Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৫৫


#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_৫৫
বিএফডিসির চার নম্বর ফ্লোরে আজ যেন আগুন জ্বলছে! সেটের চারপাশ লাইট, ক্যামেরা আর ক্রু-দের আনাগোনায় গমগম করছে। আজ ‘প্রেমের শেষ অধ্যায়’ সিনেমার সবচেয়ে বড় ক্লাইম্যাক্স আর রোমান্টিক গানের শুটিং। কিন্তু সেটের মেকআপ রুমের ভেতরে যে সাইক্লোন বইছে, তা বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই! মেকআপ রুমের প্রকাণ্ড আয়নার সামনে বসে রাগে টকটকে লাল হয়ে হাঁপাচ্ছিল দেশের এক নম্বর হট অ্যান্ড গ্ল্যামারাস নায়িকা প্রত্যাশা! তার পরনে লাল রঙের একখানা লহেঙ্গা, কপালে টিকলি, ঠোঁটে টকটকে লাল লিপস্টিক। কিন্তু তার হাতের কাছে থাকা মেকআপের ব্রাশ, পাউডারের কৌটা আর পানির বোতল ইতিমধ্যেই মেঝেতে আছড়ে পড়ে চুরমার হয়ে গেছে!
কারণ আর কিছুই নয় বিয়ের নাটক! মাত্র তিন দিন আগে এই সিনেমারই এক ‘বিয়ের শর্ট’ শুটিং করার বাহানায়, আসল কাজী এনে, আসল কাবিননামায় সই করিয়ে তাকে এক প্রকার ছলনা করে বিয়ে করে নিয়েছে সিনেমার ফাজিল ও অত্যন্ত ধূর্ত ডিরেক্টর মীর আবরিন প্রাণ! প্রত্যাশা ভেবেছিল ওটা হয়তো সিনেমারই স্ক্রিপ্টের অংশ! কিন্তু যখন প্রাণ অত্যন্ত মিষ্টি হেসে কাবিননামার আসল কপিটা তার মুখের সামনে ধরে বলল, “অভিনন্দন ম্যাডাম! আজ থেকে আপনি অফিশিয়ালি মীর প্রাণ হোসেনের আইনি বউ!” তখন থেকে প্রত্যাশার মাথার রক্ত পায়ে উঠে গেছে! মেকআপ রুমের থমথমে পরিবেশ ছারখার করে দিয়ে শিষ বাজাতে বাজাতে ভেতরে ঢুকল ডিরেক্টর মীর প্রাণ হোসেন। পরনে তার ব্ল্যাক কাস্টম-মেড ব্লেজার, গলায় ডিরেক্টরের স্পেশাল আইডি কার্ড ঝোলানো, হাতে কফির কাপ আর ঠোঁটের কোণে সেই অত্যন্ত গা-জ্বালানো, শয়তানি আর চটুল হাসি! প্রাণ কফির কাপে এক চুমুক দিয়ে আয়নায় কান্নাকাটি আর রাগে ফুঁসতে থাকা বউয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী ব্যাপার ম্যাডাম? শট রেডি, আর আপনি এখনো মেকআপ রুমের হাড়ি-পাতিল ভাঙছেন? এসব হাড়ি-পাতিলের বিল কিন্তু আমি আপনার পারিশ্রমিক থেকে কাটব!”
প্রত্যাশা এক ঝটকায় সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার মেকআপ স্পঞ্জটা সোজা প্রাণের মুখ লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারল! প্রাণ খুব কায়দা করে মাথা নিচু করে স্পঞ্জটা এড়িয়ে গেল। “তুমি এক নম্বরের একটা জালি, চিটার, বদমাইশ ডিরেক্টর!” প্রত্যাশা চিৎকার করে উঠল, “তুমি আমাকে ছলনা করে বিয়ে করেছ! ওই বিয়ের শর্ট যে আসল ছিল, তা আমি বুঝব কীভাবে?! আমি এই বিয়ে মানি না! আমি এখনই ডিভোর্স দেব!”
প্রাণ খুব শান্ত ভঙ্গিতে কাছে এগিয়ে এলো। সে দরজায় লক লাগিয়ে দিয়ে, কফির কাপটা টেবিলে রাখল। তারপর এক পা এক পা করে এসে প্রত্যাশাকে সোজা মেকআপ টেবিলের সাথে চেপে ধরল!
“ডিভোর্স? তোমার মায়ে কিডন্যাপের কথা ভুলে গেলে?” প্রাণ তার চেনা মায়াবী আর চটুল গলায় ফিসফিস করল, “যে কাবিননামায় সই করার জন্য আমি একটানা মাস ধরে স্ক্রিপ্ট রি-রাইট করেছি, সেটার ডিভোর্স দেওয়া কি এতই সহজ, আমার রূপসী নায়িকা?”
প্রত্যাশা প্রাণের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল, “তুমি একটা সাইকো! আমাকে পাওয়ার জন্য এত বড় ফাঁদ পাতলে? আমি আজ শুটিংই করব না! দেখি তোমার সিনেমা কীভাবে রিলিজ হয়!”
প্রাণ তার ব্লেজারের পকেট থেকে স্ক্রিপ্টটা বের করে সোফায় ছুঁড়ে মারল। তারপর এক গাল হেসে বলল, “শুটিং তো করতেই হবে, ম্যাডাম! কারণ আজকের শর্টে আপনার কো-স্টার হলো ক্যাসানোভা হিরো শান! আর শর্টটা হলো হিরো আপনাকে জড়িয়ে ধরে ব্যাক-হাগ দেবে আর গালে চুমু আঁকবে!” কথাটা শুনেই প্রত্যাশার মাথায় এক নতুন শয়তানি বুদ্ধি খেলে গেল! সে প্রাণের ওপর শোধ নেওয়ার সেরা সুযোগ পেয়ে গেছে! প্রত্যাশা নিজের রাগী মুখটা এক লহমায় বদলে একদম মিষ্টি আর গ্ল্যামারাস হাসি হেসে বলল, “ওহ তাই নাকি? হিরো তো বেশ হ্যান্ডসাম! আর ওর সাথে রোমান্টিক শট দিতে আমার কোনো আপত্তি নেই! বরং আজ আমি এত ন্যাচারাল এক্সপ্রেশন দেব যে আপনার পুরো এডিটিং প্যানেল কেঁপে উঠবে, ডিরেক্টর সাহেব!”
প্রত্যাশা চট করে ঘর থেকে বের হয়ে সেটে চলে গেল।
প্রাণ সেটে এসে ডিরেক্টরের চেয়ারে বসল। কিন্তু তার চশমার ওপাশ থেকে চোখ দুটো হিংসায় আগুনের গোলার মতো জ্বলে! হিরো গায়ে সুগন্ধি মেখে বেশ শার্টের বোতাম খুলে প্রত্যাশার দিকে এগিয়ে আসছে।
হিরো, প্রত্যাশার কোমরে হাত দিতেই প্রাণ মাইক হাতে চিৎকার করে উঠল, “কাট! কাট! ড্যাম ইট! আহান, তোমার হাত কি প্যারালাইজড?! ওভাবে কোমর ধরে কেউ রোমান্স করে নাকি? আবার টেক!”
দ্বিতীয়বার আহান আবার প্রত্যাশার কানের কাছে মুখ নিতেই প্রাণ আবার চেঁচাল, “কাট! আহান, তোমার এক্সপ্রেশন দেখে মনে হচ্ছে তুমি আলু-পটল বিক্রি করছ! ওভাবে হবে না!”
টানা দশবার ‘কাট’ বলার পর হিরো রেগে গিয়ে বলল, “ডিরেক্টর সাহেব! সমস্যাটা কোথায়? আমি তো ঠিকই করছি!”
প্রাণ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে হিংসা আর চরম ফোর্সেড রোমান্সের ভূত ভর করেছে! সে হিরোর দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল, “তুমি সরো তো! ডুপ্লিকেট মাস্ক নিয়ে আসো! আমি নিজে ডেমো দিয়ে দেখাচ্ছি কীভাবে শর্ট দিতে হয়!”
হিরো তো অবাক! সেটে থাকা সবাই হাঁ হয়ে গেল।
প্রাণ চট করে ফেস মাস্কটা চড়িয়ে সোজা হিরোর জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল। তারপর সবাই কিছু বুঝে ওঠার আগেই, এক জোর জাঁতায় প্রত্যাশাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল!
প্রত্যাশা চমকে উঠে বলল, “প্রাণ?! তুমি কী করছ? সরো!”
“চুপ! ক্যামেরা রোলিং!” প্রাণ ফিসফিস করে প্রত্যাশার কানের লতিতে নিজের তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “অন্য হিরোর সাথে রোমান্স করার শখ হচ্ছিল, না? এবার দেখাই আসল ডিরেক্টরের রোমান্স কাকে বলে!”
প্রাণ কোনো দিক তোয়াক্কা না করে, সেটের শত শত মানুষের সামনেই প্রত্যাশার থুতনি ধরে তার ঠোঁটে এক চরম, ব্যাকুল আর আধিপত্য বিস্তারকারী গভীর চুমু এঁকে দিল! প্রত্যাশার হাত থেকে তোয়ালে খসে পড়ল! সে চোখ বড় বড় করে প্রাণের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। সেটের সবাই তালি দিয়ে উঠল, “অসাম শর্ট! কী ন্যাচারাল কেমিস্ট্রি!”

শর্ট শেষে মাস্ক খুলতেই হিরো শানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, আর প্রত্যাশা লজ্জায় ও রাগে প্রাণকে একটা কিল মেরে মেকআপ রুমের দিকে চম্পট দিল!

সন্ধ্যা নেমেছে বিএফডিসির চত্বরে। শুটিং শেষ হতে না হতেই বাইরে ভিড় জমিয়েছে ডজন ডজন পাপারাজ্জি, বিনোদন সাংবাদিক আর ক্যামেরাম্যান।
কোথাও থেকে খবর লিক হয়ে গেছে যে ডিরেক্টর প্রাণ আর নায়িকা প্রত্যাশার নাকি গোপনে কন্টাক্ট ম্যারেজ বা স্ক্যান্ডাল হয়েছে! প্রত্যাশা নিজের গ্ল্যামারাস গাউন বদলে একটা সাধারণ ড্রেস পরে নিজের গাড়ির দিকে এগোচ্ছিল। ঠিক তখনই একদল পাপারাজ্জি আর সাংবাদিক ক্যামেরা আর মাইক নিয়ে তাকে চারিদিক থেকে ছেঁকে ধরল! ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের তীব্র আলোয় প্রত্যাশার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। এক বিশ্রী স্বভাবের পীত সাংবাদিক মাইক একদম প্রত্যাশার মুখের কাছে এনে কটু গলায় প্রশ্ন করল, “প্রত্যাশা ম্যাডাম! খবর রটেছে আপনি নাকি সিনেমার লিড রোল পাওয়ার জন্য ডিরেক্টর প্রাণের সাথে রাত কাটিয়েছেন এবং ছলে-বলে তাকে কন্টাক্ট ম্যারেজ করতে বাধ্য করেছেন? এই স্ক্যান্ডাল নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?”
অন্য এক পাপারাজ্জি তো এক ধাপ এগিয়ে বলে উঠল, “হ্যাঁ! ইন্ডাস্ট্রিতে তো রটনা আছে আপনি নাকি কাজ পাওয়ার জন্য একের পর এক ডিরেক্টরকে ফাঁদে ফেলেন! প্রাণ সাহেব কি আপনার নতুন শিকার?”
কথাগুলো শোনামাত্রই প্রত্যাশার মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ স্ট্রিমিং চলছে, আর সর্বসমক্ষে তার চরিত্র নিয়ে, তার দীর্ঘদিনের ক্যারিয়ার নিয়ে এমন বিষাক্ত আর অপমানজনক কথা বলা হচ্ছে! প্রত্যাশার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে তোতলাতে লাগল, “ন-না… এসব ভুল… আপনারা যা ভাবছেন…”
“উত্তাপ এড়াবেন না ম্যাডাম! উত্তর দিন! টাকার জন্য কি চরিত্র বেচে দিয়েছেন?!” পাপারাজ্জিরা আরও চেপে ধরল।
প্রত্যাশা ভীতি ও অপমানে কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। তার মনে হলো, আজ তার সব সম্মান ধূলিসাৎ হয়ে গেল! ঠিক তখনই একটি বিকট শব্দে থাপ্পড়ের আওয়াজ পুরো বিএফডিসি চত্বর কাঁপিয়ে দিল! যে পীত সাংবাদিকটি প্রত্যাশাকে ‘চরিত্রহীন’ বলে অপমান করছিল, তার হাতের মাইক উড়ে গিয়ে গিয়ে পড়ল দশ হাত দূরে! সাংবাদিকটি সজোরে থাপ্পড় খেয়ে মাটিতে গিয়ে আছড়ে পড়ল! সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল! ফ্ল্যাশলাইটের আলো থমকে গেল! সামনে দাঁড়িয়ে আছে মীর আরবিন প্রাণ! তার পরনের ব্লেজার খোলা, শার্টের হাতা গোটানো, আর তার চশমা ছাড়া চোখ দুটো থেকে যেন বিষাক্ত রক্ত ঝরছে! প্রাণ এক টানে কান্নাকাটি করতে থাকা প্রত্যাশাকে নিজের পেছনে নিয়ে এলো। নিজের বিশাল শরীর দিয়ে ঢাল বানিয়ে সে প্রত্যাশাকে আগলে দাঁড়াল।
“কার কত বড় সাহস যে আমার স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে বাজে কথা বলে?!” প্রাণের সেই গমগমে গর্জন পুরো বিএফডিসি চত্বর স্তব্ধ করে দিল!
মাটিতে পড়ে থাকা সাংবাদিক তোতলে উঠে বলল, “স-স্ত্রী?! মানে… আপনারা সত্যি বিয়ে করেছেন? নাকি কন্টাক্ট…”
প্রাণ ওই সাংবাদিকের শার্টের কলার ধরে তাকে এক টানে খাড়া করিয়ে দিল! “কন্টাক্ট তোর মাথা!” প্রাণ দাঁতে দাঁত চেপে গরগর করে উঠল, ” শোনুন আপনারা সবাই! ক্যামেরার লেন্স অন রাখুন আর লাইভে রেকর্ড করুন! প্রত্যাশা কোনো কন্টাক্ট ম্যারেজ করেনি, আর না সে কাজ পাওয়ার জন্য কাউকে ফাঁদে ফেলেছে! সে এই দেশের এক নম্বর নায়িকা, আর সে আমার বিবাহিতা স্ত্রী! প্রাণের আইনি বউ!”
আশেপাশের পাপারাজ্জিরা ভয়ে দু’পা পিছিয়ে গেল। প্রাণের ওই বাঘের মতো রূপ তারা আগে কখনো দেখেনি। প্রাণ ক্যামেরাগুলোর দিকে সোজা আঙুল উঁচিয়ে গম্ভীর কিন্তু সুদৃঢ় গলায় হুঁশিয়ারি দিল, “প্রত্যাশা যা অর্জন করেছে, তা তার নিজের যোগ্যতা আর পরিশ্রমে করেছে! আর তাকে পাওয়ার জন্য যদি কোনো ছলনা হয়ে থাকে, তবে সেটা করেছি আমি! আমি মীর প্রাণ হোসেন তাকে পাগলের মতো ভালোবেসে, ফাঁদ পেতে নিজের বউ বানিয়েছি! এরপর যদি কোনো পাপারাজ্জি বা সাংবাদিক আমার স্ত্রীর সম্মান, তার চরিত্র বা তার ক্যারিয়ার নিয়ে একটাও কুৎসিত শব্দ উচ্চারণ করে তবে তার ক্যামেরা ভেঙে হাত গুঁড়িয়ে দেব! মিডিয়া ক্যারিয়ার এক মিনিটে শেষ করে দেব!”
প্রাণ আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে, কেঁপে ওঠা প্রত্যাশাকে সোজা নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে, তার কাঁধে হাত রেখে তাকে আগলে নিয়ে গিয়ে নিজের কালো প্রাডো গাড়িতে তুলল। গাড়ির দরজা বন্ধ হতেই পাপারাজ্জির ভিড় পেছনে পড়ে রইল।
গাড়ির পেছনের সিটে বসে তখনও ফুঁপিয়ে কাঁদছিল প্রত্যাশা। তার সারা শরীর এখনো ভয়ে আর অপমানের স্মৃতিতে কাঁপছে। প্রাণ গাড়ির ড্রাইভারকে বাইপাসে গাড়ি চালাতে বলে নিজে পেছনের সিটে এসে বসল। সে কোনো কথা না বলে টিস্যু দিয়ে খুব নমনীয় ভঙ্গিতে প্রত্যাশার চোখের জল আর লিপস্টিক মুছে দিতে লাগল। যে প্রাণ কিছুক্ষণ আগেও ডিরেক্টরের পাওয়ার দেখাচ্ছিল, যে প্রাণ সেট জুড়ে ফাজিলমো আর চটুল হাসিতে ঘর ভরিয়ে রাখত সেই প্রাণের চোখে এখন কেবল স্ত্রীর প্রতি অপার মায়ায় ভরা অনুশোচনা আর গভীর ভালোবাসা! “কষ্ট পেয়ো না, প্রত্যাশা,” প্রাণ নিচু, সুরেল গলায় বলল, “ওদের নোংরা কথার কোনো অস্তিত্ব নেই। আমি থাকতে এই ইন্ডাস্ট্রির কোনো শকুনের সাধ্য নেই তোমার গায়ে একটা আঁচড় কাটে।”
প্রত্যাশা মুখ তুলে প্রাণের দিকে তাকাল। তার ভেজা চোখ দুটো দিয়ে এখনো জল গড়াচ্ছে। কিন্তু আজ সে দেখতে পেল প্রাণের আসল রূপটা! হ্যাঁ, এই লোকটা ছলনা করে তাকে বিয়ে করেছে, তাকে খেপায়, সেট জুড়ে ডিরেক্টরি দেখায়, অন্য হিরোর সাথে রোমান্স করলে হিংসায় জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যায়… কিন্তু যখন পুরো পৃথিবী তাকে ‘পাপারাজ্জির বিষাক্ত কামড়ে’ শেষ করে দিতে চেয়েছিল, তখন এই ফাজিল ডিরেক্টর স্বামীটাই বাঘের মতো গর্জে উঠে নিজের বুক দিয়ে তার সম্মান আগলে রেখেছে! নিজের ক্যারিয়ার বা ইমেজের পরোয়া না করে পুরো মিডিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে দিয়েছে, “সে আমার স্ত্রী!”
প্রত্যাশা বুঝতে পারল, সে এতদিন যে রাগ আর অভিমান পুষে রেখেছিল, তা আসলে প্রাণের এই অতল ভালোবাসার সামনে কতই না তুচ্ছ!
“তুমি… তুমি এত খারাপ কেন, প্রাণ?” প্রত্যাশা কেঁদে কেঁদে প্রাণের বুকে নিজের কপাল ঠেকিয়ে দিল, “কেন তুমি আমাকে এত ভালোবাসো? কেন আমার জন্য সবার সাথে যুদ্ধ করতে যাও?”
প্রাণ মৃদু হাসল। সে হাত বাড়িয়ে প্রত্যাশাকে নিজের বুকের সাথে একদম নিবিড় করে জড়িয়ে নিল। তার চুলে মুখ গুঁজে দিয়ে ফিসফিস করল, “কারণ তুমি শুধু আমার সিনেমার নায়িকা নও, প্রত্যাশা… তুমি আমার বাস্তব জীবনের একমাত্র স্ক্রিপ্ট! আর নিজের স্ক্রিপ্টকে বাঁচাতে ডিরেক্টর যেকোনো হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটাতে পারে!”
প্রত্যাশা আর নিজেকে দূরে রাখতে পারল না। সে দু’হাতে প্রাণের গলার চারপাশে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে তার বুকে মুখ লুকাল। এতদিনের জমানো সব রাগ, অভিমান আর ঘৃণা এক নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। গাড়ির কাঁচের বাইরে রাতের শহরের আলো ঝলমল করছে, আর ভেতরের অন্ধকারে ছলনা দিয়ে শুরু হওয়া দুটো মন পরম ভালোবাসার চিরন্তন সুতায় একে অপরের মাঝে বিলীন হয়ে গেল!

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে আজ উপচে পড়া ভিড়। দেশের জনপ্রিয় রক স্টার ও সিঙ্গার ‘রাত’-এর একক কনসার্ট। স্টেডিয়ামজুড়ে হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর হাতে গ্লো-স্টিক, চোখে-মুখে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। ব্যানার-পোস্টারে ছেয়ে গেছে চারপাশ, যেখানে বড় বড় করে লেখা, ‘নাইট অফ উইথ রাত’। স্টেজের পেছনের ভিআইপি গ্রিনরুমে দাঁড়িয়ে ছিল রাত। পরনে তার কালো লেদার জ্যাকেট, জিন্স, আর হাতে তার সিগনেচার গিটার। সাউন্ড চেক করতে করতেই তার মনটা বারবার চঞ্চল হয়ে উঠছিল। কারণ, যাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে সেই দুরন্ত, বেপরোয়া আর একগুঁয়ে মেয়ে সুহানা জাবিন আজ তার কনসার্টে আসার কথা দিয়েও আসেনি। রাত যাকে মনে মনে ভালোবাসে, সেই সুহানা জাবিনকে আজ পর্যন্ত সে নিজের মুখে ভালোবাসার কথা বলতে পারেনি। ভয় হতো, পাছে এই মিষ্টি সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যায়! ওদিকে শহরের উপকণ্ঠে, ৩০০ ফিটের নির্জন হাইওয়েতে তখন চলছে এক ভয়ঙ্কর অবৈধ কার রেসিং! সুহানা জাবিন তার লাল রঙের স্পোর্টস কার নিয়ে একদম সামনের সারিতে। সে অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করে, বেপরোয়া জীবন ভালোবাসে। কিন্তু আজকের প্রতিযোগিতাটা স্বাভাবিক ছিল না। বৃষ্টির পানিতে পিচ্ছিল হয়ে থাকা রাস্তায় তীব্র গতিতে মোড় নিতে গিয়ে সুহানার গাড়ির চাকা স্কিড করল! চোখের পলকে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে তার লাল গাড়িটা হাইওয়ের পাশের আইল্যান্ডে সজোরে ধাক্কা খেয়ে তিনবার উল্টে গিয়ে ধুমড়ে-মুচড়ে রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ল!
ফাঁকা রাস্তায় কেবল স্টিলের চরম সংঘর্ষের বিকট শব্দ আর এক আর্তনাদ প্রতিধ্বনি হয়ে মিলিয়ে গেল।
কনসার্ট শুরু হতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি। অর্গানাইজাররা রাতকে স্টেজে ওঠার জন্য বার বার তাগাদা দিচ্ছে। হাজার হাজার মানুষের চিৎকার আর করতালিতে স্টেডিয়াম তখন কাঁপছে। ঠিক তখনই রাতের ফোনে একটা অজানা নম্বর থেকে কল এলো। রাত ফোনটা কানে তুলতেই অপরপাশ থেকে এক কাঁপা কণ্ঠ ভেসে এলো,
“হ্যালো, রাত ভাই?! সুহানা আপু… সুহানা আপুর গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে! ৩০০ ফিটে কার রেসিংয়ে উনার গাড়ি উল্টে গেছে! প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে, আমরা উনাকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি!”
কথাটা শোনামাত্রই রাতের হাতের গিটারটা হুড়মুড় করে মেঝেতে পড়ে গেল! তার চোখের সামনে যেন অন্ধকার নেমে এলো, পুরো পৃথিবী এক লহমায় থমকে গেল। স্টেডিয়ামের হাজার হাজার মানুষের চিৎকার, আলো, গান সব কিছু যেন অর্থহীন হয়ে গেল তার কাছে।
“রাত ভাই! স্টেজ রেডি, এবার ওঠেন!” অর্গানাইজার এসে চিৎকার করে বলল।
রাত কারো দিকে ফিরেও তাকাল না। সে হাতের গিটার ফেলে দিয়ে গ্রিনরুম থেকে এক টানে বের হয়ে গেল! অর্গানাইজাররা তার পেছনে চিৎকার করে দৌড়ালো, “রাত ভাই, কনসার্ট বাতিল করলে কোটি টাকার ক্ষতি হবে! ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে!”
কিন্তু রাত তখন পাগল হয়ে গেছে। যার জীবনে সুহানাই সব, তার কাছে এই ক্যারিয়ার আর কনসার্টের মূল্য শূন্যের সমান! সে সোজা তার গাড়িতে গিয়ে বসল এবং কোনো কিছুর পরোয়া না করে ফুল স্পিডে গাড়ি চালিয়ে কুর্মিটোলা হাসপাতালের দিকে রওনা দিল।
হাসপাতালে পৌঁছেই রাত সোজা জরুরি বিভাগের দিকে দৌড়াল। ইমার্জেন্সি রুমের বাইরে রক্তে ভেজা সুহানাকে স্ট্রেচারে করে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সুহানার ধবধবে সাদা জামা রক্তে ভেসে যাচ্ছে, চোখ দুটো আধবোজা। অপারেশন থিয়েটারের লাল বাতিটা জ্বলে উঠল। রাত থিয়েটারের কাঁচের দরজায় মাথা রেখে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। টানা তিন ঘণ্টা চলল জটিল অপারেশন। রাত এক সেকেন্ডের জন্যও সেখান থেকে নড়েনি। তার ধবধবে সাদা শার্টে সুহানার রক্তের দাগ লেগে আছে। সে দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে একমনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিল। যে রাত কখনো কারো সামনে মাথা নোয়ায়নি, সেই রকস্টার আজ এক সাধারণ প্রেমিকের মতো করিডোরে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। অবশেষে রাত সাড়ে এগারোটার দিকে ডাক্তার বাইরে এলেন। চশমাটা খুলে বললেন, “অপারেশন সাকসেসফুল। মাথায় আর হাতে বেশ কিছু সেলাই লেগেছে, তবে আশঙ্কামুক্ত। জ্ঞান ফিরলে আমরা উনাকে কেবিনে শিফট করব।” রাত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার বুকে জমে থাকা পাহাড়সম পাথরটা যেন অবশেষে সরে গেল।

রাত কয়টা কে জানে? নিরিবিলি ভিআইপি কেবিনে সাদা বিছানায় শুয়ে ছিল সুহানা। তার মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতে স্যালাইন আর মনিটরের রুটিন বিপিং সাউন্ড। ডাক্তারদের অনুমতি নিয়ে কেবিনের ভেতরে প্রথম প্রবেশ করল রাত। ধীরে ধীরে হেঁটে সুহানার বেডের পাশে রাখা চেয়ারটাতে গিয়ে বসল রাত। সুহানার স্যালাইন দেওয়া নিস্তেজ হাতটি সে অত্যন্ত যত্নে নিজের দুই হাতের তালুতে তুলে নিল। সুহানার ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া চেহারার দিকে তাকাতেই রাতের চোখের কোণ বেয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। ঠিক তখনই সুহানা আলতো করে চোখ মেলল। ওষুধের প্রভাবে তার চোখের পাতা ভারী হয়ে ছিল। চোখ মেলতেই সে দেখতে পেল তার সামনে বসে আছে দেশের বিখ্যাত গায়ক ‘রাত’। কিন্তু সে তো স্টেজে নেই! তার পরনে নোংরা জামা, চোখে জল, চুলে এলোমেলো ভাব, আর পুরো চেহারায় এক চরম ভীতি ও অনুশোচনার ছাপ!
“র-রাত…?” সুহানা খুব নিচু ও ভাঙা গলায় অস্ফুট শব্দ করল, “তুমি… তুমি এখানে? তোমার তো আজ কনসার্ট ছিল…”
রাত আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে সুহানার হাতটা নিজের গালে শক্ত করে চেপে ধরে বাচ্চার মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠল! “তুমি পাগল সুহানা?!” রাতের গলা কান্নায় বুজে আসছিল, “কে বলেছিল তোমাকে ওই বাজে রেসিংয়ে যেতে?! তোমার যদি আজ কিছু হয়ে যেত… আমি কী নিয়ে বাঁচতাম বলো তো?! তুমি কীভাবে ভাবলে তোমার কনসার্টের চেয়ে আমার কাছে তোমার জীবন বড় নয়?!”
সুহানা হতবাক হয়ে রাতের দিকে তাকিয়ে রইল। রাতের চোখে এত জল সে কখনো দেখেনি। রাত সুহানার খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এলো। তার চোখের জল সুহানার হাতের তালুতে গিয়ে পড়ছিল। সে সুহানার চোখের দিকে তাকিয়ে একদম সহজ, সরল ও আকুল ভাষায় নিজের মনের জমানো সব কথা উজাড় করে বলতে শুরু করল,
“আমি তোমাকে ভালোবাসি, সুহানা! খুব ভালোবাসি! কোনো গানের লাইনে নয়, কোনো স্টেজ পারফর্ম্যান্সে নয় নিজের পুরো সত্ত্বা দিয়ে তোমাকে ভালোবেসেছি এতদিন! কিন্তু কোনোদিন মুখে বলতে পারিনি, ভয়ে… যদি তুমি আমাকে দূর করে দাও! কিন্তু আজ যখন শুনলাম তুমি আর নেই… আমার মনে হলো আমার চারপাশের আলো সব নিভে গেছে! আমার কোনো গান, কোনো খ্যাতি, কোনো রূপ-টাকা কিচ্ছু চাই না সুহানা… আমার শুধু তোমাকে চাই! প্লিজ, তুমি আমাকে ছেড়ে কখনো কোথাও যাবে না!”
রাতের এই ব্যাকুল, খাঁটি ও নিভে যাওয়া অনুভূতির তীব্রতা সোজা গিয়ে লাগল সুহানার হৃদয়ের একদম গহীন কোণে। সুহানা এতদিন রাতকে একজন ভালো বন্ধু ভাবলেও, আজকের এই ঘটনা আর রাতের চোখের জল তার ভেতরের সব অনুভূতি এক লহমায় বদলে দিল। সে বুঝতে পারল, এই পৃথিবীতে তাকে এত গভীর, এত নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসার মতো মানুষ আর দ্বিতীয়টি নেই! যে মানুষটা নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় কনসার্ট, ক্যারিয়ার আর খ্যাতি এক নিমেষে পায়ে ঠেলে তার জন্য হাসপাতালে ছুটে এসেছে তার ভালোবাসার পরিমাপ কোনো কিছু দিয়ে করা সম্ভব নয়! সুহানার চোখ দিয়েও আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ল। সে কষ্ট করে নিজের হাতটা একটু ওপরে তুলে রাতের ভেজা গাল দুটো আলতো করে স্পর্শ করল। তারপর নিচু মিষ্টি স্বরে বলল, “তুমি এত বোকা কেন রাত? এত ভালোবাসো আমাকে… অথচ একটা বারও বলোনি?”
সুহানা নিজের অন্য হাতটা বাড়িয়ে রাতকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। রাত কোনো দ্বিধা না করে পরম আশ্রয়ে সুহানার বুকের ওপর নিজের মাথাটা সঁপে দিল। সুহানা নিজের হাত দিয়ে রাতকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে আঁকড়ে রাখল। সে রাতের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল অত্যন্ত স্নেহে ও আদরে।
“আমি আর কোথাও যাব না রাত,” সুহানা ফিসফিস করে বলল, “আমার বেপরোয়া মনটা আজ থেকে শুধু তোমার কাছেই বন্দি।”
রাত মুখ তুলে সুহানার দিকে তাকাল। দুটো মন আজ সব দ্বিধা আর দূরত্ব কাটিয়ে একদম মুখোমুখি।
সুহানা আলতো করে রাতের চিবুক ধরে নিজের দিকে টেনে আনল। তারপর পরম ভালোবাসায়, গভীর অনুরাগে রাতের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। সেটি ছিল এক দীর্ঘ, গভীর ও গভীর আবেগে ভরা চুম্বন। যে চুম্বনে ছিল না কোনো তাড়াহুড়ো, ছিল কেবল এতদিন ধরে জমা রাখা ভালোবাসা, বেঁচে ফেরার স্বস্তি আর চিরকালের জন্য একে অপরের হয়ে যাওয়ার নীরব অঙ্গীকার। রাতের চোখের জল আর সুহানার ঠোঁটের উষ্ণতা এক হয়ে মিশে গেল সেই ভালোবাসার পরশে। চুম্বন শেষে সুহানা আবার রাতকে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইল। রাতের সব ভয়, সব কান্না শান্ত হয়ে গেল সুহানার সেই উষ্ণ বুকের মাঝে।

মীর বাড়ির বিশাল ফটক পেরিয়ে আরযানের কালো মার্সিডিজ গাড়িটা গ্যারেজে এসে থামল। শহরের একটি অত্যন্ত গোপনীয় ও জরুরি বিজনেস ডিলের জটিলতা মেটাতে হুট করে রাতে বাইরে যেতে হয়েছিল শানকে। তাই ফিরতে এতটা দেরি হয়ে গেল। সারাদিনের ধকল, ফাইলপত্রের জটিল হিসাব আর মীর ইন্ডাস্ট্রিজের নানা মনস্তাত্ত্বিক চাপ নিয়ে আরযান গাড়ি থেকে নামল। তার পরনে হালকা ছাই রঙের ফরমাল শার্ট, কলারের বোতাম কিছুটা ঢিলে করা, শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। এক হাতে ব্লেজারটা ভাঁজ করে নেওয়া, অন্য হাতে গাড়ির চাবি। গাড়ি থেকে নেমে মীর বাড়ির সুবিশাল উঠানে দাঁড়াতেই আরযানের মনটা কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠল। পুরো মীর বাড়ি নিঝুম শান্ত। সোডিয়াম লাইটের হলদেটে আবছা আলোয় চত্বরের বটগাছ আর নিমগাছের পাতাগুলো নিঃশব্দে কাঁপছে। কিন্তু একটা অদ্ভুত, অস্পষ্ট থমথমে হাওয়া যেন পুরো বাড়ির বাতাসে ভাসছে। এমন নিস্তব্ধতা মীর বাড়িতে সচরাচর থাকে না। আরযান নিজের রুমে যাওয়ার জন্য তিনতলার সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। তার জুতোর মচমচ শব্দটা ফাঁকা করিডোরে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করছে। কিন্তু সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখতেই তার মনে হলো কোথাও যেন কিছু একটা ঠিক নেই! এক অদ্ভুত ছায়াময় অস্বস্তি তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে বারবার ধাক্কা দিতে লাগল। জীবনের হাজারটা জটিল সিদ্ধান্ত যে মানুষটা চোখের পলকে নিয়ে নেয়, যার ঠান্ডা মাথার বুদ্ধির সামনে প্রতিপক্ষ ধূলিসাৎ হয়ে যায় সেই মীর আরযান হোসেনের পা দুটো আজ হঠাৎ করেই ভারী হয়ে এলো। সে সিঁড়ির মাঝে থমকে দাঁড়াল। তার মনের ভেতর হঠাৎ করেই ভেসে উঠল সাঁঝের সেই মায়াবী, ভয়ার্ত চেহারাটি। বিকেলের সেই বৃষ্টির দৃশ্য, রেস্টুরেন্টের বাইরে সাঁঝকে কোলে তুলে গাড়িতে বসানোর মুহূর্ত, আর গাড়ির ভেতর হিটারের উষ্ণ আলোয় সাঁঝের কাঁপা কাঁপা ঘিয়ে রঙের শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে রাখার সেই দৃশ্যটা!
‘সাঁঝ কি ঘুমিয়ে পড়েছে? নাকি এখনো ভয় পেয়ে জেগে আছে?’ নিজের অজান্তেই আরযানের হৃদস্পন্দন কিছুটা দ্রুত হয়ে গেল।
সে আর নিজের রুমে গেল না। মনের ভেতর জ্বলতে থাকা সেই অদৃশ্য চঞ্চলতা আর কৌতুহলের টানে আরযান সোজা ঘুরে ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়াল।
একতলার মূল ড্রয়িংরুমের কাছে আসতেই আরযানের চোখ সামান্য ছোট হয়ে এলো। বাইরে থেকে মনে হচ্ছিল পুরো বাড়ি ঘুমে আচ্ছন্ন, কিন্তু ড্রয়িংরুমের দরজার ফাঁক দিয়ে প্রকাণ্ড ঝাড়বাতির আলো ঠিকরে বের হচ্ছে। আর তার সাথে ভেসে আসছে বড়দের নিচু, অতীব গম্ভীর কণ্ঠস্বরের গুঞ্জন!
আরযান দরজার ভারি কাঠের ফ্রেমটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরের দৃশ্য দেখে আরযানের চোখের তারা স্থির হয়ে গেল! অসময়ের এই শেষ রাতে ড্রয়িংরুমে অলরেডি জটলা পাকিয়ে বসে আছেন মীর বাড়ির সমস্ত মুরুব্বি ও বড়রা! সোফার একদম মাঝে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছেন বুড়ো দাদাজান জহিরুল ইসলাম। তাঁর হাতের সেই বিখ্যাত কাঠের লাঠিটা দু’হাতে আঁকড়ে ধরে আছেন, মুখাবয়ব গাম্ভীর্যে পাথরের মতো শক্ত। তাঁর ডান পাশে বসে আছেন বড় কর্তা আফজাল শাহরিয়ার (আরযানের বাবা) এবং মেজো কর্তা আয়মান হোসেন (সাঁঝের বাবা)। বাম পাশের সোফায় চিন্তিত মুখে বসে আছেন বড় আম্মা নাজিরা ওয়ালেদ এবং মেজো আম্মা সাইরা শেখ। সবার মাঝখানের বিশাল টি-টেবিলে কিছু পুরোনো কাগজপত্র, পারিবারিক দলিল এবং বংশের বিশেষ ফাইল ছড়ানো। পুরো ড্রয়িংরুমের বাতাস যেন ভারী এক গাম্ভীর্যে জমে বরফ হয়ে আছে! আরযান ভেতরে ঢুকতেই সবার কথোপকথন এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল। আরযান অত্যন্ত ধীরপায়ে, নিজের চেনা মেপে মেপে ফেলা পদক্ষেপে ভেতরে হেঁটে এলো। তার চোখে চশমা নেই, কিন্তু দৃষ্টিতে এক প্রকাণ্ড প্রশ্নবোধক চিহ্ন। সে ব্লেজারটা সোফার হাতলে রেখে শান্ত কিন্তু কড়া গলায় বলল, “এত রাতে আপনারা সবাই ড্রয়িংরুমে? কোনো সমস্যা হয়েছে, দাদাজান?”
বড় কর্তা আফজাল শাহরিয়ার সোফায় একটু সোজা হয়ে বসলেন। সে আরযানের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর ও ভারিক্কি গলায় বললেন, “আমরা তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম, আরযান। একটি অত্যন্ত জরুরি ও স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সবাইকে ডাকা হয়েছে। তোমার থাকাটা খুব প্রয়োজন ছিল।”
মেজো কর্তা আয়মান হোসেনও এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরযানের দিকে তাকালেন। তাঁদের চোখের অভিব্যক্তি দেখে আরযানের তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক মুহূর্তের মধ্যে আঁচ করতে পারল এই অঘোষিত সভার কেন্দ্রবিন্দু সাধারণ কোনো বিষয় নয়! বুড়ো দাদাজান লাঠিটা মেঝেকে হালকা টোকা দিয়ে বললেন, “আফজাল, মেয়েটাকে ডেকে আনো। কথা যা হবে, সবার সামনেই হবে। মীর বাড়ির সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ নয়।”
বড় আম্মা নাজিরা ওয়ালেদ উঠে গিয়ে তিনতলার দিকে গেলেন সাঁঝকে ডাকতে। ওদিকে তিনতলার নিজের ঘরে সাঁঝ কিন্তু ঘুমায়নি। সে বিছানায় হাঁটু দুটো বুকের সাথে জড়িয়ে বসেছিল। বিকেলের পর থেকে তার মনের ভেতর যে ঝড় বইছিল, তা শান্ত হয়নি। আরযানের সেই শক্ত স্পর্শ, কোল তুলে নেওয়া আর গাড়ির ভেতরের সেই অধিকারবোধের তোলপাড় সাঁঝকে সারারাত জাগিয়ে রেখেছিল। হঠাৎ দরজায় বড় আম্মার টোকা শুনে সাঁঝ চমকে উঠল। বড় আম্মা ভেতরে ঢুকে নিচু গলায় বললেন, “সাঁঝ, নিচে চল। দাদাজান তোকে নিচে ড্রয়িংরুমে ডাকছেন।”
“ন-নিচে? এত রাতে…?” সাঁঝের গলার স্বর শুকিয়ে গেল।
“হ্যাঁ, জরুরি কথা আছে। সবাই তোর জন্যই অপেক্ষা করছে।”
সাঁঝের বুকের ভেতর যেন প্রকাণ্ড এক আতঙ্কের হাতুড়ি পিটতে শুরু করল! ‘এত রাতে হঠাৎ নিচে ডাকছেন কেন? বিকেল বেলা আরযান ভাইয়া সবার সামনে ওরকম করে হাত ধরেছিলেন… দাদাজান কি তবে রেগে গেছেন? নাকি আমাকে এই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হচ্ছে? নাকি অন্য কোনো বড় ঝামেলা হলো?’
সাঁঝ কাঁপা কাঁপা পায়ে হালকা গোলাপি রঙের ওড়নাটা গায়ে ভালোভাবে পেঁচিয়ে নিয়ে বড় আম্মার পেছনে পেছনে নিচে নামতে লাগল। তার প্রতিটা পদক্ষেপ যেন একশ কেজি ওজনের হয়ে উঠছিল। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছিল। আতঙ্কে তার গাল ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই সাঁঝ দেখল পুরো মীর বাড়ির মুরুব্বিরা সোফায় এক প্রকাণ্ড বিচারকের মতো বসে আছেন! আর তাদের ঠিক একপাশে, দেওয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মীর আরযান শান।” আরযানের চোখ দুটো সাঁঝের ওপর পড়তেই সাঁঝের বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা যেন লাফিয়ে বাইরে চলে আসার উপক্রম হলো! সাঁঝ ভয়ে আর আতঙ্কে চোখ নিচু করে ফেলল। সে কায়দা করে মেজো আম্মা সাইরা শেখের সোফার পেছনে গিয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়াল। সাঁঝের কাঁপতে থাকা হাত দুটো ওড়নার প্রান্ত শক্ত করে চেপে ধরল।
পুরো ড্রয়িংরুমে এক চরম, দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা নেমে এলো। কাঁচের ঘড়ির ‘টিক টিক’ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ সেখানে নেই। সাঁঝ ভয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে অপেক্ষা করছিল কোনো এক কঠিন শাস্তির জন্য। সে ভাবছিল, বুড়ো দাদাজান হয়তো তাকে চরম শাসন করবেন বা অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বলবেন। ঠিক সেই মুহূর্তে, আরযান অত্যন্ত ধীরস্থিরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে নিজের শার্টের কলারটা হাত দিয়ে সামান্য ঠিক করে নিয়ে বুড়ো দাদাজানের দিকে তাকাল। আরযানের মুখে কোনো ভয়ের ছাপ নেই। বুড়ো দাদাজান জহিরুল ইসলাম চশমাটা চোখের ওপর ঠিক করে বসালেন। তিনি হাত বাড়িয়ে টি-টেবিলের ওপর থেকে পারিবারিক ফাইলটা বন্ধ করলেন। তারপর তাঁর সেই জহিরুল ইসলামের মতো গম্ভীর, সুদৃঢ় ও রাজকীয় কণ্ঠে সবার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন।
“কাল বিকেলে এই ড্রয়িংরুমে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, এবং ওই পাখিটা যে কথাগুলো বলে গেছে তাতে পুরো মীর বাড়ির সম্মান আর মর্যাদার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন উঠে দাঁড়িয়েছিল,” দাদাজানের গলা পুরো ঘরে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল।
সাঁঝ ভয়ে আরও শিউরে উঠল। সে ভাবল, ‘এই তো! এবার দাদাজান বকা দেবেন!’
কিন্তু বুড়ো দাদাজান থামলেন না। তিনি সাঁঝ আর আরযানের দিকে একে একে দৃষ্টি ঘোরালেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে হঠাৎই এক অজানা, গম্ভীর অভিজ্ঞতার আলো ফুটে উঠল। “মীর বাড়ির নিয়ম হলো যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা বংশের মর্যাদা রক্ষা করেই নেওয়া হবে,” দাদাজান হাতের লাঠিটা শক্ত করে ধরে গম্ভীর কণ্ঠে যোগ করলেন, “গতকাল থেকে আজকের সমস্ত ঘটনা বিবেচনা করে, পরিবারের বড়দের সবার সাথে আলোচনা করে আমরা একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি…”
আরযান নিঃশব্দে দাদাজানের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটি স্ফটিকের মতো জ্বলজ্বল করছে। আর সাঁঝের হাত দুটো লজ্জায় ও আতঙ্কে ঠকঠক করে কাঁপছে। বুড়ো দাদাজান চশমার ওপাশ দিয়ে আরযান ও সাঁঝের দিকে সোজা তাকিয়ে নিজের হাতের লাঠিটা মেঝেকে সজোরে ঠুকে শেষ রায় ঘোষণা করলেন, “অতি শীগ্রই তোমার আর সাঁঝের বিয়ে!”
সাঁঝ মনে মনে বলে উঠল, “ কী?”
চলবে? See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply