#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
পরদিন বিকেল। মীর বাড়ির বিশাল এবং রাজকীয় লিভিং রুমে আজ যেন মেঘ কাটার পর এক চিলতে রোদ এসে পড়েছে। আরযানের কড়া ডিক্টেশন আর ভাইদের একের পর এক ‘বউ আমদানি’র মহাপ্রলয়ের পর, আজ পুরো মীর বংশ একসাথে বসেছে এক পারিবারিক আড্ডায়।
সোফায় গাম্ভীর্য নিয়ে বসে আছেন বাড়ির আসল কর্তারা। মীর বংশের প্রধান চার কর্তা ও পাশে তাদের চার স্ত্রী।
আর তাঁদের ঠিক সামনে কার্পেটে আর পাশের চেয়ারগুলোতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে মীর বাড়ির সেই বিখ্যাত ৭ ভাই আর একমাত্র আদরের বোন সাঁঝ। নাজিরা ওয়ালেদ চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে রাজ আর আব্রাজের দিকে তাকালেন। “তা বড় আব্বা আরযান! মেজো আর সেজো তো একসাথেই দুটো বোমা ফাটাল। একজন পকেটে বিশ টাকা নিয়ে নেত্রী তুলে আনল, আরেকজন চেম্বার থেকে রোগী সাইন করিয়ে নিয়ে এল। এই মীর বাড়ির প্রাচীন দেওয়ালে তো এখন শুধু বিয়ের নোটিশ ঝুলবে দেখছি!”
হাফসা বেগম বুক চেপে ধরে বললেন, “ওমা নাজিরা বুবু! আমি তো কাল রাত থেকে দুরুদ শরীফ পড়ছি। আমার রাজ নাকি আবার সংসার করে দেখবে অবনীর কন্ডিশন কেমন! ওরে আল্লাহ, রোগী দেখতে দেখতে ছেলেই আমার রোগী হয়ে গেল নাকি!”
রাজ তখনই সোজা হয়ে বসে চশমা ঠিক করল। “মা সাইকোলজি বলে, কন্ডিশন বুঝতে হলে প্র্যাক্টিক্যাল ল্যাবে নামতে হয়। অবনী এখন আমার লাইফ-ল্যাব!” পাশে বসা অবনী লজ্জায় হশাড়ির আঁচল টেনে মুখ লুকানোর চেষ্টা করল। এদিকে আব্রাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেঝের কুশনে বসে নিজের শূন্য পকেটে হাত বোলাচ্ছিল। আরসালান হোসেন মুচকি হেসে বললেন, “আব্রাজ, শুনলাম তোর নাকি সব অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ? তা বিকেলে পথসভায় কর্মীদের বিরিয়ানি না খাইয়ে কী খাওয়ালি?”
আব্রাজ মুখটা কাঁদোকাঁদো করে বলল, “কী আর খাওয়াব ছোট চাচা! বড় ভাইয়ার দোয়ায় আজ বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে ঝুলতে গেছি। কর্মীরা বিরিয়ানি চেয়েছে, আমি তাদের বাসের টিকিট দেখিয়ে বলেছি জনগণের প্রতিনিধি আজ বাসে চড়ে এসেছে, এটাই তো আসল পলিটিক্স! ওনারা সবাই এক কাপ চা খেয়ে চলে গেছেন।”
পুরো ঘরে হাসির রোল উঠল। মেজো চাচা আয়মান হোসেন আরযানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আরযান ছেলেদের পকেট একবারে শূন্য করিস না। বাসের ভাড়ার সাথে অন্তত দুটো লংকা খাওয়ার টাকা রাখিস।” আরযান চায়ে চুমুক দিয়ে কেবল মৃদু হাসল, মুখ খুলল না। তাঁর সেই শান্ত কিন্তু ধারালো চোখের নজর তখন সোফার এক কোণে বসা সাঁঝের দিকে।
সাঁঝ আজ আরযান ভাইয়ার ভয়ে একদম জড়সড় হয়ে সিল্কের একটা সাধারণ থ্রি-পিস পরে মেজো চাচীর গা ঘেঁষে বসে ছিল। সেই ছাদের ঘটনার পর সে আরযানের দিকে চোখ তোলারও সাহস পাচ্ছিল না। ঠিক তখনই ড্রামাটাকে এক অন্য লেভেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য উইংসে প্রবেশ করল মীর বাড়ির অঘোষিত খলনায়ক শালিক পাখি ‘চিকু’
চিকু উড়ে এসে সোজা মেজো চাচা আয়মান হোসেনের টাক মাথার ওপর গিয়ে বসল। বসে পা দুটো একটু চুলকে নিয়েই সে কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “পকেট খালি! আব্রাজ চোর! রাজ পাগল!”
“ঐ বজ্জাত পাখি! নাম ওখান থেকে!” আব্রাজ সোফা থেকে জুতো হাতে নিয়ে তাড়া করতে গেল। কিন্তু চিকু সেখান থেকে উড়ে গিয়ে সোজা নাজিরা ওয়ালেদের পানের বাটির ওপর বসল এবং একটা খিলখিলানো আওয়াজ করে চেঁচাল, “সাঁঝের পেট বের করা শাড়ি! আরযান জল্লাদ! আরযান জল্লাদ!” এক মুহূর্তে পুরো লিভিং রুমে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। সাঁঝের মনে হলো সে এখনই মেঝে ফাঁক করে ভেতরে ঢুকে যাবে। সে চোখ বন্ধ করে মেজো চাচীর পেছনে মুখ লুকাল। বড় চাচী নাজিরা ওয়ালেদ চোখ বড় বড় করে সাঁঝের দিকে তাকালেন, “কী বলল এই ডানাকাটা কুলাঙ্গার? সাঁঝের কী শাড়ি?”
আরভিদ এবার সুযোগ পেয়ে মুচকি হেসে তার ডায়েরিটা খুলল। “ ছাদে একটা নতুন পলিটিক্যাল সায়েন্সের থিওরি আবিষ্কৃত হয়েছে। বিস্তারিত আরযান ভাইয়া ভালো বলতে পারবেন।”
আরযান চা-এর কাপটা অত্যন্ত শান্তভাবে পিরিচের ওপর রাখল। ঘরের সবাই তখন আরযানের দিকে তাকিয়ে। আরযান সাঁঝের দিকে একবার চাইল, সাঁঝের চোখ দুটো তখন ভয়ে জবা ফুলের মতো লাল হয়ে গেছে। আরযান অত্যন্ত মার্জিত গলায় বললেন, “কিছু না। সাঁঝের শরীরটা আজ একটু খারাপ ছিল, তাই ও ছাদে হাওয়া খেতে গিয়েছিল। আর চিকুকে আজ রাতে আরভিদ ফ্রাই করে খাবে বলেছে, তাই ও উল্টোপাল্টা বকছে।”
আরযানের এই এক লাইনের ডিফেন্সে সাঁঝের বুকের ভেতরের ড্রাম বাজাটা যেন এক অদ্ভুত শান্তিতে থমকে গেল। সে আড়চোখে আরযানের দিকে তাকাল। লোকটা এত কঠোর শাসন করে, আবার সবার সামনে কেমন সুন্দর আগলে নেয়! সাইরা শেখ হেসে উঠে বললেন, “আরে রাখো তো তোমাদের পাখির কথা। এই যে নতুন দুটো বউ ঘরে এলো, এদের বরণ করার জন্য তো কাল একটা বড় অনুষ্ঠান করতে হয়। বড় আব্বা আরযান, অনুমতি আছে তো?”
আরযান উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর ল্যাপটপটা হাতে নিয়ে বললেন, “অনুমতি আছে ছোট চাচী। তবে অনুষ্ঠানের বাজেট মীর বাড়ির ফান্ড থেকে আসবে না। আব্রাজ আর রাজ কাল সকালে বাসে করে গিয়ে যার যার শ্বশুরের কাছ থেকে ধার করে আনবে।”
“কী!” আব্রাজ আর রাজ একসাথে চিৎকার করে উঠল।
পুরো মীর বাড়ির লিভিং রুম তখন বড় চাচার গম্ভীর হাসি, লিভিং রুমের সেই মহোৎসব আর হাসির হুল্লোড় যখন মাঝরাতের নিস্তব্ধতায় রূপ নিল, মীর বাড়ির বিশাল রাজপ্রাসাদ তখন এক অদ্ভুত শান্তিতে ঢেকে গেছে। তবে সবার ঘরে শান্তি থাকলেও দোতলার ডান দিকের শেষ প্রান্তে সাঁঝের ঘরে তখনো জিরো ওয়াটের নীল আলো জ্বলছিল। সাঁঝ বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে নিজের বালিশটাকে অনবরত ঘুসি মারছিল। তার রাগটা আজ শুধু আরযান মীরের ওপর নয়, নিজের কপালের ওপরও। সেই ছাদের ঘটনার পর থেকে তার ফোনটা আরযানের পকেটে বন্দি। আর ওদিকে কলেজের স্বাধীন হয়তো ভাবছে সাঁঝ তাকে ইগনোর করছে!
“হিটলার! কসাই! নিমপাতা!” সাঁঝ দাঁত কিড়মিড় করে বিড়বিড় করল। “কী ভাবেন উনি নিজেকে? ‘আমার ঘরে তালাবন্ধ করে রাখব!’ এই বাড়িটা কি ওনার একার? এটা আমারও ঘর। আমি যদি কাল কলেজে গিয়ে স্বাধীনের সাথে ইচ্ছাকৃতভাবে ফুচকা না খেয়েছি, তবে আমার নামও সাঁঝ নয়!”
ঠিক তখনই তার নজরে পড়ল পড়ার টেবিলের ওপর রাখা একটা কাঁচের বাটি। আড্ডার শেষে মেজো চাচী যখন তাকে জোর করে ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, তখনো বাটিটা এখানে ছিল না। নাকি সকাল থেকেই ছিল? খেয়াল করা হয়নি। সাঁঝ ধীর পায়ে উঠে টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাটিতে তার প্রিয় ছানার মিষ্টি রাখা, আর তার ঠিক পাশেই একটা সাদা কাগজের ছোট চিরকুট।
কাগজটা হাতে নিতেই সাঁঝের নাকের কাছে আরযানের সেই পরিচিত, চড়া পারফিউমের হালকা ঘ্রাণ এসে লাগল। চিরকুটে নিখুঁত, ধারালো হাতের লেখায় লেখা, “মিষ্টিটা খেয়ে টেবিলের ড্রয়ারে রাখা ওষুধটা খেয়ে নিবি। কাল সকালের নাস্তার টেবিলে যদি তোকে অসুস্থ দেখি, তবে শাস্তির মেয়াদ আর কলেজের বডিগার্ডের সংখ্যা দুটোই বাড়বে। আর হ্যাঁ, তোর ফোনটা মীর এভিয়েশনের আইটি ল্যাবে আছে, বেশি ছটফট করলে ওটা চিরতরে ল্যাপটপ স্ক্র্যাপে চলে যাবে।”
সাঁঝ চিরকুটটা বুকে চেপে ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দুটো আবার কান্নায় রিঙিন হয়ে উঠল, তবে এবার রাগে নয়, এক অদ্ভুত অভিমানে। এই লোকটা এত নিষ্ঠুর কেন? একদিকে তার স্বাধীনতার বারোটা বাজানোর হুমকি দেয়, ফোন কেড়ে নেয়, আর অন্যদিকে মাঝরাতে এসে চোরের মতো মিষ্টি আর ওষুধ রেখে যায়! “আমি খাব না তোমার মিষ্টি! আমি উনুনমুখী হয়ে উপোস করে মরে যাব, তখন বুঝবে!” সাঁঝ মুখে বললেও হাত বাড়িয়ে একটা বড় ছানার মিষ্টি মুখে পুরে দিল। মিষ্টির রসটা গলায় নামতেই সে ড্রয়ার খুলে ওষুধটা খেয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। ঘুমের ঘোরেও তার মনে হতে লাগল, আরযানের এই কঠিন লোহার খাঁচাটার ভেতরে কেমন যেন একটা তীব্র, দমবন্ধ করা মায়া লুকিয়ে আছে।
–
পরদিন সকাল ঠিক সাড়ে সাতটা। মীর বাড়ির বিশাল ডাইনিং টেবিলে রাজকীয় নাস্তার আয়োজন করা হয়েছে। তবে আজ টেবিলে কোনো সার্ভেন্ট নেই। আরযানের কড়া নির্দেশ অনুযায়ী নৈশি আর অবনী ডাইনিং টেবিলে নাস্তা সাজাচ্ছে, আর সাঁঝ এক কোণে মুখ কালো করে বসে আছে। বড় চাচা আফজাল শাহরিয়ার আর মেজো চাচা মীর আয়মান হোসেন টেবিলে এসে বসেছেন। আফজাল শাহরিয়ার রুটি মুখে দিয়ে বললেন, “বাহ্! আজকের রুটিটা তো বেশ গোল হয়েছে। এটা কার হাতের কাজ? নৈশি নাকি অবনী?”
নৈশি অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল, “বড় চাচা, এটা পলিটিক্যাল সায়েন্সের ম্যাপের মতো গোল হয়েছে। কারণ আটা মাখার সময় আমি মনে মনে আরযান ভাইয়ার একনায়কতন্ত্রের সীমানা আঁকছিলাম।”
টেবিলের মাথায় বসা আরযান মীর তখন নিজের ল্যাপটপ বন্ধ করে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন। তিনি নৈশির কথা শুনে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন। “সীমানাটা যদি নিখুঁত হয় নৈশি, তবে আগামীকালের নাস্তায় তোমাকে মীর এভিয়েশনের ক্যাটারিং ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব দেওয়া হবে। সেখানে কোনো পলিটিক্যাল এজেন্ডা চলবে না।”
নৈশি আর কিছু বলার সাহস পেল না, সে চুপচাপ বসে পড়ল। ওদিকে আব্রাজ আর রাজ টেবিলে এসে বসতেই ঘরের পরিবেশ বদলে গেল। আব্রাজ নিজের শূন্য পকেটে হাত দিয়ে বলল, “ভাইয়া, আজকে তো বাসের ভাড়া দেওয়ার মতো টাকাও নেই। কন্ডাক্টর যদি বাস থেকে নামিয়ে দেয়, তবে মীর বংশের এমপির ইজ্জত ধুলোয় মিশে যাবে।”
আরযান টেবিল থেকে একটা খাম বের করে আবরাজের সামনে রাখলেন। “এখানে বাসের এক মাসের পাস টিকিট আছে। ইজ্জত বাঁচানোর জন্য হ্যান্ডেলটা শক্ত করে ধরবি।”
পুরো টেবিল জুড়ে হাসির রোল উঠল। ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের পর্দা ছিঁড়ে ভেতরে প্রবেশ করল মীর বাড়ির অঘোষিত ডন ‘চিকু’
চিকু উড়ে এসে সোজা মেজো চাচার টাক মাথার ওপর বসল এবং ডানা ঝাপটে কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “সাঁঝ চোর! স্বাধীন ফ্রেন্ড! ফুচকা খাব! ফুচকা খাব!” এই কথা শোনার সাথে সাথে সাঁঝের হাতের পানির গ্লাসটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে ভয়ে আরযানের দিকে তাকাল। কাল রাতে সে মনে মনে স্বাধীনের সাথে ফুচকা খাওয়ার যে প্ল্যান করেছিল, এই বজ্জাত পাখি সেটা কীভাবে জানল? বড় চাচী নাজিরা ওয়ালেদ চোখ বড় বড় করে বললেন, “কী বলল এই ডানাকাটা কুলাঙ্গার? সাঁঝের কোন ফ্রেন্ড ফুচকা খাবে?”
আরভিদ এবার সুযোগ পেয়ে মুচকি হেসে তার ডায়েরিটা খুলল। “আজ কলেজের গেটে একটা বিশেষ সিকিউরিটি ড্রিল আছে। সাঁঝের ফুচকা খাওয়ার থিওরিটা আরযান ভাইয়া ভালো এক্সপ্লেইন করতে পারবেন।”
আরযান অত্যন্ত শান্তভাবে চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল। ঘরের সবার নজর তখন আরযানের দিকে। আরযান সাঁঝের দিকে একবার চাইলেন, সাঁঝের চোখ দুটো তখন ভয়ে আর অভিমানে টলমল করছে। সে মনে মনে ভাবছে, “এখনই বুঝি আরযান ভাইয়া সবার সামনে আমাকে বকবেন!” কিন্তু আরযান অত্যন্ত মার্জিত এবং গম্ভীর গলায় বললেন, “কিছু না। সাঁঝের কলেজে কাল কিছু বহিরাগত ছেলে ঝামেলা করার চেষ্টা করছিল, তাই আজ থেকে ওর সিকিউরিটি একটু বাড়ানো হয়েছে। আর চিকুকে সবাই খালি ফ্রাই করে খাবে বলেছে তো, তাই ও উল্টোপাল্টা বকছে। ওর মাথায় সমস্যা। বুঝতে হবে ওটা সাঁঝের পাখি।”
আরযানের এই এক লাইনের ডিফেন্সে সাঁঝের বুকের ভেতরের কালবৈশাখী ঝড়টা যেন এক অদ্ভুত শান্তিতে থমকে গেল। সে আড়চোখে আরযানের দিকে তাকাল। লোকটা বাইরে থেকে যতই কঠিন ডিক্টেশন জারি করুক না কেন, সবার সামনে তাকে আড়াল করার এই ক্ষমতাটা শুধু মীর আরযানেরই আছে।
–
দুপুর বারোটা। কলেজের ক্লাস শেষ হতে না হতেই মীর এভিয়েশনের ব্ল্যাক এসইউভি গাড়িটা সাঁঝকে সোজা মীর বাড়ির সদর দরজায় এনে নামিয়ে দিল। কলেজের গেটে আজ আরযানের পাঠানো চারজন বডিগার্ড চিলের মতো চোখ রেখে দাঁড়িয়ে ছিল, যার কারণে স্বাধীন আজ সাঁঝের ধারেকাছে ঘেষারও সুযোগ পায়নি। ফুচকা খাওয়া তো দূর, দূর থেকে একটা ইশারা করার সাহসও স্বাধীনের হয়নি।
সাঁঝ তীব্র রাগে আর অভিমানে ফুঁসতে ফুঁসতে দোতলার করিডোর দিয়ে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই মীর আরযানের স্টাডি রুমের সেগুন কাঠের ভারী দরজাটা খুলে গেল।
“ভেতরে আয়, সাঁঝ।” ভেতর থেকে আরযানের গম্ভীর, ভরাট কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
সাঁঝের পা দুটো থমকে গেল। সে বুকের ভেতর একরাশ ভয় আর জেদ জমা করে ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল। আরযান ল্যাপটপ স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে চশমাটা টেবিলের ওপর রাখল। তাঁর সাদা শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো।
“আজ কলেজে কোনো ফুচকা উৎসব হলো না?” আরযান অত্যন্ত শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু সেই শান্ত স্বরের আড়ালে একটা অদৃশ্য চাবুকের শাসন ছিল।
সাঁঝের চোখে জল চলে এল। সে আরযানের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলল, “আপনি নিজেকে কী ভাবেন আরযান ভাইয়া? আমার স্বাধীনতা বলতে কি কিচ্ছু থাকবে না? আমার ফোন কেড়ে নিয়েছেন, কলেজে বডিগার্ড পাঠিয়েছেন আমি কি আপনার জেলখানার কয়েদী?”
আরযান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তাঁর বিশাল, দীর্ঘ অবয়বটা নিয়ে সে ধীর পায়ে সাঁঝের খুব কাছে এসে দাঁড়াল। দুজনের মাঝে মাত্র কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব। আরযানের চড়া, দামী পারফিউমের ঘ্রাণে সাঁঝের মাথাটা আবার ঝিমঝিম করে উঠল। সে ভয়ে এক কদম পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু আরযান চট করে সাঁঝের ডান হাতটা ধরে নিজের দিকে টানল।
“জেলখানা?” আরযান সাঁঝের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে এক মুহূর্তের জন্য এমন এক তীব্র অধিকারবোধ আর গভীর অনুভূতি ফুটে উঠল, যা সাঁঝের চেনা ‘জল্লাদ’ আরযানের সাথে মেলে না। আরযানের নিশ্বাস সাঁঝের কপালে এসে লাগছিল। সে অত্যন্ত নিচু, ফিসফিসানি কণ্ঠে বলল, “যদি এটা জেলখানাই হয় সাঁঝ, তবে মনে রাখ এই জেলের কয়েদী যেমন তুই, এর একমাত্র জেলারও আমি। মীর বাড়ির সীমানার বাইরে তোর দিকে কোনো বাইরের ছেলের নজর পড়বে, এটা আরযান মীর বেঁচে থাকতে সম্ভব নয়।”
আরযানের হাতের শক্ত বাঁধন আর তাঁর চোখের এই নাম না জানা তীব্র চাহনিতে সাঁঝের বুকের ভেতরের ড্রাম বাজানোটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। এটা কি শুধুই বড় ভাইয়ের শাসন? নাকি এর আড়ালে অন্য কোনো তীব্র, দমবন্ধ করা মায়া লুকিয়ে আছে? সাঁঝের অবুঝ মন তা বুঝতে পারল না, সে শুধু ভয়ে আর এক অদ্ভুত আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
পরক্ষণেই আরযান নিজেকে সামলে নিল। সে সাঁঝের হাতটা ছেড়ে দিয়ে টেবিল থেকে একটা নতুন আইফোন তুলে তার সামনে রাখলেন। “আইটি ল্যাব থেকে তোর সব ডেটা ব্যাকআপ করে এই নতুন ফোনে ট্রান্সফার করা হয়েছে। ওতে শুধু আমার আর বাড়ির লোকেদের নাম্বার সেভ করা আছে। কোনো ‘স্বাধীন’ যেন এই নাম্বারে রিঙ না করে। এবার নিজের রুমে যাহ।”
সাঁঝ ফোনটা খপ করে লুফে নিয়ে আর কোনো কথা না বলে তীরের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সে নিজের রুমে গিয়ে দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল। তার হৃদস্পন্দন তখনো স্বাভাবিক হয়নি। লোকটা এত নিষ্ঠুর, অথচ তার চোখের ওই লুকানো ইশারাটা কেন সাঁঝের মনকে এক তীব্র ঝড়ে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল?
চলবে?
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪০ ( প্রথম অর্ধেক+শেষ অর্ধেক)
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১১+১২
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ২০
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১৭+১৮
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৩০
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ২
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৫
-
পরগাছা পর্ব ৯
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১১