Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১৯


#বাঁধন_রূপের_অধিকারী

#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী [১৯]

[•••অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ•••]

বাঁধনের হাত মাঝপথে আচমকা থমকে যায়। ঘাড় বাঁকিয়ে রূপার দিকে তাকায়। মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল করে ফেলছে, এখনো অবিরল কাঁদছে, গাল দুটো লাল হয়ে উঠছে, ঠোঁট দুটো তীব্র ভ’য়ে তীরতীর করে কাঁপছে। রূপার এই মায়াবী অশ্রুশিক্ত মুখটা দেখে বাঁধনের বুকে অদ্ভুত কেমন জানি অদ্ভুত নে’শা’ লেগে যায়, ভেতরের চড়া রা’গ’টা অজান্তেই একদম শিথিল হয়ে আসে। সে হাত আলগা করে ক্যান্ডিকে ছেড়ে দেয়, ক্যান্ডি ছাড়া পেয়েই এক দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।

রূপা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাঁধন শক্ত মুঠোয় তার হাতটা ধরে। এক চরম ঝটকায় রূপাকে ফ্লোর থেকে তুলে সোজা দেয়ালের সাথে পিষে ধরে। বাঁধন তার মুখটা রূপার মুখের একদম কাছে নিয়ে আসে, এতটাই কাছে যে একে অপরের তপ্ত নিঃশ্বাস একদম গা ছুঁয়ে যায়।

হঠাৎ করেই বাঁধন তাকে এইভাবে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল কেন ভেবে রূপার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। সে ছাড়া পাওয়ার জন্য দুই হাত দিয়ে ব্যাকুল হয়ে ছটফট করতে থাকে। কিন্তু বাঁধনের শরীরের তীব্র পুরুষালি ঘ্রাণ তার নাক বেয়ে যেন একদম কলিজার ভেতর ঢুকে যায়, ভ’য়ে আর এক অজানা অনুভূতিতে রূপার পুরো শরীর অবশ হয়ে আসে। বাঁধন রূপার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে।

“রূপ দেখিয়ে ম্যা’ড বানাতে চাস।নিজেকে কী ভাবিস তুই। একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ, পৃথিবীর সব ছেলে তোর জন্য পাগল হয়ে গেলেও আই ডো’ন্ট কে’য়ার। এই জাওয়াদ অধীর বাঁধন কোনোদিন কারো জন্য পাগল হয়নি, আর না কোনোদিন হবে।এই বাঁধনের মনে তোর জন্য ভালোবাসা না, শুধু ঘৃণাটুকুই বেঁচে আছে। সো ডো’ন্ট ট্রাই টু প্লে উইথ মি।”

বাঁধনের এই রহস্যময় কথার মানে বোঝে না রূপা, অশ্রু চোখে অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়, কিন্তু মুখে উত্তর দেওয়ার মতো সাহস পায় না। বাঁধন ফের বলে।

“কি হলো কথা বলছিস না কেন, ডো’ন্ট ই’উ হ্যা’ভ এ’নি ওয়া’র্ড।”

রূপা নিজের কাঁপতে থাকা কণ্ঠটাকে কোনোমতে সামলে নিয়ে শুধায়।

“কী, কী বলছেন ভাইয়া এসব।”

বাঁধন এক চিলতে বাঁকা হেসে বলে।

“বুঝতে পারছিস না কি বলছি, আ’র ই’উ আ’ন’ডা’র এ’ই’জ, ফিটার খাস।”

রূপা কিছুতেই বুঝতে পারছে না বাঁধন হঠাৎ এমন খ্যাপাটে আচরণ করছে কেন। বাঁধনের চোখ দুটো রক্তবর্ণ লাল হয়ে উঠছে, সেই চোখে এক অদ্ভুত মাতাল করা নে’শা, যা সম্পূর্ণ রূপার ওপর আটকে আছে। রূপার এই অসহায় আকুল চাহনি বাঁধনের হার্টে গিয়ে তীব্র তীরের মতো লাগে। সে নিজের ভেতর পরিষ্কার বুঝতে পারছে না, মেয়েটাকে এত কাছ থেকে দেখলেই কেমন জানি ম্যা’ড হয়ে যাচ্ছে সে, নিজের ওপর থেকে সমস্ত কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলে সে। বাঁধনের এতো কাছের উপস্থিতিতে রূপার শরীর একদম অবশ হয়ে আসছে, ভ’য়ে আর এক অজানা তীব্র অনুভূতিতে তার প্রায় জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা হয়। বাঁধন রূপার এই নাজুক আর কাবু অবস্থাটা ঝটপট বুঝে নেয়। সে এক ঝটকায় উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে যথাযথ স্বাভাবিক করে গম্ভীর কণ্ঠে বলে।

“আমার ল্যাপটপ ভেঙে দিল ওই বিচ্ছু একটা বাচ্চা, ওই ল্যাপটপের দাম কত জানিস, ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া?”

রূপা নিজের ধকপক করতে থাকা বুকে হাত রেখে বড় বড় শ্বাস নেয়। নিজেকে কোনোমতে একটু সামলে নিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলে।

“ও ও ইচ্ছে করে করেনি ভুল করে পড়ে গেছে।”

বাঁধন রূপার দিকে আবার সটান ঘুরে দাঁড়ায়, তার চোখের দিকে তাকিয়ে রা’গী কণ্ঠে বলে।

“ওইটা আমার গভর্নমেন্ট থেকে দেওয়া অফিশিয়াল ল্যাপটপ ছিল, মাত্র কিছুদিন হলো। এখন আমি ওদের কি জবাব দিবো, হোয়াট শুড আই সে, বলবো একটা বিচ্ছু একটা বাচ্চা এটা ন’ষ্ট করে ফেলেছে?”

রূপা চরম অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে ফেলে, নিজের হাত দুটো শক্ত মুঠি করে নেয়, একদম নিচু কণ্ঠে বলে।

“সরি ভাইয়া।”

এই একটা শব্দ শোনা মাত্রই বাঁধনের ভেতরের দমে যাওয়া রা’গ’টা যেন আবার দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। রূপাকে আবার দেয়ালের সাথে সজোরে চেপে ধরে বাঁধন, নিজের মুখটা তার মুখের একদম ইঞ্চিখানেক দূরত্বে এনে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে।

“থা’প্প’ড়ে গাল লাল করে দিবো, তোকে বলেছি না আমাকে ভাই ডাকবি না। হাউ ডে’য়া’র ইউ, সাহস কি করে হয় আমাকে ভাই ডাকার?”

ডুকরে কেঁদে দেয় রূপা, তার চোখের অবিরল পানি বাঁধনের বুকের শার্টে লেপ্টে যাচ্ছে। সে চোখ বুজে ছটফট করতে করতে আকুল কণ্ঠে বলে।

“রুমে যাবো আমি ছাড়েন আমাকে, আর আমি আপনার ল্যাপটপ কিনে দিবো, এক সপ্তাহের মধ্যে।”

মস্তিষ্ক দাউদাউ করে জ্ব’লে ওঠে বাঁধনের। বুকের ভেতর চেপে থাকা তীব্র ক্ষো’ভ, অহংকার এক নিমেষে চাড়া দিয়ে ওঠে, চোখের মণি দুটো রাগে স্থির হয়ে যায়। সে রূপার অবাধ্য চোখের দিকে তাকিয়ে ধিক্কারের কণ্ঠে বলে।

“কি বললি ল্যাপটপ কিনে দিবি। দাম কত জানিস এর, ডু ইউ হ্যা’ভ এ’নি আ’ই’ডি’য়া। তোর বাবারও যোগ্যতা নেই এই ল্যাপটপ কিনে দেওয়ার। তোর বাবার যোগ্যতা নেই বলেই তো তোর মা লো’ভে আমার বাবার কাছে এসেছে, আর তুই কিনা আমার ল্যাপটপ কিনে দিবি, হাউ সো ফা’নি।”

বাঁধনের এত কাছে এক মুহূর্তও দম নিতে পারছে না রূপা। বাঁধনের শরীরের তীব্র ঘ্রাণ মুখের তপ্ত তড়িৎ নিঃশ্বাস তাকে যেন জ্যান্ত মে’রে ফেলছে, প্রতি সেকেন্ডে তার ভেতরের সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে আসছে। সে দেয়ালের শক্ত পলেস্তারার সাথে নিজের শরীরটাকে আরও বেশি লেপ্টে দিয়ে কাতর কণ্ঠে বলে।

“ছাড়ুন প্লিজ।”

রূপার ছটফটানি বাঁধনের মনে এক তীব্র ক্রুর আনন্দ দিচ্ছে। নিজের চড়া স্বভাবের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সে আরও এগিয়ে আসে, মেয়েটাকে যেন নিজের সমস্ত পৌরুষ, শক্তির নিচে একদম বিলীন করে দিতে চায়। রূপার থরথর করে কাঁপতে থাকা ঠোঁটের একদম মুখোমুখি নিজের ঠোঁট জোড়া এনে, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে একদম নিচু গম্ভীর স্বরে বলে।

“যদি না ছাড়ি।”

কথাটা শেষ হতেই রূপার পুরো শরীরটা নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়ল বাঁধনের শক্ত বুকের ওপর। জীবনে প্রথম কোনো পুরুষ মানুষ তার এত সীমানার ভেতরে এসেছে, এতটা নিবিড়ভাবে তাকে অবরুদ্ধ করেছে। পুরুষের শরীরের অচেনা তীব্র সুবাস, মুখের তপ্ত নিঃশ্বাসের ঝাপটা রূপার চেনা জগৎটাকে এক নিমেষে ওলটপালট করে দিল। এক সেকেন্ড দুই সেকেন্ড মাথার ভেতর সবকিছু কেমন যেন ফাঁকা হয়ে এল, স্নায়ুর ওপর থেকে সমস্ত জোর হারিয়ে এক গভীর ক্লান্তিতে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল সে।

রূপার মেঘবরণ লম্বা চুলের গোছা বাঁধনের শার্টের বোতামে আটকে চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে, মেয়েটার এমন অবাধ্য নৈকট্যে বাঁধনের বুকের ভেতরের ধুকপুকানি আচমকা তীব্র গতিতে বাজতে লাগল। সম্পূর্ণ নিথর হয়ে মেয়েটা ঢলে আছে বাঁধনের শক্ত বুকে, শরীরে কোথাও কোনো স্পন্দন নেই, নেই সামান্যতম নাড়াচড়া। বাঁধন রূপার অবশ মাথাটা নিজের বুক থেকে আলতো করে ধরে সোজা করার চেষ্টা রাতেই শরীরটা মেঝেতে পড়ে যেতে নিল, মুহূর্তের অসতর্কতায় বাঁধন দুহাতে তার নরম কোমর জড়িয়ে নেয়। মেয়েটার পুরো শরীরটা এখন শূন্যের মধ্যে ঝুলে যায়, বাঁধন স্তব্ধ হয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে রূপার মুখের দিকে। বন্ধ চোখের পাতায় পানি লেপ্টে আছে, ঘন চোখের পাপড়িগুলো কান্নায় ভিজে একাকার, নিষ্পাপ কোনো বাচ্চার মতো দেখাচ্ছে তাকে। চেতনা হারানো এই রূপসী মেয়েটাকে দেখতে এই মুহূর্তে আরও অদ্ভুত আকর্ষণীয় সুন্দর লাগছে, যা দেখে বাঁধনের ভেতরের সুপ্ত আবেগ চাড়া দিয়ে বুকে যেন এক প্রবল ঝড় তুলে দিল। এক ঝটকায় নিজের কোলপাঁজায় তুলে নেয় রূপাকে, রূপার ঘরের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে চরম বিরক্তিমাখা চড়া কণ্ঠে বলে।

“মেয়েটা কি খাই না কিছু, কথায় কথায় এমন জ্ঞান হা’রি’য়ে ফেলে কেন, ইটস সো অ্যানোইং।”

অচেতন রূপাকে কোলপাঁজায় জড়িয়ে সোজা রূপার নিজের শান্ত স্নিগ্ধ রুমে নিয়ে আসে বাঁধন। বৃষ্টি ততক্ষণে শাওয়ার শেষ করে ভেজা চুলে ফ্রেশ হয়ে রুমে ফিরে এসেছে। বাঁধন আলতো ছোঁয়ায় রূপাকে বিছানার নরম তোশকে সাবধানে শুইয়ে দেয়। ঠিক তখনই বৃষ্টি ব্যালকনি থেকে ঘরের ভেতরে পা রাখতেই এই অভাবনীয় দৃশ্য দেখে মারাত্মক স্তব্ধতায় থমকে যায়। সে কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে অস্ফুট গলায় বলে।

“র-রূপার কি হয়েছে।”

বাঁধন এক পলক বৃষ্টির দিকে তাকায়। নিজের স্বভাবসুলভ রুক্ষ গাম্ভীর্য ধরে রেখে চড়া কণ্ঠে বলে।

“জ্ঞান হা’রি’য়েছে মুখে পানি দাও ঠিক চলে আসবে, অ্যান্ড হ্যাঁ, জ্ঞান আসলে বলবে ঠিকমতো খেতে, শি ইজ সো উইক।”

কথাটা শেষ করেই ঘর থেকে তড়িৎ গতিতে বেরিয়ে যায় বাঁধন। বৃষ্টি কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। নিজের ভেতরের জড়তা কাটিয়ে সোজা ঠান্ডা পানি এনে রূপার ফ্যাকাশে চোখে-মুখে আলতো করে ছিটিয়ে দেয়। রূপা কপাল কুঁচকে এক গভীর অস্বস্তি নিয়ে আস্তে আস্তে চোখ খোলে।কোথায় আছে বোঝার চেষ্টা করল রূপা। বিছানার পাশে বসা বৃষ্টি কপালে হাত দিয়ে বেশ উদগ্রীব হয়ে শুধায়।

“কিরে কি এমন হয়েছিল যে তুই আবার জ্ঞান হা’রি’য়েছিস।”

সব স্মৃতি যেন এক ঝটকায় মগজে ফিরে পেল রূপা, মনে পড়ে গেল সবকিছু। বাঁধনের একদম কাছে আসা, তার পুরুষালি শরীরের মাদকতাময় ঘ্রাণ, সব কিছুই যেন তাকে এক অদ্ভুত অস্থিরতার অতল গহ্বরে ফেলে দিল। রূপাকে এমন নিঝুম হয়ে চুপচাপ থাকতে দেখে বৃষ্টি পুনরায় বলে।

“কি হলো বল?”

রূপা নিজের ভেতরের প্রবল ছটফটানি নিমেষেই আড়াল করে নিল, মলিন ঠোঁটে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলে।

“কিছু হয়নি শুধু।”

নিমেষে দুই ভ্রু কুঁচকে তাকায় বৃষ্টি। তীব্র কৌতুহলে জানতে চাইল।

“শুধু কী?”

এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে রূপা। খুব ধীর গলায় বলে।

“ক্যান্ডি বাঁধন ভাইয়ের ল্যাপটপ ভেঙে ফেলেছে।”

বৃষ্টির চোখ যেন ধাক্কা খেয়ে কপালে উঠে গেল। তীব্র বিস্ময়ে বলে।

“কি বলিস।”

রূপা বিছানা ছেড়ে উঠে বসতে বসতে বলে।

“হ্যাঁ রে, উনি দারুণ ক্ষ্যাপে গেছে, আমার এখন কিছু একটা করতে হবে।”

বৃষ্টির দুশ্চিন্তা আরও বাড়ল। সে তটস্থ হয়ে প্রশ্ন করে।

“এখন কি করবি তুই?”

রূপা কিছুক্ষণ গভীর ভাবনায় ডুবে থেকে বলে।

“আমি চাচ্ছি উনার ল্যাপটপটা ফেরত দিতে, কারও জিনিস ভাঙার দায় মাথায় নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই না।”

বৃষ্টি চরম অবাক হয়ে বিছানা থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল। রূপার এমন অবাস্তব কথা শুনে তার দুই চোখ কপালে তুলে বলে।

“তুই কি পা’গ’ল হয়ে গেছিস, এত গুলা টাকা পাবি কোথায়, বাঁধন ভাইয়া যে স্মার্ট, কম দামের ল্যাপটপ কোনো ভাবেই ব্যবহার করবে না, মিনিমাম ১০ লাখের উপরে তো দাম হবেই।”

রূপা মলিন মুখে আলতো মাথা নাড়ল। বৃষ্টির ভুল ভাঙাতে গিয়ে ঠোঁটে আলগা হাসি ফুটিয়ে দেয়।

“তুই পা’গ’ল, উনার পার্সোনাল ল্যাপটপ ভাঙেনি, সরকার থেকে দেওয়া ল্যাপটপ ভেঙে গেছে।”

এতক্ষণে বৃষ্টির বুকের ওপর থেকে যেন মস্ত বড় একটা পাথর নেমে গেল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সোফায় ধপ করে বসে পড়ে বলে।

“ওহহ তাই বল, ওটা আর কত দাম হবে, এই ধর ১ লাখ বিশ হাজার বা ১ লাখ ষাট হাজার।”

এক লাখ ষাট হাজার টাকার অঙ্কটা মাথায় আসতেই রূপার বুকের ভেতরটা ছাৎ করে উঠল। এতগুলো টাকা সে হুট করে পাবে কোথায়, তার ওপর নিজের জিদের বশে বলে এসেছে এক সপ্তাহের মধ্যে ল্যাপটপ ফেরত দেবে। সে বৃষ্টির দিকে গভীর আকৃতি নিয়ে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে।

“তুই শিওর এত গুলো টাকা লাগে।”

বৃষ্টি সোফায় আরাম করে পিঠ ঠেকিয়ে রূপার দিকে তাকাল। নিজের এক হাত নেড়ে বেশ জাঁকালো ভঙ্গিতে উত্তর দেয়।

“আরে হ্যাঁ। আচ্ছা দাঁড়া, একেক জনের ল্যাপটপের মডেল তো একেক রকম থাকে। তুই এক কাজ কর, ল্যাপটপের নামটা বল, আমি এখনই গুগলে সার্চ করে প্রাইজ বের করছি।”

বলেই বৃষ্টি হাতের ফোনটা আনলক করতে লাগল। রূপা কপালে হালকা হাত দিয়ে চোখ বুজে সেই মুহূর্তটা মনে করার চেষ্টা করল দণ্ডি ল্যাপটপটা যখন টেবিল থেকে ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেল, তখন সে আবছা দেখেছিল ওটার ডিসপ্লে প্যানেলের নিচে চকচকে রূপালী অক্ষরে একটা নাম লেখা ছিল। সে ঝট করে চোখ খুলে বৃষ্টির দিকে ফিরে নামটা আওড়ে বলে।

“HP EliteBook 840।”

বৃষ্টির আঙুলগুলো এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ফোনের স্ক্রিনে ঝড় তুলল। সেকেন্ডের মাথায় প্রাইজটা স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই বৃষ্টির নিজের চোখই ছানাবড়া হয়ে গেল, সে ঝটপট বিছানার কাছে এগিয়ে এসে ফোনটা রূপার চোখের সামনে বাড়িয়ে ধরে ধপ করে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে।

“দেখ। নিজের চোখেই দেখে নে এবার।”

রূপা কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা নিজের মুখের সামনে ধরল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করা দামটার দিকে নজর যেতেই তার দুই চোখ এক ঝটকায় কপালে উঠে গেল। চোখের সামনে পরিষ্কার লেখা এক লাখ ষাট হাজার টাকা প্রাইজ। পুরো মাথাটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে চক্কর দিয়ে উঠল তার, সে দুই হাত দিয়ে শক্ত করে মাথা চেপে ধরে বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল। রূপার এমন হা-হুতাশ দেখে বৃষ্টি তার পিঠে হাত বুলিয়ে অভয় দেওয়ার সুরে বলে।

“এসব ফালতু চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল তো। বাঁধন ভাইয়ের ল্যাপটপই তো ভেঙে ফেলেছিস, বাইরের কোনো অচেনা মানুষের টা তো আর না।”

রূপা জেদি চোখে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে,

“না, আমি দিবোই।”

বৃষ্টি কিছুক্ষণ ভেবে বলে,

“তাহলে নরমাল একটা কিনে দে। সত্তর হাজার টাকার মধ্যে ভালো ল্যাপটপ পেয়ে যাবি।”

রূপা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে বলে,

“না। এইচপি এলিটবুক এইট ফোরটি ভেঙেছি, এইচপি এলিটবুক এইট ফোরটিই দিবো। ওটা যদি দশ লাখ টাকাও হয় তবুও দিবো।”

বৃষ্টির চোখ কপালে উঠে গেল। সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,

“এত টাকা কোথায় পাবি তুই।”

রূপা রাগী মুখে বালিশটা জড়িয়ে ধরে বলে,

“রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করব, তাও দিবো।”

বৃষ্টির হাসি চেপে রাখা দায় হয়ে গেল। সে খিলখিল করে হেসে বলে,

“তোরে দেখে মনে হচ্ছে এখনি একটা বাটি নিয়ে বের হয়ে যাবি।”

রূপা চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই বৃষ্টি হাসি থামানোর চেষ্টা করে বলে,

“আচ্ছা আচ্ছা, রাগ করিস না। আমাকে একটু ভাবতে দে। দেখি কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না।”

রূপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বৃষ্টি ফের বলে,

“চিন্তা করিস না দোস্ত। আমি আছি তোর পাশে।”

___________________

এদিকে আকাশ ফ্রেশ হয়ে নিচে নামল। রান্নাঘরে শিপ্লি রহমান আর রজনী রহমান রাতের রান্না নিয়ে ব্যস্ত।

আকাশ রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে বলে,

“মা, এক কাপ কফি দিতে পারবে।”

কথাটা বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে চলে গেল।

শিপ্লি রহমান তাড়াতাড়ি পানি গরম করতে দিলেন।

কফি বানাতে বানাতেই মাগরিবের আযান ভেসে এলো চারদিক থেকে। তিনি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হালকা অস্থির হয়ে গেলেন। নামাজের সময় হয়ে গেছে। দ্রুত কফিটা মগে ঢেলে ট্রের উপর রাখলেন। ঠিক তখনই বৃষ্টি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। শিপ্লি রহমান যেন হাতে চাঁদ পেলেন। তিনি তাড়াতাড়ি বৃষ্টির সামনে গিয়ে কফির মগটা এগিয়ে দিয়ে বলে,

“মা, এই কফিটা তোমার আকাশ ভাইয়ার রুমে একটু দিয়ে আসো তো। আমার অযু করতে হবে, আযান হয়ে গেছে।”

শিল্পী রহমানের মুখের কথাটা শুনতেই বৃষ্টির বুকের ভেতরটা একদম ধক করে উঠল। মনে এক নিমিষেই একরাশ ভয় ঢুকে গেল তার তখন কেবিনে গিয়ে নাম্বার দিয়ে আসেনি, এখন আবার রুমে গেলে যদি ধমক দেয়। কিন্তু শিল্পী রহমানের এই আকুতিভরা অনুরোধটাও সে কোনোভাবেই ফেলতে পারবে না। নিজের ভেতরের প্রবল অস্থিরতাটা কোনোমতে আড়াল করে মুখে একটা জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে বলে।

“আচ্ছা আন্টি, দিয়ে আসছি।”

শিল্পী রহমান পরম মায়ায় বৃষ্টির মাথায় হাত রেখে হেসে বলেন।

“লক্ষ্মী একটা মেয়ে।”

বলেই দ্রুতপায়ে ওখান থেকে চলে গেলেন শিল্পী রহমান। বৃষ্টি এক বুক বড় বড় শ্বাস টেনে নিজের ফুসফুসটা হালকা করার চেষ্টা করল। ধীরপায়ে পা বাড়াল আকাশের রুমের দিকে, অথচ প্রতিটা কদমে তার বুকের ভেতরে কেউ যেন জোরে জোরে হাতুড়ি পিটাচ্ছে। রুমের দরজার সামনে এসে নিজের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে মুখে একটা আলগা হাসি ঝুলিয়ে নক করে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তার আগেই ভেতর থেকে আকাশের চেনা কণ্ঠ ভেসে এল।

“হ্যাঁ মা, আসো।”

মুহূর্তেই দুই ভ্রু কুঁচকে গেল বৃষ্টির। নিজের মনেই খটকা লাগল ওকে মা ডাকল কেন। সে ঠোঁট কামড়ে ধরে মাথাটা নিচু করে খুব ধীরে ধীরে রুমের ভেতরে পা রাখল। আকাশ তখন সোফায় আরাম করে বসে একমনে ফোন টিপছিল, দরজার দিকে না তাকিয়েই খুব স্বাভাবিক গলায় বলে।

“কি ব্যাপার মা, তুমি তো আমার রুমে পারমিশন নিয়ে আসো না, আজ হঠাৎ পারমিশন। আমার ওপর কি কোনো রকম রেগে আছো?”

কথাটা কানে আসতেই হাতের কফিটা কেঁপে উঠে মেঝেতে পড়ার উপক্রম হলো বৃষ্টির। সে নিজের দাঁতে দাঁত চেপে রাগ আর অস্বস্তিটা সামাল দিল; এই ছেলে তাকে কি না ‘মা’ ডাকছে। নিজেকে কোনোমতে শান্ত রেখে, গলার স্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে আস্তে করে বলে।

“স্যার, আমি বৃষ্টি, আপনার মা নই।”

চমকে উঠে ঝট করে সামনে তাকায় আকাশ। চোখের সামনে মাকে না দেখে বৃষ্টিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুহূর্তেই তীব্র বিরক্তিতে তার দুই ভ্রু কুঁচকে একাকার হয়ে গেল। সোফা থেকে সোজা হয়ে বসে বেশ চড়া গলায় ধমকে ওঠে।

“ইডিয়ট। কারও রুমে আসলে নক করে পারমিশন নিয়ে আসতে হয় জানো না। হোয়াট এ ব্যাড ম্যানার্স।”

বৃষ্টি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মাথাটা আরও নিচু করে ফেলে। আমতা-আমতা করে বলে।

“স্যার, আমি নক করেছি। কিছু বলতে যাবো, তার আগেই আপনি আমাকে মা বানিয়ে।”

কথাটা পুরো শেষ হওয়ার আগেই রাগে-ক্ষোভে দাঁতে দাঁত চেপে সোফা ছেড়ে ঝট করে দাঁড়িয়ে যায় আকাশ। আঙুল উঁচিয়ে গর্জে ওঠে।

“জাস্ট শাট আপ, স্টুপি’ড। ওয়ান মোর ওয়ার্ড অ্যান্ড আই উইল ফায়ার ইউ।”

বৃষ্টি ভয় পেয়ে জলদি জলদি মাথা নাড়ায়।

“ওকে স্যার, এই যে আপনার কফি।”

বলেই পা টিপে টিপে আকাশের একদম সামনে এসে কফির মগসহ ট্রে-টা তার দিকে বাড়িয়ে ধরে। আকাশ নিজের বাম হাতটা প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিল। ডান হাতটা বাড়িয়ে কফির মগটা আলতো করে নেওয়ার সময় বৃষ্টির জড়োসড়ো হয়ে থাকার ভঙ্গিটা তার নজরে পড়ল। কফিতে একটা চুমুক দিয়ে কৌতূহলী গম্ভীর গলায় শুধায়।

“তুমি সবসময় এমন মাথা নিচু করে থাকো কেন।”

চমকে উঠে ভেতর-বাহির পুরো কেঁপে উঠল বৃষ্টির। এই খিটখিটে পুরুষটার চোখের দিকে তাকালেই যে তার বুকের ভেতর কেমন ওলটপালট হয়ে যায়, সেই কথা সে মুখ ফুটে কেমনে বোঝায়। আমতা-আমতা করে থমথমে গলায় বলে।

“স্যা..স্যার এমনি। আমি যাই এখন?”

বলেই এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে যেই না পিছন ফিরে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে আকাশের ধারালো কণ্ঠ ধেয়ে এল।

“জাস্ট এ মিনিট। দাঁড়াও।”

নিমেষেই পা দুটো যেন মেঝেতে আটকে গেল বৃষ্টির। বুকের ভেতরের হার্টবিটটা এত জোরে চলছে যে সেটা তাকে রীতিমতো জ্বালিয়ে মারছে। আর সব থেকে বেশি জ্বালাচ্ছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই গম্ভীর পুরুষটা। কোনো রকমে নিজেকে শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল সে। মাথাটা যথারীতি নিচু রেখেই কাঁপা গলায় বলে।

“জ্বি বলুন স্যার?”

আকাশ কফির মগে আলতো একটা চুমুক দিল। চোখ জোড়া বৃষ্টির ওপর স্থির রেখে শান্ত কিন্তু কড়া গলায় বলে।

“কলেজে আমি তোমার বাবার নাম্বার চেয়েছিলাম, তখন তো দিলে না। এখন দাও।”

এবার আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রইল না বৃষ্টির। সহসা মাথা তুলে আকাশের চোখের দিকে তাকায়, তার পুরো মুখটা তখন চরম অসহায়ত্বে ভেসে গেছে। কাতর গলায় বলে।

“স্যার।”

আকাশ কফির মগটা ঠোঁটের কাছে ধরে রাখার ভান করে, বেশ ভাব নিয়ে এক ভ্রু উঁচিয়ে শুধায়।

“হুম বলো।”

বৃষ্টি এবার একদম বাচ্চাদের মতো দুই হাত জোড় করে অনুনয়-বিনয় করার সুরে বলে।

“মাফ করে দিন না প্লিজ। আর কখনো এমন ভুল হবে না, সত্যি বলছি। এখন থেকে প্রতিদিন একদম ঠিকঠাক পড়া শিখে যাবো।”

বৃষ্টির এই কচি বাচ্চাদের মতো ভয়ার্ত চেহারা দেখে মনে মনে বেশ মজা পেল পুরুষটি। কিন্তু বাস্তবে নিজের মুখের ভাব এক চুলও নড়তে দিল না সে। গলাটা যথাযথ গম্ভীর আর ভারী করে বলে।

“”দ্যাটস ট্রু।”?

বৃষ্টি জলদি জলদি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল, যেন এখনই মাথাটা কেটে পড়ে যাবে। আকাশের ঠোঁটের কোণে আবছা হাসির রেখা ফুটে উঠলেও সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কড়া গলায় বলে।

“ঠিক আছে, নাও ইউ মে গো। তবে নেক্সট টাইম পড়া না পারলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না, কথাটা জাস্ট মাথায় রেখো।”

একটা বড় ফাঁড়া কেটে গেল ভেবে বৃষ্টি মনে মনে হাফ ছাড়ে। আর তখনই অবচেতন মনে তার মুখ থেকে ফসকে বেরিয়ে যায়।

“ওকে হিটলার স্যার।”

কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই আকাশ রাগে চোখ দুটো বড় বড় করে তাকায়। চোয়াল শক্ত করে গর্জে ওঠে।

“হোয়াট। কি বললে তুমি?”

নিজের চরম বোকামিতে ঝট করে দাঁত দিয়ে জিভে কামড় দিল বৃষ্টি। আর এক মুহূর্ত দাঁড়ানো মানেই নির্ঘাত মরণ। সে ভয়ে সোজা দরজার দিকে দৌড় লাগাল। রুম থেকে বের হওয়ার জন্য দ্রুত পা বাড়াতে বাড়াতেই পেছন ফিরে চি-ৎ-কা-র করে কথাটা ছুড়ে দিয়ে পালাল।

“সরি স্যার। সত্যি কথা ভুলে মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে।”

_______________

দুদিন আগে গ্রামে মামাতো বোনের বিয়ে খেতে এসেছে ইশতিয়াক। প্রথম দুটো দিন বেশ ভালোই কাটছিল, হাসি-খুশি, আড্ডা আর পাড়া-পড়শি সকলের সাথে মিলেমিশে ভালোই আনন্দ করেছে সে। কিন্তু আজ হঠাৎ বিয়ের মোক্ষম দিনেই শোনা গেল মস্ত বড় এক দুঃসংবাদ আসল বর নাকি অন্য কোনো মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে গেছে। এই কথা ছড়াতেই চারপাশের প্রতিবেশী আর লোকজনের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল মেয়েটার জীবন নাকি এক নিমেষেই নষ্ট হয়ে গেল, কলঙ্ক লেগে গেল তার পবিত্র গায়ে।

এতকিছুর মাঝেও ইশতিয়াক অবশ্য একদম স্বাভাবিক। সে বাইরের উঠোনে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে, আয়েশ করে পায়ের ওপর পা তুলে নিজের মতো বুঁদ হয়ে ফোন চাপছে। চারপাশের এই কান্নাকাটি আর হট্টগোল যেন তাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করছে না, আশে পাশে যেন কিছুই হচ্ছে না।

হঠাৎ করেই সে খেয়াল করল, তার বাবা, মামা আর মা সবাই এসে একজোট হয়ে ঠিক তার সামনে থমকে দাঁড়িয়েছে। ইশতিয়াক সামান্য ভ্রু কুঁচকে সবার মুখের দিকে একবার তাকাল, কিন্তু পরক্ষণেই সেটাকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে আবার নিজের মতো করে ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু তার বাবা আর মামা যেভাবে একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে, তাতে বেশ বিরক্ত হয়েই ফোন থেকে চোখ তুলে সবার দিকে তাকাল সে।

“কি হয়েছে? সবাই আমার দিকে এভাবে হা করে তাকিয়ে আছো কেন?”

ইশতিয়াকের মামা আচমকা এগিয়ে এসে ইশতিয়াকের একটা হাত শক্ত করে ধরে ফেললেন। পরক্ষণেই হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে আকুতিভরা গলায় বলেন।

“ইশতিয়াক বাবা। বাঁচা আমায়। এই বুড়ো বয়সে তোর মামার সম্মানটা একটু বাঁচা বাবা।”

ইশতিয়াক চরম অবাক হয়ে নিজের চোখ দুটো বড় বড় করে বলে।

“আমি বাঁচাবো মানে? কি বলছেন কি মামা?”

ইশতিয়াকের মামা চোখের জল মুছতে মুছতে ভাঙা গলায় বলেন।

“আমার এই অসহায় মেয়েটাকে তুই বিয়ে কর বাবা। এই মুহূর্তে একমাত্র তুই-ই পারবি আমার মেয়েটাকে সমাজের বুকে কলঙ্কিত হওয়া থেকে উদ্ধার করতে।”

কথাটা শোনা মাত্রই ঝটকা দিয়ে মামার হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল ইশতিয়াক। বসা থেকে এক ঝটকায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বলে।

“অসম্ভব। এটা আমি কখনোই করতে পারবো না।”

ছেলের এমন সাফ জবাব শুনে ইশতিয়াকের মা এবার হন্তদন্ত হয়ে সামনে এগিয়ে এসে বলেন।

“কেন করতে পারবি না শুনি? সীমা কত ভালো মেয়ে, দেখতেও মাশাল্লাহ এত সুন্দর। ওকে বিয়ে করতে তোর সমস্যাটা কোথায়?”

মায়ের মুখে বিয়ের জোর জবরদস্তির কথা শুনতেই এক নিমিষে বুকের ভেতরটা তীব্র ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল ইশতিয়াকের। চোখের সামনে মুহূর্তে ভেসে উঠল রূপার সেই মায়াবী মুখখানা মেয়েটাকে সে যে নিজের অজান্তেই প্রচণ্ড রকম ভালোবেসে ফেলেছে। রূপাকে ছাড়া অন্য কোনো মেয়েকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে মেনে নেওয়া তার পক্ষে কোনো জন্মেই সম্ভব না। সে নিজের ভেতরের অস্থিরতা লুকিয়ে চোয়াল শক্ত করে বলে।

“তার আলাদা কোনো কারণ নেই মা। আমি এই বিয়ে কোনোভাবেই করতে পারবো না, ব্যস। তা ছাড়া আমার সীমাকে ওসব চোখে ভালো লাগে না।”

ছেলের মুখে সীমাকে অপছন্দের কথা শুনে এবার ইশতিয়াকের বাবা বেশ চড়া গলায় গম্ভীর মুখে বলেন।

“কেন ভালো লাগে না সীমাকে? মেয়েটা দেখতে মাশাল্লাহ এত সুন্দর, আচার-আচরণ, স্বভাব-চরিত্র সব দিক থেকেই কত ভালো।”

সবার এই একঘেয়ে জোরজবরদস্তিতে ইশতিয়াকের মাথার রগ যেন ছিঁড়ে গেল। সে তীব্র রাগে পাশে থাকা প্লাস্টিকের চেয়ারটায় সজোরে এক লাথি মেরে চেঁচিয়ে বলে।

“ব্যাপারটা ওরকম না। তোমরা সবাই মিলে আমার কথাটা বুঝতে পারছো না কেন? আমি সীমাকে কোনোভাবেই বিয়ে করতে পারবো না।”

ছেলের এমন ঔদ্ধত্য দেখে এবার ইশতিয়াকের মা উল্টো মারাত্মক রেগে আগুন হয়ে গেলেন। তিনি নিজের আঙুল উঁচিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলেন।

“ওকে তোকে বিয়ে করতেই হবে। তোকে আমি জন্ম দিয়েছি, তোর কোনো ফালতু ওজর-আপত্তি আমি শুনতে চাই না।”

মায়ের এমন একরোখা হুকুম শুনে ইশতিয়াকও নিজের জেদে অটল রইল। সে দুই হাত ছুড়ে সাফ জানিয়ে দিয়ে বলে।

“আমি করবো না বিয়ে। ব্যাস আর এক মিনিটও থাকবো না আমি এই জঘন্য জায়গায়।”

এই বলে ইশতিয়াক নিজের ব্যাগটা নেওয়ার জন্য আর ওখান থেকে চিরতরে চলে যাওয়ার জন্য হনহনিয়ে পা বাড়ায়। ছেলের এমন চলে যাওয়ার ভঙ্গি দেখে পেছন থেকে মা তার শেষ অস্ত্রটা ছুড়ে দিয়ে তী-ব্র চি-ৎ-কা-রে বলেন।

“তাহলে তুইও কান খুলে শুনে রাখ। আজ যদি তুই সীমাকে বিয়ে না করিস, তাহলে কালই সকালে তুই তোর মায়ের মরা মুখ দেখবি।”

রানিং….!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply