Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৪০


#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ

#ইশরাত_জাহান_জেরিন

#পর্ব_৪০

সিঙ্গাপুরের পাঁচতারা হোটেলের ৭০২ নম্বর রুমে যখন ভোরের প্রথম আলোটা কাঁচের জানালা গলে এসে পড়ল, তখন বাইরে ক্রান্তীয় বৃষ্টির বেগ অনেকটাই কমে এসেছে। পাতার ডগায় জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে। ঘরের ভেতরের এসিটা বড্ড মন্থর গতিতে চলছে, যা ঘরের গুমোট পরিবেশটাকে আরও খানিকটা ঠান্ডা করে তুলেছে। বিছানার ওপর শুয়ে থাকা ক্যাপ্টেন তাজের বন্ধ চোখের পাতা দুটো কেঁপে উঠল। মাথার ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে, যেন হাজারটা এয়ারক্রাফটের প্রোপেলার একসাথে তার মগজের ভেতর ঘুরছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপালে হাত দিতে গেল, কিন্তু তখনই তার মনে হলো হাতের ওপর একটা বাড়তি ভার। চোখের ওপর থেকে গাম্ভীর্যের পর্দাটা সরিয়ে তাজ তাকাতেই তার পুরো শরীর এক মূহূর্তে শক্ত হয়ে গেল। তার চওড়া বুকের একপাশে মাথা গুঁজে শান্তিতে ঘুমাচ্ছে সিয়া! সিয়ার এক হাত তখনো তাজের শার্টের ছেঁড়া বোতামের মাঝখান দিয়ে তার উন্মুক্ত বুকের চামড়া ছুঁয়ে আছে। ঘরের মেঝেতে তাকাতেই তাজের চোখ চড়কগাছ। সিয়ার গায়ের অ্যাপ্রনটা মেঝের এক কোণে দুমড়েমুচড়ে পড়ে আছে, তার চুলের ক্লিপটা বিছানার নিচে ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে, আর পুরো ঘরের চাদর-বালিশ একদম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে! তাজ এক ঝটকায় সিয়াকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে বিছানায় সোজা হয়ে বসল। তার ধারালো চোখ দুটোতে তখন একাধারে বিস্ময়, রাগ আর তীব্র বিভ্রান্তি “মিস সিয়া! ওয়েক আপ! হোয়াট ইজ দিস ননসেন্স?” তাজের সেই গমগমে কড়া গলার আওয়াজে সিয়ার ঘুম এক মূহূর্তে টুটে গেল। সে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। নিজের আলুথালু চুল আর গায়ের জামার বোতামের দিকে তাকাতেই তার চোখ দিয়ে টপটপ করে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। সে বিছানার চাদরটা বুকের কাছে টেনে ধরে হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তাজ নিজের কপালটা চেপে ধরে ধমকের সুরে বলল, “কান্না বন্ধ করো সিয়া! আগে বলো এখানে কী হয়েছে? তুমি আমার রুমে কী করছ? আর ঘরের এই অবস্থা কেন? মাই হেড ইজ ব্ল্যাঙ্কিং আউট!”

সিয়া কান্নার বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়ে হিক্কা তুলে বলল, “আপনি… আপনি কিছুই মনে করতে পারছেন না, স্যার? আপনি কাল রাতে জ্বরের ঘোরে আমাকে… আমাকে জোর করে নিজের বুকের সাথে টেনে নিলেন। আমি বারবার বললাম স্যার ছাড়ুন, আমি আপনার সেবা করতে এসেছি, জলপট্টি দিতে এসেছি। কিন্তু আপনি… আপনি তো মীর বাড়ির ছেলে! আপনাদের অভিধানে তো ‘না’ বলে কোনো শব্দ নেই!” তাজ স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মনে পড়ছে কাল রাতে সে প্রচণ্ড জ্বরে ভুগছিল, কিন্তু তারপরের ঘটনাগুলো সব ঝাপসা। সে নিজের ছেঁড়া শার্টের বোতামের দিকে তাকিয়ে বড্ড অপ্রস্তুত গলায় বলল, “আমি… আমি কি সত্যি তেমন কিছু করেছি? আই ওয়াজ নট ইন মাই সেন্স সিয়া!”

“সেন্সে ছিলেন না বলেই তো এত বড় সর্বনাশটা করে ফেললেন!” সিয়া চোখ মুছে বিছানা থেকে নেমে মেঝের থেকে নিজের অ্যাপ্রনটা তুলে নিল। তার গলা ক্ষোভে আর অভিমানে কাঁপছিল। “একজন চিফ ক্যাপ্টেনের চাকুরির সুরক্ষার কথা ভেবে আমি ইন্টারকমে ডাক্তার ডাকিনি, নিজে সারারাত জেগে আপনার সেবা করতে এলাম। আর আপনি কি না সুযোগ বুঝে আমার… আমার সবটুকু কেড়ে নিলেন! এখন সকাল হতেই বলছেন কিছুই মনে নেই? বাহ্!”

তাজ চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল। মীর তাজের জীবনে এই প্রথম কোনো পরিস্থিতি তার কন্ট্রোলের বাইরে চলে গেছে। সে সিভিল এভিয়েশনের সবচেয়ে ডিসিপ্লিন্ড অফিসার, তার ক্যারিয়ারে আজ পর্যন্ত কোনো দাগ লাগেনি। অথচ আজ তার নিজেরই জুনিয়র এয়ার হোস্টেস তার রুমে, তার বিছানায় কাঁদছে! তাজ গম্ভীর, পাথুরে গলায় বলল, “দেখুন সিয়া, আমি কোনো কাপুরুষ নই। যদি কাল রাতে আমার তরফ থেকে কোনো ভুল হয়ে থাকে, তবে তার দায় আমি নেব। কিন্তু সিভিল এভিয়েশনের নিয়মানুযায়ী ফ্লাইটে কোনো ক্রু মেম্বারের সাথে পার্সোনাল রিলেশনশিপ…”

“রেখে দিন আপনার এভিয়েশনের নিয়ম!” সিয়া এক কদম এগিয়ে এসে তাজের টেবিলের ওপর হাত ঠেকিয়ে দাঁড়াল। তার চোখের কোণে কান্নার দাগ। সে এবার এক চিলতে জেদি, নাছোড়বান্দা হাসি ফুটে উঠল। সে তাজের সানগ্লাসটা টেবিল থেকে তুলে তাজের চোখের সামনে নাচিয়ে বলল, “সর্বনাশ যখন করেছেন ক্যাপ্টেন সাহেব, তখন শাস্তি তো আপনাকে পেতেই হবে। আর আপনার শাস্তি হলো বিয়ে! আপনি আজই ঢাকায় ফিরে মীর বাড়িতে জানাবেন যে আপনি আমাকে বিয়ে করছেন। নইলে এই লণ্ডভণ্ড ঘরের ছবি আর আমার এই ছেঁড়া জামার গল্প আমি সোজা এভিয়েশন অথরিটির বোর্ডে জমা দেব। তখন চাকরিও যাবে, আর যাবজ্জীবন জেল খাটতে হবে!” তাজ সানগ্লাসটা সিয়ার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে নিজের চোখে পরল। সানগ্লাসের আড়ালে তার ধারালো চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত মায়া দেখা যাচ্ছে। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সিয়ার খুব কাছে এল। তার লম্বা, চওড়া শরীরের ছায়ায় সিয়া আবার এক মূহূর্তে ছোট হয়ে গেল। তাজ বড্ড নিচু, ভারী গলায় বলল, “হুমকি দিচ্ছো, মিস সিয়া? মীর তাজের ক্যারিয়ার ধ্বংস করার ভয় দেখাচ্ছ?”

সিয়া বুক ফুলিয়ে বলল, “হ্যাঁ দিচ্ছি! নিজের অধিকার আদায়ের জন্য মেয়েদের একটু বৈপ্লবিক হতে হয়, যা আপনিই কাল ডিনারে বলেছিলেন।”

তাজ ক্ষণস্থায়ী হাসি ফুটিয়ে বলল, “ঠিক আছে। সোমবারের রিটার্ন ফ্লাইটে কোনো ভুল যেন না দেখি। আর ঢাকায় নেমেই কাজী ডাকার ব্যবস্থা করছি। মীর বাড়ির খাঁচায় ঢোকার শখ যখন হয়েছে, তখন আর পালাবার পথ পাবে না। এবার নিজের ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হও, এয়ারপোর্টে বের হতে হবে।”

সিয়া মনে মনে এক বিশাল জয়ের উল্লাস চেপে রেখে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে রুম থেকে প্রায় দৌড়ে বের হয়ে এল। সে দরজার বাইরে এসে নিজের গালে নিজেই চিমটি কাটল। নাটকটা একটু বেশিই ওভার-অ্যাক্টিং হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এই বাউন্সার ক্যাপ্টেনকে লাইনে আনার জন্য এ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। এই বলদ লোক আসলেই একটা বদল। সিয়া চাকরিতে ঢুকেছিল ওই ভদ্রলোককে দেখে। কত কষ্ট করেছে। রোজ ছুটি নিতে যেত যাতে ছুটির অজুহাতে এই বেরসিকের সাথে দেখা করতে পারে। কিন্তু এর মাথায় তো বুদ্ধি বলতে কুছ বি নেহি। রাতে কিছু হয়নি যদিও….তবে এই ধান্ধাবাজি করে যদি খারুসটার বউ হওয়া যায়!

ঢাকা আর্মি স্টেডিয়ামের গ্যালারি আজ যেন ফুটন্ত কড়াই। গ্যালারির চারপাশ জুড়ে লাল-সবুজের পতাকার মেলা, ভুভুজেলা বাঁশির কানফাটানো আওয়াজ আর হাজার হাজার দর্শকের উন্মাদনা। আজ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে বাংলাদেশের মুখোমুখি হয়েছে শক্তিশালী মালদ্বীপ। আর বাংলাদেশের এই অপরাজেয় ফুটবল দলের অধিনায়ক, যার কাঁধে আজ পুরো দেশের কোটি মানুষের স্বপ্ন, সে আর কেউ নয় মীর আরযান শান।

বিজনেস ম্যাগাজিনের কর্পোরেট স্যুট আর ব্লেজার ছুড়ে ফেলে আরযান আজ নেমেছে তার চিরচেনা সবুজ মাঠে। তার পরনে বাংলাদেশ দলের সেই ঐতিহ্যবাহী ১০ নম্বর জার্সি, বাহুতে জ্বলজ্বল করছে ক্যাপ্টেনের আর্মব্যান্ড। মাঠের ফ্লাডলাইটের তীব্র আলোয় আরযানের ফর্সা, ঘামে ভেজা মুখাবয়ব আর তার সেই তীক্ষ্ণ পাথুরে চোয়াল যেন আরও বেশি ধারালো আর আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে। সে যখন মাঠে ওয়ার্ম-আপ করার জন্য কদম বাড়াচ্ছে, তখন গ্যালারির একটা বড় অংশ বিশেষ করে তরুণী দর্শকেরা শুধু ‘শান! শান!’ বলে চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে ফেলছে। ভিআইপি গ্যালারির সবচেয়ে সামনের সারিতে বসে আছে মীর পরিবারের সবাই। বড় মা, মেজো মা, চাচিরা তো আছেনই, সাথে এসেছে আরভিদ আর আর্যা। আর তাদের ঠিক মাঝখানে, এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে সাঁঝ। সাঁঝের পরনে আজ লাল-সবুজ কম্বিনেশনের একটা সুতির শাড়ি, কপালে ছোট্ট একটা লাল টিপ। কিন্তু তার দৃষ্টি মাঠের দিকে যতটা না আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি আছে আরযানের দিকে। সাঁঝের বুকের ভেতরটা আজ সকাল থেকেই দুরুদুরু করে কাঁপছে। আরযান যে এত বড় মাপের একজন ফুটবলার, সে কেবল বাংলাদেশ দলেই খেলে না, বরং ১০ নাম্বার জার্সির ক্যাপ্টেন এটা সে জানে। তবে দিনকে দিন তার জনপ্রিয়তা যে এত বাড়বে কে জানে? আরভিদ আর্যার কাঁধে হাত রেখে বড্ড চতুর হেসে বলল, “দেখলে আর্যা? আমাদের শান ভাইয়াকে মাঠে নামতেই কীভাবে মেয়েদের স্কোয়াড চিৎকার শুরু করেছে? বিজনেস ডেস্কে ও যতটা গম্ভীর, মাঠের সবুজ ঘাসে ও ততটাই কিলার!”

আর্যা আলতো হেসে সাঁঝের দিকে তাকাল। সাঁঝ তখন দুই হাত দিয়ে নিজের শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরে মাঠের দিকে তাকিয়ে আছে। আর্যা সাঁঝের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “কী রে সাঁঝ? তোর ১০ নাম্বার জার্সির ক্যাপ্টেনের এই ক্রেজ দেখে ভয় পাচ্ছিস নাকি? তোর আরযান ভাইয়া কিন্তু শুধু মাঠে নয়, মেয়েদের হৃদয়েও গোল দিতে ওস্তাদ!”

সাঁঝ মুখে একটা জোরাজুরি হাসি ফুটিয়ে বলল, “ভয় পাব কেন আর্যা আপু? আরযান ভাইয়া দেশের জন্য খেলছে, এটা তো গর্বের ব্যাপার।” মুখ ফুটে গর্বের কথা বললেও সাঁঝের মনের ভেতর কেন জানি একটা অস্বস্তি দানা বাঁধতে শুরু করেছে। এই অনুভূতিটা তার জীবনে একদম নতুন। সে তো আরযান ভাইয়াকে চিরকাল বড্ড কড়া, রাগী আর দূরত্বের এক মানুষ হিসেবেই দেখে এসেছে। কিন্তু আজ এই উন্মত্ত গ্যালারির হাজারটা মেয়ের চোখের তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি যখন আরযানের ওপর এসে পড়ছে, তখন সাঁঝের নিজের বুকের বাঁ পাশে এক তীব্র কামড় অনুভূত হচ্ছে। সে জীবনে কোনোদিন কারও জন্য জেলাস ফিল করেনি, কিন্তু আজ যেন তার নিজের অজান্তেই আরযানের ওপর একচ্ছত্র অধিকারবোধ জেগে উঠছে। ঠিক তখনই রেফরির দীর্ঘ বাঁশির আওয়াজে ম্যাচ শুরু হলো। পুরো স্টেডিয়াম এক মূহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে আবার গর্জে উঠল।

ম্যাচের প্রথমার্ধ ছিল বড্ড কঠিন। মালদ্বীপের ডিফেন্ডাররা আরযানকে একদম ম্যান-টু-ম্যান মার্কিং করে রেখেছিল। আরযান মাঠে বল পেলেই তিনজন করে ডিফেন্ডার তাকে ঘিরে ধরছে। কিন্তু মীর আরযান শান দমবার পাত্র নয়। তার পায়ের কাজ বড্ড নিখুঁত, ড্রিবলিং যেন এক একটি জ্যামিতিক শিল্প। প্রথমার্ধের ৩৫ মিনিটে আরযান মাঝমাঠ থেকে বল পেয়ে একাই তিনজন ডিফেন্ডারকে ড্রিবল করে কাটিয়ে ডি-বক্সের বাইরে থেকে এক বুলেট গতির শট নিল। বলটা মালদ্বীপের গোলকিপারকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে জালের ওপরের কোণ দিয়ে জড়িয়ে গেল!

“গোওওওওোল!” পুরো আর্মি স্টেডিয়াম মূহূর্তে ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠল। ভিআইপি গ্যালারিতে আরভিদ লাফিয়ে উঠে চিৎকার করে উঠল, মা-চাচিরা আনন্দে হাততালি দিতে লাগলেন। সাঁঝ নিজের আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। মাঠে তখন আরযান গোল উদযাপন করার জন্য কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে ছুটে যাচ্ছে। সে তার ১০ নাম্বার জার্সিটা টেনে ধরে গ্যালারির দিকে তাকাল। তার সেই ঘামে ভেজা, রণক্লান্ত তীব্র পুরুষালি মুখটা দেখে স্টেডিয়ামের মেয়েদের চিৎকারের তীব্রতা যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। আরযান কিন্তু গ্যালারির সাধারণ ভিড়ের দিকে তাকাল না, তার দূরবীন চোখ জোড়া এক মূহূর্তে ভিআইপি বক্সে থাকা সাঁঝের ওপর এসে স্থির হলো। সে সাঁঝের দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল। সাঁঝের বুকটা এক মূহূর্তে এক অজানা সুখে তোলপাড় হয়ে গেল। সে লজ্জায় মাথা নিচু করে আবার বসে পড়ল।

দ্বিতীয়ার্ধে মালদ্বীপ গোল শোধ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। ম্যাচের ৮০ মিনিটে তারা একটা পেনাল্টি পেয়ে গোল শোধও করে দিল। ম্যাচ যখন ১-১ সমতায়, তখন গ্যালারিতে টানটান উত্তেজনা। ঘড়ির কাঁটা তখন ৯০ মিনিট ছুঁয়ে ইনজুরি টাইমের শেষ মিনিটে এসে দাঁড়িয়েছে। ঠিক তখনই বাংলাদেশ একটা কর্নার পেল। উত্তেজনায় পুরো স্টেডিয়ামের দর্শক তখন দাঁড়িয়ে পড়েছে। কর্নার কিকটা যখন উড়ে এল ডি-বক্সের মাঝখানে, আরযান বাতাসে চিল পাখির মতো ভেসে উঠল। মালদ্বীপের দুজন চওড়া ডিফেন্ডারকে এয়ার ব্যাটেলে পরাস্ত করে আরযান এক নিখুঁত হেডে বলটা গোলের ভেতরে ঠেলে দিল! সাথে সাথেই রেফরির শেষ বাঁশি বাজল। ২-১ ব্যবধানে বাংলাদেশকে সাফ চ্যাম্পিয়ন করে মাঠেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ক্যাপ্টেন মীর আরযান শান। তার দুই হাত আকাশের দিকে ছড়ানো, চোখ বন্ধ। পুরো মাঠ তখন লাল-সবুজের আবিরে রঙিন হয়ে গেছে। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ভিআইপি লাউঞ্জের করিডোরে মীর পরিবারের সবাই অপেক্ষা করছে আরযানের জন্য। আরযান তখনো তার সেই ঘামে ভেজা কাদা-মাখা ১০ নাম্বার জার্সি গায়ে, গলায় চ্যাম্পিয়নস মেডেল ঝুলিয়ে, হাতে ম্যাচ জয়ী ট্রফিটা নিয়ে লাউঞ্জের দিকে আসছে। কিন্তু আরযান একা আসতে পারছে না। লাউঞ্জের করিডোরে পা রাখতেই একদল তরুণী মডিশ মেয়ে যারা হয়তো স্পন্সর বা ক্লাবের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আত্মীয় আরযানের চারপাশটা একদম মৌমাছির মতো ছেঁকে ধরল। তাদের পরনে আধুনিক জিন্স-টপস, চোখেমুখে আরযানের জন্য তীব্র মুগ্ধতা আর আদিখ্যেতা।

“ও মাই গড শান! ইউ ওয়ার জাস্ট আমেজিং টুডে!” একটা ছোট চুল ওয়ালা মেয়ে আরযানের খুব কাছে গিয়ে তার বাহুটা প্রায় ছুঁয়ে বলল। “শান, একটা সেলফি প্লিজ! আপনার ওই লাস্ট হেডটা বড্ড খতরনাক ছিল!” আরেকটা মেয়ে নিজের দামি আইফোনটা আরযানের মুখের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বড্ড আদুরে গলায় আবদার করল। সাঁঝ একটু দূরে বড় মা আর আর্যার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটা দেখছিল। তার ফর্সা মুখটা এক মূহূর্তে রাগে আর অপমানে লাল হয়ে গেল। সে দেখল, আরযান কিন্তু মেয়েদের ওপর রেগে যাচ্ছে না, কিংবা তার সেই কড়া ‘খাঁচার চাবি’র গাম্ভীর্য দেখাচ্ছে না। সে বড্ড শান্ত, প্রফেশনাল একটা হাসি মুখে ঝুলিয়ে মেয়েদের সেলফির আবদার মেটাচ্ছে। এমনকি একটা মেয়ে যখন আরযানের গলার মেডেলটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে চাইল, আরযান বড্ড ভদ্রভাবে মাথা নিচু করে তাকে ওটা দেখতে দিল! সাঁঝের বুকের ভেতর তখন যেন একটা আগ্নেয়গিরি লাভা উগরে দিচ্ছে। যে আরযান ভাইয়া বাড়িতে সাঁঝকে অন্য কোনো ছেলের সাথে হাসতে দেখলে পুরো আকাশ মাথায় তোলে, যে আরযান ভাইয়া সাঁঝের ইন্টার্নশিপ বাতিল করার জন্য বড় আব্বুর কাছে নালিশ করে, সে আজ নিজে এতগুলো মেয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কীভাবে এমন অবলীলায় হাসিমুখে কথা বলছে? মেয়েগুলো তো প্রায় তার গায়ের ওপর পড়ে যাচ্ছে! সাঁঝের হুট করেই মনে হলো, আরযান ভাইয়া তাকে বলেছিল, ‘তোর ওপর মীর আরযানের কোনো অধিকার নেই। নিজের ইচ্ছেমতো চল।’ সাঁঝের চোখে এবার নোনা জল টলমল করে উঠল। তার মনে হলো, আরযান ভাইয়া বোধহয় সত্যি তাকে পর করে দিয়েছে। এই যে এত এত সুন্দর, আধুনিক মেয়েরা তার চারপােশ ঘুরঘুর করছে, আরযান ভাইয়া হয়তো তাদের কাউকেই এখন নিজের ভাবছে। আরভিদ সাঁঝের এই ফোলা মুখ আর তার হাতের মুঠোয় শাড়ির আঁচল দুমড়েমুচড়ে ফেলার ভঙ্গিটা লক্ষ্য করেছে। সে আর্যার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে একটু হাসল, বড্ড উস্কানিমূলক গলায় বলল, “আরে বাহ্! শান ভাইয়ার ফ্যান ফলোয়িং তো দেখছি টলিউড-বলিউডের নায়কদেরও হার মানাবে। ওই যে নীল ড্রেস পরা মেয়েটা তো দেখছি ভাইয়ার শার্টের ঘাম মুছিয়ে দিতেও রাজি! কী বলো সাঁঝ? ভাইয়াকে তো বড্ড হ্যান্ডসাম লাগছে আজ!” সাঁঝ আর নিজের ভেতরের এই তীব্র জেলাসির অনল চেপে রাখতে পারল না। সে আরভিদের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে, আরযানের দিকে আর একটিবারও না তাকিয়ে বড্ড মাপা কদমে করিডোর ধরে উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার পা দুটো কাঁপছিল, চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। আরযান মেয়েদের ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে সেলফি তুললেও তার তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া কিন্তু এক মূহূর্তের জন্যও সাঁঝের ওপর থেকে সরেনি। সে সাঁঝের শাড়ির আঁচল চেপে ধরা, তার ফর্সা মুখের সেই তীব্র রাগী ও অভিমানী অভিব্যক্তি এবং শেষে চোরের মতো চোখ মুছে পালিয়ে যাওয়া সবটাই নিখুঁতভাবে লক্ষ্য করেছে।

আরযানের ঠোঁটের কোণে এবার হাসি ফুটে উঠল। সে মেয়েদের উদ্দেশ্যে বড্ড মাপা কদমে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, “এক্সকিউজ মি লেডিস, মাই ফ্যামিলি ইজ ওয়েটিং। গুড নাইট।” মেয়েদের সেই মোহময়ী স্কোয়াডকে এক মূহূর্তে পেছনে ফেলে ক্যাপ্টেন মীর আরযান শান তার হাতের ট্রফিটা নিয়ে সোজা এগিয়ে গেল সেই অন্ধ করিডোরের দিকে, করিডোরের সেই অন্ধ গলিটার দিকে একা একা হেঁটে আসলেও সাঁঝের মনটা পড়ে রইল লাউঞ্জের সেই ঝলমলে আলোর নিচে। পা দুটো যেন আর সামনের দিকে এগোতে চাইছিল না। সে বারবার না চাইতেও ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকাচ্ছিল। তার অবাধ্য চোখ জোড়া ভিড়ের মাঝে কেবল সেই ১০ নম্বর জার্সিটাকেই খুঁজছিল। কিন্তু হুট করেই সাঁঝের পুরো শরীরটা এক মূহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। লাউঞ্জের সেই ভিড়টা এখনো আছে, কিন্তু সেখানে আরযান ভাইয়া নেই! শুধু আরযানই নয়, তার সাথে সেই ছোট ড্রেস পরা, মডিশ টাইপের মর্দানা সুন্দরী মেয়েটাও গায়েব! যে মেয়েটা একটু আগে আরযানের বাহু ছুঁয়ে আদিখ্যেতা করছিল, তাকেও আর কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সাঁঝের বুকের ভেতরটা এক মূহূর্তে ছ্যাৎ করে উঠল। তার মাথার ভেতর হাজারটা কুচিন্তা এসে ভিড় করতে লাগল। মনে মনে সে ওই মেয়েটার গুষ্টি উদ্ধার করতে শুরু করল, “কী সব ছোট ছোট জামাকাপড় পরে ঘুরে বেড়ায়! একটুও লজ্জা-শরম নেই! আর আরযান ভাইয়ারই বা কী এত কথা? মাঠ থেকে বের হতে না হতেই একটা অচেনা মেয়ের সাথে এভাবে একা একা কোথায় চলে গেল?” রাগে, অপমানে আর তীব্র জেলাসিতে সাঁঝের দম আটকে আসার উপক্রম হলো। সে আর এক মূহূর্তও চুপচাপ বসে থাকতে পারল না। বসার আসন ছেড়ে সে হুট করে খাড়া হয়ে উঠে দাঁড়াল। সাঁঝকে এভাবে আকস্মিক উঠে দাঁড়াতে দেখে পাশে বসা আরভিদ চট করে তার হাতটা হালকা করে চেপে ধরল। সে ভ্রু নাচিয়ে বলল, “কী রে সাঁঝ? হুট করে উঠে দাঁড়ালি যে? কই যাস?”

সাঁঝ চরম ততমত খেয়ে গেল। নিজের ভেতরের তোলপাড়টা আড়াল করার জন্য সে আমতা আমতা করে বলল, “আাম… আমি… পানি, আরভিদ ভাইয়া। বড্ড তৃষ্ণা পেয়েছে, একটু পানি আনতে যাই।”

আরভিদ শব্দ করে হেসে উঠল। সে পকেট থেকে একটা সিলড পানির বোতল বের করে সাঁঝের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আরে, পানি তো আমার কাছেই আছে! এই নে, খেয়ে নে। বাইরে যাওয়ার কী দরকার?” সাঁঝ এবার একদম ফাঁদে পড়ে গেল। সে বোতলটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে আরভিদকে বকল। তারপর চট করে আরেকটা বাহানা মাথায় এনে বলল, “না… মানে, ঠান্ডা পানি না ভাইয়া। আমার গলায় একটু সমস্যা, আমি একটু নরমাল ফিল্টার ওয়াটার খুঁজতে যাচ্ছি। ওয়াশরুমেও যাব একটু।” কথাটা বলেই সে আরভিদকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে প্রায় এক দৌড়ে ওখান থেকে কেটে পড়ল।

করিডোর পেরিয়ে খেলোয়াড়দের অফিশিয়াল ড্রেসিংরুমের জোনের দিকে হাঁটা দিল সাঁঝ। এই জোনে সাধারণ দর্শকদের ঢোকার অনুমতি নেই, কিন্তু মীর পরিবারের সদস্য হওয়ায় তাকে কেউ বাধা দিল না। সাঁঝের একমাত্র লক্ষ্য এখন আরযান ভাইয়াকে খুঁজে বের করা। সে দুই হাতে শাড়ির কুচিটা সামান্য উঁচিয়ে ধরে গটগট করে হেঁটে যাচ্ছিল। ড্রেসিংরুমের করিডোরের একদম শেষ মাথায় যেতেই সাঁঝের চোখ দুটো রাগে প্রায় জবা ফুলের মতো লাল হয়ে গেল।

সে স্পষ্ট দেখল, আরযান ভাইয়া আর সেই ছোট ড্রেস পরা মেয়েটা একসাথে একটা ড্রেসআপ রুমের ভেতর ঢুকছে! মেয়েটা আগে ঢুকল, আর তার ঠিক পেছনেই আরযান ভাইয়া দরজা ঠেলে ভেতরে চলে গেল। সাঁঝের মাথা তখন আর বিন্দুমাত্র কাজ করছিল না। তার ভেতরের ‘আক্রমণাত্মক মুড’ তখন শতভাগ অন হয়ে গেছে। যে আরযান ভাইয়া তাকে সারাজীবন শাসনের খাঁচায় বন্দি করে রাখল, সে আজ একটা পরমেয়ের সাথে ড্রেসিংরুমে একা? সাঁঝ আজ একে একদম হাতে-নাতে ধরবে! সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ড্রেসআপ রুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজার লকটা পুরোপুরি লাগানো ছিল না। সাঁঝ এক ঝটকায়, বেশ জোরেই দরজাটা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল।

“আরযান ভাইয়া, আপনি এখানে…!” চিৎকার করে কথাটা বলতে গিয়েই সাঁঝের মুখের কথা মুখের ভেতরই আটকে গেল। ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে তার পুরো শরীর যেন এক মূহূর্তে বরফ হয়ে গেল। রুমে আরযান ভাইয়া নেই! ড্রেসআপ রুমের ভেতরের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেই মর্দানা সুন্দরী মেয়েটা আরেকজন মাঝবয়সী মেকআপ আর্টিস্ট বা ডিরেক্টর টাইপের লোকের সাথে কথা বলছে। মেয়েটা হাতে একটা স্পন্সরের ক্যাটালগ নিয়ে বলছিল, “হ্যাঁ ভাইয়া, ক্যাপ্টেন শানকে তো সাইন করালাম। ওনার অফিশিয়াল বাইটটা জাস্ট ওনার ওয়াশরুম থেকে বের হলেই নিতে হবে।” মেয়েটার কথা শুনে সাঁঝের পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। সে খেয়াল করল, ড্রেসআপ রুমের ভেতরের এটাচড ওয়াশরুমের দরজাটা বন্ধ, আর ভেতর থেকে পানির শব্দ আসছে। তার মানে আরযান ভাইয়া এই মেয়ের সাথে রুমে ঢোকেনি, সে আসলে স্রেফ ওয়াশরুম ব্যবহার করতে এসেছে! আর মেয়েটা এসেছে তার অফিশিয়াল স্পন্সরশিপের কাজের প্রয়োজনে, অন্য আরেকজন সহকর্মীর সাথে! সাঁঝের নিজের ওপর নিজের এতটাই লজ্জা আর ঘেন্না হলো যে তার মনে হচ্ছিল মেঝের শ্বেতপাথরটা যদি এখন দুভাগ হয়ে যেত, তবে সে তার ভেতর ঢুকে পড়ত। সে যে তীব্র জেলাসির বশে কতটা অন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তা ভেবে তার নিজের কান দুটো লজ্জায় গরম হয়ে লাল হয়ে উঠল। সে আমতা আমতা করে রুম থেকে পা বাড়িয়ে পেছনের দিকে পালাতে যাবে, ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজাটা খুলে গেল। ভেতর থেকে বের হয়ে এল মীর আরযান শান। সে এতক্ষণে তার সেই কাদা-মাখা ১০ নম্বর জার্সিটা বদলে একটা ফর্সা সাদা কটন শার্ট পরে নিয়েছে, কিন্তু শার্টের ওপরের দুটো বোতাম এখনো আলগা। তার চুলগুলো ভেজা, কপাল বেয়ে দু-এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছে। ওয়াশরুম থেকে বের হতেই আরযানের তীক্ষ্ণ, গম্ভীর চোখ জোড়া সোজা গিয়ে পড়ল দরজার কাছে চোরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা সাঁঝের ওপর। আরযান এক মূহূর্তের জন্য থামল। সে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বড্ড মাপা কদমে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, “মিস রিয়া, আপনাদের পেপারসগুলো আমার পিএ-র কাছে রেখে দিন, আমি কাল সাইন করে দেব। নাও এক্সকিউজ মি।”

মেয়েটি আর তার সহকর্মী দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে যেতেই আরযান ড্রেসআপ রুমের দরজাটা আলতো করে টেনে বন্ধ করে দিল। পুরো রুমে এখন শুধু আরযান আর সাঁঝ। আরযান সাঁঝের খুব কাছে এগিয়ে এল। পারফিউমের সুবাস আর তার লম্বা চওড়া শরীরের ছায়ায় সাঁঝ আবার এক মূহূর্তে কেঁচো হয়ে গেল। সে মাথা নিচু করে নিজের শাড়ির আঁচলটা আঙুলে পেঁচাতে লাগল। আরযান সাঁঝের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, পকেটে হাত গুজে ধমকের সুরে জিজ্ঞেস করল, “খেলোয়াড়দের অফিশিয়াল ড্রেসিংরুমে তুই কী করছিস সাঁঝ? আর একটু আগে যেভাবে দরজা ধাক্কা দিয়ে ঢুকালি, মনে হলো যেন কোনো চোর ধরতে এসেছিস। হোয়াট ইজ দিস?”

সাঁঝের গলা দিয়ে তখন কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। সে লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মুখটা আরও নিচু করে বিড়বিড় করে বলল, “না… মানে আরযান ভাইয়া… আমি… আমি আসলে আরভিদ ভাইয়ার জন্য… না, মানে আপনার জন্য…”

আরযান আর সাঁঝকে বাহানা বানানোর সুযোগ দিল না। সে এক কদম আরও এগিয়ে এসে সাঁঝের চিবুকটা নিজের শক্ত, ফর্সা আঙুলের মুঠোয় চেপে ধরে মুখটা ওপরে তুলল। আরযানের সেই নেশাতুর, গভীর চোখ জোড়া সাঁঝের চোখের ভেতর যেন এক তীব্র অপরাধবোধের তড়িৎপ্রবাহ তৈরি করল। আরযান বড্ড নিচু গলায় বলল, “মিথ্যে বলা বন্ধ কর সাঁঝ। তোর ওই ফোলা মুখ, করিডোর ধরে চোরের মতো আমার পিছু নেওয়া আর এই রুমে এসে হাতে-নাতে ধরার চিল-দৃষ্টি সব মীর আরযান মাঠের ভেতর থেকেই লক্ষ্য করছে। কেন রে সাঁঝ? তুই কি জেলাস হচ্ছিস?”

সাঁঝ আর নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারল না। আরযানের শার্টের হাতাটা আলতো করে ছুঁয়ে, কাঁপা গলায় বলল, “হ্যাঁ… হ্যাঁ, হচ্ছিলাম জেলাস! আমি সহ্য করতে পারছিলাম না ওভাবে অন্য কোনো মেয়ে আপনার গায়ের ওপর পড়ুক, আপনার বাহু ছুঁয়ে কথা বলুক। আপনি শুধু আমার আরযান ভাইয়া… আপনার ওপর শুধু আমার…!”

কথাটা শেষ করার আগেই সাঁঝ লজ্জায় আরক্ত হয়ে আরযানের চওড়া বুকে নিজের মুখটা গুঁজে দিল। আরযান আর নিজের ভেতরের অবাধ্যতা চেপে রাখতে পারল না। সে সাঁঝের কোমরটা এক ঝটকায় নিজের দিকে টেনে এনে শক্ত করে পিষে ফেলল, আর অন্য হাত দিয়ে সাঁঝের ভেজা চুলে বিলি কেটে বড্ড ফিসফিস করে বলল, “বলেছিলাম না সাঁঝ, মীর বাড়ির ছেলের এই খাঁচায় বন্দি থাকাটাই তোর ভাগ্যের সবচেয়ে সুন্দর নিয়ম। এবার বুঝলি তো, কত ধানে কত চাল?”

সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সেই শতাব্দী প্রাচীন জমিদার বাড়িটার চারপাশ জুড়ে তখন থমথমে অন্ধকার। সদর দরজার ওপরে ঝুলানো বিশাল হ্যালোজেন বাতিটার আলোয় চারপাশের পুরোনো শ্যাওলা ধরা দেয়ালগুলোকে কেমন যেন অপার্থিব দেখাচ্ছে। ‘সমর্পণ’ সিনেমার আউটডোর শুটিংয়ের সেট তৈরি হয়েছে এই বাড়ির বিশাল নাচঘরে। চারদিকে ভারী রাজকীয় পর্দা, ঝাড়বাতি আর রজনীগন্ধার সুবাসে ঘরটা ম ম করছে। পুরো সেটে তখন পিনপতন নীরবতা। ডিরেক্টর প্যানেলের মনিটরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর। লাইটম্যান, ক্যামেরা ক্রু সবাই যে যার পজিশনে রেডি। আজ শুটিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং হাই-ভোল্টেজ দৃশ্য নায়ক আর নায়িকার বিয়ের ক্লাইম্যাক্স। পর্দার আড়াল থেকে যখন প্রত্যাশা বের হয়ে এল, তখন পুরো সেটের লোক এক মূহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ি, গা ভর্তি ভারী গয়না, প্রত্যাশাকে একদম সত্যিকারের রাজকন্যে রাজবধূর মতো দেখাচ্ছিল। তার ফর্সা মুখটা লজ্জায় আর উত্তেজনায় সামান্য লাল হয়ে আছে। সে আলতো করে নিজের শাড়ির আঁচলটা সামলাতে সামলাতে সেটের মাঝখানে মঞ্চে এসে বসল। সেখানে ইতিমধ্যে শেরওয়ানি আর মাথায় রাজকীয় পাগড়ি পরে বসে আছে সুপারস্টার মীর আরবিন প্রাণ। প্রাণের ফর্সা, ধারালো চেহারায় আজ গম্ভীর মাদকতা। তার সেই চতুর চোখ দুটো যখন লাল বেনারসি পরা প্রত্যাশার ওপর স্থির হলো, তখন তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। মীর বাড়ির ছেলেদের চোখের সেই চিলতে হাসির গভীরতা মাপা সাধারণ কোনো মেয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। মঞ্চের ঠিক সামনে বসে আছেন একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক, যাঁর সামনে খোলা রয়েছে একটি আসল, বড় আকারের লাল খাতা যাকে কাবিননামা বলে। প্রত্যাশা প্রাণের পাশে এসে বসতেই প্রাণ বড্ড নিচু গলায় বলল, “আজ তোমাকে বড্ড বেশি খতরনাক সুন্দর লাগছে, প্রত্যাশা। একদম আমার আসল খাঁচার বন্দি পাখির মতো।”

প্রত্যাশা সরল মনে হেসে ফিসফিস করে বলল, “প্রাণ ডিরেক্টর সাহেব তো বললেন এই সিনের জন্য একদম রিয়াল ফিল আনতে হবে। কিন্তু এই কাজি সাহেবকে দেখে তো পুরো আসল মনে হচ্ছে! উনি যেভাবে খাতা খুলে বসে আছেন, আমার তো এখনই নার্ভাস লাগছে।”

প্রাণ তার চোখের সানগ্লাসটা টেবিলের এক কোণে সরিয়ে রেখে প্রত্যাশার খুব কাছাকাছি ঘেঁষে বসল। তার শরীর থেকে আসা পারফিউমের তীব্র সুবাস প্রত্যাশাকে এক মূহূর্তে আচ্ছন্ন করে ফেলল। প্রাণ গম্ভীর গলায় বলল, “মীর আরবিন প্রাণের সিনেমায় কোনো নকল জিনিসের জায়গা নেই, প্রত্যাশা। আমি যা করি, তা নিখুঁত এবং রিয়াল করি। স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী যখন কাজি সাহেব সই করতে বলবেন, তুমি কোনো দ্বিধা না করে নিজের আসল সইটা করে দেবে। ঠিক আছে?”

“হ্যাঁ, অবশ্যই। শটের জন্য আমি রেডি,” প্রত্যাশা মাথা নাড়াল।

ডিরেক্টর চিল চিৎকার দিয়ে উঠলেন, “রোলিং… ক্যামেরা… অ্যাকশন!”

কাজি সাহেব তাঁর গম্ভীর গালগলা কাঁপিয়ে যাবতীয় জিনিস পড়া শুরু করলেন। কিন্তু প্রত্যাশার বাবার নাম কেন নেওয়া হলো? জিজ্ঞেস করতেই প্রাণ জানাল, “বললাম তো সব রিয়েল রেখেছি।”

ক্যামেরার লেন্সগুলো এক এক করে তাদের ক্লোজ-আপ শট নিচ্ছিল। কাজি সাহেব বিয়ের নিয়মকানুন শেষ করে সেই বিশাল লাল খাতাটা প্রত্যাশার দিকে এগিয়ে দিলেন।

“ প্রত্যাশা, আপনি ২০ লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া, মীর আরবিন প্রাণকে স্বামী হিসেবে কবুল করিয়া এই রেজিস্ট্রি খাতায় স্বাক্ষর করুন।”

প্রত্যাশা স্ক্রিপ্টের সংলাপ মনে করে অত্যন্ত সাবলীলভাবে কলমটা হাতে নিল। সে খাতায় নির্দিষ্ট জায়গায় নিজের অফিশিয়াল স্বাক্ষর, ‘প্রত্যাশা’ লিখে দিল। তার হাতটা সামান্য কাঁপছে, কিন্তু সে ভাবল এটা হয়তো চরিত্রের প্রয়োজনেই হচ্ছে। তার ওপর এই সিনেমায় সবার সব রিয়েল নাম ব্যবহার করা হয়েছে, আবার পরিচয়। একেবারে নতুনত্ব! এরপর খাতাটা প্রাণের সামনে দেওয়া হলো। প্রাণ এক মূহূর্ত সময় নষ্ট না করে, অত্যন্ত দৃঢ় হাতে নিজের চেনা স্বাক্ষরটা বসিয়ে দিল, ‘মীর আরবিন প্রাণ’।

“কাট! কাট! পারফেক্ট শট! ওয়ান টেক ওকে!” সাব ডিরেক্টর সাহেব চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে হাততালি দিয়ে উঠলেন। পুরো সেটের মানুষ একসঙ্গে চিৎকার করে হাততালি দিয়ে উঠল। লাইটগুলো এক এক করে নিভিয়ে দেওয়া হলো, ক্রু মেম্বাররা ক্যামেরা প্যাক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। প্রত্যাশা একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে গা থেকে ভারী গয়নাগুলো খোলার জন্য চেয়ার থেকে উঠতে গেল। কিন্তু সে এক কদম বাড়ানোর আগেই এক জোড়া শক্ত, চওড়া হাত পেছন থেকে এসে তার কোমরটা জড়িয়ে ধরল। এক তীব্র টানে প্রত্যাশাকে আবার বসিয়ে দেওয়া হলো। প্রত্যাশা চমকে উঠে পেছনে তাকাল। প্রাণ তখনো তার শেরওয়ানি পরে বসে আছে,

“প্রাণ ভাইয়া? কী করছেন? শট তো ওকে হয়ে গেছে। ছাড়ুন, আমি কস্টিউম চেঞ্জ করতে যাব,” প্রত্যাশা কিছুটা অবাক হয়ে বলল। প্রাণ তার পকেট থেকে একটা ছোট্ট ভাঁজ করা কাগজ বের করে প্রত্যাশার চোখের সামনে ধরল। ওটা আর কিছু নয়, মীর আরবিন প্রাণ এবং প্রত্যাশার আসল কাবিননামার অফিশিয়াল কার্বন কপি! প্রাণ প্রত্যাশার কানের কাছে নিজের মুখটা এনে বুক কাঁপানো গলায় বলল, “শুটিংয়ের শট শেষ হয়েছে প্রত্যাশা, কিন্তু আমাদের জীবনের আসল শট তো এইমাত্র শুরু হলো। এই কাজি সাহেব কোনো জুনিয়র আর্টিস্ট নন, উনি সিলেটের স্থানীয় আসল সরকারি কাজি। আর এই কাবিননামায় তুমি যে সইটা করেছ, ওটা কোনো সিনেমার প্রপস নয়। ওটা তোমার আইনি বিয়ের দলিল। কবুল যে পড়লে ওটাও আমার রিয়েল ছিল।”

প্রত্যাশার ফর্সা মুখটা এক মূহূর্তে কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। তার পুরো শরীর ভয়ে কাঁপতে লাগল। সে অবুঝের মতো বলল, “মজাক… মজাক বন্ধ করুন প্রাণ ভাইয়া! এটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট ছিল! আপনি সাব ডিরেক্টরের সাথে মিলে আমাকে বোকা বানাচ্ছেন, তাই না?” প্রাণ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ঠোঁটের কোণে সেই চতুর শয়তানি হাসিটা ফুটিয়ে তুলল। সে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে রুমের দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিল। তারপর ফিরে এসে প্রত্যাশার চিবুকটা নিজের ফর্সা হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল।

“মীর বাড়ির ছেলেরা ভালোবাসা নিয়ে কোনো মজাক করে না, প্রত্যাশা। মিডিয়ার এই ঝলমলে দুনিয়ায় তোমায় আমি একা ছেড়ে দেব, আর অন্য কোনো ছেলে তোমার এই সরলতার সুযোগ নেবে তা মীর আরবিন প্রাণ বেঁচে থাকতে হতে দেবে না। তুমি এখন মীর বাড়ির রেজিস্ট্রি করা বউ। আর মীর বাড়ির ছেলেদের ডিকশনারিতে নিজের বউকে হাতছাড়া করার কোনো নিয়ম নেই।” প্রত্যাশা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, তার চোখ থেকে নোনা জল গড়িয়ে চন্দনের ফোঁটাগুলোকে ধুয়ে দিতে লাগল। “আপনি আমার সাথে চিটিং করেছেন! আমি এই বিয়ে মানি না! আমি এখনই সবাইকে বলে দেব!” প্রাণ এক ঝটকায় প্রত্যাশাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে পিষে ধরল। সে অটল গলায় বলল, “কাকে বলবে, বউ? আইনত তুমি এখন আমার। আর এই মীর আরবিন প্রাণ এখন বউ ছাড়া এক পা-ও নড়বে না। আগামীকালের আউটডোর শ্যুট বাতিল। নইলে ক্যারিয়ার তো দূর, এই ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমতিও পাবে না। এখন ভালো মেয়ের মতো নিজের এই চোখের জলটুকু মুছে নাও, কারণ মীর বাড়ির বউদের কাঁদতে নেই ওদের কাজ শুধু স্বামীদের ভালোবাসা আর আদর খাওয়া।

প্রত্যাশা স্তব্ধ হয়ে প্রাণের সেই চওড়া বুকের মাঝে বন্দি হয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, ভালোবাসার ফাঁদ কতটা নিখুঁত আর ভয়ঙ্কর হয়। সেখান থেকে মুক্তির কোনো পথ নেই।

ড্রেসআপ রুমের ভেতরের সেই থমথমে অথচ তীব্র ওম মাখানো পরিবেশটা হুট করেই ভেঙে গেল বাইরের করিডোর থেকে ভেসে আসা কতগুলো চেনা গলার আওয়াজে। আরভিদ, আর্যা আর মা-চাচিদের গলার আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। তারা সাঁঝ আর আরযানকে খুঁজতে খুঁজতেই এই জোনের দিকে এগিয়ে আসছেন। “আরে সাঁঝ মেয়েটা পানি আনতে গেল, নাকি নিজেই পানির ফিল্টারে ঢুকে গেল? আর শান ভাইয়াও তো এই রুমের দিকেই এল!” আরভিদের সেই চপল, উস্কানিমূলক গলার আওয়াজ একদম দরজার কাছাকাছি আসতেই আরযানের পাথুরে চোয়াল জোড়া আবার শক্ত হয়ে উঠল। সে সাঁঝকে নিজের বুক থেকে আলতো করে সরিয়ে এক ঝটকায় ড্রেসআপ রুমের দরজাটা টেনে পুরোটা খুলে দিল। দরজার ওপাশে তখন আরভিদ হাত উঁচিয়ে আর্যাকে কিছু বলছিল, আর মা-চাচিরা চারপাশটা দেখছিলেন। হুট করে আরযানের এই রণমূর্তি দেখে সবাই এক মূহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। আরযান তার সেই ১০ নম্বর জার্সির ক্যাপ্টেনের কড়া, গমগমে গলার আওয়াজে এক তীব্র ধমক দিয়ে বলল, “প্লেয়ার্স জোনের অফিশিয়াল ড্রেসিংরুমে আপনারা এভাবে পুরো স্কোয়াড নিয়ে কী করছেন? এটা কি মীর বাড়ির ড্রয়িংরুম? আরভিদ, সবাইকে নিয়ে এক্ষুনি লাউঞ্জের দিকে যাহ। মেইন গেটের বাইরে মিডিয়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, ফ্যামিলিকে এভাবে এখানে দেখলে কালকের নিউজে উল্টোপাল্টা ছাপা হবে। গেট আউট ফ্রম হেয়ার, নাও!”

আরযানের সেই ধমক শুনে মা-চাচিরা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালেন না। তারা দ্রুত উল্টো পথে হাঁটা দিলেন। আরভিদ আর্যার দিকে তাকিয়ে একটা শুকনো ঢোক গিলে বিড়বিড় করে বলল, “ভাইয়া তো মাঠে গোল দেওয়ার পরও দেখছি লাল কার্ড দেখানোর মুডে আছে! চলো চলো, কেটে পড়ি।”

সবাই যখন করিডোর ধরে প্রায় দৌড়ে পালাচ্ছে, সাঁঝও সেই ভিড়ের সুযোগ নিয়ে চোরের মতো মাথা নিচু করে তাদের পেছনে পেছনে কেটে পড়তে চাইল। সে বড্ড মাপা কদমে এক পা বাড়াতেই পেছন থেকে আরযানের সেই হাড় কাঁপানো গলার আওয়াজ ভেসে এল, “তুই না সাঁঝ। তুই এখানেই থাকবি।” কথাটা শোনামাত্রই সাঁঝের পা যেন মেঝের সাথে জমে পাথর হয়ে গেল। তার পুরো শরীর ভয়ে শিউরে উঠল, বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করে কাঁপতে কাঁপতে যেন এক মূহূর্তে থেমে গেল। সে ঘুরে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। করিডোরের শেষ মাথায় আরভিদ আর আর্যা একবার পেছনের দিকে তাকিয়ে সাঁঝের জন্য একটা করুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেল। আরযান দরজাটা আবার ধীর পায়ে টেনে লক করে দিল। পুরো রুমে এখন কেবল এসি চলার মৃদু শব্দ আর সাঁঝের নিজের বুকের দ্রুত ধড়ফড়ানি। আরযান আর কোনো তাড়া দেখাল না। সে শিকারি চিতাবাঘের মতো ধীর পায়ে সাঁঝের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তার পকেটে দুই হাত গোঁজা, চোখ জোড়া সাঁঝের লাল হয়ে যাওয়া কানের লতি আর কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ওপর স্থির। আরযানের এই শান্ত অবয়ব সাঁঝকে আরও বেশি কোণঠাসা করে ফেলল। সে পেছনের দিকে দু কদম পিছিয়ে যেতেই তার পিঠটা গিয়ে ঠেকল ড্রেসআপ রুমের শক্ত কাঠের আলমারির সাথে। আর পালানোর কোনো পথ নেই। আরযান সাঁঝের একদম ইঞ্চি খানেক দূরত্বে এসে দাঁড়াল। তার গা থেকে তখনো সেই পারফিউম আর পুরুষের তীব্র জেদি সুবাস আসছে, যা সাঁঝের মগজকে অবশ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সাঁঝ ভয়ে আর একদম কুঁকড়ে গিয়ে দুই হাত দিয়ে নিজের শাড়ির আঁচলটা বুকের কাছে শক্ত করে চেপে ধরল। সে আর চুপ থাকতে পারল না। আরযানের অবাধ্য দৃষ্টির চাপ সহ্য করতে না পেরে সে একনাগাড়ে বলতে শুরু করল, “আমি… আমি সত্যি ভুল করে ফেলেছি আরযান ভাইয়া। আমার আরভিদ ভাইয়ার বোতলের পানি খাওয়া উচিত ছিল। আমি কেন যে এখানে আসতে গেলাম! আপনি… আপনি প্লিজ আমার ওপর এভাবে রাগ করবেন না। আমি তো আপনার অধিকার মেনে নিয়েছি। আমি তো বললামই যে আমি জেলাস হচ্ছিলাম। ওই মেয়েটা আপনার এত কাছে গিয়ে কথা বলছিল কেন? আপনিও তো বড্ড হাসিমুখে সেলফি তুলছিলেন! আমার কি একটুও খারাপ লাগতে পারে না? আপনি আমাকে যা শাস্তি দেওয়ার দিন, বকুন, ঘরে বন্দি করে রাখুন… তাও এভাবে চোরের মতো আটকে রেখে ভয় দেখাবেন না, প্লিজ!”

সাঁঝের এতগুলো কথার বিপরীতে আরযান একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। সে কেবল নীরব দর্শকের মতো সাঁঝের এই ছটফটানি, তার চোখের কোণে জমে থাকা নোনা জলের চকচকে আভা আর ভয়ার্ত মুখাবয়ব দেখছে। আরযানের এই মৌনতা সাঁঝের বুকের ভেতর তিরের মতো বিঁধছে। যখন আরযান আরও এক কদম এগিয়ে এসে সাঁঝের একদম গায়ের ওপর নিজের চওড়া শরীরের ছায়াটা ফেলল, তখন সাঁঝ আর নিতে পারল না। সে ভাবল আরযান ভাইয়া হয়তো এবার তার সেই কড়া শাসনের চাবুকটা চালাবে, নয়তো তাকে কোনো বাঁধনে পিষে ফেলবে। সে নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিল। তার লম্বা চোখের পাতাগুলো কাঁপছে, ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরে সে একটা গভীর নিশ্বাসের অপেক্ষা করছে।

কিন্তু তার ধারণাকে সম্পূর্ণ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে আরযান তার ওপর কোনো অধিকার খাটাল না। সে সাঁঝের খুব কাছে, একদম তার কানের লতির কাছে নিজের তপ্ত নিশ্বাস ফেলে বুক কাঁপানো গম্ভীর গলায় বলল, “আমি তুই না, সাঁঝ। আমি মীর আরযান শান।”

আরযানের মুখের এই একটা কথাই সাঁঝকে এক মূহূর্তে চোখ খুলতে বাধ্য করল। আরযান সাঁঝের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বড্ড নিরাসক্ত গলায় বলতে লাগল, “আমার সব জায়গায় মুখ দেওয়ার স্বভাব না, সাঁঝ। কুকুর চিনিস? কুকুর রাস্তার মোড়ে মোড়ে, সবখানে মুখ দিয়ে বেড়ায়। মীর আরযান কোনো রাস্তার কুকুর নয় যে যেকোনো সুন্দর মুখ দেখলেই সেখানে নিজের অধিকার বিলিয়ে দেবে। আমার ডিকশনারিতে যাকে একবার ‘আমার’ বলে সিলমোহর দেওয়া হয়, সে ছাড়া এই পৃথিবীর কোনো নারী আমার বাহু স্পর্শ করার যোগ্যতা রাখে না। সেটা অফিশিয়াল সেলফি হোক কিংবা স্পন্সরের কাজ।”

কথাগুলো বলে আরযান সাঁঝের চিবুক থেকে নিজের হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে নিল। সে সাঁঝের দিকে আর একটিবারও না তাকিয়ে, তার এই কান্নায় ভেজা মুখ আর এক বুক খালি অনুভূতিকে কোনো পাত্তা না দিয়ে মাপা কদমে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

সে দরজার লকটা খুলে করিডোরে পা রাখার আগে শেষবারের মতো ঘুরে তাকাল। আরযান ঠান্ডা গলায় বলল, “নিজের ভুলটা যখন বুঝতে পেরেছিস, তখন এবার একাই লাউঞ্জের দিকে আয়। মীর আরযানের ছায়া আজ থেকে তোর সাথে তখনই থাকবে, যখন তুই মীর বাড়ির বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে শিখবি। পথ ছাড়লাম, এবার নিজের ইচ্ছেমতো চল।” আরযান পাশ কাটিয়ে করিডোর ধরে মাপা কদমে হেঁটে নিচে নেমে গেল। পুরো ড্রেসআপ রুমে সাঁঝ একা দাঁড়িয়ে রইল। দেয়ালের আলমারিটা শক্ত করে ধরে সে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার চোখের জল তখন বাঁধভাঙা বন্যার মতো গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। আরযানের সেই ‘কুকুর চিনিস?’ কথাটা তার এই তীব্র ব্যক্তিত্বের চড়টা সাঁঝের বুকে তিরের মতো বিঁধে রইল। সে আজ বুঝতে পারল, মীর আরযানকে শাসন করা কিংবা তার ভালোবাসাকে খাঁচা ভাবাটা কত বড় ভুল ছিল। সে এক চরম একাকীত্বের নরকে নিজেকে আবিষ্কার করল, যেখানে আরযানের এই ফেলে যাওয়া দূরত্বটাই তার সবচেয়ে বড় শাস্তি।

[চলবে…]

( ৫k+ শব্দের একটা তবুও এই লেখা বৃথা৷ কারন এই গল্পের তেমন রেসপন্স নাই। ১ হাজার রিয়েক্টও উঠে না। আর কি বলব?)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply