Golpo ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ ডিফেন্স রিলেটেড

ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ২২


লেখনীতে_সাদিয়া

পর্ব_২২

সবাই রেসপন্স করবেন।
শহরের পিচ ঢালা রাস্তায় হিমেল হাওয়ার সাথে সাথে বাইক চলছে। ভিহান ভাই বাইপাস রাস্তা ধরেছে হয়তো। খোলামেলা রাস্তা। যতদূর চোখ যায় সব ফাঁকা দেখতে পায়। থেমে থেমে ফসলের মাঠ আর গাছপালা দেখা যাচ্ছে। এমন নিরিবিলি রাস্তায় শান্ত পরিবেশে বাইকে বসে ঘুরার খুব ইচ্ছে ছিলো রাহার। অবশেষে ভিহান ভাই এর জন্যে পূরণ তো হলো? ইশশ রাগ করে যদি না আসতো? তাহলে কি এই মজার সময়টা উপভোগ করতে পারতো? কখনোই না। আর বড় কথা হলো লোভী রাহা কি রাগ করেও না আসতো? যে ভেবেছে রাহা রাগ করে না আসতে পারে আসলে সে একটা গাধা। খান বাড়ির মেয়ে সে সহজে কি হার মানা যায়?

রাহা আড়চোখে একবার ভিহান ভাই এর সাদা শার্ট পরা আটশাট হওয়া প্রস্থ পিঠের দিকে তাকালো। ওই বিশাল দেহী লোকটার কাঁধে তার ছোট্ট ফর্শা হাতটা যেন মোমের মতো গলে যাচ্ছে। চারপাশ দিয়ে মৃদুমন্দর বাতাস এসে গায়ে লাগছে। নাসারন্ধ্রে ফুরফুর করে ঢুকছে ভিহান ভাই এর শরীর থেকে আসা চন্দন আর সাফরানের ঘ্রাণ। ইশশ ভিহান ভাই এর গা থেকে ভেসে আসা এই মাতাল করা সুঘ্রাণ টা নিলেই আর অন্তঃকরণ উত্থলিত হয় বারবার। মস্তিষ্ক কেমন বশ হয়ে যেতে চায় এই সুঘ্রাণে। নিজেকে কেমন যেন মাতাল মাতাল লাগে। এত কাছ থেকে ভিহান ভাই এর শরীরের ঘ্রাণ রাহা কে অস্থির পাগল করে তুলছিলো। মেয়েটা চোখ বন্ধ করে নাক টেনে বুক ভরে যেন নিশ্বাসের সাথে সেই সুভাস চুষে নিচ্ছে।

গাড়ির লুকিং গ্লাসে ভিহান একটু পরপরই দেখছে নিজ প্রেয়সী কে। এলোমেলো হয়ে রাহার চুল গুলি উড়ছে। থেকে থেকেই মেয়েটা চোখ বন্ধ করে নাক টানছে। বিষয়টা সবটাই ভিহানের জানা। মেয়েটা কেন এমন করছে তাও সে জানে। ভিহান এক গালে খানিক হাসলো।

ক্ষীণ সুরে পিছন থেকে ডাকল রাহা, “ভিহান ভাই?”

ঝট করে ভিহান গাড়ি রানিং রেখে তাকালো গ্লাসের দিকে। মনে সন্দেহ হলো, মেয়েটা কি অস্বস্তি অনুভব করছে? ওর কি খারাপ লাগছে? দ্রুত বেগে প্রশ্ন করল ভিহান,

“কি হয়েছে? গাড়ি থামাবো?”

“না না গাড়ি থামাতে হবে না।”

“তবে?”

রাহা জবাব না দিয়ে একটু সময় নিলো। ভিহান মিররে তাকিয়ে দেখল মেয়েটা নিজের উড়ন্ত চুল গুলিকে কানের পিছনে গুঁজে দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করলো।

“কি হয়েছে ইডিয়েট বল?”

ফুরফুরে মেজাজটা মুহূর্তে কেমন বদলে গেলো রাহার। বিরক্তিতে মুখটা খানিক কুঁচকালো সে। নাক মুখ উপরে তুলে বলল, “আপনি এত রসকষহীন কেন ভিহান ভাই? আমার সাথে একটু ভালো করে কথা বলতে পারেন না?”

ভিহান আয়নায় তাকিয়ে দেখলো রাহা কে। ওর বিরক্তির রেশ দেখে খানিক হাসলো ও নিঃশব্দে। পরক্ষণে জবাব দিলো খসখসে গলায়, “তোর মতো বানর কে বেশি লাই দিতে নেই।”

রাহা আরো বিরক্ত হলো। রাগে মুখ ফুলিয়ে কটমট করলো ও। ওর বিরক্তমাখা রঙ্গিম মুখ দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসলোও ভিহান। কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর বলল সে,

“কিরে বল কি বলবি?”

রাহা মুখ ভেংচায়। ভিহান সেটা দেখে নিঃশব্দে। মেয়েটা অভিমান নিয়ে মুখ ফিরিয়ে উত্তর দিলো, “বলবো না।”

“ওকে ফাইন।”
দায়সারা জবাব দিয়ে ভিহান ভাই আবারও চুপ হয়ে যায়।

আরো কিছুদূর যাওয়ার পর রুষ্ট হয়ে রাহা বলল আবারও, “ও ভিহান ভাই? আপনি কি আসলেই শুনবেন না?”

আয়নায় রাহার চোখমুখ আর ওর কর্ম দেখে পেট ফেটে হাসি পেলো ওর। নিজেই অভিমান করলো আবার নিজেই সেধে এসে জানাতে পাগল হয়ে ওঠল। মেয়েটা আসলেই তারছেড়া। ওর স্বভাবই এমন। কিছু বলতে চেয়েছে আর সেটা হজম করতে পারবে এটা ওকে নিয়ে ভাবাই অসম্ভব।

ভিহান ভাই কে জবাব দিতে না দেখে রাহা একটু ওর হাতটা শক্ত করে ধরে কাঁধ প্রায় ঝাঁকানোর মতো করে ডাকল।

“ভিহান ভাই, শুনছেন আমার কথা?”

ভিহান ঠোঁট কামড়ে নিজের হাসি সংবরত করতে করতে বলল,

“শুনছি।”

কানের পিছনে অবাধ্য চুল গুলিকে আবারও সরিয়ে দিতে চাইলো রাহা। উপরন্তু দমকা হাওয়ায় সেই চুল আবারও বাঁধনহারা হয়ে এলোমেলো হলো।

সেদিক পানে ধীর চোখে তাকিয়ে নিজ মনে আওড়ালো ভিহান,
“রাহা, তোর প্রতি আমার সীমাহীন অনুভূতি তোর ওই অবাধ্য চুলের চেয়েও অধিক উশৃঙ্খল, ছন্নছাড়া, উন্মাদ।”

“ভিহান ভাই আপনি কোন পারফিউম ইউস করেন?”
রাহার হঠাৎ প্রশ্নে ভ্রম কাটে ভিহানের। গলার স্বর শক্ত রেখে প্রশ্ন করে,

“কেন?”

“এমনি। জানতে ইচ্ছা হচ্ছে একটু মিকটু। বলুন না প্লিজ।”

“আমি কি একটা পারফিউম ইউস করি?”

থমকালো রাহা। কপাল কুঁচকে চিন্তা করতেই মনঃস্পটে ভিহান ভাই এর ভেনেটি টা ভেসে ওঠল। যেখানে হরেক রকম নাম না জানা পারফিউমের কালেকশন আছে। চিন্তিত ভঙ্গিতে জবাব দিলো রাহা,

“না। অনেক গুলি। সেগুলি নিশ্চয়ই অনেক দামী?”

“হতে পারে।”

“কত হবে একেকটা?”

“তুই কি এখন আমার পারফিউমের হিসাবের খাতা খুলে নিয়ে বসেছিস স্টুপিড?”

পিছন থেকে রাহা মুখ ভেংচায়। চটপট গলায় বলে, “ঠিক আছে বলতে হবে না আগে বলুন আপনি কোন পারফিউম টা ব্যবহার করেন?”

“সব গুলো।”

“আরে না। ওই যে আপনার গা থেকে ভেসে আসা সাফরান আর চন্দন চন্দন একটা সুভাস লাগে না? ওটা.. ওটা কোন পারফিউম ভিহান ভাই?”

“তোর জানতে হবে কেন?”

“জানলে দোষ আছে? আমি তো আপনার পারফিউম নিয়ে নিচ্ছি না।”

“অফকোর্স দোষ আছে। কারণ তোর কোনো কিছু ভালো লাগা মানেই আমার রুম থেকে সেটা গায়েব হয়ে যাওয়া।”

চোখ দুটি বড়বড় করে চিৎকার করে ওঠল রাহা, “মানে আপনি আমাকে ইনডিরেক্টলি চোর বলছেন ভিহান ভাই?”

“উঁহু। ডিরেক্টলি বলছি।”

“কি বললেন আপনি? এত বড় কথা? আপনি আমায় চোর বলছেন? যাবো না আমি আপনার সাথে। গাড়ি থামান। আমি বাড়ি গিয়ে বড়বাবার কাছে বিচার দিবো। আপনি আমাকে অপমান করেছেন এটা রাহা মেনে নিবে ভেবেছেন? কিছুতেই না।”

রাহা একাই বকবক করতে লাগলো পিছন থেকে। মুখটা মেয়েটার ফুলে আছে। খানিক লাল আভাও ছড়াচ্ছে। থেকে থেকে ভিহান সে রাগান্বিত মুখের পানে তাকিয়ে নীরবে নিঃশব্দে মিটিমিটি করে হাসছে।

মনে মনে আওড়ায়, “আমার ফুলকো লাল টমেটো টা।”

গাড়ির ভেতর গান চলছে। সামি রাফি হইহই করছে। রুশমিও প্রফুল্ল চিত্তে বসে আছে। রাগে আগুন হয়ে আছে শুধু একটা মানুষ। তার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসতে হাসতে জিদান গাড়িতে চলা গানের সাথে নিজেও ঠোঁট মিলাচ্ছে।

এতক্ষণ নীরবে ওদের সব কিছু মেনে নিলেও কামিলি আর চুপ করে থাকতে পারলো না। সে চিৎকার করে বলল,

“সবাই চুপ করোওওও।”

কামিলির চিৎকারে সামি রাফি চুপ হয়ে গেলো। সেই সাথে জিদানও গানের সাথে তাল মিলিয়ে চলা ঠোঁট বন্ধ করে ফেলল। গাড়িতে গান ছাড়া আর ওদের সবার নিশ্বাস ছাড়া কোনো শব্দ হলো না।

কামিলি রাগান্বিত ভাবে শীতল গলায় বলল, “গান অফ করো জিদান ভাই।”

জিদান শুনলো না সে কথা। ত্যাড়া ছেলেটা সটান বসে থেকে সামনে তাকিয়ে স্টেয়ারিং ঘুরাতে লাগল। এই পর্যায়ে কামিলি বিকট এক চিৎকার করলো আবারও।

“গান টা অফ করোওওওও।”

জিদান বিরক্তির সাথে তাকালো কামিলির পানে। ঠোঁট নাড়িয়ে বিরবির করে “শাঁকচুন্নি” বলতে বলতে গানটা অফ করে দিয়ে আবারও চুপ হলো।
রাগে কামিলি ফোঁসফোঁস করছে। যেন এখুনি সবাই কে রাগে উড়িয়ে দিবে গাড়ি সহ। জিদান মুখ ভেংচায়।

“তুমি মিথ্যে বললে কেন আমাকে জিদান ভাই?”

জিদান কোনো জবাব দিচ্ছে না দেখে কামিলি আবারও চিৎকার করে। এই পর্যায়ে রুশমি ধমকে ওঠে ওকে।

“তুই ভাইয়ার উপর চিল্লাছিস কেন কামিলি? এটা কোন ধরনের অভদ্রতা।”

কামিলির চোখ টলমল।

“আর উনি যে আমায় মিথ্যে বলল?”

“কি মিথ্যে বলেছে?”

“তুমি সত্যি জানো না রুশমি আপু?”

“না জানি না বল আমায়।”

কামিলি জিদান ভাই এর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো, “আমাকে জবাব দাও জিদান ভাই। আমাকে মিথ্যে বললে কেন?”

“…

“কি হলো উত্তর দাও।”

“চুপ কর কামরাঙা।”

“আমাকে ওই নামে ডাকবে না কিন্তু।”

“একশো একবার ডাকবো। হাজারবার ডাকবো। তোর শুনতে ইচ্ছা না হলে বের হয়ে যা। কি দরজা খুলে দিবো? একটা কিক দিলেই হবে।”

রাগে কামিলি এবার সইতে না পেরে জিদান ভাই কে এলোপাথাড়ি কয়েকটা কিল দিতে থাকে। রুশমি সহ সামি রাফি সবাই অবাক। রুশমির ধমকে কামিলি শান্ত হয়। চেঁচিয়ে বলে ওঠে জিদান,

“কামরাঙ্গার বাচ্চা তোকে এবার সত্যি সত্যি লাত্থি দিয়ে গাড়ি থেকে বের করে দিবো।”

লাল লাল চোখে কামিলি জবাব দেয়, “তুমি একটা শয়তান। আস্তো একটা গরিলা। তোমাকে পারলে আমি চিবিয়ে খেয়ে ফেলতাম জিদান ভাই।”

“তুই কইলেই হইলো নাকি? আমি জব্বর মাল আছি ভায়া। যেন তেন মানুষের কাছে আমি নিজেকে বিলিয়ে দিবো না খাওয়ার জন্যে।”

ফাজিল ভাই এর এমন কথায় লজ্জায় রুশমি আর টু শব্দ করেনি। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এই দুইটা যা ইচ্ছা করুক। পারলে গাড়িতে চুল টানাটানি করে ছিঁড়ে ফেলুক তাতে তার আর কিছুই যায় আসে না। দুটোই ফাজিল।

কামিলি রাগে নাক কাঁপালো। কিন্তু পুরো রাস্তায় আর একটাও কথা বলল না। শুধু ফোঁসফোঁস করে গেলো। তার সমস্ত আশা এই লোকটা পানি করে দিলো। জিদানও গান ছেড়ে আবারও আগের মতো স্বাভাবিক ভাবে নেচে নেচে গাড়ি চালাতে লাগলো।

নীরব ছিমছাম সুন্দর একটা রেস্টুরেন্টের সামনে এসে গাড়ি থামালো ভিহান। নিজ শহর থেকে অনেকটা দূরে এই রেস্টুরেন্ট টা বড্ড পছন্দ হলো রাহার। সে অবাক আর মুগ্ধ চোখে দেখতে লাগল চারপাশ। ভিহান বাইকটা সাইড করে রেখে এসে ওর সামনে দাঁড়ালো। তখন জিজ্ঞেস করলো রাহা,

“ওরা কোথায়?”

ভ্রু সরু করলো ভিহান। নিজ ভাবে ফোন টিপতে লাগল। গটগট হাতে কিছু করছে হয়তো। ভিহান ভাই কে চুপ থাকতে দেখে রাহা প্রশ্ন করলো আবারও,

“কি হলো? ওরা কোথায়?”

“দেখছি তো ইডিয়েট। সর্বক্ষণ মুখটা পকপক করতেই থাকে।”
সামান্য ধমকে চুপসে গেলো মেয়েটা। গাল ফুলিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। আর কথায় বলবে না এই জল্লাদ টার সাথে। ভিহান চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল ওর মুখাবরণ।

“জিদানের ফোন বন্ধ।”

রাহা পাশ ফিরে তাকালো। চিন্তিত মুখে প্রশ্ন করল, “বন্ধ মানে? ওরা কি এখনো আসেনি?”

“সেটা আমি কি করে জানবো? ওরা হয়তো কোথাও লেইট করছে কিংবা নিজেদের পছন্দের কোনো জায়গায় ওঠেছে।”

“মানে? কি বলছেন আপনি এসব? ওরা নিজেদের পছন্দের জায়গায় কেন ওঠবে ভিহান ভাই? আমরা না সবাই এক সাথে ঘুরতে এলাম? আপনি কি ওদের ঠিকানাটা ঠিকঠাক পাঠান নি?”

“….

“কি হলো ভিহান ভাই? আপনি চুপ করে আছেন কেন? ওরা ঠিকানা জানলে এত লেইট করার তো কথা না। তাহলে আসছে না কেন এখনো?”

“শাট আপ ইডিয়েট।”

রাহা একটু নড়ে ওঠল। বিরক্তের মুখে তাকালো ভিহান ভাই এর দিকে। আড়ালে মুখ ভেংচালো। এদিকে ভিহান ফোনে কি করছে আর এক টানা কল দিচ্ছে কাউকে।

রাহা কিছু সময় চুপ থাকে। নিজের ফোনটা নিয়ে আসলে কি এত বলতে হতো এই জাঁদরেল টাকে? গলা তো নয় যেন তলোয়ার। সব কিছু যেন ফালাফালা করে দেওয়ার জন্যে সদা প্রস্তুত। ওর মুখে চিন্তা। কোথায় ওরা? এক সাথে একটু মজা করবে ভেবে প্ল্যান করলো অথচ ঘোড়ারডিম কিছুই হচ্ছে না। আড়চোখে ভিহান ভাই কে দেখে আবারও মিনমিন গলায় বলল, “আপনি রুশমি আপুকে একটা ফোন দিন না।”

কাছুমাছু মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা রাহার পানে এক পলক দৃষ্টি দিয়ে ধারাজ গলায় জবাব দিলো সে, “ওদের কারো ফোনে কল যাচ্ছে না। হয়তো নেটওয়ার্ক পাচ্ছে না। তুই চল।”
নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে ভিহান ভাই ওর ফর্শা চিকণ কব্জি ধরল। মৃদু স্বরে “কাম” বলতে বলতে টেনে নিয়ে গেল ভেতরে। রাহা বিমোহিত আবেশিত নয়নে অপলক দেখল ওর হাত চেঁপে ধরা ভিহান ভাই এর বড়সড় হাতটা।

একটা বিশাল রেস্টুরেন্টের সামনে এসে জিদান গাড়ি থামালো। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। পুরো রিসোর্টের একটা ভাইব দিচ্ছে। সবাই যখন রিসোর্টের মুগ্ধতা দেখতে ব্যস্ত কামিলি বলল তখন,

“ভিহান ভাই রাহা কোথায়?”

ততক্ষণে রুশমিরও খেয়াল হলো।
“হ্যাঁ তাই তো। ভাইয়া, বড় ভাইয়া কোথায়? ওরা কি আগে চলে এসেছে?”

সূক্ষ্ম চোখে জিদান ওদের সবাই কে একবার দেখে নিয়ে ভীষণ সিরিয়াস ভঙ্গিতে গলা কাঁশল সবসময় ফান মুডে থাকা ছেলেটা। বুকটা উঁচু করে দিয়ে নিজের স্বাভাবিক চিত্তে বলল, “বুঝতে পারছি না তো। এতক্ষণে তো চলে আসার কথা।”

কামিলি রুক্ষ মুখে বলল, “ওদের একটা ফোন দাও।”

জিদান হঠাৎ খেপাটে ভঙ্গিমায় নিচের ঠোঁটটা উপরের দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে চোখ রাঙ্গালো কামিলির দিকে। এতে অবশ্য কামিলি পাত্তা দিলো না। মুখ মুচড়ে সামনের চুল গুলিকে নাটকীয়তার সাথে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে পিছনে ঠেলে দিলো। পাল্লা দিয়ে জিদানও মেয়েদের মতো দ্বিগুণ তেজ নিয়ে ভেংচি কাটলো। ওর এমন ভাব দেখে কামিলি রাগে লাল হলেও রুশমি না পারতে হেসে ওঠল ঠোঁট চেঁপে।

রাফি উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল, “জিদান ভাই তোমাকে হেব্বি লেগেছে।”

“থাপড়ে কান লাল হয়ে ফেলবো বেয়াদব চুপ কর।”

কামিলির ধমকে রাফি বড় ভাই এর পিছনে গিয়ে লুকালো। রুশমি নরম সুরে বলল, “আহ, কামিলি ওকে এখানে ধমকাচ্ছিস কেন? লোকে কি বলবে?”

“আর ও যে..”

কামিলির কথা শেষ হওয়ার আগেই জিদান ওর পিছনে লুকানো রাফিকে টেনে নিয়ে বলল, “ও তো শাঁকচুন্নি। পারবে শুধু ছোটদের সাথে। আমার ছোট্ট বিচ্ছু কে কিছু করবে কোন শালা?”

“দেখলে আপু?”

জিদান গলা বাড়িয়ে বলল, “আরে ওই ধইনছা কি দেখবে? তুই রাফির সাথে লাগছে যাস ক্যান? পারলে আমার সাথে পাঙ্গা নে। আয়..”

বলতে বলতে জিদান নিজের স্কাই ব্লু শার্টের গোটানো হাতাটা আরেকটু উপরে তুলতে তুলতে প্রায় তেড়ে গেলো। ওকে রুশমি থামিয়ে বলল, “হচ্ছে টা কি ছোট ভাইয়া? তুমি কি ওর মতো ছেলেমানুষি করা শুরু করলে নাকি?”

“মাঝেমাঝে মনডা চায় ওরে মাথায় উপর তুইল্লা একটা আছাড় দিয়া ভর্তা বানাই ফেলি।”

কামিলি অনেক কষ্টে নিজের ধৈর্য ধরে বলল, “আপু উনাকে থামতে বলো কিন্তু।”

“ওই ছেমড়ি চুপ থাক। তোর মুখে আমি স্টেপলার মারমু।”

“তোমাকে আমি কুচিকাটা করবো জিদান ভাই।”

“আর তোকে আমি বুড়িগঙ্গায় চুবামু।”

“আমাকে বুড়িগঙ্গায় নিয়ে গেলে কি আমি তোমাকে ছাড়া যাবো? তোমাকে ওখানে নিয়ে গিয়ে কুত্তার গু খাওয়াবো জিদান ভাই।”

“তোরে..”

জিদান রাগী ভাবে আশেপাশে কিছু খুঁজছিলো হয়তো কামিলিকে মেরে দিবে বলে। তা দেখে সামি রাফি মজা পেয়ে মুখে হাত দিয়ে হাসলেও রুশমি বিরক্ত বোধ করল।

“ধূর। ভালোই লাগে না। কোথায় ঘুরতে এলাম একটু মজা করতে কিন্তু সেই অশান্তিই লেগে আছে কপালে।”

অবশেষে রুশমি জিদান কে থামিয়ে দিয়ে শান্ত ভাবে বলল, “ভাইয়া কে কল দাও।”

“ভাইয়ার ফোন বন্ধ।”

রুশমি অবাক হলো। কামিলি পাশ থেকে তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “তুমি রাহা কে একটা কল দাও আপু।”

কামিলির কথায় সেটা করলো রুশমি। কিন্তু তাতে আশাহত হলো সে। কারণ ফোনটা ধরেছে মেজোমা। রাহা নাকি ফোন বাড়িতে ফেলে গিয়েছে। ওরা দুজন কোথায় আছে সেই চিন্তা সবার মাঝে দেখা গেলো। রাফি এতসব মাথায় না নিয়ে সে আশপাশ দেখতে লাগল। ভাই কে বারবার বলছিলো ভেতরে যেতে। এদিকে জিদান নির্বিকার ভাবে ফোন টিপে যাচ্ছে। যেন এসবে তার কোনো হেলদোল নেই।

রাগে কামিলির শরীর জ্বলে যাচ্ছে। রাহার প্রতিও রাগ লাগছে অদ্ভুত ভাবে। সবচেয়ে বেশি রাগ হচ্ছে এই গরিলাটার উপর। পাড়ছে না শুধু চিৎকার করে কাঁদতে। তারউপর ফোনে চার্জ নেই তাই অফ হয়ে গিয়েছে।

কামিলি রুশমি কে বলল, “আপু তুমি একটা কল দাও তো ভিহান ভাই কে।”

রুশমি সেটাই করতে গেলো। জিদান তাচ্ছিল্য করে বলল, “হ্যাঁ দে দে।”

রুশমি কল দিলো অথচ ভাইয়ের ফোন সত্যি অফ পেলো। সবাই বড্ড চিন্তিত আর আশাহত হলো। অবশেষে জিদান বলল, “এত দূর এসেছি কি ওদের জন্যে এভাবেই ফিরে যাবো নাকি? ভাইয়া জাহান্নামে যাক। চল আমরা একটু ভেতরটা ঘুরে কিছু ভোজন করে আসি।”

শেষে সবাই এটাই করলো। কামিলির মুখটা দেখার মতো হলো। ও না পরতে ওদের সাথে ভেতরে গেলো। মুখটা বড্ড কালো হয়ে ছিলো মেয়েটার। কিন্তু ওর চুপসে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে জিদান মজা পেয়ে হাসলো। নিজেই নিজেকে সাধুবাদ দিয়ে বলল,

“ইউ আর গ্রেট জিদান। তুই সেরা রে।”
সবশেষে ডান হাতের পাঁচ আঙ্গুল একত্রে করে বড়সড় একটা চুম্মা খেলো নিজেকে নিজেই।

খুব শান্তশিষ্ট পরিবেশ রেস্টুরেন্টের ভেতরে। একটা শীতল স্নিগ্ধ ভাবও আছে। রাহা অবাক চোখ নিয়ে আশপাশ দেখছে। এক কোণার একটা টেবিলে ভিহান ভাই আর ও মুখোমুখি বসে আছে। খাবারের অপেক্ষা করছে। সে আশপাশ দেখছিলো। অথচ লোকটা ফোন টিপায় ব্যস্ত ছিল। ইশশ ভুল করে ওর ফোনটা রেখে এসেছে বাসায় নয়তো কত গুলি পিকচার তুলা যেতো।

অনেকটা জড়তা নিয়ে লঘু আওয়াজে ডাকলো রাহা,

“ভিহান ভাই?”

ওর ডাকে ভিহান মুখ ফুটে কোনো জবাব দিলো না। যেভাবে বসে ছিল ঠিক সেভাবে বসেই এক চুল না নড়েই কেবল চোখ দুটি উপরে তুলে রাহার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। যার মানে, “বল শুনছি।”

বিষয়টা ধরতে পেরে রাহা নড়েচড়ে বসল। ইতস্তত নিয়ে বলল, “আপনার ফোনটা একুসখানি দিবেন?”

ওর তুলতুলে মুখটা দেখে হাসি পেলো ভিহানের। তবে সে সেটা চেঁপে রেখে ঘাড় ঘুরালো। তা দেখে রাহা ভাবল হয়তো দিবে না। তাই আহ্লাদ নিয়ে বলল, “না করবেন না। পিলিজ লাগে ভিহান ভাই একটু দিন না।”

রাহার ওমন সুরে কথা শুনে মুখ আড়াল করেই ভিহান ঠোঁটে ঠোঁট চেঁপে ধরে। মেয়েটা কেন এত আদুরী হতে গেলো? হাসি চেঁপে রেখে সে কিয়ৎক্ষণ নীরব থেকে ওঠে দাঁড়ালো। গাম্ভীর্য গলায় বলল, “চল আমি ক্লিক করে দিচ্ছি।”

রাহা ভ্যাবাচ্যাকা গেলো। বোকার মতো ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে। মানুষটা কি করে বুঝল সে ছবি তুলতেই ফোন চাইছে? সে তো মুখ ফুটে বলেওনি।

“এখানে বসে না থেকে ওঠে পর ইডিয়েট।”

থতবত খেয়ে রাহা জলদি ওঠল। খুশিও হলো মনে মনে। কারণ ভিহান ভাই বড্ড ভালো ক্লিক করতে পারে। স্টুডেন্ট থাকতে নাকি এদিক সেদিক বন্ধুদের নিয়ে ফটোগ্রাফি করতে ছুটতো।

“গেট ইনটু পজিশন প্রপার্লি, স্টুপিড।”

রাহা নিজের ওড়নাটা ঠিকঠাক করে পোজ নিয়ে দাঁড়ালো। কোমল ঠোঁটের ফাঁকে একটা মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে তাকালো ভিহান ভাই এর ফোনের দিকে। তা দেখে মুখ ঘুরিয়ে তপ্ত শ্বাস ঝাড়ল ভিহান। মনে মনে বলল, “যেখানে অন্য পজিশন শেখানোর কথা সেখানে বলদটাকে এখনো আমার ছবি তোলার পজিশন শিখাতে হচ্ছে। ইডিয়েট কোথাকার।”

“কি হলো ভিহান ভাই আপনি ছবি না তুলে ওদিকে তাকিয়ে কি দেখছেন?”

ভিহান এবার তাকালো। রাহার পানে চেয়ে দাঁত পিষে ক্ষীণ সুরে বলল, “আমার ধ্বংস।”

“কি?”

“জীবন টা ধ্বংস করে দিয়ে আবার…”

“কি বিড়বিড় করছেন আপনি?”

“নাথিং। পোজ নে।”

রাহা একেরপর এক ছবি তুলে যাচ্ছে। ভিহান গাঢ় নয়নে ওর দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে। মাঝেমাঝে কোনো এঙ্গেল খরাপ এলে আবার নিজ তাগিদে দেখিয়ে দিচ্ছে। মেয়েটাও যেন বড্ড আদরে উল্লাসে নানান ভাবে ছবি তুলছে। ওকে দেখে আর মনে হচ্ছে না ওদের থেকে দূরে এসে তার মন খারাপ। ভিহান স্কিনে রাহার আদুরে মুখের ঘায়েলি হাসির দিকে নেশালু চোখে তাকিয়ে আছে। ছবি তুলে দিতে দিতে যেন হৃদয় থেকে ধ্বনির উত্থলিত হলো,

“আমায় ছারখার করে দেওয়ার জন্যে তুই রাহা বোধহয় ওঠে পড়ে লেগেছিস। একটু একটু করে মরে যাচ্ছি আমি অথচ সেটা দেখছিস না। স্টুপিডইইই..”

ততক্ষণে খাবার চলে এসেছে বলে ভিহান ওর হাত টেনে নিয়েই আবার টেবিলের সামনে গেলো। পছন্দের সব খাবার দেখে খুশিতে লাফ দিয়ে ওঠল রাহা। চোখেমুখে আনন্দ আর ঝলক নিয়ে সে দ্রুত করে বসল। টেবিলে এক প্লেট চিকেন উইংস, নাচোস ইউদ চিজ, একটা চিজি বার্গার আর একটা চকলেট শেক। সাথে আবার একটা মোজিটো ও আছে। সবগুলির দিকে রাহা লোভনীয় দৃষ্টি দিচ্ছে এক্সাইটেডের সাথে। ওর দিকে ঠোঁটে আঙ্গুল ঠেকিয়ে আরাম করে বসে থেকে গাঢ় চাউনি দিয়ে দেখছে ভিহান। এইসব গুলি মেয়েটা এখন ধীরে ধীরে বসে খাবে। না করলে মুখ ফুলিয়ে দিবে। রাতে আবার পেট ব্যথায় চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলবে। স্বভাব কি না! ভিহান নাও করলো না। চিকেন উইংস মেয়েটার বড্ড পছন্দ। চিকেনের এই অংশ ও খুব আরাম করে খায়। ভিহান বিরামহীন ক্লান্তহীন ভাবে ও দিকে নরম চাউনি নিক্ষেপ করে রেখেছে। মেয়েটা চোখ মুদে তৃপ্তি নিয়ে উইংস খাচ্ছে। ওরদিকে ভিহান এক ধ্যানে চেয়ে আছে। এমন সময় নিজের জন্যে অর্ডার দেওয়া কেবল এক কাপ কফি চলে এলো। ছেলেটা জিজ্ঞেস করলো আরো কিছু নিবে কি না। কিন্তু ও হাতের ইশারায় শুধু চলে যেতে বলল। কফির মগে চুমুক দিতে দিতে গভীর ভাবে তাকিয়ে দেখতে লাগল রাহার খাওয়ার দৃশ্যটুক।

ওদিকে কিছুটা দূরেই কালো মাক্স আর ক্যাপ পড়ে শারহান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখল ওকে। এ যে ভিহান তা ভাবতেই যেন ওর কষ্ট হচ্ছে। শালা চেয়েছে কিভাবে দেখো। যেন চোখ দিয়েই গিলে নিবে ওর ননির পুতুলটাকে। রগচটা, গম্ভীর রাগী ছেলেটাও যে এভাবে কাউকে দেখতে পারে কখনো তা শারহান নিজ চোখে না দেখলে ভাবতেই পারতো না।

“শালা লুচ্চার চাউনি দেখ।”
মনেমনে বকতে বকতে শারহান একটু কেঁশে ওঠতেই ভিহান নিজের জায়গায় বসেই চোখ ঘুরিয়ে এক পলক দেখল ওকে। ওর পাশে আরো দুজন লোক বসে আছে। তাদের মাঝ বরাবর আরেকটা টেবিলে বসে আছে আরো দুটো লোক। একটু দূরে একটা কাপল বসেছে। একেবারে কর্নারের দিকে বসেছে অল্প বয়সী দুইটা ছেলেমেয়ে। বোধহয় গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড।

ভিহান কফি খেতে খেতে নিজের ফোনে টাইপ করতে লাগল, “ফোকাস অন ইউরসেল্ফে ডামি।”

হঠাৎ শারহানের ফোনটা টুং করতেই সেটা তুলে নিলো। এমন একটা ম্যাসেজ পেয়ে সে চোখ তুলে তাকালো অপর দিকে বসে থাকা ভিহানের পানে। কি গভীর মুগ্ধতার সাথে তাকিয়ে আছে নিজের বাচ্চা পাখির দিকে। শালা নিজে পেরেম পিরিতি করছে। আর এদিকে তাকে হুকুম করছে কাজের জন্যে। এত রাগ লাগলো শারহানের। ইচ্ছা হলো ওর নাক বরাবর একটা ঘুষি দিতে। তবে যদি জ্বালাটা কমত। কত করে বলল একটা মেয়ে নিয়ে আসুক সে। না তাকে পাত্তা না দিয়ে আদেশ দিলো কোনো মেয়ে নিয়ে যাওয়া চলবে না। এদিকে দেখো সে নিজেই মেয়ে নিয়ে চলে এসেছে। আবার যেততেন মেয়ে না নিজের বাচ্চা প্রেয়সী স্বয়ং তার চাচাতো বোন। রাগে নিজের চুল টেনে ধরতে চাইলো ও।

নিজের বাচ্চা প্রেয়সী যেন তাকে দেখতে না পায় তাই জন্যে তাকে এভাবে মাক্স আর ক্যাপ পরে বসে থাকতে হচ্ছে। ওর কুতকুতি পাখি তাকে দেখে যেন কাজের ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে তাই এই ব্যবস্থা।

মাঝখানের সারিতে বসা দুজন লোককের খাবার চলে আসছে। ওরা নিজেদের মাঝে কথা বলছে। শারহান ওর টেবিলে বসা বন্ধুদের সাথে টুকটাক কথার উত্তর দিলেও ওর কান কেবল ওদিকেই। নিজের বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে এমন মনে হলেও সে আদৌত নিজের কাজই করছে।

ভিহানও সেইম। গাঢ় নয়নে তাকিয়ে আছে নিজের প্রেয়সীর দিকে। কিন্তু শ্রবণ ইন্দ্রিয় কাজ করছে ওই দিকে।

রাহা উইংস খেয়ে হু হা করছে। ঠোঁটের পাশে সস লাগিয়ে একাকার। ভিহান ছোট্ট করে হাসে। টিস্যু নিয়ে উঠে নিজেই হাত বাড়িয়ে ওর ঠোঁট মুছে দিয়ে আওড়ায়, “ইডিয়েট।”

মাঝের সারির লোকটা নিজের পকেট থেকে একটা খাম বের করে সেটা ওপর দিকের লোকটার কাছে এগিয়ে দেয়। তীক্ষ্ণ গলায় শুধু বলে “ম্যাপ” সেই লোকটা সেই খাম দেখে সেটা নিজের পকেটে নিয়ে নেয়। আবারও নিজেদের মাঝে কথা বলতে থাকে।

ভিহানের ইশারা পেয়ে শারহান ওর পাশের জনের জ্যাকেটের থেকে একটা খাম বের করে। এরপর নিজের পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে সেটা খামে ভরে নেয়। কাজ টা এতটা আড়ালে করেছে যে কেউ দেখার উপায় নেই।

শারহান ওদের সাথে হাসাহাসি করতে করতে ভিহান কে ম্যাসেজ করে, “ডান।”

“ইফ ভিহান ভাই ঝালল।”

ঠোঁট গোল করে হু হা করছে রাহা। ওর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ভিহান দাঁতে দাঁত চেঁপে বিড়বিড় করল, “ওটা তোর ঝাল নয় ইডিয়েট আমার মরণ ফাঁদ।”

রাহা হু হা করছে আর হাত নাড়াচ্ছে। সেদিকে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে চকলেট শেক টা এগিয়ে দিলো ভিহান, পিষে গলায় বলল,

“আমায় জানে আর না মারতে চাইলে আগে এটা খা স্টুপিড।”

ঝালের ঘোরে রাহা সেসব কিছু খেয়াল করলো না। এক চুমুকে খেতে লাগল শেকটা।

মাঝের সারির খাম নেওয়া সেই লোকটা একটু ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্যে উঠতেই ভিহান নিখুঁত ভঙ্গিমায় শারহান কে ইশারা করল। ইঙ্গিত পেয়ে সে নিজেও ওঠে গেলো ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্যে। যেন সে এটারই অপেক্ষা করছিলো।

কিছুক্ষণ পর শারহানের ম্যাসেজ এলো, “কমপ্লিট।”

ভিহানের ঠোঁটে ক্রুর হাসি খেলে গেলো। বাহিরে তখন আকাশ ডাকছিল গরগর করে। মাঝেমাঝে বিদ্যুৎও চমকাচ্ছিল। একেবারে হুট করে ঝমঝম করে মুহূর্তে বৃষ্টি নেমে সব ভিজিয়ে দেওয়া শুরু করল।

আয়েস করে রাহা বৃষ্টিমুখর দিনে নিজের খাবার খেতে লাগল। এক লম্বা ঠেকুর দিয়ে বলল,

“ইশশ পেটে যদি একটু জায়গা থাকতো এমন দিনে খিচুড়ি খেলে ভালো লাগতো। তাই না ভিহান ভাই?”

রাহা আগ্রহ আর উচ্ছ্বাস নিয়ে তাকালেও লোকটা ভ্রু সরু একে এমন ভাবে তাকে দেখলো যেন খেয়ে ফেলবে। ইতস্তত হলো রাহা। আমতাআমতা করে বলল, “এ..এমন ভাবে তাকাচ্ছেন কে..কেন? ভুল কিছু তো বলিনি।”

চোখ দুটি সরু করে জানতে চাইলো ভিহান, “তোর ওই টুক পেটে তিল পরিমাণ জায়গা আছে তো স্টুপিড?”

কথাটায় বোধহয় সম্মানে লাগলো রাহার। লজ্জাও পেলো। বিরক্তির রেশে ঠোঁট উল্টে দিয়ে কিছু বলবে তার আগে ঠেকুর এলো আবারও। বলল, “নেই বলেই তো এভাবে বলছি। না হলে তো অর্ডারই করে ফেলতাম।”

ভিহান “হাহ্” শব্দ করে শ্বাস ঝাড়ল। মুখ ফিরিয়ে বলল, “পেটুক একটা।”

রাহা রাগলো। চোখমুখে বিতৃষ্ণা নিয়ে বলল, “খায়িয়ে টায়িয়ে আপনি আমাকে এভাবে খোঁটা দিতে পারেন না ভিহান ভাই।”

ভিহান কোনো জবাব দিলো না। খেয়াল করল মাঝের সারিতে বসা লোকটা খাওয়া শেষ করে অপর মানুষটার জন্যে হয়তো অপেক্ষা করছে। কল দিচ্ছে অনবরত। আসছে না বলে বিরক্তির সাথে গালি দিয়ে নিজেই ওঠে গেলো।

বাহিরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। রাহা চুপচাপ বসে থেকে মোজিটোর স্ট্রো তে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়েছে। আনমনে তাকিয়ে দেখছে কিছু। ওর দিকে নেশা নেশা চোখ নিয়ে ভিহান অগাধ চাউনিতে চেয়ে দেখছে রাহা কে।

“থামাতেই যদি না পারিস তাহলে বুক সমুদ্রে এত উথাল ঝড় কেন তুলিস রাহা?”

নিজ মনে প্রশ্ন করে গেলেও উত্তর আর আসে না রাহার থেকে। আসবে কি করে? ভিহান ভাই তো নিজের অনুভূতি কে সংগোপনে লালন করে। এত বছর ধরে খুব যত্নে আদরে লুকানো অনুভূতি গুলোর সাথে তো ভিহান একাই লড়ে আসছে। কখনো আনন্দে কিংবা কখনো লাগাম ছাড়া অবাধ্য ধৈর্যের সাথে।

“ভিহান ভাই?”

রাহার মিনমিনে ডাক অনুসরণ করে ভিহান তাকালো। নিজেও শ্লথ কন্ঠে জবাব দিলো, “শুনছি।”

“আপনি তো কফি ছাড়া কিছুই খেলেন না।”

“…..
আমতাআমতা করেও বলে ফেলল মেয়েটা, “আজ আমার পেট ব্যথা করলে আপনার দোষ। ধরে নিবো আপনি নজর দিয়েছেন।”

“হোয়াট ননসেন্স?”

রাহা ঢোক গিলল। নড়েচড়ে আড়চোখে তাকিয়ে বলল, “আমি এত এত কিছু খেলাম কিন্ত কফি ছাড়া কিছু খান নি আপনি। পেট ব্যথা হলে ভাববো আপনি নজর লাগিয়েছেন।”

ভিহান জবাব দিলো না। চুপচাপ তীক্ষ্ণ চোখের চাউনি তার উপর দিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে দেখে রাহা খানিকটা অস্বস্তি বোধ করে। এই রে বেশি বলেছে ফেলেছে নাকি? জাঁদরেল টা কিভাবে শকুনি দৃষ্টি দিয়েছে।

ভিহান ঠোঁটের উপর তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলটা আলতো করে ঠেকিয়ে রাহার পানে তাকিয়ে আছে। মনে মনে বলছে,

“নজরের কথা যদি বলিস তাহলে তো তোর গোটা অঙ্গে আমার নজর লেপ্টে আছে রে রাহা।”

ভিহান ভাই কে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে শঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন করল সে, “আ..আপনি এভাবে তাকিয়ে আছেন কে..কেন?”

ভিহান জবাব দিলো না। চেয়ারের গা থেকে পিঠটা সরিয়ে একটু ঝুঁকে এলো টেবিলের উপর। মুখটা খানিকটা রাহার দিকে ঝুঁকিয়ে জানতে চাইল,

“তাহলে তোর পুরো শরীর ব্যথা করে না রাহা?”

ভ্যাবাচ্যাকা গেলো মেয়েটা। বোকার মতো তাকিয়ে দেখতে লাগল ভিহান ভাই কে। মানুষটা কি মুচকি হাসল? মাথায় কিছুই খেললো না মেয়েটার। কয়েক মুহূর্তের জন্যে নিজেকে মস্তিষ্ক হীন লাগল। ওর ড্যাবড্যাব করা চাউনির মাঝেই ভিহান ওয়েটার কে ডাক দিলো। ছেলেটা আসতেই নিজেকে সামলানোর জন্যে বারবার পলক ঝাপটালো সে।

বাহিরে তখনো ঝুম বৃষ্টি পড়ছে। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। কি করবে ভিহান কিছু বুঝলোও না। শারহান সহ বাকি সবাই চলে গিয়েছে। রেস্টুরেন্টে কেবল তারা আরেকটা কাপল বসে আছে। রাহা ভয় ভয় নিয়ে বলল, “আমাকে আর কয়েকটা ছবি তুলে দিবেন ভিহান ভাই?”

“না দিলে?”

মুহূর্তে রাহা বোকা বোকা একটা হাসি দিয়ে বলল, “দিন না। প্লিজ দিন না ভিহান ভাই। শুধু কয়েকটা। প্লিজ দিন। আপনি তো অনেক ভালো।”

ভিহান সরু চোখে প্রশ্ন করল, “তুই না আমাকে জাঁদরেল ডাকিস?”

বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেলো মেয়েটা। যেন চুর চুরি করতে গিয়ে ধরে পড়েছে। লজ্জায় শঙ্কায় আর অস্বস্তিতে মেয়েটার মুখ প্রায় চুপসে গিয়েছে। ওর এমন অপ্রস্তুত মুখ টা দেখে ভিহান ঠোঁট টিপে হাসল। তর্জনী উঁচিয়ে শাসানো সুরে বলল,

“ফারদার যদি শুনেছি তাহলে তোকে পুরোটাই গিলে ফেলবো কিন্তু…”

রাহা হাসার চেষ্টা করল। বোকা বোকা হাসি। কান ধরে উল্লাসে বলল, “আচ্ছা আর বলবো না। এবার ছবি তুলে দিন।”

ভিহান ভাই এর ঠোঁট টিপা হাসি দেখে রাহা থমকালো। পরক্ষণে বিষয়টা আন্দাজ করে দ্রুত কান থেকে হাত সরালো।

সন্ধ্যার পরপর বৃষ্টিটা একটু কমেছে। বাহিরে তবুও গুড়িগুড়ি বৃষ্টি দেখা যাচ্ছে। খুবই অল্প। এদিকে লম্বা পথ। এখন বের না হলে ফিরতে খুব দেড়ি হবে। ভিহান অগত্যা রাহা কে কঠিন স্বরে প্রশ্ন করল, “এই বৃষ্টিতে যেতে পারবি তো?”

“হ্যাঁ।”

“ভেবে বলছিস?”

রাহা মাথা নাড়ায়। শেষে ভিহান ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় বাইকের ধারে। যাওয়ার পথে নিরিবিলি রাস্তা পড়বে। একটু জোরে টানলে তাড়াতাড়ি ফিরতে পারবে। বিচক্ষণ ভিহান টা আন্দাজও করতে পারলো না সামনে কোন ভয়ংকর বিপদ তার কলিজা কামড়ে ধরার জন্যে অপেক্ষা করছে।

চলমান…..

অবশ্যই মতামত জানাবে পাখিরা। আসন্ন বিপদ কি হতে পারে বলে মনে হয় আপনাদের? যে যেটা ভাবছেন সেটা অন্তত কমেন্টে লিখবেন। কেমন হচ্ছে সেটাও বলে যাবেন। ভালোবাসা🫶🥰

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply