Golpo romantic golpo জল তরঙ্গের প্রেম

জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৪৩


জলতরঙ্গেরপ্রেম

পর্ব সংখ্যা;৪৩

লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি

কুয়াশার আস্তরণে প্রকৃতির সবুজ রঙ বিষাদে পরিণত হয়েছে। বিকেলের মলিন আলোয় ছাদের মেঝেতে বসে খেলা করছে তিন্নি।
হাড়ি – পাতিল দিয়ে রান্না বাটি খেলছে। খেলার মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে পাখি গুলো দেখছে সে। তার থেকে অদূরে দাঁড়িয়ে গাছে পানি দিচ্ছেন সাহানারা। কিছুক্ষণের মধ্যে মাগরিবের আজান পড়বে। শেষ বিকেলের কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশময় ছোটো ছোটো অসংখ্য নাম জানা, অজানা পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে। মাঝে মধ্যে বাড়ির পাশের বড় গাছ গুলোর পাতা গলিয়ে ডাকছে তারা। পানি দেওয়া শেষ হতেই; চেয়ার টেনে তিন্নির পাশে এসে বসলেন। আঁচলে হাত মুছে, ফোনটা নিজের হাতে নিলেন।
ফোনের লক খুলে কল লিস্টে প্রবেশ করলেন তিনি। তরঙ্গের নাম্বার টা ডায়াল করে নির্নিমেষ সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। লাস্ট কল টা ওনার নিজের দেওয়া। তাও আরো দুই দিন আগের। কিন্তু, সেই কল ধরা হয়নি। ছেলেটা বাড়ি ছাড়ার পর থেকে প্রায় একশো বার কল দিয়েছেন তিনি। একবার ও কল তোলেনি রাগী ছেলেটা। এতো রাগ কেন তার? একবার ক্ষমা করে দিতে পারছে না মাকে? ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার মাঝেই সাহানারার চোখ ফেঁটে জল গড়িয়ে পড়লো। নোনা জলের স্রোতেরা বাঁধ ভাঙলো। ঠুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। কিছুটা শান্ত হয়ে তিন্নিকে কাছে ডাকলেন;-
–” মা এই দিকে আয় তো!”
চাচির ডাক পেতেই; খেলনা বাটি রেখে ছুটে এলো তিন্নি। সাহানারা বাচ্চাটাকে টেনে পাশে বসালো। গালে হাত চেপে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন।
–” তুই জানিস?”
অবুঝ চোখে তাকিয়ে, চোখ ডললো বাচ্চাটা। ঘুম থেকে উঠেই ছাদে চলে আসার দরুন চোখ জোড়া এখনো জ্বালা করছে তার।
–” কি চাচি?”
–” তোর তরঙ্গ ভাইয়া আমার থেকে ও বেশি তোকে ভালোবাসে।”
–” কে বলেছে তোমাকে?”
–” আমি বলছি তোকে! দেখিস না, ও বাসা নিয়েই ছুটে এলো তোকে সাথে নিয়ে যাবার জন্য। তোর বাবার সাথে তর্ক করলো। কই আমাকে তো নিতে এলো না। তবে বোঝ! মা হিসেবে আমি কতটা ব্যর্থ। আর বোন হিসেবে তুই কতটা সফল।”
নিভু গলায় উচ্চারণ করা চাচির প্রতিটা কথা অবাক হয়ে শুনলো তিন্নি। তরঙ্গ ভাইয়া তাকে চাচির থেকে ও বেশি ভালোবাসে শুনেই ফিক করে হেসে দিলো বাচ্চাটা। পরক্ষণেই চাচির অশ্রু সিক্ত চক্ষু দেখে নিজেকে সামলে নিলো সে। দু’হাতে চাচিকে জড়িয়ে ধরলো তিন্নি।
–” ভাইয়া তোমাকে ও ভালোবাসে। না, না বেশি ভালোবাসে চাচি। তুমি কেঁদো না। আমি ও তোমাকে ভালোবাসি। আপু ও,”
অশ্রু সিক্ত গাল দুটো মুছে; হাসার চেষ্টা করলেন সাহানারা। বাচ্চাটা তাকে স্বান্তনা দিচ্ছে। একাকিত্বে সঙ্গী হয়ে জড়িয়ে ধরছে। আর সে কি না এই নিষ্পাপ ফুটফুটে বাচ্চাটাকে এতো কষ্ট দিন দিয়েছে। তার মা সমতূল্য বড় বোনের পিঠ পুড়িয়ে বাড়ি ছাড়া করেছে।
–” তোরা দুই বোন আমায় ভালোবাসলি। বিনিময়ে আমি তোদের আলাদা করে দিলাম।”
ইতস্তত মুখে আমতা, আমতা করে ফের সাহানারা সুধালো;-
–” তোর ভাইকে কল দেই। একটু কথা বল! ছেলেটা কেমন আছে একটু জানি। সে তো আমার সাথে কথাই বলছে না।”
খুশিতে চকচক করে উঠলো তিন্নির চোখ জোড়া। আহ্লাদে আটখানা হয়ে আরেকটু গা ঘেঁষে বসলো চাচির।
–” বলবো, দাও দাও।”
কোমল হেসে তিন্নির চুলে হাত বুলিয়ে তরঙ্গের নাম্বারে কল দিলেন তিনি। প্রথম দু’বার কেঁটে গেলো। শেষ বারে রিসিভ হতেই গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো সাহানারার।


অনবরত ফোনের তীব্র শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো তরীর। ঘুম ঘুম চোখে দু’জনের বালিশের মাঝ বরাবর থেকে ফোনটা তুলে ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখলো তরী।
ডায়ালে চাচির নাম্বার দেখতেই তার চোখের ঘুমেরা উধাও হয়ে গেলো। শোয়া অবস্থায় ডাকলো তরঙ্গ কে।
–” তরঙ্গ? এইই তরঙ্গ? আপনার কল এসেছে। এদিকে আসুন! ফোন রিসিভ করুন।”
কিন্তু ওই রুম থেকে সাড়া এলো না। পুনরায় ডাকলো তরী। শেষে বিরক্ত হয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে পড়লো সে। সারা ফ্ল্যাট খুঁজে ও তাকে না পেয়ে; দরজার ছিটকিনির দিকে তাকিয়ে বুঝলো ছেলেটা বাসায় নেই। অজ্ঞাত দুরু দুরু বুকে ফোন রিসিভ করে কানে ধরলো সে।
–” আসসালামু অলাইকুম ভাইয়া।”
ফোনের ওপাশ থেকে বোনের উচ্ছ্বসিত কন্ঠ পেয়ে অনাকাঙিক্ষত এক শুভ্র হাসি ফুটে উঠলো তরীর ওষ্ঠে। অবাকের তোপে হাত ফসকে ফোন পড়ে যেতে নিতে, কাঁপা হাতে ফোনটা কানের সাথে চেপে ধরলো সে।
–” পাখি? কেমন আছিস তুই?”
বোনের কণ্ঠ পেয়ে তিন্নি ও মুক্ত পাখির ন্যায় ডানা ঝাপ্টে উঠলো।
–” আপুউউ?”
–” বল পাখি।”
–” কেমন আছো তুমি?”
–” আমি ভালো আছি। তুই?”
–” খুব ভালো। ভাইয়া কেমন আছে আপু? ভাইয়া কোথায়?”
ফোন কানে নিয়ে রুমে ফিরে এলো তরী। কোলের উপর বালিশ নিয়ে বিছানায় বসলো সে।
–” আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুই চাচির ফোন কোথায় ফেলি? চাচি দেখলে খবর আছে। ফোন ধরেছিস কেন?”
বোনের কথায় চাচির দিকে তাকালো তিন্নি। তরীর মুখে এহেন কথা শুনে মলিন হয়ে গেছে সাহানারার মুখ। কাঁচুমাচু মুখে অন্য দিকে তাকালেন তিনি।
–” চাচি নিজেই ফোন দিয়েছেন আমাকে। তুমি জানো আপু। চাচির গা থেকে না মা, মা সুভাষ। কি মিষ্টি সেই সুভাষ। তুমি বাড়ি চলে এসো। চাচি খুব ভালোবাসবে। ভাইয়া কে ও নিয়ে আসো।”
তিন্নির কথা গুলো শোনার ফাঁকে। জামা কাপড় ছাদ থেকে তুলে ঘরে ফিরলো তরঙ্গ। জামা কাপড় গুলো ঘরে টানানো রশিতে টানিয়ে তরীর পাশে এসে বসলো সে। ইশারায় জিজ্ঞেস করলো কে কল দিয়েছে। তরী ও হাতের ইশারায় তাকে চুপ করতে বলে জবাব দিলো।
–” কি হয়েছে তোর?”
–” কিছু হয়নি। চাচি ভালো হয়ে গেছে আপু। তোমার আর ভাইয়ার জন্য খুব কাঁদছে।”
মা ফোন করেছে। বুঝতেই তরীর কান থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে কেটে দিলো। তরঙ্গ কল কাঁটতেই থতমত খেয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
–” কি করলেন এটা? কল কেটেছেন কেন?”
–” শাশুড়ির জন্য পরাণ উথলে, হৃদয় টা খালে পড়ে যাচ্ছে নাকি তরকারি জান?”
তরীর হাত সরিয়ে, তার কোলে জায়গা করে নিলো তরঙ্গ। বালিশে মুখ ডাবিয়ে কোমর জড়িয়ে ধরলো তরীর। গভীর শ্বাস টানলো সে।
–” বাইরে ঘুরতে যাবি? চল একটু ঘুরে আসি।”
তরঙ্গের কথায় জানলা দিয়ে বাইরে তাকালো তরী। সূর্য পশ্চিমে ডলে পড়েছে। কুয়াশারা নিজেদের রাজ্যেত চালাতে শুরু করেছে ধরনীতে। প্রকৃতির অপরূপ রূপে খেলা করছে পৃথিবী। আকাশের রঙ দেখে তরঙ্গের চুলের মাঝে হাত রাখলো সে। আলতো হাতে সিল্কি চুল গুলোতে বিলি কেঁটে দিতে দিতে বললো;-
–” এখন বাইরে গেলে তো বেশিক্ষণ হাঁটতে পারবো না। মাগরিবের আজান পড়ে যাবে।”
–” বিশ মিনিট সময় আছে এখনো। আপনি কি যাবেন ম্যাডাম?”
–” সন্ধ্যার পর হলে যাবো। এখন আর বেরোবো না।”
–” আচ্ছা, তাহলে সন্ধ্যার পর। এখন বিশ মিনিট একটু মেডিটেশন নেই! চুপটি করে বসে থাকুন তো।”

চলবে

( প্রিয় পাঠক মহল,
আমার শরীর খুবই খারাপ। ডান হাত একদম ই চলছে না। মাথা ও কাজ করছে না। খুবই ক্লান্ত!) See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply