিত্বকে।

আগন্তুক নারীর অস্ত্রে পুনরায় ট্রিগার চাপা পড়তেই অরণ্যের নিস্তব্ধতা চিরে বেরিয়ে এল বিকট গু’লির শব্দ।

চলবে…………।?

(📌আজকের পর্বটায় কার কি মনে হয় গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। আপনাদের মন্তব্যের উপর ভিত্তি করে পরের পর্ব আসবে।)

#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা

[পর্ব ১০০] শেষাংশ

#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম

(🚫 দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয় এবং প্রাপ্তমনস্কদের জন্য উন্মুক্ত)

(🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

আফরিদ এহসান এক কদম অগ্রসর হতেই, ঝড়ের বেগে নি’ক্ষিপ্ত সীসার প্রক্ষিপ্ত গোলা তার বক্ষস্থলে সরাসরি বিদ্ধ হলো। মুহূর্তমাত্রে তার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু যেন বিদ্যুৎপ্রবাহে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। ন্যান্সি স্তম্ভিত মূর্তির ন্যায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার নয়নদ্বয় বিস্ফারিত, শিরায় শিরায় জমাট বেঁধে গেল আতঙ্কের হিমশীতল স্রোত।

পরক্ষণেই আরেকটি গু’লি আরও নিখুঁত, আরও নির্মমভাবে আফরিদের বক্ষমধ্যস্থলে আ’ঘাত হানল।

ঘটনার অভিঘাত এতই তীব্র যে, সে কিছুই উপলব্ধি করার পূর্বেই তার অগ্রসরমান পদযুগল কয়েক কদম পেছনে সরে গেল। ভারসাম্যহীন হয়ে তার দেহ কাঁপতে কাঁপতে পিছনের দিকে হেলে পড়ল।

পায়ের নীচে মাটি যেন সরে গেল। অবলম্বনহীন, অসহায় সেই দেহ মুহূর্তেই পাহাড়চূড়ার সীমা অতিক্রম করে গভীর খাদের দিকে নিপতিত হলো।

নিজেকে রক্ষা করার কোনো অবলম্বনই তার করতলগোচর হলো না।যা ধরে সে প্রাণ রক্ষা করতে পারে। তবুও হাত বাড়ালো কিছু খোঁজে আত্মরক্ষার প্রয়াসে।

অতঃপর এক নিঃশব্দ, নির্মম পতনে আফরিদ এহসান নিমেষের মধ্যে অরণ্যের গহীন অন্ধকার খাদে বিলীন হয়ে গেল।

ন্যান্সির চেতনাজগৎ যেন হঠাৎই স্থবির হয়ে পড়ল। নিঃশ্বাস রুদ্ধ, বক্ষস্থলে অসহ্য চাপ, মস্তিষ্কে ঘন অন্ধকারের বিস্তার।

অশ্রুবিন্দুগুলো টপটপ করে তার নেত্রকোণ থেকে গড়িয়ে পড়তে লাগল নীরব, অথচ তীব্র যন্ত্রণার ভাষায়।

অতঃপর সে হঠাৎই ভেঙে পড়ে বিকট আর্তনাদে চিৎকার করে উঠল,

“আ… আফরিদঈঈঈ!”

অসংযতভাবে ছুটে গেল সে সামনের দিকে। কিন্তু ততক্ষণে সময় তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

খাদের নিচে কেবল দেখা যায় এক মানবদেহের ধূসর পতনচিহ্ন যা ধীরে ধীরে অরণ্যের অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। ভেজা নয়ন থেকে বিচ্ছুরিত অশ্রুকণা বাতাসে স্থগিত হয়ে আছে, রয়েছে বক্ষঃস্থল হতে নিঃসৃত র’ক্তবিন্দু, পরক্ষণেই সেগুলোও হারিয়ে গেল অনন্ত অরণ্যের গভীরে।

ন্যান্সির কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল আফরিদের কণ্ঠস্বর যেন মৃত্যুও তাকে সম্পূর্ণ নীরব করতে পারেনি,

❝তোর আমার আবার দেখা হোক,

প্রণয় ঘটুক,

যেখানে থাকবে না পাপ-পুণ্যের হিসাব,

না থাকবে বিচ্ছেদ নামক কোনো বিবাদ❞

সে ক্ষিপ্ত, উন্মাদ প্রায় অবস্থায় আবারও চিৎকার করে উঠল,

“আফরিদ? আফরিদ,, কোথায় আপনি? উত্তর দিন! কোথায় তুমি?”

অরণ্যের প্রতিটি বৃক্ষ, প্রতিটি শাখা যেন তার আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত করে ফিরিয়ে দিচ্ছে কিন্তু কোনো উত্তর নেই। নিস্তব্ধতা শুধু আরও ভারী হয়ে ওঠে।

পাহাড়ের চূড়ায় এলোমেলো ভঙ্গিতে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে প্রিয় -অপ্রিয় মানুষটিকে খোঁজে চলেছে কন্যা। একেবারে খাদের কিনারায় এসে ধপ করে বসে পড়ল,

ন্যান্সি নিজের চুল আঁকড়ে ধরে উঠে দাঁড়ায়, বুক চেপে ধরে হাঁপাতে থাকে,

“ও আফরিদ কোথায় তুমি? এভাবে আমাকে একা করে চলে যেওনা! আমি একা হয়ে যাবো আফরিদ!”

কন্যার কণ্ঠ ভেঙে যায়, শ্বাসপ্রশ্বাস এলোমেলো হয়ে পড়ে। সে আবারও ছুটে যেতে উদ্যত হয় অরণ্যের গভীর অন্ধকারে যেন সেই পতিত শূন্যতাকে স্পর্শ করতে চায়।

“আফরিদ,, প্লিজ,, সাড়া দাও না। আল্লাহর দোহাই সাড়া দেও!”

হঠাৎই সে নিথর হয়ে মাটিতে বসে পড়ে।ঠিক তখনই তার কর্ণকুহরে স্পর্শ করে এক শীতল, মধুর অথচ ভয়াবহ নারীকণ্ঠ,

“লিটল মাউস?”

ন্যান্সির সমগ্র দেহে শিহরণ বয়ে যায়। ধীরে ধীরে সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। শ্বাস তার কণ্ঠে আটকে যায়, হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে তীব্র হয়ে ওঠে।

“ত,,, তুমি,,,

অরণ্যের অন্ধকার ভেদ করে সে দেখে সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই আগন্তুক নারী, নিঃশব্দ, রহস্যময়, এবং ভয়ংকর স্থিরতায় পরিপূর্ণ।

ন্যান্সির দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। পৃথিবী যেন এক মুহূর্তে ভারসাম্য হারায়। কারণ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অস্তিত্বের স্বরূপ দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে ন্যান্সি স্থির থাকতে পারল না!

**************************

“তারপর কি পোলাডা মই’রা গেছে?”

স্থূলকায় নারীর কর্কশ কণ্ঠস্বর নিস্তব্ধ কক্ষে ধাক্কার মতো আছড়ে পড়ল। শব্দটা যেন দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এলো, ভেতরের অস্থিরতা আরও ঘনীভূত করে তুলল।

সামনে বসা রমণীর চোখদ্বয় এক মুহূর্তে অগ্নিস্ফুলিঙ্গে দীপ্ত হয়ে উঠল। দৃষ্টিতে ছিল অদম্য ক্ষো’ভ, অব্যক্ত যন্ত্রণা আর দীর্ঘদিনের জমে থাকা উন্মা’দনা। সে দাঁতে দাঁত চেপে, কণ্ঠস্বর নীচু অথচ ধারালো করে বলল,

“না,সে ম’রেনি। সে ফিরবে,,,সে বলেছে সে আসবেই।”

এই কথাটুকু যেন পুরো কক্ষে বিদ্রূপের বিস্ফোরণ ঘটাল।

গোল হয়ে বসে থাকা নারীদের দল একযোগে হেসে উঠল সে হাসি ছিল করুণ, বি’কৃত, আর বোধহীন উল্লাসে পূর্ণ। যেন যুক্তি-চিন্তা বহু আগেই নির্বাসিত হয়েছে তাদের মনোজগৎ থেকে।

স্থূলকায় নারী আবারও কটাক্ষ করে বলল,

“হ! তোরে কইছে? পাগলী কোথাকার!”

“পাগলী” এই শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথেই কন্যার ভেতরে যেন বিস্ফোরণ ঘটে গেল। তার কপালের শিরা ফুলে উঠল, চোখদুটি আরও গভীরভাবে জ্বলে উঠল।

সে মুহূর্তে নিজের কব্জিতে বাঁধা লৌহশিকলগুলোর দিকে তাকাল লোহার শীতলতা যেন তার অপমানকে আরও তীব্র করে তুলছে।

ঘরের অন্য প্রান্তে বসা নারীদের কেউ কেউ বিকৃত স্বরে উচ্চারণ করল,

“হা’লার পুত, ম’রছে ভালা হইছে!”

আরেকজন নিস্তেজ হাসিতে যোগ করল,

“আমিও ম’রমু,, ম’রতে নাকি অনেক মজা!”

এই কক্ষে প্রত্যেকেই যেন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন। চিন্তার ধারাবাহিকতা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে বহু আগেই। এখানে যুক্তি নেই, আছে কেবল ভাঙা স্মৃতি, বিভ্রান্ত উচ্চারণ আর অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া।

কিন্তু রমণী আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না।

হঠাৎই সে ঝাঁপিয়ে পড়ল স্থূলকায় নারীর দিকে।

লৌহশিকলবদ্ধ হাতদুটি তবুও ভয়ংকর দৃঢ়তায় উঠে গেল। সে তার গলা চেপে ধরল, কণ্ঠস্বর ফেটে বেরিয়ে এল,

“আমি বলেছি সে ম’রেনি! ম’রেনি সে! কেন বললি সে মরে গেছে?!”

তার কণ্ঠে তখন আর মানুষের স্বাভাবিকতা অবশিষ্ট নেই ছিল কেবল ক্ষ’তবিক্ষ’ত মানসিকতার বিস্ফোরণ।

কক্ষের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। পাগলগারদের এই অন্ধকার জগতে তখন একটিমাত্র সত্য স্পষ্ট এখানে কেউই পুরোপুরি জীবিত নয়, আবার কেউই পুরোপুরি মৃ’তও নয়।

লৌহশিকলবদ্ধ অবস্থাতেও রমণীর আঙুল স্থূলকায় নারীর গলায় আরও শক্ত হয়ে বসে গেল। তার চোখদুটি তখন আর চোখ নয় একটা ভাঙা আগ্নেয়গিরির মতো, যেখানে কেবল বিস্ফোরণের অপেক্ষা।

“আমি বলেছি সে ম’রেনি!”

সে আবারও চিৎকার করল, কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠলেও তাতে ছিল অস্বাভাবিক এক দৃঢ়তা,

“কেন তোমরা বারবার বলো সে ম’রে গেছে?”

স্থূলকায় নারী হাঁপাতে লাগল। মুখ লাল হয়ে উঠেছে, শ্বাস আটকে আসছে। তবুও তার মুখে ভয়ের বদলে ফুটে উঠল উন্মত্ত হাসি। যেন এই কষ্টও তার কাছে কোনো বাস্তবতা নয়, বরং আরেকটা খেলা।

“হ,,, হা,,,

পাগল মহিলা কষ্টে কষ্টে বলল,

“পাগলি, তুইও তো আমাদের মতোই,,,

এই কথাটুকু যেন শেষ স্ফুলিঙ্গ। রমণীর চোখ আরও অন্ধকার হয়ে গেল। তার শিকল বাঁধা হাত কাঁপছে, তবুও সে ছাড়ল না।

কক্ষের অন্য প্রান্তে বসা নারীরা তখনও হেসে চলেছে। কেউ বিড়বিড় করছে, কেউ দেয়ালের দিকে তাকিয়ে অদৃশ্য কিছুর সাথে কথা বলছে। কেউ আবার নিজের হাত চাটছে, যেন বাস্তবতা-অবাস্তবতার পার্থক্য তাদের কাছে বহু আগেই বিলীন।

ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে ধাতব চাবির ঝনঝন শব্দ শোনা গেল।

“টিং,,, টিং,,

এক মুহূর্তেই কক্ষের পরিবেশ বদলে গেল। হাসি থেমে গেল অর্ধেক উচ্চারণে, কেউ চুপ করে গেল, কেউ আবার অকারণে চেঁচিয়ে উঠল।

ভারী লোহার দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল।সাদা কোট পরা দুইজন কর্মী ভেতরে প্রবেশ করল। তাদের হাতে ছিল ইনজেকশন আর ফাইল। একজন শান্ত অথচ শীতল কণ্ঠে বলল,

“রাউন্ড টাইম। সবাই শান্ত থাকবেন।”

এই বাক্য শুনতেই কক্ষের অস্থিরতা আরও বেড়ে গেল। কেউ বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠল, কেউ দেয়ালে মাথা ঠুকতে লাগল, কেউ আবার হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল, যেন আত্মা শরীর ছেড়ে গেছে।

রমণী ধীরে ধীরে স্থূলকায় নারীকে ছেড়ে দিল। তার শিকলবদ্ধ হাত এখনো কাঁপছে।

কর্মীদের একজন এগিয়ে এসে তার দিকে তাকাল। চোখে অভ্যাসের ক্লান্তি।

“তুমি আবার ঝামেলা করেছ?”

কর্মী প্রশ্ন করল।ন্যান্সি কোনো উত্তর দিল না। শুধু দূরে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছে না।

ভেতরের এক কোণে বসে থাকা আরেকজন নারী হঠাৎ ফিসফিস করে বলল,

“সে আসবে!”

তারপর আবার হেসে উঠলো শব্দ করে।

“সে বলছে আসবে,,, আমি জানি আফরিদ আসবে!”

আর সেই হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল কেবিনের সাদা দেয়ালে, যেখানে বাস্তবতা আর বিভ্রমের মাঝে কোনো সীমানা আর অবশিষ্ট নেই।

কন্যার কণ্ঠস্বর কক্ষে ছু’রির মতো ছিঁড়ে গেল কাঁপা, ভাঙা, অথচ অবিশ্বাস্য জোরে চেঁচিয়ে উঠল সে।

“ওরা বলছে আমার আফরিদ ম’রে গেছে! কিন্তু আমি বলছি সে ম’রেনি! তুমি আমার কথা বিশ্বাস করো প্লিজ! তুমি প্লিজ আমাকে এখান থেকে যেতে দাও!”

ন্যান্সির কণ্ঠে তখন আর শুধু কথা ছিল না ছিল এক বিধ্বস্ত আত্মার আ’র্তনাদ, ছিল স্মৃতির বিরুদ্ধে এক অবিরাম যুদ্ধ।

কক্ষের এক কোণে দাঁড়ানো নার্স একবারও তার দিকে ফিরেও তাকাল না। হাতে ফাইল, চোখে অভ্যাসের শীতলতা। যেন এই চিৎকার তার কাছে প্রতিদিনের শব্দমাত্র কোনো ব্যথা নয়, কোনো সত্য নয়।

ন্যান্সির দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল,

“ইনজেকশন রেডি করো।”

এই বাক্য শুনতেই কন্যার শরীর যেন থেমে গেল।

তার চোখদুটি বিস্ফারিত হয়ে গেল। শিরায় শিরায় রক্ত যেন জমাট বেঁধে আসছে।

“না,, না,,,

ন্যান্সি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

“তোমরা শুনছ না কেন? আমি একদম সুস্থ আছি। আমি পাগল নই। আমাকে আমার হাসব্যান্ডের কাছে যেতে দাও। আমি বলছি সে ম’রেনি! “

সে এগিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু শিকলবদ্ধ কব্জি তাকে আটকে দিল। ধাতব শিকল দেয়ালে ঘষা খেয়ে তীক্ষ্ণ শব্দ তুলল, খঁচ্, খঁচ্, অন্য নারীরা তখনো নিজেদের জগতে হারিয়ে গেছে। কেউ হাসছে অকারণে, কেউ দেয়ালে আঙুল দিয়ে অদৃশ্য রেখা আঁকছে, কেউ আবার একই শব্দ বারবার বলছে,

“আমাকে যেতে দাও! আমি এখানে থাকলে পাগল হয়ে যাবো। আমার,,, আমার সবকিছু মনে আছে সব! আমাকে ছাড়ো প্লিজ!”

কন্যার চোখে পানি জমে গেল, কিন্তু সেই পানি পড়ল না যেন ভেতরেই আটকে গেল অপমান আর যন্ত্রণার ভারে।

সে নিচু স্বরে, ভাঙা কণ্ঠে আবার বলল,

“প্লিজ, আমি মিথ্যে বলছি না আমি জানি সে ম’রেনি,,

তবুও কেউ শুনল না। নার্স এবার কাছে এসে দাঁড়াল। তার হাতে ইনজেকশন। কণ্ঠ শান্ত, নির্লিপ্ত,

“শান্ত হও। এটা তোমার জন্যই ভালো।”

এই কথাটা যেন আ’গুনে তেল ঢেলে দিল।

“ভালো?”

কন্যা হঠাৎ হাসল, কিন্তু সেই হাসি ছিল কান্নার চেয়েও ভয়ংকর,

“তোমাদের কাছে ভালো মানে কী? আমাকে ভুলে যাওয়া? আমার সত্যটা কেড়ে নেওয়া? এসব ইনজেকশন দিয়ে আমাকে পাগল বানাতে চাওয়া ভালো?”

ন্যান্সি হঠাৎ শিকল ঝাঁকিয়ে উঠল। দেয়ালে ধাক্কা লাগল তার হাত। ধাতব শব্দে কক্ষ কেঁপে উঠল।

“আমি পাগল না!”

ন্যান্সি চিৎকার করল,

“তোমরা আমাকে পাগল বানাচ্ছ!”

নার্স এক মুহূর্ত থামল। তারপর খুব ধীরে ইনজেকশন এগিয়ে ধরল।

“তুমি এখন বিশ্রাম নেবে।”

এই বাক্য শেষ হতেই কন্যার চোখে আতঙ্ক ভেঙে পড়ল।

“না,, না,, না!”

ন্যান্সি চিৎকার করে উঠল,

“আমাকে ঘুম পাড়িও না! আমি ঘুমালে আমি তাকে ভুলে যাব!”

কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।একজন কর্মী এসে তার কাঁধ চেপে ধরল। আরেকজন শিকল খুলে না, বরং আরও শক্ত করল।ইনজেকশন প্রবেশ করল তার বাহুতে।এক মুহূর্ত।দুই মুহূর্ত।তার শরীরের প্রতিরোধ ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে লাগল।

কণ্ঠস্বর ফিসফিসে হয়ে গেল,

“আমাকে ছাড়ো! আমার আফরিদ ম’রেনি,,,

চোখের পাতা ভারী হয়ে এল।

“আমি,, জানি,,

তার শেষ দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেল, আর সেই ঝাপসার ভেতরও যেন সে একটাই নাম খুঁজছে আফরিদ।শেষবারের মতো তার ঠোঁট নড়ল, খুব নিঃশব্দে

“সে,,, ফিরবে,,

তারপর কক্ষের শব্দ মিলিয়ে গেল।শুধু শিকলের ধাতব ঠাণ্ডা শব্দ থেকে গেল, আর এক অসমাপ্ত ভালোবাসার আ’র্তনাদ যা কেউ শুনতে চাইল না।

*****************************

“শাড়ি আমার একদম পছন্দ নয়!”

“কিন্তু আমার ভীষণ পছন্দ!”

অলস, নিশ্চিন্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করল আফরিদ।

“তোকে শাড়িতে এমন লাগে, যেন রঙিন সন্ধ্যা নিজেই মানুষ হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, পরাণ!”

কথাটুকু কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই ন্যান্সি ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল শয্যার দিকে। বিছানায় আরাম করে হেলান দিয়ে আধশোয়া আফরিদ। এক পা আরেক পায়ের উপর তুলে রেখেছে। দৃষ্টি সম্পূর্ণ নিবদ্ধ মোবাইলের স্ক্রিনে। যেন পৃথিবীর আর কোনো কিছুর প্রতিই তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই।

ন্যান্সি দীর্ঘ, উষ্ণ এক নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। অতঃপর সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,

“আপনি তো আমার দিকে তাকাননি। তাহলে কীভাবে বুঝলেন আমি শাড়ি নিয়ে অসন্তুষ্ট?”

প্রশ্নটি শেষ হতেই আফরিদের ওষ্ঠপ্রান্তে দুষ্টু এক হাসির রেখা ফুটে উঠল। কোনো উত্তর না দিয়ে সে নিজের ডান হাতটি ন্যান্সির দিকে বাড়িয়ে দিল।

ন্যান্সি বিরক্ত মুখে এগিয়ে এসে বিছানায় বসল।

পরক্ষণেই আফরিদ মোবাইলের স্ক্রিনটি তার সামনে ধরতেই কন্যার বিস্ময়ে চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।

“এগুলো…

সে হতভম্ব।শাড়ির আঁচল ঠিক করা থেকে শুরু করে আয়নার সামনে নিজের সঙ্গে লড়াই করা প্রতিটি মুহূর্ত গোপনে ভিডিও করে রেখেছে আফরিদ। শুধু তাই নয়, অজস্র ছবিও তুলে ফেলেছে।

ন্যান্সির গাল মুহূর্তেই রক্তিম আভায় রঞ্জিত হয়ে উঠল। সে লজ্জা আর বিরক্তির মিশেলে আফরিদের বাহুতে হালকা কিল বসিয়ে বলল,

“ফাজিল! নির্লজ্জ একটা মানুষ! না বলে ভিডিও করেন? একদম অসভ্য!”

খিলখিল করে হেসে উঠল আফরিদ। হাসতে হাসতেই কন্যার কোমর জড়িয়ে নিজের বক্ষে টেনে নিল।

ন্যান্সির এলোমেলো কেশরাশিতে মুখ ডুবিয়ে মৃদুস্বরে ফিসফিস করল,

“ওরে আমার লাল টমেটো, জানিস? তোকে শাড়িতে দেখলেই মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য একজায়গায় এসে থেমে গেছে। আফরিদ এহসানের প্রেশার বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য এই শাড়ি যথেষ্ট।”

সে এক মুহূর্ত থেমে ন্যান্সির ঠোঁটে গভীর একটি চুম্বন এঁকে দিল।

“আফরিদ এহসানের হৃদয় যদি কখনো প্রশান্তি খুঁজে পেয়ে থাকে, তবে সেটা এই দৃশ্যেই। তুই শাড়ি পরে যখন আমার সামনে দাঁড়াস, তখন মনে হয় স্বর্গের কোনো হুর ভুল করে পৃথিবীতে নেমে এসেছে।”

ন্যান্সি ঠোঁট ফুলিয়ে প্রতিবাদ করল,

“এত মিথ্যে প্রশংসা করতে আপনার ক্লান্তি লাগে না?”

আফরিদ নীরবে তার থুতনি আঙুলে তুলে নিল।

নীলাভ নয়নদ্বয় গভীরভাবে স্থির হলো ন্যান্সির চোখে।

“এগুলো প্রশংসা নয়, পরাণ এগুলো আমার চোখে দেখা সত্যি। দুনিয়া যদি একদিন তোকে সাধারণও বলে, তবু আমার চোখে তুই সেই নারী যাকে দেখে বারবার প্রেমে পড়া যায়। একই মানুষকে, একই শাড়িতে, হাজারবার নতুন করে ভালোবাসা যায়।”

****************

কল্পনার রঙিন আবরণ হঠাৎই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ভেঙে পড়ল।

আফরিদের হাসি, তার কণ্ঠ, তার স্পর্শ সবকিছু নিমিষেই শূন্যে বিলীন হয়ে গেল। চকিতে উঠে দাঁড়াল ন্যান্সি। পায়ে ভারী লোহার বেড়ি, দুই কব্জিতেও মোটা শিকল। শিকলের ঝনঝন শব্দ তুলে টলমল পায়ে ছুটে এলো সেলের লোহার গরাদের সামনে। উন্মত্ত দৃষ্টিতে চারপাশে তাকাল। না। কোথাও নেই আফরিদ এহসান।

বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই শূন্য হয়ে গেল। হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দন অসহনীয় যন্ত্রণায় মোচড় দিতে লাগল। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল।

চারপাশে সারি সারি অন্ধকার সেল। কোথাও কেউ অকারণে হাসছে, কোথাও কেউ বিড়বিড় করছে, কেউ নিজের মাথায় নিজেই আঘাত করছে। পুরো পরিবেশটাই বিভীষিকাময়, অস্বস্তিকর।

ন্যান্সি মরিয়া হয়ে গরাদ আঁকড়ে ধরল।

“আমাকে বের করো! প্লিজ, আমাকে বের করো! আমি পাগল নই… আমি একদম সুস্থ! নার্স, শুনছেন? আমি সুস্থ!”

বলে উন্মাদের মতো শিকল টানতে শুরু করল।লোহার ভারী বন্ধন তার কব্জিতে নির্মমভাবে কেটে বসছে। প্রতিটি টানে মনে হচ্ছে চামড়া ছিঁড়ে হাড় পর্যন্ত কম্পিত হয়ে উঠছে। তবুও থামল না সে। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে।

অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বারবার চিৎকার করতে লাগল,

“আমাকে ছেড়ে দিন,প্লিজ! আফরিদ এলে আমাকে খুঁজে পাবে না,,,, আমাকে এখানে আটকে রাখবেন না আমাকে যেতে দিন,,,প্লিজ!”

কিন্তু তার আর্তনাদ যেন এই পাগলগারদের স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে গিয়ে নিঃশব্দে মা’রা গেল।

পাশের সেলগুলো থেকে বিকৃত হাসির রোল উঠল।

কেউ থালা-বাটি মেঝেতে আছড়ে বিকট শব্দ করছে।

কেউ আবার দুই হাততালি দিয়ে অকারণে হেসে উঠছে।

কেউ চিৎকার করছে,

“পাগলী! পাগলী! সবাই পাগল!”

মুহূর্তের মধ্যে করিডোর জুড়ে বিকট ধাতব শব্দের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল। ঠন্,ঠন্,ঝনঝন,ঠাস!

শব্দগুলো যেন হাতুড়ির আঘাত হয়ে ন্যান্সির মস্তিষ্কে আছড়ে পড়তে লাগল।

ন্যান্সি দুই হাত দিয়ে কান শক্ত করে চেপে ধরল।

“না… না… থামো!”

মাথার ভেতর যেন অসংখ্য সূচ একসঙ্গে বিদ্ধ হচ্ছে।

দৃষ্টি কাঁপছে। শ্বাসপ্রশ্বাস অগোছালো হয়ে উঠেছে।

“থামো… প্লিজ… আওয়াজ কোরো না… আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে…

কিন্তু কে শোনে কার কথা!উন্মাদদের হাসি আরও বিকৃত হয়ে উঠল।কেউ গরাদে মাথা ঠুকছে।

কেউ সুরবিহীন কণ্ঠে গান ধরেছে। কেউ আবার থালা-বাটি বাজিয়ে উল্লাসে মেতে উঠেছে।শব্দ,শুধু শব্দ অসহ্য, কর্কশ, হৃদয়বিদারক শব্দ।ন্যান্সি আর সহ্য করতে পারল না।

হাঁটু ভেঙে ধপাস করে ঠান্ডা স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে বসে পড়ল।

দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরে কাঁপতে কাঁপতে ডুকরে উঠল,

“বন্ধ করো… প্লিজ… বন্ধ করো… আমি আর পারছি না… কেউ ওদের থামাও… প্লিজ…

তার কান্না, আর্ত’নাদ আর অসহায় মিনতি মিলেমিশে সেই বিভীষিকাময় পাগলাগারদের অন্ধকার করিডোরে নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি হয়ে ঘুরপাক খেতে লাগল।

*****************************

পাগলগারদের দীর্ঘ, স্যাঁতসেঁতে করিডোর জুড়ে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর পার্থ ভূঁইয়া।

তার পেছন পেছন হাঁটছেন হাসপাতালের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক, সিনিয়র নার্স, দু’জন ওয়ার্ডবয় এবং কর্তব্যরত নিরাপত্তারক্ষী।

প্রতিটি সেলের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি রোগীদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করছেন। কোথাও কেউ নিজের সাথেই কথা বলছে, কেউ দেয়ালে মাথা ঠুকছে, কেউ আবার মেঝেতে বসে শূন্যে হাত নাড়ছে।

অবশেষে করিডোরের একেবারে শেষ প্রান্তের লোহার সেলের সামনে এসে থামলেন তিনি।সেলের ভেতর গুটিসুটি মে’রে বসে আছে ন্যান্সি।অগোছালো এলোমেলো চুল।কান্নায় ফুলে ওঠা র’ক্তাভ চোখ।

দুই হাতের কব্জিতে ভারী লোহার শিকল।

সে বিড়বিড় করে একই নাম উচ্চারণ করছে

“আফরিদ… আফরিদ… তুমি আসবে… তুমি বলেছিলে আমাকে একা ফেলে যাবেনা!”

ডক্টর পার্থ ভূঁইয়া কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইলেন।

কোনো প্রশ্ন করলেন না। শুধু রোগিণীর প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, দৃষ্টির ওঠানামা, শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি এবং মানসিক প্রতিক্রিয়া গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করলেন। কয়েক মুহূর্ত পর ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে এলেন।

করিডোরের একপাশে দাঁড়িয়েই হাসপাতালের প্রধান তত্ত্বাবধায়ককে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“মেয়েটার অবস্থা প্রত্যাশার চেয়েও জটিল।”

সিনিয়র নার্স উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

“স্যার,কোনো উন্নতি হচ্ছে না?”

ডক্টর পার্থ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“না। বরং ওর মস্তিষ্ক এখনো সেই নির্দিষ্ট সময়খণ্ডেই বন্দী হয়ে আছে যেখানে ওর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্রমাটা ঘটেছিল।”

নার্সরা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। ডক্টর পার্থ আবার বললেন,

“আপনারা খেয়াল করেছেন? ও বর্তমানকে ঠিকমতো গ্রহণই করতে পারছে না। ওর কাছে অতীতটাই বাস্তব। ও বিশ্বাস করে, যার জন্য অপেক্ষা করছে সে ফিরে আসবে। তাই প্রতিদিন একই কথা বলে, একই মানুষকে খোঁজে।”

একজন ওয়ার্ডবয় ইতস্তত করে বলল,

“স্যার,মুহিদ সাহেব তো বলেছিলেন, উনিই নাকি রাস্তায় গাড়ি দুর্ঘটনার পর মেয়েটাকে উদ্ধার করেছিলেন?””

“ঠিক তাই।”

ডক্টর পার্থ মাথা নাড়লেন।

‘মুহিদ সাহেবের বয়ান অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর মেয়েটির শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি মানসিক অবস্থাও ছিল ভয়াবহ। সে তখনও প্রচণ্ড শকে ছিল। বারবার একই ব্যক্তির নাম নিচ্ছিল, অস্বাভাবিকভাবে কাঁদছিল, নিজের পরিচয় পর্যন্ত সুসংগতভাবে বলতে পারছিল না। সম্ভবত সেই দুর্ঘটনা ও তার আগের ঘটনাগুলো মিলে ওর মস্তিষ্কে গভীর মানসিক আ’ঘাত সৃষ্টি করেছে।”

তিনি কিছুক্ষণ থেমে ফাইলের পাতায় চোখ বুলিয়ে আবার বললেন,

“এটাকে আমরা সাধারণ স্মৃতিভ্রংশ বলি না। এটা গভীর ট্রমাজনিত মানসিক বিচ্ছিন্নতা। মস্তিষ্ক নিজেকে বাঁচানোর জন্য বাস্তবতার একটা অংশকে আটকে রেখেছে। তাই ও বারবার সেই স্মৃতিগুলোর ভেতর ফিরে যাচ্ছে।”

প্রধান তত্ত্বাবধায়ক কপালে ভাঁজ ফেলে প্রশ্ন করলেন,

“স্যার, তাহলে কি ও পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে?”

ডক্টর পার্থ উত্তর দেওয়ার আগে কয়েক সেকেন্ড নীরব রইলেন।

“সম্ভাবনা আছে,তবে সেটা নির্ভর করছে ওর ট্রিগারগুলোর ওপর। যদি আবার কোনো বড় মানসিক ধাক্কা পায়, তাহলে অবস্থা আরও ভয়াবহ হতে পারে। হ্যালুসিনেশন, তীব্র উন্মাদনা, আত্মক্ষতির প্রবণতা সবকিছুর ঝুঁকি রয়েছে।”

কথাগুলো শুনে উপস্থিত সবাই গম্ভীর হয়ে গেল।

ডক্টর পার্থ দৃঢ় কণ্ঠে নির্দেশ দিলেন,

“ওর ওপর চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারি রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই ওকে একা রাখা যাবে না। ধারালো কিংবা আত্মক্ষ’তির উপযোগী কোনো বস্তু ওর নাগালের মধ্যে থাকবে না। রাতে যদি আবার চিৎকার শুরু করে, সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবেন।”

তিনি শেষবারের মতো ন্যান্সির সেলের দিকে তাকালেন।

গরাদের ওপাশে বসে থাকা মেয়েটি তখনও বিড়বিড় করে একই নাম উচ্চারণ করছে,

“আফরিদ… তুমি বলেছিলে… তুমি আসবে… আমি অপেক্ষা করছি..

ডক্টর পার্থ ধীর নিঃশ্বাস ফেললেন। তার বহু বছরের চিকিৎসকজীবনে অসংখ্য মানসিক রোগী দেখেছেন তিনি। কিন্তু এই মেয়েটির চোখে যে অবিরাম অপেক্ষা, যে অবিনশ্বর শোক আর যে ভাঙাচোরা ভালোবাসার অবশেষ জমাট বেঁধে আছে তা তাকে একজন চিকিৎসক হিসেবেও অদ্ভুতভাবে নীরব করে দিল।

*****************************

রজনীর গভীর নিস্তব্ধতা যেন সমগ্র পাগলগারদের বুকে এক অদৃশ্য শোকের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে।

বাইরে অবিরাম বর্ষণ। টুপ,টুপ,টুপ বৃষ্টির ফোঁটাগুলো জানালার লোহার গ্রিলে আছড়ে পড়ে এক বিষণ্ন সুরের জন্ম দিচ্ছে। আকাশের বুক চিরে মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের ক্ষীণ ঝলক ভেসে উঠছে, আবার নিমিষেই গ্রাস করছে অন্ধকার।

সেলের ভেতর ভ্যাপসা গরম। দেয়ালের স্যাঁতসেঁতে গায়ে জলকণা জমে আছে। বাতাস বলতে কিছুই নেই। ঘামে ভিজে একাকার হয়ে গেছে ন্যান্সির এলোমেলো কেশ, কপাল, গলা।তবু আজ তার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

মেঝেতে পড়ে থাকা ছোট্ট একখণ্ড নুড়ি পাথর কুড়িয়ে নিল সে।

ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল দেয়ালের সেই শেষ ফাঁকা অংশটার কাছে। দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল। পুরো দেয়াল জুড়ে প্রিয় পুরুষটির নাম লিখে ভরিয়ে রেখেছে সে।

তারপর কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে অত্যন্ত যত্নে, একেকটি অক্ষর যেন বুকের র’ক্ত দিয়ে আঁকছে এমন নিবিষ্টতায় লিখতে শুরু করল।

“আফরিদ এহসান…”

লেখা শেষ করেও থামল না। আরও নিচে ছোট ছোট অক্ষরে লিখল,

“আমার আয়াশের আব্বু…

লেখাগুলো শেষ হতেই কাঁপতে থাকা আঙুল থেকে নুড়ি পাথরটি খসে পড়ল। টুক,ক্ষীণ শব্দ তুলে গড়িয়ে গেল মেঝের এক কোণে।

ন্যান্সি স্থির দাঁড়িয়ে রইল। চোখের কোণ বেয়ে নীরব অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে কপাল ঠেকিয়ে দিল দেয়ালের সেই নামগুলোর উপর।

মনে হলো, এ যেন নিছক দেয়াল নয় এটাই আফরিদের বুক, যেখানে মাথা রেখে সে একদিন নিশ্চিন্তে চোখ বুজেছিল।

হঠাৎই ডুকরে কেঁদে উঠল সে।

ভাঙা, কাঁপা কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

“আপনি তো বলেছিলেন,আমাকে কোনোদিন একা ফেলে যাবেন না!”

অশ্রু গড়িয়ে পড়ে দেয়ালের গায়ে মিশে গেল।

“মনে নেই আপনার?”

সে দু’হাতে দেয়ালটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

“সেদিন বলেছিলেন,আমি যদি সবাইকে হারিয়েও ফেলি, তবু আপনি আমার হাত ছাড়বেন না! আপনি বলেছিলেন, আমি কাঁদলে আপনি বাঁচবেন না, তাহলে আজ আমি এত কাঁদছি,আপনি কোথায়?”

নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। প্রতিটি শব্দ যেন বুক চিরে বেরিয়ে আসছে।

“দেখুন না,আমি আজও আপনার নাম লিখে রাখি… যদি কোনোদিন ফিরে আসেন যদি ভুলে যান,তাহলে এই দেয়াল আপনাকে মনে করিয়ে দেবে এখানে একটা মেয়ে এখনো আপনার অপেক্ষায় আছে!”

সে কপালটা আরও শক্ত করে ঠেকিয়ে চোখ বুজে ফেলল।

*****************

“ভালোবাসেন?”

“প্রমাণ লাগবে নাকি?”

ন্যান্সি মাথা দোলায়! আফরিদ ওই স্নিগ্ধ ভেজা মুখশ্রী হাতের আঁজলায় তুলে ফিসফিসিয়ে বললো।

“আমি তোকে চেয়েছি মানে পৃথিবীর বাকি সব পুরুষ তোর জন্য নিষিদ্ধ।”

ন্যান্সি নিস্প্রভ চাহনিতে দেখে আফরিদ এহসান কে।

“যদি কখনো মনে হয় তুই আমার ধ্বংসের কারণ হবি তাহলে তোকে নিজের হাতে মে রে ফেলব!”

এযাত্রায় চমকে উঠে ন্যান্সি, বিস্মিত কন্ঠে শুধোয়।

“সত্যি কি তাই? তাহলে আমাকে ছাড়া আপনি বাঁচবেন কিভাবে?”

আফরিদ মুচকি হাসলো, হাসিটা বহাল রেখে বলল।

“এই দুনিয়াটা ভীষণ খারাপ রে অ্যাঞ্জেলিনা। এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় আমি তোকে একা রেখে যাবো না। আমার ধ্বংসের আগে তোকে মে’রে ফেলব, তারপর আমিও ম’রে যাবো। তুই এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় আমি ছাড়া চলতে পারবি না, পদে পদে জানোয়ার গুলো তোকে ছিঁড়ে খাবে। আমি ওতটাও মহান নইরে বান্দি। তোর মতো পবিত্রফুলকে নরকে রেখে পালাবো না।”

*************

ন্যান্সি ডুকড়ে কেঁদে উঠলো, ক্রন্দনরত কন্ঠে বলে উঠে,

“কাপুরুষ একটা, পালিয়ে গেছেন তো আমাকে ছেড়ে! চলে গেলেন এভাবে! কেন গেলেন? আমি কিভাবে এখানে থাকবো? আমার এখানে কষ্ট হচ্ছে? আমাকে নিয়ে যান না!”

বাইরে প্রচণ্ড বজ্রপাত হলো। গুড়ুম গুড়ুম শব্দ হচ্ছে। আকাশ যেন বিদীর্ণ হয়ে উঠল। সেই ভয়ংকর গর্জনের মাঝেই ন্যান্সি দুই হাত তুলে দেয়াল আঁকড়ে ধরল।

“দেখুন, আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে! এই চারটা দেয়াল আমাকে প্রতিদিন একটু একটু করে মে’রে ফেলছে। প্লিজ… আমাকে নিয়ে যান। যেখানে আছেন, সেখানেই নিয়ে যান। আমি আর পারছি না!”

তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত।শ্বাস যেন গলায় আটকে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ করেই ভাঙা কণ্ঠে বিড়বিড় করল,

“এই এক জন্মে আপনার হতে গিয়ে, আপনাকে নিঃশেষে ভালোবাসতে গিয়ে আমার ঠিকানা হয়ে গেল এই উন্মাদদের কারাগার। অথচ আমার নিয়তি তো এমন ছিল না!”

একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ওষ্ঠের কোণে।

“আমার আশ্রয় হওয়ার কথা ছিল আপনার বক্ষের উষ্ণতা আপনার দুই বাহুর নিরাপদ বেষ্টনী!আপনার হৃদস্পন্দনের শব্দ। সেখানে মাথা রেখে বাকি জীবনটা পার করার স্বপ্ন দেখেছিলাম।”

বজ্রের বিকট গর্জন আরেকবার বিদীর্ণ করে দিল নিশীথের নিস্তব্ধ আকাশ।

সেই গর্জনের ভেতরেই ন্যান্সির কণ্ঠ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এল।

ওষ্ঠদ্বয় কাঁপল শেষবারের মতো ভাঙা কণ্ঠে একবার বলল,

“শুনছেন, আফরিদ?”

তার ক্লান্ত দেহটা ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে এল। অশ্রুসিক্ত চোখদুটো আপনাতেই বুজে এলো। মাথাটা এখনো ঠেকানো সেই দেয়ালে যেখানে কাঁপা হাতে লেখা আছে দুটি নাম আফরিদ এহসান।আমার আয়াশের আব্বু।

এ যেন অবসন্ন মস্তিষ্কের এক গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া। ঠিক তখনই কর্ণকুহরে ভেসে উঠল বহুদিন আগের সেই শীতল, ধারালো, অনুভূতিশূন্য কণ্ঠস্বর।

রিসার্চ সেন্টারে সেদিন কাঁদতে কাঁদতে ন্যান্সি প্রশ্ন করেছিল,

“কে,,,কে মে’রেছে আমার আয়াশকে?”

আর আফরিদ স্থির নীল দৃষ্টিতে তাকিয়ে, অদ্ভুত এক রহস্যময় হাসি ঠোঁটে টেনে বলেছিল,

“ওয়েটিং ফর নেক্সট…….

Waiting for next….

(ফেসবুকে এখানেই চূড়ান্ত সমাপ্তি দেওয়া হলো। #অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা এর আর কোনো পর্ব ফেসবুকে আসবে না । তৃতীয় খন্ড আর ফেসবুকে আসবে না।সেটা মলাট আকারে একেবারে বইয়ে আসবে। গল্প এখনো বাকি! এখানে প্রায় ৫০% তুলে ধরা হয়েছে, আরো ৫০% গল্প এখনো বাকি যা সময় নিয়ে আসবে!

জীবনে প্রথমবার আমি এরকম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। এতবছর ধরে আমার লেখালেখির জগতে প্রথমবার এরকম করলাম, অর্ধসমাপ্ত দিলাম।

এতদিন যারা গল্পটির সাথে ছিলেন ,ভালো মন্দ সবকিছু জানিয়েছেন তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ!আর যারা এতদিন ধরে নীরবে গল্প পড়ে গেছেন, কপি করে গেছেন, আমার দিন রাত কল্পনা করা দৃশ্যগুলো কপি করেছেন তাদের জন্য শুভকামনা!এখন দেখব কোথা থেকে গল্প কপি করেন!আর নীরব পাঠকদের জানাই ধন্যবাদ, আমি যতটা আগ্রহ নিয়ে গল্পটি লিখেছিলাম ঠিক ততটাই বিতৃষ্ণা নিয়ে শেষ করে দিলাম!জানি অনেকের এখন ক্ষোভ হবে আমার প্রতি কিন্তু সত্যি বলতে আমার কিছু করার নেই! হাজারবার বলেছিলাম আপনারা রেসপন্স করুন, করুন, করুন কিন্তু শুনেন নি। এখন অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন বই আসবে বলে বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু বিষয়টি এমন নয়। বই দেওয়ার জন্য প্রকাশক অনেক আগেই বলেছিলাম, আপনারা দেখবেন ৩০ থেকে ৪০ পর্বের মধ্যে কোথাও উল্লেখ করেছি প্রকাশক গল্প চাইছে কিন্তু আমি দিতে চাইনা, কারণ আমার পাঠক গল্পটি ভীষণ পছন্দ করেছে।তাই পুরোটা ফেসবুকে দেবো। কিন্তু আমি জানতাম না পাঠকদের আগ্রহ শেষ হয়ে গেছে, গল্পটা অনেকে কাটছাঁট করে টুকে নিচ্ছে অথচ আমার পাঠক প্রতিবাদ করছে না। একশোটি পর্ব দেওয়ার পরেও জানি অনেক রহস্য, অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে, সেটা তৃতীয় খন্ডে দেওয়া হবে।

এখন আসি মূল কথায়। আফরিদ এহসান মরেছে, এই কথাটা আমি বলিনি এখনো।এটা স্যাড এন্ডিং ভেবে মনমতো কাহিনী বানাবেন না। গল্প এখনো বাকি! এখানে প্রায় ৫০% তুলে ধরা হয়েছে, আরো ৫০% গল্প এখনো বাকি যা সময় নিয়ে আসবে! আমি লিখছি তবে ফেসবুকের জন্য নয়। ফেসবুকে দেওয়ায় ইচ্ছে নেই। আমি জানতাম সময়ের সাথে রেসপন্স বাড়ে কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

আমি যেখানে দু’দিন, তিনদিন সময় নিয়ে চার পাঁচ হাজারের পর্ব লিখি। সেখানে আপনাদের দুই লাইনের একটি মন্তব্য এবং একটি রিয়্যাক্ট দিতে কষ্ট হয়। তাহলে আমি কেনো লিখব এতটা সময় ব্যয় করে? তো যারা পড়তে চান তারা বাকিটা বইয়ে পড়ে নিবেন। বইয়ে নতুন নতুন চমৎকার চরিত্র পাবেন,আর কি থাকবে বাকিটা বই পড়লেই বুঝতে পারবেন। এখন যদি আপনারা এটা নিয়ে সমালোচনা করতে চান তাহলে করুন, আমি কিচ্ছু বলবো না।

আমি আবারো বলছি ফেসবুকে কাহিনী ৫০% , এবং আপনাদের কি মনে হয় না আমি এতদিন ধোঁয়াশা?জি ঠিক ভাবছেন, সামনে কি লিখব কল্পলাও করতে পারবেন না!)

❝অর্ধসমাপ্ত❞

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply