#পদ্মপ্রিয়া
#পর্ব_১৭
#ঈশিতা_রহমান_সানজিদা
অল্প বয়সে ছেলেরা তাড়াতাড়ি পথভ্রষ্ট হয়। খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ছোট বেলা থেকেই সিগারেট ধরে। প্রথমে ইচ্ছে না থাকলেও বন্ধুদের আবদার পূরণ করতেই হয়। অনুপমার ধারণা ছেলে তার খারাপ বন্ধুদের সঙ্গ পেয়েছে। এত বড় সাহস বাড়িতেও সিগারেট ধরিয়েছে। অনেক গালমন্দ করলেও ছেলের মুখ থেকে হ্যাঁ সূচক কথা বের করতে পারলো না। মুখটা গোমড়া করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। বেচারা অনুভব কাঁদো কাঁদো মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল। সত্যি কথা বললো আর মা বুঝল না! অন্যায় না করেও তার ভাগিদার হতে হচ্ছে। এটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। নূর এবার কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রাখে। অনুভব হতাশ হয়ে বলে,’আমি সিগারেট ধরি নাই কখনো ফুপি! আম্মু শুধু শুধু আমাকে বকাবকি করে গেল।’
আজমাঈনের বিষয়টা গোপন রাখাই শ্রেয়। এমন একটা বিষয় রাশেদ সাহেবের থেকেও লুকিয়ে যেতে হবে। বাড়িতে অশান্তি হোক নূর চায় না। সে অনুভবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,’আমি জানি তুমি এ কাজ কখনোই করবে না। তোমায় বিশ্বাস করি। কষ্ট পেও না, ভাবি কিছু বললে এরপর আমি কথা বলব।’
‘তোমার কথা আম্মু গোনায় ধরে? দাদু মণিও তো বিশ্বাস করবে। আব্বুকে বললে আমাকেই মারবে। ধুর, ভালো লাগে না কিছু।’
অনুভব দৌড়ে চলে গেল। নূর দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে কিছু বলতেও পারছেনা। রাশেদ সাহেব বাড়িতে নেই, তবে রেহানা তো আছে। তাকে বললে হয়তো বুঝতে পারবেন। অনুপমা কে কিছু তিনিই বলতে পারবেন। মা’কে কথাটা বলার জন্য নিচে নামে নূর। মায়ের রুমের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। ভেতর থেকে সাইমনের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এভাবে অন্যের কথা শোনা ঠিক নয়। এজন্য ফিরে যাচ্ছিল সে, হঠাৎ একটা কুরুচিপূর্ণ কথা কানে আসতেই সে থেমে গেল। মনে হল কি কথা হচ্ছে শোনা উচিত। বাড়িতে এমনিতেই কেউ থাকে না, নূর তো রুম থেকে বের হয়না। এজন্য ওরা তেমন সতর্ক হয়নি ও দরজা বন্ধ করেনি।
সাইমন বলছে,’আব্বুর বয়স হয়েছে, আর কতদিন বাঁচবে? আজ মরলে কাল দু’দিন, এখন এই ব্যবসা করার কি দরকার? নূরকে দেওয়ার ই বা দরকার কি? ওর আজ বাদে কাল বিয়ে হয়ে যাবে। বাড়ির সকলের দায়িত্ব তখন তো আমার নিতে হবে। এই বাড়ির সকলের খরচ মাসে কত তা কি জানে নূর? ওর হাতে এতকিছু দেওয়ার দরকার কি?’
রেহানা চুপচাপ ছেলের কথা শুনছেন। তিনি বলেন, ‘আমি কি বলব? তোর বাবার উপর কথা বলার সাধ্য আছে আমার? বলেছিলাম তোকে এবারের মত সাহায্য করতে। কিন্তু উনি মানা করে দিয়েছেন। বলেছেন তোর বউয়ের গয়না বিক্রি করে হলেও ধার শোধ করতে তাও উনি টাকা দেবেন না।’
সাইমনের মনে রাগ, মনটাও বেশ খারাপ। ব্যাংকের লোন শোধ করতে হবে। টাকা পাচ্ছে না কোথাও। শ্বশুর বাড়ি থেকে চাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তারা যদি বলে বাপের অনেক টাকা থাকতে তাদের কাছে কেন চাচ্ছে তখন কি হবে? বাবার কথা বললে মুখ থাকবে না। এজন্যই মা’কে বোঝাতে এসেছে সে। কিন্তু রেহানাও আশানুরূপ কোন আশা দিতে পারছে না। সাইমন বললো,’এখন যদি আব্বুর ভালো মন্দ কিছু হয়ে যায় কে দেখবে? আমাকেই তো দেখতে হবে? তোমার মেয়ে কি বোঝে? ওই রুমের মধ্যে বন্দি থেকে দুনিয়া কতটুকু বুঝেছে ও। আজ আব্বু আছে বলেই ব্যবসা করতে পারছে। উনি মারা যাওয়ার পর কি করবে? কে ওকে সামলাবে? আমি কখনোই ওর দিকে ফিরে দেখব না বলে দিলাম। এতে তুমি আমাকে যা খুশি বলতে পারো। বিয়ে দিলে মেয়েরা তোমাদের খোঁজ ও নিবে না। বড় মেয়েকে তো দেখেছ? স্বামীর পেছন পেছন ঘুরে। তোমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। সব দায়িত্ব আমার উপরে। এখন যদি আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাহলে আব্বুর ভালো মন্দ কিছু হলে তার দায়িত্ব নিতেও আমার ভাবতে হবে, নিব কি নিব না।’
নূর মুখে হাত চেপে ধরে। এটা ওর ভাই! ছিঃ ছিঃ, এতটা নিচে নেমে গেছে যে বাবার মৃত্যু কামনা করে! তার অসুস্থতার সুযোগ খোঁজে! এ কথা শোনার আগে ওর কান নষ্ট হয়ে গেলে ভালো হত বুঝি। আর মা, তিনিও ছেলের কথা মানছে! মা কি বোঝে না যে সাইমন স্বার্থ পাগল ছেলে। এর আগেও বেশ কয়েকবার লস খাওয়ার পর রাশেদ সাহেব টাকা দিয়েছেন। লোন শোধ করেছেন, প্রতিবার সাইমন আশা দিয়েছে যে এবার সে বাবার কথা মেনে চলবে। কিন্তু পরে আবার স্বরূপে ফিরে গেছে। কোন কথাই শোনেনি। এজন্য এবার রাগ করেছেন রাশেদ সাহেব। একেবারে জন্য এতদিনের পাশে থাকা ভুলে গেল সাইমন? রেহানা ব্যবসা সম্পর্কে জানে না বিধায় এসব বলছে। ছেলে তার কতবড় ধান্দাবাজ সেটা তো রাশেদ সাহেব ভালো করেই জানেন। এখন নূরের ব্যবসা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে নূরের ব্যবসায় ইনভেস্ট প্রথমে রাশেদ সাহেব করলেও এখন নূর সাবলম্বী হতে শুরু করেছে। মেধা থাকলে যেকোনো বয়সে সফলতা অর্জন করা সম্ভব। তবে বাবার সাপোর্টের কারণে আজ সে এখানে দাঁড়িয়ে। পরবর্তীতেও তার সাপোর্ট দরকার হবে। বিয়ের পর স্বামী পাশে না থাকলে নূর দাঁড়াতে পারবে না। তাই রাশেদ সাহেব তেমন পাত্র খুঁজছেন।
এবার নূরের ঘৃণা পেল খুব, ভাইয়ের কাছে একটু স্নেহ পাওয়ার আশায় তার কথায় শুধু মাথা নেড়েছে। তবুও সেই ভাই যদি মনের ভেতর এমন কিছু পোষণ করে রাখে তাহলে তার থেকে আর কিছুই আশা করা যায়না।
আবার সাইমনের গলার স্বর শোনা গেল,’এই ছেলের সাথে নূরের বিয়ে দিয়ে দাও, তাদের সাথে আমার সব কথা হয়ে গেছে। বিয়ের পর নূরকে ওরা বাইরের কোন কাজ করতে দিবে না। এখন আব্বুর কথায় হ্যাঁ বললেও বিয়ে হয়ে গেলে তো আব্বুর জোর থাকবে না। তখন ওরা যা বলবে তাই হবে।’
রেহানা বলেন,’সে যাই করে করুক, কিন্তু এমন কিছু করিস না যে বোনের ক্ষতি হয়। ও যেন স্বামীর সংসারে ভালো থাকে। মা হয়ে কোন ছেলে মেয়ে অসুখি হোক তা চাইব কিভাবে!’
‘চিন্তা করো না, ওদের পরিবার খুবই ভালো। নূরকে ভালো রাখবে। শুধু ব্যবসা করতে দিবে না এটুকুই।’
নূরের আর শোনার ইচ্ছা হলো না। রাগে দুঃখে নিজের রুমে ফিরে গেল। এরপর হয়তো তারা আরো জঘন্যতম কথাবার্তা বলবে। তা শোনার শক্তি নেই নূরের। এসব কথা গোপন রাখাও সম্ভব নয়। রাশেদ সাহেব ফিরলেই তাকে জানাতে হবে। তবে রাশেদ সাহেব এর এক কাঠি উপরে। তিনি বিকেলে ফিরলেন উকিল কে নিয়ে। আজ যা হবে তা সবার সামনে হবে। সাইমন, অনুপমা উপস্থিত। রেহানা বেগম সোফায় বসেছেন, স্বামীর মতিগতি তিনিও বুঝতে পারছেন না। নূরকে তলব করা হলো, বলা হল উকিল এসেছে এ যেন ড্রয়িং রুমে আসে। সুতি হিজাব টা মাথায় দিয়ে নিকাব বেঁধে সে নিচে এলো।
বাবার পাশে বসলো, রাশেদ সাহেব ক্লান্ত মুখেও হাসলেন নূরকে দেখে। বলেন,’আজ অনেক দৌড়াদৌড়ি করলাম, এখন তুই এর অবসান ঘটিয়ে দে। উকিল সাহেব দলিল টা দিন।’
মধ্যবয়স্ক উকিল তার ব্যাগ থেকে দলিল বের করে নূরের সামনে রাখে। কলম এগিয়ে দেয়। রাশেদ সাহেব মেয়েকে বলেন,’সাইন কর, তারপর থেকে রেহনুমা নূর ইন্টেরিয়র স্টুডিও কোম্পানি তোর হয়ে যাবে।’
বিষ্ময় বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল নূর, এত বড় কোম্পানির মালিক সে হবে! তাও এত তাড়াতাড়ি! সে বললো,’আমি এত দায়িত্ব সামলাতে পারব?’
‘ফারিন সবসময় তোর সাথে থাকবে। আরো অভিজ্ঞতা সম্পন্ন দু’জনকে নিয়োগ দিচ্ছি। তোর কোন অসুবিধা হবে না। বিজনেসম্যানের মেয়ে হয়ে ভয় পাওয়া চলে না রে মা।’
বাকি সবাই আঁতকে ওঠে, বিষয়টা তাদের হজম হয়না। সাইমন রেহানা বেগম কে ইশারা দিতেই সে বলে উঠলো,’তোমার মাথা ঠিক আছে? ছেলেকে রেখে মেয়েকে সব দিচ্ছো? ও ছোট মানুষ কি বুঝবে! কাউকে কখনো দেখেছ যে এই বয়সে এত বড় ব্যবসা দেখছে?’
রাশেদ সাহেব শান্তভাবে বলেন,’তুমি দেখনি তবে আমি অনেক দেখেছি, এই ডিজিটাল যুগে এসে মেয়েরা অল্প বয়সেও বড়বড় ব্যবসা করছে। তাছাড়া আমার মেয়ে একা নয়। আমি ওর সাথে আছি, যতদিন জীবিত আছি থাকব। ছেলের হয়ে সাফাই গাইতে আসবে না। আমি সবাইকে ডেকেছি আমার সিদ্ধান্ত জানাতে কারো অনুমতি নিতে নয়।’
রেহানা দমে গেলেন, সাইমনের কথা বলার সাহস হল না আর। নূর মায়ের দিকে তাকায়, চোখে চোখ পড়তেই রেহানা না করে তাকে। সে যেন এই ব্যবসা নিজের নামে না নেয়। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে নূর সাইন করে দেয়। উঠে দাঁড়িয়ে বলে,’অনেক ক্লান্ত তুমি আব্বু, আমি ঠান্ডা কিছু নিয়ে আসি।’ যাওয়ার পথে পা বাড়িয়েও সে থেমে গিয়ে রাশেদ সাহেব কে উদ্দেশ্য করে বলে,’আরেকটা কথা, তোমাদের দেখা ওই ছেলেকে আমি বিয়ে করব না। কেন, কি হয়েছে, এমন কোন প্রশ্নের জবাব ও দিব না।’
এই ধাক্কাটা রাশেদ সাহেব নিতে পারলেন না, ছোট মেয়ে এমন শক্ত গলায় কখনোই কথা বলেনি। বাড়ির সকলে যা বলে এসেছে বিনা বাক্যে তাই করে এসেছে। আজ নিজের জীবনের এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিলো! ভাবতেই অবাক লাগছে। তবে এতে তিনি খুশি, ভীষণ খুশি। মেয়েটা যদি এখন থেকে নিজের ভালো মন্দ বুঝে চলতে পারে তাহলে তো ভালোই হবে।
—————–
গত পনের দিন ধরে আজমাঈনের সাথে যোগাযোগ নেই ফয়েজের, ফোন দিলেও ধরে না। অস্বাভাবিক লাগলো বিষয় টা। এরই মাঝে আজমল শিকদার ফোনে জানালেন তার ছেলে অসুস্থ, ভীষণ রকমের অসুস্থ। এই খবর পেয়ে ফয়েজ কি বসে থাকার মানুষ? নারায়ণগঞ্জ থেকে ছুটে ঢাকায় চলে এসেছে। ফয়েজ কে দেখে আজমল শিকদার স্বস্তি পেলো। আদর করে সোফায় বসিয়ে বললো,’বসো বসো বাবা, ছেলেটার হঠাৎ করে কি যে হলো? কিচ্ছু খায়না, মনে হয় পানির উপরে বেঁচে আছে।’
এতটা করুন শোনালো যে ফয়েজ কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল। এত খারাপ অবস্থা অথচ আজমাঈন জানায়নি। খুব করে বকে দিতে হবে। জিজ্ঞেস করল, ‘ও কি রুমে আছে? যাই গিয়ে দেখে আসি।’
‘না না, ও তো হোটেলে গেছে। কাজ চলতেছে এখনও।’
ফয়েজের চোয়াল ঝুলে পড়লো, হা করে তাকিয়ে রইল আজমল শিকদারের দিকে। একটু আগেই ছেলের করুন অবস্থার বর্ণনা করছিলেন। একটা মানুষ এত অসুস্থ হলে তো বিছানায় পড়ে যাওয়ার কথা। পরবর্তীতে মনে পড়লো এতো আজমল শিকদার। তার কথা সিরিয়াসলি নেওয়ার মানেই নেই। আজমল শিকদার ছেলেকে ফোন করে বাসায় আসতে বলেন। ফয়েজ আসার কথা শুনে আজমাঈন চলে এলো। ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলে, ‘তুই এখন? আসবি বললি না তো?’
‘আমার ফোন ধরিস?’
তাহমিনা নাস্তা এনে টেবিলে সাজিয়ে বলেন,’তোর বাপ বলেছে ছেলে অসুস্থ অনেক ঠিকমতো ভাত খায়না এজন্য ও এসেছে তোকে দেখতে।’
বিরক্ত চোখে বাবার দিকে তাকায় আজমাঈন,’আমি অসুস্থ?’
ছেলের কথায় পাত্তা না দিয়ে আজমল শিকদার ফয়েজ কে বলে,’দেখো ওকে একবার ভালো করে, তাহলেই বুঝবা।’
ফয়েজ সত্যি সত্যি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে। আসলেই আজমাঈন কে অন্যরকম লাগছে। মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে, চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে যাচ্ছে কেমন। শরীর ভেঙ্গে গেছে, বোধহয় জিমে যায় না এখন। কেমন ছন্নছাড়া ভাব। ফয়েজ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে,’কি হয়েছে? আঙ্কেল তো ভুল কিছু বলেনি। তাছাড়া আমার ফোন ধরিস না, কিছু তো হয়েছে।’
বাপের দিকে কড়া নজর দিয়ে ফয়েজ কে নিয়ে রুমে ঢোকে আজমাঈন। হাতঘড়ি খুলতে খুলতে বলে, ‘দরজা লক করে দে, নাহলে আমার বাপ উঁকিঝুঁকি দিবে। কথা শোনার চেষ্টা করবে।’
ফয়েজ দরজা আটকে বলে,’শুনলে কি হবে?’
আজমাঈন জুতো খুলে বিছানায় বসলো, এসির টেম্পারেচার কমিয়ে দিয়ে শার্টের বোতাম তিনটা খুলে বসলো। বললো,’অনেক কিছু ঘটিয়ে ফেলেছি!’
ফয়েজ দূর থেকে বিন ব্যাগটা টেনে আনলো। পা ছড়িয়ে বসে বললো,’তা তো বুঝতে পারছি তোর চেহারা দেখে। কিন্তু কি করেছিস যে আঙ্কেল এভাবে ডেকে আনলো? আমি তো ভাবলাম কি না কি হয়েছে।’
‘আরে ধুর!! ওভারথিঙ্কিং ওনার যত। ভাত বেশি খেলেও সমস্যা আবার কম খেলেও সমস্যা। ওই ব্যাটার কথা ধরলে হবে না।’
‘তা বুঝলাম, কিন্তু কি করেছিস সেটা বল?’
তপ্ত শ্বাস ফেলে আজমাঈন। এখনও চোখ বন্ধ করলে সেই দিনের ঘটনা চোখের সামনে ভাসে। চোখ বন্ধ করে সে বলে,’আমি একজন কে দেখছি।’
‘কাকে?’
‘নূরকে।’
‘সে তো কাজের সময় কত দেখেছিস সেটা এভাবে বলার কি আছে?’
আজমাঈন দাঁতে দাঁত চেপে বলে,’আমি ওর চেহারা দেখছি।’
এতক্ষণে ফয়েজের হুশ ফিরল, বিন ব্যাগে গা এলিয়ে দিয়েছিল একেবারে। আজমাঈনের কথা শুনে লাফিয়ে উঠলো। ততক্ষণে আজমাঈন বিছানায় টান হয়ে শুয়ে পড়েছে। বন্ধুর নাড়ি নক্ষত্র জানা ওর। এই পরিবর্তনের কারণ ধরতেও পারলো। লাফিয়ে উঠলো খাটের উপর। আজমাঈন চোখ বন্ধ করে আছে। ফয়েজ ওর গালে হালকা চাপড় মেরে বলতে লাগলো,’এই, বেহুঁশ হয়ে পড়িস না। হুঁশে আয়, তুই কি ভাবতে পারছিস এর ফলাফল কি হতে পারে?’
আজমাঈন চোখ খোলে, উঠে বসে,’ধুর!! আমার সম্পূর্ণ হুঁশ আছে।’ পা তুলে বসে আরাম করে,’এখন হুঁশে থাকা অবস্থায় কি করা যায় তাই বল? মেয়েটা আমাকে খারাপ ভেবে বসে আছে বোধহয়!’
বন্ধুর এমন গা ছাড়া ভাব দেখে ফয়েজ বলে,’এতটা স্বাভাবিক আছিস কিভাবে? নূর তো দাদুকে সব বলে দিয়েছে বোধহয়।’
‘বলে দিলে এতদিনে আমার উপর এ্যাটাক শুরু হয়ে যেত।’
‘কিন্তু ওদিকে তো নূরের বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে!’
স্বাভাবিকতা কেটে গিয়ে কপালে ভাঁজ পড়ল আজমাঈনের। ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে রইল ফয়েজের দিকে। ফয়েজ বললো,’তুই সেদিন রাতে বেরিয়ে আসার পরের দিন নূরকে দেখতে এসেছিল। ছেলে পক্ষের পছন্দ হয়েছে।’
আজমাঈন হঠাৎ করেই ফয়েজের দু বাহু চেপে ধরল,’ছেলেটা দেখেছিল নূরকে?’
আজমাঈন এমন হুটহাট প্রশ্নে ফয়েজ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ছে বারবার। কন্ঠে নমনীয়তা এনে বলে,’তুই ঠিক আছিস?’
‘জবাব দে।’ বিরক্ত হয়ে শরীর ঝাঁকায় ফয়েজের। এবার মৃদু রাগ করে ফয়েজ বলে,’না রে বাল, ওই ছেলে দেখতে গিয়েছিল কিন্তু নূর কেঁদে কেটে অস্থির হয়ে গেল। তারপর কোন খবর তো পেলাম না। বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে কিনা তাও জানি না।’
হতাশ হয় আজমাঈন, সে কি করবে বুঝতে পারছে না। নিজে কি চায় তাও জানে না। আগের ন্যায় শুয়ে পড়ে সে। ফয়েজ শুকনো ঢোক গিলে বলে,’কি করতে চাস তুই?’
আজমাঈন উপুড় হয়ে শুয়ে বলে,’জানি না রে, শুধু এতটুকু বলতে পারি যে আমার ঘুম হচ্ছে না সেদিনের পর থেকে।’
ফয়েজ উঠে দাঁড়িয়ে বলে,’আমি সত্যি জানি না যে কি হবে, তবে আমি এর মধ্যে নেই।’
দরজা খুলতেই আজমল শিকদার হুড়মুড় করে ভেতরে ঢোকে। এতক্ষণ দরজায় আড়ি পেতেছিল কিন্তু ওদের কোন কথাই শুনতে পায়নি। ইশারায় ফয়েজকে প্রশ্ন করতেই সে বলে উঠলো,’আপনার ছেলেকে বিয়ে করিয়ে দিন আঙ্কেল। নাহলে এই অসুখ কমবে না।’
আজমল শিকদার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। আজমাঈন তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলে,’অসুখ না ছাই, বল নেশা। আমি নেশা করেছি।’
খেকিয়ে উঠেন আজমল শিকদার,’হারামজাদা!! তুই নেশা করা শুরু করেছিস। আজ তোর হাড়গোড় যদি না ভেঙেছি তাহলে আমি,,,,।’
আজমাঈন ফয়েজের পেছনে লুকিয়ে বলে,’তাহলে তুমি আমার খালু।’
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে একটু পর তিনি বলেন,’এক পাগল সামলাতে পারি না, তুই আরেক পাগল ঘাড়ে বসাতে চাচ্ছিস?’
কথাটা তাহমিনার কানে যায়, বড়বড় পা ফেলে এসে বলে,’আমি পাগল?’
‘তুমি না, তোমার বোনকে বলেছি।’
‘আমাকে বয়রা মনে হয় তোমার?’
আজমল শিকদার কথা ঘোরান। মিষ্টি সুরে বলেন, ‘ওসব ছাড়ো, তোমার ছেলে বিয়ে করতে চাইছে। এরকম নির্লজ্জ বেহায়া জীবনেও দেখিনি। বাপের কাছে এসে বলে বিয়ে করব।’
আজমাঈন বলে,’তুমি বিয়ে করার কথা আমাকে বলো নি তো কি হয়েছে আমি ঠিকই বলে নিচ্ছি।’
‘হতচ্ছাড়া তখন তোর জন্মই তো হয়নি। আগামী দুই বছরের মধ্যেও তোর বিয়ে দিব না। দেখি তুই কিভাবে বিয়ে করিস তাও একা একা।’
আজমাঈনের বিপদের সময়টা তাহমিনা বুঝলো। সে স্বামীর বিরোধীতা করে বললো,’তুমি বিয়ে দেওয়ার কে হ্যাঁ? আমি আমার ছেলের বিয়ে দিব। আমার বান্ধবীর মেয়েকে পছন্দ করে রেখেছি। কি মিষ্টি মেয়েটা, আমার তো ভারি পছন্দ।’ আজমাঈনের দিকে তাকিয়ে বলেন,’খুব শিঘ্রই রিং পড়িয়ে আসব। তুই সময় বের করে রাখ।’
তাহমিনা রান্না নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বেচারা আজমাঈন নদী থেকে উঠে সমুদ্রে পড়লো এবার। মাথার ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল। ফয়েজ তা দেখে উচ্চস্বরে হাসতে লাগলো। আসলো রোগি দেখতে, এখন চোখের সামনে আরো বেশি রোগি হয়ে যাচ্ছে আজমাঈন। আজমল শিকদার লুঙ্গি উঁচু করে ধরে চলে গেছেন।
ফয়েজ বলে,’মাথা থেকে ওসব চিন্তা বাদ দে, আন্টি যা করবেন ভালোর জন্য করবেন। যে ভাবনা এসেছে তোর মাথায় তা পূরণ হওয়া অসম্ভব।’
আজমাঈন গভীর শ্বাস ফেলে বলে,’একটু শান্তি চাচ্ছি আপাতত, প্লিজ হেল্প মি।’
চলবে,,,,,,
Share On:
TAGS: ঈশিতা রহমান সানজিদা, পদ্মপ্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১০
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১২
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৮
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৩
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৮
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৪
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৯
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৬
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৪
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৭