#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
(সূচনা পর্ব)
চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহ চলে, বাহিরে কাঠফাটা রোদ। বাসায় থেকেও যেন নিঃশ্বাস আঁটকে আসছে। রোদের তাপে বাহিরে তাকানোর মতো অবস্থা নেই৷ ১২ টা ৩৭ নাগাদ বাসায় ঢুকল লিফাত, ঘামে সারা শরীর চিকচিক করছে। মেইন গেইট পার হতেই শক্ত কিছুর সাথে হোঁচট খেল৷ সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ খারাপ হলো, চিৎকার করার আগেই ছুটে এলো নৌমি। পড়নের ওড়না দিয়ে শক্ত বক্সটা মুছতে মুছতে আদুরে কন্ঠে বলল,
” বাবু, লাগে নি তো তোমার? “
লিফাত কন্ঠে রাগ ঢেলে চেঁচাল,
“তোর বাবু রাখার জায়গা কি আর ছিল না?”
“চেঁচাচ্ছো কেনো? ২ ঘন্টা যাবৎ কারেন্ট নেই। এদিক দিয়ে বাতাস আসছে তাই তো বাবুর কোলে বসে ছিলাম।”
” ইচ্ছে করতেছে তোর বাবু সহ তোকে তোদের বাসায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আসি। সর সামনে থেকে।”
” আফসোস, তোমার ইচ্ছে ইচ্ছেই থেকে যাবে।”
এরমধ্যে লিফাতের আম্মু শরবত নিয়ে আসলেন। লিফাতকে দেখে শান্ত কন্ঠে শুধালেন,
“কিরে, তুই কখন এলি?”
“এইতো।”
লিফাতের আম্মু শরবত হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। শরবত কাকে দিবেন ঠিক বুঝতে পারছেন না। লিফাতের দিকে হাত বাড়াতে যাবে ওমনি নৌমি শরবত নিয়ে ঢকঢক করে অর্ধেক শেষ করে ফেলল। শরবত খেতে খেতে চোখ ঘুরিয়ে লিফাতের দিকে তাকালো। লিফাতের রাগী চোখ মুখ দেখে খাওয়া বন্ধ করে গ্লাস থেকে ঠোঁট সরালো। অর্ধেক গ্লাস শরবত লিফাতের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“খাবে?”
” তুই ই খা, খেতে খেতে এই বাড়ির সব খেয়ে ফেল৷ “
লিফাত রাগে গজগজ করতে করতে চলে যাচ্ছে৷ নৌমি শক্ত কন্ঠে বলে উঠল,
“আমি তোমার ভাগের কিছু খায় নি। লেবু দুটা বাসা থেকে নিয়ে আসছিলাম।”
লিফাত কিছু না বলেই রুমে চলে গেছে। লিফাতের মা লতিফা বেগম নৌমির দিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বললেন,
“ছেলেটা এত রোদের মধ্যে বাহির থেকে আসছে, শরবতটা ওকে দিয়ে দিলে তোর কি খুব ক্ষতি হয়ে যেত?”
“সকালে ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় তোমার ছেলেকে পেছন থেকে এত ডাকলাম অথচ ফিরেও তাকালো না৷ ভাব নিয়ে রিক্সা করে চলে গেল। সে বলেছে, আমাকে নিয়ে ভার্সিটিতে গেলে নাকি তার ইজ্জতে টান পড়ে। তাহলে এখন আমি কেনো শরবত দিব বলো?”
“তোরা কি বড় হচ্ছিস না? এখনও এভাবে লেগে থাকিস কেনো বল তো!”
” আমি নেহাৎ ই ভালো মেয়ে তারজন্য তোমার ছেলের অত্যাচার এতবছর ধরে সহ্য করে আসছি। নাহলে…”
“নাহলে কি?”
” কিছু না। শরবত বানিয়ে দাও, তোমার ছেলেকে দিয়ে আসি। “
“দাঁড়া, দিচ্ছি।”
নৌমি শরবতের গ্লাস হাতে নিয়ে লিফাতের রুমে আসছে। লিফাত ওয়াশরুমে, নৌমি শরবতের গ্লাস টেবিলের উপর রেখে লিফাতের ফোনের লক খুলে ইউটিউবে ভিডিও দেখছে। লিফাত গোসল শেষ করে বেড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে রাগী স্বরে বলল,
” তুই আবার আমার লক দেখে ফেলছিস?”
নৌমি নিঃশব্দে হেসে বলে উঠল,
” যে লক দিয়ে রাখতে পারো না, সেই লক কেনো দাও? আমরা আমরায় তো, আমাদের মাঝে এসব লকটকের আবার কি প্রয়োজন?”
” রাখ ফোন, আমার ফোনে আমার অনেক পার্সোনাল জিনিস আছে।”
” হু জানি, আছে তো গার্লফ্রেন্ডের সাথে ৫ টা ছবি তারমধ্যে ৩ টায় বেহুদা।”
” বাকি ২ টা তো ভালো!”
নৌমি হাসতে হাসতে বলল,
” কে বলেছে? বাকি ২ টাতে তোমাকে বিশ্রী লাগছিল, তাই ডিলিট করে ফেলছি।”
“কি?”
” হু, আবার ঘুরতে গেলে আমাকে নিয়ে যেও। গাছ, লতা-পাতার ফাঁক দিয়ে স্টাইলিশ ফটো তুলে দিব। “
” আজকের পর তুই ভুলেও আমার ফোন ধরবি না। “
” এই কথা আজ অব্দি কতবার বলেছো বলো তো? তার থেকে ভালো হয় আমাকে একটা এন্ড্রয়েড ফোন কিনে দেয়ার ব্যবস্থ করো। বিশ্বাস করো, তুমি আম্মুকে একবার বললেই আম্মু আব্বুকে বলবে। এটুকু উপকার করো, তাহলে তোমার ফোন বেশি ধরবো না।”
“কোনো প্রয়োজন নেই।”
নৌমি কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,
“তোমার দিলে কি দয়া হয় না?”
” না কারণ ফোন কিনে দিলে তুই ভন্ড হয়ে যাবি।”
” এখন মনে হয় খুব ভদ্র আছি!”
লিফাত চোখ রাঙাতেই নৌমি চুপ করে গেল। শরবতের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
” শরবত রেখে গেলাম, খেয়ে নিও।”
নৌমি দরজা পর্যন্ত যেতেই লিফাত ডাকল,
” শুন”
নৌমি চমকে উঠে জানতে চাইল,
“ফোন কিনে দিবা?”
“না।”
নৌমি মনমরা হয়ে বলল,
” তাহলে?”
“পরশু তোর হবু ভাবির জন্মদিন। সুন্দর একটা প্ল্যান দিস তাহলে তোকেও নিয়ে যাব।”
” ঠিক আছে। তুমি রিলাক্সে থাকো, কালকের মধ্যে সব প্ল্যান করে ফেলব। তবে আমার একটা শর্ত আছে।”
“কি শর্ত?”
“সন্ধ্যার পর শহীদ মিনার চত্বরে হালিম খাওয়াতে নিতে হবে। “
“কবে?”
“আজকেই।”
” ঠিক আছে, ডান।”
“ওকে।”
পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের তাপ কিছুটা কমতেই ছাদে গেল লিফাত৷ খুব মনোযোগ দিয়ে ফোনে কথা বলছে। মিনিট পাঁচেক বাদেই চঞ্চল পায়ে ছুটে আসলো নৌমি। পড়নে বেগুনি রঙের টিশার্ট,কালো রঙের স্কার্ট আর একটা ওড়না হিজাব। ছাদের এপাশ ওপাশ খোঁজে ছুটে গেল লিফাতের কাছে। নৌমি খুব জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে গুরুতর কন্ঠে বলে উঠল,
” তুমি ভাই প্রেম ই করো আর ঐদিকে তোমার বিয়ে ঠিক হয়ে যাচ্ছে। “
লিফাত ঘাড় ঘুরিয়ে নৌমিকে এক নজর দেখেই প্রশ্ন করল,
” আমার বিয়ে?”
“হ্যাঁ”
লিফাত সহসা কল কেটে দিয়েছে। কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“কার সাথে?”
“কার সাথে আবার আমার সাথে।”
লিফাত অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,
” তুই না করিস নি? বলিস নি আমার রিলেশন আছে?”
নৌমি একগাল হেসে বলল,
” ভাই, রিলেশন তোমার তাই মাথা ব্যথাও তোমার। আমাকে বাসার মানুষ জিজ্ঞেস করেছে, তোমাকে বিয়ে করতে আপত্তি আছে কি না, আমিও বলে দিয়েছি কোনো আপত্তি নেই। কারণ আমার বয়ফ্রেন্ডও নাই আর মাথা ব্যথাও নাই। “
“তাই বলে তুই আমাকে বিয়ে করবি?”
“না, মোটেই না। তোমাকে বিয়ে করতে আমার বয়েই গেছে। তুমি বাসায় চেঁচামেচি করবা, নিজে থেকে বিয়ে ভাঙবা। বাসায় তোমার রেপুটেশন খারাপ হবে এতে আমি পৈশাচিক আনন্দ পাবো। বুঝতে পেরেছো?”
“তোর মতো কাজিন কারো জীবনে না আসুক।”
“আর তোমার মতো কাজিন সবার জীবনে আসুক। এখন নিচে চলো, সবাই তোমাকে ডাকছে।”
“কেনো?”
” ওমা বললাম না, বিয়ের আলোচনা চলছে। তুমি ছাড়া এই আলোচনা শেষ হবে না তো।”
” আমি যদি আজকে ফাঁসি তাহলে তোর একদিন কি আমার যে কয়দিন লাগে। তোর হালিম খাওয়া আর সপ্তাহে সপ্তাহে ঘুরতে যাওয়া সব বন্ধ হয়ে যাবে। মনে থাকে যেন!”
নৌমি মেকি স্বরে বলল,
“আমাকে ভয় দেখাবেন না জনাব তামজিদ আকন্দ তাজ। কারণ ভুল করেও যদি আমার সাথে আপনার বিয়ে হয়ে যায় তাহলে আপনি আমাকে ঘুরতে নিয়ে যেতে বাধ্য। শুধু হালিম কেন রাত ৩ টায় তেহারি খেতে চাইলেও এনে দিতে বাধ্য থাকিবেন।”
” অসম্ভব। “
” অসম্ভব সম্ভব হওয়ার আগেই প্রতিবাদ করতে হবে, চলো। প্রতিবাদের ফাঁকে আমার মোবাইল টার কথা একটু বলো, প্লিজ।”
লিফাত আর নৌমি নিচে আসছে। ড্রয়িং রুমে নৌমির আব্বু-আম্মু, লিফাতের আব্বু- আম্মু, লিফাতের ছোট চাচ্চু, কাকিরাও উপস্থিত। লিফাতকে নামতে দেখে লিফাতের আব্বু শান্ত গলায় বললেন,
“কোথায় ছিলে?”
“ছাদে।”
” তোমার আর নৌমির বিয়ের বিষয়ে কথা বলছিলাম, ভাবলাম তোমাদের জানিয়ে রাখি। তোমার আপত্তি নেই তো?”
লিফাত আড়চোখে নৌমির দিকে তাকালো। নৌমি মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। লিফাতের আব্বু হৃদরোগে আক্রান্ত। জোরে কথা বলা কিংবা উত্তেজিত হওয়া বারণ। তাই লিফাত জোরগলায় কিছু বলতেও সাহস পায় না। লিফাত আব্বুর দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
” আমি এখনও বিয়ের কথা ভাবি নি, আব্বু।”
“তোমাকে ভাবতে বলেছে কে? বিয়ে তো এখনি দিচ্ছি না। আগে পড়াশোনা শেষ করো, চাকরি নেও তারপর না হয় বিয়ে হবে।”
“না মানে…”
” কি বলতে চাও? নৌমি কি সুন্দরী নয়?”
নৌমি সঙ্গে সঙ্গে তপ্ত দৃষ্টিতে তাকালো, চোখে সন্দেহ স্পষ্ট। লিফাত থতমত খেয়ে বলল,
“আমার ঘাড়ে কয়টা মাথা আছে যে নৌমিকে অসুন্দর বলবো। নৌমির মতো সুন্দরী মেয়ে বিশ্বে বিরল। কিন্ত কথা হলো, বিরল প্রজাতির প্রাণীর সঠিক যত্নের জন্য অন্যরকম পরিবেশ প্রয়োজন৷ তাই বলছিলাম….”
“তোমার আর কিছু বলতে হবে না। বিরল প্রজাতির আলোচনা তুমি তোমার ডিপার্টমেন্টে শেষ করে এসো। “
নৌমি বার বার চোখে ইশারা দিচ্ছে কিন্তু লিফাত কিছুই বলছে না। বিষয়টা নৌমির আব্বুর নজরে পড়তেই শান্ত গলায় বললেন,
“নৌমি অনেকদিন যাবৎ এন্ড্রয়েড ফোন চাইতেছে। দিব কি না ভাবতেছি। কি করা উচিত বলো তো!”
লিফাত সহসা শক্ত কন্ঠে বলে উঠল,
” শুধু শুধু ফোন দিতে হবে না। ও তো বেশিরভাগ সময় আমার ফোন ই ব্যবহার করে, ওর জন্য আমার ফোনের লক ই পরিবর্তন করি না। ওর যখন প্রয়োজন আমার ফোন ই ব্যবহার করতে পারবে। “
“আমারও তাই মনে হয়। ফোন দিলে অযথা ফোন ব্যবহার করে সময় নষ্ট করবে। “
“জ্বি।”
নৌমি মুখ ফুলিয়ে চেয়ে আছে, ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসছে। লিফাত ভ্রু নাচিয়ে জিভ বের করে ভেঙচি কাটলো। নৌমি ঠোঁট বেঁকিয়ে বিড়বিড় করে খানিকক্ষণ বকে সঙ্গে সঙ্গে বাসায় চলে গেল।
চলবে……
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২১(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৪
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২০+এক্সট্রা
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৫
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৪
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৫
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৩১
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১২
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৭