Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪৪


বাঁধনরূপেরঅধিকারী

লেখিকাসুমিচৌধুরী [৪৪]

রূপার এই পাগলাটে কাণ্ডকারখানা দেখে বাঁধনের মনের গহীনে একপ্রস্থ দ্যোতনা সৃষ্টি হলো। মেয়েটাকে চটানো কিংবা তার অমলিন অনুভূতির পরশ পাওয়া এ যেন এক নতুন খেলা! কিন্তু কাঁদতে কাঁদতে রূপার ফর্সা চেহারাটা একদম রক্তিম রূপ ধারণ করেছে, শ্বাস আঁটকে আসার উপক্রম।বিষয়টা উপলব্ধি করতেই বাঁধন নিজের দুই চওড়া তালুতে এই অষ্টাদশীর নরম গাল দুটো আলতো করে চেপে ধরে রূপার মুখটা নিজের সমান্তরালে নিয়ে এলো। গভীর চোখের তারায় চোখ রেখে, সুরটা একধাপ কোমল করে বললো,
—-” আরে স্টপ! কাঁদতে কাঁদতে কি পুরো প্রাসাদ ভাসিয়ে দিবি নাকি?”
কিন্তু ততক্ষণে রাশভাঙা অভিমান আর তীব্র মনস্তাপ রূপার হুঁশ-জ্ঞান পুরোপুরি হরণ করে নিয়েছে। এই পুরুষের প্রতিটি উচ্চারণ এখন তার কানে বিষাক্ত ছুরির ফলার মতো বিধছে! কোনো কিছু না ভেবেই নিজের সর্বশক্তি দিয়ে বাঁধনের খালি বুকে এক সজোর ধাক্কা বসিয়ে দিল রূপা।আচমকা ধাক্কায় সামলাতে না পেরে কয়েক পা পেছনে সরে গেল বাঁধন। রক্তজবার মতো লাল হয়ে ওঠা দুটো চোখ বাঁধনের চেহারায় গেঁথে দিয়ে, রুদ্ধ হয়ে আসা গলায় রূপা বললো,
—-” তুই একটা বেইমান! পরম মিথ্যুক!”
মুহূর্তের মধ্যে বাঁধনের দুটো হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এলো, হাতের রগগুলো ভেসে উঠলো স্পষ্ট। মেয়েটার গায়ে জ্বালা ধরানো রাগ চড়াতে গিয়ে এখন নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরিটাই উসকে উঠছে! তবে অত্যন্ত সূক্ষ্ম দক্ষতায় নিজের সেই উত্তাপ চেপে নিল সে।চেহারার সব কাঠিন্য দূর করে, এক ভিন্ন ছন্দের সুর তুলে বাঁধন বললো,
—-” আচ্ছা তুই প্রিসিয়াকে খুন করতে চাস, তাই তো?”
রূপার কণ্ঠ থেকে হাহাকারের মতো তীব্র এক আক্রোশ ছড়িয়ে পড়লো,
—-” হ্যাঁ! আগে ওকে খুন করবো, তারপর তোকে করবো!”
বাঁধন এক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর চেহারায় কোনো ভাঙন না ধরে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যময় ভঙ্গিতে বললো,
—-” ওকে ফাইন, আমি প্রিসিয়াকে নিয়ে আসছি। দাঁড়া।”
বলেই বাঁধন ট্রাউজারের পকেট থেকে ফোনটা বের করে সরাসরি একটা নম্বরে ডায়াল করে কানে ধরলো। অপরপ্রান্তে রিসিভ হতেই খুব সংক্ষেপে আদেশের সুর ফুটিয়ে বললো,
—-” ব্রিং দেম হিয়ার ফাস্ট।”
ফোনটা রেখে দেওয়ার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই শান্ত পরিবেশের স্তব্ধতা ভেঙে কয়েকজন গার্ড মুভিনকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে এলো। বাঁধনের ঠিক মুখোমুখি এনে মুভিনকে জোরপূর্বক হাঁটু গেড়ে বসিয়ে দেওয়া হলো।ঘটনার আকস্মিকতায় রূপা পুরোপুরি দিশেহারা! বাঁধন আসলে কী খেলা খেলছে, তার মাথায় কিছুই ঢুকছে না।বাঁধন এক পলকের জন্য রূপার বিভ্রান্ত চেহারার দিকে নিজের গাঢ় দৃষ্টি ফেললো। পরক্ষণেই সেখান থেকে চোখ সরিয়ে, হাঁটু গেড়ে থাকা মুভিনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একদম থমথমে কণ্ঠে বললো,
—-” আচ্ছা, ইথান প্রিসিয়া কে?”
মাথা নিচু করে নিচু গলায় জবাব দিল মুভিন,
—-” খ্রিস্টান বংশের মাফিয়া ডন ইথান রিচার্ডসনের মেয়ে।”
বাঁধন চোখ দুটি কিছুটা ছোট করে থমথমে সুর তুলে বললো,
—-” তুই কী এখন ইথান প্রিসিয়াকে দেখতে পাচ্ছিস?”
দ্রুত হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ালো মুভিন।রূপার দৃষ্টিতে ফুটে উঠলো এক তীব্র বিস্ময় আর কৌতূহল। কই, সে নিজে তো আশেপাশে কোনো প্রিসিয়াকে দেখতে পাচ্ছে না! তবে এই মুভিন কোথায় দেখতে পেল তাকে?দুটি হাত ট্রাউজারের পকেটে পুরে মুভিনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, ঠোঁটে একফালি বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বাঁধন বললো,
—-” আচ্ছা, কোথায় দেখতে পাচ্ছিস? আমাকে একটু দেখা তো।”
মুহূর্তের মধ্যে নিজের কাঁপতে থাকা তর্জনীটা সোজা তুলে রূপার দিকে ইশারা করলো মুভিন।যেন তীব্র কারেন্টের শর্ট খেল রূপা! বুকটা ধক করে উঠলো তার। এই লোকটা তার দিকে আঙুল তুলছে কেন?বাঁধন গম্ভীর গলায় প্রশ্ন তুললো,
—-” কিন্তু আমরা তো ওকে রূপা নামে চিনি। তবে সে ইথান প্রিসিয়া কীভাবে হয়?”
মুভিন রুদ্ধশ্বাসে কেঁপে উঠে বললো,
—-” ও রূপা নয়! ও কানাডার ইথান রিচার্ডসনের মেয়ে ইথান প্রিসিয়া। এটাই আসল সত্য!”
কথাটা কানে পৌঁছানো মাত্রই রূপার মাথাটা তীব্রভাবে চক্কর দিয়ে উঠলো। এক লহমায় মনে হলো, পায়ের তলার মসৃণ মেঝেটা যেন শূন্যে বিলীন হয়ে গেছে!বাঁধন একচুলও বিচলিত না হয়ে, বরফশীতল কণ্ঠে বললো,
—-” আচ্ছা, কীভাবে প্রমাণ করবি এটা সত্য?”
মুভিন বিষণ্ণ চোখে নিচে তাকিয়ে বলে উঠলো,
—-” সত্যটা আমি নিজেই জানি। আজ থেকে প্রায় ১৯ বছর আগে রূপাকে হাসপাতাল থেকে চুরি করে মারুফ হোসেন। আমি সেই দৃশ্যটা সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখতে পাই। পরবর্তীতে আমি মারুফের স্ত্রী রজনীর নাম্বারে কল দিয়ে সম্পূর্ণ বিষয়টা বিস্তারিত বলি। কিন্তু তিনি পুলিশে না গিয়ে আমাকে উল্টো এক অদ্ভুত প্রস্তাব দেন! তিনি বলেন, এই মেয়েটাকে যদি বড় করা যায়, তবে এর নামের সম্পত্তির সই নিয়ে আমরা তিনজন অর্ধেক করে ভাগ করে নেব। লোভের বশে আমিও রাজি হয়ে যাই। এরপর রজনীর সাথে যোগাযোগ রাখতে রাখতে আমাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে রজনী মারুফকে ডিভোর্স দিয়ে রূপাকে নিজের কাছে নিয়ে চলে যায়। আমি তখন কানাডায় ছিলাম, আর তাছাড়া আমার নিজের স্ত্রী-সন্তান আছে। এই পরিস্থিতিতে রজনীকে বিয়ে করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না, আর আমার সেই ইচ্ছেও ছিল না! শুধুমাত্র বিপুল ওই সম্পত্তির লোভে তার সাথে নামমাত্র সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলাম। তাই তাকে পরামর্শ দিয়েছিলাম সে যেন সাময়িকভাবে অন্য কাউকে বিয়ে করে রূপাকে বড় করে তোলে, আর মেয়েটা প্রাপ্তবয়স্ক হলে তখন সমস্ত সত্য প্রকাশ করা যাবে।”
কথাগুলো কানে পৌঁছানো মাত্রই গায়ের সব শক্তি যেন এক লহমায় হারিয়ে গেল রূপার! একঝাটকায় ধপাস করে মেঝের ওপর বসে পড়লো সে। চারপাশের পুরো পৃথিবীটা যেন তীব্র গতিতে ঘুরতে শুরু করেছে! রজনী যে তার আসল জন্মদাত্রী মা নয়, এই সত্যটা সে আগেই জানতো। কিন্তু তার শরীরে বইছে এক অচেনা ভিনদেশি রক্ত, সে বাংলাদেশের মাটির মেয়েই নয় এই অপ্রিয় সত্য যেন তার চেতনাকে পুরোপুরি অসাড় করে দিল!মুভিন আরও কত অসংলগ্ন কথা বলে চললো, সব নিস্তব্ধ হয়ে শুনলো রূপা।কয়েক মুহূর্ত পর বাঁধন পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এক গার্ডের দিকে চোখের ইশারা করতেই সে অনুগত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে দ্রুত ঘরে প্রবেশ করলো। পরক্ষণেই একটা ল্যাপটপ এনে রূপার ঠিক মুখোমুখি রেখে স্ক্রিনটা অন করলো। ল্যাপটপের পর্দায় ফুটে উঠলো একটা ভিডিও ক্লিপ।
ভিডিওতে মারুফ হোসেনকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেদিনের সেই সাক্ষাৎকারে রূপার পরিচয় নিয়ে মারুফ যা যা ফাঁস করেছিল, তার প্রতিটি শব্দ রূপার কানে বিঁধতে লাগলো। ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে রূপার চোখ দুটো নোনা জলে ঝাপসা হয়ে এলো।তার আপন বলে এই ধরাতলে কেউ বেঁচে নেই।তার জন্মদাতা মা-বাবা বহুকাল আগেই ওপারে পাড়ি জমিয়েছেন অর্থাৎ নিখাদ সত্যিটাই হলো, সে সত্যিই এক সহায়হীন এতিম!বুকের ভেতর চেপে রাখা নিঃশ্বাস আটকে এসে দু-হাতে মুখ ঢেকে তীব্র হাহাকারে কেঁদে উঠলো রূপা।ধপাস করে মেঝের ওপর বসে কান্নাকাটি করা রূপার ঠিক কাছাকাছি এগিয়ে এলো বাঁধন। তার চেহারায় একপ্রকার স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। কিছুটা তিক্ততা মিশিয়ে বললো,
—-” তুই কি এই প্যানপ্যান কান্না ছাড়া আর কিছুই পারিস না? সামান্য কোনো কিছু ঘটলেই ছাগলের মতো প্যাঁ প্যাঁ করে কাঁদতে বসে যাস! ডিজগাস্টিং!”
নোনা জলে ঝাপসা হয়ে আসা চোখ দুটো তুলে বাঁধনের আপাদমস্তক চাইলো রূপা। তখনই তার চোখ গিয়ে আটকে গেল বাঁধনের উন্মুক্ত ছাতিটার ওপর। যেখানে কৃষ্ণবর্ণের কালিতে স্পষ্ট ফুটে আছে সেই নামটা
—-প্রিসিয়া—-
যে প্রিসিয়ার নাম দেখে সে এতক্ষণ ঈর্ষায় আর অভিমানে দগ্ধ হচ্ছিল, সেই প্রিসিয়া তো আর অন্য কেউ নয় সে তো নিজেই! বাঁধন এতদিন ধরে রূপার সেই আসল সত্তা, সেই ধুলোচাপা পড়ে থাকা সত্যটাকেই নিজের শরীরে ধারণ করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল!ভাবনাটা মাথায় আসামাত্রই এক অচেনা আবেগে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো রূপা। ধেয়ে এলো বাঁধনের মুখোমুখি। নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে লোকটার শক্ত বুকে এলোপাথাড়ি আঘাত করতে করতে রুদ্ধ স্বরে বললো,
—-” আপনি এত কিছু জানতেন, তবুও আমাকে কেন এতদিন আঁধারে রাখলেন? কেন আগে কিছু বলেননি?”
বাঁধন নিজের জায়গায় অবিচল থেকে দুটো হাত প্রসারিত করে রূপাকে আটকানোর চেষ্টা চালালো। ঠোঁটের কোণে সামান্য রাশভারী ভাব ফুটিয়ে বললো,
—-” আরে থাম! রোবট পেয়েছিস নাকি আমাকে যে যখন খুশি এসে কিল-ঘুষি বসিয়ে দিবি? আর বাই দ্য ওয়ে, আমি সঠিক মুহূর্তটার অপেক্ষায় ছিলাম। কারণ কিছু জটিল সত্য পুরোপুরি পরিষ্কার না করে হুট করে সামনে আনা যায় না। আজ সেই সঠিক সময়টা এসেছে, আর আমি প্রমানসহ তোর আসল পরিচয় তুলে ধরেছি।”
বাঁধনের সেই তপ্ত বুকে আর কোনো আঘাত করার শক্তি রূপার রইলো না। দুই বাহু দিয়ে কঠিন সেই পুরুষটিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে দিল সে। অঝোর ধারায় চোখের জল বিসর্জন দিতে দিতে রূপা ক্ষোভ আর বেদনায় আক্ষেপ প্রকাশ করে বললো,
—-” আমি নিখাদ এক এতিম! আমার মা-বাবা বলে এই ধরায় কেউ নেই, আমি সত্যিই বড় এতিম!”
বাঁধন কোনো সান্ত্বনার বাণী শোনালো না। শান্ত ও নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে। কাঁদুক মেয়েটা! বুকের গহীনে জমানো পলিমাটিগুলো নোনা জলে ধুয়ে ধুয়ে মনটা একটু হালকা হোক।আশেপাশে তখনও সব সশস্ত্র গার্ড নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর তাদের সবার উপস্থিতিতেই এই অষ্টাদশী বাঁধনকে আঁকড়ে ধরে হাহাকার করে কেঁদে চলেছে।বাঁধন চোখের সূক্ষ্ম ইশারায় গার্ডদের দিকে নির্দেশ পাঠালো। আদেশের ভাষা বুঝে নেওয়ার সাথে সাথে গার্ডরা মেঝের ওপর পড়ে থাকা মুভিনকে সেখান থেকে টেনেহিঁচড়ে সরিয়ে নিয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্ত পার হতেই রূপার স্তব্ধ মস্তিষ্কে যেন এক অচেনা আশঙ্কার বিদ্যুৎ চমকে উঠলো! সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ভাবনা এসে তার রক্তচাপ যেন এক লহমায় বাড়িয়ে দিল। সে খ্রিস্টান, আর বাঁধন খাঁটি মুসলিম!
ভাবনাট মাথায় আসামাত্রই এক তীব্র আতঙ্কে বাঁধনের বুক থেকে ছিটকে পেছনে সরে এলো সে। ভয়ে সারা শরীরটা রি-রি করে কেঁপে উঠলো তার। নোনা জলে ঝাপসা হয়ে আসা চোখ দুটো স্বামীর গাঢ় চেহারার ওপর রেখে ভেতরের অজানা এক আতঙ্কে শিউরে উঠলো রূপা। তার মনে হাজারটা প্রশ্ন দানা বাঁধছে এই ধর্মাচরণের ফারাকের জন্য বাঁধন তাকে চিরতরে পর করে দেবে না তো?সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অষ্টাদশীর এই ভয়ার্ত, অস্থির ভাবভঙ্গি বাঁধনের তীক্ষ্ণ চোখ দুটো এড়াতে পারলো না। সে কৌতূহল নিয়ে দুটো ভ্রু সামান্য উঁচিয়ে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে বললো,
—-” কী হয়েছে?”
গলার স্বর জড়িয়ে এলো রূপার। শুকনো নালী দিয়ে কোনোমতে কাঁপতে কাাঁপতে উচ্চারণ করলো,
—-” আ-আমি… আমি খ্রিস্টান!”
বাঁধনের চেহারায় বিন্দুমাত্র অস্থিরতার ছাপ দেখা গেল না। সে একদম স্বাভাবিক ও থমথমে সুর তুলে বললো,
—-” তো?”
রূপার চোখে ফুটে উঠলো একরাশ ব্যাকুলতা আর হারানোর ভয়। কাঁপা ঠোঁটে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
—-” আপনি… আপনি আমাকে ছেড়ে দেবেন না তো?”
এক হাত কোমরে রেখে অন্য হাত দিয়ে কপালটা শক্ত করে চেপে ধরলো বাঁধন। এ কোনো গাধার প্রেমে পড়লো সে? এ তো মহামূর্খ গাধার চাইতেও একধাপ এগিয়ে! যার জন্য সে নিজের ক্যারিয়ার, স্বদেশের বিশাল চাকরি সব পেছনে ফেলে সুদূর কানাডায় ছুটে এলো, আর এই মেয়ে কিনা ভেবে বসে আছে সে তাকে ছেড়ে দেবে!বুকের ভেতর থেকে কয়েকটা দীর্ঘশ্বাস টেনে নিয়ে, বিরক্তি আর স্নেহের এক অদ্ভুত মিশ্রণে রূপার দিকে চেয়ে বললো,
—” বিশ্বাস কর! মাফিয়ার বাচ্চা, আমি যদি আগে থেকে জানতাম এই পৃথিবীতে এসে তোর মতো এক গাধার পাল্লায় পড়তে হবে, তবে ভুলেও এই মর্ত্যে আসতাম না!”
কথাটা শোনামাত্রই অভিমান আর রাগে ফুলকাটা হয়ে গেল অষ্টাদশীর দুই গাল! ঠোঁট দুটো উল্টে এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে পুরুষটার দিকে চেয়ে রইলো সে।মেয়েটার গাল ফোলানোর সেই কচি মুখশ্রী দেখে এবার আর নিজের হাসির রাশ টেনে রাখতে পারলো না বাঁধন। থমথমে ভাবটা উবে গিয়ে ফিক করে হেসে ফেললো সে।রূপা মুগ্ধ ও বিস্মিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো স্বামীর পানে। এই কঠোর, গম্ভীর পুরুষের মুখে এমন অমলিন হাসি যেন বড্ড বেমানান! এরকম মিষ্টি আর খিলখিল করা হাসি জীবনে কোনোদিন এই মানবটার মুখে সে দেখেনি। কাউকে হাসলে যে এতটা দেবদূতের মতো সুন্দর লাগতে পারে, তা রূপার কল্পনারও বাইরে ছিল!
মুহূর্তের মধ্যে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়লো তার জন্য। মনে হতে লাগলো, জীবনের সব শোক, কষ্ট আর আক্ষেপ যেন পুরুষটির এই এক চিলতে হাসির উত্তাপে নিমিষেই ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাবে!ধীর পায়ে এগিয়ে এসে অষ্টাদশীর দুই গালে নিজের উষ্ণ হাত দুটো রাখলো বাঁধন। হাতের বুড়ো আঙুল দুটো দিয়ে রূপার ভিজে যাওয়া চোখের জল আলতো করে মুছিয়ে দিতে দিতে স্নিগ্ধ স্বরে বললো,
—-” ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছে থাকলে, যেই মুহূর্তে জানতে পেরেছি আমি একটা খ্রিস্টান মেয়েকে মন সঁপে দিয়ে তাকে বিয়ে করেছি, তাহলে তখনই ছেড়ে দিতাম! বুঝেছিস? তাই একটা কথা খুব ভালো করে মাথায় গেঁথে নে এই বাঁধনের খাঁচায় যতক্ষণ শেষ নিঃশ্বাসটুকু বাদে, সে কোনোদিন তোকে নিজের থেকে আলাদা হতে দেবে না।”
ছলছল চোখে বাঁধনের দিকে চেয়ে রূপা সকাতরে বললো,
—-” সত্যি বলছেন আপনি?”
বাঁধন এক মুহূর্ত নীরব থেকে খুব শান্ত গলায় বললো,
—-” হুম।”
আর কিছু ভাবার মতো মানসিক অবস্থা তখন রূপার ছিল না। ব্যাকুল হয়ে আবারও বাঁধন কে শক্ত করে নিজের আবেশে জড়িয়ে ধরলো ।কয়েক মুহূর্তের নিঝুম নীরবতা নেমে এলো চারেপাশে। হঠাৎই রূপার রুদ্ধ মস্তিষ্কে আগের একটা কথা বিদ্যুৎ চমকের মতো খেলে গেল! বাঁধন চাকরি ছেড়ে দিয়েছে তা-ও ইথান প্রিসিয়ার জন্য! অর্থাৎ, শুধুমাত্র তার জন্য!চকিতে মাথা তুলে বাঁধনের মুখের পানে চোখ রেখে বিস্ময়ে রূপা বললো,
—-” আপনি চাকরি কেন ছাড়লেন?”
বাঁধন এক নিমেষে রূপার কোমরটা আঁকড়ে ধরে একদম নিজের শরীরের সাথে লেপটে নিলো। অষ্টাদশীর সুবাস মাখা ঠোঁটের ঠিক সামান্য দূরত্বে নিজের ঠোঁট দুটো রেখে আবেশ জড়ানো মৃদু সুরে ফিসফিস করে বললো,
—-” আপনাকে পাওয়ার তীব্র নেশায়।”
এক অচেনা গভীর শিহরণে থরথর করে কেঁপে উঠলো রূপা। অসীম বিস্ময় মাখানো দৃষ্টিতে বাঁধনের দিকে চেয়ে রইলো সে। পরক্ষণেই কৌতূহল সামলাতে না পেরে আবার বললো,
—-” তাহলে সিগারেট খাওয়ার কারণ?”
একদম কাছাকাছি থেকেই তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বাঁধন জবাব দিল,
—-” সেই কারণটাও আপনি।”
দুই ভ্রু আশ্চর্য হয়ে খানিকটা উঁচুতে উঠে গেল রূপার । লোকটার এমন উসকানিমূলক কথার আসল মানে রূপা কিছুতেই ধরে উঠতে পারছে না। সে আবারও প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
—-” তাহলে হঠাৎ এমন রক্তক্ষয়ী গুন্ডাগিরির কারণ?”
ডান হাত দিয়ে এই রূপসীর নাকটা আলতো করে টিপে দিয়ে রহস্যময় হেসে বাঁধন বললো,
—-” সেটাও আপনি!”
এক ঝটকায় মেজাজটা চড়ে গেল রূপার! ক্ষোভের জ্বালায় বাঁধনকে ধাক্কা দিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে এলো সে। একরাশ বিরক্তি সুরে বললো,
—-” আমি এমন কী মহাপাপ করেছি যার খেসারত দিতে আপনাকে এই চরম আর ধ্বংসাত্মক পথগুলো বেছে নিতে হলো?”
বাঁধন হাতের রগগুলো হালকা ডলে নিয়ে প্রথমে ডান হাতটা একটা আলতো ঝাঁকি দিল, পরপরই বাঁ হাতটাও একইভাবে ঝেড়ে নিল। তারপর ধীর ও স্থিত পদে রূপার দিকে এগোতে এগোতে বললো,
—-” একটা আস্ত মানুষকে নিঃশব্দে পাগল করে ছেড়েছেন আপনি! হয়তো এটাই আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় পাপ।”
আশঙ্কায় ক্রমাগত পেছন পানে পা বাড়াতে বাড়াতে রূপা রুদ্ধ স্বরে বললো,
—-” একদম ফাজলামি করবেন না! আমি কাউকে পাগল-টাগল করি নাই, বুঝলেন?”
ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বাঁধন শুধালো,
—-” তাই?”
পিছাতে পিছাতে একঘেয়ে সুরে উত্তর দিল রূপা,
—-” হুম!”
কিন্তু অনবরত পিছাতে পিছাতে রূপা একদম সুইমিংপুলের ধার ঘেঁষে এসে দাঁড়িয়েছে, তা তার নিজেরও খেয়াল ছিল না! হঠাৎ পরের পা-টা ফেলতেই পথ শেষ! ভারসাম্য হারিয়ে সোজা সুইমিংপুলের কনকনে জলের দিকে উল্টে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হতেই বাঁধন বিদ্যুৎ গতিতে সামনে ছিটকে এলো। এক ঝটকায় শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ফেললো রূপার হাতটা।রূপা তখন একদম শূন্যে ঝুলে থাকা অবস্থায় পড়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকি নিয়ে টিকে আছে। বাঁধন শুধু মুঠোটা আলগা করে দিলেই সোজা গিয়ে পড়বে হিমশীতল পুলে! বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা তীব্র গতিতে লাফাচ্ছে তার, ঘন ঘন বড় বড় শ্বাস নিতে লাগলো সে।বাঁধন ওপর থেকে রূপার সেই ভয়ার্ত, আকুল চেহারার দিকে তাকিয়ে কোমল আবেশভরা সুরে বললো,
—-” কেউ আপনাকে ছাড়া বাঁচতে পারে না। আপনি দূরে সরে গেলে সে দিশেহারা হয়ে যায়, তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয়, সমস্ত পৃথিবীটা তার কাছে একদম এলোমেলো হয়ে যায়! আপনি ছাড়া যে সে বড্ড অগোছালো আপনিই তার একমাত্র শান্তির নাম, আপনিই তার বেঁচে থাকার সুখানুভূতি।”
বিস্ময় আর কৌতূহলের এক গভীর চাদরে ঢাকা পড়লো রূপার চোখ দুটো। মনের অজান্তেই এক ঘোরলাগা স্তব্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে রুদ্ধশ্বাসে উচ্চারণ করলো,
—-” কে সে?”
বাঁধন নিজের তীব্র চাহনিটা রূপার ওপর স্থির রেখে খুব হালকা আর আবেশ জড়ানো গলায় বললো,
—-” আপনি নিজে বুঝে নিয়েন, সে কে।”
রূপা আর একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারলো না। শূন্যে ঝুলন্ত অবস্থায় একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলো সেই গম্ভীর চেহারার পানে। বাঁধনের ঠোঁটের কোণে হঠাৎ ফুটে উঠলো এক দুষ্টুমিভরা কুটিল হাসি। হালকা হেসে শুধালো,
—-” ছেড়ে দিব?”
মুহূর্তের মধ্যে রূপার মনের গভীর ঘোরটা কেটে গেল! সে যে সুইমিংপুলের কনকনে জলের ওপর একদম শরীর ঝুঁকিয়ে শূন্যে ভারসাম্যহীন হয়ে ঝুলছে, সেই চরম বাস্তবতার কথা একদম ভুলেই গিয়েছিল! বাঁধন হাতের আঁকড় আলগা করলেই ছপাৎ করে আছড়ে পড়বে হিমশীতল অতলে।
ভয়ে গলার কাছে এক দলা থুতু গিলে, আকুল নয়নে চেয়ে সকাতরে বলে উঠলো,
—-” প্লিজ ছাড়বেন না! দোহাই আপনার!”
বাঁধন একপলক রূপার ভয়ার্ত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি মাখা সুরে আক্ষেপের সাথে বললো,
—-” আই এম সরি, বেইবি!”
রূপা ভয়ে হাত-পা ঠাণ্ডা করে তীব্র আকুতি জানিয়ে উঠল,
—-” না, না, প্লিজ! প্লিজ ধরুন!”
কিন্তু রূপার সেই আকুতিতে কান না দিয়ে বাঁধন হাওয়ায় একটা শিস বাজিয়ে মুখে গাণিতিক সংখ্যা উচ্চারণ করতে শুরু করলো,
—-” ওয়ান… টু… থ্রি…!”
থ্রি বলা শেষ হতেই নিমিষে রূপার হাত দুটো আলগা করে দিল বাঁধন!বিপদের মুখ থেকে নিজেকে বাঁচাতে রূপা আঁকড়ে ধরার তীব্র চেষ্টায় সোজা হাত দুটো বাঁধনের দিকে বাড়িয়ে দিল। কিন্তু শরীর ততক্ষণে অনেকটা ঢলে নিচে নেমে যাওয়ায় বাঁধনের চওড়া ছাতি স্পর্শ করা সম্ভব হলো না। রূপা কোনো কিছু না ভেবেই বাঁচার তাগিদে খপ করে বাঁধনের পরনের ট্রাউজারটা শক্ত করে টেনে ধরলো!বাঁধনের মুখের দুষ্টুমির হাসিটা এক লহমায় উবে গেল! সে কিছু বুঝে ওঠার বা নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই, রূপার টানের তোড়ে নিজের শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে সোজা নিচের দিকে হেলে পড়লো। পর মুহূর্তেই দুজন একসাথে ভাসমান গতিতে গিয়ে সুইমিংপুলের সেই হিমশীতল কনকনে পানিতে ‘ছপাৎ’ শব্দে আছড়ে পড়লো!
এক নিমেষেই দুজন ভিজে একদম একাকার হয়ে গেল! কনকনে হিমশীতল পানির তলদেশ থেকে ঝপাৎ করে দুজন একসাথে মাথা তুলে ওপরের বাতাসে শ্বাস নিল।বাঁধনের মেজাজ তখন চরম তুঙ্গে। রূপার এই আচমকা কাণ্ডকারখানায় ক্ষেপে গিয়ে তীব্র কিছু শোনানোর জন্য মুখ খুলতে যাবে, কিন্তু রূপার চেহারার দিকে চোখ পড়তেই এক মুহূর্তের জন্য নিখাদ স্তম্ভিত হয়ে গেল সে!রূপার দীর্ঘ কৃষ্ণকালো চুলগুলো ভিজে একাকার হয়ে তার ফর্সা গাল আর অনাবৃত ঘাড়ে লেপ্টে আছে। ভেজা চোখের পাপড়িগুলো যেন আগের চেয়েও শতগুণ ঘন আর গাঢ় দেখাচ্ছে। আর তার সুগঠিত থুতনি বেয়ে ফোটা ফোটা স্বচ্ছ পানি টপটপ করে ঝরে পড়ছে নিচের শান্ত জলে!মুহূর্তের মধ্যে বাঁধনের সেই তীব্র রাগ উবে গিয়ে চোখের তারায় ঘন হয়ে এলো এক মাতাল করা গভীর নেশা!

বাঁধনকে ওভাবে নিজের পানে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে রূপা কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। সে ভেবেছিল বাঁধন নিশ্চয়ই কোনো কঠিন বকুনি দেবে! তাই আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু একটা বলার জন্য যেই না নিজের কচি ঠোঁট জোড়া উন্মুক্ত করতে গেল, ঠিক তখনই বাঁধন ছিটকে সামনে এগিয়ে এলো।রূপার ভিজে যাওয়া রেশমি চুলে ডান হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, এক অনির্বচনীয় আবেশে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল রূপার ভেজা মিষ্টি ঠোঁটের গভীরে!পুরো ঘটনাটা এত দ্রুত আর আচমকা ঘটে গেল যে রূপার তা উপলব্ধি করার মতো ন্যূনতম সময়টুকুও মিললো না। কনকনে পানির মাঝে দাঁড়িয়ে তার পুরো শরীর যেন এক পলকে বরফের মতো একদম নিথর ও জমে কাঠ হয়ে গেল! এই তপ্ত, উন্মত্ত পুরুষটিকে থামানোর সামান্যতম ক্ষমতা বা হুঁশটুকুও যেন হারিয়ে ফেললো সে।

রাতের কনকনে ঠান্ডা বাতাসে নিঝুম বারান্দায় নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সীমা। হালকা বাতাস এসে তার রেশমি চুলগুলোকে আলতো করে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। মনটার গহীনে কেমন যেন একটা অচেনা অস্থিরতা দানা বেঁধেছে!
আজকে পুরোটা দিন জুড়ে ইশতিয়াক তাকে কী পরিমাণ যে জ্বালিয়ে মেরেছে, তার কোনো হিসাব নেই! লোকটা হঠাৎ কেমন যেন বেপরোয়া আর দুষ্টুমিতে মেতে উঠেছে তার সাথে। ইশতিয়াকের এই অস্বাভাবিক রূপ সীমা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। শহরের ব্যস্ততা ছেড়ে লোকটা হুট করে গ্রামে কেন চলে এলো? আর এসেই বা কেন সীমাকে ঘিরেই তার সব ছলাকলা? আচ্ছা, এই সবকিছু কি শুধুই ক্ষণিকের ঠাট্টা নাকি এর পেছনে কোনো গভীর সত্য লুকিয়ে আছে? হাজারো অলিখিত প্রশ্ন সীমার মনকে প্রতিনিয়ত ঘিরে ধরছে, কিন্তু কোনোটারই সঠিক উত্তর মিলিয়ে উঠতে পারছে না সে।
সীমা যখন এই গভীর ভাবনার সাগরে তলিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক উত্তপ্ত পুরুষালী নিঃশ্বাস এসে তার অনাবৃত ঘাড়ে ছোঁয়া দিয়ে গেল!এক তীব্র অচেনা শিহরণে সীমার পুরো শরীর মুহূর্তের মধ্যে শিউরে উঠলো! বুকের ভেতরটা অকারণে প্রচণ্ড জোরে ধক করে উঠলো তার। ধীরগতিতে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকানোর চেষ্টা করতেই, রাতের সেই নিঝুম নিস্তব্ধতা চুরমার করে দিয়ে এক গভীর পুরুষালি কণ্ঠ সীমার একদম কানের কাছে ফিসফিস করে সুর তুলে গেয়ে উঠলো,
‘চলে আয় মনেরই ঠিকানায়,
বাসবো ভালো হাত ধরে
চলে আয় প্রেমেরই ইশারায়,
দেবো তোকে প্রেম ভরে’
এক অদ্ভুত আবেশে আবারও শিউরে উঠলো সীমা! চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখলো, ইশতিয়াক তার একদম ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। এতটাই কাছে যে, লোকটার উত্তপ্ত নিঃশ্বাস এসে আছড়ে পড়ছে সীমার অনাবৃত ঘাড়ে!
আতঙ্কে সীমা খানিকটা সরে যাওয়ার উপক্রম করতেই, পিছন থেকে এক ঝটকায় সীমার সরু কোমরটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে নিজের বুকের সাথে লেপটে নিলো ইশতিয়াক।
মুহূর্তের মধ্যে যেন থমকে গেল সীমার পুরো অস্তিত্ব! বুকের ভেতর শ্বাসের গতি এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে গেল। জীবনে এই প্রথমবার সে ইশতিয়াকের এত ঘনিষ্ট স্পর্শে! রাগে আর অস্বস্তিতে চিৎকার করে উঠলো সীমা,
—-” কী হচ্ছে কী! ছাড়ুন আমাকে! এভাবে ধরেছেন কেন?”
ইশতিয়াক কোনো তর্কেও গেল না, একটা উত্তরও দিল না। অত্যন্ত নিপুণ হাতে আড়াল থেকে একটা তাজা সাদা গোলাপ বের করে সীমার কানের পিঠে গুঁজে দিল। ইশতিয়াকের আঙুলের মিহি স্পর্শ ঘাড়ে লাগতেই এক অচেনা শিহরণে চোখ দুটো আপনাতেই বুজে এলো সীমার।
ঠিক তখনই সীমার সংবেদনশীল কানে আলতো করে ফুঁ দিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে ইশতিয়াক বলে উঠলো,
—-” আর যদি না ছাড়ি?”
সীমা চোখ খুলে তীব্র বিরক্তি আর ব্যাকুলতা মিশিয়ে বললো,
—-” ছাড়বেন না কেন? আপনার হঠাৎ কী হয়েছে একটু বলবেন?”
ইশতিয়াক হালকা হেসে, খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো,
—-” কই, আমার আবার কী হবে? আমি তো এক্কেবারে ঠিকঠাক আছি!”
সীমা এবার ক্ষোভে ফুঁসে উঠে বললো,
—-” তাহলে মাঝখান থেকে আমার সাথে এসব মেকি নাটক করার মানেটা কী?”
সীমার কথা শেষ হওয়ার সুযোগ না দিয়েই এক লহমায় তার নরম গালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল ইশতিয়াক!সীমা চরম রাগে কিছু একটা শোনাতে যাবে, কিন্তু তার আগেই ইশতিয়াক সীমার ঘাড়ে নিজের মুখটা গভীর করে ডুবিয়ে দিয়ে আবেশ জড়ানো রুদ্ধ স্বরে বলে উঠলো,
—-” আর আমি যদি বলি এসব কোনো নাটক নয়, এর প্রতিটি অনুভূতিই নিখাদ সত্যি? তাহলে?”
সীমার ধৈর্যের বাঁধ এবার পুরোপুরি চুরমার হয়ে গেল! লোকটা তাকে ভাবছেটা কী? যখন খুশি অবহেলায় ছুড়ে ফেলবে, আর ইচ্ছে হলেই আবার অধিকার ফলাতে এসে এমন অসভ্যতা করবে?
রাগে ও ক্ষোভে পুরোপুরি হুঁশ হারিয়ে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ইশতিয়াকের মুখোমুখি ঘুরে দাঁড়ালো সে। তারপর ইশতিয়াক কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সমস্ত শক্তি জড়ো করে তার গালে কষে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল! সেই চড়ের তীব্র শব্দে পুরো নিরিবিলি করিডোর যেন মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠলো।বুকের ভেতর চেপে রাখা জমে থাকা সব কষ্ট এক নিমেষে উপচে পড়ে আর্তনাদের মতো ছড়িয়ে পড়লো সীমার কণ্ঠ থেকে,
—-” কী পেয়েছেন আপনি আমাকে, হ্যাঁ? আমি কি আপনার খেলার কোনো নির্জীব পুতুল যে যখন খুশি মন চাইল আর আমায় নিয়ে খেলা শুরু করলেন? আপনি মুক্তি চেয়েছিলেন না? আমি তো নিঃশব্দে আপনাকে সেই মুক্তি দিয়ে চিরতরে দূরে সরে এসেছি! তাহলে আবার কেন আমার সামনে এসে আমাকে বাধ্য করছেন আপনার বিষাক্ত মায়ায় জড়াতে? কেন আমাকে এভাবে জ্যান্ত লাশ বানিয়ে রাখছেন?”
সীমার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। সে গলা ফাটিয়ে বলতে লাগলো,
—-” এক কাজ করুন, এভাবে প্রতিদিন তিলে তিলে মারার চেয়ে একবারে মেরে ফেলুন আমাকে! আর যদি মারতে না পারেন, তবে প্লিজ এভাবে বাঁচিয়ে রেখে তড়পাবেন না! আমি একটু মানসিক শান্তি চাই… একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে চাই! হাতজোড় করে অনুরোধ করছি, এখান থেকে চলে যান আপনি! আমি আর আপনার সাথে থাকতে চাই না, নিজেকে নতুন করে আর গুঁড়ো গুঁড়ো করে ভাঙতে চাই না!”
কথাগুলো শেষ করেই সীমা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালো না। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে সেই করিডোর পার হয়ে সোজা গিয়ে তার দাদির রুমে ঢুকে ভেতর থেকে ধপাস করে দরজা বন্ধ করে দিল।দাদি তখন মাত্রই বিছানায় শুতে যাচ্ছিলেন। সীমাকে এভাবে এলোমেলো চুলে, অঝোর ধারায় কাঁদতে দেখে আঁতকে উঠে তড়িঘড়ি এগিয়ে এলেন। আকুল গলায় শুধালেন,
—-” কী হয়েছে রে তোর? এভাবে রুদ্ধশ্বাসে কাঁদছিস কেন? ইশতিয়াক কিছু বলেছে নাকি তোকে?”
সীমা তখন চরম মানসিক যন্ত্রণায় নিজের সমস্ত হুঁশ-জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। মুহূর্তের মধ্যে দাদিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে হাহাকার করে কেঁদে উঠলো,
—-” দাদি! উনি কেন আমার সাথে এমন ছলনা করছেন? উনি নিজেই তো আমার কাছ থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন, আমি তো নিজের জীবন থেকে উনাকে সেই মুক্তি দিয়ে চলে এসেছি! তাহলে আবার কেন আমার সামনে এসে আমাকে এভাবে ভেঙে দুর্বল করে দিচ্ছেন? দাদি, আমি আর পারছি না আমি সত্যি পাগল হয়ে যাব! তুমি উনাকে এখান থেকে এক্ষুনি চলে যেতে বলো প্লিজ উনাকে চলে যেতে বলো!”
সীমার দাদি সীমাকে সান্ত্বনা দিয়ে পরম স্নেহে মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
—-” ইশতিয়াকের সাথে কি ঝগড়া হয়েছে বোন? ঝগড়া করে থাকলে তুই আমাকে বল, আমি ওকে একদম ভালোমতো বকে দেবো।”
সীমা আর কোনো কথার উত্তর দিতে পারলো না, দাদির বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে কেবল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চললো।ঠিক তখনই দরজায় সশব্দে ঠকঠক টোকা পড়লো।
সীমার দাদি ঘরের ভেতর থেকেই উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
—-” কে রে?”
বাইরে থেকে ইশতিয়াকের বিন্দুমাত্র অপরাধবোধহীন, একদম চঞ্চল ও চেনা কণ্ঠ ভেসে এলো,
—-” আমি বুড়ি, দরজাটা খোলো! বউ রাগ করে চলে গেছে, তাই আজ রাতে আমি তোমার সাথে ঘুমাবো!”
মুহূর্তের মধ্যে দাদি সীমাকে কোল থেকে সরিয়ে তাড়াহুড়ো করে গিয়ে ঘরের দরজাটা খুলে দিলেন। ইশতিয়াককে ভেতরে ঢুকতে দেখেই এগিয়ে গিয়ে সোজা তার কানটা শক্ত করে মুচড়ে ধরে বললেন,
—-” বউ রাগ করে চলে এসেছে, তা তুই কি একটু আদর-সোহাগ করে বউয়ের রাগটা ভাঙাতে পারিস না, হতচ্ছাড়া?”
ইশতিয়াক কান টেনে ধরায় ব্যথায় উফ করে ওঠার ভান করলো। তারপর আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সীমার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত দুষ্টুমিতে চোখ টিপে দাদিকে আক্ষেপের সুরে বললো,
—-” আহ্‌ বুড়ি! কানটা ছাড়ো! রাগ কীভাবে ভাঙাবো বলো? একটু তোমার নাতিকে কাছে টেনে আদর করতে গেছে, অমনি তোমার নাতি কষে গালে ‘ঠাস’ করে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল! একটু আদরের সুযোগও দেয় না, তোমার নাতি খালি আমায় মারে!”
কথাটা শোনামাত্রই চরম লজ্জায় সীমার কান্নার বেগ নিমিষে উবে গেল!দাদি চোখ দুটো বড় বড় করে সীমার দিকে ঘোরতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
—-” সীমা! ইশতিয়াক এসব কী বলছে? তুই সত্যি সত্যিই ওর গালে হাত তুলেছিস?”
সীমা একদম মাথা নিচু করে, অপরাধীর মতো থরথর করে কাঁপতে কাাঁপতে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ালো।সীমার দাদি এসব বে আদবি বিন্দুমাত্র পছন্দ করেন না। যত রাগই থাক, স্বামীর গায়ে হাত তোলা উনার চোখে মস্ত বড় অপরাধ! তিনি রেগে গিয়ে ইশতিয়াকের কান ছেড়ে দিয়ে হনহন করে সীমার কাছে এগিয়ে এলেন। গম্ভীর কণ্ঠে শাসিয়ে বললেন,
—-” খবরদার সীমা! এরপর যদি কোনোদিন শুনি যে তুই স্বামীর গায়ে হাত তুলেছিস, তবে আমার চেয়ে খারাপ কিন্তু আর কেউ হবে না! স্বামী হচ্ছে নারীজাতির জন্য বেহেশতের চাবি, স্বামীকে আঘাত করা মানে আল্লাহর আরশ কাঁপানো! ইশতিয়াকের ওপর রাগ হতে পারে, অভিমান হতে পারে, সেটার জন্য তুই কথা বলবি না, দূরে দূরে থাকবি সে নিজেই এসে তোর মেজাজ ঠান্ডা করবে! কিন্তু ভুলেও কোনোদিন আর স্বামীর গায়ে হাত দিবি না!”
ইশতিয়াক দরজার চৌকাঠে হেলেদুলে দাঁড়িয়ে একগাল হেসে বলে উঠলো,
—-” বোঝাও দাদি! ভালো করে বোঝাও তোমার নাতিকে, যাতে আমরা দুজন জলদি তোমাকে সুসংবাদ দিতে পারি!”
কথাটা শোনামাত্রই চরম লজ্জায় সীমার দুই কান দিয়ে যেন একেবারে আগুনের ধোঁয়া বের হতে লাগলো! এই ইশতিয়াক লোকটা যে এতটা ঠোঁটকাটা আর বেহায়াপনা করতে পারে, তা সীমার কল্পনারও বাইরে ছিল।দাদি ইশতিয়াকের পিঠে হালকা চাপড় মেরে হেসে বললেন,
—-” থাম এবার! অনেক হয়েছে, এবার লক্ষ্মী ছেলে মেয়ের মতো নিজের রুমে যা তোরা।”
সীমা ব্যাকুল হয়ে দাদির হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে বললো,
—-” না দাদি,আমি আজ রাতে তোমার সাথে এখানেই ঘুমাবো।”
ইশতিয়াক ঠোঁটের কোণে একচিলতে বাঁকা আর চ্যাটাং হাসি ঝুলিয়ে গম্ভীর ভান করে হুমকি দিয়ে বললো,
—-” বুড়ি আজকে বউ যদি আমার ঘরে না আসে তাহলে আগে আমার খাট না, তোমার ঘাট আগে ভাঙবো”
চলবো…!
[সাপোর্ট করিও প্রিয়রা,কমেন্ট জানিও কেমন হয়ছে
] See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply