Golpo romantic golpo আসবো ফিরে আবারো

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৫


#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৬৫

#সুরভী_আক্তার

( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ ) 

আদ্রের কথায় চকিতে উত্তর করলো শিশির….

” শাফাহ্ তো রুমে নেই । আমি নিচে নামার আগে ওকে ডাকতে গেছিলাম । পাইনি রুমে । 

শাহিনা কাবির কপাল কুঁচকালেন..

” রুমে নেই তো কোথায় ? ও তো নিচে নামেনি এখনো । ঘুম থেকে উঠে ছাদে গেছে নাকি ? এতো সকালে ছাদে কি করছে ও ? দেখছি দাঁড়াও….

সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে গেলেন তিনি । সারা থামিয়ে দিলো…..

” আন্টি, তুমি দাঁড়াও ‌। আমি ঝটপট গিয়ে দেখে আসছি । 

নমনীয় রমনীর সুমিষ্ট কথায় প্রসন্ন হাসলেন ভদ্রমহিলা । 

ছাদেও নেই শাফাহ্ । সারা এসে জানায় । বাড়ির কোত্থাও নেই সে । খোঁজা হলো সবখানে । বাগানেও দেখা হলো । নেই সেখানেও । অতঃপর ফোন করা হলো , ঘরে বাজছে ওর ফোন । 

প্রথমত খুব চিন্তা করলো না কেউ । তবে সময় পেরোতেই দুশ্চিন্তা ভর করলো মাথায় । ঘন্টা পেরোলো । খোঁজ নেই মেয়েটার । আদ্রের আর ভার্সিটিতে বেরোনো হলো না । 

এক রাতের ব্যাবধানে কোথায় উধাও হতে পারে এই বোকা মেয়ে ?

থমথমে হয়ে গেলো কাবির ম্যানসন । বসার ঘরে একপাশে বসে মেয়ের চিন্তায় ফুঁপিয়ে কাঁদছেন শাহিনা কাবির । স্থির নেই কেউ । ছটফট সবার হৃদয় । মেয়েটা বাড়ি থেকে এভাবে হুট করে কোথায় যেতে পারে ? আন্দাজে কোথায় বা খোঁজ করবে ওর ? 

এদিকে ইয়াশের ফোন বন্ধ । মেঘা কন্টাক্ট করতে পারে নি তার সাথে । পেরিয়েছে ঘন্টা দুয়েক । বাড়ি নিস্তব্ধ পুরো । আর হাত গুটিয়ে বসে থাকা গেলো না । সবার মস্তিষ্ক ফাঁকা । কারোর মাথাতেই আসছে না কোনো কিছু । শেষে থানায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো । আর এক মুহুর্ত অপেক্ষা করতে চাইলো না শুভ্র । উঠে দাঁড়াতেই বাঁধা দেয় রৌদ্র…..

” ভাইয়া,, ওয়েট ! থানায় যেতে হবে না । 

শুভ্র এলোমেলো হয়ে বলে……

” হবে না মানে ? টুকটুকি কোথাও নেই রুডি । কে জানে ঐ গাব্বু মরেছে কোথায় ! ওকে পাই একবার, থাপড়ে সোজা করবো একদম । লাই পেয়ে গেছে ঐ ইডিয়ট । কিছু বলা হয় না ওকে, তাই বলে এভাবে সবাইকে চিন্তায় ফেলবে ও ?

” বোকার মতো কথা বলো না ভাইয়া । টুকটুকি কেমন জানো তুমি । ও বাড়ি থেকে এক পা বেরোনোর সাহস রাখে না । আর এভাবে হুটহাট কাউকে কিছু না বলে তো একেবারেই না । 

আদ্রের চিন্তিত স্বর । তৌসিফ কাবির উঠে দাঁড়িয়ে আদেশ করলেন ভেজা গলায়…..

” শুভ্র, থানায় চলো । 

” বাবাই দাঁড়াও । 

ফের থামায় রৌদ্র । সবাই এবার সংকুচিত দৃষ্টিতে তাকায় ওর দিকে । বলে বেপরোয়া যুবক….

” আই থিংক, আমি জানি টুকটুকি কোথায় ।

ওর কথায় প্রত্যেকে ভ্রু গুটালেও শাহিনা কাবির বিচলিত হয়ে পড়লেন…..

” রৌদ্র, কি জানিস তুই ? কোথায় আমার মেয়ে, বলনা ?

” রিল্যাক্স মনি ! আমি জানি না সঠিক । বাট আমি যদি ভুল না হই, তাহলে টুকটুকি এখন ইয়াশের সাথে থাকতে পারে । 

বাজ পড়লো সবার মাঝে । একসাথে অবিশ্বাসে আঁতকে উঠলেন সকলে । শাহিনা কাবির পিছিয়ে যান । কপাল গুটিয়ে তাৎক্ষণিক বিব্রত হয়ে বলেন তোফায়েল কাবির…..

” কি বলছো এসব ? মাথা ঠিক আছে তোমার ? 

বরাবরের ন্যায় বাপের প্রশ্নের উত্তর করার প্রয়োজন বোধ করলো না সে । স্থির হয়ে বসে রইলো । এতক্ষণ কারোর মাথাতেই ইয়াশের চিন্তা ছিলো না । এ বেলায় কপালে ক্ষুদ্র ভাঁজ ফেলে একে একে ভাবলেন সবাই । 

মেঘা আঁতকে শুধোয়…..

” কি বলছেন আপনি এসব ? টুকটুকি ভাইয়ার সাথে থাকবে কেনো ? ভাইয়া কোথায়, সেটাই তো জানি না আমরা । ভাইয়া তো চলে গেছে তাই না ? তাহলে টুকটুকি কিভাবে থাকবে ভাইয়ার সাথে ? 

রৌদ্র স্থবির হয়ে বসে । দৃষ্টি নিচুতে । সে জানে না সঠিক । তবে মন‌ এটাই বলছে । কেনো বলছে জানা নেই । অবান্তর ধারনা তার । 

রৌদ্রের কথায় বিশেষ পাত্তা দিলো না কেউই । তবে খচখচানি রইলো মনে । সে অবস্থাতেই থানায় একটা মিসিং ডাইরি করে আসা হলো । চব্বিশ ঘণ্টার আগে তারা কেস তুলবেন না হাতে । অনেক চেষ্টার পর পার্সোনালি কেস‌ হাতে নিতে ম্যানেজ করেছে শুভ্র । 

টুকটুকি বাড়ি নেই, সবার জানা অনুসারে প্রায় নয় ঘন্টা হতে চললো । 

ধরনী তলিয়ে অন্ধকার নামার আগেই কাবির ম্যানসনে অন্ধকার নেমেছে আজ । গুমোট পুরো বাড়ি । গোটা দিন থেমে থেমে কেঁদেছেন শাহিনা কাবির । টেনশনে শরীর হেলে পড়েছে । কেঁদে কেঁটে কাহিল অবস্থা করেছেন নিজের । চারটা পেরিয়েছে অনেক আগে । সদরে কড়া পড়তেই ইতস্তত হয়ে দরজা খুলে দেয় শিশির । ওপাশে সায়ান । দরজা খুলতেই এক গাল হাসলো সে । সাথে মা বাবা আছে । শুভ্র কে ফোন করছে কতক্ষন ধরে । সেই ছেলে ফোন ধরছে না , বরং কেটে দিচ্ছে মুখের উপর । সায়ান বিব্রত হয়েছে চরম । হাতে তার বিশাল এক গোলাপের বুকে । শাফাহ্ ফুল আনতে বলেছিলো আগের দিন । অবশ্য সে ফুল ব্যাতীত শাফাহ্’র সামনে আসে না খুব একটা । আর আজকের এই স্পেশাল দিনে ফুল নিয়ে আসবে না , তা কি করে হয় ? 

শিশির অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে তাদের সামনে । জোর পুর্বক হেসে কুশল বিনিময় করে । ভেতরে ঢোকেন তারা । কলিং বেলের শব্দ শোনা মাত্রই ছটফটিয়ে নিচে নামলো শুভ্র । আন্দাজ সঠিক তার । সায়ান কে দেখে কলিজা শুকিয়ে আসলো । ঢোক গিললো সে । কি জবাব দেবে এখন ? 

সায়ান শুভ্র কে দেখে চোয়াল খিচে ঝাড়ি মারে…..

” কতবার ফোন করেছি তোকে , ধরছিলি না কেনো ? 

” তোকে আজ আসতে বারন করেছিলাম আমি ! তবুও এসেছিস কেনো ? 

” আমাদের তো আগে থেকেই আসার কথা ছিলো , বারন করলি কেনো হঠাৎ ? কোনো রিজন ও দিসনি । তাহলে না এসে কি করবো ? 

শুভ্র হকচকিয়ে চোখ নামালো । নিচে নামলেন তৌসিফ কাবির । মুখ কালো । ফিকে হাসি টানার চেষ্টা করলেন ঠোঁটে । মেহের আব্বু আম্মুর সাথে টুকটাক কথা বলে ব্যস্ত রাখলো । বুঝতে দিলো না কিছু । শাহিনা কাবিরের প্রসঙ্গ কাটানো গেলো কথায় কথায় । 

তবে সায়ান কে থামানো গেলো না…..

” শুভ্র , শাফাহ্ কোথায় ? ফুল এনেছি ওর জন্য ? দিয়ে আসি গিয়ে ! আচ্ছা, ওকে শাড়ি পড়তে বলেছিস ? বলেছিলাম যে তোকে । শাড়ি পড়েছে ও ? কোথায় আছে , ঘরে ? আচ্ছা দাঁড়া , আমি গিয়ে দেখে আসি একটাবার । দিয়ে আসি ফুল গুলো । দেখবি , খুব খুশি হবে । 

সায়ান প্রফুল্ল মনে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায় । হাত টেনে ধরে শুভ্র ! বন্ধুর খুশিতে আত্মহারা মুখাবয়ব দেখে কষ্টে চিরে যায় বুক খানি । রুদ্ধ স্বরে বলে……

” তোকে আসতে বারন করেছিলাম আমি , আসলি কেনো আজ ? শুনলি না কেনো আমার কথা ? 

সায়ান অবাক হলো । চুপসে এলো মুখখানি…..

” কি হয়েছে শুভ্র ? এনিথিং রং ? এমন‌ দেখাচ্ছে কেনো তোকে ? বাড়ির বাকিরাই বা কোথায় ? সবাই এমন মনমরা কেনো ? সব ঠিকাছে তো ? 

” না , ঠিক নেই সব । 

” কি ঠিক নেই ?

” কিচ্ছু ঠিক নেই । টুকটুকির সাথে দেখা করতে পারবি না তুই । আজ চলে যা । আমি সময় করে ডাকবো তোকে । 

” মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর ? এসেছি কি যাওয়ার জন্য ? তোর বোনকে ঘরে তোলার ডেট ফাইনাল করে তবেই যাবো আজ । 

থেমে ডাক পাড়লো…..

” আম্মু, তোমরা কথা বলো । আমি শাফাহ্ কে দেখে আসি । মেহের, আমার সাথে আয় তুই । 

মেহের আহত চোখে শুভ্রর দিকে তাকায় । না বোধক মাথা নাড়ায় শুভ্র । 

শাফাহ্’র ঘরে ঢুকে ওকে পেলো না সায়ান । হন্যে হয়ে খুঁজলো উদ্বিগ্ন মনে । তর সইছে না তার । চোখ দুটি বড্ড তৃষ্ণার্ত । চাতক পাখির ন্যায় উন্মুখ । মেটানো প্রয়োজন এই তৃষ্ণা । 

দুটো ঘরে খুঁজলো সে ! না পেয়ে রেগে বললো…..

” শুভ্র , বোন কোথায় তোর ? কি শুরু করেছিস বলতো ? পাগল‌ বানিয়ে ছাড়বি আমায় । বলনা ও‌ কোথায় ? 

উদগ্রীব যুবক আদ্র আর মেঘা’কে দেখলো এতক্ষণে । শুভ্রর থেকে কোনোরূপ সাঁড়া না পেয়ে ব্যাতিব্যস্ত হয়ে তাদের বললো……

” মেঘা , শাফাহ্ কোথায় ? বলো না , বোন ‌! আমি দেখবো ওকে ! 

মেঘা চোখ নামিয়ে নেয় । 

সায়ানের কেমন ছটফট লাগে অজ্ঞাত অনুভবে । কারোর ভাবগতিক সুবিধার লাগে না । সে ব্যাকুল হয়ে পড়ে । সবার মুখ কালো থমথমে । শাফাহ্ ব্যাতীত সবাই আছে । নেই কেবল আসল জন । অথচ তারই তো প্রয়োজন । ভীষণ প্রয়োজন । দুটো দিন দেখা হয় নি ওকে । সায়ান হাপুসহুপুস করেছে । ধৈর্য ধরেছে এই দিনের । অথচ এই দিনে এসেও তাকে বেগতিক ছটফট করতে হচ্ছে । এ কি মানা যায় ? 

শুভ্র ওর আনচান অবস্থা দেখে ওকে টেনে নিয়ে যায় ঘরে । বারান্দায় দাঁড়ায় । পিছু পিছু যায় মেহের । 

সায়ান ছটফট করে । আকুল হয়ে বলে হাঁসফাঁস করে……

” কি হয়েছে শুভ্র ? এতো কেনো সাসপেন্স ক্রিয়েট করছিস বলতো ? পরীক্ষা নিচ্ছিস ধৈর্যের ? দিয়ে এসেছি অনেক বছর ধরে । আর পারবো না । আমার কিউটিপাইকে লাগবে এখন । বোঝাতে পেরেছিস ওকে তোরা ? ও কি সিনক্রিয়েট করেছে ? তাই এমন করছিস ? ডোন্ট ওয়ারি, শাফাহ্ নাজুক । আমি মানিয়ে নেবো ওকে । কিন্তু তার জন্য ওর সাথে কথা বলা প্রয়োজন আমার । কোথায় ও ? 

শুভ্র বহু কষ্টে বাণী আওড়ায়….

” ও নেই সায়ান । সকাল থেকে শাফাহ্ কে খুঁজে পাচ্ছি না । কোথায় আছে, আমরা জানি না কেউ । পুলিশ কেস করেছি । ও কখন থেকে নেই , তাও জানি না । পুরো বাড়িতে হাহাকার নেমেছে ওর চিন্তায় । তুই আসলি কেনো এই হাহাকারে ? আমি বারন করেছিলাম তোকে ! বলতে চাইনি এসব ! 

সায়ান আপনা আপনি পিছিয়ে গেলো এক কদম । তূষিত চোখ জোড়া কুঁচকে এলো । নড়বড়ে শরীর দুলে উঠলো তার । বুঝলো না কিছু । কিসব বলছে এই ছেলে ? মজা নিচ্ছে ওর সাথে ? এ কেমন মজার ধরন ? শুভ্রর কথাটা মজা ভাবতে গিয়েও গলা শুকিয়ে আসলো । গলা ভেজানোর বৃথা চেষ্টা চালালো সে । অস্পষ্ট স্বরে ঠোঁট কাঁপিয়ে বললো…..

” শা….শাফাহ্’কে খুঁজে পাচ্ছিস না মানে ? 

” খুঁজে পাচ্ছি না মানে পাচ্ছি না । ও নেই কোথাও । 

” কি বলছিস এসব ? মাথা ঠিক আছে তোর,,, পাগল হয়ে গেছিস ? উবে যাবে ও ? 

সায়ানের কন্ঠে কম্পিত রাগ । শুভ্র ভার দাবিয়ে উচ্চারণ করলো……

” উবে গেছে অলরেডি ।

” দেখ শুভ্র, প্লিজ যন্ত্রণা দিস না আমায় । সত্যিটা বল ভাই । কোথায় আমার শাফাহ্ ? ওর খোঁজ নেই মানে , কখন থেকে নেই ? কোথায় গেছে ও ? 

” সঠিক জানলে হাত গুটিয়ে বসে থাকতাম না । সকাল থেকে ওকে পাই নি । আর…..

” আর কি ? 

” ইয়াশ ও নেই । ওর চলে যাওয়ার ডেট ছিলো আজ । 

” তো ? 

” আই থিংক, টুকটুকি ইয়াশের সাথে আছে । যদি ভুল না হই তবে….

ছেলেটার দূর্বল হাত ফসকে ফুলের বুকেটা ঝপ করে পড়ে যায় মেঝেতে । রাগে ঝুলে আসা চোয়াল খিচে নেয় সে । দাঁতে দাঁত পিষে আঙুল তুলে ধমকায় আর কিছু বলার আগে….

” শাট আপ শুভ্র ! বাজে কথা বলবি না । কোথায় শাফাহ্ ? এটা যদি তোর কোনো উদ্ভট ইয়ার্কি হয়ে থাকে, তাহলে ছাড়বো না আমি তোকে । প্লিজ এভাবে পোড়াস না আমায় । বল কি হয়েছে ? 

” ইয়ার্কি করছি না আমি । 

স্পষ্ট জবানে সায়ানের পুরুষালি দেহখানা কেঁপে ওঠে থরথরিয়ে । চোখ দুটি ঝুঁকে আসে মেঝের দিকে । ইতোমধ্যে ভিজে এসেছে অক্ষিপট । 

বুঝতে চাইছে না সে ‌। সত্যের মুখোমুখি থেকেও অবিশ্বাসে মাথা ঝাঁকালো দু’পাশে । শুকনো ঠোঁট জোড়া জিভে ভিজিয়ে ঢোক গিললো । 

এতক্ষণের চড়া উঁচু জবান এ বেলায় ফিসফিসে আওয়াজে পরিনত হলো , বিড়বিড় করলো অস্ফুটে…..

” না, কিছুতেই না । হতে পারে না এটা । 

সে দমে না এক মুহুর্ত । 

দাম্ভিক কদমে সায়ান কে ঠেলে সরিয়ে বেরিয়ে আসে পাশে কাটিয়ে । ভড়কে যায় মেহের,, 

” ভাইয়া ! 

ডাকে শুভ্রও……

” সায়ান !

,,,, 

বাড়িটা পুরো গুমোট । রোজকার ন্যায় সব আলো জ্বলছে না । ঝকঝক করছে না কাবির ম্যানসন । অন্ধকার নেমেছে দেয়াল গুলোতে । একেক জনের হাল বেহাল । রান্না বান্না হয়নি সকালেও । মুখেও কিছু রোচেনি এসব চিন্তায় । 

খানিক আগে আরো একটা ঝড় বয়ে গেছে । সবাই একটু হলেও পেয়ে গেছে শাফাহ্’র খোঁজ । 

রৌদ্রের ফোনে একটা মেসেজ এসেছিলো ‌। 

যা দেখে থমকে গেছে পুরো পরিবার । রা নেই কারোর মুখে । কেবল একটা ছবি । আর কোনো বার্তা নেই । সবাই দেখেছে ছবিটা । উড়ন্ত প্লেনে জানালার পাশের সিটে নিথর পড়ে আছে কাবির পরিবারের ছোট মেয়ে শাফাহ্ কাবির । শুকনো মেয়েটার মুখখানা । কেবল এই ছবিটাই । যা সবার অন্তর কাঁপাতে যথেষ্ট । স্যাটেলাইট সংযোগে ছবিটা এসেছে ইয়াশের নাম্বার থেকে । স্তম্ভিত সকলে । রৌদ্রের ধারনাই সঠিক । শাফাহ্ কে নিয়ে গেছে ইয়াশ । সংকেত পাঠিয়েছে এতক্ষণে । কাবির পরিবারের ছোট মেয়ে এখন উড়ে যাচ্ছে ভিন্ন দেশের উদ্দেশ্যে । 

চব্বিশ ঘণ্টার আগে খোঁজ মিলবে না ভালো করে ।

ইয়াশের আকস্মিক এমন কান্ডের হেতু বুঝতে পারছেন না কেউ । সায়ান ও দেখেছে ছবিটা । শুধু এক ঝলক । নিষ্পলক চেয়ে দেখেছে শুধু , বোঝার চেষ্টা করেনি কিছু । কিচ্ছুটি বলেও নি । নিস্তেজ চিত্তে বেরিয়ে গেছে বাড়ি থেকে । শুভ্র পিছু নিয়েছে তার । ওকে একলা রাখা মানে অঘটন । এ অঘটন ঘটতে দেওয়া যাবে না । 

মেঘা ঘাপটি মেরে বসে আছে ঘরে । বাইরে কারোর মুখোমুখি হতে পারে নি আর । মুখ নেই কারোর সামনে দাঁড়ানোর । এটা কি করলো ইয়াশ । শাফাহ্ কে এভাবে সাথে নিলো কেনো ? এতো আকস্মিক হতে পারে না । এক রাতের ব্যবধানে নিশ্চয়ই ওকে সাথে নেওয়ার বন্দোবস্ত হয় নি ! 

কান্না পায় মেঘার । গা জ্বলে অপরাধ বোধে । বাড়ির সবার অবস্থা করুণ । 

ভাবতে ভাবতে ফুঁপিয়ে কাঁদে রমনী । এলোমেলো লাগে সবি । কি হচ্ছে না হচ্ছে , বুঝতে গেলে কেমন ঘোর লাগে ।  রৌদ্র টাও নেই । কোথায় কে জানে ! 

হাঁটু জড়িয়ে নিয়ে মাথা এলিয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে একবিংশী । কান্নার ছেদ ঘটলো ঠান্ডা মিঠে ডাকে….

” রৌদ্রময়ী ! 

ছলাৎ করে ওঠে একবিংশী হৃদয় । মাথা ফিরিয়ে চাইতেই রৌদ্র কে দেখে । ওষ্ঠ উল্টে ছলছলে আহত চোখে তাকায় । এগিয়ে এসে পাশে বসে রৌদ্র । হাত বাড়িয়ে দিতেই রমনী বিলম্ব করে না । ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটার সুঠাম বক্ষের আবডালে । ফুঁপিয়ে বলে থেমে থেমে…..

” ভাইয়া এটা কি করলো, রৌদ্র ? কেনো করলো , বলতে পারেন ? আই কান্ট বিলিভ দিস । ভাইয়া এটা করতে পারে না কিছুতেই । টুকটুকি কে কেনো সাথে নিয়ে যাবে ও ? কোনো কারন নেই এসবের ! তবুও এসব কি হচ্ছে ! কেনো হচ্ছে…..? 

” কাম ডাউন জান পাখি । আমি বোধহয় বুঝতে পারছি কেনো হচ্ছে এসব । কিন্তু এটা বুঝতে পারছি না, সব ঠিক হয়ে যাওয়ার পরও ইয়াশ এমনটা করলো কেনো ? 

মেঘা কান্না গিলে চোখ তুলে চায় । রৌদ্র কে এতোটা গম্ভীর দেখেনি কখনো । আজ সারাটা সকাল রৌদ্র কে অন্যরকম লেগেছে । ম্যাচিউর লেগেছে খুব । কথা বার্তাও অদ্ভুত লেগেছে । 

রমনী শুধালো না বুঝে…..

” মানে ? 

” ইয়াশ তোমাকে নিতে আসেনি এখানে । ও জানতো, আমার থেকে তোমাকে কেড়ে নিতে পারবে না কখনো । তুমি না চাইলেও আমি তোমাকে আমার সাথে থাকতে বাধ্য করতাম, ফোর্স করে হলেও আটকে রাখতাম । ইয়াশ কাড়তে পারতো না তোমায় । ও তো মিছে চেষ্টায় এসেছিলো । কিন্তু বিফল হলো , যখন দেখলো তুমিও দূর্বল আমার প্রতি । ও তোমাকে কষ্ট দিতে চায়নি । নেশায় না থাকলে হয়তো সেদিন কিছুই বলতো না আমার বিষয়ে । ও চেয়েছিলো প্রতিশোধ নিতে । সেজন্যই ফিরেছে । প্রথম দিনই সংকেত দিয়েছিলো আমায় । আমি বুঝিনি । ভেবেছিলাম তোমায় কাড়তে চায় । 

তাই সবদিক থেকে বেঁধে ফেলেছি তোমায় । কিন্তু এটা বুঝিনি……

” কি বোঝেন নি ? 

রৌদ্র হুশে ফিরলো । মাথা ঝাঁকালো…..

” সবটা না জানা অবধি তোমার ভাইয়ার নামে নালিশ করবো না আমি । ভুল বুঝো না । শুধু শুনে রাখো , ও যা করেছে সব প্রি প্লান । হুট করে কিছুই হয় নি ‌। পাসপোর্ট, ভিসা, এয়ার টিকিট, এতো সব একদিনে ম্যানেজ হয় নি নিশ্চয়ই ! ওর প্লান ভিন্ন ছিলো । 

কিন্তু সব ভুল বোঝাবুঝি মিটে যাওয়ার পরও টুকটুকি কে এসবে টানলো কেনো ও ? সায়ান ভাইয়া ওকে ভালোবাসে । এটা হতে পারে না ! ওকে না পেলে মরে যাবে সায়ান ভাইয়া । সবাই জানে, কেবল ঐ বোকাটাই বুঝলো না । 

মেঘা তাজ্জব বনে তাকিয়ে রয় গোল গোল চোখে । রৌদ্রের কন্ঠে গাম্ভীর্যতা । অর্থবহ কথা মেপে বলছে আজ । সে বাঁকা চোখে রমনীর নির্বোধ চেহারা দেখে মন ফেরালো গৃহে । হাসলো মুচকি । মেয়েটার ভেজা গাল মুছিয়ে দিতে দিতে আলগোছে শুধালো…..

” খিদে পেয়েছে ? 

না বোধক মাথা নাড়ায় মেঘা । 

সকাল থেকে তেমন কিছু খাওয়া হয় নি । রান্নাও হয় নি বাড়িতে । রাতে টুকটাক রান্না হলেও কেউ গিলতে পারে নি দুশ্চিন্তায় । গলা বেয়ে খাবার নামেনি মেঘারও । অথচ পেট চুইচুই করছে । ইচ্ছে নেই খাওয়ার ।

রৌদ্র বুঝলো । মোলায়েম কন্ঠে বলল…..

” চুপিচুপি বাইরে যাই ? যা খেতে চাইবে, খাওয়াবো । কি খাবে বলো ? 

” কিছু না । সবাই টেনশন করছে,, ভালো লগছে না কিছু ‌।

” ডোন্ট ওয়ারি সুইটহার্ট ,,, সব ঠিক হয়ে যাবে । ওরা ফ্লাইটে আছে এখনো । পৌঁছাক আগে , খোঁজ মিলবে তারপর । 

,,,,,,,

পেরিয়েছে চব্বিশ ঘন্টার অধিক সময় । ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস । ছোট্ট একতলা পেন্টহাউস । কালচে তার প্রতিটি দেয়াল । পুরো অ্যাপার্টমেন্ট ক্ষিণ নিওন আলোয় আলোকিত । সামনে দুহাত দূরে কি আছে, তাও বোঝা মুশকিল । অ্যাপার্টমেন্টে দুটো মাস্টার বেডরুম বোধহয় । তাও বেশি একজনের ক্ষেত্রে । এ বাড়িতে একজনই থাকে । আর এভাবে আবছা আলোতেই তার বসবাস । ঘরে কেবল হলদে লাইট জ্বলছে । সাদা বাল্ব নেই বাড়ির কোথাও । এক রঙা দুটো ডিম লাইট জ্বলছে । তার আলোতে কেমন বিদঘুটে দেখাচ্ছে আশপাশ । চোখ মেলে তাকানো দায় । ঘোরাচ্ছে মাথা । সব কিছুর মাঝে নীরবতা ছেদে একখানা রিনরিনে মেয়েলি কন্ঠ ভেসে আসে । চার দেয়ালে বারি খেয়ে আটকে রয় একখানে । খুব ঠাহর করলে বোঝা যায় , এটা কান্নার আওয়াজ । ফুপিয়ে কাঁদছে কোনো এক রমনী । 

ক্যালিফোর্নিয়ায় রাত নয়টা প্রায় । খানিক আগে এয়ার পোর্ট থেকে ফিরে সোজা শাওয়ার নিতে ঢুকেছে ইয়াশ । সে বেরোলো প্রায় মিনিট বিশেক পর । কোমরে সাদা টাওয়েল পেঁচানো । হলদে আলোয় সাদা রঙটা ঘেঁটে গিয়ে হলদেটে দেখাচ্ছে । এলোমেলো ভেজা চুল কপালে লেপ্টে । সে বেরিয়েই ওয়াক ইন ক্লজেট থেকে নিজের কাপড় বের করলো । থরে বিথরে তার প্রতিটা জিনিস টান টান গোছানো । 

রিনিঝিনি কান্না কানে পড়ছে বহুক্ষণ ধরে । তপ্ত যুবক সহ্য করে যাচ্ছে নীরবে । এখন বিরক্ত হলো । বিতৃষ্ণ ভাঁজ পড়লো ললাটে । চোখ ঘুরিয়ে আওয়াজ অনুসরণ করে খুঁজলো এপাশ ওপাশ । 

বেডের ঠিক সামন বরাবর হালকা ধূসর রঙের কাস্টম মেড মিনিমালিস্ট সোফা । কান্নার আওয়াজের উৎস তার পেছন থেকেই । ইয়াশ হাঁফ ছাড়ে । একহাতে ভেজা চুল গুলো ব্যাক ব্লাশ করে পেছনের দিকে ঠেলে দেয় । চোয়াল দাবিয়ে ত্রম্ভ পায়ে এগিয়ে যায় । কান্নারত রমনী সোফার পেছনে গুটিসুটি মেরে বসে আছে । ফুঁপিয়ে কাঁদছে অনবরত । তাকে দেখেই ধমকায় ইয়াশ……

” স্টপিট,, স্টুপিড গার্ল ! সেই কাল থেকে প্যান প্যান করে মাথা খাচ্ছো । আর একবার যদি গলা দিয়ে সাউন্ড বেরোয় না , তাহলে গলার রগ টেনে ছিড়ে ফেলবো বলে রাখলাম । আই সেইড স্টপ…..

চড়া ধমকে ধক্ করে চুপসে যায় শাফাহ্ । হামাগুড়ি দিয়ে পিছিয়ে বসে । আরো গুটিয়ে নেয় নিজেকে । কান্না রোধ করতে দুহাতে মুখ চেপে ধরে । হেঁচকি উঠে যায় গলা চিরে । ভয়ে ভয়ে মাথা তুলে চায় সে । হলদে আলোয় ইয়াশের অমন খোলামেলা পেটানো শরীর দেখে কান্না ভুলে বৃহৎ নয়নে চায় । চাহনি হয় নির্লজ্জ । পরক্ষনে থতমত খেয়ে দৃষ্টি নামায় । মুখ থেকে হাত সরিয়ে হেঁচকি তোলে ‌। নাক টেনে আওড়ায় ফিকড়ে ফিকড়ে….

” আপনি একটা রাক্ষস, বিটকেল । কোথায় নিয়ে এসেছেন আমায় ? আমাকে বাড়িতে রেখে আসুন এক্ষুনি । বাড়ি যাবো আমি ! 

” শাট আপ । বাড়ির কথা বললে , এখানেই মেরে পুঁতে রাখবো । খোঁজ পাবে না কেউ । চুপচাপ কান্না গিলে নাও । নয়তো ফ্রেশ হয়ে এসে তারপর যত খুশি তত কাঁদো । এখন কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করে মাথার পোকা নাড়াবে না একদম । 

পরিপ্রেক্ষিতে শাফাহ্ ঝট করে উঠে দাঁড়ায় । চোখ মুছে নেয় । কাল থেকে কেঁদে লাভ হয়নি । কাঁদবে না আর । সে শক্ত হলো । জবান উঁচালো…..

” আমাকে এখানে এনেছেন কেনো আপনি ? কোন সাহসে ? সাহায্যের এই প্রতিদান দিচ্ছেন ? অনেক সময় পেরিয়ে গেছে ‌। বাড়িতে সবাই টেনশন করবে আমার জন্য । আপনি প্লিজ আমাকে বাড়িতে রেখে আসুন । 

” রেখে আসার জন্য তো আনিনি । 

” তাহলে কেনো এনেছেন আমায় ? কি চাই আপনার ? 

ইয়াশ তাকালো পূর্ণ চোখে । ফিচেল চাহনি ‌। একই হাসি ওষ্ঠপূটে । ভয়ার্ত রমনীর দিকে এক কদম এগোলো সে । কোমর বাঁকিয়ে ঝুঁকলো একটু আধটু । আকস্মিক লোকটার এমন কান্ডে ছ্যাত করে ওঠে রমনী । দ্রুত পিছিয়ে যায় ‌। ভীত নারী মন কু গায় । নোংরা চিন্তায় চেহারা বিকৃত করে মুখ ফসকে বলে…..

” খবরদার কাছে আসবেন না । আপনি এতো জঘন্য ? যদি ভুলভাল চিন্তা থেকে থাকে, তাহলে মেরে ফেলবো আপনাকে ? 

ইয়াশ নিজেও বিকৃত করলো নিরেট মুখখানি । বাজে তকমায় দাঁত চেপে ধমকালো তাৎক্ষণিক…..

” শাট আপ । থাপ্পর চেনো ? জঘন্য চিন্তা করেছো তো মেরে সোজা করবো একদম ।

ঝাড়ি মেরে থামলো । নিজেকে সামলে সেই শুরুর প্রত্যুত্তরে বললো……

” চেয়েছিলাম তো প্রতিশোধ । বাট এখন আর চাই না সেটা । এখন বাঁচতে চাই । বাঁচার জন্য একটা সঙ্গী চাই । এখানে বড্ড একা আমি । 

শাফাহ্ এক মুহুর্তে স্থির হয়ে গেলো লোকটার এমন কাতর স্বরে । ঢোক গিলে বললো….

” আমাকে রেখে এসে বাঁচুন আপনি । বাড়ি যাবো আমি ।  কেনো এনেছেন আমাকে এতো দূর ? 

” যন্ত্রণা দিতে । 

বাড়ি যাওয়ার কথা দ্বিতীয় বার উচ্চারণ করলে তৃতীয় বার আর মুখ খোলার মতো অবস্থায় থাকবে না । কালকের কথা ভুলে যেও না । 

শাফাহ্ ধক্ করে ওঠে । দুহাত তুলে দুগাল চেপে ধরে । কাল মেরেছিলো লোকটা । চড়া থাপ্পড়ের কথা ভুলে যায় কি করে ?

আর ওকে যন্ত্রণা দেবে মানে ? কিসের যন্ত্রণা ? কি বলছে লোকটা ? ভাবতে গিয়ে ভয় লাগে । সে ভয়ে আঁধারে পেছাতে গিয়ে ঠাস করে পা জড়িয়ে পড়ে যায় ইতালিয়ান মার্বেলের শক্ত মেঝেতে । ব্যাথায় কুকিয়ে ওঠে মৃদুমন্দ । ইয়াশ উদ্বেগহীন । চেয়ে থেকে মেয়েটার কোকানি শুনে দৃষ্টি ফেরালো । বুঝলো বোধহয় । বললো কথাটুকু শুধরে…..

” যন্ত্রণা ? উঁহু,,, ভেবেছিলাম যন্ত্রণা দেবো । বদলা নেবো । যা যা আমার বোনের সাথে হয়েছে, সব বর্তাবো তোমার উপর । কিন্তু না । এখন দেখি রৌদ্র আমার বোনকে ভালোবাসে খুব বেশি । ভালোবাসা ? সেটা তো পারবো না আমি । ইম্পসিবল । কিন্তু তুমি আমার সাজানো খুঁটি ছিলে । তাই ছাড়লাম না । যন্ত্রণা দেবো টুকটাক । পরে কি হয় দেখি…

সে থামলো না । সামনে থেকে সরে এসে গায়ে টিশার্ট আর ট্রাউজার জড়িয়ে নিলো । বেরোনোর আগে আবার হুংকার দিলো……

” দশ মিনিটের মধ্যে শাওয়ার নিয়ে তৈরি থাকবে । জাস্ট টেন মিনিট । এদিক ওদিক হলে তোমার উপর দিয়ে কি যাবে, তুমি ভাবতেও পারছো না । 

বেরিয়ে গেলো গটগট পায়ে । অবলা রমনী ভড়কায় । শুকিয়ে আসে ভেতরটা । বুঝে পায় না কিছু । মনে পড়ে সেরাতের থাপ্পড়ের কথা । কি জোরে চড় মেরেছিলো এই রাক্ষস লোকটা । 

সেদিন রাতেই খাওয়ার পর ইয়াশ তাকে নিয়ে বাড়ি ছেড়েছে । জোর পুর্বক বাড়ি থেকে বের করতে পারলেও মেয়েটা চেঁচামেচি করে বাগড়া দিয়েছিলো পথিমধ্যে । পরে এক থাপ্পরে দমে গেছে । রাত কাটিয়েছে বেঘোরে । পরবর্তীতে যা যা হলো সবেতেই একের পর এক ঝটকা খেয়েছে নির্বোধ মেয়েটা । ঘুম ভাঙতেই নিজেকে আবিষ্কার করেছে বিমানে । পুরো বিমান ফাঁকা । তার সাথে কেউ নেই ইয়াশ ব্যাতীত । প্রাইভেট চার্টার ফ্লাইট উড়ে চলেছে অজানা পথে ‌। গন্তব্য নির্ধারিত হলেও রমনীর কাছে অজ্ঞাত । 

একলা মেয়েটা চেঁচামেচি, ছোড়াছুড়ি করে লাভ হয়নি । কেঁদেও কুল পায়নি সে । অতঃপর দীর্ঘ সময় পর এক কাপড়েই হাজির হয়েছে এই ক্যালিফোর্নিয়ায় । 

এয়ার পোর্ট থেকে লোকটা তাকে টেনে হিচড়ে এ বাড়িতে এনে ফেলেছে । কি বিদঘুটে একটা হাউজ ‌। চোখ ঝলসে যাচ্ছে নিওন আলোয় । শাফাহ্’র মাথা ঘুরছে । এলোমেলো লাগছে চারপাশ । মনে হচ্ছে দেয়াল গুলো ঠেসে ধরতে আসছে ওকে । লোকটা বেরিয়ে গেছে । বুক চিরে কান্না আসছে মেয়েটার । ও ওষ্ঠ উল্টে নাক টানলো । ওরনার এক কোণ খামচে ধরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো এপাশ ওপাশ । অমনি গুরুভার কন্ঠ কানে বাজলো…..

” ফ্রেশ হতে বলেছি আমি । হাতে সময় অনলি টেন মিনিট…..

শাফাহ্ চমকায় । ধক্ করে পিছু ফিরে দরজার দিকে তাকায় । লোকটা সটান দাঁড়িয়ে বুকে হাত গুটিয়ে । দৃষ্টি বোধহয় তীক্ষ্ণ । ক্ষুণ্ন আলোয় মুখাবয়ব বুঝলো না মেয়েটা । শুল্ক ঢোক গিললো । মিনমিনে গলায় বললো…..

” ক…কাপড় ? 

” ক্লজেট থেকে কিছু একটা পড়ে নাও । 

বেরিয়ে গেলো । 

তবুও থম মেরে দাঁড়িয়ে রাইলো শাফাহ্ । গিজগিজ করে ভেংচি কাটলো লোকটার পেছনে । 

পেরোয় আরো আধা ঘন্টা । ইয়াশ ফের ঘরে ঢুকলো । মুখে তিতি বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট । এই মেয়েকে দশ মিনিট সময় দিয়েছে । সে জায়গায় তিন গুণ সময় পেরিয়ে গেছে আরো । ঘরে ঢুকে এপাশ ওপাশ তাকালো ইয়াশ । বিছানার কোণে আটকালো দৃষ্টি । জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে মেয়েটা । সে ধমকালো স্বভাব সুলভ…..

” সমস্যা কি ? ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বেরোতে বলেছিলাম আমি । কানে যায় নি কথা ? 

মেয়েটা মুখ তুলে পিটপিট করে তাকায় । আহত তার সূচিশুভ্র মুখ খানি । কোমর ছড়ানো চুল গুলো পিঠে লুটোচ্ছে । পড়নে ধূসর রঙা একটা টিশার্ট । প্যান্ট কালো । ইয়াশের এসব । ক্লজেটে এসবই পেলো । টিশার্টের গলা নেমে এসেছে কাঁধে । খুলে যাচ্ছে এক প্রকার । কোনো রকমে টেনে টুনে আটকে রেখেছে সেটাকে । পা জড়িয়ে বসে আছে এখন । ওকে দেখে খুব একটা প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে আদেশ ছুড়লো ইয়াশ…..

” এসো আমার সাথে ! 

রমনী বিনা বাক্যে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায় । সে নিতান্তই অনুচ্চ । ছিমছাম গড়নের হালকা তনু তার । তার দেহে এসব রাক্ষসের পোশাক সয় কি করে ? টিশার্টের ভেতরে তার মতো আরো চারজনের জায়গা হবে । লম্বা প্যান্ট নেমেছে তালু ছাড়িয়ে । মেঝেতে লুটোচ্ছে অর্ধেকটা । ঢিলে হয়ে কোমর থেকে নেমে যাচ্ছে । মেয়েটা চেপে ধরে রেখেছে কোনমতে । রাগ উঠলো তার । খেকিয়ে উঠলো…..

” এসব ছিলো শুধু । এসব পড়বো আমি ? রাক্ষুসে সব কাপড়-চোপড় । 

” তো তোমাকে এসব পড়তে কে বলেছে ? 

” আপনি তো বললেন । চব্বিশ ঘন্টা ধরে বিমানে ছিলাম । গা ম্যাজ ম্যাজ করছিলো । ফ্রেশ হওয়ার দরকার ছিলো । কিন্তু ড্রেস কোথায় পাবো আমি ? 

ইয়াশ কিছু বললো না । চোয়াল খিচে গটগট পায়ে এগিয়ে ঠাস করে আলমারি খুললো । এপাশ ওপাশ ঘেঁটে কিছু একটা বের করে ছুঁড়ে মারলো মেয়েটার মুখের উপর । চিবিয়ে বললো……

” এটা পড়ে নাও, ফাস্ট । 

শাফাহ্ আবছা আলোয় দেখলো, একটা শাড়ি বোধহয় । চমকালো মেয়েটা । ফ্যাল ফ্যাল তাকালো ইয়াশের দিকে । পরক্ষনে শাড়িটার দিকে । সুক্ষ্ম কাজের জামদানি একখানা শাড়ি । লাল রঙের । পূরনো বোধহয় । 

সে আহম্মক বনলো । কিছু বলার আগেই গটগটিয়ে পাশ কাটায় ইয়াশ । হুট করে মুখ খোলে শাফাহ্….

” কো.. কোথায় নিয়ে যাবেন আমায় ? 

ইয়াশ থামলো । ঘাড় বাঁকিয়ে আড়চোখে তাকিয়ে বললো ভারী গলায়……

” যোমের দূয়ারে । যেখানে গেলে আর মুক্তি পাবে না, সেখানে । 

,,,,,,,,,

বাংলাদেশে তখন বিকেল পাঁচটা । 

এ অবধি ঠিক হয়নি কোনো কিছু । সব এলোমেলো এখনো । তছতছ সবার ভেতর । বাড়িটা খালি এক জনের বিরহে ‌। অবশ্য শুভ্র ও বাড়ি ফেরেনি কাল থেকে । সায়ানের সাথে ও কোথায় আছে, খোঁজ মেলেনি । মেহের ও জানে না । 

লিভিং রুমে গুটিয়ে বসে আছেন শাহিনা কাবির । মাথায় হাত তার ‌। মুখখানি শুকনো । মেহের এক বাটি স্যুপ নিয়ে পাশে বসে । ভেজা ভেজা গলায় ভাব জমাতে চায়…..

” মা,, এই স্যুপ টুকু খেয়ে নাও তো । এরপর ঔষধ আছে তোমার ! না খেয়ে খেয়ে শরীরের কি অবস্থা করেছো, খেয়াল আছে । একেই চিন্তায় চিন্তায় অসুস্থ, তার উপর এভাবে না খেয়ে থাকলে আরো অসুস্থ হয়ে পড়বে তুমি ! 

শাহিনা কাবির চুপচাপ বসে আছেন । শুনেও শুনলেন না । মেঘা নিচে নামে । অপরাধী মুখে গুটি গুটি পায়ে পাশে দাঁড়ায় । ডাকে….

” মনি! 

এবার নড়েন ভদ্র মহিলা । তড়াক করে মেঘার দিকে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিপাত করেন । 

” তুই ? খবরদার, ডাকবি না আমায় । তোর মনি নই আমি । কেউ নই । আমার বোকা মেয়েটাকে ভাসিয়ে দিলি তুই ? কি দোষ করেছিলো ও তোদের ? তোর ভাই কেনো এতো বড় সর্বনাশ করলো আমাদের ? 

” মনি, তুমি ভাইয়াকে ভুল বুঝো না প্লিজ ‌। আমার ভাইয়া এমন নয় । তুমি তো দেখেছো ওকে । চেনো তুমি । 

” চিনতে ভুল করেছি আমরা । আর কি চিনবো ? আমার মেয়েটাকে কেনো সাথে নিয়ে গেছে ও ? কোন অপরাধে ? তুই সব জানতিস,তাই না ? শাফাহ্ কেও বোকা বানিয়েছিস তুই, ভুল বুঝিয়েছিস ! 

” মনি ! 

” চুপপপপ । খবরদার ঐ মুখে আর ডাকবি না আমায় । 

মেঘার চোখ থেকে টুপটাপ পানি গড়িয়ে পরে । এ বাড়িতে শাহিনা কাবির সবচেয়ে শান্ত স্বভাবের । মেঘার সবচে প্রিয় একজন । অনেকটা মায়ের মতোই মনোরম । আর আজ তিনিই এভাবে ভুল বুঝলেন ওকে ? মেঘা মানতে পারে না । 

চিবুক নামিয়ে কান্না চেপে ধরে । 

রুবিনা কাবির এগিয়ে আসেন । মেঘা কে টেনে ফেরান নিজের দিকে । চোখে পানি দেখে আঁতকে ওঠেন তিনি । 

” মেঘাকে এসব কি বলছো, আপা ? ওর কি দোষ ? 

” দেখো না মা, আমি কিছু জানতাম না এসবের । আর আমার ভাইয়া খারাপ নয় । ভুল বুঝছে সবাই । ভাইয়া এসব এমনি এমনি করতে পারে না কিছুতেই । 

” তো কি কারণ আছে এসব করার ? আমার মেয়েটা কি ক্ষতি করেছে ওর ? সাফাই গাইছিস ভাইয়ের হয়ে ? সব দেখেও এসব বলতে লজ্জা করছে না ? 

তিনি থামতেই ভেসে আসে পূরু কন্ঠ…..

” মনি,,, ইভারাকে বকছো কেনো তুমি ? 

🛑 রিচেক দিতে পারিনি । মাথা তুলতে পারছি না । বানান ভুল মানিয়ে নেবেন । এলোমেলো হয়ে থাকলে পরে ইডিট করে দেবো ‌। হ্যাপি রিডিং। 🛑

#চলবে……..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply