Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৪৭


যেখানেপ্রেমনিষিদ্ধ

পর্ব_৪৭

ইশরাতজাহানজেরিন

সাঁঝ এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ মিনিট ধরে। তারপরই তার মুখের অবস্থা এমন হলো, যেন পৃথিবীর সমস্ত পাপের শাস্তি একসঙ্গে তার ওপর নেমে এসেছে। “আরযান ভাইয়া…”
কোনো উত্তর নেই। “আরযান ভাইয়া…”
ঘরের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে আরযান মোবাইলে কারও সঙ্গে কথা বলছে।
“হ্যাঁ। গেটের সামনে কাউকে ঢুকতে দেবে না। পরিবারের কোনো সদস্যও এখন সাংবাদিকদের সামনে যাবে না। আমি নিচে আসছি।”
ফোন কেটে সে সাঁঝের দিকে তাকাল। “পা নামাসনি তো?”
সাঁঝ দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “না।”
“ভালো।”
“কিন্তু আমার পা…”
“পা আছে তো?”
“আছে।”
“তাহলে সমস্যা কোথায়?”
সাঁঝের চোখে পানি চলে এলো। “আপনি আমার শত্রু! আপনাকে আমি জীবনে কোনোদিন ক্ষমা করব না!”
আরযান ভ্রু তুলল। “এই কথাটা গত দশ বছরে অন্তত চারশো বার বলেছিস।”
“এবার সত্যি বলছি!”
“ঠিক আছে।”
“আপনি আমাকে একটু বসতে দেবেন?”
“না।”
“দশ মিনিট দাঁড়িয়ে আছি!”
“আর পঞ্চাশ মিনিট বাকি।”
সাঁঝ হতাশ হয়ে দেয়ালে কপাল ঠেকিয়ে দিল।
“হায় আল্লাহ! এই লোকটা আমার বরকে বিয়ে ছাড়াই বিধবা বানিয়ে ছাড়বে!”

আরযানের ঠোঁটের কোণে আবারও অতি সামান্য একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল। কিন্তু সাঁঝ সেটা দেখতে পেল না। কারণ সে তখন নিজের পা নিয়ে শোকসভা পালন করতে ব্যস্ত।

নিচতলায় তখন পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত। প্রধান ফটকের বাইরে সাংবাদিকদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কয়েকজন গেটের গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোন উঁচিয়ে চিৎকার করছে।
“আরযান মীর কি সত্যিই সাঁঝকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন?”
“মীর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য দেওয়া হবে?”
“সেদিন রাতের ঘোষণার সত্যতা কী?”
“এই সম্পর্ক কি আগে থেকেই ছিল?”
“সাঁঝ কোথায়?”
প্রশ্নের পর প্রশ্ন। বাড়ির মা-চাচিরা ড্রয়িংরুমে বসে কপালে হাত দিয়ে বললেন, “এই সাংবাদিকগুলোর আর কোনো কাজ নেই? একটা ছেলে একটা মেয়েকে বিয়ে করবে কি করবে না, এই নিয়েই এত মাথাব্যথা!”
তেজ সোফায় বসে আপেল কাটতে কাটতে বলল, “বড় মা, আপনি ভুল ভাবছেন। এটা এখন আর বিয়ের খবর নেই। এটা জাতীয় ইস্যু হয়ে গেছে।”
রাজ সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আর পাঁচ মিনিট পর দেখবি, সংসদে আলোচনা হবে ‘সাঁঝ-আরযান ইস্যুতে সরকারের অবস্থান কী?'”
অবনী পাশ থেকে বলল, “আমার মনে হয় একটা কমিটি গঠন করা উচিত।”
তিনজন একসঙ্গে হেসে উঠল। নৈশি কিন্তু হাসল না।
সে চুপচাপ বসে ছিল। তার চোখে অদ্ভুত একটা চিন্তা।
কারণ গত রাতের কথাগুলো তার মাথা থেকে কিছুতেই বের হচ্ছিল না। আরযান সাধারণত কোনো বিষয়ে আবেগ দেখায় না। মিডিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ করে সাঁঝকে হবু স্ত্রী বলে ঘোষণা করা এটা নিছক কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ছিল না। এর পেছনে কিছু একটা আছে। নৈশি ধীরে ধীরে তাজের দিকে তাকাল।
“তাজ ভাই…”
তাজ সংবাদপত্র নামিয়ে তাকাল। “হুম?”
“আরযান ভাইয়া কি সত্যিই সাঁঝকে বিয়ে করতে চান?”
ঘরে মুহূর্তেই নীরবতা নেমে এলো। তাজ কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
“এই প্রশ্নের উত্তর আরযান ছাড়া আর কেউ দিতে পারবে না।”
সিয়া পাশ থেকে বলল, “কিন্তু আমার তো মনে হয় লোকটা সাঁঝকে বিয়ে করলে প্রথম রাতেই অর্গানিক কেমিস্ট্রির পরীক্ষা নেবে।”
তেজ হেসে ফেলল। “সেটা তো হবেই!”
বড় মা চোখ রাঙিয়ে বললেন, “তোরা চুপ কর!”
ঠিক তখনই সিঁড়ির ওপর থেকে ভারী পায়ের শব্দ ভেসে এলো। সবাই একসঙ্গে তাকাল। আরযান মীর ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। সাদা শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। চোখে চশমা। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। তার পেছনে কেউ নেই। সাঁঝও নেই।
সিয়া ফিসফিস করে বলল,
“সাঁঝ কোথায়?”
আরযান নিচে এসে থামল। “ও শাস্তি ভোগ করছে।”
সিয়া চোখ বড় বড় করে বলল, “বাইরে মিডিয়া আর আপনি ঘরের ভেতরে শাস্তি দিচ্ছেন?”
“হ্যাঁ।”
“কী শাস্তি?”
“এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে।”
সিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আপনার মাথায় আসলে কী আছে?”
আরযান শান্ত গলায় বলল, “শৃঙ্খলা।”
সিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আপনার ভাই তাজেরও একই রোগ।”
তাজ সঙ্গে সঙ্গে তাকাল। “আমাকে টানছ কেন?”
“কারণ আপনিও জল্লাদ।”
“সিয়া।”
“জি, ক্যাপ্টেন?”
“চুপ।”
“জি, ক্যাপ্টেন।”
সিয়া সঙ্গে সঙ্গে মুখ বন্ধ করে ফেলল। তেজ মুচকি হেসে বলল, “এই বাড়ির দুই জোড়া মানুষকে দেখলে আমার মনে হয় বিয়ে আসলে শান্তির বিষয় নয়। এটা সামরিক প্রশিক্ষণ।”
আযরান তাকাল। “তেজ।”
“জি ভাইয়া । আমি চুপ।”
ঠিক তখনই বাইরে থেকে প্রচণ্ড একটা শব্দ হলো।
সবাই চমকে উঠল। গেটের দিক থেকে রহিম মিয়ার চিৎকার শোনা গেল, “স্যার! সাংবাদিকরা গেটের তালা ভাঙার চেষ্টা করছে!”
আরযানের চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল। সে ফোন বের করে কাউকে কল করল।
“সিকিউরিটি টিমকে বলো। গেটের সামনে কাউকে ঢুকতে দেবে না। আর পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করো।”
তাজও উঠে দাঁড়াল। “আমি যাচ্ছি।”
আরযান মাথা নাড়ল। “না। তুই এখানে থাক।”
“কেন?”
“কারণ মিডিয়া তোকেও টানবে।”
তাজ কিছু বলল না। আরযান এবার সবার দিকে তাকাল। “আজ থেকে কেউ সাঁঝের সঙ্গে সাংবাদিকদের সামনে কোনো কথা বলবে না।”
আরযানের মা অবাক হয়ে বললেন, “কিন্তু বাবা, এত বড় একটা কথা তুমি বললে, এখন তো সবাই সত্যিটা জানতে চাইবে!”
আরযান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল, “সত্যিটা জানার সময় এখনো আসেনি।”
ঘরের সবাই থমকে গেল। নৈশি এবার নিশ্চিত হলো।

ঘটনার পেছনে সত্যিই কিছু আছে।

সাঁঝের এক পা অবশেষে কাঁপতে শুরু করেছে।
“আর পারছি না…”
সে ফিসফিস করল। “আর দশ মিনিট… তারপর পাঁচ মিনিট। তারপর দুই মিনিট। শেষমেশ সাঁঝের শরীর আর তার কথা শুনল না। সে মেঝেতে বসে পড়ল।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজা খুলে আরযান ঢুকল। সাঁঝ চোখ বন্ধ করে বলল,
“আমি জানি। সময় শেষ হয়নি। আপনি এখন আধা ঘণ্টা বাড়াবেন।”
কোনো উত্তর নেই। সাঁঝ ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
আরযান তার সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে এক গ্লাস পানি।
“খা।”
সাঁঝ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“কী?”
“পানি।”
“আপনি আমাকে দেবেন?”
“না, পাশের বাড়ির বিড়ালকে দেব।”
সাঁঝ সঙ্গে সঙ্গে গ্লাসটা নিয়ে এক নিঃশ্বাসে পানি খেয়ে ফেলল। তারপর সন্দেহভরা চোখে তাকাল।
“আপনি আমাকে এত সহজে ছেড়ে দিচ্ছেন কেন?”
আরযান চুপ করে রইল। তারপর বলল,
“কারণ নিচে সাংবাদিকরা দাঁড়িয়ে আছে।”
সাঁঝের মুখ আবার শুকিয়ে গেল। “ওরা কি আমাকে ধরতে আসবে?”
“হ্যাঁ।”
“আমি কী বলব?”
“কিছু বলবি না।”
“কিন্তু যদি জোর করে?”
“তাহলে আমার দিকে তাকাবি।”
সাঁঝ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“কেন?”
আরযান এবার খুব নিচু গলায় বলল,

“কারণ তুই একা নোস।”

মীর বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে তখনও সাংবাদিকদের ভিড় জমে আছে। কেউ মাইক্রোফোন হাতে গেটের দিকে এগিয়ে আসছে, কেউ ক্যামেরা নিয়ে লাইভ করছে, আবার কেউ মোবাইলে কারও সঙ্গে উত্তেজিত গলায় কথা বলছে।
গেটের ভেতর থেকে নিরাপত্তারক্ষীরা কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। কিন্তু সাংবাদিকদের উৎসাহে কোনো কমতি নেই। ঠিক তখনই বাড়ির প্রধান দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল আরযান মীর। পরনে ধবধবে সাদা শার্ট, কালো ট্রাউজার। চোখে রিমলেস চশমা। তার পেছনে তাজও বেরিয়ে এসেছিল। তবে আরযান হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল।
“বললাম না তুই ভেতরে থাক।”
তাজ বুঝে গেল। “ঠিক আছে।”
আরযান একাই গেটের দিকে এগিয়ে গেল।
গেটের সামনে পৌঁছাতেই সাংবাদিকদের মাইক্রোফোন একসঙ্গে তার দিকে এগিয়ে এলো।
“মিস্টার আরযান!”
“স্যার, সাঁঝের সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা আসলে কী?”
“আপনি কি সত্যিই তাকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন?”
“গত রাতে আপনি নিজেই তাকে আপনার হবু স্ত্রী বলেছেন….”
আরযান হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিল। অদ্ভুত ব্যাপার, এতজন মানুষের চিৎকারের মাঝেও তার একটিমাত্র হাতের ইশারায় পরিবেশটা খানিকটা শান্ত হয়ে গেল। আরযান খুব ঠান্ডা গলায় বলল,
“একজন করে প্রশ্ন করুন।”
একজন সাংবাদিক সুযোগ নিয়ে মাইক্রোফোন এগিয়ে দিল। “স্যার, প্রথম প্রশ্ন সাঁঝ কি সত্যিই আপনার হবু স্ত্রী?”
আরযান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর বলল, “ওই রাতে আমি যা বলেছি, তার উদ্দেশ্য ছিল পরিস্থিতি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা।”
সাংবাদিকরা আবার গুঞ্জন শুরু করল। “তাহলে সেটা সত্যি নয়?”
“আপনি কি মিডিয়াকে বিভ্রান্ত করেছেন?”
আরযানের চোখ এবার একটু কঠিন হলো। “আমি কাউকে বিভ্রান্ত করতে চাইনি।”
সে ধীরে ধীরে বলল, “কিন্তু গতকাল যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেখানে আমার পরিবারের একজন সদস্যকে নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে অপ্রয়োজনীয় আলোচনা হচ্ছিল। সেটা বন্ধ করার দায়িত্ব আমার ছিল। আমি সেটাই করেছি।”
একজন সাংবাদিক আবার প্রশ্ন করল, “তাহলে সাঁঝের সঙ্গে আপনার কোনো বিয়ের পরিকল্পনা নেই?”
আরযান এবার সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকাল।
“আমার পরিবারের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কোনো ঘোষণা দেওয়ার প্রয়োজন হলে, সেটা আমি নিজেই দেব।”
“কিন্তু সাঁঝের মতামত কী?”
আরযানের মুখ শক্ত হয়ে গেল। “সাঁঝ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তার অনুমতি ছাড়া আলোচনা করা কোনো সাংবাদিকতার অংশ নয়।”
কয়েকজন সাংবাদিক চুপ হয়ে গেল। আরযান আরও বলল,
“আপনারা সংবাদ সংগ্রহ করতে এসেছেন, সেটা করুন। কিন্তু আমার পরিবারের কোনো সদস্যকে হয়রানি করবেন না। বিশেষ করে সাঁঝকে নয়।”
একজন সাংবাদিক বলল, “স্যার, তাহলে কি ধরে নেব আপনারা এই সম্পর্কের ব্যাপারে ভবিষ্যতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন?”
আরযান খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “আমি যা বলার, সময় হলে নিজেই বলব।” এই বলে সে আর কোনো প্রশ্নের সুযোগ না দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল।
তাজ গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। আরযান তার পাশে এসে বলল, “মিডিয়ার ফুটেজগুলো মনিটর করো। কেউ বাড়াবাড়ি করলে আইনজীবীদের জানাবে।”
তাজ মাথা নাড়ল। “ঠিক আছে।”
আরযান এবার বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে গেল। “আর একটা কথা।”
“জি?”
“সাঁঝ কোথায়?”
তাজ ঠোঁটের কোণে হাসি চেপে বলল, “সম্ভবত নিজের ঘরে।”
আরযান চোখ সরু করল। “সম্ভবত?”
তাজ এবার হাসি লুকিয়ে বলল,
“তুমি তো ওকে এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছো। এখনো হয়তো দাঁড়িয়ে আছে।”
আরযান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “ওর শাস্তি তো মৌকুফ করে দিলাম। আর ওকে আমি চিনি। পাঁচ মিনিট পরেই কোনো নতুন কাণ্ড করবে।”
তাজ বলল, “তোমার ভাই এত বছরের অভিজ্ঞতা।”
“হ্যাঁ।”
আরযান বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। তিনতলায় তখন সাঁঝ সত্যিই নিজের ঘরে বসে আছে। তবে পড়াশোনা করছে না। তার সামনে একটা ছোট্ট কাগজ। কাগজে বড় বড় করে লেখা,
“অপারেশন হিটলার ভাইয়ার মাথা গরম!”
সাঁঝ কাগজটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। “মিডিয়া সামলাতে নিচে গিয়ে এত বড় বড় কথা বলে এসেছে! এখন একটু বুঝুক, বাড়ির ভেতরের মিডিয়া সামলানো কত কঠিন।”
সে নিজের ড্রয়ার খুলে একটা ছোট্ট রিমোট বের করল। এই রিমোট দিয়ে আরযানের স্টাডি রুমের ডেস্কের ওপর রাখা ব্লুটুথ স্পিকারটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সাঁঝ গত সপ্তাহে এটা সেট করে রেখেছে।
তার পরিকল্পনা খুব সহজ। আরযান যখন স্টাডি রুমে বসে কাজ করবে, তখন হঠাৎ স্পিকার থেকে একটা রেকর্ড করা শব্দ বাজবে।
“হিটলার ভাইয়া! তারপর অর্গানিক কেমিস্ট্রি পড়! তারপর কান ধর!”সাঁঝ নিজের মুখ চেপে হাসতে লাগল।
“আজ দেখব কতক্ষণ গম্ভীর থাকেন!”
সে রিমোটটা হাতে নিয়ে দরজার আড়ালে লুকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর আরযান স্টাডি রুমে ঢুকল। চেয়ারে বসে ল্যাপটপ খুলল। সাঁঝ রিমোটের বোতাম চাপল। স্পিকার থেকে ভেসে এলো,
“হিটলার ভাইয়া!”
আরযান থেমে গেল। সাঁঝ মুখ চেপে হাসছে। আরযান চারদিকে তাকাল। সে আবার ল্যাপটপের দিকে তাকাল। সাঁঝ আবার বোতাম চাপল।
“অর্গানিক কেমিস্ট্রি পড়!”
আরযানের কপালে এবার ভাঁজ পড়ল। সাঁঝের হাসি আর থামছে না। তৃতীয়বার বোতাম চাপল।
“কান ধর!”
আরযান ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠল। সাঁঝের হাসি মিলিয়ে গেল।
“উফ! লোকটা উঠে গেছে কেন?” আরযান দরজা খুলে করিডোরে বেরিয়ে এলো। সাঁঝ তাড়াতাড়ি পাশের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। আরযান করিডোরে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকাল।
“সাঁঝ।”
কোনো উত্তর নেই। “বেরিয়ে আয়।”
“তুই যদি নিজে থেকে বেরিয়ে আসিস, শাস্তি কম হবে।”
পর্দার আড়াল থেকে সাঁঝ মনে মনে বলল, “এটা নিশ্চয়ই মিথ্যা কথা।” সে চুপ করে রইল। আরযান ধীরে ধীরে পর্দার দিকে এগিয়ে গেল। সাঁঝের বুক ধুকপুক করতে লাগল। আরযান পর্দা সরাতেই
সাঁঝ এক লাফে অন্যদিকে ছুট দিল।
“ধরতে পারলে ধরুন!”
আরযান স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “ঠিক আছে।”
সাঁঝ দৌড়াতে দৌড়াতে থেমে গেল। “কী ঠিক আছে?”
“দৌড়।”
“মানে?”
“যতক্ষণ না ক্লান্ত হচ্ছিস, দৌড়া।”
সাঁঝের মুখ শুকিয়ে গেল। “ভাইয়া…”
আরযান হাতঘড়ির দিকে তাকাল। “আজকের শাস্তির সঙ্গে আরও বিশ মিনিট যোগ হলো।”
“কীইই?!”
“আর দশ মিনিট দৌড়ালে আরও দশ মিনিট।”
সাঁঝ সঙ্গে সঙ্গে দৌড় বন্ধ করে দুই হাত জোড় করল।
“আমি আর করব না!”
আরযান তার হাত থেকে রিমোটটা নিয়ে নিল। “এই জিনিসটা কোথা থেকে পেলি?”
সাঁঝ নিচু গলায় বলল, “অনলাইনে।”
“আমার স্টাডি রুমের স্পিকারের সঙ্গে কানেক্ট করেছিস?”
“জি।”
“কেন?”
সাঁঝ মাথা চুলকে বলল, “আপনার গম্ভীর মুখটা একটু কমানোর জন্য।”
আরযান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল, “আজ দুপুরে এক ঘণ্টা আমার সঙ্গে বসে পড়বি।”
সাঁঝ হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
“এটাই শাস্তি?”
“না।”
“তাহলে?”
“আমি পড়াব।”
সাঁঝের মুখ একেবারে বিবর্ণ হয়ে গেল। “আপনি পড়াবেন?”
“হ্যাঁ।”
“তার চেয়ে আমাকে এক পায়ে দাঁড় করান!”
আরযান মুচকি হাসল। “সেটাও হবে।”
“হায় আল্লাহ!”

নিচতলায় নৈশি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে আব্রাজকে খুঁজছে। আব্রাজ ড্রয়িংরুমে বসে ফোনে ব্যস্ত। নৈশি এসে বলল, “শুনছেন?”
“হুম?”
“চিকুকে একটু দেখবেন? ওকে খাবার দিতে হবে।”
আব্রাজ উঠে খাঁচার কাছে গেল। চিকু তখন বেশ চুপচাপ। আব্রাজ অবাক হয়ে বলল,
“আজ এত শান্ত কেন?”
নৈশি বলল, “শয়তান পাখি কিছু একটা প্ল্যান করছে মনে হয়।”
চিকু মাথা কাত করল। তারপর বলল, “আব্রাজ… নৈশি…”
দুজনেই তাকাল। চিকু আবার বলল, “চুমু!”
নৈশির মুখ সঙ্গে সঙ্গে লাল হয়ে গেল। আব্রাজের মুখ হাঁ হয়ে গেল। “এই শব্দটা তোকে কে শিখিয়েছে?”
চিকু নির্বিকার। “চুমু!”
নৈশি তাড়াতাড়ি চারদিকে তাকাল। “চুপ! কেউ শুনে ফেলবে!”
চিকু এবার আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠল, “আব্রাজ নৈশিকে চুমু দিছে!”
আব্রাজের মুখের রং বদলে গেল। “আমি?!”
নৈশি দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। “চিকু!”
চিকু খাঁচার ভেতর ডানা ঝাপটে খুশিতে বলল, “চুমু! চুমু! চুমু!”
ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে তেজের গলা, “কী হলো? কে কাকে চুমু দিল?”
আব্রাজ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। নৈশি এবার আব্রাজের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আপনাদের পাখি। আপনাদেরদায়িত্ব।”
আব্রাজ অসহায় গলায় বলল, “এটা আমার পাখি না।”
চিকু সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “আব্রাজের বউ!”
তেজ দরজায় এসে দাঁড়িয়ে হেসে কুটিকুটি। “আহা! সকালের নাশতা বাদ দিয়ে আজ তো বিনোদন ফ্রি!”
নৈশি লজ্জায় দৌড়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
আব্রাজ চিকুর খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “চিকু, তোর খাবারে আজ থেকে শুধু কাঁচা মরিচ।”
চিকু বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে বলল, “আব্রাজ পইড়া গেছে!”
আব্রাজ দুই হাত কোমরে রেখে আকাশের দিকে তাকাল। “আল্লাহ, এই পাখিটাকে কে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিল!”
দূর থেকে সাঁঝের হাসির শব্দ ভেসে এলো। আরযান সঙ্গে সঙ্গে তাকাল। “সাঁঝ!” হাসি থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর খুব ছোট্ট গলায় উত্তর এলো—ল,
“জি ভাইয়া…”
“আমার সঙ্গে পড়তে বস।”
“জি…”
তারপর সাঁঝ মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করল, “এই বাড়িতে মানুষ হয়ে জন্মানোই আমার সবচেয়ে বড় ভুল।”
আরযান শুনে ফেলল। “কী বললি?”
সাঁঝ সঙ্গে সঙ্গে মিষ্টি হেসে বলল,
“বললাম, আপনার মতো ভাইয়া পাওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য।”
আরযান মাথা নাড়ল। “ভালো। এবার বই নিয়ে আয়।”
সাঁঝ মুখ কুঁচকে বই আনতে গেল। আর নিচে চিকু আবার চেঁচিয়ে উঠল,
“নৈশি! আব্রাজ! খাট ভাঙছে!”

পুরো বাড়ি আবার হাসিতে ফেটে পড়ল। শুধু আব্রাজ আর নৈশি দুজনেই মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল।

বিকেল বেলা। দুপুরের গরমটা অনেকটাই কমে এসেছে। বৃষ্টির পর আকাশে সাদা-কালো মেঘের ভেলা ভাসছে, পশ্চিমের দিকে সূর্যের আলো মেঘের ফাঁক গলে এসে বাড়ির পুরোনো দেয়ালগুলোকে মায়াবী হলুদ রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে। বাগানের ভেজা মাটির গন্ধের সঙ্গে শিউলি ফুলের মিষ্টি সুবাস মিশে চারপাশটাকে কেমন শান্ত করে তুলেছে। বিশাল বাড়িটা দিনের ব্যস্ততার পর একটু একটু করে নিস্তব্ধ হয়ে আসছে। সাঁঝের হাতে একটা দূরবীন। চোখে সন্দেহজনক উজ্জ্বলতা। আর ঠোঁটে শয়তানি হাসি।
সাঁঝ দূরবীনটা চোখে লাগিয়ে পাশের বাড়ির ছাদটার দিকে তাকাল। তারপর একটু পরপর দূরবীন নামিয়ে আবার লাগাচ্ছে। পাশের বাড়িটা মীর বাড়ির তুলনায় ছোট হলেও বেশ সুন্দর। দোতলার ওপর একটা বড় ছাদ, চারদিকে টবে লাগানো গাছপালা। ছাদের এক কোণে কাপড় শুকাতে দেওয়া হয়েছে। সাঁঝ দূরবীন নামিয়ে নিজের মনে বলল,
“হুম… ছাদে গাছ আছে, টব আছে, কাপড় আছে… কিন্তু মানুষটা কোথায়?”
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা মেয়েলি গলা শোনা গেল, “কাকে খুঁজছিস?”
সাঁঝ চমকে ঘুরে দাঁড়াল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে ডালিয়া। সাঁঝের সঘনিষ্ঠ বান্ধবী। গোলগাল মুখ, কাঁধ ছোঁয়া চুল, চোখে সবসময় কৌতূহলের ঝিলিক। হাতে একটা ছোট ব্যাগ ঝুলছে। মীর বাড়িতে আসার অনুমতি তার বহুদিনের, তাই বাড়ির লোকজনও তাকে বেশ ভালোভাবেই চেনে। সাঁঝ দূরবীনটা পেছনে লুকিয়ে ফেলল।
“কাউকে না।”
ডালিয়া ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এল। “তুই দূরবীন হাতে দাঁড়িয়ে আছিস, আর বলছিস কাউকে না?”
“পাখি দেখছিলাম।”
ডালিয়া জানালার বাইরে তাকাল। “পাখি?”
“হ্যাঁ।”
“পাখিটা কি পাশের বাড়ির ছাদে থাকে?”
সাঁঝ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আসলে পাখিটা একটু লম্বা।”
ডালিয়া চোখ বড় বড় করে তাকাল। “লম্বা পাখি?”
সাঁঝ এবার আর অভিনয় ধরে রাখতে পারল না। হেসে ফেলে ডালিয়ার হাত ধরে টেনে বারান্দার দিকে নিয়ে গেল। “চুপ! তুই আগে এটা দেখ।”
সে দূরবীনটা ডালিয়ার হাতে ধরিয়ে দিল। ডালিয়া কৌতূহলী হয়ে দূরবীনে চোখ রাখল। কয়েক সেকেন্ড পর তার মুখেও মৃদু হাসি ফুটল।
“ওমা!”
সাঁঝ ফিসফিস করে বলল, “দেখেছিস?”
“হ্যাঁ।”
“কেমন?”
ডালিয়া একটু লজ্জা পেয়ে বলল, “খারাপ না তো!”
সাঁঝ সঙ্গে সঙ্গে তার কাঁধে চাপড় মেরে বলল,
“আমি তোকে বলেছিলাম! পাশের বাড়িতে নতুন ভাড়াটে এসেছে। ছেলেটা নাকি খুব ভালো দেখতে। আজকে প্রথমবার ছাদে উঠেছে।”
ডালিয়া আবার দূরবীনে তাকাল। “চেহারা তো দেখা যাচ্ছে না ঠিকমতো।”
“এই জন্যই তো নিচে যেতে হবে।”
ডালিয়া দূরবীন নামিয়ে তাকাল। “নিচে মানে?”
সাঁঝের চোখ চকচক করল। “পাশের বাড়ির সামনে।”
“তুই পাগল?”
“একটু।”
“আরযান ভাইয়া জানলে?”
সাঁঝ হাত নেড়ে বলল, “আরযান ভাইয়া এখন স্টাডি রুমে। বিকেল পাঁচটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত উনি অন্য কারও দিকে তাকান না। খালি কাজের ফাঁকে আমাকে একটু পর পর গরুর মতো গুতা মারে।”
ডালিয়া অবাক হয়ে বলল,
“মানে?”
“মানে কাজ করে।”
“তোর ওপর এত নজর রাখে?”
সাঁঝ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমার জীবনে স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই।”
ডালিয়া মুচকি হাসল।
“তাহলে আজ স্বাধীনতার স্বাদ নেবি?”
সাঁঝ দুই হাত কোমরে রেখে দাঁত বের করে হাসল।
“চল।”
পাঁচ মিনিট পর মীর বাড়ির পেছনের ছোট গেট দিয়ে দুটো মেয়ে বেরিয়ে গেল। একজন সাঁঝ। অন্যজন ডালিয়া। দুজনেরই মুখে মাস্ক। মাথায় ওড়না। হাতে একটা ছোট ছাতা। দেখলে মনে হবে খুব নিরীহভাবে কোথাও যাচ্ছে। কিন্তু তাদের চোখের চাহনি বলছে অন্য কথা। সাঁঝ হাঁটতে হাঁটতে ফিসফিস করে বলল,
“ডালিয়া, তুই স্বাভাবিকভাবে হাঁট।”
“আমি তো স্বাভাবিকই হাঁটছি।”
“তুই এত পেছনে পেছনে তাকাচ্ছিস কেন?”
“ভয় লাগছে।”
“কিসের?”
“আরযান ভাইয়ার।”
সাঁঝ থমকে দাঁড়াল। তারপর বলল,
“আমারও।”
দুজনেই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর আবার হাঁটা শুরু করল। পাশের বাড়ির সামনের রাস্তার কাছে এসে তারা একটা বড় কৃষ্ণচূড়া গাছের আড়ালে দাঁড়াল। সাঁঝ আবার দূরবীন বের করল।
ডালিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
“এতক্ষণে আবার দূরবীন?”
“বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ।”
“তুই ছেলে দেখতে এসেছিস, গবেষণা করতে না।”
“চুপ।”
সাঁঝ দূরবীন চোখে লাগাল। ছেলেটা এবার ছাদে এসেছে। গাঢ় নীল টি-শার্ট পরা। হাতে একটা বই। ছাদের রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। ডালিয়া সাঁঝের হাত থেকে দূরবীন নিয়ে নিল। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল,
“আসলে…”
“কী?”
“খারাপ না।”
সাঁঝ হাসল। “বলেছিলাম না!”
“কিন্তু তুই আমাকে নিয়ে এখানে কেন এলি?”
“কারণ তুই বিয়ের জন্য ছেলে খুঁজছিস বলেছিলি।”
ডালিয়া চোখ বড় বড় করে বলল, “আমি মজা করে বলেছিলাম!”
“আমি মজা বুঝি না।”
“সেটা তো জানিই।”
দুজনেই হাসতে শুরু করল। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা গম্ভীর গলা ভেসে এলো।
“আমিও বুঝি না।”
সাঁঝের হাসি মুহূর্তে বন্ধ।
ডালিয়ার হাত থেকে দূরবীন প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। দুজনেই ধীরে ধীরে পেছনে ঘুরল। রাস্তার একপাশে কালো রঙের গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরযান।
পরনে গাঢ় ধূসর শার্ট, হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। চোখে চশমা। দুই হাত বুকের সামনে ভাঁজ করা।
মুখ দেখে মনে হচ্ছে, গত জন্মের সব রাগ সে আজকে নিয়ে এসেছে। সাঁঝের মুখের রং পাল্টে গেল। ডালিয়া ফিসফিস করে বলল,
“এটা কি সত্যিই আরযান ভাইয়া?”
সাঁঝ শুকনো গলায় বলল,
“না।”
“তাহলে কে?”
“আমাদের কেয়ামত।”
আরযান ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে এল। তার চোখ প্রথমে সাঁঝের ওপর গেল। তারপর ডালিয়ার দিকে। তারপর সাঁঝের হাতে থাকা দূরবীনের দিকে।
আরযান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“বেশ।”
সাঁঝ মাথা নিচু করে ফেলল। “ভাইয়া…”
“চুপ।”
ডালিয়া ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। আরযান এবার ডালিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি ডালিয়া?”
ডালিয়া শুকনো গলায় বলল, “জি ভাইয়া।”
“ভালো মেয়ে বলে জানতাম।”
ডালিয়া মাথা আরও নিচু করল।
“জি…”
“আজ জানতে পারলাম, ভালো মেয়েরা বিকেলে পাশের বাড়ির ছাদে দূরবীন দিয়ে ছেলে দেখে।”
ডালিয়া লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। সাঁঝ তাড়াতাড়ি বলল,
“ভাইয়া, ও কিছু করেনি। সব আমি করেছি।”
আরযান তাকাল। “তুই চুপ।”
সাঁঝ মুখ বন্ধ করল। আরযান ডালিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আর তুমি?”
ডালিয়া কাঁপা গলায় বলল, “আমি… ওর সঙ্গে এসেছিলাম।”
“কেন?”
ডালিয়া মাথা নিচু করে বলল, “ও বলেছিল একটু দেখবে…”
আরযান চোখ বন্ধ করে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“দুজনেই আমার সঙ্গে বাড়ি চল।”
সাঁঝ সঙ্গে সঙ্গে বলল, “ভাইয়া, আমরা কিন্তু কোনো খারাপ কাজ করিনি!”
আরযান ভ্রু তুলল। “পাশের বাড়ির ছেলেকে দূরবীন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা কি ভালো কাজ?”
সাঁঝ চুপ। “উত্তর দে।”
“না।”
“দিবি না?”
“ হু।”
“তো দে?”

“ইয়ে মানে……”

মীর বাড়িতে ফিরে দুজনকে সোজা আরযানের স্টাডি রুমের সামনে দাঁড় করানো হলো। সাঁঝ আর ডালিয়া পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। দুজনের মুখই গম্ভীর। আরযান টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে। সে প্রথমে সাঁঝের দিকে তাকাল।
“তুই কী শাস্তি পাবি, সেটা তোর জানা আছে।”
সাঁঝ মুখ বাঁকিয়ে বলল, “আবার এক পায়ে দাঁড়াব?”
“না।”
সাঁঝ একটু স্বস্তি পেল। “তাহলে?”
“আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত আমার স্টাডি রুমের সব বইয়ের তাক গুছাবি।”
সাঁঝের মুখ আবার ঝুলে গেল। “এত বই!”
“হ্যাঁ।”
তারপর আরযান ডালিয়ার দিকে তাকাল। “আর তুমি।”
ডালিয়া সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়াল। “জি?”
“তুমি যেহেতু এই কাণ্ডে সঙ্গ দিয়েছ, তোমারও শাস্তি আছে।”
ডালিয়ার চোখ গোল। “আমারও?”
“হ্যাঁ।”
সাঁঝ পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, “দুঃখিত রে।”
আরযান শুনে ফেলল। “সাঁঝ।”
“জি?”
“তোর শাস্তি আরও এক ঘণ্টা বাড়ল।”
সাঁঝের মুখ হাঁ। “কেন?!”
“কারণ তুই বন্ধুকে অপরাধে সহযোগী বানিয়েছিস।”
ডালিয়া মুখ চেপে হাসতে যাচ্ছিল। আরযান এবার তার দিকে তাকাল।
“আর তুমি হাসছ কেন?”
ডালিয়ার হাসি সঙ্গে সঙ্গে উধাও। “না… মানে…”
“তোমার শাস্তি?”
“জি?”
“সাঁঝের সঙ্গে বসে বই গুছাবে।”
সাঁঝ আর ডালিয়া একসঙ্গে একে অন্যের দিকে তাকাল। তারপর দুজনেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আরযান দরজার দিকে যেতে যেতে বলল,
“আর একটা কথা।”
দুজনেই তাকাল। “পাশের বাড়ির ছেলেকে দেখতে হলে আগে বাড়ির বড়দের বলবে। চুপিচুপি বের হয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দূরবীন দিয়ে মানুষ দেখা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।”
সাঁঝ মাথা নিচু করে বলল,
“জি।”
আরযান একটু থেমে আবার বলল,
“তবে…”
সাঁঝ তাকাল।
“ছেলেটা কেমন দেখতে?”
“ছাগলের কালো কালো চকলেটের মতো দেখতে। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পুরুষ তো আমার চোখে আমার ভাই আরযানই।”
আরযান সাঁঝের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তারপর বলল, “শাস্তি এক ঘন্টা আরও বাড়ল।”
সাঁঝ আর ডালিয়া দুজনেই হতভম্ব। আরযান মুখ গম্ভীর রেখেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দুজন কয়েক সেকেন্ড চুপ। তারপর ডালিয়া ফিসফিস করে বলল,
“তোর ভাইয়া কি একটু কৌতূহলী?”
সাঁঝ চোখ বড় বড় করে বলল,
“চুপ! শুনে ফেললে আমাদের আবার দশ অধ্যায় পড়াবে!”
দুজনেই মুখ চেপে হাসতে লাগল। আর দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আরযান সেই হাসির শব্দ শুনে মাথা নেড়ে মৃদু হেসে ফেলল।
চলবে? See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply