Uncategorized

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৭৫


#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৭৫

#সুরভী_আক্তার

( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ ) 

আজ দিন পাঁচেকের মাথায় ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরেছে ইয়াশ্ আর শাফাহ্ । পরদিন আসার কথা বললেও সেদিন আসার ডেট ছিলো না । আরো তিন দিন সময় ছিলো হাতে । এ তিন দিন গোটা জুরিখে টুকটাক ঘোরাঘুরি করেছে ওরা দুটোতে । আশপাশে অনেক দর্শনীয় স্থান ছিলো । শাফাহ্ কে‌ দেখিয়েছে সব । যেহেতু মেয়েটাকে সাথে নিয়ে গেছিলো, তাই ওর দিকটাও ভেবেছে খানিক । 

ওরা এয়ার পোর্টে ল্যান্ড করে ঠিক সন্ধ্যা সাতটায় । ক্লান্ত দেহ তুলে সোজা বাড়ির পথে ফিরেছে । রমনী নাজেহাল প্রায় । ঝিমিয়ে গেছে পুরো ‌। চলছে না ললিতাঙ্গ । এয়ার পোর্ট থেকে একটা গাড়ি ড্রপ করেছিলো ওদের । পেন্ট হাউসের সামনে নামিয়ে দিয়েছে সোজা । 

অ্যাপার্টমেন্টের মেইন ডোরের সামনে এসে দাঁড়ানো মাত্রই বিষ্ময়ে চোখ জোড়া বৃহৎ হয়ে আসলো শাফাহ্’র । ক্লান্তি উধাও হলো নিমিষেই । নিভু নিভু আঁখি জোড়া তড়াক করে গোল হয়ে আসলো । ওরা বাড়িতে ছিলো না গুনে গুনে পাঁচ দিন । এই পাঁচ দিনে পাঁচ টা হলুদ গোলাপের বুকে এসে জমা হয়েছে দরজার সামনে । বাসি হওয়ার দরুন কিছু ফুল নেতিয়ে পড়েছে । কিছু সতেজ । একটা বেশি, সেটা বোধহয় আজ এসেছে । শাফাহ্ আহম্মক বনে চেয়ে রয় ওসবের দিকে । 

ফুল আসলো কোথা থেকে ? ওরা তো ছিলো না ঘরে ! 

রমনী ঢোক গিলে চোরা চোখে দেখে নেয় ইয়াশ কে । ফুল গুলো ছুঁইয়ে দেখার তীব্র কামুকতায় আঁকুপাঁকু করলেও সাহস কুলোয় না সামনে এগোনোর । যদি পা বাড়ায়, তাহলে নিশ্চয়ই ঝাড়ি খাবে এই লোকের কাছ থেকে । প্রথম দিনের কথা ভোলেনি সে । রমনী টেনে হেঁচড়ে চোখ নামিয়ে বহু কষ্টে সংযত করে নিজেকে । 

ওদিকে ইয়াশের ভ্রু কুঁচকানো । মুখশ্রী টানটান নিরেট । মাড়ি খিচে ফুল গুলোর দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে সেও । যেনো ভস্ম করে দেবে এক্ষুনি । কিছু বললো না সে । না বলে প্রত্যেকটা বুকে তুলে রাগে ক্ষোভে হিসহিসিয়ে প্রাচীর টপকে ছুড়ে মারলো বাইরের দিকে । 

শেষে দম ফেললো । ফুল গুলো উচ্ছিষ্টের ন্যায় পড়ে রইলো বাড়ির বাইরে । তপ্ত যুবক তপ্ত চাপা স্বরে কারোর উদ্দেশ্যে আওড়ালো অত্যাধিক ক্রোধে…..

” ডিসগাস্টিং, ফা*কিং গার্ল  ! 

তার ক্রোধিত মৃদু বাক্য পৌঁছায় শাফাহ্’র কানে । সে মিনমিনিয়ে বলে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে…..

” আমি আবার কি করলাম ? 

তড়াক করে চাইলো ইয়াশ…..

” হোয়াট ? 

” ডিসগাস্টিং, ফাকিং……

” ওয়য়য় ,, শাট আপ । তোমাকে বলিনি । পকপক করো না । ভেতরে যাও । 

বলতে বলতে পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করলো । সাথে লাইটার । রাগের সময় সিগারেট লাগে তার । তার উপর গত ঘন্টা গুলোতে খাওয়া হয় নি । মাথা ঝিমঝিম করছে ‌। রাগ চড়ে আছে মস্তিষ্কের নিউরনে । দমানো প্রয়োজন নিজেকে । সে একটা সিগারেট ঠোঁটের ভাঁজে চেপে ধরলো । লাইটার জ্বালানো মাত্রই আঁতকে উঠলো শাফাহ্…..

কাঁচুমাচু মুখে বাঁধা দিলো ভেজা কন্ঠে…..

” দাঁড়ান প্লিজ । এখন খাবেন না । আমি চলে যাই আগে, দরজা খুলে দিন । 

ফের ঘাড় ঘোরালো ইয়াশ । মুখ কুঁচকানো, খানিক বিব্রত হলো সে । ঠোঁট থেকে সিগারেট সরিয়ে ডান হাতে ঘাড় ডলে এগিয়ে এসে পাসওয়ার্ড টাইপ করলো শাফাহ্’র সামনেই । 

দরজা খুলে দিতেই নজরে ঠেকলো ভেতরের ঘুটঘুটে অন্ধকার । কম্পিত হলো রমনীর হৃৎপিণ্ড । সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো সে । 

আবার মনে পড়লো, সেদিন যুবককে জড়িয়ে ধরেছিলো অন্ধকারে । কিন্তু এই রাক্ষসটা তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলো । বিন্দুমাত্র শান্তনা দেয় নি । 

আজ আর আগ বাড়িয়ে নিরাশ হতে গেলো না মেয়েটা । মুখ ভোঁতা করে সটান রইলো । ইয়াশ ওকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকে তাকায় । ‌

হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় ভেতরে । দরজা লাগিয়ে সুইচ বোর্ড হাতড়ে লাইট অন করতেই ঝকঝক করে ওঠে পুরো বাড়ি । ইতালিয়ান মার্বেলের মেঝে সহ চার দেয়ালের তকতকে কাঁচ চিকচিক করে ওঠে উজ্জ্বল আলোয় । 

অন্ধকার ঘুচে নিমিষেই আলো ছড়ায় প্রতিটি কোণে । 

শাফাহ্ যেনো আকস্মিকই আকাশ থেকে পড়লো । হা বনে অবিশ্বাস্য নয়নে এপাশ ওপাশ দৃষ্টি ফেললো । বোধহয় ভুল দেখছে । চোখ কচলে আবার তাকালো । নাহ, ঠিকি দেখছে । 

তবে এই ভুতুড়ে ঘুটঘুটে বাড়িতে এতো এতো আলোর মেলা বসলো কি করে ?

প্রখর ঝলকানিতে ঝলসে যাচ্ছে চোখ । শাফাহ্ বিড়বিড় করে সন্দিহান হয়ে আওড়ায়….

” মেঘার ভাইয়া,,,, দেখুন আমরা বোধহয় ভুল বাড়িতে এসেছি । মানুষের পিটুনি খেতে না চাইলে পালান জলদি । 

ইয়াশের সাঁড়া নেই । শাফাহ্ না তাকিয়েই ঘোরের বশে ওর বাহু ঝাঁকালো….

” আমি স্বপ্ন দেখছি না তো ? এ বাড়িতে এতো এতো লাইট আসলো কোথা থেকে ? নিশ্চয়ই আমি ঘুমিয়ে আছি এখনো, প্লেনে আছি তাই না ? তাইতো তো ভাবছি, অনেকক্ষণ থেকে ঝাড়ি খাচ্ছি না আপনার থেকে । ঘুমিয়ে থাকলেই এমন উদ্ভট অভাবনীয় স্বপ্ন দেখি আমি । একটা চিমটি কাটুন তো আমায় ! ভেঙে যাক এই ঘোর । 

শাফাহ্ হাত বাড়িয়ে দেয় । ইয়াশ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে । মেয়েটাকে পাত্তা দেয় না বিন্দুমাত্র । বিড়বিড় করতে করতে পা বাড়ায় লাউঞ্জের দিকে…..

” টকেটিভ লেডি ! 

সে চলে যায় । 

শাফাহ্ হা বনে হতবাক হয়ে রয়েছে এখনো । 

বিশ্বাস হচ্ছে না কিছুতেই । যাওয়ার কালেও ঘুটঘুটে একটা ভুতের বাড়ি ফেলে গেছিলো । ফিরে আসার পর এতো ঝকঝকে হলো কি করে ? 

হিসেব মেলে না কিছুতেই । 

মেয়েটা আর ভাবে না । এক‌ ছুটে ঘরে যায় । সুইচ অন করতেই ঘরও আলোকিত হয় জমজমাট আলোয় । ঘরের সাথে সাথে দিপ্তীতে ঝিকঝিক করে ওঠে রমনীর মুখখানি । এবারে সন্দেহ কাটতেই ফিক করে হেসে ওঠে বোকা মেয়েটা । লাফিয়ে ওঠে । দুহাত মেলে আপ্লুত হয়ে চক্রাকারে গন্ডি কাটে পুরো ঘরে । আর যাই হোক, ভীষণ স্বস্তি পেলো সে । তিমিরে ঢুবে ভয়ে ভয়ে থাকতে হবে না আর । প্রাণোচ্ছল হয়ে থাকতে পারবে । 

সে ফ্রেশ হয়ে বেরোতে বেরোতে সময় লাগিয়েছে । ততক্ষণে ইয়াশের অর্ডার করা খাবার এসে গেছে বাইরে থেকে । পাশের রুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এই ঘরের দরজার সামনে এসে এক মুহুর্ত থেমে হুট করেই ঘরে ঢুকলো ইয়াশ । পড়নে শর্ট’স আর ক্যাপ স্লিভ টি শার্ট । গলায় টাওয়েল ঝোলানো, ভেজা মাথার চুল । 

রমনীও নিজের কোমর ছড়ানো অবিন্যস্ত কেশরাশী টাওয়ালে পেঁচিয়ে পানি ঝড়াতে ব্যস্ত । ইয়াশ গলা খাঁকারি দিয়ে গুরুভার হয়ে ডাকলো…..

” এইইই টুকটুকি,, 

মেয়েটা ঝট করে তাকায় । বেশ ফুরফুরে সে । ভরা গালে হেসে বললো…..

” কি হয়েছে ? 

” খাবার এসে গেছে ! গরম আছে এখন । চলো ! 

” উমম,, খিদে পেয়েছে খুব । চলুন । 

আর থামলো না । কোনো রকমে চুলে টাওয়েল পেঁচিয়ে জোর কদমে বেরোলো বাইরে । 

খেতে বসেছে দু’জনে । ইয়াশ চোরা চোখ সামলাতে হিমশিম খায় । খাওয়ার মাঝে বলে ঠান্ডা স্বরে…..

” আর কতদিন এভাবে বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করে খাবো ? 

শাফাহ্ তড়াক করে চোখ তুললো । চিবুতে চিবুতে বললো অস্পষ্ট স্বরে…..

” তাই তো,,, আচ্ছা রান্না করাটা শিখে নিন এবারে । খুব একটা কঠিন নয় । দু একদিন ইউটিউব দেখলে ঠিক শিখে যাবেন । তাহলে বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করে খেতে হবে না । আর এমনিতেও বাইরের খাবার খেতে নেই বেশি । বুঝলেন ? এখন অন্তত রান্না শেখা উচিত আপনার ! 

” রান্না আমি শিখবো, না তুমি ? 

” অবশ্যই আপনি । 

আমি ওসব পারবো না । আপনি রান্না করবেন, আর আমি শুধু খাবো ! ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং হবে । 

কথা শেষ করে রমনী ফিক করে হাসে গাল চেপে । ইয়াশ চোখ পাকিয়ে রেগে বলে…..

” আমি রান্না পারি স্টুপিড । 

” তাহলে বাইরে থেকে অর্ডার করছেন কেনো ? কাল থেকে আপনি সব রান্না করবেন ! 

ইয়াশ রেগে তাকায় আবার । ভ্যাট ভ্যাট করে হাসে শাফাহ্ 

 । সেভাবেই দাঁত কেলিয়ে বলে থেমে থেমে….

” না মানে, আমি তো রাঁধতে পারি না । 

” পারো না বলে শিখবেও না ? বয়স কত তোমার ? মেয়ে হয়ে রান্না পারো না স্টুপিড ! কাল থেকে রান্না শিখবে, সংসারের যত কাজ সব শিখবে । বিয়ে হয়েছে তোমার ! এসব তুমি না করলে কে করবে ? 

” আপনি ! 

মেয়েটার জিভ পিছলে বেরিয়ে যায় বেফাঁস কথা । পরক্ষণে ইয়াশের লালচে রাগান্বিত দৃষ্টি দেখে জিভে কামড় বসায় । আমতা আমতা করে…..

” না মানে, আমিই করবো ? আসলে, বাড়িতে কখনো রান্না করিনি তো । 

” এখানে করতে হবে । আমি ছাড়া আর কেউ নেই এখানে তোমার । আর না তুমি ছাড়া আমার । আমরা আমরাই তো । প্রথমে ভুলচুক হবে । মানিয়ে নেবো । ধীরে ধীরে ঠিক শিখে যাবে । 

” শিখিয়ে না দিলে শিখবো কি করে ? 

” উমমম, আমি শিখিয়ে দেবো । ওকে ? 

শাফাহ্ একটু ঝুঁকে কাছ থেকে পরখ করলো ইয়াশ কে । লোকটা এতো শান্ত কেনো আজ ? হঠাৎ এমন পরিবর্তন , কি করে ? 

,,,,,,,, 

বাংলাদেশে রাত দশটা । খানিক আগে সারার গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান থেকে ফিরেছে আদ্র আর শিশির । 

বিকেলের ফ্লাইটে মেঘা আর রৌদ্র পাড়ি জমিয়েছে সুইজারল্যান্ডে । ওদের সাথে কথা হয় নি আর । বাড়ির সবার মন বিষন্ন । একে একে যেনো ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে গোটা কাবির ম্যানসন । আগের মতো চঞ্চলতা নেই বাড়িতে । হুট করেই যেনো সব এলোমেলো হয়ে বদলে যাচ্ছে একে একে । রৌদ্রের চলে যাওয়াটা আগে থেকেই সবাই জানলেও মেঘাও যাবে সাথে , এটা জানা ছিলো না কারোর । উপস্থিত মুহুর্তে সবটা অ্যারেঞ্জ করে মেঘা কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে । 

বিকেলে ওদের এয়ার পোর্টে ড্রপ করতে গেছিলো আদ্র আর শিশির । সেখান থেকেই সোজা শিকদার বাড়িতে গেছিলো দুটোতে মিলে । 

ফিরতে ফিরতে প্রায় দশটাই বেজেছে । বাড়ির সবার মন খারাপ । যে যার মতো ঘরে আছে । 

ও বাড়ি থেকে খেয়ে এসেছে বিধায় বাড়িতে এসে আর খেতে হয় নি । 

ফ্রেশ হয়ে খাটের ব্যাক বোর্ডে হেলান দিয়ে একটুখানি বই হাতে নিয়ে বসেছে শিশির । চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে বইয়ের পাতায় । 

কাল ক্লাস টেস্ট আছে । তবে সারাদিনেও পড়া হয় নি আজ । এখন ঘুমানোর আগে একটু চোখ বুলিয়ে ঘুমাবে । মাথাটাও ধরেছে । নিভে আসছে চোখ । 

ওর পরে আদ্র ফ্রেশ হয়ে বেরোলো । ঘুমানোর প্রস্তুতি নিয়ে নিজেও এসে বসলো শিশিরের পাশে । স্ত্রীর মলিন মুখখানা পরখ করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জড়িয়ে নিয়ে বললো….

” এখন আবার পড়তে বসলে যে , ঘুমাবে না ? ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোমায় । 

মেয়েটা বই সরায় চোখের সামনে থেকে । পাল্টা বলে আদ্রের দিকে তাকিয়ে…..

” বাড়িটা কেমন ফাঁকা লাগছে । প্রথমে শাফাহ্ ,, আর তারপর মেঘা আর রৌদ্র ভাইয়াও চলে গেলো আজ । সবাইকে মিস করছি । মেঘা,শাফাহ্ কেউ নেই । একলা একলা লাগছে আমার । 

” উমম, একলা কেনো ? আমি তো আছি, তোমার পারফেক্ট হাসবেন্ড । আর বাকিরাও তো আছে । মেঘ আর রুডিও ফিরে আসবে কদিন পর । টুকটুকি চলে যাওয়ার পর বাড়ির সবকিছু বদলে গেছে একটু । সেই শূন্যতা টা ঘুচতে সময় লাগছে এখন । 

” শাফাহ্ কে মনে পড়ে খুব । কথাও হয় না ওর সাথে ! 

আপনার মনে পড়ে না ? আপনি স্বাভাবিক থাকেন অনেকটা ! 

আদ্র বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেললো । বললো মলিন মুখে…..

” এ বাড়িতে আমাকে সবচেয়ে বেশি জ্বালাতন করতো ঐ টুকটুকির বাচ্চা । ওকে যদি কেউ সবচেয়ে বেশি মিস করে, সেটা হলাম আমি । 

ভাবিনি কখনো , ও এভাবে চলে যাবে । সায়ান ভাইয়ার সাথে ওর বিয়ে হলে ও আমাদের হয়েই থাকতো । কিন্তু এখন, হাজার কোটি মাইল দূরে ওর অবস্থান । তবে ইয়াশ খারাপ নয় , যথেষ্ট ম্যাচিউর সে । ভুল করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেও সে টুকটুকি কে কখনো কষ্ট পেতে দেবে না, এটা জানি । 

কথা শেষ করে মৃদু হাসলো । শিশির ও মিঠে হাসে ওষ্ঠ প্রসারিত করে । আদ্র চেয়ে দেখে তা । 

শ্যামলিনীর হাত থেকে বই খানা টেনে সরিয়ে বেড সাইড টেবিলের উপর রাখে । ঝুঁকে কপালে কপাল ঠেকিয়ে শুধোয়….

” মন খারাপ ? 

” উঁহু ! 

” তাহলে এমন মনমরা হয়ে আছো কেনো ? 

” এমনি ।

” লং ড্রাইভে যাই ? 

” এখন , এই রাতে ? 

” হু, ওয়েদার ঠান্ডা । ভালো লাগবে । মন ভালো হয়ে যাবে পুরো । 

” মন খারাপ নেই তো আমার । 

” তাহলে স্মাইল করো ! 

শিশির আদ্রের চোখে চোখ রেখে মিষ্টি হাসে । হাত বাড়িয়ে লোকটার চুলের ভাঁজে আঙ্গুল চালিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলে…..

” কাল ক্লাস আছে তো, ঘুমিয়ে পড়ুন । 

আদ্র চোখ সরু করে দুদিকে মাথা ঝাঁকায় ‌। শিশির পরিপন্থি বুঝে ভ্রু নাচায় ‌। 

তার বিপরীতে চোখ সরু করে নিচের অধর কামড়ে ধরে আদ্র । ফিচেল হাসি তার ওষ্ঠপূটে । মুখশ্রী পাল্টে এসেছে নিমিষেই । অদ্ভুত ঘোর লাগা চাহনা নজর জোড়ায় । 

তার মুখাবয়বের বদলে যাওয়া ভঙ্গিমা দেখে আঁতকে ওঠে শিশির । চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে দূরে সরায় লোকটাকে । গলা ভিজিয়ে বলে চোখ চুরিয়ে……

” স্যার,, ঘুমান এখন । 

আদ্র ভ্রু গুটায় কিঞ্চিত । ফের শ্যামলিনীর কাছে ঝুঁকে বলে হাস্কি টোনে…..

” রোমান্টিক মুহুর্তে স্যার ডাকো কেনো বেয়াদব ? আমি তোমার স্যার কেবলই ভার্সিটিতে । সবসময় স্যার স্যার বলে কান পচাবে না একদম । 

” তো কি বলবো ? 

” কল মি আদ্র ! 

শিশির যেনো চমকে গেলো । এটা বিরাট কঠিন ব্যাপার তার কাছে । সে তাৎক্ষণিক হাত নাড়ায়……

” পাগল হয়েছেন ? আমি আপনার নাম ধরে ডাকবো ?

” হুম,, এক্ষুনি । ডাকো….

” কোনো দিন না । 

” উঁহু,,, ডাকো । 

” উঁহু, না । 

আদ্র আরো ঝুঁকে যায় । আর পেছাতে পারে না রমনী । ধীরে ধীরে মিশে যায় বিছানার সাথে । শুষ্ক ঢোক গেলে লাগাতার । 

আদ্র ওর উপর অগ্রসর হয়েছে অনেকটা । মেয়েটা ভড়কে যায় সাংঘাতিক । ঠোঁট ভিজিয়ে মিনমিন করে…..

” এইই সরুন তো , ঘুমাবো ‌এখন । একেই পড়া হয়নি কিছুই ! ক্লাস টেস্ট আছে কাল । 

” ভালোবাসতে দিলে টেস্টে ফুল মার্কস দেবো, প্রমিস । 

নির্লজ্জ লোকটার নির্লজ্জ কথায় মেয়েটা লাল হয়ে ওঠে লাজে । তাকাতে পারে না । বুজে নেয় চোখ । সেভাবেই বলে…

” অসভ্য, আমি আপনার স্টুডেন্ট । সব সময় উল্টো পাল্টা কথা বলতে লজ্জা করে না ? 

” বেয়াদব, আমি তোমার হাসবেন্ড । সব সময় আমার কাজে বাগড়া দিতে তোমার লজ্জা করে না ? 

শিশির মিইয়ে যায় । ওষ্ঠ উল্টায় । 

” আপনার নাম ধরে ডাকা আমার দ্বারা সম্ভব নয় । 

” ওকে । তাহলে লাভ ইউ বলো ! 

মেয়েটা ইতস্তত হয়েও বিড়বিড় করলো…..

” আই লাভ ইউ । এবার হয়েছে ? 

” উঁহু ,,, আই মিস ইউ,বলো । 

” আই মিস ইউউউ । 

” আই নিড ইউ ?

” আই নিড ইউ । 

” ওকে, আই নিড ইউ ঠু ভেজা বেড়াল । 

আকস্মিক আর বিলম্ব করলো না লোকটা ‌। শিশির জালে ফেসে গেছে । নিজের কথার অর্থ বুঝে ওঠা মাত্রই ধক্ করে উঠলো । দৃষ্টি মেললো তড়াক করে । সেকেন্ডের মাথায় ওষ্ঠাধরে গভীর স্পর্শ পেতেই তীব্র শিরশিরানি আপনা আপনি বুজে এলো চোখ দুটি । আর রেহাই হলো না । ন্যস্ত হলো রমনী । 

,,,,,

জুরিখের সময় অনুযায়ী কানেক্টিং ফ্লাইটে রৌদ্র আর মেঘা এয়ার পোর্টে ল্যান্ড করে রাত্রি এগারোটায় । এয়ার লাইন্স পরিবর্তন করে দীর্ঘ এক অভিজান শেষে জুরিখ এয়ার পোর্টে ল্যান্ড করতে করতে এই এগারোটা বেজেছে ওদের । রানওয়েতে লাস্ট ফ্লাইট ছিলো এটাই । তখন চারদিক শান্ত, নিস্তব্ধ । নিরিবিলি পুরো । হুড়োহুড়ি নেই কোথাও । সারা দিনের ব্যস্ততা শেষে বিমানবন্দরে তখন কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছেন কর্মীরা । 

রৌদ্র মেঘার হাত শক্ত করে চেপে ধরেছে এক হাতে । অন্য হাতে ল্যাগেজের টেলিস্কোপিক হ্যান্ডেল । ঝিমুচ্ছে মেঘা । এটাই তার জীবনের প্রথম এয়ার ট্রাভেল । ভীষণ দূর্বল হয়ে পড়েছে একবিংশী । দীর্ঘ জার্নিতেও মুখে তুলতেও পারে নি কিচ্ছুটি । মোশন সিকনেসে বমি হয়েছে দুবার । এতে আরো মিইয়ে গেছে রমনী তন্বী । 

রৌদ্র ওর হাত ধরে ধীর পায়ে কোনো রকমে এয়ার পোর্টের বাইরে বেরোলো । চিন্তিত সে । উদাসীন নজরে সামনের রাস্তায় তাকানো মাত্রই যেনো বুক ফুলিয়ে লম্বা হাঁফ ছাড়ল । ল্যাগেজ ছেড়ে এবার রমনীর দিকে ধ্যান ফেরালো পুরো দমে । নিস্তেজ মেয়েটাকে দাঁড় করালো নিজের সুঠাম দেহের সাথে হেলান দিয়ে । 

সেকেন্ড কয়েকের মাথায় এক সাথে বেশ কজন লোক ছুটে আসলেন দড়দড়িয়ে । 

মেঘা ক্লান্তিময় দৃষ্টি তুলে তাকানোর ফুরসৎ পেলো না , তার আগেই একসাথে ওর দিকে প্রায় দশটার মতো ভিন্ন ভিন্ন ফুলের বুকে বাড়িয়ে দেওয়া হলো । একই সাথে মুখ নাড়িয়ে অভ্যর্থনা জানালেন সকলে…..

” ওয়েল কাম ম্যাম । 

মেঘা ঝট করে চাইলো চকিতে । 

তাদের সামনে জন দশেক লং কোর্ট পরিহিত বেশ সুদর্শন যুবক । প্রত্যেকের হাতে ফুলের তোড়া । বিনয়ে দৃষ্টি নোয়ানো তাদের । ক্লিন শেভ চোয়াল টানটান । 

হাবভাব দেখে মনে হয় যেনো এনারা এসকর্ট । কিন্তু মেঘাকে এভাবে অভিবাদন জানাচ্ছে কেনো । চোখ কচলে আবার তাকালো মেঘা । 

পরক্ষণে রৌদ্রের দিকে । রৌদ্র কিছু বললো না । চোখ নাড়িয়ে আলগোছে ইশারা করতেই প্রত্যেকে সরে গেলেন সামনে থেকে । সারিবদ্ধ হয়ে পাশাপাশি দাঁড়ালেন মাথা নামিয়ে । 

মেঘা অবাক লোচনে তাকিয়েই রয় । বুঝে পায় না কিছু । তার তাকিয়ে থাকার মাঝেই আরো একজন এসে হাজির হলেন সামনে । তার চেহারা বেশ স্বাভাবিক । দেশি ভাব আছে মুখাবয়বে । চোয়াল ভর্তি চাপ দাড়ি । চোখ দুটোতে খুশি উপচে পড়ছে । ছেলেটা হাসি মুখে বেশ মনোরম কন্ঠে বললো আরো একটা ব্লু অর্কিডের বুকে এগিয়ে দিয়ে…..

” ওয়েল কাম ম্যাম । 

মেঘা তখনো বাকরুদ্ধ । রৌদ্রের সম্মতি পেতেই জোর পূর্বক হেসে আগ বাড়িয়ে ফুলের বুকে টা হাতে নিলো । কোনো রকমে ধীরুজ স্বরে উচ্চারণ করলো….

” থ্যাংক ইউ ! 

মাহির আর কিছু বলতে যাবে , তার আগেই থামিয়ে দেয় রৌদ্র । ভরাট কন্ঠে বলে…

” বাকি কথা পরে হবে মাহির । আগে যাওয়া যাক ? ইভারা টায়ার্ড । 

” ওকে বস , লেটস গো ! 

সারি সারি তিনটে কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে শুনশান রাস্তায় । সামনের টা মার্সিডিজ । রৌদ্র আর মেঘা গাড়ির কাছে যাওয়ার আগেই একজন গিয়ে দরজা খুলে দিলেন । আশ্চর্য না হয়ে পারলো না রমনী । পদে পদে বিস্মিত হচ্ছে সে । এতো এতো সংবর্ধনা কিসের জন্য ? রৌদ্র কে সবাই এভাবে ট্রিট করছেই বা কেনো ? যেনো সে খুব নামিদামি কেউ । আর মেঘা,, মেঘার আসার খবর আগে থেকেই জানলেন কি করে এনারা ? এভাবে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানালো যে ? মেঘা কে চেনে বুঝি ? শুনেছে মেঘার কথা ? 

রমনী যা ভেবে এসেছিলো, সেই অহেতুক ধারনা নিচে নামলো এক ধাপ । রৌদ্রের জীবনে যদি অন্য কেউ থেকেই থাকে, তাহলে এভাবে হঠাৎ করে দ্বিধাহীন মেঘাকে সাথে আনলো কেনো ? 

গাড়িতে উঠে ব্যাক সিটে পাশাপাশি বসলো দুজনে । ফ্রন্ট সিটে মাহির । বাকিরা পেছনের দুটো গাড়িতে উঠেছে । 

মেঘা উঠে বসা মাত্রই আড়চোখে একবার রৌদ্র কে দেখে নিলো । দৃষ্টি সরালো চোখাচোখি হওয়ার আগেই । দূরত্ব বজায় রেখে বসেছে । 

রৌদ্র কাছ ঘেঁষলো । কাছাকাছি এসে রমনীর কাঁধ জড়িয়ে নিলো । বাহু বাড়িয়ে কাঁধ ইশারা করে বললো মোলায়েম কন্ঠে……

” মাথা রাখো এখানে ! 

রমনী বিনা বাক্যে সমর্পণ করে । রৌদ্র তার বাঁধা চুলের ভাঁজে নাক ডুবিয়ে সুঘ্রাণ টানে । ঠোঁট ছুঁইয়ে শুধোয়…..

” খারাপ লাগছে এখনো ? বমি ভাব আছে ? 

একবিংশী পাপড়ি নিভিয়ে না বোধক মাথা ঝাঁকায় । 

রৌদ্র হাসে স্মিথ । 

মাহির ঘাড় ঘুরিয়ে চোরা চোখে আপ্লুত দৃষ্টিতে দেখে দু’জনকে । আপনা আপনি ঠোঁট চওড়া হয় তার । মেঘা কে দেখার সাধ ছিলো বহু বছরের । 

সেই এক রমনীর কথা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছিলো তার । তীব্র বাসনা জন্মেছিলো রৌদ্রের রৌদ্রময়ী কে এক ঝলক দেখার জন্য । 

আজ দেখলো । পুরলো বাসনা । এই মেয়ের জন্যই উন্মাদ এই বেপরোয়া যুবক । অবশ্য উন্মাদ হওয়ার যথেষ্ট হেতু আছে । 

রৌদ্রের অ্যাপার্টমেন্টে যাবে ওরা । ‌আগে থেকেই সবটা বুঝিয়ে বলা আছে মাহির কে । সে অনুযায়ী অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছাতে পৌঁছাতে লেগে যায় বিশ মিনিট । 

ততক্ষণে রমনী ঘুমে কাদা । ক্লান্ত ছিলো । একটু চোখ বুজতেই তলিয়েছে ঘুমে । 

গাড়ি থামতেই মেঘার ডান গালে হাত তুললো রৌদ্র । 

” ইভারা ? 

ধীরে ডেকে তার ঘুমের গভীরতা ঠাহর করে নিলো । রমনীর নড়চড় নেই । ঘুমোচ্ছে বেঘোরে । উষ্ণ শ্বাস আছড়ে পড়ছে শার্ট ভেদে যুবকের বুকের বা পাশে । 

সে আর ডাকলো না । 

নেমে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দিলো মাহির । কিছু বলার আগেই ঠোঁটে আঙুল চেপে চুপ করার ইশারা করলো যুবক । আলগোছে রমনীকে কোলে নিয়েই নামলো গাড়ি থেকে । পা বাড়িয়ে মাহিরের উদ্দেশ্যে বললো….

🛑 পরের পর্বটা সারা’র বিয়ে স্পেশাল হবে । 

আর হ্যাঁ, এখন একটু গড়মিল লাগতে পারে । কারন তিনটে দেশের বর্ননা হচ্ছে এখন । সময়ের পার্থক্য কিন্তু আছে । কোথাও রাত হলে কোথাও দিন । বুঝতে হলে একটু মনযোগ দিয়ে বুঝে বুঝে পড়বেন ।

আমার চোখের সমস্যা বেড়ে গেছে ইদানিং । ফোনের দিকে তাকাতে পারি না । তাই একদিন পর পর দিচ্ছি । একটু মানিয়ে নেবেন সবটা । ওকে ? কাল বিয়ে স্পেশাল পর্ব দেবো । রেসপন্স পূর্ণ করবেন ঝটপট । 🛑

#চলবে………….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply