Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৩২


#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ

#ইশরাত_জাহান_জেরিন

#পর্ব_৩২

পিলুগ্রামের এই সুবিশাল, প্রাচীন জমিদার বাড়িটার প্রতিটি কোণায় তখনো বিয়েবাড়ির উৎসবের রেশ। উৎসবের আলোর রোশনাই আর চারিদিকের কোলাহল ছাপিয়ে বড় বড় ডেকচিতে রান্না হওয়া কাচ্চি বিরিয়ানির খাঁটি ঘি আর মশলার তীব্র সুবাস বাতাসে ভাসছে। বাড়ির নিচে তখনো আত্মীয়স্বজনদের হাসাহাসি আর লাউডস্পিকারে বাজা সানাইয়ের সুর শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এই জমকালো উৎসবের আমেজও মীর বাড়ির পুত্রবধূ, অর্থাৎ নেত্রী নৈশির ভেতরের জমাট বাঁধা ক্ষোভ আর বিরক্তিকে এক চুলও কমাতে পারছিল না। নৈশির কাছে এই বিয়েবাড়ির দাওয়াত খাওয়াটা কোনো আনন্দের উৎসব না, বরং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। মীর বংশের পুত্রবধূ হিসেবে সবার সামনে জোর করে মুখে একটা কৃত্রিম, মিষ্টি হাসির মুখোশ পরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার ফর্সা চোয়াল দুটো রীতিমতো ব্যথা হয়ে গেছে। তার ওপর আবার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল মীর আব্রাজ রোদ। তার আইনগত স্বামী এবং রাজনৈতিক ময়দানের চিরশত্রু। বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত তাদের সম্পর্কটা সেই চেনা ‘সাপে-নেউলে’র সমীকরণেই আটকে আছে। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি নয়, আর সেই জেদের কারণেই আজ অবধি তাদের বাসর রাতটাও অধরাই রয়ে গেছে।

রাত তখন আনুমানিক এগারোটা। দাওয়াতের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা, মেজো খালার তদারকি আর আত্মীয়দের হাজারটা কৌতুহলী প্রশ্নের উত্তর শেষ করে নৈশি যখন দোতলার উত্তর ব্লকের সেই ঘরটায় ঢুকল, তখন তার পুরো শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে আসছিল। সে ঘরের দরজাটা একটু জোরেই ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে ধপাস করে বন্ধ করে দিল। ভেতরে ঢুকতেই নৈশির চোখ চড়কগাছে উঠল। ঘরের নরম নীল আলোর নিচে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আব্রাজ তখনো অত্যন্ত আয়েশ করে নিজের অফ-হোয়াইট সিল্কের পাঞ্জাবির কলারটা ঠিক করছে। আরযান ভাই তাঁর ফ্রিজ হয়ে যাওয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টটা আজই সচল করে দিয়েছেন, আর সেই খুশিতে আব্রাজের পকেট এখন রীতিমতো কড়কড়ে নতুন নোটের ওমে গরম হয়ে আছে। চোখে-মুখে তার একজন সফল, তরুণ এমপির সেই চেনা অহংকারী আর দাপুটে ভাব। আব্রাজকে অমন রাজকীয় মেজাজে দেখতেই নৈশির ভেতরের ক্ষোভের আগুনটা এক মুহূর্তে দপ করে জ্বলে উঠল। সে ভারী বেনারসি শাড়ির কুঁচিটা একহাতে শক্ত করে চেপে ধরে গটগট করে আব্রাজের দিকে এগিয়ে গেল। সে ঠোঁটের কোণে একরাশ অবজ্ঞা ফুটিয়ে বলল,

“দিনভর তো মেলা দাপট দেখালেন মিস্টার অনারেবল এমপি সাহেব! নিচে সবার সামনে তো এমন পোজ দিচ্ছিলেন যেন পিলুগ্রামের এই পুরো জমিদারিটাই আপনি একাই কিনে নিয়েছেন। পকেটে চারটে টাকা ফেরত আসতেই অহংকারে পা মাটিতে পড়ছে না, তাই না? আপনার এই ‘এমপি ইমেজ’ আর ভন্ড মুখোশটা রক্ষা করতে করতে নিচে আমার হাসতে হাসতে দম বন্ধ হয়ে আসছিল!”

আব্রাজ আয়না থেকে চোখ না সরিয়েই ঠোঁটের কোণে তার সেই অতি পরিচিত ধূর্ত আর বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে তুলল। সে পকেট থেকে আইফোনটা বের করে টেবিলের ওপর আলতো করে রাখল, যেখানে টাকার বান্ডিলটার ওম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সে অত্যন্ত শান্ত গলায় ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “হাসিটা আপনার যতটাই ফেক হোক না কেন নৈশি নেত্রী, আপনার এই লাল বেনারসি আর গয়নার সাজগোজটা কিন্তু একদম অরিজিনাল হয়েছে। আর আমার পকেটের গরম টাকা নিয়ে আপনাকে মাথা ঘামাতে হবে না। মীর আব্রাজ টাকা দিয়ে মানুষকে কেনে না, সে শুধু জানে মীর বংশের সম্মানটা কীভাবে ধুলোবালি থেকে উঁচুতে ধরে রাখতে হয়। আপনি নিজের রাজনৈতিক স্পিচটা ঢাকার মাঠের জন্য জমিয়ে রাখুন, পিলুগ্রামের এই বন্ধ ঘরে ওটার কোনো ভোটার নেই।”

“মুখ সামলে কথা বলুন আব্রাজ!” নৈশি তীব্র রাগে ফেটে পড়ে আব্রাজের বুকের ঠিক এক ইঞ্চি সামনে নিজের তর্জনী আঙুলটা উঁচিয়ে ধরল। “আপনার এই ক্যাপিটালিস্ট অহংকার আর ক্ষমতার দাপট আমি একদিন ঠিক ধুলোয় মিশিয়ে দেব। আমার সামনে এই এমপির নাটক দেখাবেন না!”

নৈশি আর এক সেকেন্ডও এই ‘বজ্জাত’ লোকটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকতে চাচ্ছিল না। সে তীব্র অভিমানে আর রাগে এক ঝটকায় ঘুরে আব্রাজের পাশ কাটিয়ে ঘরের কোণার আলমারিটার দিকে চলে যেতে চাইল। কিন্তু ঘরটা জমিদার বাড়ির অন্যান্য ঘরের তুলনায় কিছুটা ছোট আর মেঝের ওপর বিছানো ছিল পুরনো এক মোটা কার্পেট। নৈশি রাগের মাথায় দ্রুত পা বাড়াতেই তার ভারী শাড়ির পাড়টা কার্পেটের এক কোণায় বিশ্রীভাবে আটকে গেল।

“আরে!” নৈশি নিজের ভারসাম্য হারিয়ে এক তীব্র আর্তনাদ করে উঠল। পড়ে যাওয়ার ঠিক শেষ মুহূর্তে, আব্রাজ বিদ্যুৎ গতিতে নিজের চওড়া হাত দুটো বাড়িয়ে দিল। সে এক ঝটকায় নৈশির কোমরটা নিজের শক্ত হাতের বেড়িতে পুরে নিলো। নৈশি নিচে আছড়ে না পড়লেও, তার পুরো শরীরটা এক প্রবল ঝটকায় আছড়ে পড়ল আব্রাজের শক্ত, চওড়া আর তপ্ত বুকের ওপর! আব্রাজ নিজেও সেই আকস্মিক ধাক্কার বেগ সামলাতে না পেরে পেছনের দেয়ালের সাথে সশব্দে গিয়ে ঠেকল। কিন্তু তার হাতের বাঁধন আলগা হলো না। বিয়ের এতগুলো দিন পার হয়ে গেলেও, এই প্রথম তারা একে অপরের এতখানি কাছে, এতখানি নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। নৈশির গলার ভারী সোনার হার আর বেনারসির জরি-সুতোর কাজগুলো আব্রাজের সিল্কের পাঞ্জাবির বোতামে এমনভাবে পেঁচিয়ে গেল যে, চাইলেও আর এক ইঞ্চি দূরত্ব তৈরি করার উপায় রইল না। ঘরের ম্লান নীল আলোয় নৈশির রাগী, লাজুক আর ক্লান্ত ফর্সা মুখটা আব্রাজের চোখের ঠিক সামনে স্থির হয়ে রইল। নৈশির দ্রুত ওঠা-নামা করা তপ্ত নিশ্বাস আব্রাজের গলার চামড়ায় অবাধ্য ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ছিল, যা মীর আব্রাজের ভেতরের সেই দাপুটে পুরুষালি অস্তিত্বকে এক নিমেষে নাড়িয়ে দিল।

নৈশি ভয়ে আর এক চেনা তীব্র রোমাঞ্চে কাঁপতে কাঁপতে আব্রাজের শার্টের কলারটা নিজের ছোট ছোট আঙুলে মুচড়ে ধরল। সে নিজের ভেতরের কাঁপন আড়াল করতে জোর করে গলার স্বর শক্ত করে ফিসফিসিয়ে বলল, “অসভ্য লোক একটা! নাটক বন্ধ করুন আর ছাড়ুন আমাকে! বিয়ের ওই মিথ্যা অভিনয় নিচে সবার সামনে করেছেন, এই বন্ধ ঘরে ওই জোর খাটানোর ক্ষমতা আপনার নেই!”

আব্রাজ ছাড়ল না। সে নৈশির কোমরটা আরও একটু শক্ত করে নিজের দিকে চেপে ধরে, তাঁর চোখের ভেতরের সেই অবাধ্য জেদটা দেখতে দেখতে অত্যন্ত গভীর ও ভরাট গলায় বলল, “জোর আমি খাটাইনি নেত্রী, বর্ডার ক্রস করে আপনি নিজেই আমার বুকের ওপর এসে আছড়ে পড়েছেন। আর মীর আব্রাজ রোদ নিজের বুকে আসা অধিকার কোনোদিন হাতছাড়া করে না।”

জমিদার বাড়ির বিশাল ছাদটায় তখন নিঝুম রাত। নিচে বিয়েবাড়ির আলোর রোশনাই আর মেজো খালার তদারকির চড়া গলা কিছুটা কমে এসেছে। গ্রামের ঠান্ডা হাওয়া এসে বিঁধছিল রাতের চুলে। তার পরনে একটা ঢিলেঢালা কালো হুডি। ডানহাতের কড়ার সেই কাটার দাগটা এখন শুকিয়ে এসেছে, কিন্তু সুহানার সেই কালো রুমালের ঘ্রাণটা এখনো তার অবচেতন মনে টাটকা। ক্লাবের সেই মারামারির পর আজ চারটে দিন হয়ে গেল, সুহানা জাবিন নামক সেই ‘ডাইনী রেসার’ মেয়েটা তাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারের মাঝে একা ফেলে উধাও।

“কী রে পপ স্টার? একা একা ছাদের কোণায় বসে দেবদাসগিরি করছিস কেন? নিচে তোকে খোঁজার জন্য ফুফাতো-খালাতো বোনদের লাইন লেগে গেছে!”

পেছন থেকে আরভিদের গলা শুনে রাত একটু চমকে উঠে নিজের গিটারটা কোলের ওপর টেনে নিল। প্রাণ ছাদে এসে বসল। তার পেছনে কিছু কাজিনরাও চলে এলো। রাতে যদিও তাজও ছিল। সে এসে রাতের পাশে ধপাস করে বসে বলল, “আমাদের মীর বাড়ির একমাত্র রকস্টার ফুচকা-কাচ্চি খেয়ে ছাদ বিবাগী হয়ে গেছে। রাত, অনেক দিন তোর লাইভ কনসার্ট শুনি না ভাই। এই পিলুগ্রামের চাঁদের আলোয় একটা গান শোনা তো দেখি!”

সবাই তখন চোখের ইশারায় রাতকে অনুরোধ করল। কাজিনদের এত ধরাধরিতে রাত আর না করতে পারল না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গিটারের তারে আঙুল ছোঁয়াল। এক অদ্ভুত, বিষাদময় অ্যাকোস্টিক কর্ডের ঝংকার পিলুগ্রামের রাতের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিল।

রাত চোখ বন্ধ করল। গিটারের প্রতিটা টোনে তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল রেসিং ট্র্যাকে হেলমেট খোলা সুহানার সেই ঘর্মাক্ত ফর্সা মুখ, তার ঠোঁটের সেই অবাধ্য কামড়, আর ক্লাবের ভেতরে মদের বোতল হাতে সেই ডেঞ্জারাস রূপ। রাত গিটারে টুংটাং সুর তুলতে তুলতে ভাঙা, গভীর কণ্ঠে গেয়ে উঠল:

“তুমি অধরা হয়েই রইলে মনের গহীন কোণে,

খুঁজে ফিরি তোমায় আমি প্রতিটা ক্ষণে ক্ষণে…

অন্ধকার ওই রাজপথে যদি থমকে দাঁড়ায় গাড়ি,

জেনো এই বলদ সিঙ্গার দেবে তোমার শহর পাড়ি…”

গানের শেষ লাইনটায় ‘বলদ সিঙ্গার’ শব্দটা আসতেই সবাই একে অপরের দিকে তাকাল। সুর তো ঠিকই আছে, কিন্তু এই মারা খাওয়া লিরিক্স কার আবিষ্কার?

রাজ চট করে বলল, “হিউম্যান সাইকোলজি বলে, আর্টের পেছনে যখন কোনো তীব্র অবাধ্য অবসেসন থাকে, তখন গানের লিরিক্সেও এমন অদ্ভুত কোড ল্যাঙ্গুয়েজ চলে আসে। রাত, তুই কারোর প্রেমে পড়েছিস ভাই?”

রাত শুধু একটা ম্লান হাসল। সে গিটারের কর্ডটা থামিয়ে ছাদের রেলিংয়ের দিকে তাকাল। তার মনে মনে তখন একটাই প্রশ্ন সুহানা কি এখন কোনো রেসিং ট্র্যাকে গাড়ি ছড়াচ্ছে? নাকি লতিফ মির্জার গুন্ডাদের থেকে বাঁচতে কোথাও লুকিয়ে আছে? ঠিক তখনই রাতের হুডির পকেটে থাকা ফোনটা তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে কোনো নাম নেই, একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত, আননোন ‘রং নাম্বার’ ভাসছে। রাত প্রথমে ভাবল কোনো ফ্যান বা কোনো ক্লায়েন্ট হবে। সে বিরক্ত হয়ে কলটা কেটে দিতে চাইল, কিন্তু কী ভেবে যেন রিসিভ করে কানে ঠেকাল।

“হ্যালো?” রাতের গলায় কিছুটা উদাসীনতা। ওপাশ থেকে কোনো জবাব এলো না। শুধু একটা চেনা, ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া গেল। রাতের বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে ড্রাম পেটাতে শুরু করল। এই নিঃশ্বাসের ছন্দ সে খুব ভালো করেই চেনে! পরের সেকেন্ডেই ওপাশ থেকে একটা ক্ষুরধার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “রক্তটা কি মুছেছিলে, নাকি এখনো ওই চকোলেট মুখে হিরো সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছ, বলদ সিঙ্গার?”

রাতের হাতের গিটারটা এক সেকেন্ডের জন্য কেঁপে উঠল। তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ওপাশে আর কেউ নয়… স্বয়ং সুহানা!

রাজ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পিলুগ্রামের বর্ষণমুখর সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু তাঁর মনের ভেতর তখন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের চেয়েও জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া চলছে।

রাজ গলা পরিষ্কার করে অবনীর দিকে না তাকিয়েই বলল, “দেখো অবনী, তুমি পিলুগ্রামের এই পরিবেশটা দেখে আবার ভুল বুঝছো না তো? আমি আরযান ভাইয়ের সামনে যা বলেছি, ওটা কিন্তু একেবারেই প্রফেশনাল গ্রাউন্ড থেকে বলা। তোমার ওই সিভিয়ার ট্রমা আর প্যানিক অ্যাটাকগুলো সামলানোর জন্য এই এনভায়রনমেন্টাল শিফটটা খুব দরকার ছিল। আর বিয়েটা… মানে, আইনি সুরক্ষা না থাকলে তো আমি তোমাকে চব্বিশ ঘণ্টা অবজারভেশনে রাখতে পারতাম না। সো, এই বিয়েটা কিন্তু ইন রিয়েলিটি তোমার থেরাপিরই একটা অংশ মাত্র। তুমি এটাকে পার্সোনাল নিচ্ছ না তো?”

রাজ যখন কথাগুলো বলছিল, তখন তাঁর নিজের কানেই সেগুলো খুব কাঁচা ফাঁকিবাজির মতো শোনাচ্ছিল। সে নিজের চশমাটা নাকের ওপর বারবার ঠিক করছিল। এটা রাজের নার্ভাস হওয়ার বড় লক্ষণ।

অবনী বিছানায় বসে রাজের এই ছটফটানি খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করছিল। রাজের পিঠের দিকে তাকিয়ে সে একটা মৃদু হাসি দিল। অবনী ধীর পায়ে উঠে রাজের একদম পেছনে এসে দাঁড়াল। রাজ জানালার কাঁচের প্রতিফলনে অবনীকে তাঁর পাশে দেখে একটু হকচকিয়ে গেল। রাজ আবার খেই হারিয়ে বলল, “মানে আমি বলতে চাচ্ছি, থেরাপিউটিক বন্ডিং আর পার্সোনাল ইমোশন কিন্তু আলাদা জিনিস। এজ এ ডক্টর, আমি স্রেফ তোমার ভালোর কথা ভেবেই এত বড় রিস্কটা নিলাম। আরযান ভাই তো অলরেডি আমাকে পাগল ডিক্লেয়ার করে দিয়েছেন। তুমি আবার হুট করে কোনো ভুল ডিসিশন নিও না। তুমি কী ভাবছো?”

অবনী রাজের দিকে কয়েক কদম এগিয়ে এলো। জানালার বাইরে থেকে আসা সোডিয়াম আলোর আভা তাঁর ফর্সা মুখে একটা মায়াবী ছায়া ফেলেছে। সে রাজের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত ও গভীর কণ্ঠে বলল, “ডাক্তারবাবু, আপনার এই থেরাপির থিওরিগুলো আপনার ডায়েরিতেই থাক। নয়-ছয় কথা বলে আমাকে আর ভোলানোর চেষ্টা করবেন না।”

রাজ অপ্রস্তুত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইল, “না, মানে থেরাপি তো আসলে…”

অবনী খিলখিল করে হেসে উঠল। রাজ স্তব্ধ হয়ে গেল, কারণ অবনীর গলার এই স্বতঃস্ফূর্ত হাসি সে থেরাপি সেশনে কোনোদিন শুনতে পায়নি। অবনী হাসতে হাসতেই রাজের খুব কাছে এসে একদম নিচু স্বরে বলল, “আপনি আমায় ভালোবাসেন, তাই না ডাক্তারবাবু? আপনার এই এত বড় রিস্ক নেওয়া, আরযান ভাইয়ের চড়া শাসন মাথা পেতে নেওয়া সবই কি স্রেফ থেরাপি? আমি কিন্তু সব জানি। আপনি না বললেও আপনার চোখ সব বলে দেয়। পেশেন্টের পালস চেক করতে করতে আপনি কবে যে নিজের মনটাই হারিয়ে ফেলেছেন, সেটা আমি আগেই ধরে ফেলেছি।”

রাজের বুকটা তখন এক অদ্ভুত শব্দে ধক করে উঠল। যে রাজ দুনিয়ার সব মানুষের সাইকোলজি নিয়ে খেলা করে, আজ সে তাঁর নিজের পেশেন্টের সামনে একদম নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবনী এক মুহূর্ত রাজের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার বলল, “খুব ভালো লাগে ডাক্তারবাবু, যখন আপনি আমাকে আড়াল করার জন্য মিথ্যে অজুহাত খোজেন। আপনার এই ভালোবাসাটা আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মেডিসিন।”

রাজ আর কিছু বলতে পারল না। জানালার বাইরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল, রাজের সব লজিক আর থেরাপি হার মানল অবনীর ওই সহজ স্বীকারোক্তির কাছে।

রাত তখন আনুমানিক একটা। কালো মেঘে আকাশটা পুরোপুরি ঢাকা, যেকোনো মুহূর্তে কালবৈশাখী নামবে। আলিশান মার্বেল পিলারের পাশে দাঁড়িয়ে আছে মীর আরযান শান। তাঁর পরনের কালো শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো। চারপাশে ওউড পারফিউমের চড়া ঘ্রাণ ছাপিয়ে তখন তীব্র হয়ে উঠেছে তামাকের কড়া গন্ধ। আরযানের ডানহাতের আঙুলের ডগায় জ্বলছে দামি বিদেশি সিগারেট। তিনি একের পর এক সিগারেট পুড়িয়ে চলেছেন, অথচ তাঁর পাথরের মতো শক্ত ও ফর্সা মুখাবয়বে কোনো ক্লান্তি নেই। হয়তো সাঁঝের কথাই ভাবছে। ঠিক তখনই সিঁড়িঘর থেকে ধীর পায়ে হেঁটে এলো মীর তাজ শাহরিয়ার। মীর ভাইদের মধ্যে তাজ সবসময়ই একটু আড়ালে থাকে, কিন্তু তার ধারালো চোখ আর শান্ত অবজারভেশন মীর বাড়ির কোনো চালই এড়াতে দেয় না। তাজ এসে আরযানের থেকে কয়েক হাত দূরে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। আরযানকে এভাবে একের পর এক সিগারেট ধ্বংস করতে দেখেও সে অবাক হলো না। সে পকেট থেকে লাইটারটা বের করে আরযানের দিকে এগিয়ে দিয়ে খুব ঠাণ্ডা গলায় বলল, “ তুমি এখানে ছাই ওড়াচ্ছ কেন? যা তোমায় কষ্ট দেয় তা কেন করতে যাও? নিয়ন্ত্রণ হারালে নাকি?”

আরযান জ্বলন্ত সিগারেটটায় শেষ টান দিয়ে মেঝেতে ফেলে বুট জুতো দিয়ে পিষে দিলেন। পরমুহূর্তেই প্যাকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে চেপে ধরলেন। তাজের বাড়িয়ে দেওয়া লাইটারের আলোয় আরযানের চোখ দুটো এক পলকের জন্য জ্বলে উঠল ঠিক যেন এক হিংস্র শিকারি বাঘের চোখ। সিগারেটটা ধরিয়ে এক গাল ধোঁয়া আকাশের দিকে ছুড়ে দিয়ে আরযান গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “নিয়ন্ত্রণ আমি হারাইনি তাজ। নিয়ন্ত্রণ আমি নিজের হাতে কড়া করে নিয়েছি। সাঁঝ একটা অবুঝ পাখি, যাকে খাঁচায় কীভাবে আটকে রাখতে হয় তা আমার খুব ভালো করেই জানা আছে।”

তাজ একটা বাঁকা হাসল। সে আরযানের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল, “পাখিকে খাঁচায় রাখা যায় ভাই, কিন্তু তার ডানা ঝাপটানো তো বন্ধ করা যায় না। মেলবোর্ন ফেরত ওই আদিবকে তো বর্ডার পার করে দিলে, কিন্তু সাঁঝের মনের ভেতর যে জেদটা তুমি নিজ হাতে বুনে দিয়েছ, ওটা কীভাবে উপড়াবে? তুমি কি চাও সেটা অন্তত নিজের কাছে পরিষ্কার করো।”

কি চায় সে? সিগারেটের লালচে আগুনটা অন্ধকারের মাঝে তীব্রভাবে কাঁপতে লাগল। আরযান তাজের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। দুজনের উচ্চতা আর ব্যক্তিত্বের চড়া ভাব ছাদের বাতাসকে এক সেকেন্ডে ভারী করে তুলল। আরযান তাঁর গম্ভীর, স্বৈরাচারী কণ্ঠে বিষাদ মিশিয়ে বললেন, “সম্পত্তি? মীর আরযানের সম্পত্তির হিসাব করার ক্ষমতা এই শহরের কোনো ব্যাংকের নেই, তাজ। কিন্তু সাঁঝ… ও তো নিষিদ্ধ টান, যার কোনো নাম হয় না। ও যদি মনে করে আদিবের দেওয়া ওই সস্তা প্রশংসা নিয়ে ও মীর আরযানের সীমানা পার হয়ে যাবে, তবে ও ভুল ভাবছে। ও জেদ দেখাবে, আমি সেই জেদ ভাঙব। ও যতবার ডানা ঝাপটাবো, আমি ততবার খাঁচার লোহার শিকগুলো আরও শক্ত করব। ও শুধু আমার নজরে থাকবে, আমার নিশ্বাসের সীমানায় থাকবে।”

তাজ আরযানের এই ভয়াবহ অধিকারবোধ দেখে এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তাজ আরযানের কাঁধে হাত রেখে ধীর গলায় বলল, “শাস্তিটা একটু বেশি কড়া হয়ে যাচ্ছে না ভাই? মেয়েটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেলে কিন্তু মীর আরযানের এই জেদ জেতার পরও হেরে যাবে।”

আরযান কোনো উত্তর দিল না। সে তাজের হাতটা আলতো করে সরিয়ে দিয়ে আবার রেলিংয়ের দিকে ঘুরল। পকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করতে করতে তিনি অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, “ভেঙে যাক সাঁঝ, কিন্তু ও যেন শুধু আমার বুকেই ভেঙে পড়ে।”*

ঠিক তখনই আকাশের কোণ চিরে কালবৈশাখীর প্রথম বিদ্যুৎটা চমকে উঠল, যা মীর আরযানের ফর্সা মুখে এক মরণঘাতী, তীব্র নিষিদ্ধ টানের ছায়া ফেলে গেল।

চলবে?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply