Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর ওয়াসিফ

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩৬


#লেখনীতে_ঐশী_রহমান

#মেজর_ওয়াসিফ

পর্ব (৩৬)

‘ মুমতাহিনা! চল আমরা আরেকবার বিয়ে করে ফেলি’

আচমকা এই কথাটা কানে যেতেই ধারা বুক থেকে মাথা উঠিয়ে তাকায় ওয়াসিফের দিকে। ওয়াসিফ ওর অবাক হওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলে।

‘ আগেরবার বিয়েটা খুব তাড়াহুড়ো করে হয়েছিলো, না ছিলো কোনো আনুষ্ঠানিকতা আর না ছিলো কোনো আয়োজন। এমনকি আমার কিনে দেওয়া বিয়ের শাড়িটাও পরিসনি তুই। সেদিন না একবার মন খারাপ করে বললি তোর বৌ সাজার অনেক শখ, চল তাহলে এবার তোর সব শখ পূরণ করে ফেলি’

ধারা কিছু বলার আগে ওয়াসিফ আবার বলে।

‘ আমি তোর কোথাও কোনো আফসোসের জায়গা রাখবোনা, কোথাও না’

ধারা এতক্ষণ কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে বলে।

‘ আবার বিয়ে করতে হবে? কিন্তু ওতে তো অনেক খরচ, আপনার তো চাকরি নেই, টাকা পয়সা অযথা কোথায় পাবেন’?

ওয়াসিফ ওকে টেনে এগিয়ে পটাপট দুটো চুমু খেয়ে বলে।

‘ ওরে হিসাবি বৌ আমার, এতো চিন্তা করতে কে বলেছে আপনাকে? আপনার স্বামীর চাকরি না থাকতে পারে কিন্তু মনটা অনেক বড়ো। সে তার বৌয়ের শখ, ইচ্ছে গুলো পূরণ করার ক্ষমতা রাখে’

‘ করবি বিয়ে?’

ধারা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থেকে বলে ‘ লাল শাড়ি, গহনা, আর মাথায় গোমটা দিয়ে নতুন বৌ সাজতে হবে’

ওয়াসিফ মাথা উপর নিচ ঝাকিয়ে বলে ‘ জি জি, বৌ সাজতে হবে, শাহেদ ওয়াসিফের লাল টুকটাকে একটা বৌ সাজতে হবে’

ধারার মুখে লজ্জা মিশ্রিত একটা হাসি ফোটে, মুখটা লুকিয়ে ফেলতে চাইলে ওয়াসিফ তা দেয়না, হাত দুটো টেনে রেখে বলে।

‘ তবে আমার একটা শর্ত আছে মুমতাহিনা ‘

‘ কি শর্ত ‘?

‘ অতীতে কি ঘটে গেছে, কি হয়েছে, কি না হয়েছে ওসব ভেবে হীনমন্যতায় ভোগা যাবেনা। সবসময় মনে রাখতে হবে, তোর সামনে সুন্দর একটা ভবিষ্যত আছে, তোর একটা ঘর আছে, সংসার আছে, স্বামী আছে, পরিশেষে তোর কোল জুড়ে আগামী বছর গুলোতে দুই/চারটে বাচ্চা ও থাকবে, শুধু থাকবেনা, তুই জানিস? তোর মধ্যে কেউ একজন আছে ‘

ধারা বুঝতে পারে না ওয়াসিফের কথা, ও শুধু তাকিয়ে থাকে। ওয়াসিফ সোয়া থেকে উঠে এক হাতে ওকে টেনে ওঠায়। আলতো হাতে পেটের কাছ থেকে শাড়ির ভাজটা সরিয়ে নিজের একটা হাত রেখে বলে।

‘ অনুভব করতে পারছিস না তাই না যে এখানে কেউ আছে? পারবি কি করে ও তো এখনো ছোট একটা দানার মতো, আরো কয়েকটা মাস পর তুই ভীষণ ভাবে অনুভব করতে পারবি ওকে, তারপর আরো কয়েকটা মাস কাটিয়ে ওকে তুই ছুঁতেও পারবি, এবার বল! তোর কেমন অনুভব হচ্ছে? তুই কি ফিল করছিস? আমাকে বল, আমি শুনতে চাই’

ধারা কতক্ষণ থ হয়ে তাকিয়ে থেকে বলে ‘ কিছুই অনুভব করতে পারছি না। আপনি কিসব বলছেন সবকিছু আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। পরিষ্কার করে বলুন’

ওয়াসিফ ওর চোখ জোড়ার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট করে বলে।

‘ ১-১৮ বছর বয়স পরযন্ত তুই চাচা-চাচির মেয়ে ছিলি, তোর পরিচয় ছিলো তুই তাদের মেয়ে। এরপর ১৯ তম বয়সে তোর পরিচয়ের আরেকটু পূর্ণতা এনে তুই আমার বৌ হলি। এবার ২০ তম বয়সে তোর সবটুকু পূর্ণতার খাতা ভরাট করতে নতুন এক সদস্য আসবে তোর আর আমার মাঝে, আমাদের প্রথম সন্তান, তোকে মা বলার লোক। একজন নারীর জীবনের সকল পূর্ণতায় পূর্ণতা পুষিয়ে দেওয়ার লোক। বুঝতে পেরেছিস’?

ধারা কথা বলেনা, ওয়াসিফ বুঝতে পারছেনা বৌয়ের প্রতিক্রিয়া। আচমকা ধারা চোখ নামিয়ে তাকায় নিজের পেটের দিকে, তারপর আবার তাকায় ওয়াসিফের মুখের দিকে। ইতিমধ্যে ওর চোখে নোনাপানি ছলছল করে ওঠে। হয়তো ও কিছু অনুভব করতে পারছে। চট করে জড়িয়ে ধরে স্বামীকে। হুহু করে কেঁদে উঠতেই ওয়াসিফ ওকে আগলে রেখে জিজ্ঞেস করে।

‘ কাঁদছিস কেনো তুই? এখানে কাঁদার কি আছে মুমতাহিনা ‘?

ধারা কান্না থামিয়ে অস্ফুটস্বরে বলে ‘ আমি জানি না, আমি কেনো কাঁদছি, তবে আমার ভীষণ ই কান্না পাচ্ছে। আপনি প্লিজ আমাকে থামাবেন না। আমি একটু কাঁদবো আজ’

ওয়াসিফ কিচ্ছু বলেনা আজ ওকে, ধারা ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে। ওদের এই মরুভূমির মতো জীবনে বাচ্চাটা যদি এক পশলা বৃষ্টি হয়ে আসে তবে ওরা দুই স্বামী স্ত্রী পরিশেষে তোমায়-আমায় মিলে একটা সুন্দর জীবনের সাক্ষাৎ পাবে। ওদের জীবনের গত হওয়া বিষাদ দিনগুলোর উপর ধূলো পড়বে, ওরা ভুলে যাবে সবকিছু। ওরা ওদের পূর্ণতায় ভরা সুখের সংসার সাজাবে। ভালোবেসে যার নাম দেবে ওয়াসিফ

‘ ধারা’র সংসার’

________

বাড়ির সদস্য গুলো যেনো আজ সকাল সকাল দুই দফায় হোচট খেতে খেতেও খায়না। প্রথম খবরটিতে খুশির আমেজ তুলতে তুলতে জানতে পারলো এবাড়িতে আবার ও তাদের বিয়ে হবে, তাও কাদের? ওয়াসিফ আর ধারার। এই খবরটি ওয়াসিফ সকালে খেতে বসেই সবার সামনে তুলেছে। শাহেনূর এই বিষয় কোনো কথা না বললেও অন্য সদস্যরা এর কারণ জানতে চাইলে ওয়াসিফ বলেছে ‘ ওর বৌ আর বাচ্চার খুশির জন্য ‘

ধারার মানসিক চাপ, হতাশা কমাতে ওয়াসিফ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হাতে সপ্তাহ খানেকের মতো সময় আছে ওর। গত দেড়টা বছর এবাড়িতে কোনো হৈচৈ হয়নি, তাই চলে যাওয়ার আগে ওয়াসিফ ভীষণ ভাবে চাচ্ছে বড়ো করে কিছু একটার আয়োজন হোক, মুমতাহিনার পাশাপাশি এবাড়ির মানুষ গুলো ও একটু মন খুলে হাসুক। ওর মুমতাহিনা সুস্থ সাভাবিক হোক। ভাইয়ের মুখ থেকে এই খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে লুইপা, সামির কে এক ঝাড়ি মেরে বরিশাল যাওয়া বাতিল করে ওকে এখানে আসতে বলেছে। লোপারও খুশি ধরছেনা। মানে গোটা এই পরিবারটার উপর দিয়ে আজকের এই দিনে খুশি খুশি এক আবহাওয়া বইছে।

খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে ই ওয়াসিফ দুই চাচার হাতে লাখ খানেক টাকা দিয়ে বলে মোটামুটি শ’খানেক মানুষের আয়োজন করবেন। লোপা, লুইপা কে ডেকে তাদের হাতে ষাট হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলে ‘ মুমতাহিনা কে জার্নি করাবো না, আমিও যাবোনা, পছন্দ মতো কেনাকাটা করবি তোরা দুই বোন ওর জন্য চল্লিশ হাজার টাকার মধ্যে। বিয়ের শাড়িটা কিনবি না, ওটা আছে। বাকিবাদ মেয়েকে বিয়েতে যা যা দেয় সব কিনবি, বাকি বিশ হাজার টাকা দিয়ে মায়েদের জন্য আর তোরা দুইবোন শাড়ি কিনবি। চাচাদের পানজাবি শাহীন আসার সময় নিয়ে আসবে। কোথাও কম পড়লে আমাকে জানাবি, কিপ্টামি করবি না’

সকালে এভাবে যার যার কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার পর থেকে মোটামুটি এবাড়িতে একটা বিয়ে বিয়ে আয়োজন লেগেছে। বাড়ির ভেতরে বাইরে লোকজনের আওয়াজ পেতে ধারা ঘর থেকে বেরিয়ে দোতালার বড়ো বারান্দায় দাড়িয়ে দেখে, ছেলেপেলেরা মই দিয়ে ওদের বাড়ির গেট সাজাতে ব্যস্ত। বাড়িতে মেজো চাচার পালা দেশি একটা গরু জবাই দেবে বলে মা-চাচীদের সঙ্গে আলাপ করছে উঠানে দাড়িয়ে। ধারা ওখান থেকে ঘুরে লুইপার ঘরের দরজা খোলা পেয়ে ভেতরে তাকাতেই দেখে ওরা কেউ ঘরে নেই। এমনকি বাড়িতে ও নেই। থাকবে কি করে? ওরা তো কোনো রকম নাস্তা খেয়েই শহরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরেছে কেনাকাটা করতে। কেনাকাটা অনেক, সকাল সকাল না বের হলে তো রাত হয়ে যাবে, অবশ্য ওদের সঙ্গে শাহেনূর আছে। তারপর ও ওয়াসিফের আদেশ, বিকেলের আগে বাড়ি ফেরা চাই।

বাড়ির সবার ব্যস্ততা টুকু ধারা ঘুরে ঘুরে দেখে ঘরে চলে যায়। অন্যসবার মতো ওর মনের মধ্যে ও সুখসুখ লাগছে। আবার ভীষণ লজ্জা ও পাচ্ছে। কেনো পাচ্ছে সে কারণ ওর জানা নেই….

#চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply