#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
দুপুরের কড়া রোদ যখন গাছের পাতায় ঝিলিক দিয়ে আলো-ছায়ার খেলা তৈরি করছে, তখন বাড়ির অন্দরমহলেনিস্তব্ধতা। ভারী দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষে বংশের মুরুব্বিরা যখন ড্রয়িংরুমে বসে পলিটিক্স আর জমিজমার তর্কে মগ্ন, আর মীর আরযান যখন ভাবছে সাঁঝ ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে ঠিক তখনই পিলুগ্রামের সীমানার শেষ মাথায় ঘটল এক মহাবিপত্তি। সাঁঝকে বাড়ির কোনো ঘরে, বারান্দায় বা ছাদ কোথাও পাওয়া গেল না। জ্বরের ক্লান্তি ধুয়ে মুছে সাফ করে দিয়ে সে তখন গ্রামের সীমানার ঠিক শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী, বিশাল পুরনো তেঁতুল গাছটার মগডালে আসন গেড়ে বসেছে। ওড়নাটা কোমরে কষে বেঁধেছে সে, যাতে ডালপালা বেয়ে উঠতে কোনো অসুবিধা না হয়। পিঠের ওপর অবাধ্য চুলগুলো আলগা করে ছড়ানো। গাছের ঘন সবুজ পাতার আড়ালে সে নিজেকে এমনভাবে লুকিয়ে ফেলেছে যে, নিচ থেকে তাকালে বোঝার সাধ্য নেই সেখানে কোনো মানবসন্তানের অস্তিত্ব আছে। সাঁঝের বাঁহাতে কাগজের একটা পুড়িয়া, যাতে কড়া করে মেশানো আছে লাল মরিচের গুঁড়ো আর বিট লবণ। আর ডানহাতে কাঁচা-পাকা তেঁতুলের একটা আস্ত ডাল। সে একটা পুষ্ট তেঁতুল ভেঙে লবণের গুঁড়োয় ভালো করে ডুবিয়ে সজোরে এক কামড় দিল। টক, ঝাল আর লবণের তীব্র স্বাদ জিভে লাগতেই তার পুরো শরীর একবার শিউরে উঠল, দুই চোখ বুজে গেল অবলীলায়। মুখের ভেতরের সেই চনমনে স্বাদ উপভোগ করতে করতে সে চোখ-মুখ কুঁচকে ফিসফিস করে বলল,
“উফফ! যা টক! কলিজা পর্যন্ত কেঁপে উঠছে। ওই তিতা ওষুধ গিলতে গিলতে মুখে ঘা হয়ে গিয়েছিল। এবার আসবে আসল মজা। শান সাহেব ভেবেছেন আমাকে ঘরের ভেতর খাঁচায় বন্দী করে রাখবেন? উঁহু, মীর বাড়ির মেয়েকে আটকানো এত সোজা নয়!”
সাঁঝ তেঁতুলের ভেজা বিচিটা মুখের একপাশে জমা করে গাছের ডাল বেয়ে একটু সামনের দিকে এগিয়ে এল। ঠিক এই তেঁতুল গাছটার নিচ দিয়েই মেজো খালার বাড়ির পেছনের পায়ে-হাঁটা সরু রাস্তাটা চলে গেছে। দুপুরে চড়া রোদের কারণে রাস্তাটা একদম জনমানবহীন। কিন্তু প্রকৃতির এই নীরবতা ভেঙে ঠিক তখনই সেই রাস্তা দিয়ে অত্যন্ত ধীর পায়ে, লাঠিতে ভর দিয়ে যাচ্ছিলেন মেজো খালার বাড়ির সবচেয়ে বয়স্ক এবং সম্মানিত মেহমান, মেজো দাদু। ভদ্রলোক অত্যন্ত কড়া মেজাজের মানুষ। গ্রামের সবাই তাকে যমের মতো ভয় পায়। পরনে তার ধবধবে সাদা আড়ংয়ের পাঞ্জাবি, পরগাছা কাটার মতো নিখুঁত করে ছাঁটা সাদা দাড়ি, আর হাতের লাঠিটা তিনি প্রতি পদক্ষেপে মাটিতে ঠুকছেন আভিজাত্যের সাথে। তবে এই পুরো অবয়বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি ছিল তার মাথার ঠিক মাঝখানটা। সেখানে এক চুলও অবশিষ্ট নেই। একটি বিশাল, মসৃণ এবং চকচকে টাক! দুপুরের কড়া রোদ যখন সেই পিচ্ছিল টাকে এসে পড়ল, তখন সেটা রীতিমতো কোনো সোলার প্যানেলের মতো আলো রিফ্লেক্ট করতে শুরু করল। গাছের মগডালে বসা সাঁঝের চোখে তখন এক দুর্ধর্ষ শিকারীর চিল-দৃষ্টি ফুটে উঠল। সে সোজা হয়ে বসে এক হাত দিয়ে গাছের ডালটা শক্ত করে ধরল। তার মনে হলো, এই চকচকে টাকটা যেন কোনো সাধারণ মাথা নয়, বরং তাকে ইশারা করে ডাকছে, ‘আয় সাঁঝ, আমাকে নিশানা কর!’
সাঁঝ তার মুখের ভেতরের সেই পিচ্ছিল, ভেজা তেঁতুলের বিচিটাকে জিবের ডগায় নিয়ে এল। সে তার দুই চোখ সরু করে একদম মিলিটারী স্নাইপারদের মতো নিশানা স্থির করল। বাতাস কোন দিকে বইছে, দূরত্ব কতখানি সব যেন তার অবচেতনেই হিসেব হয়ে গেল। টাস! একদম নিখুঁত, জ্যামিতিক লক্ষ্যভেদ!
বিচিটা বাতাস কেটে সটান গিয়ে ল্যান্ড করল মেজো দাদুর সেই পরম যত্নে রাখা চকচকে টাকটার ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে। ভেজা জিনিসটা টাকে লাগার সাথে সাথে এক অদ্ভুত চটচটে শব্দ হলো। ভদ্রলোক যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি মাঝরাস্তায় থমকে দাঁড়িয়ে, হাতের লাঠিটা হাত থেকে প্রায় ফেলেই দিচ্ছিলেন। এক হাত দিয়ে মাথার সেই পিচ্ছিল অংশে হাত দিয়ে চারপাশটা পাগলের মতো দেখতে লাগলেন। “আরে! কেডা? কোন বেয়াদব? ঢিল মারে কোন চ্যাংড়া?” কিন্তু চারপাশে ধূ-ধূ রোদ আর নিস্তব্ধতা ছাড়া কিচ্ছু নেই। তিনি যখন নিজের হাতের তালুর দিকে তাকালেন, দেখলেন সেখানে একটা ভেজা, চিবানো তেঁতুলের বিচি লেপ্টে আছে। মেজো দাদু কপালে ভাঁজ ফেলে ওপরের দিকে তাকাতে গেলেন। আর ঠিক তখনই, গাছের ঘন অন্ধকার পাতার আড়াল থেকে সাঁঝ তার কণ্ঠস্বর পুরোপুরি বদলে ফেলল। সে নিজের গলাটাকে যতটা সম্ভব খড়খড়ে করে ডাইনিদের মতো শব্দ করে উঠল,
“ হাহাহা হা…! কত্তদিন পর তাজা মানুষের গন্ধ পাইলাম! টাক খামু… তোর মাথার ভেতরের গরম মগজ চুষে চুষে খামু…! হিহিহিহিহি.!”**
দুপুরের নিঝুম বাতাসে ওই ঘন তেঁতুল গাছ থেকে আসা পৈশাচিক কণ্ঠস্বর আর নিজের টাকে লাগা সেই অদ্ভুত ভেজা স্পর্শ এই দুইয়ের মিলনে মেজো দাদুর সত্ত্বা এক সেকেন্ডে কাঁপতে শুরু করল। তিনি ভূত-প্রেত-পেত্নীর গল্পে ভীষণ বিশ্বাস করেন। উনার মনে হলো, এই শতবর্ষী গাছে আসলেই কোনো জ্যান্ত শাকচুন্নি নেমে এসেছে যা উনার মাথা চিবিয়ে খাবে।
ভদ্রলোক আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালেন না। নিজের হাতের লাঠিটার মায়া ত্যাগ করে ওখানেই ফেলে দিলেন। তারপর এত বছরের সমস্ত গাম্ভীর্য আর আভিজাত্য বিসর্জন দিয়ে, দুই হাতে নিজের লুঙ্গিটা হাঁটু পর্যন্ত টেনে তুললেন। তারপর দিলেন এক অন্ধ দৌড়! ৭৫ বছর বয়সের একজন বৃদ্ধ মানুষ যে দুপুরের কড়া রোদে অলৌকিক কোনো শক্তিতে উসাইন বোল্টের গতিতে দৌড়াতে পারেন, তা পিলুগ্রামের মানুষ আজ না দেখলে বিশ্বাস করত না। তিনি ‘ওরে বাবা রে! ভুতে খাইল রে! পেত্নী নামছে রে!’ বলে চিৎকার করতে করতে বিয়ে বাড়ির উঠোনের দিকে ছুটলেন। দুনিয়ার কোনো শক্তি আজ তাকে থামাতে পারবে না। মেজো দাদুর সেই দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে লুঙ্গি তুলে দৌড়ানোর দৃশ্যটা ওপর থেকে দেখে সাঁঝ আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে গাছের ডালটা জড়িয়ে ধরে পেটে হাত দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল।
তার সেই বাঁধভাঙা, চঞ্চল আর বিজয়ের হাসি তখন রোদেলা দুপুরের অলস বাতাসে অপার্থিব, জীবন্ত সুর তুলল।
তেঁতুল গাছ থেকে বাঁদরের মতো চটপটে ভঙ্গিতে নিচে নেমে এল সাঁঝ। দুই পায়ের ধুলো ঝেড়ে, কোমরের ওড়নাটা একটু শক্ত করে কষে সে চারপাশটা দেখে নিল। মেজো দাদুর ওই ঐতিহাসিক দৌড় দেখার পর তার ভেতরের ‘ক্রিমিনাল মাইন্ড’ যেন দ্বিগুণ উৎসাহে জেগে উঠেছে। জ্বরে শুয়ে শুয়ে সে পিলুগ্রামের যে ক্ষতি করেছে, তা আজ উসুল না করলে মীর বাড়ির মেয়ে হিসেবে নিজের আত্মসম্মানে বাধছে। তার চাই আরও বড় কোনো ধামাকা। পা টিপে টিপে সে এগিয়ে গেল জমিদার বাড়ির পেছনের রান্নাঘরের লাগোয়া পুরোনো আমবাগানের দিকে। সেখানে ছোট আর বড় জো খালার দুই মেয়ে রিমি, মিলি আর পাড়ার দু-একটা কাজিন মেয়ে রোদে বসে চুলে তেল দিচ্ছিল আর অলস গল্প করছিল। সাঁঝকে এমন চোর-বিড়ালের মতো এগিয়ে আসতে দেখে ওরা চমকে উঠল। সাঁঝ তর্জনী ঠোঁটে চেপে ‘চুপ’ থাকার ইশারা করল। তারপর ওদের টেনে নিয়ে গেল পুরোনো একটা ভাঙা দেয়ালের আড়ালে।
“শোন রিমি, মিলি…”সাঁঝ গলাটা একদম আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডনদের মতো নিচ করে বলল, “মেজো খালার ওই মস্ত বড়, খাঁকি রঙের বদমেজাজী মোরগটা আছে না? যেটা ভোর চারটা বাজতে না বাজতেই একদম কর্কশ গলায় কক-ক-ক-ক করে করাত চালানোর মতো চিল্লামিল্লি শুরু করে? ওই ব্যাটার জন্য জ্বরের ঘোরেও আমি শান্তিতে ঘুমাতে পারিনি। আজ ওটার ডানা ছাঁটতে হবে। ওটার একটা গতি করা দরকার।”
মিলি ভয়ে ভয়ে চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল, “কী করবি সাঁঝ আপু? খালার প্রিয় মোরগ ওটা। ওটার ডাক না শুনলে খালার নাকি সকালই হয় না! তুই কি ওটার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে দিবি?”
সাঁঝ কপালে একটা মৃদু টোকা দিয়ে বলল, “ধুর গাধী! গলায় ওড়না পেঁচাব কেন? আমরা কি খুনি? আমরা হলাম প্রফেশনাল। ওটাকে আজ আমরা পাচার করব, মানে চুরি করব! পাড়ার ওই যে শফিকের ছোকরা গ্যাং আছে না? ওদের কাছে ওটা বেচে দেব। ওরা রাতে ওটা দিয়ে বনভোজন বা পিকনিক করবে, আর আমাদের দেবে কড়কড়ে ক্যাশ টাকা। সেই টাকা দিয়ে আমরা বিকেলে ভ্যানগাড়ি ডেকে নদীর পাড়ে যাব, মনের সুখে চটপটি আর ফুচকা খাব। খালার মোরগের মাংস দিয়ে ওরা ইবাদত করবে, আর সেই পুণ্য দিয়ে আমরা চটপটি চিবাব। লাভ-ক্ষতির অংকটা বোঝ!”
মীর বাড়ির মেয়ে যখন নিজে লিডার হয়ে এমন লোভনীয় অফার দেয়, তখন বাকিদের আর না করার সাধ্য থাকে না। চটপটি আর ফুচকার নাম শুনে রিমি আর মিলির জিভে জল চলে এলো। ওরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। মিশন সাকসেসফুল। যেই ভাবা, সেই কাজ। সাঁঝ নিজে কমান্ডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো। রান্নাঘরের পেছনে মেজো খালার মস্ত বড় বাঁশের খাঁচা। তার ভেতর সেই রাজকীয় খাঁকি মোরগটা তখন অত্যন্ত অহংকারী ভঙ্গিতে দানা খুঁটছিল। ওটার একেকটা ঠোকর যা ভয়ংকর, পাড়ার বাচ্চারা ওটার ত্রিসীমানায় ঘেঁষে না। সাঁঝ ওড়নাটা মুখে মাস্কের মতো পেঁচিয়ে নিল। তারপর বিড়ালের মতো নিঃশব্দে, হামাগুড়ি দিয়ে খাঁচার পেছনের দরজাটার দিকে এগিয়ে গেল। মিলি আর রিমি রইল ‘লুকআউট’ হিসেবে আছে। যদি মেজো খালা বা মীর আরযান ভাইয়া ওদিক দিয়ে আসে, তবে ওরা কাশির শব্দ করে সিগন্যাল দেবে।
খাঁচার দরজাটা আলতো করে খুলল সাঁঝ। মোরগটা বিপদের গন্ধ পেয়ে যেই না ডানা ঝাপটে ‘কক’ করে আওয়াজ তুলতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে সাঁঝ চিল পাখির মতো ছোঁ মেরে মোরগটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এক হাত দিয়ে ওটার শক্ত ঠোঁট আর মুখ চেপে ধরল, যাতে কোনো আওয়াজ বাইরে না যায়। মোরগটা তার সর্বশক্তি দিয়ে সাঁঝের হাতে নখ দিয়ে আঁচড় কাটার চেষ্টা করল, কিন্তু সাঁঝ তখন মূর্তিমতী মাফিয়া। সে দমে যাওয়ার পাত্রী নয়।
“মিলি, রিমি! জলদি আয়!” সাঁঝ চাপা গলায় ফিসফিসাল। ওরা দৌড়ে এসে মিলি আর রিমির নতুন জর্জেটের দামি ওড়নাটা বাড়িয়ে দিল। সাঁঝ বিন্দুমাত্র মায়া না করে সেই ওড়না দিয়ে মোরগটার দুটো পা আর ডানা শক্ত করে বেঁধে ফেলল। মোরগটা তখন ডানা নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারিয়ে কেবল ছটফট করছে। রিমি পাশ থেকে একটা পুরোনো পাটের খালি চালের বস্তা এগিয়ে দিল। সাঁঝ মোরগটাকে উল্টো করে সেই বস্তার ভেতর পুরে মুখটা একটা সুতলি দড়ি দিয়ে কষে বেঁধে ফেলল। পুরো অপারেশনটা সম্পন্ন হলো মাত্র তিন মিনিটে, কোনো শব্দ ছাড়াই!
বস্তাটা কাঁধে তুলে নেওয়ার সাহস কাজিনদের হলো না। সাঁঝ নিজেই সেই মস্ত ভারী বস্তাটা পিঠে ফেলে পেছনের জঙ্গলঘেঁষা পাঁচিল টপকে এক দৌড়ে চলে গেল পিলুগ্রামের মোড়ের মাথায়। মোড়ের মাথায় চায়ের দোকানের পেছনে পাড়ার বখাটে ছোকরাদের গ্যাংটা আড্ডা দিচ্ছিল। সাঁঝকে বস্তা কাঁধে হন্তদন্ত হয়ে আসতে দেখে ওদের লিডার শফিক হাঁ হয়ে গেল।
“আরে! আরযান ভাইয়ার বোন না? বস্তায় কী?”
সাঁঝ বস্তাটা ধপাস করে মাটিতে ফেলে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “বেশি কথা বলবি না শফিক। একদম খাঁটি অর্গানিক খাঁকি মোরগ। মেজো খালার খাস জিনিস। ওজন কমপক্ষে চার কেজি। তোদের রাতের পিকনিকের জন্য বেস্ট আইটেম। কত দিবি বল?”
শফিক প্রথমে একটু ভয় পেল, মীর আরযানের বোনের কাছ থেকে চোরাই মোরগ কেনা মানে জান হাতে নেওয়া। কিন্তু মোরগের সাইজ দেখে লোভ সামলাতে পারল না। সে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে বলল, “ আরযান ভাইয়া জানলে কিন্তু আমাদের পিলুগ্রাম ছাড়া করবে। তাও আপনার খাতিরে ২ হাজার টাকা দিচ্ছি।”
“জলদি বের কর!” সাঁঝ হাত পাতল।
শফিক এক হাজারের দুটো কড়কড়ে নোট সাঁঝের হাতে দিল। সাঁঝ টাকাটা নিয়ে বস্তাটা ওদের দিকে ঠেলে দিয়ে এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। বাতাস কাটার গতিতে আবার বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। আমবাগানের ছায়ায় এসে সাঁঝ বুক ভরে শ্বাস নিল। মিলি আর রিমি তখনো ভয়ে কাঁপছে। সাঁঝ ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে তখন বিজয়ের উল্লাস। সে হাতের কড়কড়ে টাকার নোট বাতাসে একটু ফ্লিপ করল। টাকার সেই ‘খচখচ’ শব্দটা এই দুপুরে তার কানে কোনো মধুর সংগীতের মতো শোনাল। সে টাকাগুলো ভাজ করল। তারপর দুই আঙুলে ধরে নিজের জামার ভেতরের নিরাপদ ভাঁজে নোটগুলো গুঁজে দিল। সে রিমির দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলল, “মিশন সাকসেসফুল। এবার খালার সামনে কেউ মুখ খুলবি না। জিজ্ঞেস করলে বলবি কালকের ঝড়ে মোরগ বোধহয় উড়ে সরাসরি ঢাকা চলে গেছে, উইদাউট টিকিট!”
–
জামার নিরাপদ ভাঁজে মোরগ বেচার টাকা নিয়ে সাঁঝ যখন বিজয়ী বীরের মতো নাচতে নাচতে গ্রামের সরু আইল ধরে হাঁটছে তখন তার চোখেমুখে মূর্তিমতী অপরাধ সম্রাজ্ঞীর চনমনে ভাব। মেজো দাদুর চকমকে টাকে তেঁতুলের বিচি মেরে আর মেজো খালার খাস মোরগ পাচার করে তার আত্মবিশ্বাস এখন এভারেস্ট ছুঁয়ে ফেলেছে। কিন্তু এতটুকুতেই শান্ত হওয়ার পাত্রী সে নয়। তার অবদমিত চঞ্চল মন তখনো চিৎকার করে বলছিল ‘পিকচার আভি বাকি হ্যায়!’ হাঁটতে হাঁটতে সাঁঝ এসে পৌঁছাল গ্রামের মস্ত বড় পুরনো সরকারি পুকুর পাড়টায়। চারপাশটা বড় বড় হিজল আর জাম গাছে ঘেরা, দুপুরে রোদ সোজা গিয়ে পড়েছে টলটলে জলের ওপর। আর ঠিক তখনই, সেই পুকুর ঘাটের দিকে তাকাতেই সাঁঝের নজরে পড়লেন পিলুগ্রামের সবচেয়ে সহজ-সরল এবং নিরীহ কিসিমের মানুষ, “মকবুল চাচা”।
মকবুল চাচা মানুষ হিসেবে এতটাই সোজা যে, কেউ তাকে ডান হাত দেখাতে বললে সে নিজের জামার ডান হাতা টেনে দেখায়। আজ দুপুরে চড়া রোদে ঘেমে-নেয়ে তিনি এসেছেন পুকুরে ডুব দিয়ে গা জুড়াতে। ভদ্রলোক অত্যন্ত নিয়মানুবর্তী। তিনি তার পরনের একমাত্র ভালো তোষা সুতির সবুজ চেকের লুঙ্গিটি অত্যন্ত পরিপাটি করে ভাঁজ করে ঘাটের পাশের সবুজ নরম ঘাসের ওপর রেখে দিয়েছেন। তারপর কোমরে একটা পাতলা লাল গামছা শক্ত করে পেঁচে গপগপ শব্দে পুকুরের হাঁটু জলে নেমে ডুব দিতে শুরু করেছেন। ঘাটের ওপর সবুজ ঘাসের বুকে একা পড়ে থাকা ওই একলা লুঙ্গিটার দিকে নজর পড়তেই সাঁঝের মাথার ভেতর শত ওয়াটের একটা শয়তানি বুদ্ধির বাল্ব দপ করে জ্বলে উঠল। তার চোখের মণি দুটো বিড়ালের মতো চকচক করে উঠল। সে চারপাশটা একবার চিল-দৃষ্টিতে দেখে নিল। না, আশেপাশে কোনো মানুষ নেই। মকবুল চাচা তখন জলের নিচে মাথা ডুবিয়ে মনের সুখে ডুব-সাঁতার খেলছেন আর নাক দিয়ে ‘ভড়ভড়’ করে জল ছেটাচ্ছেন।
“সুযোগ তো বারবার আসে না!” সাঁঝ নিজের মনেই ফিসফিস করে উঠল। সে তার পরনের জামাটা একহাতে আলতো করে একটু ওপরে তুলে ধরল, যাতে হাঁটার সময় কাপড়ের কোনো খসখস শব্দ না হয়। তারপর একদম চোর-বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে, নিশ্বাস বন্ধ করে ঘাটের দিকে এগিয়ে গেল। প্রতিটা পদক্ষেপ সে ফেলছিল চরম নিখুঁত গণিতে। মকবুল চাচা যখনই জলের নিচে ডুব দিচ্ছেন, সাঁঝ তখন দুই পা এগোচ্ছে, আর চাচা যখনই শ্বাস নেওয়ার জন্য মাথা তুলছেন, সাঁঝ তখন গাছের গুঁড়ির আড়ালে মূর্তির মতো স্থির হয়ে যাচ্ছে। অবশেষে সে পৌঁছে গেল লক্ষ্যবস্তুর একদম কাছে। মকবুল চাচা তখন পুকুরের মাঝখানে গিয়ে লম্বা একটা ডুব দিয়েছেন। সাঁঝ আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। সে ছোঁ মেরে ঘাসের ওপর থেকে মকবুল চাচার সেই একমাত্র ইজ্জত আইডেন্টিটি তথা লুঙ্গিটা এক হাত দিয়ে খপ করে তুলে নিল। লুঙ্গিটা বগলদাবা করেই সে পেছনে না তাকিয়ে, এক ছুটে জান হাতে নিয়ে সোজা পাশের ঘন আমবাগানের ভেতর গিয়ে গা ঢাকা দিল। পুরো চুরির প্রক্রিয়াটা এত দ্রুত আর নিখুঁত হলো যে, আন্তর্জাতিক চোর সিন্ডিকেটের সদস্যরা দেখলেও ঈর্ষায় মরে যেত। এদিকে পুকুরের মাঝখানে মনের সুখে শেষ ডুবটা দিয়ে, মাথা ঝাড়তে ঝাড়তে পাড়ের দিকে হেঁটে এলেন মকবুল চাচা। গামছা দিয়ে চোখ আর কান মুছতে মুছতে ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেন। ঠাণ্ডা বাতাসে উনার শরীর জুড়িয়ে গেছে, এবার লুঙ্গিটা পরে মেজো খালার বিয়ে বাড়ির জিলাপি খেতে যাওয়ার কথা উনার। কিন্তু ঘাটের ওপর পা রাখতেই মকবুল চাচার চোখ দুটো কপালে উঠে গেল। ঘাসের ওপর যেখানে উনার পরিপাটি লুঙ্গিটা থাকার কথা, সেখানে এখন কেবল দুটো ঘাসফড়িং আপনমনে লাফালাফি করছে! মকবুল চাচা প্রথমে ভাবলেন রোদ লেগে উনার চোখ ধোঁয়া দেখছে। তিনি চোখ দুটো ভালো করে রগড়ে আবার তাকালেন। না! সেখানে কিচ্ছু নেই। ফাঁকা, বিলকুল ফাঁকা! ভদ্রলোকের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। এই ভরদুপুরে গামছা পরা অবস্থায় গ্রামের ঘাটে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। কেউ দেখে ফেললে উনার এত বছরের ইজ্জতের ফালুদা হয়ে যাবে। তিনি লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে দুই হাতে গামছাটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে এক ঐতিহাসিক চিৎকার দিলেন,
“ওরে আল্লা রে! ওরে আমার লুঙ্গি রে! কোন জিন-ভূতে আমার জ্যান্ত ইজ্জত লুটে নিল রে! ওরে বাবারে… ওরে পিলুগ্রামে ভুত নামছে রে… আমার একমাত্র ভালো লুঙ্গিটা নিয়া গেছে গা রে…!”
মকবুল চাচার সেই কান ফাটানো জিলিপি-মার্কা আর্তনাদ আর ইজ্জত হারানোর বিলাপ বাতাসে ভেসে গিয়ে পিলুগ্রামের আকাশ-বাতাসকে প্রকম্পিত করে তুলল। গাছের পাখিরা কিচিরমিচির করে ডানা ঝাপটে উড়ে গেল, আর পুকুরের মাছগুলোও ভয়ে জলের গভীরে ডুব দিল। এদিকে সেই বিশাল ঘন আমবাগানের মস্ত বড় একটা ফজলি আমগাছের ছায়ায় বসে মকবুল চাচার চিৎকারের তীব্রতা টের পাচ্ছিল সাঁঝ। চাচার ওই “কোন ভুতে ইজ্জত নিল” সংলাপটা শুনে সাঁঝ গাছের গুঁড়িতে পিঠ ঠেকিয়ে দুই হাতে মুখ চেপে হাসতে লাগল। হাসতে হাসতে উনার পেটে খিল ধরার উপক্রম।
“হাহাহা! চাচা তো দেখি পুরো পিলুগ্রাম মাথায় তুলছে! ভুত না ছাই, তোমার সামনে তো মীর বাড়ির বড় ডন খাড়ায় আছে!” সাঁঝ আর সময় নষ্ট করল না। সে মকবুল চাচার ওই সবুজ চেকের সুতির লুঙ্গিটা মাটির ওপর মেলল। লুঙ্গির নিচের দুটো কোনা আর ওপরের দুটো কোনা একসাথে করে খুব শক্ত একটা গিট দিল। ব্যাস! নিমেষের মধ্যে তৈরি হয়ে গেল আম পাড়ার মস্ত বড় একটা ঝুলি, যার ভেতর অন্তত বিশ-ত্রিশটা বড় আম অনায়াসে রাখা সম্ভব। সে ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল, লতিফ মির্জার বাগানের মস্ত মস্ত ফজলি আমগুলো গাছের ডালে ঝুলছে। সে লুঙ্গির তৈরি সেই ঝুলিটা নিজের গলায় ও কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে আমের বোঁটা লক্ষ্য করে ঢিল খোঁজার প্রস্তুতি নিতে নিতে ভাবল, “হুহ! মীর আরযান শানের মতো খোদাবক্স লাট সাহেবের বোন হয়ে জন্ম নিয়েছি যখন, তখন একটু-আধটু জনসেবা না করলে কি চলে? এই যে মকবুল চাচার লুঙ্গিটা চুরি করলাম, এতে উনার একটা উপকারই হলো। অতিরিক্ত সাবান দিলে কাপড়ের সুতো নষ্ট হয়, আজ উনার লুঙ্গি ধোয়ার কষ্টটা বেঁচে গেল! আর এই আমগুলো চুরি করে যখন মীর বাড়ির সবাইকে খাওয়াব, তখন তো পুণ্যটা আমার আরযানের খাতারই জমা হবে। চোর যদি পারফেক্ট হয়, তবে চুরিটাও একটা শিল্প!” কথাটা শেষ করেই সাঁঝ মাটিতে পড়ে থাকা একটা মস্ত বড় ঢিল হাতে তুলে নিল এবং লতিফ মির্জার গাছের সবচেয়ে বড় আমটার দিকে নিশানা তাক করল।
–
পিলুগ্রামের মোড়ের মাথায় লতিফ মির্জার আম চুরি আর মকবুল চাচার লুঙ্গি দিয়ে ঝুলি বানানোর পর সাঁঝের ডায়েরিতে ‘কুকাম’-এর তালিকা এখন বেশ দীর্ঘ। সে যখন বাগানের গোপন রাস্তা দিয়ে আমভর্তি সেই লুঙ্গির ঝুলিটা টানতে টানতে বাড়ির দিকে আসছিল, তখন তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় জানান দিচ্ছিল বিপদ আসন্ন। মীর আরযান শান যে ধাতের মানুষ, তাতে মেজো দাদুর আর্তনাদ আর মকবুল চাচার বিলাপ এতক্ষণে নিশ্চয়ই তার কানে পৌঁছে গেছে। আর আরযানের রাগ মানে হলো কালবৈশাখীর চেয়েও ভয়ংকর কিছু। সাঁঝ জানে, এবার আর শুধু ‘সরি’ বলে পার পাওয়া যাবে না। আরযানের সেই বরফশীতল চাউনি আর গম্ভীর ধমক থেকে বাঁচতে হলে তাকে এখন ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ প্রয়োগ করতে হবে। অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে, ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল।’ আর সেই চূড়ান্ত ‘অপরাধের বাপ’ পরিকল্পনাটি কার্যকর করতে সাঁঝ বেছে নিল জমিদার বাড়ির একদম পেছনের দিকের সেই জীর্ণ, পরিত্যক্ত ঘরটা। সেখানে দিনের বেলাতেও মাকড়সার জাল আর ধুলোর আস্তরণ ছাড়া কেউ পা রাখে না।
ঘরটায় ঢুকেই সাঁঝ এক মুহূর্তের জন্য নাক কুঁচকাল। ভ্যাপসা গন্ধ আর অন্ধকার। কিন্তু তার মাথায় এখন চাণক্য বুদ্ধি খেলছে। সে দ্রুত দেওয়ালের কোণ থেকে একটা পুরনো মরিচা ধরা লোহার চেয়ার টেনে ঘরের মাঝখানে নিয়ে এল। সিলিংয়ে ঝুলছে একটা পুরনো আমলের বড় পাখা, যা বহু বছর আগে ঘোরার ক্ষমতা হারিয়েছে। সাঁঝ তার হাতের আমের ঝুলিটা একপাশে রেখে পকেট থেকে একটা মোটা দড়ি বের করল যা সে একটু আগে আস্তাবল থেকে সরিয়েছিল। কিন্তু দড়িটা বড্ড খসখসে, গলায় লাগলে দাগ হয়ে যাবে। তাই সে বুদ্ধি পাল্টাল। নিজের গায়ের জর্জেটের ওড়নাটা খুলে সেটার একটা শক্ত গিঁট দিল ফ্যানের হুকের সাথে। নিচ থেকে দাঁড়িয়ে সে দেখল, ফাঁসের লুপটা যেন একদম নিখুঁত দেখায়। এরপর সে চেয়ারের ওপর উঠে নিজের ওড়নাটা গলার চারপাশে এমনভাবে প্যাঁচাল, যেন মনে হয় ওটা সত্যিই টাইট হয়ে আছে। কিন্তু আসলে ওটা তার কাঁধের ওপর আলগাভাবে সাপোর্ট দেওয়া ছিল। সাঁঝ আয়না ছাড়াই নিজের মুখটা একটু অ্যাডজাস্ট করে নিল। চোখের পাতাগুলো একটু নামিয়ে, ঠোঁট দুটো হালকা ফাঁক করে সে এমন এক করুণ অভিব্যক্তি আনল, যেন পৃথিবীর সমস্ত অন্যায় আর অত্যাচার তার ওপর দিয়েই বয়ে গেছে। ঠিক এই সময় ঘরের দরজায় টোকা পড়ল। সাঁঝের ‘সহযোগী’ মিলি কাঁপতে কাঁপতে ভেতরে ঢুকল। ঘরের ওই ঝুলন্ত দড়ি আর সাঁঝের অবস্থা দেখে মিলির আত্মা শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে গেল। “সাঁঝ আপু! ওরে মা রে! তুই একি করছিস? আরযান ভাইয়া জানলে আমাদের জ্যান্ত কবর দেবে!” মিলি প্রায় কেঁদে দিল।
সাঁঝ চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়েই চোখ পাকিয়ে ধমক দিল, “চুপ কর গাধী! আমি কি সত্যি সত্যি মরছি নাকি? এটা হলো ‘প্রতিরক্ষা কবচ’। আরযান ভাই যখন চাবুক নিয়ে আমাকে মারতে আসবে তখন আমি তাকে এই ‘আত্মাহুতি’র প্রমাণ দেখাব। এবার শোন, এই নে আমার ফোন। সে চেয়ার থেকে নেমে মিলির হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিল।
“শোন মিলি, অ্যাঙ্গেলটা ঠিক কর। এমনভাবে ছবিটা তুলবি যেন ওপরের ফ্যান আর আমার গলার এই ফাঁসের দড়িটা একদম স্পষ্ট দেখা যায়। আর হ্যাঁ, লাইটটা একটু কম রাখবি, যেন মনে হয় আমি গভীর শোকে আর অভিমানে অন্ধকারের আশ্রয় নিয়েছি। আমার মুখে একটা ‘ট্র্যাজিক’ লুক দিবি, যেন মনে হয় মীর আরযানের অত্যাচারে এই নিষ্পাপ মেয়েটা আজ শেষ বিদায় নিচ্ছে।” মিলি কাঁপতে কাঁপতে ক্যামেরা অন করল। সাঁঝ আবার চেয়ারে উঠে গলায় ওড়নাটা সেট করে ঝুলে থাকার ভঙ্গি করল। মিলি কয়েকটা ক্লিক করল। সাঁঝ চেয়ার থেকে নেমে ছবিগুলো চেক করল। “উঁহু! এটা হয়নি। এটাতে আমাকে খুব বেশি ফ্রেশ লাগছে। একটু চুলগুলো এলোমেলো করে দে তো। আর চোখের কাজলের এক কোণা একটু লেপ্টে দে, যেন মনে হয় আমি অনেকক্ষণ কেঁদেছি।”
মিলি বাধ্য হয়ে সাঁঝের সাজ নষ্ট করে দিল। এবার যে ছবিটা উঠল, সেটা দেখে সাঁঝ নিজেই চমকে উঠল। আক্ষরিক অর্থেই মনে হচ্ছে কোনো সিনেমার করুণ ক্লাইম্যাক্স! সাঁঝ ছবিটা গ্যালারিতে লক করে রাখল। সে ওড়নাটা ফ্যান থেকে খুলে আবার গায়ে জড়িয়ে নিল। মিলিকে ইশারা করল আমের ঝুলিটা তুলে নিতে। সাঁঝ নিজের ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, “এবার আসুক বাঘের বাচ্চা মীর আরযান! আমাকে মোরগ চুরির জন্য বকা দিলেই আমি এই ছবি তাকে সেন্ড করব আর মেসেজে লিখব ‘প্রিয় ভাই, তোমার এই দাপট আর শাসনের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে আমি চললাম না ফেরার দেশে। এই ছবিটা ট্রেলার, তুমি যদি আমার ওপর আরও রাগ করো, তবে পরের ছবিটা কিন্তু আমি অরিজিনাল দড়ি দিয়ে তুলে সোজা কবরে গিয়ে ল্যান্ড করব!’”
ভাবতেই সাঁঝের গা দিয়ে এক ধরনের রোমাঞ্চকর শিহরণ বয়ে গেল। সে জানে আরযান তাকে কতটা পাগলের মতো ভালোবাসে। আর এই ভালোবাসাকে পুঁজি করেই সে আজ তার সমস্ত ‘অপরাধ’ ধামাচাপা দেবে। সাঁঝ ঘর থেকে বের হওয়ার আগে একবার পেছনের দিকে তাকাল। তার সেই ‘ফাঁসি’র সেটটা দেখে সে নিজেই একটা শব্দ করে হেসে উঠল।
“মীর আরযান শান, আজকের যুদ্ধে আপনি আপনার সব ক্ষমতা নিয়েও হেরে যাবেন আপনার এই ‘আত্মঘাতী’ বোনের কাছে!”
–
পরিত্যক্ত ঘর থেকে বের হয়ে সাঁঝ যখন মকবুল চাচার লুঙ্গিতে বাঁধা ভারী আমের ঝুলিটা কোনোমতে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে নিয়ে আসছিল, তখন তার মুখে চাণক্য বিজয়ের হাসি। কিন্তু আমবাগানের ঠিক মাঝখানটায় আসতেই হুট করে চারপাশের বাতাসটা যেন একদম জমে বরফ হয়ে গেল। গাছের পাতার খসখস শব্দটাও এক মূহূর্তে স্তব্ধ। সাঁঝের পিঠের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় বিপদের সাইরেন বাজাচ্ছিল। সে থমকে দাঁড়িয়ে ধীরপায়ে ঘাড় ঘোরাতেই তার বুকের ভেতরের হার্টবিট যেন এক লাফে তিনশো ছুঁতে চাইল। তার হাতের আমের ঝুলিটা হাত থেকে টুপ করে ফসকে মাটিতে পড়ে গেল। বাগানের মস্ত বড় পুরনো কড়ই গাছটার গুঁড়িতে হাত বেঁধে, এক পা ভেঙে অত্যন্ত রভয়ঙ্কর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং “মীর আরযান শান।” আরযানের পরনে সেই গাঢ় খয়েরি রঙের পাঞ্জাবি। রোদে তার চোখের চশমার গ্লাসটা এক মূহূর্তের জন্য চকচকে রূপ নিল, যার আড়ালে থাকা ধারালো চাউনিটা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু তার শক্ত চোয়াল আর মুখের সেই থমথমে গাম্ভীর্য বলে দিচ্ছে, আজ পিলুগ্রামের জমিনে কোনো বড় মাপের ভূমিকম্প হতে চলেছে। সাঁঝের মুখের সব রঙ এক সেকেন্ডে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। এতক্ষণ যে মেয়েটা নিজেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন ভাবছিল, সে এখন আরযানের ওই জল্লাদ মার্কা লুক দেখে মনে মনে নিজের জানাজা পড়তে শুরু করেছে। তার হাত-পা কাঁপতে লাগল, গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ।
আরযান এক চুলও নড়ল না। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাপা কদমে সাঁঝের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তার জুতার প্রতিটা শব্দ সাঁঝের বুকে যেন একেকটা কামানের গোলার মতো আঘাত করছিল। সাঁঝ দুই পা পিছিয়ে গিয়ে একটা আমগাছের গুঁড়ির সাথে সেঁটে গেল। তার আসলেই তখন ‘জান যায় যায়’ অবস্থা। সে বিড়বিড় করে বলল, ‘“ইয়া আল্লাহ্! আজ মনে হয় মীর আরযান শান আমাকে জ্যান্ত চিবিয়ে খাবে! আমার ফাঁসির ছবি কি কাজ করবে এই জল্লাদের সামনে?”
আরযান সাঁঝের ঠিক এক হাত দূরত্বে এসে থামল। তার শরীর থেকে আসা চেনা পারফিউমের তীব্র ঘ্রাণ আর পুরুষালি দাপট সাঁঝকে একপ্রকার অবশ করে দিল। আরযান নিচু হয়ে মাটির দিকে তাকাল। মকবুল চাচার সবুজ চেকের চুরির লুঙ্গিটার ভেতর থেকে মস্ত মস্ত ফজলি আমগুলো উঁকি দিচ্ছে। আরযান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেটে হাত পুরল। তারপরমেরুদণ্ড কাঁপানো গলায় বলল,
* “তো… মাননীয়া সাঁঝ। আপনার আজকের ‘অপারেশন পিলুগ্রাম’ তো বেশ সফল মনে হচ্ছে। সকাল থেকে মেজো খালার বাড়িতে একের পর এক এফআইআর জমা হচ্ছে আর সবগুলোর তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে আমি যখন মাঠে নামলাম, তখন দেখি সব রাস্তার মোড় গিয়ে মিশেছে আমার এই ঘরে রাখা ‘বিলাই’টার কাছে। মেজো দাদু ওখান থেকে কাঁদতে কাঁদতে এসে বাবার পায়ে ধরেছেন…বলছেন তেঁতুল গাছে নাকি চার মাথার এক পেত্নী নেমে উনার চকমকে টাকে কাঁচা তেঁতুলের বিচি দিয়ে গুলি করেছে! উনার প্রেশার এখন দুইশো। মকবুল চাচা পুকুর ঘাটে গামছা পরে বসে আছেন। পুরো গ্রামের মানুষ উনার চারপাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে আর উনি বলছেন মীর বাড়ির ডাইনি উনার একমাত্র লুঙ্গি চুরি করে নিয়ে গেছে।” আরযান এবার আরও একধাপ এগিয়ে সাঁঝের একদম মুখোমুখি এলেন। তার নিশ্বাস সাঁঝের কপালে আছড়ে পড়ছিল।
“আর মেজো খালারখাঁকি মোরগ? শফিকের ছোকরা গ্যাং ওটাকে অলরেডি জবাই করার প্রিপারেশন নিচ্ছে। এখন বলেন তো, এই পুরো মীর বংশের ইজ্জত যে আজকে আপনি হাটে নিলামে তুললেন এটার শাস্তি আমি ঠিক কী দেব?”
সাঁঝের তখন ভয়ে চোখ দিয়ে পানি পড়ার দশা। আরযানের রাগ সে চেনে। কিন্তু দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে হরিণও যেমন লাফ দেয়, সাঁঝও তার কাঁপতে থাকা হাতটা ব্লাউজের ভেতর ঢুকিয়ে ফোনটা বের করল। সে ফোনটা আরযানের চোখের সামনে উঁচিয়ে ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু ভয়ে তার হাত এতটাই কাঁপছিল যে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। স্ক্রিনে সেই ওড়না দিয়ে সিলিং ফ্যানে ফাঁসি নেওয়ার এডিট করা ভয়ঙ্কর ছবিটা জ্বলজ্বল করছে।
সাঁঝ চোখ বন্ধ করে, এক নিঃশ্বাসে চেঁচিয়ে উঠল, “একদম এগোবেন না! এই দেখেন আপনার অত্যাচারের প্রমাণ! আপনি যদি আমাকে একটাও কড়া কথা শোনান বা ঘরে নিয়ে টর্চার করেন, আমি এই ছবি এখনই পুরো ফেসবুক গ্রুপে ভাইরাল করে দেব! সবাই জানবে মীর আরযান শানের বোন উনার অত্যাচারে গলায় দড়ি দিয়েছে!”
সাঁঝ ভেবেছিল আরযান হয়তো এবার থমকে যাবে, হয়তো একটু নরম হবে। কিন্তু মীর আরযানকে চেনা এত সহজ নয়। আরযান ছবিটার দিকে মাত্র এক সেকেন্ড তাকাল। সে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সাঁঝের হাত থেকে ফোনটা এক ঝটকায় কেড়ে নিল। সাঁঝ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরযান ফোনটা সজোরে পাশের একটা ইঁটের দেওয়ালে ছুড়ে মারল।
সাধের এই এক মূহূর্তে ভেঙে চৌচির হয়ে গেল।
সাঁঝের মুখটা হাঁ হয়ে গেল। “আমার… আমার ফোন! ওরে আল্লাহ্ রে!”
“ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইল মীর আরযানের সাথে চলে না সাঁঝ। “ছবি তো ডিলিট হয়ে গেল চোর। এবার রিয়েলিস্টিক কিছু করা যাক। তুই না ফাঁসি দিতে চেয়েছিলি? চল, ঘরে চল। ফাঁসির ছবিতে গলার ওই লাল দাগটা তো ইনকমপ্লিট ছিল। আজ রাতে আমি নিজের হাতে তোকে এমন কিছু ‘দাগ’ দেব, যা দেখে কাল সকালে আয়নার সামনে দাঁড়ালে তুমি নিজেই ফেসবুক লাইভে যাওয়ার কথা ভুলে যাবে।”
আরযান সাঁঝকে এক ঝটকায় পাঁজাকোলা করে নিজের চওড়া বুকে তুলে নিলেন। মাটির বুকে পড়ে রইল মকবুল চাচার সেই চুরির লুঙ্গি আর আমের ঝুলি, আর মীর আরযান তার অবাধ্য, চোর বোনটাকে কাঁধে ফেলে দাপুটে পায়ে জমিদার বাড়ির অন্দরমহলের দিকে হাঁটতে শুরু করল। সাঁঝ তখন আরযানের পিঠে মুখ লুকিয়ে মনে মনে ভাবল, “আজ রাতটা যদি কোনোমতে বেঁচে যাই, তবে জীবনে আর কোনোদিন চুরির নাম মুখেও আনব না!”
চলবে?
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেম আসবে এভাবে গল্পের লিংক
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১১+১২
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ২৯
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৭
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৫+২৬
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ১৩
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৬
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ২০
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৭
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ২২