#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
ঘরে এসে সাঁঝ বিছানার এক কোণে কাঠের পুতুলের মতো বসে রইল। তার পরনে তখন মেজো খালার জোর করে পরিয়ে দেওয়া হলুদ আর কাঁচা সবুজ রঙের একটা ঐতিহ্যবাহী সুতির শাড়ি। চুলে আলগা একগোছা বেলী ফুলের মালা জড়ানো, যার মিষ্টি সুবাস এই মুহূর্তে তার বিষাক্ত মনে একটুও শান্তি দিতে পারছিল না। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে সাঁঝের নিজেরই নিজেকে বড় অচেনা লাগছিল। চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু শাড়ির আঁচলে মুছে সে নিজের ভেতরের কান্নাটাকে জেদে রূপান্তর করার চেষ্টা করল। কিন্তু এই মুহূর্তে তার বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়েও বুকের ভেতরের ঝড়টা অনেক বেশি তীব্র ছিল। আরযানের সেই কথাগুলো, “যদি নিজে হেঁটে ভেতরে না যাস সাঁঝ, তবে সবার সামনে তোকে কোলে তুলে ভেতরে নিয়ে যেতে আমার এক সেকেন্ডও লাগবে না।” তার কানের ভেতর তীব্র এক সাইরেনের মতো বাজছিল। লোকটার এত জেদ, এত অহংকার আর এত অধিকারবোধ কোথা থেকে আসে? সে কি আসলেই তাকে নিজের সম্পত্তি ভাবে? মীর বাড়ির সীমানা যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকে নাকি ওনার নজরদারি আরও কড়া হয়! কী অদ্ভুত, কী ভয়ঙ্কর এক বৈপরীত্যে ঘেরা এই পুরুষ!
সাঁঝের ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল যখন সাইরা শেখ ঘরে ঢুকলেন। তাঁর হাতে রুপোর বাটিতে রাখা কিছুটা খাঁটি সরষের তেল আর হলুদের বাটা। তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কী রে সাঁঝু? এখনও এভাবে কাঠের পুতুলের মতো বসে আছিস? নিচে সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে। মেজো খালার ননদিনী তোকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। আর মেলবোর্ন থেকে আসা ওই আদিব ছেলেটা… আহা, কী মার্জিত ব্যবহার, কী চমৎকার রাজপুত্র মার্কা চেহারা! সারাক্ষণ শুধু জিজ্ঞেস করছে, ‘সাঁঝ কোথায়? সাঁঝের শরীর ঠিক আছে তো?’ তুই জলদি নিচে চল। ঢাকার ওই ধুলোবালি থেকে এসে এখানে মুখ অন্ধকার করে রাখলে চলে?”
সাঁঝ মায়ের দিকে তাকিয়ে নিজের ভেতরের ক্ষোভটুকু আড়াল করার চেষ্টা করল। সে অত্যন্ত ধীর অথচ শক্ত গলায় বলল, “আম্মু, আরযান ভাইয়া কেন এসেছে এখানে? ওনার তো ঢাকায় জরুরি আন্তর্জাতিক মিটিং ছিল। ওনার কি মীর এভিয়েশনে কোনো কাজ নেই? সারাক্ষণ আমার ওপর নজরদারি করা আর আমার জীবনটাকে একটা লোহার খাঁচায় বন্দি করা ছাড়া ওনার জীবনে কি আর কোনো উদ্দেশ্য নেই? উনি কেন আমার প্রতিটা পদক্ষেপে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান?”
সাইরা শেখ মেয়ের কপালে একটু হলুদের ছোঁয়া দিয়ে আদর করে বললেন, “তুই আরযানকে এখনও চিনতে পারলি না সাঁঝু? ও মীর বাড়ির বড় ছেলে। আফজাল শাহরিয়ারের পর এই পুরো মীর বংশের মান-সম্মান, ব্যবসা আর দায়িত্ব ওর একার কাঁধে। তুই ঢাকায় একা থাকিস, তোর নিরাপত্তা, তোর ভালো-মন্দ সবকিছু ও নিজের জীবনের চেয়েও বেশি সতর্কতায় দেখে। আর তাছাড়া, আরযান তোকে ছোটবেলা থেকে কতটা আগলে রেখেছে তা কি তুই জানিস না? ওর শাসনটা একটু কড়া হতে পারে, ও একটু হিটলার স্বভাবের হতে পারে, কিন্তু ওর মনে কোনো পাপ নেই। ও যা করে, তোর মঙ্গলের জন্যই করে।”
“মন পাপহীন হলে মানুষ এভাবে খাঁচায় বন্দি করে না, আম্মু,” সাঁঝ মনে মনে বলল, কিন্তু মুখে কিছু উচ্চারণ করল না।
সে খুব ভালো করেই জানে, আরযানের ভেতরের সেই অন্ধকার জগতটা মীর বাড়ির বাকি সদস্যরা কেউ দেখতে পায় না। তারা শুধু দেখে এক দায়িত্ববান, সফল, গম্ভীর এবং আদর্শ বড় ভাইকে। কিন্তু সেই চাদরের নিচে যে এক ভয়ঙ্কর, দমবন্ধ করা একনায়ক লুকিয়ে আছে, তার মুখোমুখি শুধু সাঁঝকেই হতে হয়। প্রতিটা সেকেন্ডে তার স্বাধীনতাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া মীর আরযানের আসল রূপ শুধু সাঁঝেরই চেনা। ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে আরভিদের চিরচেনা কাশির শব্দ শোনা গেল। সাইরা শেখ উঠে দাঁড়িয়ে বললে, “আচ্ছা, আমি নিচে যাচ্ছি। মেজো খালার ওখানে অনেক কাজ বাকি। আরভিদ, তুই তোর বোনকে নিচে নিয়ে আয়। জলদি করিস, গায়ে হলুদের সময় পার হয়ে যাচ্ছে।”
সাইরা শেখ ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই আরভিদ ঘরে ঢুকে ধীরপায়ে সোফায় এসে বসল। তার বগলে যথারীতি সেই চামড়ার ডায়েরিটা শক্ত করে ধরা। সে সাঁঝের দিকে তাকিয়ে চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে এক অদ্ভুত রহস্যময় হাসি হেসে বলল, “পলিটিক্যাল সায়েন্সের নতুন আপডেটটা বেশ চড়া এবং গরম, সাঁঝ। আরযান ভাইয়া নিচে এসে সোজা মেজো চাচার পাশে বসেছেন। ওনার পরনে এখন কুচকুচে কালো রঙের এক সিল্কের পাঞ্জাবি। পুরো লিভিং রুমের তাপমাত্রা ওনার উপস্থিতিতে মাইনাস ডিগ্রিতে নেমে গেছে। আদিব বেচারা এতক্ষণ মেলবোর্নের গল্পে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে রেখেছিল, কিন্তু আরযান ভাইয়াকে দেখার পর থেকে সে কেমন যেন জেনারেটরের তেলের হিসাব মেলাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তুই কি ভেতরে কোনো পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিস?”
সাঁঝ শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে মুঠো করে ধরে ক্ষিপ্ত গলায় বলল, “উনি একটা জল্লাদ, আরভিদ ভাইয়া! উনি একটা আস্ত হিটলার! উনি আমাকে জাস্ট হুমকি দিয়ে গেছেন, আমি যদি আজ আদিব ভাইয়ার আশেপাশে যাই, তবে উনি আমাকে আজ রাতেই জোর করে ঢাকা নিয়ে যাবেন। উনি নিজেকে কী ভাবেন? আমি ওনার কোনো কেনা গোলাম? আমি এই অন্যায্য শাসন আর মেনে নেব না।”
আরভিদ ডায়েরির পাতায় খসখস করে কিছু একটা লিখল, তারপর অত্যন্ত গম্ভীর ও দার্শনিক গলায় বলল, “গোলাম নোস সাঁঝু, তুই হচ্ছিস মীর আরযানের লাইফের একমাত্র ‘আনপ্রেডিক্টেবল ভ্যারিয়েবল’। আরযান ভাইয়া পৃথিবীর সব বড় বড় করপোরেট ডিল, মীর এভিয়েশনের কোটি টাকার ইন্টারন্যাশনাল প্রোজেক্ট এক তুড়িতে কন্ট্রোল করতে পারেন। কিন্তু তোকে কন্ট্রোল করতে গেলেই ওনার আইটি ল্যাব আর সিকিউরিটি ফোর্স ফেল মেরে যায়। আর সেই কারণেই ওনার এই আগ্রাসী, স্বৈরাচারী রূপ। তুই এটাকে শাসন ভাবছিস, কিন্তু পলিটিক্যাল সায়েন্সের ভাষায় একে বলে ‘টেরিটোরিয়াল ইমপালস’। মানে নিজের সীমানা আর নিজের প্রিয় বস্তুকে রক্ষা করার এক লড়াই। তুই বরং সাবধানে থাকিস সাঁঝ। বাঘ যখন একদম চুপ থাকে, তখন সে শিকারের জন্য আরও বড় আর ভয়ঙ্কর লাফ দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়। আরযান ভাইয়ার এই শান্ত রূপটাই সবচেয়ে বেশি ডেঞ্জারাস।”
সাঁঝ আরভিদের কথার কোনো উত্তর দিল না। সে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের ভেতরের সবটুকু ভয়কে একপাশে সরিয়ে রেখে নিজের মেরুদণ্ড সোজা করল। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, আরযানের এই অন্যায্য, স্বৈরাচারী ডিক্টেশনের সামনে সে আজ মাথা নোয়াবে না। যদি খাঁচা ভাঙতে হয়, তবে সে আজই ভাঙবে। সে দেখতে চায়, মীর আরযান শান সবার সামনে তাকে কীভাবে আটকায়।
–
বিকেলের গোধূলি আলো মিলিয়ে যেতেই জমিদার বাড়িটা আলোয় সেজে উঠল। চারদিকের বিশাল আমবাগানের গাছে গাছে ছোট ছোট রঙিন মরিচ বাতি আর টুনি লাইট জ্বালানো হয়েছে, যা দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছে জোনাকির মেলা বসেছে। উঠোনের মাঝখানে তৈরি করা হয়েছে এক বিশাল কাঁচা হলুদের স্টেজ, যা গাঁদা ফুল, মাটির প্রদীপ আর বাঁশের নান্দনিক কারুকাজ দিয়ে সাজানো। সাঁঝ যখন আরভিদের সাথে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো, তখন পুরো উঠোনের কোলাহল আর মানুষের গুঞ্জন যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। হলদে-সবুজ সুতির শাড়িতে তাকে দেখাচ্ছিল ঠিক জীবন্ত তেলচিত্র। যুবকদের ভিড়ে মৃদু গুঞ্জন ভেসে উঠল, কিন্তু মীর বাড়ির কড়া বেষ্টনী ভেদ করার সাহস কারও ছিল না। কিন্তু সাঁঝের চঞ্চল চোখ দুটো পুরো ভিড়ের মাঝে কেবল একজনকে খুঁজছিল। প্যান্ডেলের এক কোণে, যেখানে বড় বড় রাজকীয় সোফা পাতা হয়েছে, সেখানে মীর আরযান শান বসে আছে। তাঁর পরনে সেই কুচকুচে কালো সিল্কের পাঞ্জাবি, যার হাতা দুটো চিরাচরিতভাবে কনুই পর্যন্ত অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গুটানো। তাঁর এক হাতে একটা কাঁচের গ্লাসে কালো কফি, আর অন্য হাতের দীর্ঘ আঙুলগুলো সোফার হাতলে ধীর ছন্দে টোকা দিচ্ছে। তাঁর চোখে এখন কোনো সানগ্লাস নেই, তীক্ষ্ণ চোখ দুটো সোজা গিয়ে স্থির হলো সাঁঝের ওপর। সাঁঝের পায়ের গতি আরযানের মুখোমুখি হতেই এক সেকেন্ডের জন্য শ্লথ হয়ে গেল। সাঁঝের বুকের ভেতরের ড্রামটা আবার এক নতুন রিদমে বাজতে শুরু করল, কিন্তু সে এবার আর চোখ নামাল না। নিজের ভেতরের জেদটাকে সে বর্ম বানিয়ে নিল। ঠিক তখনই আব্রাজ আর রাজ এক কোণ থেকে উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে উঠল,।“আরে সাঁঝ! তোকে তো একদম রাজকুমারী লাগছে! জলদি স্টেজে আয়, মেজো খালার মেয়ের হলুদের মেইন পর্ব শুরু হয়ে গেছে।” সাঁঝ নিজেকে সামলে নিয়ে স্টেজের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু স্টেজের ঠিক নিচেই দাঁড়িয়ে ছিল আদিব। আদিবের পরনে এখন একটা বাসন্তী রঙের রেশমি পাঞ্জাবি, চোখে একরাশ মার্জিত চটপটে ভাব। সাঁঝকে স্টেজের দিকে আসতে দেখে আদিবের এতক্ষণের ক্লান্ত মুখটা আবার মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে এক কদম এগিয়ে এসে অত্যন্ত ভদ্রভাবে বলল, “ওয়াও সাঁঝ! ইউ লুক অ্যাবসোলিউটলি স্টার্নিং! বিশ্বাস করো, মেলবোর্নের কোনো নামী ফ্যাশন শো বা আর্ট গ্যালারিতেও আমি এত পিওর, ট্র্যাডিশনাল বিউটি দেখিনি। তোমার এই লুকটা আসলেই প্রশংসার দাবিদার। গ্রামের এই পরিবেশে তোমাকে একদম মানিয়েছে।”
আদিবের এই সরাসরি এবং অকপট প্রশংসায় সাঁঝের কিছুটা ভালো লাগার কথা ছিল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার অবুঝ মনটা পূর্ণ সায় দিল না। সে আড়চোখে একবার সোফার কোণে বসা আরযানের দিকে তাকাল। আরযান তখন অত্যন্ত ধীরলয়ে তাঁর কফির গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন, কিন্তু সাঁঝ স্পষ্ট দেখতে পেল আরযানের ডান হাতের চোয়ালের পেশিগুলো এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে উঠেছে। আরযানের সেই শান্ত, নিশ্চুপ রূপের আড়ালে যে এক ভয়ংকর কালবৈশাখী ঝড় ধেয়ে আসছে, তা সাঁঝ ছাড়া এই পুরো আসরে আর কেউ টের পাচ্ছিল না। আরযান যেন এক কৃষ্ণপক্ষের মতো পুরো উৎসবের আলোটাকে নিজের অন্ধকারে গ্রাস করতে চাইছে। আরভিদ সাঁঝের ঠিক পাশে এসে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, “সাঁঝ, ডেঞ্জার জোন অ্যালার্ট! রেড লাইন ক্রস হচ্ছে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার কিন্তু বর্ডারলাইনের খুব কাছে চলে এসেছে। আরযান ভাইয়ার ডান হাতের আঙুলগুলো যেভাবে কফির গ্লাসটা চেপে ধরেছে, আমার ভয় হচ্ছে দামী কাঁচের গ্লাসটা এখনই ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। তুই নিজের রিস্কে এই বিপজ্জনক গেমটা খেলছিস। পরে কিন্তু আমাকে বলিস না পলিটিক্যাল সায়েন্স তোকে ওয়ার্নিং দেয়নি।”
সাঁঝ আরভিদের কথাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করল। সে নিজের ভেতরের একরোখা জেদের বশে আদিবের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসিটা ঝুলিয়ে বলল, “ধন্যবাদ আদিব ভাইয়া। আপনার পাঞ্জাবিটাও খুব সুন্দর, একদম মেলবোর্ন স্ট্যান্ডার্ড। আচ্ছা, আপনি নাকি পুরো জমিদার বাড়ির এই লাইটিং ডিজাইন নিজে তদারকি করেছেন? খালামণি বলছিলেন। চলুন না, আমাকে একটু পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখাবেন? ঢাকার ওই চার দেওয়ালে বন্দি থেকে আমার চোখ একদম ক্লান্ত হয়ে গেছে।”
আদিব তো এই সুবর্ণ সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল। গত দুদিন ধরে সে কাজের চাপে সাঁঝের সাথে দুটো ভালো কথা বলার সুযোগ পায়নি। সে সানন্দে মাথা নেড়ে বলল, “অবশ্যই! চলো, পেছনের পুকুরঘাটের লাইটিংটা আমি সবচেয়ে স্পেশালভাবে ডিজাইন করেছি। ওখানকার পানির ওপর আলোর রিফ্লেকশনটা দেখলে তোমার মনে হবে তুমি কোনো রূপকথার অবাস্তব রাজ্যে আছ। চলো, তোমাকে দেখিয়ে আনি।”
সাঁঝ আর এক মুহূর্তও দেরি না করে আদিবের সাথে পেছনের বাগানের অন্ধকার পথের দিকে পা বাড়াল। সে খুব ভালো করেই জানত, সে মীর আরযানের সেই অলিখিত, বিপজ্জনক লক্ষ্মণরেখা পার করছে। কিন্তু তার ভেতরের অবুঝ, জেদি মনটা আজ দেখতে চায় আরযান মীর তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার জন্য কতদূর যেতে পারেন।
–
জমিদার বাড়ির পেছনের পুকুরঘাটটা আসলেই নিঝুম রূপ ধারণ করেছিল। উৎসবের মূল কোলাহল আর ঢাক-ঢোলের শব্দ এখান থেকে কিছুটা দূরে, তাই এখানে বাতাসের মৃদু শব্দ আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। পুকুরঘাটের চারপাশের উঁচু নারকেল আর সুপারি গাছে ঝুলানো হয়েছে নীল এবং সোনালী রঙের সূক্ষ্ম মরিচ বাতি। আদিব ঘাটের বাঁধানো শ্বেতপাথরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সাঁঝের দিকে তাকিয়ে এক গভীর প্রশান্তির শ্বাস নিয়ে বলল,
“মেলবোর্নে যখন রাতের বেলা ইয়াররা নদীর পাড়ে একাকী হাঁটতাম সাঁঝ, তখন প্রায়ই ভাবতাম দেশের মাটির এই শান্ত স্নিগ্ধতা সেখানে কোথায়? আজ তোমাকে পাশে নিয়ে এই নিঝুম পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, আমার দেশে ফেরার সিদ্ধান্তটা একশো ভাগ সঠিক ছিল। শহরের যান্ত্রিকতা থেকে দূরে এই গ্রামীণ পরিবেশটা দারুণ, তাই না?”
সাঁঝ ঘাটের এক কোণে বসে নিজের শাড়ির কুঁচিটা একটু ঠিক করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ওখানকার জীবনটা তো অনেক স্বাধীন, তাই না আদিব ভাইয়া? কেউ কারো ব্যক্তিগত জীবনে অন্যায্য হস্তক্ষেপ করে না, কেউ কারো চারপাশটা বডিগার্ড আর জিপিএস ট্র্যাকার দিয়ে লোহার খাঁচা বানিয়ে রাখে না। মানুষ সেখানে নিজের ইচ্ছেমতো বাঁচতে পারে।”
আদিব একটু নরম হেসে সাঁঝের কিছুটা কাছে এসে বসল। দুজনের মাঝে এখন দূরত্ব কমে মাত্র এক হাতের মতো। আদিব অত্যন্ত কোমল এবং সহমর্মী গলায় বলল, “হ্যাঁ, ওখানে স্বাধীনতা আছে সাঁঝ। কিন্তু জানো তো, অতিরিক্ত স্বাধীনতাও মাঝে মাঝে মানুষকে বড্ড একাকী করে তোলে। মানুষ আসলে দিনশেষে এমন একজনকে খোঁজে, যে তাকে একটু আগলে রাখবে, একটু আগলে রেখে শাসন করবে। তবে হ্যাঁ, সেই শাসনটা যেন অত্যাচারের পর্যায়ে না যায়, তা খাঁচা না হয়ে যেন নীড় হয়। তোমার চোখে আমি এক অদ্ভুত ক্লান্তি আর অজানা ভয় দেখতে পাচ্ছি সাঁঝ। ঢাকাতে কি তোমাকে কেউ খুব বেশি মেন্টাল প্রেসারে রাখে? তোমার ফ্যামিলির কেউ কি তোমার ওপর জোর খাটায়?”
আদিবের এই হঠাৎ করা প্রশ্নটা সাঁঝের মনের ভেতরের এক অত্যন্ত নরম ও ক্ষতবিক্ষত জায়গায় গিয়ে আঘাত করল। সে কিছুক্ষণের জন্য ভুলেই গেল যে সে আরযানকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য, ওনার অহংকার ভাঙার জন্য এখানে এসেছে। তার চোখে এক ফোঁটা তপ্ত জল চলে এলো। সে অত্যন্ত নিচু ও কাঁপা গলায় বলল, “কিছু মানুষ থাকে আদিব ভাইয়া, যারা নিজেদের অহংকার আর অধিকারবোধ ছাড়া আর কাউকেই ভালোবাসতে জানে না। তারা মনে করে পৃথিবীর সব নিয়ম, সব মানুষ শুধু তাদের ইশারাতেই চলবে। তাদের চোখের সামনে থাকা মানেই নিজের দমবন্ধ হয়ে আসা, নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা।”
আদিব সাঁঝের এই আকস্মিক আবেগঘন রূপ আর চোখের জল দেখে কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়ল। সে একজন মার্জিত পুরুষ হিসেবে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই সাঁঝের কাঁধে নিজের হাতটা রাখতে গেল। “ডোন্ট ওয়ারি সাঁঝ, লাইফে সব সমস্যারই কোনো না কোনো সমাধান থাকে। কেউ তোমাকে জোর করতে পারবে না…..” কিন্তু আদিবের হাতটা সাঁঝের কাঁধ স্পর্শ করার আগেই তীব্র, বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বর পুরো পুকুরঘাটের মায়াবী নীরবতাকে চিরে এক নিমেষে টুকরো টুকরো করে দিল। “হাতটা ওখানেই স্থির রাখো আদিব। যদি নিজের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যারিয়ারের সাথে নিজের ডান হাতটাও আস্ত অবস্থায় মেলবোর্নে ফেরত নিয়ে যেতে চাও, তবে আর এক ইঞ্চিও এগোবে না।”
সাঁঝ আর আদিব দুজনেই এক প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। পুকুরঘাটের অন্ধকারের ছায়া আর আমগাছের আড়াল চিরে ধীর পায়ে, ভারী কদমে এগিয়ে এলো মীর আরযান শান। তাঁর সেই কালো সিল্কের পাঞ্জাবিটা রাতের অন্ধকারে তাঁকে আরও বেশি রহস্যময়, দীর্ঘ এবং চরম ভয়ংকর দেখাচ্ছিল। তাঁর ফর্সা মুখটা পুকুরের নীল আলোয় এক নিষ্ঠুর, পাথুরে ভাস্কর্যের মতো লাগছিল। আদিব থতমত খেয়ে দ্রুত নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। মীর আরযানের এই আচমকা এন্ট্রি আর চরম আক্রমণাত্মক কথা শুনে সে নিজের আত্মসম্মানে আঘাত পেল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে একটু কড়া গলায় বলল, “ভাইয়া! আপনি এভাবে আমাদের পার্সোনাল স্পেসে এসে ইন্টারফেয়ার করছেন কেন? উই ওয়ার জাস্ট টকিং। আমরা তো কোনো অন্যায় করছিলাম না। আপনি এভাবে থ্রেট করতে পারেন না।”
আরযান আদিবের কোনো কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনই মনে করল না। সে আদিবের কথার দিকে বিন্দুমাত্র কান না দিয়ে সরাসরি আদিবের চোখের দিকে তাকাল। আরযান অত্যন্ত ক্ষুরধার কণ্ঠে বললেন, “মীর বাড়ির মেয়েদের ‘পার্সোনাল স্পেস’ মীর আরযানের পারমিশন আর সিগনেচার ছাড়া তৈরি হয় না আদিব। আমি তোমাকে আজ বিকেলেই একবার অত্যন্ত মার্জিত ভাষায় ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম যে মীর বাড়ির ভেতরের স্ট্রাকচার অনেক জটিল, এর সিকিউরিটি ড্রিল অনেক কড়া। তুমি মেলবোর্নে বড় বড় ব্রিজের ডিজাইন করতে পারো, কিন্তু এই আর্কিটেকচার ভাঙার মতো লিগ্যাল বা ফিন্যান্সিয়াল ব্যাকআপ তোমার বংশের কারও নেই। এবার এখান থেকে ভদ্রভাবে বিদায় হও, নিচে মেজো চাচা তোমাকে আর ওই জেনারেটরের রসিদটাকে খুঁজছেন। আর হ্যাঁ, যাওয়ার আগে নিজের ইমেইল আর ফ্যামিলির বিজনেস ফাইলটা একটু রিচেক করে নিও, মীর এভিয়েশনের আইটি আর লিগ্যাল উইং কিন্তু অ্যাকশন নিতে খুব বেশি সময় নেয় না। চয়েস ইজ ইয়োরস।”
আরযানের এই সরাসরি, ঠান্ডা মাথায় দেওয়া এবং চূড়ান্ত হুমকি শুনে আদিবের ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে ও নীল হয়ে গেল। সে খুব ভালো করেই জানে, করপোরেট জগতে মীর আরযান শান কে এবং তাঁর ক্ষমতা ও নিষ্ঠুরতা কতদূর বিস্তৃত। এক তুড়িতে মেলবোর্নের পিআর বাতিল করে দেওয়ার ক্ষমতা এই লোকের আছে। সে সাঁঝের দিকে একবার অত্যন্ত অপরাধী, ভীত ও অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। তীরের মতো দ্রুত পায়ে সে মূল উৎসবের আলোর দিকে প্রায় ছুটতে শুরু করল। পুকুরঘাটের সেই নীল-সোনালী আলোর মায়াজালে এখন শুধু দুটো অবয়ব অবশিষ্ঠ রইল।
চলবে?
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১৯+২০
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ১১
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৩
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৮
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৮+৯+১০
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১৭
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৬
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৬+৭
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১০
-
পরগাছা পর্ব ২৪