#আসবো_ফিরে_আবারো
#পর্ব_৬৯
#সুরভী_আক্তার
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ
)
কাবির পরিবারের সবার ভিড় হসপিটালের করিডোরে । মেহেরের অবস্থা নাজেহাল । গুরুত্বর বলা চলে । আকস্মিক মাথা ঘুরে পড়ে গেছে সে । এখন জ্ঞান শূন্য নিথর মেয়েটাকে তুলে আনা হয়েছে হসপিটালে ।
সায়ানের খোঁজ নেই আজ বেশ কদিন পেরোলো । সেই যে
কাবির ম্যানসন থেকে উধাও হয়ে গেলো , কই আর তো খোঁজ মিললো না । কোত্থাও নেই ছেলেটা । নিরুদ্দেশ পুরো । না কারোর সাথে যোগাযোগ করেছে, আর না খবর দিয়েছে নিজের । কেউ জানে না সে কোথায় !
এই দিকে ভাইয়ার চিন্তায় চিন্তায় খাওয়া, দাওয়া, ঘুম, সব বিসর্জন দিয়ে বলেছিলো মেহের । এতো স্ট্রেস কি সহ্য হয় ওটুকুনু নাজুক শরীরে ? সহ্য হয় নি । নেতিয়ে পড়েছে মেয়েটা । হুট করেই মাথা চড়কে জ্ঞান হারিয়ে পড়েছে আজ । তাৎক্ষণিক হসপিটালে নিয়ে আসা হয়েছে ওকে ।
ডক্টর দেখছেন ভেতরে । করিডোরে উপস্থিত সকলে । এলোমেলো কদমে পায়চারি করছে শুভ্র । অত্যাধিক টেনশনে স্থির থাকতে পারছে না এক দন্ড । সেই বা আর কত সহ্য করবে ? কত চাপ নেবে মাথায় ? কম ধকল তো যাচ্ছে না এই কদিনে । প্রাণ প্রিয় বন্ধুটার খোঁজ নেই,, আর এখন স্ত্রীর এই দশা । এসবে মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে তার ।
ডক্টর বের হতেই ছুটে গেলো সে । বিচলিত হয়ে শুধালো….
” ডক্টর,, মেহের কেমন আছে এখন ? কি হয়েছে ওর ?
পেছনে বাকিরা আছেন । প্রশ্নাত্মক চাহনি সকলের । ডক্টর বিষন্ন মুখে জবাব করলেন…..
” ওনার হেলথ কন্ডিশন খুব একটা ভালো নয় । শারিরিক ভাবে ভীষণ দূর্বল উনি । মেন্টাল প্রেসারেও রয়েছেন । সিকনেস থেকে জ্ঞান হারিয়েছেন । তবে একটা খুশির খবর আছে এর পাশাপাশি । উনি মা হতে চলেছেন ! ওয়ান এন্ড হাফ মানথ চলে ।
আকস্মিক সংবাদে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে গেলেন সকলে । অবিশ্বাসে চিকচিক করে উঠলো সবার মুখাবয়ব । শুভ্র বোধহয় বুঝেও বুঝলো না । এক কদম পেছালো নড়েচড়ে পায়ে । ঢোক গিলে নিভু প্রশ্নাত্মক স্বরে উচ্চারণ করলো সন্দিহান হয়ে….
” হ্যাঁ ?
” ইয়াহ্ । আপনার ওয়াইফ প্রেগন্যান্ট । বাবা হতে চলেছেন আপনি । আপনার স্ত্রী ও জানতো না । এই খুশির খবরটা সদ্য জানলেন তিনিও ।
শুভ্র ধড়ফড়িয়ে ওঠে । অত্যাধিক খুশিতে ভরে ওঠে বক্ষস্থল । হাসে অস্বাভাবিক । কদিনের ঝঞ্ঝাটের পর সুসংবাদে এই সবে ঠোঁটের কোণে হাসির দেখা মিললো তার । উচ্ছ্বাসে ভরে উঠলো অবিষন্ন মুখাবয়ব । ঠোঁট ভিজিয়ে বললো….
” আ.. আমার ওয়াইফ কেমন আছে এখন ?
” নাউ স্টেবল । তবে দূর্বল । খাওয়া দাওয়ার কমতি আছে । মা হওয়ার জন্য তার হেলথ কন্ডিশন খুব একটা স্ট্রং ছিলো না এ সময়ে । তবুও দেওয়ার মালিক আল্লাহ । এখন তার যত্নের প্রয়োজন । খাবারের দিকে খেয়াল রাখবেন । হাঁটা চলা কম করলেই ভালো । প্রেসার ক্রিয়েট করবেন না তার উপর । যত্ন নেবেন ।
ডক্টর চলে যেতেই হাঁসফাঁস করে কেবিনের ভেতরে ঢুকলো শুভ্র । মেহের শুয়ে আছে নিস্তেজ হয়ে । শুভ্র আত্মহারা হয়ে যায় ওকে দেখে । ছুটে গিয়ে স্ত্রীর পাশে বসে । রমনীর দুহাত আঁকড়ে নিজের হাতের মুঠোয় নেয় । আশপাশ নিছক জ্ঞানে উষ্ণ পরশ বুলিয়ে দেয় কপালে । বলে ঠোঁট ভিজিয়ে…..
” মেহের,,, ঠিক আছিস এখন , হ্যাঁ ? কতটা টেনশনে ফেলে দিয়েছিলি আমায়, ধারনা আছে তোর ? কতটা ভয় পেয়ে গেছিছিলাম আমি । তুই,, তুই মা…. মেহের তুই প্রেগন্যান্ট ! আ..আমি বাবা হবো মেহের ! ভাবতে পারছিস ? তুই শুনেছিস তো না ? আমাদের বেবি আসবে…
শুভ্রর অবস্থা ছটফটে । মেহেরের চোখ ভিজে আসে । মুচকি হাসে । কেবিনে সবাই উপস্থিত হয়েছেন ইতোমধ্যে । সবার সামনে শুভ্রর এমন অবস্থায় লজ্জা পেয়ে গেলো নাজুক মেয়েটা । তৌসিফ কাবির, শাহিনা কাবির, রুবিনা কাবির, সবাই আছেন । বড়দের সামনে লজ্জায় মুড়িয়ে গেলো রমনী । এতোক্ষণে সবাই সবটা শুনেছেন নিশ্চয়ই ?
মেহেরকে হসপিটাল থেকে ছাড়া হয় রাতের দিকে । ফুল বেড রেস্ট দেওয়া হয়েছে ।
এ কদিনে কাবির ম্যানসন গুমোট থাকলেও আজ যেনো ভরে উঠেছে পুরো । খুশিতে চিকচিক করছে সকলের মুখাবয়ব । দুঃখ ভুলে আজ হাসছেন সকলে । তবে কোথাও একটা শূন্যতা ঠিকি আছে ।
এইযে,, মেহেরের বাবা মা এসেছেন । মেহেরের বাবা সবটা জানলেও মা তো জানেন না কিছু । জানেন না নিজের ছেলের বিষয়ে । আজ আর তাকে ঠেকিয়ে রাখা যায় নি । মেয়ের গর্ভাবস্থার খবর পেয়েছেন তৌসিফ কাবিরের থেকে । কাবির ম্যানসনে আসার পর থেকেই প্রশ্ন করেছেন হাজার । তিনি জানতেন,, সায়ান সহ বাকিরা ট্যুরে গেছে । শুভ্র আর মেহের বাড়িতে ,, তাহলে সায়ান কোথায় ? কোথায় তার ছেলেটা ? হাজার বার প্রশ্ন করেছেন তিনি । মায়ের মন কু গাইছে । তিনি চেনেন নিজের ছেলেকে । ভালোবাসার মানুষটাকে হারিয়ে সে নিশ্চয়ই ট্যুরে গিয়ে মস্তি করবে না ! জানেন মিনারা বেগম । স্বামীর কথায় ভুলে এসেছেন এতো দিন । মনে খচখচানি থাকলেও ছেলের খোঁজ করেন নি । নিজেকে বুঝিয়ে এসেছেন বৃথা । তবে আজ আর পারলেন না ।
সবার এতো এতো গোপনতা ধরে ফেললেন ঠিকি । চমৎকার ভাবে সব চেপে যাওয়া হয়েছে তার কাছে । আজ বুঝতে পারলেন, তার ছেলের খবর নেই । নিরুদ্দেশ গত দিন দশেক ধরে । কোথায় আছে কেউ জানে না । ঠিক আছে তো আদৌও ? ঠিক থাকতে পারে ? যদি ঠিকই থেকে থাকে, তাহলে কোথায় ?
মিনারা বেগম অস্থির হয়ে উঠেছিলেন । শুভ্র মানায় তাকে । ইঙ্গিতে বোঝায়,, যেনো মেহেরের সামনে এই প্রসঙ্গ তোলা না হয় আর ।
নিচে তখন সবাই উপস্থিত । খোশ খবরে মিষ্টি আননো হয়েছে অনেক । কয়েক প্যাকেট মসজিদে বিলিয়ে দেওয়াও হয়েছে । কাবির পরিবারের নতুন সদস্য আসছে । নতুন জেনারেশন । এ বাড়ির বড় ছেলের প্রথম সন্তান ।
সবাই সব ভুলে খুশি আজ । অন্যদিকে থ বনে একপাশে বসে ছিলেন মিনারা বেগম । মেহের অসুস্থ । শরীরের অবস্থা ভালো নয় । স্ট্রেস দেওয়া বারন । মেয়ের সামনে ছেলের সংকটাপন্ন অবস্থা ঠাহর করেও কাঁদলেন না তিনি । রাতে এ বাড়িতেই ডিনারের আয়োজন করা হয়েছিলো । খেলেন না । যাওয়ার আগে চাপা কষ্টে শুভ্রকে বলে গেলেন ধরা গলায়…..
” আমার ছেলেটাকে তোমরা শেষ করে দিলে শুভ্র ? কথা দিয়ে কথা রাখলে না ! তোমার বাবা কথা দিয়েছিলেন, যদি তোমার সাথে মেহেরের বিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তিনি শাফাহ্ কে আমার ছেলের সাথে বিয়ে দেবেন । তিনি রাখতে পারলেন না সে কথা । আমার ছেলেটাকে বৃথা আশা দেখিয়ে ধ্বংস করলে তোমরা । নিজেদের জিনিস গুছিয়ে নিয়ে আমার ছেলেকে এভাবে ভাসিয়ে দিলে ? কোথায় আছে আমার ছেলে ? যদি ওর কোনো ক্ষতি হয়, তাহলে আমি তোমাদের কোনো দিন ক্ষমা করবো না শুভ্র । কোনো দিন না…..
চলে গেছেন তারা ।
শুভ্র প্রত্যুত্তর করে নি । সয়ে নিয়েছে ।
বাজে রাত নয়টা । ডিনারে দেরি হয়ে গেছে আজ । রৌদ্র ও ছিলো না । ফিরলো কেবল । সবাই খেতে বসবেন সবে ।
মেহেরের অসুস্থতার কথা শুনেছিলো বেপরোয়া যুবক । তবে কি হয়েছে জানে না এখনো । সে বাড়িতে ঢুকতেই শাহিনা কাবির গদগদ হয়ে মিষ্টি নিয়ে এগিয়ে গেলেন ।
” রৌদ্র, এসেছিস এতক্ষণে ? এই নে মিষ্টি খা আগে ।
বলতে বলতে এক টুকরো মিষ্টি রৌদ্রের মুখে ঠেসে দিলেন । রৌদ্র কপাল কুঁচকায় । খেতে খেতে বলে…..
” কিসের মিষ্টি মনি ?
আর মেহের, কেমন আছে ও ? কি হয়েছে ?
” তুই চাচ্চু হবি রৌদ্র ! মেহের মা হতে চলেছে । বাবা হবে শুভ্র । তারই মিষ্টি ।
গিলতে গিয়ে আকস্মিক যেনো মিষ্টি টুকু গলায় আটকালো রৌদ্রের । কেশে উঠলো খুক খুক করে ।
ঝট করে মেহেরের দিকে তাকালো । মেয়েটা লজ্জায় চিবুক নুইয়ে বসে আছে । পাশে শুভ্র ।
রৌদ্র ঢুকি চিপলো । সন্দিহান হয়ে বুলি ফুটালো…..
” কে বাবা হবে ?
” শুভ্র !
” এটা কি করে হতে পারে ?
আকস্মিক চেঁচিয়ে উঠলো সে । চমকালেন সবাই । শাহিনা কাবির কপাল কুঁচকে বললেন….
” কি কি করে হতে পারে ?
” শুভ্র ব্রো , তুমি এতো তাড়াতাড়ি বাবা হতে পারো কি করে ?
কয়েক ধাপ এগিয়ে শুভ্রর মুখোমুখি হয়ে বলে বসলো রৌদ্র । শুভ্র ভিড়মি খায় । কটমট করে তাকায় । রৌদ্র আবার বলে অস্থির হয়ে…..
” এটা কি হলো ব্রো ? তোমার আগে আমি বিয়ে করেছি । মা তো আগে আমি,, থুরি আমার বউ হবে । তোমার বউ আমার বউয়ের আগে মা হয় কি করে ? তুমি চিটিং করেছো !
আরো বেশি থতমত খেলো শুভ্র । ভ্যাবাচ্যাকাময় দৃষ্টিতে এপাশ ওপাশ নজর বোলালো । বড়রা সবাই উপস্থিত । নির্লজ্জ ছেলের এমন ঠোঁটকাটা কথায় অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন সকলে । সবার মাঝে ঘন পলক ফেললো শুভ্র । চোখের ইশারায় সংযত করার চেষ্টা করলো রৌদ্রকে । কিন্তু না । সেতো বেপরোয়া । দমে হয় কি এতো সহজে ? বোঝার চেষ্টাও করলো না ।
এপাশ ওপাশ খুঁজলো মেঘা কে ।
” মম,, আমার বউ কোথায় ?
রুবিনা কাবির এবার ভ্যাবাচ্যাকা খান । এই ছেলেকে বিশ্বাস নেই । বেফাঁসে কখন কি বলে দেয় হুঁশ থাকে না । ভদ্রমহিলা ঝটপট উত্তর করলেন…..
” ঘরে !
ব্যাস । থামলো না রৌদ্র । গটগটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো । আদ্র নামছিলো । দুই ভাই একে অপরকে পাশ কাটাতে গেলে একটু থামলো রৌদ্র । আদ্রের দিকে ফিরে চাপা স্বরে বিড়বিড় করলো মাড়ি খিচে……
” কালকের মধ্যে আমিও বাবা হয়ে দেখাবো । বলে রাখলাম….
আদ্র কপাল গুটায় । অস্ফুটে শুধোয়…
” হোয়াট ?
” তোর আগে বাপ হবো আমি । তুই শুধু দুনিয়া’টাই তেইশ সেকেন্ড আগে দেখেছিস । তোর আগে বিয়েও করেছি, বাসর ও করেছি, এবার বাবাও হয়ে দেখাবো । দেখে নিস । বড় আব্বু ডাক শোনার জন্য তৈরি হয়ে থাক বড় ভাই । হুহহহ্,, লজ্জা থাকা উচিত !
আদ্র কটমট করে তাকায় । রৌদ্র পরোয়া না করে উঠে যায় উপরে । নিচে দুজনের চাপা কথাগুলো শুনবো না কেউই ।
রৌদ্র চলে যেতেই শুভ্র শ্বাস ফেললো দুদিকে মাথা নাড়িয়ে । শাহিনা কাবির পরিস্থিতি বুঝে আস্তে ঘাড় ঝাঁকালেন । এগিয়ে বললেন ছেলের উদ্দেশ্যে….
” শুভ্র,,,, শাফাহ্ কে একটাবার কল করে দেখ না । সেই যে কথা হলো ,, আর তো হলো না । মেয়েটাকে এই খুশির খবর টা দেবো না ? সবাই জানলো, ও জানবে না ? মেয়েটা খুব খুশি হবে শুনলে ।
শুভ্রর চোয়াল খিচে আসলো নিমিষেই । মস্তিষ্ক চড়াও হলো । মায়ের কথায় বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিলো না । তোয়াক্কা করলো না । উঠে দাঁড়িয়ে হুংকার ছাড়লো…..
” মেহের,,, ওঠ । রুমে গিয়ে ডিনার করবি ।
পিটপিট করে তাকায় মেহের । আলগোছে উঠে দাঁড়াতেই সবার সামনে শুভ্র দ্বিধাহীন ওকে পাঁজাকোলা করে নিলো । হাঁটা চলা বারন । সিঁড়ি ওঠা তো একেবারেই নিষিদ্ধ । সে মেয়েটাকে সামলে পা বাড়িয়ে বললো রুবিনা কাবিরের উদ্দেশ্যে……
” মামনি,, কালকের মধ্যে নিচের একটা ঘর পরিষ্কার করে রাখার ব্যবস্থা করো প্লিজ । আমরা নিচে শিফট করবো । সিঁড়ি ওঠা নামা কষ্ট হয়ে যাবে নয়তো ।
শাহিনা কাবির ছেলের তপ্ত মেজাজের কারন যথেষ্ট বুঝতে পারলেন । দীর্ঘ হতাশার শ্বাস ফেললেন তিনি । আদ্র নিচে নামতেই ওকে চেপে ধরলেন ভদ্রমহিলা । এ কদিনে বেশ কবার ফোন করেছিলো আদ্র । ইয়াশ রিসিভ করে নি । পূর্ব থেকেই আশাহত হয়ে আজকেও ফোন করলো । রিসিভ হলো না প্রথম দুবার ।
তৃতীয় এবং শেষ বার ফোন করলো । তিন বার রিং হতেই আশ্চর্যজনক ভাবে এবারে রিসিভ হলো । ধক্ করে উঠলো আদ্র । তড়িঘড়ি করে ফোন স্পিকারে দিলো । ওপাশের সাঁড়া শব্দ না পেয়ে আগ বাড়িয়ে ডাকলো…..
” ইয়াশ ?
” হু !
তপ্ত যুবকের ভারী উত্তর । ঘুমের রেশ কন্ঠে । বোধহয় এখনো ওঠেনি । সেখানে সকাল সাতটা কি আটটা হবে । আদ্র বললো উদ্বিগ্ন হয়ে…..
” কদিন ধরে ফোন করছিলাম, ধরছিলে না যে ?
” এমনি ।
” টুকটুকি কোথায় ?
” ঘুমোচ্ছে !
” ওকে দেওয়া যাবে ? কথা বলতাম । মনি কথা বলবে ।
ইয়াশ উঠে বসলো । গা মুড়িয়ে চোখ ডললো । ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখে বললো ঘোরের বশে…..
” দশটার আগে উঠবে না ও ।
আদ্র চোখ সরু করে । কথাটার অর্থ বোঝার চেষ্টা করে । বলে খানিক বাদ…..
” ঘুমের স্বভাব দূর হয় নি এখনো ? ডেকে দাও । আমাদের কথা বলো !
” সন্ধ্যার পর ফোন দেবো, তখন কথা বলে নিও !
ইয়াশের দ্বিরুক্তি দেখে আদ্র শুধোয় ভারী জবানে….
” তুমি কোথায় ?
” রুমে !
” টুকটুকি ?
” পাশের রুমে !
লাউড স্পিকারে থাকায় কথাটা সবার কানে পৌঁছেছে । একসাথে কপাল কুঁচকালেন সকলে । বোঝার চেষ্টা করলেন । আদ্র খানিক অপ্রস্তুত হয় । বাবা আর বাবাই কে চোরা চোখে দেখে নেয় । যথেষ্ট বুঝতে পারে , শাফাহ্ আর ইয়াশ আলাদা থাকে । ওর সাথে সাথে সবাই বুঝলো এটা । বাকি রইলো না কেউ ।
,,,,,
রুমে এসে তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে রৌদ্র । মেঘা একটু আরামে বসে ছিলো । লোকটার সহ্য হলো না । কিসব আজেবাজে বকছে তখন থেকে । মেঘা সহ্য করছে । তবে বুঝতে পারছে না খুব একটা । সে রেগে বললো এক পর্যায়ে…..
” কি সব বলে চলেছেন তখন থেকে ? কি হয়েছে ?
” মেহের মা হয়েছে !
মেঘা চোখ সরু করলো । ভ্রু নাচিয়ে বললো….
” তো ?
” তুমি কবে মা হবে ? আবে সুইটহার্ট,,, বাবা হতে চাই আমি । আই ওয়ান্ট আস টু হ্যাভ অ্যা বেবি । ইউ নো,, বাবা হওয়ার বড্ড সখ আমার । তোমাকে মা হতে দেখার সখ । আই রিয়েলি ওয়ান্ট টু সি ইউ অ্যাজ আ মাদার ।
থামলো এক মুহুর্ত । মেঘা স্তব্ধ হয়ে গেছে নিমিষেই । চোখাচোখি চলছিলো নিবিড় ভাবে । রৌদ্র থামতেই চোখ নামালো একবিংশী । মৃদুমন্দ লাজে খচখচ করলো । রাঙা হয়ে উঠলো কপোল দুখানি । আলগোছে ঢোক গিললো । তীক্ষ্ণ চোখে ওর এই আড়ষ্টতা অবলোকন করলো রৌদ্র । হাত বাড়িয়ে রমনীকে কাছে টানলো । লতানো কোমর পেঁচিয়ে কপালে কপাল ঠেকালো । অপর হাতে রমনীর গাল ছুঁইয়ে কান পর্যন্ত পৌঁছালো । রমনীর নরম নাসিকার ডগায় নাক ছুঁইয়ে বললো আধো আধো স্বরে…..
” ইডিয়ট,, লজ্জা পাও এখনো ? পাও, যত খুশি তত পাও । তার আগে এই লজ্জা হরনের প্রতিদান দাও । বেবি চাই আমার ।
আই থিংক, উই আর রেডি টু বিকাম প্যারেন্টস । রৌদ্র আর তার রৌদ্রময়ীর জীবনে কেউ আসুক, আই ডেসপারেটলি ওয়ান্ট ইট সানি । প্লিজ…
বড্ড আবেদন সেই কন্ঠে । মেঘা পেছানোর কসরত করে । কম্পিত হাতে রৌদ্র কে দূরে ঠেলতে চায় । তবে অক্ষম সে । খুইয়ে যায় শক্তি । পারে না । হাত দুটি থমকায় বেপরোয়া যুবকের সুঠাম বক্ষের ধারে । রৌদ্রের তপ্ত শ্বাস স্পষ্ট অনুভব করে রমনী । উষ্ণ নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে মুখের উপর । লোকটার হাতের বিচরন অবাধ্য হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে । একবিংশী বারংবার ভেজা ঢোক গেলে । জিভে ঠোঁট চুবিয়ে বলে থেমে থেমে….
” রৌদ্র,, সরুন প্লিজ । ডিনারের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে….
” ইভারা,, কাছে এসো প্লিজ । আমাদের বেবি দুনিয়াতে আসার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে ।
মেয়েটাকে নকল করলো সে । বললো একই টোনে । মেঘা ঝট করে তাকায় । অবিলম্বে কুঁচকে আসে আঁখি লতা ।
রৌদ্র ও তাকিয়েছে । খুব কাছ থেকে চোখাচোখি হতেই হেসে ফেললো যুবক । মেঘা কটমট করে । থোরিই না পরোয়া করে রৌদ্র । উল্টো আরো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে রমনীকে । একটানে একবিংশীর কেশরাশী এলোমেলো করে দিয়ে উন্মত্তের ন্যায় নাক ডোবায় কাঁধের ভাঁজে । ছোট ছোট বেশ কয়েক পরশ বুলিয়ে সরে আসে ।
অতঃপর বিলম্ব হীনা হুট করেই একবিংশীর কোমল অধরের ভাঁজে খুঁজে নেয় অমৃত সুধা ।
,,,,
মোবাইলে টুং টাং মেসেজ আসতেই ওষ্ঠপূট প্রসারিত হলো ইয়াশের । হালকা হলো বক্ষস্থল । ঠোঁটের ভাঁজের সিগারেট টা ছুড়ে ফেললো পুলের পানিতে । পড়নে শর্ট’স, উদ্যম শরীর । এই ভর সন্ধ্যায় শাওয়ার নেবে এখন । সেই এক ঘন্টা যাবৎ তার অবস্থান লাউঞ্জে । হসপিটাল থেকে ছুটি নিয়েছে আবার । এবারে এক সপ্তাহের ছুটি । ছুটি শুরু পরশু থেকে । আজ ইচ্ছে করেই যায়নি । সকালে একবার ঘুরে এসেছে শুধু ।
এতক্ষণ এখানে বসে বসে সিগারেট টেনেছে একের পর এক । হয়তো এই মেসেজটারই প্রতিক্ষায় ছিলো ।
উপর পানে মুখ তুলে দীর্ঘ হাঁফ ছাড়ল সে । ফোন রেখে ঝাঁপ দিলো পুলে । শাওয়ার নিলো দীর্ঘ সময় ধরে ।
শাফাহ্ রুমে । এদিকে পা বাড়ানোর সাহস পায়নি । সিগারেট খাচ্ছিলো ইয়াশ । সেই ভয়ে আসেনি ।
কলিং বেল বাজলো দরজায় । এ বাড়িতে কেউ আসে না সচরাচর । এই প্রথম কলিং বেলের আওয়াজ শুনলো শাফাহ্ । তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বেরোলো সে । শব্দ শুনে ভেজা শরীরে কোনো রকমে কাপড় জড়িয়ে ইয়াশ ও লিভিং রুমে এসেছে । শাফাহ্ কে দেখলো মুখোমুখি । অতঃপর দরজার দিকে তাকালো । শাফাহ্ বিষ্ময়ে বলে…..
” বাব্বাহ,,,, এই রাক্ষসের বাড়িতেও কেউ আসে বুঝি ? কে আসলো ?
ইয়াশ রেগে তাকায় ।
” শাট আপ,,, রুমে যাও ।
রমনী মুখ বাঁকালো…..
” রুমে যাবো কেনো ? কে আসলো , দেখবো না আমি ?
” রুমে যেতে বলেছি আমি ।
বড্ড ক্রোধ প্রকাশ পেলো কন্ঠস্বরে । উচ্ছ্বাসিত মেয়েটা চুপসে যায় । হাত গুটিয়ে ঘরে ঢোকে আবার ।
ইয়াশ আগ পিছ না ভেবে দরজা খুললো । হয়তো জানা ওপারে কে অথবা কি হতে পারে ।
কেউ নেই দরজার ওপারে । চৌকাঠের ঠিক সামন বরাবর মেঝেতে বিশাল এক বুকে । ফুলের বুকে । হলুদ গোলাপ । ইয়াশ তা দেখে তপ্ত শ্বাস ফেললো । রাগে খিচে এলো চোয়াল । ভেজা চুল থেকে টপ টপ করে পানি ঝড়ছে । ভিজে গেছে পড়নের টি শার্ট । সে রাগ সামলাতে ভেজা চুল টেনে ধরে মুঠোতে । পরক্ষণে ব্যাক ব্লাশ করে ঠেলে দেয় পেছনের দিকে । ফুলের বুকেটা হাতে তুলে নিলো । উদ্দেশ্য ছুড়ে মারা । তবে তার আগেই পেছন থেকে ছুট্টে আসে শাফাহ্…….
” ফুলললল,,,
ওয়াও হলুদ গোলাপ । কতদিন ফুল ছুঁই না….
আমার জন্য এনেছেন ? দিন দিন….
মেয়েটা হাত বাড়িয়ে দিলো । চোখে মুখে ভরা আনন্দ । ঐ যে ,, ফুল পছন্দ তার । ফুলের ঘ্রাণে যেখানে সকাল শুরু হতো । সেখানে গত কদিন ধরে ফুলের দেখাও মেলে না । স্পর্শ তো অনেক দূর ।
আকস্মিক শাফাহ্ কে দেখে দমে যাওয়া ক্ষুব্ধতা তড়তড়িয়ে বাড়লো তপ্ত যুবকের । দাঁতে দাঁত চেপে ঝাড়ি মারলো বজ্র কন্ঠে…..
” স্টুপিড,,, কোন সাহসে বাইরে এসেছো তুমি ?
চমকে পিছিয়ে গেলো শাফাহ্ ।
ভয়ার্ত রুপ নিলো স্নিগ্ধ মুখাবয়ব । ইয়াশ ঝটপট করে আশেপাশে তাকায় । বিকেল ঝিমিয়ে এসেছে অনেকক্ষণ হলো । এপাশ ওপাশ নজর বুলিয়ে ফুলের বুকেটা সর্বশক্তি দিয়ে অদূরে ছুড়ে মারলো সে । অতঃপর খপ করে চেপে ধরলো শাফাহ্’র হাত । হিচড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে ঠাস করে দরজা আটকে দিলো । বিকট শব্দে আরো বেশি চমকালো শাফাহ্ । টাল সামলে ওঠার আগেই ফের কানে বাজলো বজ্র ধমক…..
” একদম মেরে সোজা করবো যদি আমার কথা না শোনো তবে । রুমে যেতে বলেছিলাম তোমায় । বলো বলেছিলাম কি না ? আমার কথা উপেক্ষা করে কোন সাহসে বাইরে এসেছো তুমি ?
সিটিয়ে গেলো মেয়েটা । ভয়ে ভয়ে চোখ ছোট করে তাকালো পিটপিট করে ।
” অ্যান্সার মি..?
এবারে মেয়েটার কনুই চেপে নিজের দিকে হিচড়ে আনলো তপ্ত যুবক । শাফাহ্ কেঁপে ওঠে পরপর ভারী ধমকে । ভিজে আসে অক্ষিপট । ভয়ের তোপে পানি গড়ায় টপাটপ । ইয়াশের বিভৎস ক্রোধ দেখে শুকিয়ে যায় কন্ঠনালি । বলে মিনমিনিয়ে…..
” স..সরি !
ইয়াশ ঝাড়া মেরে ওকে দূরে সরালো । রমনীর দূর্বল তনু ছিটকে পড়লো মেঝেতে । কিঞ্চিত ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলো । পরোয়া করলো না যুবক । আঙ্গুল তুলে শাশালো…..
” নেক্সট টাইম যদি আমার কথার হেরফের করো , তাহলে আর সংযত থাকবো না আমি । হাত উঠে যাবে গায়ে । মনে রেখো কথাটা ।
যুবক থামলো না একদন্ড । গটগটিয়ে নিজের নির্ধারিত ঘরটায় ঢুকে ঠাস করে দরজা আটকে দিলো ।
ফেলে গেলো জর্জরিত রমনীকে । টুপটাপ ঝড়ঝড়িয়ে পানি ঝরলো মেয়েটার ডাগর চোখ জোড়ার পাপড়ি ছাপিয়ে । ঠোঁট ভেঙে কান্না আসলো । ওষ্ঠপূটে দাঁত বসিয়ে সেই কান্না খুব সহজে গিলে নিলো বোকা মেয়েটা । উঠে দাঁড়িয়ে এলোপাথাড়ি ছুটলো ঘরের দিকে ।
আটটা বাজতে চললো প্রায় ।
এতক্ষণ নিস্তব্ধ ছিলো পুরো পেন্ট হাউস । ইয়াশ ঘর ছাড়লো এতক্ষণে । পুরো বাড়ি ঘুটঘুটে অন্ধকার । আলো জ্বালানো হয় নি । ভড়কায় তপ্ত যুবক । পাশের ঘরের দিকে তাকায় । আলোর ছিটেফোঁটাও নেই । লিভিং রুমের আলো জ্বালিয়ে সেই ঘরে ছুটলো সে । দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকা মাত্রই ছ্যাত করে উঠলো । ঘুটঘুটে অন্ধকার । নিভু আলোটাও জ্বালায় নি এই মেয়ে । তড়িঘড়ি করে সুইচ বোর্ড হাতড়ে লাইট অন করলো সে । সাথে ফোনের ফ্লাশ । ধক্ করে আলো জ্বলতেই প্রথমেই নজর পড়লো বিছানার দিকে ।
চাদর মুড়িয়ে পুরো সেপ্টে লুকিয়ে আছে শাফাহ্ । ছিমছাম তন্বী গুটিয়ে পুরো কচ্ছপের ন্যায় সিটিয়ে আছে বেডের এক পাশে । ইয়াশের বক্ষস্থল কেঁপে ওঠে অজানা আশঙ্কায় । হাঁটু কাঁপে থরথরিয়ে । তেড়ে যায় সে । মুখোমুখি দাঁড়ায় । মাথা অবধি চাদর টেনেছে এই মেয়ে । ইয়াশ হাত বাড়িয়ে দিয়েও ফিরিয়ে নিলো । নরম সুরে ডাকলো গলা ভিজিয়ে……
” টুকটুকি,,, এইইই টুকটুকি । ঘুমিয়েছো ?
মুহুর্তেই ঝট করে মাথা থেকে ঝাড়া মেরে চাদরটা সরিয়ে দিলো শাফাহ্ । ইয়াশ কে দেখে ফিক করে হেসে উঠলো । উত্তরে না বোধক মাথা নাড়ালো । ওকে ঠিকঠাক দেখে বুকে হাত রেখে হাঁফ ছাড়ে ইয়াশ । ধমকে বলে…..
” লাইট জ্বালাও নি কেনো ঘরের ?
উঠে বসলো মেয়েটা । নাক টানলো । দু হাতের আজলে মুখ মুছলো । ভারী এক ঢোক গিলে বললো…..
” মানিয়ে নিতে বলেছিলেন না ? তাই অন্ধকার টাকে মানিয়ে নিচ্ছি ।
কন্ঠস্বর অদ্ভুত । কেমন জড়িয়ে আসা । ভারী কান্নার তোপ স্পষ্ট । অস্পষ্টতা কন্ঠে । তার আসল স্বর বিলিন । বহুক্ষণ ধরে কান্না করলে যেমন হয় , ঠিক তেমন ।
ইয়াশ বুঝতে পারলো । চোখ নামিয়ে সূক্ষ্ম করলো চাহনি । মেয়েটার মুখশ্রী পরখ করলো । চোখ দুটো বিভৎস ফোলা । লাল হয়ে এসেছে আর্দ্র কিনার । ভেজা ছাপ পুরো মুখ জুড়ে । নাক টানছে বারবার ।
শুচি শুভ্র রমনীর এমন হাল অবলোকন করা মাত্রই দৃষ্টিতে ঘন পলক পড়তে লাগলো যুবকের ।
তাকাতে পারলো না । নত করলো দৃষ্টি ।
শাফাহ্ চায় চোখ তুলে । গলা কাঁপছে এখনো । হেঁচকি আসছে । ফিকড়ে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে । সব ঢেকে রমনী ভরা গালে হেসে বলে….
” কিছু বলবেন ?
ইয়াশ কথা খুঁজে পেলো না । বললো…..
” খাবে না ? খাবার অর্ডার করবো । কি খাবে ?
” খিদে নেই । পেট ভরা আছে পুরো । আপনি নিজের জন্য অর্ডার দিয়ে খেয়ে নিন । আমি ঘুমাবো । আপনি যান ।
” ভয় পাবে না একলা ?
” উঁহু । আমার বডিগার্ড নন আপনি । একলা থাকাটা শিখে নেবো ।
কথা শেষ করে হাসলো মেয়েটা । কি চমৎকার হাসি । তার আড়ালে বিষন্নতা । ইয়াশ তাকিয়ে থাকতে পারে না । অদ্ভুত রহস্যময় লাগে এই মেয়েকে । চোখ ধাঁধিয়ে যায় তপ্ত যুবকের । প্রসঙ্গ খুঁজে ফোনের স্ক্রিনে কিছু একটা করতে করতে বলে…..
” তোমার বাড়ি থেকে ফোন এসেছিলো । কথা বলে নাও ।
শাফাহ্ ছলাৎ করে ওঠে । ততক্ষণে ফোনের ওপাশে রিং হচ্ছে । মেয়েটা ব্যাকুল হয়ে পড়লো । ছটফট করে বেড সাইড টেবিলের উপর থেকে পানির গ্লাস তুলে নিলো । ঢকঢক করে খালি করলো পুরোটাই । বুক ফুলিয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস টানলো সে । ভারী কন্ঠটা হালকা আর স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো । হাসি টানলো ঠোঁটে ।
ইয়াশ অবাক লোচনে চেয়ে দেখে ওর কান্ড । মেয়েটা তেমন নয় , যেমনটা সে দেখায় ।
ফোন রিসিভ হয়েছে । আদ্রের কন্ঠ…..
” হ্যালো ।
শাফাহ্’র হাসি টুকু গায়েব । ফিকে হয়ে আসলো , বললো ইশারায়…..
” আম্মু কে দিতে বলুন ।
তাই বললো ইয়াশ । শাহিনা কাবিরের হাতে ফোন ধরিয়ে দেয় আদ্র । শাফাহ্ হুড়মুড়িয়ে খাট থেকে নেমে হামলে পড়ে…..
” হ্যালো আম্মু ,,, কেমন আছো ?
” আমি ভালো আছি । তুই কেমন আছিস ?
” আমি…? আমি খুব ভালো আছি !
টুপ করে পানি ঝরে রক্তিম কপোল ছুঁইয়ে । অথচ মেয়েটা অতর্কিতে হেসেই যায় । হাসিতে লুকায় যাতনা । বড্ড বুঝদার আর চাপা স্বভাবের এই মেয়ে । ইয়াশ আজ বেশ বুঝতে পারলো ।
শাহিনা কাবির বলেন ওপাশ থেকে….
” এতো দিন ফোন করিস নি কেনো ? ফোন করলেও ধরিস নি ।
” আমার কাছে তো ফোন নেই । আর মেঘার ভাইয়া তো হসপিটালে ব্যস্ত থাকেন সব সময় । সময়ই পান না । আচ্ছা, এখন থেকে আমি রোজ ফোন করবো,কেমন ?
” তোকে একটা খুশির খবর দিই ?
” কি খবর ?
শাহিনা কাবির হেসে বললেন…..
” তুই জানিস,,, মেহের প্রেগন্যান্ট । ফুপি হবি তুই । তোর ভাইয়া বাবা হবে শাফাহ্ । আমাদের বাড়িতে নতুন অতিথি আসতে চলেছে ।
শাফাহ্ নড়েচড়ে উঠলো । এবার হাসলো সত্যি সত্যিই । উদগ্রীব হয়ে বুলি ফুটালো…..
” সত্যিই আম্মু ?
” হু !
” ভাইয়া কোথায় ?
” ও তো বাড়িতে নেই । বেরিয়েছে একটু ।
” মেহের আপু ?
” এখানেই আছে ! কথা বলবি ?
” হ্যাঁ দাও……
শাহিনা কাবির মেহেরের দিকে ফোন বাড়িয়ে দেয় । ফোনের এপাশ থেকেই তাচ্ছিল্য শুনতে পায় শাফাহ্ । মেহের স্পষ্ট জবানে বলে উঠলো…..
” কথা বলতে ভালো লাগছে না মা । কারোর সাথে কথা বলতে পারবো না ।
ওর কথাটার অর্থ বুঝতে বাকি রয় না রমনীর । কেনো বললো, সে জানে । হাসি হাসি মুখখানা শুকিয়ে আসলো মেয়েটার । নিভে গেলো সব খুশি । ধূর্ত মেয়েটা বুঝতে দিলো না । ইয়াশ কে টপকে একপাশে দাঁড়ালো । কন্ঠ নামালো, যাতে শুনতে না পায়…..
” থাক আম্মু ,,, তুমিই বলো, ভালো আছে মেহের আপু ?
” হু,, তবে একটু দূর্বল ।
” আব্বু, বাবাই, ভাইয়া, মামনি, ওরা কেমন আছে ?
” সবাই ভালো আছে !
” আদ্র ভাইয়া, শিশির, মেঘা, রৌদ্র ভাইয়া, ওরা ?
” ওরাও ভালো আছে ।
মেয়েটা দমে গেলো । ঢোক গিললো । বহু কষ্টে বুলি ফুটালো জড়িয়ে আসা গলা চিরে….
” আর আমার বাডি ? সায়ান ভাইয়া কেমন আছে আম্মু ?
শাহিনা কাবির থমকান এহেন প্রশ্নে । ঢোক গেলেন । সত্যিটাই বলেন সময় নিয়ে…
” নেই । ভালো নেই ও ! কেমন আছে জানা নেই আমাদের ! কোথায় আছে জানা নেই । তুই চলে যাওয়ার পর থেকে সায়ানের আর কোনো খোঁজ নেই শাফাহ্ । ছেলেটা হারিয়ে গেছে হঠাৎ ।
রমনীর নড়েচড়ে অনুচ্চ শরীর খানা দুলে উঠলো কেমন । কম্পন বয়ে গেলো সর্বাঙ্গে । চোখ ছাপিয়ে টুপটাপ পানি ঝড়লো । এ বেলায় গলার নিকট দলা পাকিয়ে আটকালো রুদ্ধ নিঃশ্বাস । বুক ফাঁকা হয়ে আসলো ।
বুক ভরতে হাপুসহুপুস করে উঠলো মেয়েটা । দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না । শক্তি খুইয়ে আপনা আপনি পিছিয়ে ধপ করে পড়ে গেলো মেঝেতে । আহ্ সূচক আর্তনাদে মৃদু কুকিয়ে উঠলো ।
মেয়ের আর্তনাদে ওপাশে ধক্ করে ওঠেন শাহিনা কাবির । ব্যস্ত হয়ে পড়েন…..
” শাফাহ্,,, কি হলো মা ! শাফাহ্ ?
আদ্র ছ্যাত করে ডাকে বিচলিত কন্ঠে……
” হ্যালো,,, টুকটুকি ? হ্যালো……
ফোন কেটে দেওয়া হয়েছে ।
মেয়েটা কুকিয়ে উঠতেই ধড়ফড়িয়ে ছুটে গেলো ইয়াশ…..
” টুকটুকি ,,, কি হয়েছে ? পড়ে গেলে কি করে ?
রমনী পাথরের ন্যায় জমে গেছে । অঝোরে বৃষ্টি নামছে গাল বেয়ে । ইয়াশ ওকে এভাবে নিঃশব্দে কাঁদতে দেখে ঝাঁকালো….
” এইইই টুকটুকি ?
সর্বাঙ্গে নড়েচড়ে উঠলো মেয়েটা । তাকালো নির্বিকার ভঙ্গিতে । হেসে বললো…..
” হ্যাঁ,,, ক….কিছু না । অন্ধকারে পা জড়িয়ে গেছে । কথা বলা হয়ে গেছে আমার । আপনি ফোন নিয়ে যান । ঘুমাবো আমি । ঘুমানো প্রয়োজন । যান ।
ইয়াশ চোখ সরু করে । শাফাহ্’র দৃষ্টি মেঝেতে । আবার বললো তাড়া দিয়ে….
” কি হলো, যান । আমি ঘুমাবো !
ইয়াশ দ্বিরুক্তি করলো না । উঠে দাঁড়িয়ে পা বাড়ালো । পিছু ফিরে নিষ্ক্রিয় চোখে দেখলো আরো একবার । চৌকাঠ মারাতেই শাফাহ্ তেড়ে এসে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দেয় । চমকে পেছনে তাকায় ইয়াশ । কপালে ভাঁজ পড়ে গাঢ় । বোঝে না আকস্মিক কান্ড ।
মেয়েটা দোর লাগিয়ে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে বসেছে । দুহাতে মুখ চেপে ধরে কেঁদে উঠেছে ফিকড়ে । কান্না ধরে রাখতে না পেরে হেঁচকি উঠে গেলো গলা চিরে । এবারে ডুকরে কেঁদে উঠলো সেই চঞ্চলা বোকা রমনী । শক্ত দরজায় সর্বশক্তিতে সজোরে মাথা ঠুকলো । ব্যাথা পেলেও পরোয়া করলো । মনের ব্যাথার চেয়ে এ ব্যাথা বেশি নয় । নগন্য অতি ।
সব ওর জন্যই হয়েছে । সায়ানের খোঁজ নেই, ওর নিখোঁজ হওয়ার পেছনে দায়ী শাফাহ্ ।
তীব্র অপরাধ বোধে গগন কাঁপিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করলো ওর । চোখের ভেজা কার্নিশে ভেসে উঠলো সায়ানের নিষ্পাপ সেই মুখাবয়ব । অবিরাম মনোরম ভালোবাসা প্রকাশ পেতো সেই চেহারায় । কিন্তু শাফাহ্ বোঝে নি,, দেয় নি সেই ভালোবাসার কদর । মিছে ছুটেছে মরীচিকায় । আজ তার কষ্ট হলো । চারদিকের দেয়াল ঠেসে ধরলো তাকে । দোষারোপ করতে লাগলো বদ্ধ বাতাস ।
তীব্র যন্ত্রণায় শক্ত করে মাথা চেপে ধরে শাফাহ্,,, চেঁচিয়ে ওঠে বন্ধ ঘরে….
” আ’ম সরি বাডি । খুব করে সরি । পারলে ক্ষমা করে দিও আমায় । আমি তোমায় বুঝতে পারলাম না , বাসতে পারলাম না ভালো । আমি ভালো না, বাডি । তোমার কিউটিপাই মোটেও ভালো না । সে খুব খারাপ, নিষ্ঠুর পাষান । তোমাকে কষ্ট দিয়েছে সে । বিনা দোষে শাস্তি পাচ্ছো । এ যে বড্ড যন্ত্রনার । বুঝি আমি ।
কেনো ভালোবাসলে আমায় ? আমি যে ভুল ছিলাম । কেনো ভুলটাকে ফুল ভেবে সেধে কাঁটার আঘাত বরন করলে ? কেনো আমরা তাদেরকে ভালোবাসি, যে আমাদের নয় ? কষ্ট পেতে হয় যে এতে । কে বোঝে এই যন্ত্রনা ? তুমি খুব কষ্ট পেয়েছো তাই না ? বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে এই কষ্ট দিতে চাইনি । শেষে চেয়েছিলাম তোমার হতে । কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে আমার পথ বদলে গেছে । কি করবো এখন আমি ? কি করবো ? আআআ…
থামলো মেয়েটা । নিভে আসলো দাপুটে স্বর । শ্বাস টানলো হা করে । হাঁটু জড়িয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো । মাথা নামিয়ে বিড়বিড় করলো ক্রন্দনরত অস্পষ্ট স্বরে…..
” আমি তোমার হতে পারলাম না সায়ান ভাইয়া । আ’ম সরি ! তুমি ক্ষমা করো না আমায় । আমি বুঝেও বুঝিনি তোমায় । ক্ষমা করা উচিত নয় আমার মতো মেয়েকে । কিছুতেই না । আমি খারাপ, খুব খারাপ আমি । যোগ্য নই তোমার । কেনো এই অযোগ্য মেয়েটার জন্য নিজেকে কষ্ট দিলে তুমি ? বোকা আমি বুঝলাম না যে তোমায় ।
ফুঁপিয়ে থামে । যন্ত্রণায় কাতরায় ।
সে থামতেই নিস্তব্ধ হয়ে যায় পুরো ঘর । রাত বাড়ে । রমনীর মাথা ধরে আসে । কাঁদার অভ্যাস কোনো কালেই ছিলো না । কিন্তু এখন তা নিত্যদিনের সঙ্গী । সাথে মাথা যন্ত্রণা । মেয়েটা নেতিয়ে এলো । ঝিমিয়ে পড়লো পুরো শরীর । কনকনে ঠান্ডা মেঝেতে লুটিয়ে শুয়ে পড়লো । জীবনের সাথে মিলিয়ে গান মনে পড়লো একটা । চোখ বুজে আসার আগে রমনী হেসে বিড়বিড় করে গায় দু লাইন…..
“ মন কেঁদে কয় আমারে,, তুই তো মানুষ চিনলি না ।
আসল প্রেমের মানিক চিনলি নাআআ….
খাঁটি সোনার কদর দিলি না ।
তুই তো বন্ধু মানুষ ভালা নাআআআআ…
তুই তো বন্ধু মানুষ ভালা না ।
মেয়েটা তাচ্ছিল্য করে হাসে । আসলেই সে মানুষ চিনলো না । কদর দিলো না খাঁটি সোনার ।
কি বুঝলেন কন দেখি ? এবার তো দুটো ধামাকা হবে । একটা সারার বিয়ে । এটাতে খুশি হবেন জানি । আরেকটা, ইয়াশ আর রিসা মুখোমুখি । এটাতে কি রিয়াকসন দেবেন জানি না । তবে হ্যাঁ,,, রৌদ্রের ভালো মানুষি ভাল্লাগতেছে না । এর মধ্যে আরেকটা ধামাকা দেবো
। রেডি হন । তার আগে ঠিকমতো রেসপন্স করুন । নয়তো গল্প দেরিতে দিমু
। 
#চলবে……..
Share On:
TAGS: আসবো ফিরে আবারো, সুরভী আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫৭
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১১
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬০
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৮
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৮
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৮
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৭১+৭১
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫১
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩২
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২০(প্রথমাংশ+শেষাংশ)