Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৪১


#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ

#ইশরাত_জাহান_জেরিন

#পর্ব_৪১

গুলশানের চেম্বারের কাঁচের ওপাশে তখন ঢাকা শহরের বুকে নেমেছে আষাঢ়ের তুমুল বৃষ্টি। আকাশ ভেঙে জলধারা আছড়ে পড়ছে কাঁচের গায়ে, যার একটানা শব্দে পুরো রুমের চন্দনের সুবাসটা যেন আরও বেশি গাঢ় আর মাদকতাময় হয়ে উঠেছে।

রাজ তার থেরাপি চেয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবনীকে নিজের দুই হাতের শক্ত বাঁধনে টেনে নিল। অবনী এতক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাজের কাঁধের ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু রাজের এই আকস্মিক তীব্র আলিঙ্গনে সে শিউরে উঠল। রাজ নিজের চশমাটা টেবিলের ওপর ছুড়ে ফেলে অবনীর ভেজা গাল দুটো নিজের দুই হাতের তালুতে আগলে ধরল। তার শান্ত চোখ দুটোতে আজ কোনো পেশাদারিত্বের বর্ম নেই। সেখানে কেবল এক মহাসমুদ্রের মতো অবাধ্য, পাগলাটে ভালোবাসা টালমাটাল করছে।

“রাজ … ছাড়ো, কেউ এসে পড়বে।” অবনী বড্ড দুর্বল গলায় বলল। তার বুকের ভেতরটা তখন তীব্র এক সুখে তোলপাড় হচ্ছে। রাজ অবনীর চিবুকটা আর একটু উঁচিয়ে ধরে বুক কাঁপানো গভীর গলায় বলল, “কাকে ছাড়ব অবনী? নিজের বউকে?” রাজ আর অবনীকে কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। বাইরে তখন বৃষ্টির বেগ আরও উগ্র হচ্ছে। আর ঘরের ভেতর রাজ বড্ড ব্যাকুল হয়ে অবনীর রেশমি ঠোঁটদুটোকে নিজের গভীর চুম্বনে টেনে নিল। অবনী এক মূহূর্তে অবশ হয়ে রাজের শার্টের কলারটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল। রাজের এই তীব্র, পাগলের মতো ভালোবাসার ওমে অবনীর ভেতরের সবটুকু জেদ আর অভিমান এক নিমিষে গলে জল হয়ে গেল। সে নিজের চোখ দুটো বুজে রাজের এই তীব্র ভালোবাসার বৃষ্টিতে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল। ঠিক তখনই চেম্বারের ইন্টারকমটা বেজে উঠল। রাজ বড্ড অনিচ্ছাসত্ত্বেও অবনীকে নিজের বুক থেকে সামান্য আলতো করল, তবে তার কোমর থেকে হাত সরাল না। সে একহাতে রিসিভারটা তুলে নিল। ওপাশ থেকে পিএ-র গলা ভেসে এল, “স্যার, মেহমান এসেছেন। মিস অবনীর বাবা নিচে অপেক্ষা করছেন।” কথাটা শোনামাত্রই অবনী এক ঝটকায় রাজের বুক থেকে পিছিয়ে গেল। তার ফর্সা মুখটা ভয়ে এক মূহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “আব্বু এসেছে? রাজ আব্বু যদি জানতে পারে আমাদের বিয়েটা… আমি… আমি বড্ড ভয় পাচ্ছি।”

রাজ নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করে চশমাটা চোখে পরল। সে অবনীর কাঁপতে থাকা হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে বড্ড আশ্বাসের সুরে বলল, “কোনো ভয় নেই অবনী। আজ এই লুকোচুরি শেষ হবে।” মিনিট দশেকের মধ্যে গুলশানের সেই ক্লিনিকের স্পেশাল লাউঞ্জে এসে বসলেন অবনীর বাবা। তাঁর চেহারায় বয়সের ছাপ, চোখে একরাশ ক্লান্তি আর মেয়ের জন্য তীব্র উদ্বেগ। তিনি বড্ড দুশ্চিন্তায় ছিলেন। একটু পরেই সেখানে উপস্থিত হলেন মীর পরিবারের অভিভাবকেরা, বড় আব্বু, সেজো আব্বু, মা আর চাচিরা। ধানমণ্ডির বাড়ি থেকে রাজ নিজেই সবাইকে জরুরি ভিত্তিতে এখানে ডেকে পাঠিয়েছে। লাউঞ্জের থমথমে পরিবেশের মাঝখানে এসে দাঁড়াল রাজ আর অবনী। অবনী তখনো মাথা নিচু করে রাজের পেছনে চোরের মতো দাঁড়িয়ে আছে।

অবনীর বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বড্ড আবেগপ্রবণ গলায় বললেন, “মা অবনী! তুই কেমন আছিস রে মা? ডাক্তার সাহেব… আমার মেয়ের থেরাপি কতদূর এগোল? ও কি সুস্থ হচ্ছে?” রাজ এক কদম সামনে এগিয়ে এল। সে সবার সামনে, অবনীর বাবার একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের চোখের চশমাটা খুলে ডেস্কে রাখল। তারপর জোরালো গলায় বলল, “আসলে কোনো থেরাপি ছিল না, চাচাজান। থেরাপির নাম করে আমি অবনীকে চিরজীবনের জন্য বিয়ে করেছি। ও আমার বিবাহিত স্ত্রী।” রাজের এই একটিমাত্র ডায়ালগে পুরো লাউঞ্জে যেন এক মূহূর্তে বজ্রপাত হলো। বড় মা সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন, মা-চাচিরা নিজেদের মুখের ওপর হাত চেপে ধরলেন। অবনীর বাবা স্তব্ধ হয়ে চেয়ারের হাতলটা শক্ত করে ধরে মেয়ের দিকে তাকালেন।

“রাজ! তুই এ কী বলছিস?” সেজো আব্বু রেগে গিয়ে বললেন, “একজন সাইকোলজিস্ট হয়ে তুই একটা মেয়ের ট্রমার সুযোগ নিয়ে…”

“কোনো সুযোগ আমি নিইনি, আব্বু!” রাজের গলার স্বর এবার বুজে এল। তার সেই পাথুরে চোখে আজ প্রথম নোনা জল টলমল করে উঠল। সে অবনীর বাবার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বড্ড আকুল হয়ে বলল, “চাচাজান, একজন ডাক্তার হিসেবে আমি মানুষের মন পড়তে পারি, কিন্তু অবনীর ক্ষেত্রে আমার সব বিজ্ঞান ভুল হয়ে গিয়েছিল। আমি ওকে কোনো রোগীর চোখে দেখিনি। আমি এই মেয়েকে পাগলের তো ভালোবাসি। আমি ওকে হারাতে চাইনি চাচাজান। আমাকে ক্ষমা করে দিন, কিন্তু অবনী এখন মীর রাজের অর্ধাঙ্গিনী।”

অবনী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক দৌড়ে এসে তার বাবার পায়ের কাছে মেঝের ওপর বসে পড়ল। বাবার হাঁটু দুটো জড়িয়ে ধরে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, “আব্বু… রাজ ভাইয়া কোনো অন্যায় করেনি। আমি… আমিও রাজকে বড্ড বেশি ভালোবাসি। উনার এই শান্ত আশ্রয়ে এসে আমি আমার জীবনের সবটুকু কষ্ট ভুলে গেছি। উনাকে ছাড়া আমি বাঁচব না আব্বু!” মেয়ের এই আকুল আর্তনাদ আর চোখভরা জল দেখে অবনীর বাবার বুকের ভেতরের সবটুকু ক্ষোভ এক মূহূর্তে জল হয়ে গেল। তিনি মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। তিনি মীর রাজের সেই গম্ভীর, ধারালো চোখের ভেতরের তীব্র পাগলাটে ভালোবাসাটা স্পষ্ট দেখতে পেলেন। একজন সাইকোলজিস্ট যখন নিজের সবটুকু গাম্ভীর্য বিসর্জন দিয়ে একটা মেয়ের জন্য এভাবে হাত জোড় করে দাঁড়ায়, তখন সেই ভালোবাসাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা কোনো বাবার থাকে না। অবনীর বাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজকে টেনে তুললেন। তিনি বড্ড ভেজা গলায় বললেন, “আমার মা-হারা মেয়েটাকে আমি বড্ড একা করে ফেলেছিলাম বাবা। আজ বুঝলাম, ওর মনের আসল ডাক্তার আমি ছিলাম না, তুমি ছিলে। আমি তোমাদের এই বিয়ে মেনে নিলাম।” বড় মা এগিয়ে এসে অবনীকে বুক জড়িয়ে নিলেন। সেজো আব্বু রাজের কাঁধে হাত রেখে বড্ড গর্বের সুরে বললেন, “মীর বাড়ির ছেলেরা যাকে একবার ভালোবাসে, তাকে নিজের করে নিতে যেকোনো ফাঁদ পাততে পারে। রাজের এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদটা বড্ড নিখুঁত ছিল।” মা-চাচিরা হাসিমুখে অবনীর কপালে চুমু খেলেন। লাউঞ্জের বাইরে তখনো আষাঢ়ের বৃষ্টি ঝরছিল, কিন্তু মীর বাড়ির এই নিষিদ্ধ প্রেমের খাঁচায় আজ এক নতুন, বৈধ আর ভীষণ ইমোশনাল আশ্রয়ের সূচনা ঘটল।

রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। আষাঢ়ের সেই তুমুল বৃষ্টি তখন কিছুটা কমে এসে ঝিরিঝিরি টিপটিপ রূপ নিয়েছে। বাড়ির গেট-টুগেদার অনুষ্ঠান থেকে সবার আগে নিজের গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে বের হয়ে এসেছে সুহানা। সুহানার পরনে আজ কোনো রেসিং ট্র্যাকের জ্যাকেট বা স্নিকার্স ছিল না। পারিবারিক নিয়মের খাতিরে সে আজ পরেছিল একটা গাঢ় চকোলেট রঙের সিল্কের শাড়ি, স্লিভলেস ব্লাউজ, আর চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়ানো। শাড়ি সামলানো সুহানার মতো একজন প্রফেশনাল কার রেসারের জন্য বড্ড যন্ত্রণাদায়ক। সে গাড়িতে ওঠার আগেই শাড়ির আঁচলটা বড্ড বিরক্ত হয়ে নিজের কাঁধে একটা পিন দিয়ে কোনোমতে আটকে নিল। নিজের কাস্টমাইজড স্পোর্টস কারের স্টিয়ারিং হুইলে হাত রাখতেই সুহানা যেন নিজের চেনা রাজত্বে ফিরে এল। ঢাকা-ময়মনসিংহ হাইওয়ের একবারে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে সে তীব্র গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে দিল। বৃষ্টির ভেজা পিচ ঢালা রাস্তায় টায়ারের সেই চেনা ঘর্ষণের শব্দ সুহানার ভেতরের ক্লান্তি দূর করে দিচ্ছিল। কিন্তু উত্তরা পেরিয়ে এয়ারপোর্ট রোডের একবারে নির্জন, সোডিয়াম লাইটের হলুদ আলোয় ভেজা একটা ফ্লাইওভারের ওপরে উঠতেই সুহানার গাড়ির ইঞ্জিনটা হুট করে একটা অদ্ভুত শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল।

“হোয়াট দ্য হেল!” সুহানা ড্যাশবোর্ডে একটা চাপড় মেরে ব্রেক চাপল। গাড়িটা ফ্লাইওভারের এক কোণে এসে স্থির হলো। সে বারবার ইগনিশন সুইচ অন করার চেষ্টা করল, কিন্তু ইঞ্জিনটা স্টার্ট নেওয়ার কোনো লক্ষণই দেখাল না। সুহানা বড্ড বিরক্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে এল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটা তার ফর্সা মুখে এসে আছড়ে পড়ছে। সে শাড়ির কুচিটা একহাতে সামান্য উঁচিয়ে ধরে গাড়ির বনেটের লকটা খুলে ওপরে তুলল। মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে ভেতরের মেকানিজম দেখার চেষ্টা করছিল সে। পেশাদার রেসার হওয়ায় গাড়ির খুটিনাটি সে ভালোই বোঝে, কিন্তু আজ এই সিল্কের শাড়ি জড়িয়ে, ভারী গয়না পরে ফ্লাইওভারের মাঝরাতে একা একা রেডিয়েটর চেক করা বড্ড কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঠিক তখনই দূর থেকে একটা চেনা, কারের ইঞ্জিনের গর্জন ভেসে এল। হেডলাইটের তীব্র সাদা আলোয় সুহানার চোখ জোড়া এক মূহূর্তে ধাঁধিয়ে গেল। গাড়িটা সুহানার ঠিক পেছনে এসে এক নিখুঁত ব্রেক চেপে থামল। গাড়ির দরজা খুলে যে নেমে এল, তাকে দেখামাত্রই সুহানার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

রাত! মীর পরিবারের সেই ক্রেজি, উদ্ধত রকস্টার সিঙ্গার। রাতের পরনে একটা কালো লেদার জ্যাকেট, ভেতরে সাদা শার্টের ওপরের বোতাম আলগা। তার গলায় একটা রুপোলি চেইন, আর চুলগুলো বড্ড স্টাইলিশভাবে কপালে ছিটকে আছে। রাত কনসার্ট শেষ করে একটু দেরিতে আজ বাড়িতে ফিরছিল। সে গাড়ি থেকে নেমে নিজের পকেটে দুই হাত গুজে বড্ড চতুর, বাঁকা হাসি মুখে ঝুলিয়ে সুহানার দিকে এগিয়ে এল।

“আরে! এটা কে? লেডি ফর্মুলা ওয়ান রেসার? হাইওয়েতে এভাবে শাড়ি পরে বনেট খুলে দাঁড়িয়ে আছেন যে? রেস ট্র্যাকের স্পিড কি আজ এই ভেজা রাস্তায় লক হয়ে গেল?” রাতের গলার সেই খোঁচা সুহানার কান পর্যন্ত পৌঁছাল। সুহানা ফ্ল্যাশলাইটটা রাতের মুখের ওপর তাক করে বড্ড কড়া গলায় বলল, “নিজের চরকায় তেল দাও, রাত। মাঝরাতে হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে তোমার এই সস্তা মিউজিকাল জোকস শোনার একদম মুড নেই আমার। নিজের গাড়ি নিয়ে কেটে পড়ো এখান থেকে।”

রাত একটুও রাগল না, বরং সে আরও এক কদম সুহানার কাছে এগিয়ে এল। সে সুহানার এই রূপটা আজ প্রথম দেখছে। সবসময় ট্র্যাকিং স্যুটে থাকা জেদি মেয়েটা আজ চকোলেট রঙের সিল্কের শাড়িতে বড্ড বেশি অন্যরকম, বড্ড বেশি মোহময়ী দেখাচ্ছে। রাতের চোখ জোড়া এক মূহূর্তের জন্য সুহানার ভেজা কপাল আর খোলা চুলের ওপর আটকে গেল। রাত বড্ড নিস্পৃহ গলায় বলল, “যেতে তো পারতামই। কিন্তু কোনো মেয়ে মাঝরাতে এভাবে একা হাইওয়েতে শাড়ি সামলাবে আর গাড়ি ঠিক করবে, আর আমি পুরুষ হয়ে একা দাঁড়িয়ে তামাশা দেখব তা কি করে হয়? সরো, দেখি কী হয়েছে।” রাত সুহানাকে একপাশে সরিয়ে নিজে বকেটের ভেতর ঝুঁকতে গেল। সুহানা বড্ড রেগে গিয়ে রাতকে বাধা দেওয়ার জন্য হাত বাড়াল, “আমি বলেছি না রাত, আমার গাড়িতে তুমি হাত দেবে না! আমি নিজেই…” কথাটা শেষ করার আগেই সুহানার শাড়ির আঁচলের পিনটা হুট করে খুলে গেল এবং সে ভারসাম্য হারাতে গিয়ে তার ডান হাতের ফর্সা আঙুলটা ইঞ্জিনের একটা ধারালো মেটাল স্পিনারের কোণায় লেগে কেটে গেল।

“আহ্!” সুহানা ব্যথায় একটা মৃদু চিৎকার করে নিজের হাতটা চেপে ধরল। তার ফর্সা আঙুলের ডগা দিয়ে টপটপ করে লাল রক্ত ঝরে পড়তে লাগল। সুহানার সেই ব্যথার শব্দটা শোনামাত্রই রাতের ভেতরের সেই চেনা খ্যাপাটে, ঝগড়ুটে রূপটা এক মূহূর্তে হাওয়া হয়ে গেল। তার চোখের চাউনি বদলে গিয়ে সেখানে ব্যাকুলতা রাজত্ব করে বসল। সে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে সুহানার হাতটা নিজের শক্ত, ফর্সা মুঠোয় টেনে নিল। “উদ্ধত মেয়ে কোথাকার! সবসময় নিজের জেদ দেখাতে গিয়ে নিজের ক্ষতি করা চাই-ই চাই!” রাত কড়া গলায় ধমক দিল। সুহানা ভাবল রাত হয়তো আবার কোনো খোঁচা দেবে, সে নিজের হাতটা টেনে মুক্ত করতে চাইল। “ছাড়ো রাত, আমার কোনো সাহায্যের দরকার নেই।”

“চুপচাপ দাঁড়াও সুহানা! এক একদম অবাধ্যতা করবে না।” রাতের সেই গমগমে কণ্ঠস্বরের আদেশ যেন সুহানাকে এক মূহূর্তে স্তব্ধ করে দিল। রাত বড্ড নিঃশব্দে নিজের লেদার জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা নিখুঁত ফর্সা সুতির রুমাল বের করল। সে সুহানার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তাদের মাঝখানের দূরত্ব তখন এক ইঞ্চিরও কম। রাতের গা থেকে তখনো সেই মঞ্চ কাঁপানো দামী পারফিউম আর পুরুষের জেদি সুবাস আসছিল। রাত বড্ড আলতো করে সুহানার কেটে যাওয়া আঙুলটার ওপর রুমালটা চেপে ধরল, যাতে রক্ত পড়া বন্ধ হয়। তার দীর্ঘ, ফর্সা আঙুলগুলোর স্পর্শ সুহানার চামড়ায় গিয়ে বিঁধল। সুহানা সবসময় রাতকে একজন অহঙ্কারী, ফ্যানদের মাঝে ডুবে থাকা সিঙ্গার হিসেবেই দেখে এসেছে। কিন্তু এত কাছ থেকে, সোডিয়াম লাইটের আবছা হলুদ আলো আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মাঝে রাতের ওই গভীর, নেশাতুর চোখ দুটো আর তার এই নিঃশব্দ কেয়ারিং দেখে সুহানার বুকের ভেতর আজ প্রথমবার এক অদ্ভুত, তীব্র ধড়ফড়ানি শুরু হলো। রেস ট্র্যাকে যার হার্টবিট কখনো ২০০-র ওপরে ওঠে না, আজ রাতের এই সামান্য রুমাল বাঁধার স্পর্শে তার হৃদস্পন্দন যেন এক হাজার সিসির ইঞ্জিনের চেয়েও দ্রুত গতিতে চলতে লাগল। রাত বড্ড মনোযোগ দিয়ে সুহানার আঙুলে রুমালটা বেঁধে দিয়ে তার মুখটা একটু ওপরে তুলল। সুহানার চোখের সেই চেনা জেদি চাউনিটা আজ প্রথম রাতের কাছে বড্ড নরম, বড্ড বেশি কাঁপন ধরা মনে হলো। রাত বুক কাঁপানো গলায় বলল, “রেস ট্র্যাকে তো বড্ড স্পিডে গাড়ি চালিয়ে ঝড় তুলতে পারো সুহানা, কিন্তু নিজের এই ছোট্ট হাতটার খেয়াল রাখতে পারো না কেন? গাড়ি তো ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু এই ফর্সা চামড়ায় একটা দাগ লাগলে যে কার কলিজা পুড়বে, তা কি তোমার ওই অহঙ্কারী মাথায় ঢোকে না?” রাজের এই আচমকা কথায় আর তার চোখের ভেতরের তীব্র লুকানো যত্নটা সুহানার ভেতরের সবটুকু ইগো আর ঝগড়ার বর্মকে এক মূহূর্তে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। সে লজ্জায় আর এক অদ্ভুত মোহে নিজের চোখ দুটো নিচু করে নিল। এতদিনের সেই টম অ্যান্ড জেরি মার্কা সম্পর্কের বরফটা আজ এই ভেজা হাইওয়ের ওপর একটু একটু করে গলতে শুরু করল।

ঢাকা শহরের ব্যস্ততা, পিচঢালা রাজপথের ট্রাফিক আর ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরা রাজনীতির চিরচেনা হিসাব-নিকাশ যেভাবে আপন গতিতে চলেছে, ঠিক সেভাবেই মীর আব্রাজ রোদ আর নৈশির মধ্যকার ঠাণ্ডা যুদ্ধটাও চরম মনস্তাত্ত্বিক খেলায় রূপ নিয়েছে। নৈশি ভেবেছিল ক্লাব ঘরে সবার সামনে আবরাজকে ওই ‘আঁচল ধরা’র খোঁচাটা মেরে সে বুঝি এক দানে কিস্তিমাত করে ফেলেছে। কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল, মীর বাড়ির ছেলেদের অহংকার আর জেদের দেয়ালটা কতটা পাথুরে, বিশেষ করে পুরুষটা যদি হয় মীর আব্রাজ রোদের মতো বেপরোয়া আর চরম ঠোঁটকাটা। এই কদিনে আবরাজ বাইরে তার রাজনৈতিক ব্যস্ততা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, আর ঘরের ভেতর নৈশিকে ডিল করার ক্ষেত্রে তার অবয়বে জড়িয়ে নিয়েছে ধারালো উদাসীনতার বর্ম।

রাত তখন পৌনে বারোটা। লিভিং রুমে সোফায় দু-পা তুলে বসে ল্যাপটপে নিজের পলিটিক্যাল ব্লগের নতুন একটা ড্রাফট চেক করছিল নৈশি। বাইরে তখন জুন মাসের টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে, কাঁচের জানালার ওপাশে সোডিয়াম লাইটের আলো মায়াবী আবহ তৈরি করেছে। ঠিক তখনই মেইন ডোরের অটোমেটিক লকটা খোলার ভারী শব্দ হলো। নৈশি ল্যাপটপ থেকে চোখ সরাল। আব্রাজ ভেতরে ঢুকল। তার পরনের দামী লিনেন শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা, গলার সিল্কের টাইটা সামান্য আলগা হয়ে ঝুলছে, আর চুলগুলো বড্ড উসকোখুসকো। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, আব্রাজের সেই ফর্সা ফেসিয়াল কাটটা এখন কিছুটা ক্লান্ত, চোখ দুটো সামান্য লালচে আর সে লিভিং রুমে পা রাখতেই চারপাশের বাতাসে একটা কড়া স্কচ হুইস্কির উগ্র সুবাস ছড়িয়ে পড়ল। নৈশি ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে নাকের কাছে হাত দিয়ে একটু কুঁচকে তাকাল। সে সোজা হয়ে বসে বড্ড চড়া আর ধারালো গলায় জিজ্ঞেস করল, “এত রাতে কোথা থেকে আসা হচ্ছে, মাননীয় এমপি সাহেব? গা থেকে তো একদম বিলাতী মদের গন্ধ ছুটছে! দেশ ও দশের সেবা কি এখন মদের গ্লাসে ডুবিয়ে করা হচ্ছে?”

আব্রাজ দরজার লকটা লাগিয়ে সোজা নৈশির দিকে এগিয়ে এল। তার মুখে কোনো অপরাধবোধ বা অপ্রস্তুত ভাব তো দূরের কথা, বরং ঠোঁটের কোণে সেই বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল। সে সোফার হাতলে নিজের এক হাত রেখে নৈশির মুখের ওপর খানিকটা ঝুঁকে পড়ল। কড়া পানীয়ের সেই উগ্র তীব্র পুরুষালি তপ্ত নিশ্বাস নৈশির গালে এসে আছড়ে পড়ল।সে তার রিডিং গ্লাসের ওপর দিয়ে ঠোঁটকাটা গলায় বলল,

“ভুল ইনফরমেশন, নেত্রী। আপনার গোয়েন্দা বিভাগ বড্ড দুর্বল। আমি এইমাত্র মসজিদ থেকে এশার নামাজ পড়ে আসছি। এই মীর আব্রাজ রোদ কখনো কোনো খারাপ কাজ করতেই পারে না, সমাজসেবা ছাড়া। সারাদিন পার্লামেন্টে বিরোধী দলের চিল্লাচিল্লি শুনতে শুনতে মাথাটা ধরে গেছিল, তাই একটু চরণামৃত নিয়ে আসলাম। নামাজ পড়ে আসা মানুষের গা থেকে তো এমন সুবাসই ছড়াবে। সত্য বলছি আমার গা শুকে দেখুন, সৌদি আরবের আতরের গন্ধ পাবেন। আমি ভালো মানুষ, নামাজ-কালাম পড়ি তা আপনার চোখে পাপ মনে হলো? ধরে নিলাম পাপ কিন্তু আপনার ওই পবিত্র আঁচলে কি আমার এই সামান্য পাপ মোচনের কোনো ঘরোয়া ব্যবস্থা নেই?”

নৈশি এক ঝটকায় নিজেকে সরিয়ে নিয়ে সোফা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার ফর্সা মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠল। সে বলল, “মিথ্যে বলার একটা সীমা থাকে, রোদ! নামাজ পড়ে আসা কোনো মানুষের শরীর থেকে এমন হুইস্কির গন্ধ বের হয় না। নিজের এই ধড়িবাজ পলিটিশিয়ানের নাটকটা অন্তত ঘরের ভেতর বন্ধ করুন।”

“নাটক তো আপনি ভালো করেন, নৈশি,” আব্রাজ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলতে খুলতে নিজের বেডরুমের দিকে পা বাড়াল। ঘরের ভেতর ঢুকতে ঢুকতে সে পেছন ফিরে বড্ড তাচ্ছিল্যের সাথে ছুড়ে দিল, “বাইরে আমি পলিটিক্স করি কোটি মানুষের সাথে, আর ঘরের ভেতর আপনি পলিটিক্স করেন আমার একার সাথে। হিসাব তো একদম বরাবর। জলদি ঘরে আসেন, তোমার এই বিরোধী দলীয় নেত্রীর ঝাঁঝালো ভাষণ শোনার মতো এনার্জি আজ আমার শরীরে এক ফোঁটাও নেই। আর হে শুনুন এটা বাইরের দেশের আতরের গন্ধ, মূর্খ মানুষ যারা অন্যের পেছনে গুঁতাগুঁতি করতে ব্যস্ত থাকে সারাবেলা ওরা এসবের গুরুত্ব কি করে জানবে?”

মিনিট দশেক পর, আব্রাজ যখন বেডরুমের সাথে থাকা এটাচড ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হলো, তখন তার গায়ের সেই দামী পলিটিক্যাল আর্মার, অর্থাৎ ব্র্যান্ডের শার্ট-প্যান্ট আর চামড়ার বেল্ট একদম উধাও। তার পরনে এখন একটা নীল আর কালো চেকের সাধারণ, আরামদায়ক সুতির লুঙ্গি, যা সে বেশ কায়দা করে কোমরে গুঁজে রেখেছে, আর গায়ে জড়িয়ে আছে একটা সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি। চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মোছার কারণে কপালে লেপ্টে আছে। সোফায় কিংবা পার্লামেন্টে যে পুরুষকে দেখে দেশের বাঘা বাঘা মানুষ সমীহ করে চলে, ঘরের ভেতর সে যে এতখানি ক্যাজুয়াল হতে পারে, তা ভাবলে এখনো নৈশির মাঝে মাঝে ধাক্কা লাগে। আব্রাজ বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে সাইড টেবিল থেকে তার দামী লাইটারটা নিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। নৈশি ঠিক তখনই ঘরে ঢুকল। আবরাজের এই লুঙ্গি পরা অতি সাধারণ রূপ আর বৈপরীত্য দেখে নৈশি রাগবে নাকি খিলখিল করে হেসে উঠবে, তা এক মূহূর্তের জন্য বুঝতে পারল না। সে হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে বেঁধে দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বড্ড কড়া চোখে তাকাল। তারপর ঠোঁট উল্টে টিটকারি মেরে বলল, “বাহ! বাইরে কোটি টাকার মার্সিডিজে ঘুরে বেড়ানো মাননীয় পলিটিশিয়ান, আর ঘরে এসে এই অবস্থা? আপনার নির্বাচনী এলাকার ভোটাররা যদি কোনোদিন জানতে পারত যে পার্লামেন্ট কাঁপানো মীর আব্রাজ রোদ ঘরে এসে এভাবে লুঙ্গি পরে স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে দিয়ে সিগারেট টানে, তবে কসম খেয়ে বলছি, ব্যালট বক্সে ভোট একটাও পড়ত না। সব সম্মান এক নিমেষে ধুলোয় মিশে যেত।” আব্রাজ সিগারেটের ধোঁয়াটা জানালার ওপাশের বৃষ্টির দিকে মন্থর গতিতে ছেড়ে দিয়ে নৈশির দিকে তাকাল। ধোঁয়ার কুয়াশার আড়ালে তার চোখ দুটো বড্ড বেশি ধারালো আর নেশাক্ত দেখাচ্ছিল। সে বিছানা থেকে নেমে বড্ড ধীরপায়ে নৈশির একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। পরনে একটা সাধারণ লুঙ্গি থাকলেও তার সেই চওড়া কাঁধ, ফর্সা সুগঠিত শরীর আর তীব্র পুরুষালি ব্যক্তিত্বের দাপট যেন এক ফোঁটাও কমেনি, বরং আরও বেশি বেপরোয়া লাগছিল। সে নৈশির খুব কাছে এসে দাঁড়াল, এতটাই কাছে যে নৈশি আবরাজের স্যান্ডো গেঞ্জির ওপর থেকে তার হৃদস্পন্দনের গতিটা টের পাচ্ছিল। আব্রাজ এক হাত দিয়ে কোমরের লুঙ্গিটা সামান্য উঁচিয়ে ধরে বড্ড অহংকার আর ঠোঁটকাটা গলায় বলল, “ভোটাররা আমার বাইরের টানটান শৃঙ্খল আর ইস্ত্রি করা শার্ট-প্যান্ট দেখে ভোট দেয় না নেত্রী। আর ঘরের ভেতরের এই অবাধ্য, বেপরোয়া লোকটাকে সামলানোর একচ্ছত্র দায়িত্বটা শুধু তোমার ওই কাজি অফিসের কাগজের দলিলে লেখা আছে। লুঙ্গি হইলো খাঁটি বাঙালির জাতীয় আরামের জিনিস, জায়গা মতো হাওয়া লাগে। আর আরও অনেক সুবিধা। এই ধরুন বউকে আদর করতে গেলে ওইযে জামা-কাপড় খুলতে খুলতেই অর্ধেক সময় শেষ হয়ে যায়। এদিক থেকে লুঙ্গি বড় কাজের। খুলজা ছিমছিম, আর কাম হ জা ছিমছিম। আর পার্লামেন্টের এসি রুমে বসে এই পরম সুখ বুঝার মতো পলিটিক্যাল ব্রেন আপনার এখনো তৈরি হয় নাই। সুতরাং, আমার এই জাতীয় পোশাকে নজর না দিয়ে নিজের চরকায় তেল দেন।”

নৈশি মীর বাড়ির বাকিদের মতো এত সহজে দমে যাওয়ার পাত্রী বা অবলা নারী কোনোদিনই ছিল না। সে নিজে ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা এক শক্ত ধাঁচের মেয়ে, তাই আবরাজের এই পুরুষালি দাপটকে কীভাবে হালকা একটা চাল দিয়ে মাটিতে নামিয়ে আনতে হয়, তা তার খুব ভালো করেই জানা আছে। সে আব্রাজের এত কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও নিজের চোখের পলক একচুলও কাঁপাল না। বরং সে বিছানার পাশে গিয়ে আবরাজের ফেলে রাখা ভেজা তোয়ালেটার দিকে তাকিয়ে বড্ড চতুর একটা হাসি হাসল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে আবরাজের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, “তা নামাজী সাহেব, খুব তো ধর্মের বাণী আউড়ানো হচ্ছিল এতক্ষণ। তা মসজিদ থেকে যে এশার নামাজ পড়ে এলেন, জুতোজোড়া কি বাইরেই খুলে এসেছিলেন? নাকি ওটাও পলিটিক্যাল পাওয়ার দেখিয়ে মসজিদের বারান্দায় সোজা হুজুরের সামনে রেখে এসেছেন? আর হ্যাঁ, মুখ ধুয়ে এসেছেন ভালো কথা, কিন্তু পকেটে থাকা ওই কড়া পানীয়ের বিলের রসিদটা কি জায়নামাজের নিচে লুকিয়ে রেখেছেন?”

আব্রাজ তখন সিগারেটের শেষ লম্বা টানটা বুক ভরে টেনে নিচ্ছিল। নৈশির মুখ থেকে এই আকস্মিক, ধারালো আর চরম টাইমিংয়ের খোঁচাটা শুনতেই সে ধোঁয়াটা ঠিকমতো গিলতে পারল না। ব্যস! ধোঁয়াটা তার শ্বাসনালীতে আটকে গিয়ে মীর আব্রাজ রোদের মতো শক্তপোক্ত পুরুষ এক মূহূর্তে কাশির চোটে একদম নীল হয়ে গেল। “খক খক… উফ!” আব্রাজ সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে কোনোমতে গুঁজে দিয়ে বুক চেপে ধরে কাশতে লাগল। তার সেই ফর্সা মুখটা রাগে, লজ্জায় আর কাশির ধাক্কায় এক নিমেষে জবা ফুলের মতো লাল হয়ে উঠল। পার্লামেন্টের স্পিকারকে থামিয়ে দেওয়া পুরুষ আজ নিজের ঘরে এক মেয়ের সাধারণ একটা কাউন্টার ডায়ালগে বিষম খেয়ে শেষ!

নৈশি তখন নিজের দুই গালে হাত দিয়ে খাটের এক কোণে বসে বড্ড বিজয়ের হাসিতে ফেটে পড়ল। তার চোখের কোণে আনন্দের জল চলে এল। আব্রাজ নিজের কাশিটা কোনোমতে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার ভেতরের মীর বাড়ির সেই অহংকারী পুরুষটা এবার চরম ক্ষ্যাপা বাঘের মতো জেগে উঠল। সে এক কদমে বিছানার কাছে এসে নৈশির চিবুকটা নিজের শক্ত, ফর্সা আঙুলের মুঠোয় বড্ড জোরে চেপে ধরে তাকে নিজের দিকে টেনে উঁচিয়ে ধরল। আবরাজের আঙুলের তপ্ত চাপ নৈশির নরম চামড়ায় গিয়ে বিঁধল। সে তার মুখটা নৈশির মুখের ঠিক দুই ইঞ্চি দূরত্বে এনে বড্ড নিচু, গম্ভীর আর বুক কাঁপানো গলায় বলল,

“হাসি বড্ড বেশি চড়া হয়ে যাচ্ছে না, নেত্রী? মনে রেখবেন, আজ রাতে আপনার কোনো অনাস্থা প্রস্তাব মীর আবরাজের আদালতে পাস হবে না। আমি বিষম খেয়েছি বলে ভেববেন না যে ময়দান ছেড়ে পালিয়েছি। এবার নিজের এই সুন্দর মুখটা বন্ধ করে ভদ্র মেয়ের মতো ঘুমাতে যান, নইলে ওই ল্যাপটপে থাকা ৪কে ভিডিওর মূল ফাইলটা কিন্তু আমি আজ রাতেই ফেসবুক আর ইউটিউবে লাইভ করে দেব। তখন সারা দেশ দেখবে আমাদের বিরোধী দলীয় নেত্রী ঘরের ভেতর তার বরের সাথে কেমন পলিটিক্স করে। কী, আর হাসবে? আর যদি ঘুম না আসে, কাছে আসেন…লুঙ্গি পড়াই আছি, খুলতে আর একশন নিতে সময় লাগবে না।”

নৈশি দাঁতে দাঁত চেপে আবরাজের সেই শক্ত হাতের বাঁধন থেকে নিজের মুখটা এক ঝটকায় সরিয়ে নিল। এই ঠোঁটকাটা, বেপরোয়া পুরুষটাকে কোনো সাধারণ যুক্তি বা তর্ক দিয়ে পুরোপুরি হারানো যে অসম্ভব, তা সে আজ আবার হাড়ে হাড়ে টের পেল। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, আবরাজের এই কড়া শাসন আর তীব্র চোখের চাহনির আড়ালে যে এক মহাসমুদ্রের মতো অধিকারবোধ আর যত্ন লুকিয়ে আছে, তা নৈশির বুকের ভেতর কোথাও একটা অন্যরকম, মিষ্টি কাঁপন তুলে দিয়ে গেল, যা সে মুখে স্বীকার করতে নারাজ।

রাত তখন আড়াইটা। পুরো ধানমণ্ডির মীর বাড়ি তখননিস্তব্ধ অন্ধকারে ডুবে আছে। কেবল বাইরে জুনের শেষভাগের ক্রান্তীয় বৃষ্টিটা কখনো বাড়ছে, কখনো কমছে। বিছানায় শুয়ে সাঁঝ সারা রাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি। বিছানার এক কোণে হাঁটু দুটো বুকের কাছে গুটিয়ে সে ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। তার নিজের ওপরই এখন চরম ঘেন্না হচ্ছিল। সে কেন যে জেলাসির বশে অন্ধ হয়ে ওভাবে চোরের মতো আরযানের পিছু নিতে গেল! আরযান ভাইয়া তো কোনো রাস্তার সাধারণ পুরুষ নয়, সে মীর আরযান শান। যাকে ছোঁয়ার যোগ্যতা এই পৃথিবীর কোনো নারী রাখে না, সে কি না আজ সাঁঝের নিজের বোকামির কারণে তাকে এমন নির্মমভাবে পর করে দিল? সাঁঝ আর বিছানায় টিকে থাকতে পারল না। তার বুকের বাঁ পাশে এক তীব্র খালি অনুভূতি আর অপরাধবোধের ছটফটানি যেন তাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারছিল। সে চোখের জল মুছে, নিজের গায়ের চাদরটা সরিয়ে একটা সাধারণ সুতির হালকা গোলাপি থ্রি-পিস পরে নিল। সে বড্ড মাপা কদমে, চোরের মতো পা টিপে টিপে নিজের ঘর থেকে বের হয়ে এল। করিডোরের সোডিয়াম লাইটের হলুদ আলোয় চারপাশটা কেমন যেন অপার্থিব দেখাচ্ছিল। সাঁঝ বিড়ালের মতো হেঁটে সোজা গিয়ে দাঁড়াল আরযানের ঘরের দরজার সামনে। সে দেখল, দরজাটা পুরোপুরি লাগানো নেই, সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। ভেতর থেকে একটা হালকা নীলচে রিডিং লাইটের আলো করিডোরে এসে পড়েছে। সাঁঝের বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপছে। সে হাত বাড়িয়ে দরজাটা একটু ধাক্কা দিতেই ভেতরের দৃশ্যটা তার চোখে পড়ল, আর দেখা মাত্রই তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। আরযান ঘুমায়নি। সে তার বিছানার ওপর বসে আছে। তবে তার গায়ের সেই ফর্সা সাদা কটন শার্টটা খোলা, সে একদম খালি গায়ে বসে আছে, পরনে শুধু একটা কালো রঙের ক্যাজুয়াল ট্রাউজার। মাঠের তীব্র ফ্লাডলাইটের আলোয় যে চওড়া, সুগঠিত শরীর দেখে হাজারটা মেয়ে চিৎকার করছিল, আজ সেই শরীরের পিঠের দিকে তাকাতেই সাঁঝের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। মালদ্বীপের সেই চওড়া ডিফেন্ডারদের বডি-চেক আর এয়ার ব্যাটে ধাক্কা খাওয়ার কারণে আরযানের ডান কাঁধের নিচে আর পিঠের একটা বড় অংশ জুড়ে কালশিটে লালচে দাগ হয়ে ফুলে আছে। আরযান বড্ড উদাসীনভাবে, নিজের বায়াঁ হাত দিয়ে একটা তুলা আর বরফের টুকরো সেই ক্ষতের ওপর চেপে ধরার চেষ্টা করছে। কিন্তু একা হওয়ায় সে ঠিকমতো পিঠের ওই জায়গায় হাত পৌঁছাতে পারছে না, ব্যথায় প্রতি মূহূর্তে তার সেই তীক্ষ্ণ পাথুরে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে, কপাল বেয়ে দু-এক ফোঁটা ঘাম ঝরে পড়ছে। তার এই কষ্ট দেখে সাঁঝ দরজার বাইরে আর এক সেকেন্ডও নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সব ভয়, সব দূরত্ব ভুলে সে দরজার পর্দা ঠেলে এক প্রকার ঝড়ো গতিতেই ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল।

মেঝের ওপর নূপুরহীন পায়ের আকস্মিক শব্দ হতেই আরযান চট করে চোখ ফিরিয়ে নিল। সাঁঝকে ঘরে ঢুকতে দেখামাত্রই আরযানের চোখের সেই ব্যথার ছটা এক মূহূর্তে উধাও হয়ে সেখানে আবার সেই বরফশীতল গাম্ভীর্যের বর্মটা রাজত্ব করে বসল। সে বসার ভঙ্গিটা সোজা করে নিয়ে বড্ড শীতল চোখে তাকাল। সাঁঝ কোনো কথা না বলে সরাসরি বিছানার পাশে গিয়ে বসল। সে আরযানের কোনো অনুমতির পরোয়া না করে, এক প্রকার জোর করেই আরযানের হাত থেকে সেই বরফ আর তুলার বাটিটা কেড়ে নিল। আরযান চমকে উঠল। তার ফর্সা সুগঠিত শরীরের পেশীগুলো এক মূহূর্তে শক্ত হয়ে গেল। সে নিজের হাতটা সাঁঝের বাঁধন থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বড্ড নিরাসক্ত, যান্ত্রিক গলায় বলল, “আমার ঘরে মাঝরাতে পারমিশন ছাড়া ঢোকার সাহস কোত্থেকে পাস সাঁঝ? আর আমার ক্ষত পরিষ্কার করার জন্য মীর আরযানের কোনো ঘরোয়া দয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের ভুলটা যখন ড্রেসিংরুমেই বুঝতে পেরেছিস, তখন এখানে আর আদিখ্যেতা করার দরকার নাই। নিজের ঘরে যা।” সাঁঝ এবার আরযানের এই অবহেলা দেখে পিছিয়ে গেল না। তার চোখের কোণ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে আরযানের চওড়া পিঠের ওপর গিয়ে পড়ল। সে বড্ড জেদী আর কান্না মেশানো কাঁপা গলায় বলল, “আপনি আমাকে পর করে দিতে পারেন আরযান ভাইয়া, কিন্তু আপনার এই ক্ষতের ওপর মীর আরযানের কোনো একার অধিকার নাই! মাঠে আপনি দেশের জন্য খেলেছেন ভালো কথা, কিন্তু এই শরীরটার ওপর শুধু আপনার একার সিলমোহর মারা নাই। আমি যাব না। আপনি বকুন আর যাই করুন, আমি এই ক্ষত পরিষ্কার না করে এক পা-ও নড়ব না।” সাঁঝের এই অনাহুত জেদের বিপরীতে আরযান আর কোনো বাধা দিল না। সে বড্ড শান্ত, পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে রইল। সাঁঝ বড্ড আদুড়েপনা আর পরম মমতায় তোয়ালেটা বরফ পানিতে ভিজিয়ে আরযানের সেই কালশিটে পড়া ফর্সা পিঠের ওপর আলতো করে ছোঁয়াতে লাগল। ঠাণ্ডা বরফের স্পর্শ লাগতেই আরযানের চওড়া বুকটা একটা দীর্ঘশ্বাসে কেঁপে উঠল। সাঁঝের ফর্সা নরম আঙুলগুলো যখন আরযানের ক্ষতের চারপাশটা পরিষ্কার করছে। সাঁঝ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে মনে মনে বলল, “আপনি সারাজীবন আমাকে এই খাঁচায় বন্দি করে রাখুন আরযান ভাইয়া, কিন্তু এভাবে পর করে দিবেন না।” সাঁঝ যখন বড্ড মনোযোগ দিয়ে আরযানের পিঠের ক্ষতটা পরিষ্কার করছে, আরযান হুট করেই বিছানার সাইড টেবিলের ড্রয়ারটা নিজের এক হাত দিয়ে টান দিয়ে খুলল। সেখান থেকে সে বের করে আনল সেই চেনা, সুপরিচিত তীব্র ঝাঁঝালো *আয়ুর্বেদিক মলমের কৌটাটা। সে কৌটাটা সাঁঝের হাতের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বড্ড যান্ত্রিক আর ঠান্ডা গলায় বলল, “শখ করে যখন মাঝরাতে সেবা করতে এসেছিস, তখন এই কড়া মলমটাই লাগা। তবে আমার পিঠে না, তোর নিজের ওই অবাধ্য কবজিতে!”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই, সাঁঝ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরযান এক ঝটকায় নিজের ডান হাতটা ঘুরিয়ে সাঁঝের সেই হালকা গোলাপি থ্রি-পিসের হাতা ভেদ করে তার নরম, ফর্সা কবজিটা শক্ত আঙুলের মুঠোয় চেপে ধরল। আরযানের হাতের সেই তীব্র তপ্ত পুরুষালি উত্তাপ এক মূহূর্তে সাঁঝের চামড়া ভেদ করে তার মগজে এক তীব্র অপরাধবোধের তড়িৎপ্রবাহ তৈরি করল। সাঁঝ চমকে উঠে বলল, “আরযান ভাইয়া! ছাড়ুন… লাগছে আমার!” কিন্তু আরযানের হাতের মুঠো যেন আরও বেশি শক্ত হয়ে গেল। সে সাঁঝকে নিজের খালি, চওড়া বুকের একদম ইঞ্চি খানেক দূরত্বে এক হ্যাঁচকা টানে নিয়ে এল। আরযানের ঘন, তীব্র নিশ্বাস সাঁঝের ঠোঁটের ওপর এসে আছড়ে পড়ছিল। আরযান তার সেই নেশাতুর, গভীর চোখ জোড়া সাঁঝের চোখের ভেতর ডুবিয়ে দিয়ে বুক কাঁপানো গলায় বলল, “কুকুরের উদাহরণটা বড্ড বেশি গায়ে লেগেছে, না সাঁঝ? তুই ভেবেছিস তুই জেলাস হয়ে চোরের মতো আমার পিছু নিবি, আর মীর আরযান শান তাতেই গলে গিয়ে তোকে ক্ষমা করে দেবে? অবাধ্য রোগীদের নার্ভ সোজা করার দাওয়াই তো তুই নিজেই চেয়েছিলি মনে মনে। ড্রেসিংরুমে খুব তো চিল-চিৎকার করে বলছিলি আপনি শুধু আমার আরযান ভাইয়া! তাহলে এখন আমার এত কাছে এসে তোর চোখের পলক কাঁপছে কেন? পালাচ্ছিস কেন আমার খাঁচা থেকে?” সাঁঝ লজ্জায় আর আরযানের খালি বুকের সেই পুরুষালি সুবাসে একদম কেঁচো হয়ে গেল। তার নিজের হৃদস্পন্দন তখন আর্মি স্টেডিয়ামের ভুভুজেলা বাঁশির চেয়েও দ্রুত গতিতে চলছিল। সে বুঝতে পারল, এই বাউন্সার ক্যাপ্টেন তাকে বড্ড খতরনাক এক জালে জড়াতে যাচ্ছে। সাঁঝকে নিজের বুকের মাঝে একদম অবশ আর বন্দী করে রেখে আরযান তার আসল মাস্টারপ্ল্যানটা এবার টেবিলে নামাল। সে তার বায়াঁ হাত বাড়িয়ে ডেস্কের ওপর রাখা তার দামী আইফোনটা তুলে নিল। ফোনের স্ক্রিনটা অন করে সে সাঁঝের চোখের সামনে ধরল। ফোনের স্ক্রিনে যা দেখা যাচ্ছিল, তা দেখে সাঁঝের ফর্সা মুখটা এক মূহূর্তে কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। ওটা আর কিছু নয় ঢাকা আর্মি স্টেডিয়ামের খেলোয়াড়দের অফিশিয়াল ড্রেসিংরুমের বাইরের করিডোরের হাই-ডেফিনিশন সিসিটিভি ফুটেজ! সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, সাঁঝ কীভাবে দুই হাতে শাড়ির কুচি উঁচিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চোরের মতো আরযানের পিছু নিয়েছে, আর ড্রেসআপ রুমের দরজাটা এক ঝটকায় লাথি মারার মতো করে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকেছে। আরযান ফোনের স্ক্রিনটা লক করে বড্ড গম্ভীর গলায় বলল, “এই ফুটেজটা দেখেছিস সাঁঝ? মাঠে যে নীল ড্রেস পরা মেয়েটা আমার সাথে সেলফি তুলছিল, সে আমাদের ক্লাবের মেইন স্পন্সরের একমাত্র মেয়ে। তুই যেভাবে ড্রেসিংরুমে চোরের মতো ঢুকে হাঙ্গামা করলি, ওটার অফিশিয়াল কমপ্লেন কিন্তু অলরেডি ফেডারেশনে জমা পড়েছে। আর এই সিসিটিভি ফুটেজের মূল কপিটা আমার পিএ-র মাধ্যমে কাল সকাল নয়টায় সোজা আব্বুর ডেস্কে চলে যাবে।” সাঁঝ পুরো হা হয়ে গেল! তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। আরযান একটুও না থেমে বলতে লাগল, আব্বু যখন দেখবে মীর বাড়ির একটা মেয়ে মাঝরাতে প্লেয়ার্স জোনে ঢুকে এমন জঘন্য হাঙ্গামা করেছে, তখন তার সিদ্ধান্ত কী হবে জানিস? তোকে নির্বাসনে পাঠাআে। মীর বাড়ির ইজ্জত বাঁচানোর জন্য আর তোর এই অবাধ্য মনটাকে চিরকালের জন্য সোজা করার জন্য আব্বু কাল সকালেই কাজী ডেকে নিয়ে আসবে। এখন বল সাঁঝ, তুই কি নির্বাসনে গিয়ে সারাজীবন কাঁদবি, নাকি আরযানের ব…..’ সে কথা কামিয়ে দিল। সাঁঝ এবার বুঝতে পারল কত ধানে কত চাল! হঠাৎ আরযান তাকে ছেড়ে দিয়ে বলল, “এখন চোখের সামনে থেকে যাহ….চোখে আর কিছুক্ষণ সাফার করলে আমার ডাস্ট এলার্জি শুরু হয়ে যাবে।”

ঘড়ির কাঁটায় তখন কয়টা বাজে কে জানে? বাইরে বৃষ্টির বেগ এখন আরও উগ্র হয়েছে, জানালার কাঁচ পেরিয়ে একটানা ঝুমঝুম শব্দ লিভিং রুমের নীরবতাকে ভাঙছে। আব্রাজের পেটে তখন মদের কড়া নেশাটা পুরোপুরি কেটে গিয়ে এক তীব্র, রাক্ষুসে ক্ষিদের জন্ম হয়েছে। সারাদিন পলিটিক্যাল মিটিং আর ড্রাইভের ধকলের পর পেটে এক দানা খাবারও পড়েনি। ক্ষিদের চোটে তার পেটের ভেতর যেন এক ঝাঁক ছুঁচো ডলছিল। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে আর টিকতে না পেরে, আব্রাজ এক ঝটকায় কম্বলটা সরিয়ে উঠে বসল। পাশে নৈশি তখন গভীর ঘুমে মগ্ন, তার ফর্সা মুখের ওপর কিছু চুল ছড়ানো। আব্রাজ একটুও দ্বিধা না করে নৈশির কাঁধ ধরে বেশ জোরে একটা ধাক্কা দিল। “এই নেত্রী! উঠুন। জলদি!” তার কড়া গলার আওয়াজে নৈশি চমকে উঠে চোখ রগড়াতে রগড়াতে বসল। সে বড্ড বিরক্ত হয়ে বলল, “কী সমস্যা আপনার? মাঝরাতে ঘুমাতে দেবেন না?”

আব্রাজ নিজের পেটটা এক হাত দিয়ে চেপে ধরে বড্ড ঠোঁটকাটা আর বেপরোয়া গলায় বলল, “পেটে ক্ষিদের চোটে আমার লিভার-কিডনি সব শুকায় যাচ্ছে, আর আপনি এখানে কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাচ্ছেন? জলদি ওঠো, রান্নাঘরে গিয়ে আমার জন্য গরম গরম কিছু একটা বানিয়ে দেন।”

নৈশি বালিশটা বুকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে বলল, “আমি আপনার ঘরের কেনা চাকর নই, আরযান ভাইয়ার মতো সাঁঝকে যেমন মাঝরাতে হুকুম করেন, আমাকে ওসব করতে আসবেন না। আমার ঘুম ভাঙাবেন না, নিজে গিয়ে যা ইচ্ছা করে খান।”

“চাকর কেন হবেন? তুমি আমার লিগ্যাল অর্ধাঙ্গিনী, পলিটিক্যাল পার্টনার,” আব্রাজ নৈশির কম্বলটা এক টানে সরিয়ে দিয়ে বলল, “পার্টনারের পেটে যখন চরম খাদ্য সংকট চলে, তখন আপনার বিবেক দংশন করে না? পলিটিক্সে ইমার্জেন্সি বলে একটা কথা আছে। জলদি চলেন।”

অগত্যা, আবরাজের সেই নাছোড়বান্দা স্বভাবের কাছে হার মেনে নৈশি চোখমুখ কুঁচকে বিছানা থেকে নামল। দুজনে মিলে মাঝরাতে গুলশানের সেই লাক্সারিয়াস রান্নাঘরে এসে হাজির হলো। রান্নাঘরের লাইট জ্বলতেই এক অদ্ভুত মজার দৃশ্যের অবতারণা হলো। দেশের নামী তরুণ পলিটিশিয়ান মীর আব্রাজ রোদ তার পরনের সুতির লুঙ্গিটা এক হাত দিয়ে মালকোঁচা মেরে, স্যান্ডো গেঞ্জিটা সামান্য ওপরে তুলে রান্নাঘরের কাউন্টারে হেলান দিয়ে বড্ড রাজকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়াল। সে হাত নেড়ে নৈশিকে ডিরেকশন দিতে লাগল, “ফ্রিজ খোলেন। ওখানে ডিম আছে, আর বিকেলের কিছু পরোটা থাকার কথা। ডিমটা বড্ড কড়া করে ভাজবেন, পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচ যেন বেশি থাকে।”

নৈশির মাথায় তখন কি যেন একটা এলো। ‘অনেক তো পলিটিক্যাল পাওয়ার দেখানো হয়েছে, এবার কত ধানে কত চাল তা আমিও বুঝিয়ে ছাড়ব!’ সে ফ্রিজ থেকে ডিম বের করে বাটিতে ফাটাল। তারপর আব্রাজ যখন জানালার ওপাশে তাকিয়ে বৃষ্টির দিকে মনোযোগ দিয়েছিল, নৈশি চট করে লবণের কৌটা থেকে বড় চামচ দিয়ে দুই চামচ ভর্তি লবণ আর প্রায় এক মুঠো কুচানো কড়া ঝালের কাঁচা মরিচ সেই ডিমের ব্যাটারের মধ্যে মিশিয়ে দিল। তারপর কড়াইতে তেল দিয়ে ধোঁয়া ওঠা গরম তেলে সেই ডিমটা ছেড়ে দিল। ডিম ভাজার চমৎকার সুবাস চারদিকে ছড়াতেই আব্রাজের ক্ষিদে আরও বেড়ে গেল। নৈশি প্লেটে একটা ঠান্ডা পরোটা আর সেই মারাত্মক ডিম ভাজাটা সাজিয়ে তার সামনে এগিয়ে দিয়ে মুখে একটা অতি নিষ্পাপ হাসি ঝুলিয়ে বলল, “নিন, মাননীয় এমপি সাহেব। আপনার ইমার্জেন্সি ফুড সাপ্লাই রেডি। খেয়ে দেখুন কেমন হয়েছে।”

আব্রাজ কোনো কিছু না ভেবেই বড্ড তৃপ্তি নিয়ে পরোটা দিয়ে এক বিশাল লোকমা ডিম পেঁচিয়ে সোজা মুখের ভেতর পুরে দিল। আর মুখে দেওয়া মাত্রই… ঠিক তিন সেকেন্ডের জন্য পুরো রান্নাঘর স্তব্ধ হয়ে গেল। আব্রাহের চিবানো এক মূহূর্তে বন্ধ হয়ে গেল। তার চোখ দুটো কোটর থেকে যেন বের হয়ে আসার উপক্রম হলো। ডিমের ভেতরের সেই এক দলা লবণ আর তীব্র বোম্বাই মরিচের মতো ঝাল কাঁচা মরিচ এক সাথে তার জিভে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটাল। আব্রাজ এক লাফে কাউন্টার থেকে সরে এসে হাতের প্লেটটা টেবিলে আছাড় মেরে রেখে কাশির চোটে আর ঝালের তীব্রতায় নাচতে লাগল। সে মুখ হা করে বাতাস টানতে টানতে, ফর্সা মুখটা একদম বেগুনী কালার বানিয়ে চিল্লিয়ে উঠল, “উফফ! আআহ! নেত্রী… পানি… পানি দেম! আপনি কি এই খাবারে লবণ আর মরিচ দিয়েছেন নাকি বিরোধী দলের ছিটানো কোনো প্রাণঘাতী রাসায়নিক বিষ মিশাইছেন? জ্যান্ত মেরে ফেলার প্ল্যান নাকি এটা?”

নৈশি হাসতে শুরু করলে আব্রাজ কোনো কথা বলে হুট করে তার দিকে তাকাল। চুপ করে তাকে কিছুক্ষণ দেখে হঠাৎ বাতাসের বেগে উঠে গিয়ে নৈশির কাছে গিয়ে ঝাপটে ধরল তাকে। তারপর বলল, “স্বামী একা কি করে কষ্টের ভাগ নিবে? বউ হিসেবে আপনারও তো এই ভাগ নেওয়া উচিত?” বলেই সে নৈশির হাত দু’টো শক্ত করে ধরে তাকে নিচের বুকের সাথে মিশিয়ে শক্ত চুমু খেল। ঝালে নৈশির দম যায় যায়। কিন্তু যার ছটফটানি যত বেশি আব্রাজের চুমুর তেজ ততবেশি। চুমুর সাথে আব্রাজের অন্য হাতটাও থেমে নেই। সেটা হুট করে নৈশির বুকের কাছে ব্লাউজের অব্দি চলে গেল…..তারপর আর কি? যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়।

চলবে?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply