#আসবো_ফিরে_আবারো
#পর্ব_৭৩
#সুরভী_আক্তার
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ
)
যুবকের কন্ঠে অপরাধ বোধ উপচে পড়ছে । বলার পথে শেষে ধরে এসেছে কন্ঠনালি । এক পর্যায়ে বাক্যগুলো আহাজারিতে রুপান্তরিত হয়েছে ।
তবে তার আহাজারি কি কবরে শায়িত জনা শুনলো ? সে তো মৃত । দেহে প্রাণ নেই । ধড় গলে মাটির সাথে মিশে গেছে এতো বছরে । সে কি কভু জানলো, যে বন্ধুর কষ্টের কথা ভেবে নিজের মৃত্যুর খবরটা পর্যন্ত চেপে রেখেছে, সেই বন্ধুটাই আজ এতো বছর পর তার কবর জাপটে আহাজারি করছে !
বুক চেরা কষ্টে কাতরাচ্ছে । গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করা বাকি শুধু । সেটা করতে নেই পুরুষদের । মানে লাগে । বুক ফেটে যায় ইয়াশের । তীব্র যন্ত্রণার তোপে খাদ যুক্ত অবাধ্য চোখ দুটো বেয়ে অঝোর ধারায় ঝর্না নামে । সে মুঠোয় খুবলে ধরলো কবরের মাটি । সাঁড়া পাওয়ার প্রখর আকাঙ্ক্ষায় আবার ডাকলো নির্বোধের ন্যায়……
” কি হলো আরাফ, উঠবি না তুই ? ক্ষমা করবি না আমায় ? এখনো রেগে আছিস ইয়ার ? আমার উপর অভিমান নিয়ে চলে গেলি ? একটাবার সুযোগও দিলি না সেই অভিযান ভাঙানোর । এতো তাড়া ছিলো চলে যাওয়ার ? কেনো আরাফ, হোয়াই ? আরে ইয়ার,, তুই তো সব আমার । আমি আর ঝামেলা করবো না তোর সাথে । মেরেছিলাম তোকে আমি । বিশ্বাস কর, ভুল করে হাত উঠে গেছিলো সেদিন । আমি আমাতে ছিলাম না । ভুল বুঝেছি তোকে । তুইতো জানতিস আমি কেমন, কেনো ক্ষমা করলি না সেদিন আমায় ? কেনো বোঝালি না, মানিয়ে নিলি না কেনো, কেনো চলে আসলি আমায় ছেড়ে ? হোয়াই আরাফ ? তুই চলে এসেছিস, এতে আমি কতটা কষ্ট পেয়েছি জানিস ? কিন্তু, কিন্তু চলে আসার পর আবার কোথায় চলে গেলি তুই ? কোন না ফেরার দেশে ? আমাকে একলা ফেলে কেনো চলে গেলি ওখানে ? আমরা না বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলাম । ছোট্ট কাল থেকে সতেরোটা বছর একসাথে কাটিয়েছি । এতো সহজে ভুলে গেলি আমায় ? আরাফ,, আই মিস ইউ । আমি তোকে জড়িয়ে ধরতে চাই প্লিজ । কেনো আমাকে ক্ষমা করলি না তুই ? হোয়াই ? আ’ম সরি ! আমি রিসা কে চাই না । ও শুধু তোর । তোরা একে অপরকে ভালোবাসিস । আমি কে তোদের মাঝে আসার ? আসবো না আমি । এই দেখ, আমি বিয়ে করেছি । আর কোনো ভয় নেই । লাগবে না আমার রিসা কে । কিন্তু তোকে লাগবে । প্লিজ ফিরে আয় । তোকে প্রয়োজন আমার । ভীষণ প্রয়োজন । চোখ দুটো মরিয়া হয়ে উঠেছে তোকে এক পলক দেখার আশায় । কেনো চলে গেলি আমায় ফেলে ? এই স্বার্থপর আমি টার সাথে তুইও স্বার্থপরতা করলি ?
রূঢ় যুবকের কন্ঠ ঝিমিয়ে পড়েছে । সে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে । অযথা আর্তনাদ করছে শুধু । বাড়ছে তিমির । ডাকছে ঝিঁঝিঁ পোকা । নিস্তব্ধ এক সমাধী স্থলে কেবলই এক যুবকের আর্তনাদ কেঁপে কেঁপে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে । তারা তিন জনা ব্যাতীত কেউ নেই সেথায় ।
রিসা ফিকড়ে উঠলো । তড়িঘড়ি করে চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো এবার । করবের কাছে ইয়াশের পাশে বসলো । কবরটার আগা গোড়া পরখ করলো ভীষণ মর্মাহত দৃষ্টিতে । মোচড় দিয়ে উঠলো ভেতরটা । তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার দিতে ইচ্ছে করলো রমনীর । কোটর ফেটে ঝরঝরিয়ে গড়িয়ে পড়লো বেশ কয়েক ফোঁটা অবাধ্য নোনা জল । এবারে শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠলো সে । তার জীবনটা যন্ত্রণার । সে বুঝতে দেয় না । তাই বলে কি কষ্ট হয় না ? হয়, মারাত্মক যন্ত্রণা হয় । সে সহ্য করে ।
এবারো সয়ে নিলো । সামলে নিলো নিজেকে ।
ইয়াশের কাঁধে হাত রেখে ডাকলো আবছা স্বরে…..
” সন্ধ্যা হয়ে গেছে । এখানে বেশিক্ষণ থাকাটা ঠিক হবে না ইয়াশ । ওঠ….
ইয়াশ স্থবির । নিস্পৃহ পুরো । তার তেজ নেই । বিন্দুমাত্র জোর নেই শরীরে । নিথর যুবকের স্থিরতা দেখে থামলো রমনী, বললো খানিক বাদ…..
” তোকে বলেছিলাম কাঁদবি না । শুনলি না আমার কথা । এখন ওঠ, দেরি হয়ে যাচ্ছে ।
” তোরা আমার সাথে এই বিশ্বাসঘাতকতাটা কেনো করলি রিসা ? কেনো আগে জানালি না আমায় ,, শেষ বার দেখতে দিলি না ওকে ? আমাকে এতোটা পর করেছিস ?
” পর করলে তোর কষ্টের কথা ভাবতো না । সে শেষ নিঃশ্বাস ছাড়ার আগ মুহূর্তেও বলে গেছে, যেনো তোকে এসব জানতে দেওয়া না হয় । তুই পারবি না সইতে । এখন যখন জেনেই গেছিস, সয়ে নে । যেভাবে আমি নিচ্ছি । ওকে আর জ্বালাস না ইয়াশ । ঘুমোতে দে । কষ্ট দিস না প্লিজ । এমনিতেই বন্ধুত্বের বিচ্ছেদে তোর জন্য অনেক যাতনা সহ্য করেছে ও !
শেষ কথাটায় কেমন বাচ্চাদের ন্যায় হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো যুবক । শক্ত করে কবরটাকে চেপে ধরলো ।
” আ’ম সরি আরাফ । আমি বেইমান, প্লিজ এই বেইমানটাকে ক্ষমা করে দে । আমি কক্ষনো তোকে কষ্ট দিতে চাইনি । কিন্তু আমি, আমি সেসময় পারিনি নিজেকে সামলাতে । আমি রিসা কে ভালোবাসি না আরাফ, শুনছিস তুই ? চাই না আমি রিসাকে ।
তুই হলে সব হয়ে যেতো আমার । শেষে কিনা তুই চলে গেলি ? আমার যে কেউ নেই রে । তুইও রইলি না ?
ইয়াশ থামতেই একটা বাচ্চা কন্ঠ ভেসে আসলো….
” মাম্মা !!
রিসা চমকে ওঠে । চকিতে তাকায় । শাফাহ্’র পেছনে সুট বুট পড়া সুদর্শন এক সুঠাম যুবক । তার কোলে ছোট্ট মিনি । ওষ্ঠ উল্টানো । ধড়ফড়িয়ে উঠলো রিসা । দ্রুত ছুটে গেলো । যুবকের থেকে মেয়েকে ছাড়িয়ে বুকে আগলে নিলো । মেয়ের মাথাটা বুকের মাঝে চেপে ধরে ভড়কানো গলায় আওড়ালো যুবকের উদ্দেশ্যে…..
” মাহির,, সন্ধ্যা হয়ে গেছে । তুমি ওকে এখানে নিয়ে এসেছো কেনো ?
মাহির কবরের পাশে নেতিয়ে পড়া নিথর যুবককে দেখে নিলো এক ঝলক । অতঃপর উত্তরে বললো….
” সামলাতে পারছিলাম না । থাকছিলো না আমার কাছে ।
” তাই বলে তুমি ওকে এখানে নিয়ে আসবে ?
হিতাহিত জ্ঞান শূন্য রাগ প্রকাশ পেলো কন্ঠে । চোখ নামালো মাহির । বললো নম্রভাবে…..
” সরি ম্যাম । বাট, আমার মনে হয় না ভুল কিছু করেছি । আরিসার সব জানা উচিত । জানানো উচিত । আপনিও বোকামো করছেন বসের মতো ।
রিসা মেয়েকে সামলায় । ঢোক গিলে বলে বাচ্চার উদ্দেশ্যে….
” কি হয়েছে মাম্মা ? থাকছিলে না কেনো আঙ্কেলের কাছে ?
মিনির দৃষ্টি রিসার ঘাড় ছাপিয়ে ইয়াশের পানে পড়েছে । সে বললো চমকে গিয়ে….
” ইয়াশ আঙ্কেল ? কি হয়েছে আঙ্কেলের ?
উঠে বসলো ইয়াশ । চোখ মুখ মুছে নিজেকে সামলে নিলো । কবরের পাশ থেকে এক মুঠো মাটি তুলে কবরে ছড়িয়ে দিলো । মিনি কে ধরতে পারে না রিসা । কোল থেকে ছেচড়ে নেমে ইয়াশের দিকে ছুটে যায় সে । আটকানো যায় না । অবুঝ বাচ্চাটা এপাশ ওপাশ তাকালো । ইয়াশের ভেজা ভেজা মুখশ্রী দেখে আঁতকে বললো…..
” আঙ্কেল কি হয়েছে ? কেঁদেছো তুমি ? বকেছে তোমায় ? কে বকেছে ?
ভেজা চোখে হাসলো ইয়াশ । হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে টেনে নিলো ।
” আ’ম ফাইন মাম্মা । কেউ বকেনি ।
অতঃপর উঁচু ঢিপির দিকে তাকিয়ে বলল পূনরায়….
” আরাফ,, দেখ তোর মেয়ে । পুরো তোর মতো । মিষ্টি বুড়ি একদম । দেখিস নি ওকে,তাই না ?
ইয়াশ বেশি কিছু বলতে যাবে । তার আগেই তেড়ে আসে রিসা । থামিয়ে দেয়…..
” মিনি, আমার কাছে এসো । বাড়ি যাবো এখন ।
” না,, আমি পাপার সাথে কথা বলবো । মিনি গুড গার্ল ছিলো । এবার মিনি পাপার সাথে কথা বলবে ।
রিসা ঢোক গেলে । ইয়াশ না বুঝে ফের আহত হয়ে আসে । বলে….
” পাপা কে চেনো তুমি ?
” হু , মিনির পাপা ইয়াং ম্যান । মিনিকে খুব ভালোবাসে । কিন্তু মিনির কাছে আসে না । দূরে থাকে সবসময় ।
মাম্মা, মিনি পাপা’র সাথে কথা বলবে । মিনি গুড গার্ল । তবুও মিনি’র পাপা মিনি’র কাছে আসে না । মিনি রাগ করেছে । পাপা কে মিস করছে ।
রিসা ইয়াশের নির্বোধ মুখো ভঙ্গিমা দেখে নেয় চোরা চোখে । মিনিকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আলগোছে আদল আগলে বোঝায়……
” জেদ করে না মাম্মা । বাড়িতে যাই আগে, ওকে ? ইয়াশ আঙ্কেল এসেছে । তুমি না গুড গার্ল । আঙ্কেল কে বলো, আমরা বাড়ি যাবো এখন । তারপর সব হবে ।
বাচ্চাটা কাঁদো কাঁদো হয়ে আসলো এবারে । কত আর মানাবে নিজেকে ? বাচ্চা হৃদয় সয় না । তবুও বাধ্য বাচ্চার ন্যায় বুঝে নিলো সবকিছু ।
ইয়াশের কাছে গুলিয়ে যায় সবটা । আবার আন্দাজ করে কিছু একটা । এই মুহূর্তে কৌতুহল দমায় ।
ফেরার আগে শেষ বারের মতো আরাফের কবরে হাত বুলিয়ে দেয় যুবক….
” গুড বায় চ্যাম্প,,, পরপারে দেখা হবে । সেখানেও তোকে বন্ধু হিসেবে চাই আমি । এপারের বোঝাপড়া টা ওপাড়ে সেরে নেবো । আর বুঝবো না ভুল । বুঝতেও দেবো না । শুধু তুই ক্ষমা করে দিস আমায় । নয়তো বেঁচে থেকেও শান্তি পাবো না আমি ।
,,,,,,,
বাজে রাত নয়টা ।
এই পুরোটা সময় মিনির সাথে কাটিয়েছে ইয়াশ । রিসোর্টে ফিরতে চেয়েছিলো । ফেরেনি ইচ্ছে করেই । রিসা ওকে একবারও আটকায় নি । আহামরি কথাও বলে নি । আশরাফ তালুকদার জোর করেছেন এবাড়িতে থাকার জন্য । ইয়াশ দ্বিধাহীন মেনে নিয়েছে । অনেক প্রশ্ন আছে তার । উত্তর রিসার কাছে । নেওয়া প্রয়োজন উত্তর গুলো ।
মিনি কথায় বেশ পটু । পকর পকর করতে পারে কূট কূট করে । সারাটা সময় বকবক করেছে ইয়াশের সাথে । পাপার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলো অধিকাংশ সময়ে । কিন্তু ইয়াশের মনে হাজারো সংশয় ! পাপা মানে ? কে পাপা ? ইয়াশ এই নিয়ে খচখচ করছে । আঁকুপাঁকু করছে তার বক্ষস্থল । ছোট বাচ্চা টাকে সে কিছু শুধোয় নি ।
আন্দাজ করেছে কিছু একটা । তবে সেই আন্দাজ সত্য কিনা সন্দিহান । কাটানো উচিত এই সন্দেহ । রিসা কে কিছু প্রশ্ন করবে সুযোগ বুঝে ।
নয়টার পর ডিনারে বসেছিলো সবাই । এ বাড়িটা বিলাসবহুল । তবে গোটা বাড়ি মিলে থাকে মোটে তিনজন । আশরাফ তালুকদার, রিসা আর মিনি । আরাফের মৃত্যুর পর ওর মাও ছেলের শোকে হার্ট অ্যাটাক করে পরলোকগমন করেন । তার পর থেকেই একা সবাই । দেশে ফেরা হয় নি আর । এখানেই রয়েছেন । তবে আরাফের মা’র কবর দেশের মাটিতে । সেখানেই একলা পড়ে আছেন তিনি ।
রিসাকে নিজের মেয়ের মতোই দেখেন আশরাফ তালুকদার । সব হারিয়ে তিনিও এখানেই রয়েছেন রিসার সাথে । আরাফের নতুন বিজনেস টাও সবে দাঁড়িয়েছিলো তখন । তিনি এসব একা ফেলে যেতে পারেননি দেশে ।
ছেলে নেই তো কি হয়েছে ? একটা মেয়ে পেয়েছেন তিনি । নাতনি পেয়েছেন । বাঁচার জন্য যথেষ্ট এটুকুই ।
বাড়িতে কাজের লোক অগনিত । তারাই করেন সব । খাওয়া দাওয়ার পালা চুকিয়ে ঘরে গেলো ইয়াশ । তখনো মিনি ওর পিছু ছাড়ে নি । নতুন বন্ধু পেয়েছে । রৌদ্রের সাথে কথা বলার জন্য বায়না করেনি আর । ভুলেছে বেমালুম । শাফাহ্ গুটিসুটি মেরে বসে আছে একপাশে । সেই তখনের পর গুনে দুটো কথাও বলে নি বোধহয় । অচেনা অজানা মানুষের ভিড়ে কুন্ঠিত রমনী ।
চুপসে গেছে পুরো । একেই কিছু ঢুকছে না মাথায় । প্রশ্ন করার সাহস নেই । ইয়াশ কে তখন ওভাবে কাঁদতে দেখে আরো বেশি ভয় পেয়েছে ।
ইয়াশ ব্যস্ত মিনিকে নিয়ে । পুরো বিছানা জুড়ে ডল , টয়স , টেডিবিয়ার, খেলনা, অগনিত । খেলছে সে । ইয়াশ কে নিয়েছে সাথে ।
শাফাহ্ পিটপিট করে চেয়ে দেখছে কেবল ।
এমতসময় ঘরে আসলো রিসা । তিনজনকে একসাথে দেখে হাঁফ ছাড়ল । বললো মেয়ের উদ্দেশ্যে…..
” মিনি,, দশটা বাজে । ইউ আর লেইট । ঘুমোবে না ? চলো রুমে…..
মিনি বায়না করে……
” আরেট্টু থাকি মাম্মা । ইয়াশ আঙ্কেল সো গুড, লাইক পাপা ।
ইয়াশ ফের প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে রিসার দিকে তাকালো । তার তীরের ন্যায় সূচালো চাহনি সরাসরি না দেখেও ঠিক ঠাহর করতে পারলো রিসা । সে নিঃশব্দে গলা ভিজিয়ে বললো আগ বাড়িয়ে…..
” আচ্ছা । তাহলে তুমি এখন একটু আন্টির সাথে থাকো । খেলো । ইয়াশ আঙ্কেলের সাথে আমার একটু কথা আছে । আমরা কথা বলে আসি, ওকে মাম্মা ?
বাচ্চাটা মাথা দুলিয়ে সায় দিলো । শাফাহ্’র দিকে ফিরলো রিসা । মেয়েটা প্রতিক্রিয়াহীন বসে আছে ।
ইয়াশের দিকে পলক ফেলে রুম থেকে বেরোলো রিসা । ইয়াশ পিছু নেয় দ্রুত কদমে । মিনির ঘরের টেরেসে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে ওরা । চুপচাপ দুজনায় । দৃষ্টি শূন্যে ।
আসমানে রুপোর থালার ন্যায় বিরাট চাঁদ । আলো ছড়াচ্ছে ধরনীতে । উক্ত চিকচিকে রুপোলি আলোয় ঝকঝক করছে রিসার উজ্জ্বল মুখখানা । মেয়েটা সুন্দর যথেষ্ট । চোখে ধরার ন্যায় মাধুর্যময়ী । ইয়াশ শেষ দেখেছে আরো সাড়ে ছয় বছর আগে । মাঝে অনেকটা সময় । এই সময়েই মেয়েটার মাঝে বদল এসেছে অনেক । আগের সেই ছিমছাম মেয়েটার গড়নে পরিবর্তন এসেছে । গোলগাল হয়েছে অনেকটা । ছটফটে স্বভাবটা নেই বোধহয় । সময় সাপেক্ষে ঝিমিয়ে গেছে তার চঞ্চলতা । যেটা ইয়াশের খুব পছন্দ ছিলো । আর সেই চঞ্চলতাই হয়তো প্রেমে পড়ার কারণ ।
তবে রিসা আর আগের মতো নেই । গমগমে হয়ে গেছে স্বভাব । ইয়াশের সাথে স্বাভাবিক হয়ে কথা বলতে ইতস্তত সে । চোখে চোখ রাখা আরো বড় দায় ।
ইয়াশ চুপিচুপি তাকিয়ে থাকলো না বেশিক্ষণ । আরো বেশি অপ্রস্তুত করলো না রিসা কে । ভুল বোঝাবুঝি আছে ওদের মাঝে এখনো । অস্বস্তি আছে ।
সে দূরাকাশে চেয়ে হাঁফ ছেড়ে নীরবতা ভাঙলো……
” আ’ম সরি রিসা !
” কেনো ?
” তোর এই অস্বস্তি বোধের জন্য দায়ী আমি । অতিরিক্ত ভেবে ফেলেছিলাম । অকোয়ার্ড ফিল করছিস । আমরা আর আগের মতো ফ্রি নেই ।
” স্বাভাবিক !
নীরবতা চললো । আবারো ছেদ ঘটালো ইয়াশ…..
” কিছু বলার জন্য ডেকেছিলি !
” তোর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য ডেকেছি । প্রশ্ন কর ।
ইয়াশ শুধোয় ঠোঁট কাঁপিয়ে…..
” আরাফ আমায় ক্ষমা করেনি, তাই না ?
” ও তোকে ভুলই বোঝেনি কখনো । ভুল বোঝাবুঝিটা এক পাক্ষিক ছিলো । সেটা তোর দিক থেকে শুধু । আমরা কেউ তোকে দোষারোপ করিনি । ক্ষমা তো পরের ব্যাপার । তবে ও খুব কষ্ট পেয়েছিলো তোর ব্যবহারে । তুই কিছু বুঝতে চাসনি ।
ফের নীরবতা । ভেতর ভেতর দগ্ধ হলো তপ্ত যুবক । ঢোক গিলে বললো…..
” তোর মেয়ের নাম মিনি ?
” আমাদের মেয়ের নাম আরিসা । ডাকনাম মিনি ।
” আরাফ+রিসা ,,, দুটো মিলিয়ে আরিসা । সুন্দর বেশ ।
” হুঁ । জন্মের আগেই আরাফ রেখেছিলো ।
ইয়াশ তাকালো । দৃষ্টি সরালো না এবার । রিসা শূন্যে তাকিয়ে এখনো । ঠোঁটের কোণে কিঞ্চিত হাসি । চাঁদের আলোয় স্পষ্ট চিকচিক করছে রমনীর আঁখি কার্নিশ ।
” তুই বদলে গেছিস রিসা !
” তুইও !
” আমরা আর আগের মতো নেই ।
” কারন আমাদের জীবনে আরাফ নেই । তোর কিনা জানিনা, তবে আমার বদলের কারন এটাই । ও থাকলে বদলাতাম না । সুখে থাকতাম ।
” দুঃখে আছিস এখন ?
রিসাও তাকালো এবার । চোখাচোখি হলো । সেকেন্ড দুয়েক পেরোতেই হুট করেই কেঁদে উঠলো শক্ত খোলসধারী মেয়েটা । আর পারলো না সে ।
হুড়মুড়িয়ে হাঁটু ভেঙ্গে ধপ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো । হাউমাউ করে উঠলো ।
” ও এতোটা নিষ্ঠুর হলো কি করে বলতে পারিস, ইয়াশ ? ও কি করে পারলো আমাকে একা ফেলে চলে যেতে ? ও তো ভালোবেসেছিলো আমায়, তাহলে কি করে পারলো কষ্ট দিতে ? আমি তো সব ছেড়েছি ওর জন্য । পরিবার ছেড়েছি, দেশ ছেড়েছি, আর ও কিনা আমাকেই ছেড়ে দিলো ? কেনো ? ও তো আমাকে কথা দিয়েছিলো, গোটা জীবন আমার সাথে পাড়ি দেবে । তাহলে জীবন শুরু করার আগেই কেনো না ফেরার দেশে পাড়ি জমালো সে ? আমরা তো তখনো সংসার করিনি ভালো মতো । সংসারের স্বাদ মেটেনি আমার । ও আমাকে পূর্ণ করতে গিয়ে, একেবারে অপূর্ণ করে রেখে গেলো ।
আমি কাকে বলবো আমার কষ্ট হয় । ও ছাড়া নিঃস্ব আমি । শূন্য আমি । ওকে ছোঁয়ার, ওকে দেখার, তৃষ্ণা মেটেনি আমার । তার আগেই ও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, ইয়াশ । আমার কলিজা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে । ও পাষান, নিষ্ঠুর । খুব তাড়া ছিলো ওর । ওকে আমি আমার করে চেয়েছিলাম, সব ছেড়ে ছিলাম ওর জন্য, কিন্তু ঐ পাষন্ড টা থাকলো না আমার হয়ে । চলে গেলো আমাকে কাঁদিয়ে । কার কাছে কাঁদবো আমি ? পরিবার ছেড়ে ওর বুকে মাথা গুঁজে কেঁদেছিলাম । আর ও আমার মাথা গোঁজার ঠাঁই টাই কেড়ে নিলো । স্বার্থপরের মতো এ দুনিয়ায় আমাকে একা ফেলে পালালো ।
আমার মেয়ে, আমাদের সন্তানকে জন্মানোর সময় টুকুও দেয় নি ও । দেখেনি আমাদের সন্তানের মুখ ।
আমার মেয়েকে আমি এ অবধি বলতে পারিনি, যে ওর পাপা নেই । ওর জন্মের আগেই ওর পাপা মরে গেছে । এ কথা বলতে পারিনি আমি ওকে । কি করে বলবো ? সইতে পারবে না আমার বাচ্চাটা । ভেঙে যাবে ওর নিষ্পাপ হৃদয় । মরে যাবে ও । তখন কাকে নিয়ে বাঁচবো আমি ? আমি যে সম্বলহীন, অভাগী । আরাফকে ছাড়া আমি একেবারেই সর্বশান্ত…..
মেয়েটা থামে । রাতের নিস্তব্ধতায় তার চিৎকার বিস্তৃত হয় বহুদূর । ফিকড়ে ফিকড়ে ওঠে কান্নার দরুন । ইয়াশ ওর মুখোমুখি এক হাঁটু মুড়ে বসলো । শান্তনায় ছুঁতে গিয়েও ফিরিয়ে নিলো হাত । বললো ধরা জবানে…..
” রিল্যাক্স রিসা,,, কাঁদিস না প্লিজ । তোকে কাঁদতে দেখিনি কখনো । দেখতেও চাই না । প্লিজ ডোন্ট ক্রাই । আমাকে কাঁদতে বারন করে নিজে কাঁদছিস ?
” তোর আর আমার যন্ত্রনা যে ভিন্ন । ও আমার জীবন ছিলো । অর্ধাঙ্গ ছিলো ।
আর এমনিতেও, আমি কাঁদি না ইয়াশ । আমার মেয়েটা বুঝতে শিখেছে থেকে একটা দিনও কাঁদিনি । কাঁদবোই বা কার কাছে ? লাভ আছে কি পানি ঝরিয়ে ? ও তো ফিরবে না ।
” তাহলে এখন কাঁদছিস কেনো ?
রিসা ছটফট করে দুচোখ মুছে নিলো । হাসলো বোকার মতো । ধাতস্থ আর সর্বাংসহা প্রমাণ করলো নিজেকে । বললো…..
” আর কাঁদবো না । এবার বল, আর কি জানবি ?
” মিনি পাপা কাকে বললো ? আমি যা আন্দাজ করছি, তাই ?
রিসা নাক টানলো । জোরে জোরে শ্বাস টেনে গলা পাতলা করে সামলালো নিজেকে । অপ্রস্তুত কুন্ঠায় নত হলো শির । সময় লাগলো উত্তর করতে । মিনিটের মাথায় বললো….
” হু, রৌদ্রকে পাপা ভাবে ও । ডাকে তাই বলেই ।
ইয়াশ থমকায় এক মুহুর্ত । ধারনা সত্যিই তার ।
” রিসা,,,
রিসা বুঝিয়ে বলে….
” ভুল বুঝিস না । রৌদ্র কেবল মেঘার । তোর বোনকে নিয়ে চিন্তা নেই ।
আরাফের মৃত্যুর আগেই এক্সিডেন্টের খবর পেয়ে জুরিখে আসে রৌদ্র । তার আগের দিন বোধহয় ও তোর বোনকে বিয়ে করেছিলো । না বলে কয়ে রেখে এসেছিলো মেঘাকে । সত্যিই বলতে গেলে তোর বোন লাকি ইয়াশ । রৌদ্রের মতো কেউ একজন আছে ওর জীবনে ।
দশ তারিখ রাত নটায় আরাফ মারা যায় । তখন আমি পাঁচ মাসের প্রেগন্যান্ট । দিশেহারা হয়ে গেছিলাম আমি । সে অবস্থায় দিনের পর দিন হসপিটালে পড়ে ছিলাম । বন্ধু বাদ দিলাম, বোনের মতো টেক কেয়ার করেছে রৌদ্র আমার ।
আরাফ নতুন বিজনেস দাঁড় করিয়েছিলো এখানে । সেই বেপরোয়া রৌদ্রটা সব সামলেছে একা হাতে । জেদ করে ও দেশে ফেরেনি । সময় দিয়েছিলো নিজেকে, আর তোর বোনকেও । মেঘার জন্য ধাপে ধাপে নিজেকে পরিবর্তন করেছে রৌদ্র ।
পুরো বিজনেস সামলেছে । আজকে জুরিখের এই নামকরা ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়ানোর পেছনে রৌদ্র প্রধান কারিগর ।
আমার যখন বাচ্চা হলো , তখন রৌদ্র খুব খুশি ছিলো । আমিও সব ভুলে খুশি ছিলাম । কিন্তু খুশি টিকলো না ।
জন্মের পর মিনির হার্টে একটা ফুটো ধরা পড়ে । খুব সামান্য । ও কাঁদতে পারে না এখনো । শ্বাস কষ্ট হয় বেশি হাইপার হয়ে গেলে । সেই জন্মের পর থেকেই রৌদ্র কে দেখে এসেছে ও । মা বলার পর দ্বিতীয় ডাকটা শিখেছে । বাববা, ডাকটা সে রৌদ্র কে ডেকে ছিলো । আর ঐ পাগলটা আমার মেয়েকে আশকারা দিয়েছে । পাপা ডাক শিখিয়েছে নিজে । আমি শতবার বারন করেছি । কিন্তু ও শোনেনি । আমিও বোকার মতো জোর খাটাই নি আর । ভয় পেয়েছিলাম, যদি আমার মেয়েটার কোনো ক্ষতি হয় ! যদি ও কখনো জানতে পারে ওর পাপা নেই, তাহলে ও কাঁদবে । কষ্ট হবে ওর । যদি ভুল কিছু হয়ে যায় ? আমি বাঁচবো কাকে নিয়ে । ও তো নিষ্পাপ , বোঝে না । আর আমি সুবিধাবাদী ওকে বোঝানোর চেষ্টাও করিনি আর ।
ইয়াশ আশ্চর্য বনে গেলো । পাশাপাশি হাঁটু জড়িয়ে বসে দুজনায় । নিজেকে ধাতস্থ করলো যুবক । গলা ভিজিয়ে বললো……
” এটা ঠিক হয় নি রিসা,,, একদিন না একদিন সব জানবে,সব বুঝবে মিনি । তখন আরো বেশি কষ্ট পাবে ।
” আমি জানি না কিছু । কিন্তু আমার বাচ্চা মেয়েটাকে কষ্ট দিতে চাইনি আমি ।
” নতুন জীবন শুরু করলি না কেনো তাহলে ? গোটা জীবন পড়ে আছে তোর ।
রিসা তাকালো নিষ্ক্রিয় চোখে । হেসে বললো…..
” আমার জীবন তো একটাই । এই জীবনে কোন স্পর্ধায় দুজনকে ঠাই দেবো বল ? আরাফ আমায় ছেড়ে চলে গেছে, তাই বলে আমিও ওকে ছেড়ে অন্য কাউকে গ্রহণ করবো ? স্বার্থপর হবো আমিও ? আমি ওর হাত ধরেছি, ও ছেড়েছে এপাড়ে । পরপারে আবার ওর হাতই ধরবো আমি । তৃতীয় কেউ আসবে না আমাদের মাঝে । দোটানায় পড়তে চাই না আমি । একজনকে ভালোবেসেছি, তার শূন্য ভালোবাসা নিয়েই সারাজীবন কাটিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখি আমি । এপাড়ে দশ মাসের জন্য পেয়েছিলাম ওকে । ওপাড়ে অনন্ত কালের জন্য পাবো । অপেক্ষায় আছি ওপাড়ে যাওয়ার জন্য । ওকে পাওয়ার জন্য ।
ইয়াশ মৃদু হাসলো । ঠিক এই কথাটাই সেদিন রাতে শুনেছিলো রৌদ্রের মুখে । রিসা তার জীবনে কখনো কাউকে জায়গা দেবে না আর । সিদ্ধান্ত পাকা ।
আর ইয়াশ কি এতোটাই নিষ্ঠুর, যে তার বন্ধুর বিরহে তার স্ত্রীকে আপন করার উল্লাসে মাতবে ?
ইয়াশ বুক ফুলিয়ে লম্বা হাঁফ ছাড়লো । বললো রিসা…..
” তবে ভালো লাগছে তোকে দেখে, নতুন জীবন শুরু করেছিস তুই । রৌদ্রের বোন খুব সুন্দর । মিষ্টি একটা মেয়ে ।
” শুনেছিস তাহলে ওর পরিচয় ?
” রৌদ্র বলেছে । দেখবি,, তুই সুখি হবি অনেক ।
” আর তুই ?
” আমি পরপারে সুখ খুঁজে নেবো । এপাড়ে আমার মেয়েকে নিয়েই খুশি আছি আমি । আরাফও আছে আমার স্মৃতিতে ।
,,,,,,,
ওরা ঘরে আসতে আসতে মিনি ঘুমিয়ে পড়েছে । রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা । রিসা মিনি কে কোলে করে নিয়ে গেলো । শাফাহ্ গুটিসুটি মেরে মিনির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো এতক্ষণ ।
ইয়াশ আসতেই আরো বেশি জড়োসড়ো হয়ে গেলো মেয়েটা । পিটপিট করে ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানার এক কোণে শরীর এলিয়ে শুয়ে পড়লো । ভাবখানা এমন , যেনো সে ইয়াশকে ভয় পাচ্ছে । ইয়াশ ওকে পরখ করে সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে । মেয়েটার সাথে কথা বলা হয় নি সেই বিকেলের পর থেকে । ওর সংশয়ী অবস্থা আন্দাজ করতে পারছে যুবক । সে একপাশে বসলো ।
মাথা ধরেছে । সে দীর্ঘ ক্ষন নীরবে পরখ করলো শাফাহ্ কে । কেমন অদ্ভুত আবদার করে বসলো হুট করে….
মোলায়েম কন্ঠে ডাকলো প্রথমে…..
” টুকটুকি,,,
শাফাহ্ ভড়কে উত্তর করে….
” হু ?
” ঘুমাবে এক্ষুনি ? ঘুমানোর আগে মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেবে, প্লিজ ? ঘুমাতাম শান্তিতে ।
এক বসায় দেড় হাজার শব্দ লিখেছি । শেষের দিকে আউলা ঝাউলা, রিচেক দেইনি । বানানে ভুল ত্রুটি হলে মানিয়ে নেবেন । আগের দিন খুব সুন্দর মতো রেসপন্স পূর্ণ করেছেন । আজকেও করবেন, ওকে ? পরবর্তী পর্বে বাঁশ আসবে
। তৈরি থাকুন । রেসপন্স পূর্ণ হলে, ছোট করে হলেও কাল দেওয়ার চেষ্টা করবো । 
#চলবে………
Share On:
TAGS: আসবো ফিরে আবারো, সুরভী আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪০
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২১
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১০( প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২০(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৮
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৫
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৪+বোনাস
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৭
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬২
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৩