বাঁধনরূপেরঅধিকারী
লেখিকাসুমিচৌধুরী [৪২]
চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছে বাঁধন। যেই চাকরি তাকে তার রূপের কাছে যেতে বাধা দেবে, সেই চাকরি তার এক রত্তিও দরকার নেই। যে আইন বা যে ক্ষমতা তাকে রূপাকে ফিরিয়ে আনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, সেই সবকিছু আজ থেকে তার কাছে চিরতরে নিষিদ্ধ।
রাত এখন বড্ড নিস্তব্ধ। নিঝুম চারদিক থেকে শুধু শিয়ালের হাঁক আর ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে শব্দ ভেসে আসছে। ব্যালকনিতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে একে পর এক সিগারেট টেনে চলেছে বাঁধন। পাশেই হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে আকাশ, তার ঠোঁটেও বিষাক্ত ধোঁয়ার আগুন জ্বলছে। যে বাঁধন একদিন সিগারেট তো দূরের কথা, এর সামান্য ধোঁয়াটুকুও সহ্য করতে পারতো না আজ সেই বাঁধনই একটার পর একটা সিগারেট জ্বালিয়ে মুখে ধরছে!
অবশ্য আজ তার এমন করার পেছনে একটাই কারণ। কেউ একজন তাকে বলেছিল সিগারেটের বিষাক্ত ধোঁয়া নাকি বুকের ভেতরের আগুনটাকে কিছুটা হলেও জুড়িয়ে দেয়, কষ্ট আর তীব্র যন্ত্রণা নাকি সাময়িক ভুলিয়ে রাখে! রূপকে হারিয়ে বাঁধন আজ যে নারকীয় যন্ত্রণার আগুনে পুড়ছে, সেখান থেকে যদি সামান্য একটু শান্তি পাওয়া যায়, যদি চোখের কোণের ওই কালবৈশাখী আগুনকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলিয়ে রাখা যায় সেই এক চিলতে আশায় আজ নিজের সবথেকে অপছন্দের জিনিসটাকেও ঠোঁটে তুলে নিয়েছে বাঁধন।আর এই মোহের কথাটা তাকে বলেছিল আকাশ। সন্ধ্যার পরপরই বাঁধনের নিঝুম ফ্ল্যাটে এসে উপস্থিত হয়েছিল সে। আকাশও ভালো নেই, বড্ড এলোমেলো আর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে গেছে ছেলেটা। আগের সেই হাসি-ঠাট্টা, চঞ্চলতা কিচ্ছু নেই তার মাঝে। অতিরিক্ত মাত্রায় সিগারেট টানছে সে। আগে হয়তো শখে দু-একটা খেত, কিন্তু এখন চেইন স্মোকার হয়ে গেছে। তার নাকি মনে হয় এটা টানলে বুকের গহীন ক্ষতটায় একটু আরাম মেলে।কিছুক্ষণ আগে আকাশকে ওভাবে সিগারেট টানতে দেখে বাঁধন নিজের শূন্য চোখে তার দিকে তাকিয়ে শুধিয়েছিল,
—-” কী আছে রে এতে? এত কেন খাস?”
আকাশ একগাল ফিকে আর উদাস হেসে জবাব দিয়েছিল,
—-” কী আছে তা তো জানি না , তবে এটা টানলে ভেতরের জমানো কষ্টগুলো না অন্তত কিছুক্ষণের জন্য ভুলে থাকা যায়।”
কথাটা শোনামাত্রই আকাশের হাত থেকে এক ঝটকায় জ্বলন্ত সিগারেটটা ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়েছিল বাঁধন। আর নিমিষে নিজের ঠোঁটের কোণে চেপে ধরে সজোরে টান দিতে শুরু করেছিল। আকাশ বিন্দুমাত্র অবাক হয়নি। কারণ বাঁধন কতটা যন্ত্রণার সাগরে ডুবছে, তা আকাশের চেয়ে ভালো আর কে-ই বা বুঝবে! সে চুপচাপ নিজের পকেট থেকে আর একটা সিগারেট বের করে দেশলাই জ্বালিয়ে টেনে চলেছিল।
বেশ খানিকটা দমবন্ধ নীরবতার পর আকাশ ধীরকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—-” শেষ পর্যন্ত কানাডায় যাবিই তুই?”
ঠোঁট থেকে ধোঁয়াটুকু আস্তে করে বাতাসে উড়িয়ে থমথমে কণ্ঠে বাঁধন জবাব দিল,
—-” হুম।”
আকাশের চোখে এক অজানা আশঙ্কা ফুটে উঠল, সে বিষণ্ণ গলায় বলল,
—-” কুখ্যাত গুন্ডার হাতে পড়তে পারে রূপা! ওদের সাথে কি একা লড়াই করতে পারবি তুই?”
বাঁধনের চোয়াল মুহূর্তের মধ্যে আবার লোহার মতো শক্ত হয়ে এলো, সে ঠান্ডা কিন্তু স্থির গলায় বলল,
—-” পারবো কি পারবো না জানি না আকাশ তবে রূপকে ফেরত পেলে আমি হবো জয়, আর না পেলে হবো ক্ষয়।”
আকাশ নিজের সিগারেটের দিকে চেয়ে রইল, তারপর একটু ইতস্তত করে বলল,
—-” আগে তো শুধু মেয়েটাকে ঘৃণাই করতিস। তবে আজ কেন তার জন্য এতটা বুকচেরা টান?”
বাঁধন আকাশের কথার উত্তরে অন্ধকারের দিকে চেয়ে আত্মমগ্ন কণ্ঠে আওড়ালো,
—-” আমার এই অভিশপ্ত আর বিষাদময় জীবনে সে এসেছিল আমার অমৃত হয়ে। বিষাদে যদি অমৃত ঢালা হয় আকাশ, তবে সেটা তো আর বিষাদ থাকে না, পুরোটাই অমৃত হয়ে যায়! তাহলে এখন বল, আমি কীভাবে আর সেই আগের বিষাদ হয়ে থাকি?”
আকাশ আর কিছু বলতে পারল না। দুটো বিষণ্ণ পুরুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কেবল রাতের বাতাস আর সিগারেটের ছাই গুণল।কিছুক্ষণ পর হঠাৎ অন্ধকার চিঁড়ে বিষাদগ্রস্ত গলায় আকাশ বলল,
—-” আমি যাবো তোর সাথে।”
আকাশের সেই প্রস্তাবিত কথা কানেই নিল না বাঁধন। সে সোজা আকাশের দিকে তাকাল, আর সরাসরি এক ব্যক্তিগত প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
—-” বৃষ্টিকে ভালোবাসিস?”
‘বৃষ্টি’ নামটা শোনামাত্রই যেন আচমকা একটা প্রকাণ্ড ধাক্কা খেল আকাশ! চোখের পলকে ছেলেটা ভেতরে ভেতরে শতভাগে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল। তার ঠোঁট দুটো থরথর করে কেঁপে উঠল, আর হাত আঙুলের ফাঁক থেকে আধপোড়া সিগারেটটা ফসকে সোজা নিচে পড়ে গেল! এই একটা নারী। এই একটা নামই তো তাকে গত কয়টা দিন ধরে তিল তিল করে মেরে ফেলছে, এক মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে দিচ্ছে না! প্রতিটা সেকেন্ডে, প্রতিটা মুহূর্তে মেয়েটার স্মৃতি যেন অদৃশ্য ছায়া হয়ে তাকে চারপাশ থেকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।মুহূর্তের মধ্যে আকাশ সেই ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিতে ডুব দিল। ছোটবেলায় যেকোনো কষ্টে, যেকোনো বেদনায় সে যেভাবে বাঁধনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতো ঠিক সেই শৈশবের আকুলতায় আজ সে বাঁধনের গলা জড়িয়ে ধরে তার চওড়া ঘাড়ে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল!একদম ছোট শিশুর মতো ভাঙা গলায় আর্তনাদ করে আকাশ বলে উঠল,
—-” ওই মেয়েটার নাম আর নিস না দোস্ত! প্লিজ নিস না! এই মেয়েটা আমাকে গত দুটো দিন ধরে একদম জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে ! আমি যেখানেই যাচ্ছি, যার দিকেই তাকাচ্ছি ওই মেয়েটার মায়াবী চেহারাটা আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে! আমি শান্তিতে একটা নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিতে পারছি না বাঁধন! আমি জীবনে কখনো এত বিশ্রীভাবে ভেঙে পড়িনি, যতটা বৃষ্টি দূরে চলে যাওয়ায় ভেঙে পড়েছি!”
বাঁধনের নিজের ভেতরে সমুদ্রও তোলপাড় করছে, কিন্তু সে নিজেকে শক্ত রাখল। নিজের বিশাল হাত দুটো দিয়ে ভাঙা বন্ধুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে পরম ভরসায় জড়িয়ে রাখল। তারপর ইস্পাতকঠিন গলায় বলল,
—-” ফোকাস আকাশ! জাস্ট ফোকাস! আজ তোকে একটা খাঁটি কথা বলি শোন।ভেঙে পড়া যেকোনো জিনিস বা মানুষ যদি নিজেকে সবসময় দুর্বল মনে করে, নিজেকে তুচ্ছ ভেবে হাত গুটিয়ে বসে থাকে, তবে সে সারা জীবন শুধুই ভেঙে যেতেই থাকবে! আর যদি ভেঙে যাওয়া টুকরোগুলোকে একত্র করে নিজেকে নতুন করে শক্ত করে দাঁড় করায়, সামনে লড়াই করতে শেখে তবে সে শুধু শক্তই হয় না, দিনশেষে এক চরম বিজয়ী হয়েও আত্মপ্রকাশ করে! কথায় আছে না’একবার না পারিলে দেখো শতবার’? কারণ সত্যি চেষ্টার ফল কখনো বিফলে যায় না আকাশ!”
এক মুহূর্ত থেমে, ব্যালকনির বাইরের গভীর অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বাঁধন আবার বলে চলল,
—-” এই দেখ আমাকে যে মেয়েটাকে ছাড়া আমার একটা দিন তো দূরের কথা, একটা মুহূর্ত চলা দুষ্কর হয়ে পড়েছিল আজ কতগুলো দিন হয়ে গেল আমি তাকে ছাড়াই বেঁচে আছি! তাহলে তুই বুঝ আমি ভেতরে ভেতরে কেমন মানুষ হিসেবে টিকে আছি? আমি ভাঙছি, চুরমার হচ্ছি, কিন্তু মুহূর্তেই আবার নিজেকে দ্বিগুণ শক্ত করছি! কারণ এখন আমার ভেঙে পড়লে তো মোটেই চলবে না! কিছু লড়াই থাকে যা আগে নিজের ভেতরের অস্তিত্বের সাথে লড়তে হয়, তারপর গিয়ে শত্রুর সাথে লড়তে হয়, তবেই না যুদ্ধের আসল জয় আসে! তুই যদি নিজের ভেতরের কষ্টগুলোর সাথেই লড়াই করে হেরে যাস, তবে তো বাইরের দুনিয়ার কাছে এমনিতেই ব্যর্থ হয়ে যাবি! আর বাইরের ওই রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে ব্যর্থ হওয়া মানে কী জানিস? যার জন্য এই এত লড়াই, এত রক্ত সেই প্রাণের মানুষকে চিরতরে হারিয়ে ফেলা!”
আকাশ নিস্তব্ধ হয়ে বাঁধনের বলা প্রতিটি কথা গভীর মনোযোগ আর অনুভূতি দিয়ে শুনলো। বাঁধনের ইস্পাতকঠিন যুক্তি আর ভরসার হাত যেন তার ভেতরের সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ধূলিসাৎ করে দিল। অতঃপর খুব পরিষ্কার আর একরাশ অনুভূতির সুর মিলিয়ে বলল,
—-” আমি বৃষ্টিকে চাই বাঁধন! ওই মেয়েটাকে আমি নিজের অজান্তে বড্ড বেশি ভালোবেসে ফেলেছি।”
বাঁধন বিষাদ কাটার আভাস পেয়ে হালকা একচিলতে শান্ত হাসি ফুটিয়ে বলল,
—-” বুঝলাম। বৃষ্টি কি জানে?
আকাশ মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—-” না, এখন পর্যন্ত ওকে মুখ ফুটে কিছু বলি নাই। তবে তোর সাথে কানাডায় গিয়ে ওকে একদম পাক্কা বলে দেবো!”
বাঁধন সামান্য ভুরু কুঁচকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে শুধাল,
—-” আর ইউ শিওর?”
আকাশ এবার বাঁধনের বাঁধন ছেড়ে একদম শক্ত হয়ে সামনে দাঁড়াল। নিজের হাত দুটো শক্ত মুষ্টি বানিয়ে পরম শক্তিতে বাঁধনের চওড়া বুকে হালকা একটা ফ্রেন্ডলি পাঞ্চ মেরে পুরো দমে বলে উঠল,
—-” একদম পাক্কা শিওর!”
বাঁধনের চাকরি থেকে পদত্যাগের খবরটা শোনা মাত্রই আর এক মুহূর্তও দেরি করেননি আহসান রহমান। তিনি হন্তদন্ত হয়ে সোজা বাঁধনের ফ্ল্যাটে এসে হাজির হয়েছেন।ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে থমথমে পরিবেশ। বিষণ্ণ আর চরম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখে বসে আছে আহসান রহমান, আকাশ, অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর এবং জেইন। সবার চোখেই একরাশ উৎকণ্ঠা আর আশঙ্কার ছাপ। বাঁধন কিছুক্ষণ আগে আচমকা বাসা থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেছে, সে কোথায় গেছে সে খবর তাদের কারও কাছেই নেই।রাত তখন প্রায় ১টার কাছাকাছি। ঠিক তখনই দরজায় শব্দ হলো। কিন্তু বাঁধন একা ফিরে আসেনি। অখিল তাকে পরম শক্তিতে ধরে ধরে ধীরে ধীরে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল!
বাঁধনকে এই করুণ অবস্থায় ঘরে ঢুকতে দেখে ড্রয়িংরুমে বসে থাকা সবাই চমকে উঠে নিজের অজান্তেই একযোগে দাঁড়িয়ে পড়ল! বাঁধনের বাঁ হাতের কবজিতে মোটা করে সাদা ব্যান্ডেজ পেঁচানো, ফর্সা গালে স্পষ্ট কাটার তাজা দাগ, ধুলোবালি লেগে চুলগুলো একদম উস্কোখুস্কো হয়ে কপালে লেপ্টে আছে। তবে সবথেকে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে তার চোখ দুটো। লাল টকটকে হয়ে সেই চোখ দুটো দিয়ে যেন খাঁটি মরিচের গুঁড়ো ঠিকরে বের হচ্ছে! কিন্তু শরীরে এত এত আঘাত আর এত ঝড় বয়ে যাওয়ার পরেও তার বিষাক্ত কঠিন মুখে বিন্দুমাত্র ক্লান্তি বা অনুশোচনার ছাপ নেই ছেলেকে এই হাল দেখে আহসান রহমান একপ্রকার দৌড়েই সামনে এগিয়ে আসলেন। আতঙ্কিত কণ্ঠে অখিলকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,
—-” বাবা অখিল! কী হয়েছে ওর? হাতে ব্যান্ডেজ কেন? এভাবে আহত হলো কীভাবে?”
বাঁধন আহসান রহমানের আকুলতা আর উপস্থিত বাকি সবাইকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, কারও কোনো কথা না শোনার ভান করে এক ঝটকায় অখিলের শক্ত বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। তারপর এক কদমও না থেমে তপ্ত পায়ে সোজা ওপরের ছাদে উঠে গেল।অখিল একটা লম্বা ও ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে আহসান রহমানের উদ্বেগে ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—-” আর বলবেন না আঙ্কেল! অতিরিক্ত স্পিডে বাইক ড্রাইভ করতে গিয়ে সোজা এক ক্র্যাশের মুখে পড়েছিল! অন কন্ট্রোল হয়ে বাইক নিয়ে একটা চিলতে বাউন্ডারির সাথে ধাক্কা খেয়েছে! তবে আল্লাহর হাজার শুকরিয়া যে মাথায় হেলমেট পরা ছিল, তাই মাথায় বড় কোনো আঘাত লাগেনি শুধু বাঁ হাতের কবজিটা অনেকটাই কেটে ছাল উঠে গেছে, তাই ডাক্তার ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে।”
অখিলের কথা শেষ হতেই আকাশ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আহসান রহমানের একদম সামনে দাঁড়িয়ে নিচু ও গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
—-” চাচ্চু, বাঁধন কিন্তু একদম ভালো নেই! রূপাকে হারিয়ে তোমার ছেলেটা ভেতরে ভেতরে একদম পাগল হয়ে গেছে। আমার মনে হয় এবার তোমার নিজে থেকে ওর কাছে যাওয়া উচিত, ওর সাথে একটু বাড়িয়ে কথা বলা উচিত। মায়ের আদর তো কখনো পেলই না।বাবার ভালোবাসা থেকেও তো কতগুলো বছর ধরে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে! তুমি একটু যাও চাচ্চু। হয়তো আজ বাবার একটু পরশ, একটু পরম ভালোবাসা পেলে ও সামান্য হলেও শান্তি পাবে। ওকে একটু বুকে জড়িয়ে ধরে ভরসা দাও।”
আকাশের প্রতিটি কথা আহসান রহমানের বুকের ভেতরের পুরোনো ক্ষতগুলোকে এক নিমেষে তাজা করে দিল। তিনি নিঃশব্দে ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন। কাঁপাকাঁপা হাতে চোখ থেকে চশমাটা খুলে মাথা নিচু করে দুই আঙুলে চোখ দুটো চেপে ধরে রাখলেন। কিন্তু বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসা চোখের পানি থামানো গেল না আঙুলের ফাঁক গলে তা গড়িয়ে পড়ে আঙুল দুটোকে ভিজিয়ে দিল। আজ নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যর্থ আর অপরাধী বাবা বলে মনে হচ্ছে তাঁর!আকাশ তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। সে আহসান রহমানের হাত দুটো ধরে মিনতির সুরে বলল,
—-” চাচ্চু, তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে তো চলবে না! তুমিই যদি ভেঙে পড়ো, তবে এই চরম বিপদের দিনে ওকে সাহস দেবে কে? ভরসা জোগাবে কে বলো? নিজেকে একটু শক্ত করো। প্লিজ আমার কথাটা একবার শোনো তুমি সোজা ছাদে যাও। ওর পাশে গিয়ে শান্ত হয়ে কটা ভালো কথা বলো। দেখে নিও, আজ বাবা হিসেবে তুমি হাত বাড়ালে ও যদি আর নিজের ওই শক্ত ইগো নিয়ে ধরে রাখতে পারে, তবে আমি তোমার ভাতিজা আকাশই না!”
আহসান রহমান একটা দীর্ঘ ও ভারী শ্বাস ফেলে চোখের পানিটুকু যত্ন করে মুছে নিলেন। চশমাটা আবার চোখে এঁটে দিয়ে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তারপর ভারী পায়ে, বুকে একরাশ আশা আর অপরাধবোধ নিয়ে আস্তে আস্তে ছাদের দিকে হেঁটে গেলেন।ছাদে এসে তিনি দেখলেন ধবধবে চাঁদের আলোয় ছাদের রেলিংয়ের সামনে দুই পকেটে হাত গুঁজে নিঝুম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাঁধন। তার জোড়া দৃষ্টি বহুদূরের কালচে আকাশের পানে স্থির হয়ে আছে… যেন কোনো এক হারিয়ে যাওয়া প্রিয় নক্ষত্রকে খুঁজে পেতে ব্যাকুল হয়ে তারা গুনে চলেছে সে।
আহসান রহমান গিয়ে বাঁধনের একদম ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে ছেলের চওড়া পিঠটার দিকে চেয়ে রইলেন। আজকে নিজের এই রক্ত-মাংসের ছেলের সাথে কথা বলতেও যেন তাঁর নিজের ভেতরে এক চরম লজ্জা আর অপরাধবোধ কাজ করছে! তিনি তিল তিল করে উপলব্ধি করতে পারলেন কতটা ব্যর্থ আর অপদাৰ্থ বাবা হলে একজন পুরুষ তার নিজের সন্তানের সাথে দুটো কথা বলতে এমন লজ্জায় গুটিয়ে যায়!চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আবারও এক ফোঁটা তাজা পানি গাল গড়িয়ে পড়ে গেল। বুঝতে পারছেন না কীভাবে ডাকবেন তিনি ছেলেকে, কী বলে শুরু করবেন কথা। কত বছর পার হয়ে গেছে! ছোটবেলায় বাঁধন যখনই কোনো অবুঝ অভিমান বা রাগ করত, তিনি মিষ্টি করে একটা গান গেয়ে শোনাতেন আর অমনি সেই ছোট ছেলেটা দৌড়ে এসে তাঁকে জাঁকড়ে ধরে বলত, ‘আই লাভ ইউ পাপ্পা!’
কিন্তু সেই পাঁচ বছরের ছোট্ট বাঁধন তো আর আজকের এই পাষাণ-কঠিন, এসপি জাওয়াদ অধীর বাঁধন নেই যে সামান্য একটা সুর শুনে এসে অমনি জড়িয়ে ধরে বলবে ‘আই লাভ ইউ পাপ্পা!’তবুও আহসান রহমান আজ বুকভরা হাহাকার নিয়ে সেই পুরোনো সুবর্ণ স্মৃতিতেই ডুবে গেলেন। ছেলের ভেতরের জমে থাকা হিমাদ্রি বরফ গলাতে, তার বহুবছরের শক্ত রাগ ভাঙাতে প্রবীণ বাবা নিচু হয়ে ছাদের মেঝেতেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন ঠিক যেমনটা বাঁধন ছোট থাকতে তিনি বসতেন!দুটো বৃদ্ধ হাত সামনের দিকে প্রসারিত করে, অতীতে যে গানটা গেয়ে তিনি পুচকে বাঁধনের রাগ ভাঙাতেন সেই পুরোনো পরম মমতার গানটাই আজ তাঁর কাঁপাকাঁপা বয়স্ক কণ্ঠে সুর তুলে কেঁপে উঠল,
‘লক্ষ্মী সোনা আদর করে দিচ্ছি তোকে
লক্ষ চুমু, মায়া ভরা তোরই মুখে’
আচমকা রাতের নিস্তব্ধতায় বাবার মায়াবী কণ্ঠে সেই অতি চেনা পুরোনো সুর ভেসে আসতেই থরথর করে কেঁপে উঠল বাঁধন! গানটা কান ভেদ করে সোজা মস্তিষ্কে পৌঁছাতেই তার পুরো শরীর এক অদ্ভুত শিহরণে শিউরে উঠল!হ্যাঁ, এ তো সেই চিরচেনা গান! একসময় সে কোনো কারণে অভিমান করে মুখ ভার করলে আহসান রহমান এই আদুরে গলায় গানটা গেয়ে তাকে বুকের মাঝে টেনে নিতেন, কখনো তো পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। কত শত বছর পর বাবার কান্নাসিক্ত কণ্ঠে সেই পুরোনো সুর শুনতে পেয়ে বাঁধনের বহু বছরের আগলে রাখা ইস্পাতকঠিন প্রতিজ্ঞার বাঁধগুলো এক মুহূর্তেই শিথিল হয়ে এলো!সে একদম ধীর পায়ে ঘুরে দাঁড়াল পেছনের দিকে। ঘুরে তাকাতেই যেন এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে গেল বাঁধন! তার বুকের ভেতরের কলিজাটা যেন হুহু করে কেঁদে উঠল!
ঠিক ছোটবেলায় রাগ করলে আহসান রহমান যেভাবে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে তাকে গান গেয়ে কাছে ডাকতেন ঠিক একইভাবে আজ এই বৃদ্ধ বয়সেও আহসান রহমান হাঁটু গেড়ে বসে আছেন! তাঁর দুটো হাত আগের মতোই মায়ায় প্রসারিত করা যেন পাঁচ বছরের অবুঝ বাচ্চাটাকে ভালোবাসার উষ্ণ বুকে টেনে নেওয়ার জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছেন!বাঁধনের দিকে চেয়ে আহসান রহমান এবার একগাল বুকচেরা, মায়াবী আর আর্দ্র হেসে গানের পরবর্তী কলি দুটো পরম আদরে গেয়ে উঠলেন,
‘কলিজা তুই আমার, তুই যে নয়নের আলো,
লাগে না তুই ছাড়া,
লাগে না তো যে ভালো
রূপকথা তুই তো আমারই
জীবনের চেয়েও আরো দামি’
বাঁধন আসলো না। আহসান রহমান মনে মনে জানতেন বাঁধন হয়তো আর কখনোই আসবে না। আগের সেই চঞ্চল, অবুঝ বাঁধন কে তো সে নিজেরই করা চরম ভুলের মাশুল দিতে গিয়ে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে!তিনি কোনো উপায় না পেয়ে মাথা নিচু করে অঝোরে কেঁদে ফেললেন। বুকের ভেতরটা যেন শতভাগে চুরমার হয়ে ফেটে যাচ্ছে তাঁর। এত বছরের বয়ে বেড়ানো অপরাধবোধ আর এই নির্মম কষ্ট তিনি আর সহ্য করতে পারছেন না।ঠিক তখনই নিঃশব্দ ছাদটা কাঁপিয়ে একটা আকুল ও আর্দ্র কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো,
—-” আই লাভ ইউ পাপ্পা!”
বাবার কাঁপা গলার সেই ডাক আর কান্না শুনে বাঁধন নিজেকে আর সামলে রাখতে পারেনি। আহসান রহমান চমকে উঠে মাথা তুলে সামনে তাকাতেই দেখলেন তার ঠিক এক হাত সামনে বাঁধনও হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে আছে ছেলেটার দু-চোখ বেয়ে অবিরল ধারায় পানি গড়িয়ে পড়ছে, বিষাদময় মুখে একরাশ ব্যাকুলতা আর বাবার জন্য বহু বছর লুকিয়ে রাখা সেই ব্যাকুল ভালোবাসা!আহসান রহমান আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। সঙ্গে সঙ্গে বাঁধনকে নিজের বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। বাঁধনও এত বছর পর বাবার এই পরম ভালোবাসার উষ্ণ ছোঁয়া পেয়ে সব ইগো আর শক্ত খোলস হারিয়ে একদম ছোট্ট বাচ্চার মতো বাবাকে জাঁকড়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল,
—-” আই লাভ ইউ পাপ্পা আই লাভ ইউ সো মাচ পাপ্পা”
আহসান রহমান ছেলের মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই বারবার বলতে লাগলেন,
—-” আই লাভ ইউ টু আমার সোনা ছেলে! আই লাভ ইউ টু।”
বলেই তিনি বাঁধনের অশ্রুসিক্ত মুখটা দু-হাতে তুলে ধরে হাহাকার করে আবার বলে উঠলেন,
— “তুই কবে এত বড় হয়ে গেলি, বাঁধন? এত অভিমান নিয়ে কবে থেকে বাঁচতে শিখলি? আমার ছোট্ট ছেলেটা কবে এত বড় হয়ে গেল”
বাঁধন বাবার বুকে মুখ গুঁজে বাষ্পরুদ্ধ গলায় বলল,
—-” আমি কোথায় বড় হয়েছি বাবা? আমি তো একটুও বড় হইনি! এই দেখো না, ছোটবেলায় যেমন একটু সুর করে আমায় ডাকলেই আমি হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে চলে আসতাম, আজও তো তোমার মুখে ওই সুরটা শোনামাত্রই ছুটে চলে আসলাম! তাহলে তোমার বাঁধন কোথায় বড় হলো বলো?”
আহসান রহমান চোখের জলে ছেলের মুখটা ভাসিয়ে কাতর কণ্ঠে বললেন,
—-” তুই আমাকে মাফ করে দে বাবা তুই আমাকে দয়া করে ক্ষমা করে দে! আমি চোখ থাকতেও একদম অন্ধ ছিলাম রে।না বুঝে, না জেনে তোকে অযথাই কত কষ্ট দিয়ে ফেলেছি! আমাকে তুই মাফ করে দে বাবা।”
বাঁধন আলতো করে বাবার চোখের পানি মুছে দিয়ে পরম মায়ায় বলল,
—-” তুমি কেন মাফ চাইছ বাবা? তুমি তো ইচ্ছা করে জেনে বুঝে কোনো ভুল করোনি। আর বাবা যতই অবহেলা করুক না কেন, সাময়িকভাবে সন্তানের মনে হয়তো খানিকটা অভিমান জমা হতে পারে, কিন্তু বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা কখনো কমে যায় না! ঠিক তেমনি আমার ভালোবাসাও বিন্দুমাত্র কমেনি বরং আগের চেয়েও এখন তোমায় আরও অনেক বেশি ভালোবাসি পাপ্পা।”
আহসান রহমান অশ্রুসিক্ত মুখে একচিলতে স্বস্তির হাসি ফুটিয়ে ছেলের গালে হাত রেখে শুধালেন,
—-” কিন্তু তুই হুট করে পুলিশি চাকরিটা থেকে কেন পদত্যাগ করলি বাবা?”
কথাটা শোনামাত্রই বাঁধনের এতক্ষণের চেপে রাখা শক্ত বাঁধটা যেন আবার চুরমার হয়ে ভেঙে পড়ল! সে আর্দ্র ও ব্যাকুল গলায় বলে উঠল,
—-” বাবা, আমার রূপ কানাডায় আছে! জানি না সেখানে ও কেমন আছে, কোন নরকে আটকে আছে! আমি যেকোনো মূল্যে ওর কাছে ছুটে যেতে চাই বাবা। কিন্তু এই সরকারি চাকরিটা আমাকে রূপের কাছে পৌঁছানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল! তাই ওটা এক মুহূর্তে ছুড়ে ফেলে দিয়েছি যে চাকরি আমাকে আমার রূপের কাছে যেতে দেয় না, সেই চাকরির আমার বিন্দুমাত্র দরকার নেই বাবা!”
আহসান রহমান চরম বিস্ময় নিয়ে বাঁধনের দিকে তাকালেন। পরম মায়ায় গড়া এই ছেলেটা একটা মাত্র নারীর প্রতি অগাধ ভালোবাসার টানে এমন একটা দামি, মর্যাদাপূর্ণ সরকারি চাকরি ছেড়ে দিল! যে চাকরিটা দেশের হাজার হাজার তরুণের আজন্ম লালিত স্বপ্ন, সেই স্বপ্নের অবস্থান এক নিমেষে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে শুধু তার ভালোবাসার মানুষকে পাওয়ার আকুলতায়!বাঁধন এবার আহসান রহমানকে আবারও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। বাষ্পরুদ্ধ গলায় বলল,
—-” আমি একটুও ভালো নেই বাবা। তোমার এই ছেলেটা রূপকে ছাড়া বড্ড বেশি অগোছালো!”
একটু থেমে বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ব্যাকুল কণ্ঠে বলল,
—-“আই লাভ হার বাবা আই লাভ হার সো মাচ! তাকে ছাড়া আমি বাঁচব না। মরে যাব।”
আহসান রহমান বাঁধনের মাথাটা সোজা করে নিজের দু-হাতে তুলে ধরলেন। তারপর পরম স্নেহে তার চোখের কালবৈশাখী পানিটুকু মুছে দিতে দিতে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
—-“আমি আছি তোর পাশে তোর কোনো ভয় নেই! আমি এখন তোকে যা যা বলব, তুই ঠিক সেভাবেই সবটা করবি।”
আহসান রহমান খুব বিচক্ষণতার সাথে পুরো রণকৌশল আর পরিকল্পনা বাঁধনকে বুঝিয়ে দিলেন। সবটা শোনামাত্রই বাঁধন কিছুটা সংশয় আর আশার আলো নিয়ে বাবার হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
—-” আমি পারব তো বাবা?”
আহসান রহমান বুকে ভরসা জাগিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
—-” পারবি মানে? জাওয়াদ অধীর বাঁধন আমার ছেলে কোনো লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার মতো ছেলে নয়!”
বাবার এই এক বাক্যের ভরসাটাই যেন বাঁধনের ভেতরের সমস্ত দুর্বলতা ধূলিসাৎ করে দিল। সে আবারও বাবার চওড়া বুকটাতে আছড়ে পড়ে শক্ত করে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। আহসান রহমানও পরম মায়ায় নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে সন্তানকে আগলে রাখলেন।অবশেষে বহুবছরের জমতে থাকা সব মান-অভিমান, দুঃখ আর দূরত্বকে পেছনে ফেলে বাবা আর ছেলের এই অপূর্ব মহাকাব্যিক পুনর্মিলন ঘটল। আর নীরব রাতে নিঝুম আকাশের অগণিত জ্বলজ্বলে তারা সাক্ষী হয়ে রইল বাবা আর ছেলের এই শাশ্বত ভালোবাসার!
কিছুদিন পর,,
দুপুরের কড়া রোদটা যেন একটু বেশিই গা জ্বালিয়ে দিচ্ছে। চারপাশে থমথমে নীরবতার মাঝে দূর থেকে দু-একটা কোকিলের ডাক আর গুরুগম্ভীর সুর ভেসে আসছে।সীমা পুকুরপাড়ের পুরোনো বাঁশের চাঙ্গের ওপর চুপচাপ বসে আছে। দুটো পা নিচপানে ঝুলানো। তার বিষণ্ণ দৃষ্টি বহুদূরের শূন্যতায় হারিয়ে গেছে। হয়তো নিজের ক্ষয়ে যাওয়া ভাগ্যের নির্মম লেখাই মনের ক্যানভাসে মেলাচ্ছে সে।হঠাৎ করেই সীমার ঠিক পাশে কে যেন ধপ করে বসে পড়ল! হালকা জীর্ণ বাঁশের চাঙ্গটা সজোরে নড়ে উঠল। সীমা চমকে উঠে চরম বিস্ময় নিয়ে পাশে তাকাল। আর তাকাতেই তার বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দনটা এক মুহূর্তে থমকে গেল!পাশে আর কেউ নয় ইশতিয়াক! ঠিক একইভাবে পা ঝুলিয়ে একদম তার গা ঘেঁষে বসে আছে সে!
সীমা পলকহীন চোখে কয়েকবার পিটপিট করে তাকাল। ইশতিয়াক এই ভরদুপুরে এই নিঝুম গ্রামে? সে কি স্বপ্ন দেখছে না তো? মনের খটকা মেটাতে নিজের হাতে সজোরে একটা চিমটি কাটল সীমা। ব্যথায় শরীর রি-রি করে উঠল, কিন্তু পাশের মানুষটা মিলিয়ে গেল না! তার মানে এটা কোনো অলীক স্বপ্ন নয়, ইশতিয়াক সত্যি সত্যিই তার পাশে বসে আছে!সীমার এমন থতমত ভাবনার মাঝেই ইশতিয়াক খুব স্বাভাবিক গলায় শুধাল,
—-” কেমন আছ?”
সীমা সরু চোখে ভ্রু কুঁচকে, অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
—-” আপনি আপনি আমাদের এই গ্রামে?”
ইশতিয়াক একটা আড়মোড়া ভেঙে, ঢুলুঢুলু চোখে হাই তুলতে তুলতে বেশ আভিজাত্যের ভাব নিয়ে বলল,
—-” ওই আসলে বউটার জন্য মনটা খুব কেমন কেমন করছিল তো! তাই আর থাকতে না পেরে বউকে এক নজর দেখতে সোজা চলে আসলাম।”
সীমা তব্দা খেয়ে বলল,
—-” আপনার আপনার বউ?”
ইশতিয়াক কান চুলকে বেশ বিরক্তির সুরে বলল,
—-” কানে একটু কম শোনো নাকি হে?”
সীমা নিজেকে সামলে নিয়ে চটে গিয়ে বলল,
—-” সব ঠিকই শুনেছি! কিন্তু ‘আপনার বউ’ মানে? আপনার বউ আবার এই অজপাড়াগাঁয়ে কে হতে যাবে, শুনি?”
ইশতিয়াক সীমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
—-” আমার বউকে চেনো না তুমি?”
সীমা বুক চিরে একটা অভিমানের নিঃশ্বাস ফেলে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে কাঠখোট্টা গলায় বলল,
—-” না, চিনি না!”
ইশতিয়াক এবার সীমার একদম কাছে সরে এসে বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলল,
—-” আচ্ছা ঠিক আছে, না চিনলে আমি ভালো করে চিনিয়ে দিচ্ছি। এই সামনেই একটা ছোট্ট একতলা বাড়ি আছে না? সেখানে সাইফুল শরীয়তের এক মেয়ে থাকে, নাম তার সীমা ফুলটুসি! আর ওই মেয়েটাই হচ্ছে আমার খাঁটি বউ! কী এবার চিনতে পেরেছ, নাকি অন্য কোনো উপায়ে চিনিয়ে দিতে হবে?”
ইশতিয়াকের মুখে নিজের এমন বিচিত্র পরিচয় শুনে চোখ দুটো বড় বড় করে অবাক হয়ে তাকাল সীমা। পরক্ষণেই অভিমানী মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
—- “আমার নাম সীমা ফুলটুসি না, আমার নাম মাহরিমা আয়াত সীমা!”
ইশতিয়াক নাছোড়বান্দার মতো মাথা নেড়ে বলল,
—- “ওহ আচ্ছা, ঠিক আছে এবার আবার নতুন করে বলছি এই সামনেই একটা ছোট্ট একতলা বাড়ি আছে না? সেখানে সাইফুল শরীয়তের এক মেয়ে থাকে, যার নাম মাহরিমা আয়াত সীমা! আর ওই মেয়েটাই হচ্ছে আমার খাঁটি বউ! কী, এবার চিনতে পেরেছ, নাকি অন্য কোনো উপায়ে চিনিয়ে দিতে হবে?”
সীমা বাঁকা চোখে তার দিকে তাকিয়ে ঝেড়ে কেশে বলল,
—- “আমি আপনার বউ নই!”
ইশতিয়াক এবার সীমার একদম কানের কাছে মুখটা নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
—- “আচ্ছা তাই? তাহলে সীমা বেবি, চলো সোজা রুমে যাই! একটু অন্য কিছু করে বুঝিয়ে দিই তুমি আমার আসলে কে হও!”
কথাটা শোনামাত্রই লজ্জায় কান দুটো ঝাঁঝাঁ করে উঠল সীমার! এই ইশতিয়াক হুট করে এমন নির্লজ্জ আর অসভ্য মার্কা কথা কেন বলছে? সে বাঁশের চাঙ্গ থেকে এক লাফে নিচে নেমে ইশতিয়াককে বড় একটা ভেংচি কাটল। তারপর চটজলদি বাড়ির দিকে হাঁটা ধরে গজগজ করে বলল,
—- “অসভ্য একটা!”
ইশতিয়াকও চাঙ্গ থেকে এক লাফে নিচে নেমে পড়ল। দুই হাত পেছনের দিকে বেঁধে বেশ আয়েশ করে সীমার পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে বলল,
—- “ওমা! তুমি দেখি সত্যি রুমের দিকেই যাচ্ছ! আমি তো কথার কথা বলেছিলাম, এখন দেখি তুমি একদম রেডি! ওকে, নো প্রবলেম। তুমি যখন যাবেই, তখন আমি না গিয়ে থাকতে পারি বলো?”
সীমা হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিয়ে পেছনে না তাকিয়েই ধমকের সুরে বলল,
—- “এই, আপনি এত অসভ্য কবে থেকে হলেন বলুন তো? এসব ফালতু কথা বলতে একটুও লজ্জা করছে না আপনার?”
ইশতিয়াক সীমার সমান্তরালে হাঁটতে হাঁটতে এক গাল হেসে বলল,
—-” সভ্যই তো ছিলাম ম্যাডাম, কিন্তু আপনি শান্তিতে সভ্য হয়ে থাকতে দিলেন কই?”
সীমা হাঁটার গতি আরও বাড়িয়ে দিয়ে অভিমানের সুর চড়িয়ে বলল,
—-” আমি আবার আপনার কী করলাম? আপনিই তো আমার থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন, তাই তো আমি নিজে থেকে আপনার জীবন ছেড়ে চলে এসেছি!”
ইশতিয়াক একটা চিলতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর গলায় বলল,
—-” ওই কাজটাই তো সব থেকে বড় ভুল করেছেন! আপনি ভেবেছেন আপনি চলে এসেছেন? মোটেও না! বরং চলে এসে আমাকে আরও গভীরভাবে আপনার ছায়ায় টেনে নিয়েছেন।”
সীমা এবার লজ্জায় আর রাগে মাথার ওড়নাটা এক টানে টেনে এনে পুরো মুখটা ঢেকে ফেলল। তারপর ওড়নার ভেতর থেকেই গজগজ করতে করতে বলল,
—-” আমি কাউকে নিজের লাইফে টেনে নিইনি! এখন দয়া করে আপনি আমার পিছু ছাড়ুন তো খামোখা আমার পিছু কেন নিয়েছেন?”
ইশতিয়াক চট করে সীমার মুখের ওপর ঢেকে রাখা ওড়নার এক কোনায় আলতো করে টান মেরে ধরে, সীমার সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মিষ্টি সুর তুলে গেয়ে উঠল,
‘ও কন্যা গো, ডাইকো না ডাইকো না যৌবন রঙিন কাপড় দিয়া
এই বয়সে মরবে শেষে গরমে পুড়িয়া
আমায় কইরাছো পাগল’
কানাডার শহরগুলোর রূপ যেন এক ভিন্ন দুনিয়া যেখানে আধুনিকতার চরম উৎকর্ষের সাথে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য একদম মিশে গেছে। সুউচ্চ কাঁচের স্কাইস্ক্রেপার, ব্যস্ত প্রশস্ত রাস্তা আর ঝলমলে আলোর রোশনাইয়ের ঠিক পাশেই দেখা মেলে শান্ত লেক, পাইন বন আর হিমেল বাতাসের কোমল ছোঁয়া। তীব্র শীতে বরফের চাদরে ঢাকা স্তব্ধ সাদা মেজাজ হোক কিংবা শরতের লাল-কমলা তুষারপাতসম পাতায় মোড়ানো চারপাশ, কানাডার শহরগুলো যেমন একাধারে ভীষণ গোছানো ও শান্ত, তেমনি ভেতরে ভেতরে লুকিয়ে রাখে এক গভীর, রোমাঞ্চকর রহস্য।
সুন্দর, পরিচ্ছন্ন এক ধবধবে রুম। ঘরের এক কোণে টেবিল-চেয়ার পাতা, আর সেখানে বসেই অত্যন্ত নিখুঁত ও যত্নশীল হাতে ক্যানভাসে পেন্সিল ঘষে চলেছে এক রমণী। সে খুব মনোযোগ দিয়ে এক পুরুষের শান্ত, মায়াবী ঘুমন্ত ছবি আঁকছে।পেন্সিলের প্রতিটি টানে যখনই পুরুষটির রূপ ক্যানভাসে ফুটে উঠছে, তখনই পরম তৃষ্ণার্ত চোখে ছবিটার দিকে তাকাচ্ছে রমণীটা। যতবারই দেখছে, ততবারই ভালোবাসার তীব্র টানে তার বুকের ভেতরটা যেন হাহাকার করে শূন্য হয়ে যাচ্ছে!আর আমাদের এই বিষাদময় রমণীটি অন্য কেউ নয় স্বয়ং রূপা, ওরফে ইথান প্রিসিয়া!গত কয়েক দিন ধরে কানাডার অচেনা শহরের এক চারদেয়ালের মাঝে তাকে সারাদিন বন্দি করে রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ম করে ট্রলি ভর্তি খাবার ঘরে পৌঁছে যায় ঠিকই, কিন্তু এর বাইরে ওপাশের মুক্ত পৃথিবী দেখার কোনো সুযোগ তার নেই। ঘরটা বোধহয় কোনো বিখ্যাত শিল্পীর ছিল, তাই আর্ট পেপার, ক্যানভাস, হরেক রকমের রঙের তুলি আর স্কেচ পেন্সিলের কোনো অভাব ছিল না। আর তাই একাকীত্বের এই গুমোট বন্দিদশায় বসে বসেই রূপা এঁকে চলেছে তার স্বপ্নের পুরুষ।
রূপা পেন্সিলটা হাতে নিয়ে আবার ছবিটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কত কত দিন ধরে এই ভালোবাসার মুখটা স্বচক্ষে দেখে না সে! এই মুখটাতে একবার হাত ছোঁয়ানোর জন্য, একটু ছোঁয়া পাওয়ার জন্য তার ভেতরটা যেন দুমড়ে-মুচড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে।আর সেই ছবিটির পুরুষটি অন্য কেউ নয় স্বয়ং জাওয়াদ অধীর বাঁধন! রূপার তিন কবুল বলা স্বামী!রূপা মৃদু কাঁপাকাঁপা হাতে বাঁধনের মায়াবী চোখের পাতা দুটো আর্ট পেপারে আরেকটু সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে তুলতে আনমনে আর ব্যাকুল কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল,
—-” আপনি ঘুমালে এতটাই মায়াময় লাগে যে, আপনার সেই নিস্তব্ধ সৌন্দর্যকে কাগজে ফুটিয়ে তুলতে আমার কেটে গেল দীর্ঘ ২০ দিন! আপনার ঘুমন্ত মুখের প্রতিটি রেখা, প্রতিটি শান্তির ছোঁয়া ভাবতে ভাবতে, আঁকতে আঁকতে কখন যে হৃদয়ের অজান্তেই আপনাকে বড্ড ভালোবেসে ফেলেছি, তা আর নিজেকেও বোঝাতে পারিনি। আমি তো সেই হতভাগী মেয়ে, যে আপনার এই নিঃশব্দ ঘুমের মাঝেই নিজের আস্ত ভালোবাসার গল্পটা খুঁজে পেয়েছে! লাভ ইউ, আমার ঘুমন্ত রাজকুমার!”
বলতে বলতে রূপা ছবিটা বুকের খুব কাছে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। নোনা জল গড়িয়ে ক্যানভাসের ওপর পড়তে লাগল।
—-” বাঁধন কোথায় আপনি? আপনার রূপ আপনাকে খুব মিস করছে।”
হঠাৎ দরজায় সজোরে খটকা শব্দ! রূপা চমকে উঠে তড়িঘড়ি করে চোখের পানি মুছে ফেলল। দ্রুত হাতে পরম যত্নে আঁকা ছবিটা টেবিলের অন্যপাশে লুকিয়ে ফেলে একদম স্বাভাবিক হয়ে বসল সে।ধীরে ধীরে ড্রয়িংরুমের ভেতর ভারী জুতোর শব্দে হাঁটতে হাঁটতে এক বয়স্ক পুরুষ এসে দাঁড়াল রূপার সামনে। সেই লোকটা আর কেউ নয় রজনীর পুরোনো প্রেমিক মুভিন! আর তার ঠিক পেছন পেছনে ছায়ার মতো আরেকজন এসে দাঁড়াল। এই পুরো শহরের কুখ্যাত মাফিয়া ড্যানি! সবাই তাকে এক নামে ড্যানি মাফিয়া বলেই চেনে। বয়স পঁচাশরের কোঠায় পৌঁছালেও তার হুল্লোড় আর চলাফেরা দেখলে একদম ২৭ বছরের ফুটফুটে যুবকের মতোই মনে হয়।এই বিষাক্ত দুই লোককে সামনে দেখে রূপা নিজে থেকেই একটু গুটিয়ে গেল। ড্যানি ধীরপায়ে হেঁটে রূপার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে ধূর্ত হেসে বলে উঠল,
—-” কী করছ, সুইটহার্ট?”
রূপা তার দিকে তপ্ত, রাগী দৃষ্টিতে তাকাল। ড্যানি মিথ্যে ভয় পাওয়ার ভান করে বুকে হাত দিয়ে বলল,
—-” ওরে বাপরে! সুইটহার্ট, তোমার এই চোখ দুটো দেখে তো আমি সত্যি খুব ভয় পেয়ে গেলাম!”
রূপা আর কোনো কথা বাড়াল না, চরম ঘৃণায় নিজের চোখ দুটো অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল।ঠিক তখনই এক রূপসী মেয়ে হাতে বিশাল একটা বিলাসবহুল শপিং ব্যাগ নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। ড্যানি একবার মেয়েটার দিকে তাকাল, তারপর রূপার দিকে ঘুরে রহস্যময় হেসে বলল,
—-” সুইটহার্ট, চটপট তৈরি হয়ে নাও তো! আজকের এই শুভ আর বিশেষ দিনটার কথা তোমার হয়তো খুব ভালো করেই মনে আছে, তাই না?”
ড্যানির কথাটা কান ভেদ করতেই চমকে উঠে রূপা! সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ে গেল আজকের তারিখটার কথা আজ যে এই ভয়াল ড্যানির সাথে তার জোরপূর্বক বিয়ের দিন!
ভাবতেই রূপার সারা শরীর আতঙ্কে শিউরে উঠল, হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসতে লাগল।আসলে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি তো, তাহলে চলুন বুঝাচ্ছি।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল সেদিন, যখন রূপাকে জোর করে কিডন্যাপ করে এই কানাডায় উড়িয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল। এখানে এনে তাকে একটা বড় আইনি সম্পত্তিপত্রে সই করতে বলা হয়। কিন্তু রূপা কোনো না কোনোভাবে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সই করতে অস্বীকার করে। বাধ্য হয়ে মুভিন তার চেনাজানা এই শক্তিশালী মাফিয়া ড্যানিকে ডেকে পাঠায় যাতে ভয় দেখিয়ে রূপার কাছ থেকে সই আদায় করা যায়।
কিন্তু প্রথমবার রূপাকে দেখেই লোভাতুর চোখে পছন্দ করে ফেলে ড্যানি এবং তাকে নিজের করে পেতে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। রূপা তো সোজাসাপ্টা সেই প্রস্তাবে না করে দেয়। ড্যানি বড্ড চালাক ও খতরনাক লোক। সে রূপার আসল পরিচয় আর অতীত জানে যে রূপার আসল দাদি ফেন্সি ইয়ারা এখনো বেঁচে আছে! ড্যানি কৌশলে সেই বৃদ্ধাকে ধরে নিয়ে আসে। মুভিন রূপাকে জানায় যে ইনিই তার জন্মদাত্রী দাদি। রূপা প্রথমে বিশ্বাস করতে না পারলেও ফেন্সি ইয়ারা রূপার মুখ, মায়াবী চোখ আর ওই এক চিলতে ঘ্যাঁচ দাঁত দেখে নিজের রক্তের নাতনিকে চিনতে এক মুহূর্তও ভুল করেননি! রূপাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদেছিলেন তিনি।বয়স্ক ওই মহিলার প্রতি অজানা এক মায়ায় জড়িয়ে পড়েছিল রূপার মন। ঠিক তখনই ড্যানি তার মাফিয়া রূপ দেখায়! ফেন্সি ইয়ারাকে বাঁধন পরা অবস্থায় জিম্মি করে রূপাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যদি রূপা ড্যানিকে বিয়ে করতে রাজি না হয়, তবে তার চোখের সামনেই ওর বৃদ্ধা দাদিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হবে!
এই অসহায় দাদির আকুলতায় রূপা বাধ্য হয়ে সেই নরকসম বিয়েতে রাজি হয়ে যায়। ড্যানি আর মুভিনের ভেতর মেপে ডিল হয়েছে,রূপাকে বিয়ে করার পর ড্যানি জোর করে ওর সই নিয়ে নেবে। চুক্তি অনুযায়ী সম্পত্তি পেয়ে যাবে মুভিন, আর রূপাকে চিরতরে নিজের বন্দি করে রেখে দেবে মাফিয়া ড্যানি!
রূপা আর নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারল না। অঝোরে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে আকুল কণ্ঠে বলে উঠল,
—-” আপনি কেন বুঝতে পারছেন না, আপনি বয়সে আমার বাবার মতো! আর আমি তো একজন বিবাহিত মেয়ে আমার হাসবেন্ড আছে।”
‘হাসবেন্ড’ শব্দটা শুনতেই ড্যানির মেজাজ চড়ে গেল। সে সজোরে সামনের কাঠের টেবিলে লাথি মেরে গর্জে উঠল,
—-” ওই পুরোনো স্বামীর কথা চিরতরে ভুলে যাও, সুইটহার্ট! এখন থেকে আমিই হব তোমার একমাত্র শুরু আর তোমার শেষ! আমার কাছে এসো, সোনার সিংহাসনে বসিয়ে একদম রাজরানী বানিয়ে রাখব তোমাকে!”
রূপা বুকচেরা হাহাকার নিয়ে বলল,
—-” আমি আপনার কোনো রাজরানী হয়ে থাকতে চাই না! দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন আপনারা, প্লিজ!”
মুভিন এবার বিরক্তি নিয়ে সামনে এগিয়ে এল। ধমকের সুরে বলল,
—-” আরে, তুমি খামোখা এত কাবলি খাচ্ছ কেন বল তো? একদম ভুলে যেও না যে তোমার বুড়ি দাদি এখন আমাদের কবজায় বন্দি! বাবা-মাকে তো বহু আগেই হারিয়েছ, এবার কি দাদিকেও নিজের জেদের কারণে চিরতরে হারাতে চাও? যদি বুড়িকে জ্যান্ত দেখতে চাও, তবে বেশি নাটক না করে চুপচাপ রেডি হয়ে নিচে এসো!”
কথা কটা বিষের মতো রূপার কানে ঢেলে দিয়ে মুভিন আর ড্যানি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।রূপা একাকী নিস্তব্ধ ফ্লোরে ধপ করে বসে পড়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। কেন জানি তার মন বারবার বলছিল, ফেন্সি ইয়ারা সত্যিই তার নিজের দাদি! ওই প্রবীণ বৃদ্ধার চোখে সে তো নিজের রক্তে টানা স্পষ্ট কান্না দেখেছে, খাঁটি ভালোবাসা আর মায়া দেখেছে। তাকে কীভাবে নিজের চোখের সামনে মরতে দেয় সে?
অবশেষে রূপাকে বধূবেশে রেডি করানো হলো। কোনো প্রতিবাদ না করে একটা প্রাণহীন পুতুলের মতো সে বসে রইল। দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটার শরীরে প্রাণটুকু হয়তো আছে, কিন্তু ভেতরের সমস্ত অনুভূতি আর স্মৃতি যেন জমে বরফ হয়ে গেছে!রেডি করিয়ে রূপাকে ধরে ধরে নিচে বিয়ের বিলাসবহুল মণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হলো। প্রতিটা সেকেন্ডে রূপার ভেতরের আত্মাটুকু ধুঁকে ধুঁকে মরে যাচ্ছে। মনে মনে সে তার সবটুকু অস্তিত্ব দিয়ে ব্যাকুল হয়ে ডেকে চলেছে তার বাঁধনকে।
“‘বাঁধন কোথায় আপনি? এসে বাঁচান আপনার রূপকে।”
আশেপাশে অনেক হেভিওয়েট অতিথি টেবিলগুলোতে আড্ডায় মত্ত। তারা অবাক চোখে দেখছে এক পঞ্চাশ বছর বয়সী দাপুটে বুড়ো কীভাবে তার অর্ধেকেরও কম বয়সের এক অপরূপা ১৯ বছরের তরুণীকে বিয়ে করছে! দৃশ্যটা অনেকের কাছেই অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য আর হাস্যকর মনে হলেও কেউ মুখ ফুটে টু শব্দটাও করার সাহস পেল না। কারণ ড্যানির মাফিয়া ক্ষমতার দাপট এ শহরের সবারই জানা!ড্যানি পরম অহংকারে রূপার হাতটা চেপে ধরে স্টেজে গিয়ে উঠল।কিন্তু স্টেজে পা রাখতেই হঠাৎ রূপার চোখ দুটো সামনের দৃশ্যটার ওপর আটকে গেল! সে এক মুহূর্তের জন্য একদম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল!
সামনে বেশ কিছু প্রফেশনাল ড্যান্স বয় ছন্দে ছন্দে নাচছে। আর সেই ড্যান্স বয়দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুরোদমে তাল মিলিয়ে নাচছে এক রহস্যময় যুবক! তার পরনে কালো টি-শার্ট, তার ওপর এক ধবধবে সাদা শার্ট যে শার্টের সবকটা বোতাম পুরোপুরি খোলা, হাতা দুটো ফুল-স্লিভ। মাথায় উল্টো করে পরা সাদা ক্যাপ, আর মুখের অর্ধেকটা ঢেকে রেখেছে একটা কুচকুচে কালো মাস্ক।শুধু তার চাবুকের মতো চোখ দুটো বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কালো, ক্ষুরধার আর ভীষণ গভীর!হঠাৎ রূপার দৃষ্টি থমকে গেল ছেলেটার বাঁ চোখের ঠিক ভ্রু ওপরের দিকে স্লিট করে কাটা একটা দাগের দিকে। মুহূর্তের মধ্যে রূপার যেন নিঃশ্বাস আটকে এলো! ভেতরের হার্টবিটটা সজোরে লাফিয়ে উঠে এক নিমেষে থমকে গেল! বুকের ভেতরের পুরো হৃৎস্পন্দন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল সেই অদ্ভুত নাচতে থাকা যুবকটাকে দেখে।
চলবে…!
[অনেক বড় পর্ব লিখতে সময় লাগে আর কষ্টও হয় দয়া করে সবাই সাপোর্ট আগের পর্বের মতো 7k বানিয়ে দিও, সবাই সাপোর্ট করিও অনুরোধ] See less
Share On:
TAGS: বাঁধন রূপের অধিকারী, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬১
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৪
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে পর্ব ৩
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫৮
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১৯
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৬