#আসবো_ফিরে_আবারো
#পর্ব_৬৭
#সুরভী_আক্তার
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ
)
ইয়াশ বাড়ি ফিরতে ফিরতে দুপুর তিনটে বেজেছে ।
বেশ লম্বা ছুটি কাটিয়ে আজ হসপিটালে গেছিলো বহুদিন বাদ । এখনো শেষ হয়নি ছুটি । হাতে আরো দিন চারেক আছে । ছুটির মাঝেই আজ একটু দেখা দিয়ে আসলো । দিন কয়েকের এই বিশ্রামের পর তাকে আবারো ফিরতে হবে সেই চিরচেনা, পরিচিত জীবনে । সাদা অ্যাপ্রন, হসপিটালের করিডোর, রোগিদের ভিড় আর অসংখ্য হৃদযন্ত্রের স্পন্দনের মাঝে ।
তার জীবনটা সহজ নয় , আবার খুব কঠিন ও নয় । সে নিজে বেছে নিয়েছে এই পথ । সব ছেড়ে জেদের বশে নিজের সাথে পাঙ্গা দিয়ে নিজের এই অবস্থান তৈরি করেছে । বর্তমান সে লস অ্যাঞ্জেলেসের নামকরা প্রাইভেট হসপিটালের একজন প্রতিষ্ঠিত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ । হাসপাতালে তার পরিচয় ঠান্ডা মস্তিষ্কের দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে ।
ফ্রন্ট ডোরের পাশের ডিজিটাল প্যানেলে অভ্যস্ত হাতে পাসওয়ার্ড টাইপ করতেই খুলে গেলো দরজা ।
ডোর আনলক করে ভেতরে ঢুকলো সে । শার্টের বোতামগুলো এক এক করে খুলতে খুলতে আশপাশ না তাকিয়ে সোজা ঢুকলো নিজের ঘরে । তীক্ষ্ণ তূষিত দৃষ্টিতে খুঁজলো কাউকে । দেখা পাওয়া মাত্রই গুটিয়ে আসলো কপাল । মসৃণ ললাটে ভাঁজ পড়লো কয়েক স্তর ।
মেঝেতে পা বিছিয়ে বসে বেডের ধারে মাথা এলিয়ে পড়ে আছে শাফাহ্ । নিস্তেজ তার ক্ষিণ তনু । পড়নে এখনো সেই শাড়িটা । ইয়াশ কিঞ্চিত বিভ্রান্ত হয়ে চোখ সরিয়ে নিলো । মনে পড়লো কালকের ঘটনা । মেয়েটাকে জোর পূর্বক বিয়ে করেছে কাল রাতে । কেঁদেছে মেয়েটা । চড়ও খেয়েছে একটা । শেষমেষ বিয়েটা হয়েছে ওদের । বাড়িতে ফেরার পর ইয়াশের সাথে আর কথা বলেনি সে । হয়তো প্রচন্ড অভিমান আর ক্ষোভে ।
আর আজ সকালে মেয়েটা ঘুম থেকে ওঠার আগেই ইয়াশ বেরিয়ে গেছে । মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হয়নি দুজনার ।
এই মুহূর্তে ইয়াশ উদ্বেগ হীন হতে গিয়েও পারলো না । আবার তাকালো নিস্পন্দ মেয়েটার দিকে । ডাকলো গম্ভীর গলায়…..
” এই মেয়ে ?
মেয়েটার সাড়া নেই । ইয়াশ আবার ডাকে এক কদম এগিয়ে…..
” এইইই , এভাবে নিচে বসে আছো কেনো ? ওঠো !
শাফাহ্ চোখের ভারী পাপড়ি যুগল ফাঁক করলো বহু কষ্টে । আধো ভেজা ভেজা দৃষ্টি তার । এক হাতে পেট চেপে ধরে রেখেছে । অন্যহাত মাথার পাশে । সে ইয়াশ কে দেখে ঢোক গিললো । চোখ সরু করে প্রশ্ন করলো তপ্ত যুবক….
” কি হয়েছে ?
মেয়েটা মাথা তোলে । কন্ঠ খাদে নামিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে…..
” খিদে পেয়েছে !
” খাওনি কিছু ?
” খেয়েছি তো ।
” তাও খিদে পেয়েছে ?
” সেই কখন খেয়েছি । সবটা বের করে দিয়েছি আবার । দূর্বল লাগছে ।
ইয়াশ কপাল কুঁচকে ফেলে…
” মানে ?
” বমি হয়েছে !
” হোয়াট ? কেনো ?
শাফাহ্ চোখ নামিয়ে ধীরে উঠে দাঁড়ালো ।
সকালে ঐ বাটি ভর্তি কাস্টার্ড খাওয়ার পর থেকেই গা গুলিয়ে উঠছে । পেট থেকে উগড়ে বেরোচ্ছে সবটা । খেয়েছে তো একটুখানি । এর মধ্যে তাতেই বমি করেছে তিনবার । ঠান্ডা ছিলো খাবার । তার উপর বাসি বোধহয় । খিদের জ্বালায় মেয়েটা সেসব কিছুরই তোয়াক্কা করে নি । পেট ভরাতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হতে হচ্ছে এখন । পরপর বমি করার পর এ যাত্রায় শরীরে শক্তি নেই বিন্দুমাত্র । টলছে ছিমছাম দেহ খানা । সে টলমল পায়ে কোনো রকমে দাঁড়িয়ে বললো ক্ষিণ স্বরে…..
” ফ্রিজে কাস্টার্ড ছিলো, ওটা খাওয়ার পর থেকেই বমি হচ্ছে বারবার ।
ইয়াশের চোখে মুখে পরিবর্তন আসলো তৎক্ষণাৎ । বিক্ষুব্ধ হয়ে ঝাঁজিয়ে উঠলো সে…..
” হোয়াট ? কাস্টার্ড খেয়েছো মানে ? ইউ স্টুপিড, ওটা স্টেল ছিলো । কতদিনের স্পয়েল্ড জানো ? আর তুমি ওটাই খেয়েছো ? মাথা খারাপ তোমার ? চোখে দেখোনি ? খাবার জন্য আর কিচ্ছু পাওনি ঘরে ?
তপ্ত ধমকে চুপসে গেলো মেয়েটা । চিবুক নামিয়ে নিলো ।
আঁতকে পেছাতে চাইলো এক কদম । তবে শক্তি পেলো না । এক পা ও নড়লো না সে ।
ইয়াশ থেমে গলা কাঁপিয়ে পূণরায় ঝাড়ি মারে…..
” চুপ করে আছো কেনো এখন ?
” আর কিছু ছিলো না কিচেনে ! খিদে পেয়েছিল খুব । তাই খেয়েছি ওটাই ।
” চিকেন, মাটান, চাল, ডাল, ডিম, দুধ, ব্রেড, সব ছিলো , খিদে পেয়েছে তো কিছু একটা বানিয়ে খেতে পারোনি ? বাসি খাবার খেয়ে মরতে চাইছো ? মারতে চাইছো আমাকেও ? ফাঁসাতে চাইছো ?
” আমি রাঁধতে পারি না ।
শাফাহ্’র অকপট স্বীকারোক্তি……
ইয়াশ চরম বিরক্ত হয় । এক হাত কোমরে ঠেসে অন্য হাতে মাথার চুল খামচে ধরে । রেগে মেগে দাঁত খিচে তেড়ে যায় । একেবারে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে সংবরণ করে নিজেকে । মেয়েটা পুরো গুটিয়ে গেছে । চিবুক গলায় মিশিয়ে সিটিয়ে দাঁড়ালো ।
ইয়াশ ক্রোধিত হয়ে কিছু বলার আগেই আকস্মিক দুহাতে মুখ চেপে ধরে এলোমেলো কদমে ওয়াশ রুমের দিকে ছুটলো শাফাহ্ । দূর্বল মেয়েটাকে ওভাবে ছুটতে দেখে দপ করে রাগ দমলো যুবকের । নিরেট মুখাবয়বে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো মুহুর্তেই । পিছু ডাকলো ভড়কানো গলায়….
” এই ,,, এইইই টুকটুকি, কি হলো ?
শাফাহ্’র জবাব নেই । পেটের কোণে জমে থাকা কিছু তেঁতো তরল উগলে বেরিয়ে আসলো আবারো । গলগলিয়ে চতুর্থ বারের মতো পেট উগড়ে বমি করলো মেয়েটা । এক হাত ওয়াশ রুমের দরজার চৌকাঠে ঠেকিয়ে অন্যহাতে পেট চেপে ধরে হাঁটু ভেঙ্গে লুটিয়ে পড়লো সেখানেই । নিস্তেজ হয়ে বসে পড়লো ।
ইয়াশ ছুটে যায় । আতঙ্কে চোখে মুখে আঁধার নামে । সেও হাঁটু গেড়ে বসে মেয়েটার সম্মুখে । মেঝের দিকে তাকিয়ে দেখে সাদা বমি করেছে এই মেয়ে । পেটে কিছু না থাকলে কি আর বেরোবে ? ফ্রিজের কাস্টার্ড অনেক দিনের বাসি ছিলো । ভাবতে গেলেই রাগ উঠলো ইয়াশের মাথায় । এই মেয়ে তো আচ্ছা পাগল । কোন জ্ঞানে ঐ খাবার টা খেলো সে ? এখন অবস্থা দেখো, কতটা গুরুতর । পুরো নেতিয়ে পড়েছে । চোখ মুখ দেবে গেছে । খিচে নিয়েছে তীব্র অস্বস্তিতে ।
ইয়াশ আকস্মিক হাত বাড়িয়ে দিয়ে ঘৃণা হীন রমনীর মুখ মুছিয়ে দিলো । রাগ চেপে দু বাহু ধরে বললো মোলায়েম কন্ঠে…..
” আরো বমি পাচ্ছে ?
শাফাহ্ আলগোছে না বোধক মাথা নাড়ায় । ইয়াশ বাহু টেনে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে……
” ওঠো !
ক্ষিণ মাত্র শক্তি নেই ললিতাঙ্গে । একই ভাবে নেতিয়ে পড়ে রইলো মেয়েটা । চোখ খুলে পিটপিট করে তাকালো ভেজা চোখে । ইয়াশ বোধহয় বুঝলো । কিছু বললো না । অভাবনীয় কিছু করতে গিয়েও থেমে গেলো দ্বিধায় । ধরলো না মেয়েটাকে । ঢোক গিলে সরে আসলো । টেবিলের ড্রয়ার থেকে ফার্স্ট এইড বক্স বের করে একটা ঔষধ খুঁজে নিলো । অতঃপর এক গ্লাস পানি সমেত আবার অগ্রসর হলো রমনীর পানে । সামনে বসে বাড়িয়ে দিয়ে বললো….
” এটা খেয়ে নাও । বমি হবে না আর ।
মেয়েটা দ্বিমত করলো না । খেয়ে নিলো ।
সেখানে বসে রইলো মিনিট দুয়েক । ইয়াশ উঠে দাঁড়িয়ে ক্লজেট থেকে কাপড় বের করে রুম থেকে বেরোতে বেরোতে বললো…..
” ফ্রেশ হয়ে নাও । বাইরে যাবো ।
মিনিট বিশেকের মাথায় সে আবার রুমে হাজির । পাশের রুমে শাওয়ার নিয়ে পুরো ফিটফাট হয়ে এসেছে । পড়নের সাদা শার্ট টার উপরের বাটান দুটো খোলা ।
শাফাহ্ বিছানার একপাশে গুটিয়ে বসে আছে । এখনো একই অবস্থা তার । ইয়াশ ভ্রু কুঁচকে বললো গুরুভার কন্ঠে….
” এখনো এভাবে বসে আছো যে ?
” তো কি করবো ?
” চেঞ্জ করতে বলেছি ।
” চেঞ্জ করে কি পড়বো ? ড্রেস আছে আমার ?
” তুমি এতো বোকা কেনো, হ্যাঁ ? এতো জ্বালাতন করছো কেনো আমায় ? বাড়ি থেকে যেই ড্রেসটা পড়ে এসেছিলে, শাড়ি চেঞ্জ করে ওটা পড়ে নাও ।
” ওটা পড়ে বাইরে যাবো ?
” তো ?
শাফাহ্ চুপ রইলো । খচখচ করলো । বললো এক মুহুর্ত পর…..
” আমাকে এখানেই রাখবেন আজীবন ?
” যতদিন বাঁচবো ততদিন !
” তাহলে শপিং করিয়ে দিন ।
” পারবো না ।
মেয়েটা মুখ ভার করে ফিরিয়ে নিলো দৃষ্টি । প্রশ্ন করলো কিয়ৎ কাল বাদ…..
” এই শাড়িটা কার ?
ইয়াশ শ্বাস ফেললো । আনমনে মৃদু হেসে বলল…..
” আমার মা’র । বিয়ের শাড়ি তার । উফফফ, ইউ আর লাকি গার্ল । শাশুড়ির বিয়ের শাড়ি দিয়ে তার ছেলেকে বিয়ে করতে পেরেছো ।
শাফাহ্ যেনো চমকে উঠলো । তড়াক করে তাকালো । বললো আগ্রহী হয়ে…..
” আপনার মা’র বিয়ের শাড়ি এটা ? আপনার কাছে ছিলো ? মেঘার কাছে একটা চেইন আছে আন্টির । আর আপনার কাছে শাড়ি । বাহ্, খুব সুন্দর এটা । তাই ভাবছিলাম, আপনার কাছে এই শাড়ি আসবে কোথা থেকে !
কথা শেষ করে চঞ্চলা রমনী বিছানা থেকে নামলো । কুঁচি ঠিক করে ভার মুখে হাসি টেনে বললো…
” কোথায় যাবেন চলুন । এভাবেই যাবো ।
,,,,,,
প্রায় মিনিট বিশেকের মধ্যেই ওরা পৌঁছায় লস অ্যাঞ্জেলেসের ডাউন টাউনের ইউএস ব্যাঙ্ক টাওয়ারের সামনে । টাওয়ারের একাত্তর তলার “71Above” রেস্টুরেন্টে । ক্যালিফোর্নিয়ার অন্যতম বিলাসবহুল ফাইন ডাইনিং রেস্টুরেন্ট ।
ইয়াশ বিমূর্ত শাফাহ্ কে নিয়ে ওঠে সেখানে । টাওয়ারের দ্রুতগামী লিফট থেকে নেমে দাঁড়ানো মাত্রই থমকে যায় রমনী । আলোক সজ্জায় ঝলসে যায় আঁখি জোড়া ।
শাফাহ্ রিতিমত নির্বাক, বিমুগ্ধ আশপাশ দেখে । দেশের গন্ডি পেরিয়ে এই উচ্চবিত্ত দেশে আসার পর থেকেই আনচান করছিলো সে । টুকটাক দেখেছে আশপাশ । আজ আসার পথেও জানালা ছাপিয়ে আহম্মক বনে চোখ গোল গোল করে দেখে গেছে রাস্তা ঘাট ।
চমৎকার আলোক সজ্জায় সজ্জিত রেস্টুরেন্টের ভেতরটা দেখে স্তব্ধ হলো আরো বেশি । পুরোটা রেস্তোরাঁ চারিদিক থেকে সচ্ছ কাঁচে ঘেরা । ভূমি হতে ৯৫০ মিটার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে কাঁচ ভেদে নিঃসন্দেহে পুরো লস অ্যাঞ্জেলেসের অমায়িক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় এখান থেকে । সময় তখন পাঁচটা প্রায় । দিনের আলো ফিকে হতেই কৃত্রিম আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে পুরো শহর । কাঁচের বিশাল দেয়ালের ওপারে পুরো লস অ্যাঞ্জেলেস শহরটা ঝকঝকে হিরের গালিচার ন্যায় বিছিয়ে রয়েছে যেনো । চওড়া রাস্তা ঘাটে অনবরত ব্যস্ত গতিতে চলছে যানবাহন । হেডলাইটের আলো গুলো বিশাল দূরত্বে থেকে জোনাকির ন্যায় জ্বলছে আর নিভছে ।
শাফাহ্ হা বনে দেখে যায় দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে । ভেতরে জমজমাট ভিড় অনেক । রমনীর মনযোগ নেই সেদিকে । তার ঘোর কাটলো ইয়াশের ডাকে…
” এইইই মেয়ে । বসো এখানে ।
চমকে পিছু ফিরলো মেয়েটা । জানালার পাশের রিজার্ভ টেবিলে ইতোমধ্যে বসেছে ইয়াশ । এতো সব নতুনত্ব দেখে চিকচিক করে উঠলো শাফাহ্ । গদগদ হয়ে এগিয়ে গেলো….
” আপনাদের শহরটা তো অনেক সুন্দর । আমাকে ঘুরিয়ে দেখাবেন পুরোটা ?
” পারবো না । বসো চুপচাপ….
মেয়েটার হাসি টুকু মিলিয়ে যায় । চুপসে যায় মুখখানি । বসে আলগোছে । আবার হেসে বলে….
” খিদে পেয়েছে ভীষণ । এখানে খেতে এসেছি আমরা ?
ইয়াশ উত্তর করলো না । একজন ওয়েটার কে ডাকলো । গম্ভীর মুখে শাফাহ্ কে প্রশ্ন করলো…..
” ইউ স্টুপিড টকেটিভ লেডি, কি খাবে বলো ?
শাফাহ্ হাপুসহুপুস করে উঠলো খিদের চোটে । ঢোক গিলে বোকার মতো বললো…..
” বিরিয়ানি ! ভীষণ খেতে ইচ্ছে করছে ।
দাঁত পিষে ধমকায় ইয়াশ…..
” শাট আপ । বাংলাদেশ পেয়েছো এটা ! এখানে ওসব পাবে না । ইনফ্যাক্ট, তোমার পছন্দ মতো কিছুই পাবে না । ভেজেটেরিয়ান অর সি ফুড, কোনটা খাবে বলো ?
আচ্ছা আমি দুটোই অর্ডার করে দিচ্ছি….
অতঃপর ওয়েটারের দিকে ফিরে হাসি হাসি মুখে বললো..
” ওয়ান ক্রিস্পি অক্টোপাস, টুনা ক্রুডো, অর রেড বিট স্টেক,,, উইদাউট এনি ওয়াইন ,, ওকে ? বি কেয়ারফুল….
অর্ডার নিয়ে ওয়েটার চলে যেতেই ইয়াশ তাকালো শাফাহ্’র দিকে । হাসি ঠেলে চোখ কুঁচকে বললো…..
” হোয়াট আর ইউ লুকিং অ্যাট ?
” আমার পছন্দ মতো কিছুই নেই , তাহলে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কেনো ?
” ইচ্ছে হয়েছে তাই । চুপচাপ বসে থাকো….
” আমি চুপচাপ বসে থাকতে পারি না । সহ্য করার হলে করুন, নয়তো আমাকে আমার বাড়িতে রেখে আসুন ।
” আবার বাড়ির কথা বলছো ? আরেকটা থাপ্পড় বসাবো গালে ?
” মেরেই দেখুন…
ইয়াশ বিরক্ত হলো চরম । কাল থেকে বাড়ির কথা বলতে হাজার বার বারন করা হয়েছে এই মেয়েকে । তবুও ভয় ডর নেই একটুও । অথচ কাল বিয়ের সময় কাঁদছিলো ভয়ে ।
একটু আগেও তো নেতিয়ে পড়ছিলো, এখন তেজ দেখো । মুখে মুখে তর্ক সহ্য করলো না ইয়াশ….
কন্ঠ চড়িয়ে বললো…..
” এইই মেয়ে, মুখে মুখে তর্ক করছো কোন সাহসে ? জোর করে বিয়ে করেছি আমি তোমায় ! ভয় করছে না ?
ইয়াশের গমগমে স্বরে শাফাহ্ থোরিই না পাত্তা দিলো । চেয়ারের উপর দুই পা উঠিয়ে বাবু হয়ে বসলো । দীর্ঘ এক শ্বাস ফেললো এপাশ ওপাশ তাকিয়ে । অতঃপর বললো হাত নাড়িয়ে….
” ভয় করবে কেনো ? আপনি বাঘ না ভল্লুক ? অবশ্য, কোনো রাক্ষসের থেকে কম নন ! সব সময় ধমকান শুধু ।
” শাট আপ স্টুপিড ! কে রাক্ষস ?
” এই যে আপনি ! নিজেকে দেখেছেন কখনো ? অবশ্য বাড়িতে তো একটা আয়নাও নেই । দেখবেনই বা কি করে ? আমি বলছি শুনুন, আপনি অনেকটা রাক্ষসের মতোই দেখতে ।
” তাহলে খেয়ে ফেলি তোমায় ?
শাফাহ্ মুখ বিকৃত করলো । ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বললো আঁখি লতা কুঁচকে…..
” খুব খিদে পেয়েছে বুঝি ? আমারও পেয়েছে ভীষণ ! ডোন্ট ওয়ারি, একটু পর খাবার আসছে । খেয়ে নেবো একসাথে ।
ইয়াশ ডান পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । কিঞ্চিত রাগে হাত মুঠিয়ে নিলো । এ কাকে তুলে আনলো সে ? আস্ত একটা ডাম্ব ।
তপ্ত যুবক ফোঁস করে শ্বাস ফেললো আবারো ।
বললো…..
” ভয় করছে না এখন , তাহলে কাল বিয়ের সময় ন্যাকা কান্না করছিলে কেনো ?
শাফাহ্ হাসলো চোখ নামিয়ে । যেনো লজ্জা পেলো । বললো মিটিমিটি স্বরে…..
” বিয়ের দিন সব মেয়েরাই কাঁদে , জানেন না ? সিরাত আপু, শিশির আর মেঘাও তো কেঁদেছিলো ! আমি কাঁদবো না কেনো ?
” ইউ মিন, তুমি শুধু ফর্মালিটি মেইনটেইন এর জন্য কেঁদেছো ?
” হু । তা নয়তো কি ! আপনার মতো এতো সুন্দর ছেলেকে বিয়ে না করার জন্য কাঁদবে কোন পাগল ?
” একটু আগেই না বলছিলে আমি নাকি রাক্ষসের মতো দেখতে । এখন আবার সুন্দর বলছো যে ?
” রাক্ষরাও সুন্দর হয় , আপনাকে না দেখলে বুঝতাম না ।
ইয়াশ হাসলো ঠোঁট বাঁকিয়ে । ক্রুর মুখাবয়ব টানটান করে বললো…..
” আমি তোমাকে বিয়ে করেছি কেনো, জানো ?
” কেনো ?
” টর্চার করার জন্য ।
ছেলেটার সহজ বাক্য । শাফাহ্ প্রতিক্রিয়া দেখালো না । চোখ নামিয়ে চিকন হেসে বললো পাল্টা…..
” আর, আমি আপনাকে বিয়ে করেছি কেনো জানেন ?
” আমি জোর করেছি, তাই !
” উঁহু, আপনার জোরে বিয়ে করলে এতক্ষণে খারাপ কিছু ঘটিয়ে ফেলতাম । তা করিনি । আমি তো বিয়ে করেছি মুক্ত হওয়ার জন্য । কিছু অবান্তর স্বপ্ন থেকে মুক্তির জন্য । বাঁচার জন্য । আপনি জোর করেছেন, তা ঠিক । তবে আপনার জোরে বাধ্য হইনি মোটেও ।
এ বেলায় রমনীর কন্ঠ সুরে পরিবর্তন এসেছে । কেমন গম্ভীর শোনালো তার কথা গুলো । ইয়াশ বুঝলো না । কপাল গুটিয়ে নিলো । অর্থ জানতে চাওয়ার জন্য মুখ খোলার আগেই ওয়েটার এসে খাবার সার্ভ করে চলে গেলেন । শাফাহ্ ঠোঁট ভিজিয়ে হামলে পড়লো খাওয়ায় । বড্ড খিদে পেয়েছে । যা পাওয়া গেছে, তাই সই । অন্তত খিদে তো মিটবে এতে । খেতে খেতে ইয়াশের দিকে চোখ দিলো । ছেলেটা কেমন সূক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে আছে । হয়তো এখনো শাফাহ্’র বলা কথাটার অর্থ বোঝার চেষ্টা করছে । শাফাহ্ হাসলো মিষ্টি করে । বললো খাবার চিবিয়ে……
” আপনি খাবেন না ?
” না !
” এতো খাবার আমি খাবো কি করে ?
” একটু আগে কি বললে তুমি ?
ইয়াশের পাল্টা অনুসন্ধিৎসু প্রশ্ন । খাদ যুক্ত দৃষ্টি সূচালো । শাফাহ্ হেসে বললো…..
” ও কিছুনা । খেয়ে নিন আপনিও । টর্চার করবেন তো আমায়, শক্তি প্রয়োজন । না খেলে শক্তি পাবেন না । আমি আবার রান্না বান্না পারি না । কিছুই পারি না । বকবক করতে পারি শুধু ।
বলেই ফিক করে হাসলো মেয়েটা । ইয়াশ শেষ কথাটা টেনে বিড়বিড় করলো অস্ফুটে…..
” তাতেই চলবে ।
,,,,,
খাওয়া দাওয়া শেষে সোজাসুজি বাড়ি ফিরেছে ওরা । তখন প্রায় সন্ধ্যা সাতটা । ধরনী তলিয়ে আঁধার নেমেছে ।
পাসওয়ার্ড টাইপ করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো দু’জন । অন্ধকার ঘুটঘুটে । দিনে কাঁচ ভেদে সূর্যরশ্মির আলোয় আলোকিত থাকে পুরো অ্যাপার্টমেন্ট । তবে রাতে অনেকটাই অন্ধকার । আলো আবছা । বাড়িতে না থাকায় আলো জ্বালানো হয় নি । ভেতরে ঢোকা মাত্রই অমনিশায় ছ্যাত করে উঠলো শাফাহ্ ।
দরজা চাপিয়ে দিতে না দিতেই বাইরে থেকে ছুটে আসা ক্ষিণ আলো টুকুও মিলিয়ে গেলো । তমসাছন্ন হয়ে গেলো চার দেয়ালের ভেতরটা । ভয়ে ধক্ করে উঠে তৎক্ষণাৎ ইয়াশের বাহু চেপে ধরলো শাফাহ্ । কাছ ঘেঁষে গুটিয়ে দাঁড়ালো ।
আকস্মিক শাফাহ্’র স্পর্শে বিব্রত হয় ইয়াশ । কপালে ভাঁজ ফেলে মেয়েটাকে দূরে সরানোর চেষ্টা করে । তবে পারে না । হাত বাড়িয়ে লাইট অন করে । লাভ হলো না খুব একটা । এই ক্ষিণ আলোর সাথে ওর সন্ধি থাকলেও শাফাহ্’র ভয় দূর হলো না ।
ইয়াশ ওর হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বললো…..
” স্টুপিড, হাত ছাড়ো আমার ।
” ভয় করছে !
” তো কি, কোলে নেবো ?
তিরস্কার পেয়ে হাত ছাড়লো শাফাহ্ । খিটখিটে স্বরে বলল….
” এই অন্ধকারে থাকেন কি করে আপনি ? অস্বস্তি হয় না ?
” অভ্যাস হয়ে গেছে ।
” আমার অভ্যাস নেই । পুরো বাড়িতে নতুন করে লাইট লাগাবেন । নয়তো আমি থাকতে পারবো না এই ভুতের ঘরে ।
” পারবো না কিছু করতে । তোমাকে সুখে রাখার জন্য এখানে আনিনি আমি । এভাবেই থাকতে হবে তোমায় ।তুমি থাকবে না, তোমার ঘাড় থাকবে ।
চোয়াল খিচে চিবিয়ে উচ্চারণ করলো যুবক । অতঃপর মেয়েটাকে একা ফেলে ঘরে ঢুকলো ।
শাফাহ্ পেছনে ফোঁস করে ওঠে । কারোর রাগ, উপেক্ষা, তপ্ত স্বর সহ্য করতে পারে না সে । আর এই লোকটার আচরণ শুরু থেকেই ওর উপর ক্ষুব্ধ । সহ্য করে যাচ্ছে শাফাহ্ । অলৌকিক ভাবে অসহ্যকর অনুভূতি হচ্ছে না । সেও তড়তড়িয়ে পিছু নিলো । গমগমে স্বরে বলল….
” ফোন দিন । আমি বাড়িতে কথা বলবো….
” প্রয়োজন নেই ।
” কেনো ?
” পিছুটান জাগবে ।
” আমার ফ্যামিলি ওটা । পিছুটান ছিঁড়তে বলছেন ?
” বলছি !
” আপনি আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন !
” তুমি দিচ্ছো কেনো ?
” আমি কিন্তু কাঁদবো এবার ।
” কাঁদানোর জন্যই এনেছি ।
শাফাহ্ ওষ্ঠ উল্টে ফেললো । টইটুম্বুর হয়ে ভরে আসলো আঁখি কোটর । সে নাজুক । অল্পতেই কাহিল হয় । কেঁদে ফেললো এ বেলায় । বললো ফুঁপিয়ে উঠে….
” কি ক্ষতি করেছি আমি আপনার ? কেনো এখানে এনেছেন আমায় ? কেনো বিয়ে করলেন ?
” বিয়ে করেছি সারাজীবন বেঁধে রাখার জন্য । বিয়েটা একটা বাঁধন মাত্র । ক্ষতি করোনি তুমি আমার । কেও ক্ষতি করেনি । আমি ভুল । ভুল বুঝি, ভুল করি সবসময় । আর এর খেসারত ও আমিই দেই । তোমাকে এভাবে জোর করাটাও হয়তো ভুল । কিন্তু আমার কাছে ভুল মনে হচ্ছে না এটা । যদি ভুল হয়েই থাকে, তাহলে মানিয়ে নাও । কারন এই ভুল শোধরাবো না আমি ।
বলতে বলতে নিজের ফোন আনলক করে শাফাহ্’র হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিছানার একপাশে বসলো । শাফাহ্ চোখ গাল মুছলো । তড়িঘড়ি করে শুভ্রর নাম্বারে ডায়াল করলো এপাশ থেকে ধ্যান সরিয়ে । বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী সকাল সাতটা পেরিয়েছে ।
সায়ান রাতে ছিলো এবাড়িতেই । ছেলেটাকে শুভ্র একা ছাড়ে নি এক মুহুর্তও । ওর সাথেই ছিলো রাতেও । আটটা বাজতে চললো, সায়ান ঘুমোচ্ছে এখনো । ভোরের দিকে ঘুমিয়েছে বহু কসরতে ।
শুভ্র খাটের ব্যাক বোর্ডে হেলান দিয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে এক ধ্যানে । ধোঁয়া ওঠা কফির মগ বেড সাইড টেবিলে । খানিক আগে মেহের দিয়ে গেলো । বাড়ির সবাই স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে । কিন্তু এই সায়ান ? কি হবে এই ছেলের ? পারবে কি স্বাভাবিক হতে ? শুভ্রর জানা মতে পারবে না কখনো ।
ফোন বাজতেই ধ্যান কাটলো শুভ্রর । সায়ানের ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার সঙ্কায় তড়িঘড়ি করে ফোন হাতড়ে সাইলেন্ট করলো । স্ক্রিনে তাকানো মাত্রই ভিন্ন কোডের আননোন নাম্বার দেখে কপাল কুঁচকে ফেললো । করপোরেট কল ভেবে খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখালো না । প্রথম বার বাজতে বাজতে কেটে গেলো ফোন ।
দ্বিতীয় বার আবার কল আসলো । করপোরেট হলে একবারের বেশি আসার কথা নয় । এ বেলায় ভাবান্তর দেখালো শুভ্র । স্বল্প উদ্বেগে ফোন রিসিভ করে কানে ঠেকালো । কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো চিকন রিনরিনে মেয়েলি কন্ঠের ডাক…..
” ভাইয়া !
শুভ্র আঁতকে ওঠে চেনা সম্বোধনে । হেলান দেওয়া জীর্ণ শরীর খানা দুলে ওঠে তার । ছ্যাঁত করে সোজা হয়ে বসে । কাঁপা গলায় অস্ফুটে উচ্চারণ করে…..
” টুকটুকি !!
তার কথা শেষ হতে না হতেই লাফিয়ে ওঠে সায়ান । ফোনের শব্দেই ঘুম ভেঙ্গেছে তার । টুকটুকির নাম সম্বোধনে কেঁপে উঠলো যুবকের আত্মা । বলহীন শরীর খানা টেনে তুললো সে । হাঁসফাঁস করে উঠলো অবিশ্বাসে…..
” শাফাহ্,,,
ওপাশ থেকে টুকটুকি হেসে কুল পায় না । কাঁদতে কাঁদতে হাসে । বলে উচ্ছ্বাসিত হয়ে…..
” হ্যাঁ ভাইয়া, আমি ।
” টুকটুকি,, বনু । তুই ফোন করেছিস আমায় !
শাফাহ্ কিছু বলতে পারলো না । তার আগেই এক ঝটকায় শুভ্রর হাত থেকে ফোন ছিনিয়ে নিলো সায়ান । হাপুসহুপুস করে উঠলো । ভিজলো দু’চোখ । সে ফোন কানে চেপে রুদ্ধ স্বরে বললো চেঁচিয়ে……
” শাফাহ্, কিউটিপাই, জান আমার, তুই এটা ? সত্যি তুই ?
ওপাশে মর্মান্তিক হাসে শাফাহ্ । সায়ানের কন্ঠের রোধ বুঝতে পারে যথেষ্ট । চোখ থেকে পানি গড়ায় অবিলম্বে ।বলে দু শব্দ…..
” হ্যাঁ বাডি ।
সায়ান দিকবিদিক জ্ঞান খুইয়ে বসলো । বুক চিরে দম টেনে হাঁসফাঁস করে বললো….
” জান আমার, জানরে, ঠিক আছিস তুই ? এই জান বলনা, তুই ঠিক আছিস তো ? ও তোকে মেরেছে, হ্যাঁ ? কি করেছে ও তোকে ? ভয় পাচ্ছিস তুই ? একদম ভয় পাবি না ! কোথায় আছিস বল, আমি এক্ষুনি তোকে নিতে আসবো !
” আমি ঠিক আছি সায়ান ভাইয়া !
মেয়েটার এক বাক্যেই থমকে যায় যুবক । ছটফটানি কমে আসে । শাফাহ্ আরো বলে……
” আমি একদম ঠিক আছি । উনি আমায় মারবেন কেনো ? কিচ্ছু করেন নি উনি আমায় । ভয় পাচ্ছি না একটুও । তোমরা চিন্তা করো না সায়ান ভাইয়া । আমি ভালো আছি তো ।
যুবকের হাত থেকে ফোনটা খসে পড়ে অবিলম্বে । সে অবিশ্বাসে ভেজা চোখে শুভ্রর দিকে তাকায় ।
” ও আমায় ভাইয়া ডাকছে কেনো শুভ্র ? ও ঠিক আছে তো ?
শুভ্র ধড়ফড়িয়ে নিচে নেমেছে ফোন নিয়ে । ফোন স্পিকারে । শাহিনা কাবির মেয়ের কন্ঠ শুনে কেঁদে উঠলেন । শাফাহ্ মাকে শান্তনা দিয়ে বলে……
” আম্মু,, কাঁদছো কেনো ? আমি ভালো আছি তো । তোমরা তো সব জানো, তাই না ? মেঘার ভাইয়া আমাকে বিয়ে করেছে । জানো,, আমরা একটু আগে অনেক বড় একটা রেস্টুরেন্টে খেতে গেছিলাম । আমি একদম ঠিক আছি আম্মু । তোমরা চিন্তা করছো আমায় নিয়ে ? চিন্তা করো না একটুও । আমি ভালো আছি তো । উনি কিচ্ছু করেন নি আমায় ।
বাড়ির সবাই একে একে এটা ওটা শুধোতে ব্যস্ত । শাফাহ্ হিমশিম খেয়ে যায় । সিঁড়ির নিচে সায়ান দাঁড়িয়ে । শাফাহ্’র অমন নির্ভিক স্ফীতি উল্লাসে বলা কথা গুলো মনযোগ দিয়ে শুনলো সে । সবার অগোচরে নিঃশব্দে কদম বাড়িয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো ।
পুরো পর্বটাই ওদের দুজনকে নিয়ে ছিলো । পরের পর্বে বাকিদের পাবেন । এই পর্বে রেসপন্স করবেন দ্রুত । হ্যাপি রিডিং । 
#চলবে……..
#আসবো_ফিরে_আবারো
#বোনাস_পর্ব
#সুরভী_আক্তার
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ
)
সবার সাথে কথা বলার মাঝেই আদ্র ফোন হাতে টেনে নেয় । বলে খানিক রাগে…..
” টুকটুকির বাচ্চাাাাা,,, আগে ফোন করিস নি কেনো, হ্যাঁ ? আমরা কতটা টেনশনে ছিলাম, জানিস ?
শাফাহ্ হাসলো শব্দ করে । টুপ করে পানি ঝড়লো বাঁ চোখের ভেজা কার্নিশ বেয়ে,, বললো হাস্যোজ্জ্বল মুখে….
” আদ্র ভাইয়ার বাচ্চাাাা,,, এইতো টেনশন মুক্ত করে দিলাম এখন । অযথা চিন্তা করো না আমায় নিয়ে । আমি ভালো আছি । বিশ্বাস করো, খুব ভালো আছি । এখানে তুমি নেই ,, জ্বালাতন করছো না আমায় । ভালো থাকবো না আবার ? আর উনি, মেঘার ভাইয়া কিন্তু খারাপ নন । বৃথা ভুল বুঝোনা ওনাকে । উনি আমার কোনো ক্ষতি করেননি ।
এপাশ থেকে তৌসিফ কাবিরের কম্পিত স্বরের বাক্য রমনীর কানে যায় এবারে…..
” আমরা জানি, ইয়াশ খারাপ নয় । ওকে বলো, তোমাকে যেনো দেশে নিয়ে আসে । আমরা কিচ্ছু বলবো না । মেনে নেবো সবটা । শুধু জানতে চাই, ও কেনো এমনটা করলো ।
বাবার কথায় শফাহ্ ভেজা চোখে ইয়াশের দিকে তাকায় । এখনো সটান বসে আছে যুবক । দুহাত একসাথে বেঁধে সামনের দিকে ঝুঁকে বসে আছে । শুনছে হয়তো মনযোগ দিয়ে । ফোন স্পিকারে । শাফাহ্ নিজে স্পিকার অন করেছে ।
আব্বুর কথার কোনো উত্তর করলো না রমনী । ছোট ছোট চোখে ইয়াশের দিকে তাকিয়ে রইলো । ওপাশ থেকে আগ বাড়িয়ে মেঘা ফোন হাতে নেয় ।
” টুকটুকি, ভাইয়া কোথায় ?
” এখানেই আছে !
” ফোন দে, আমি কথা বলবো ওর সাথে ।
ইয়াশ ঝট করে উঠে দাঁড়ালো এবার । মেঘার প্রত্যুত্তরে শাফাহ্ আর কিছু বলার আগেই তেড়ে গিয়ে এক ঝটকায় ফোন কেড়ে নিলো । মুখের উপর টুং টুং করে কল কেটে দিলো ।
শাফাহ্ ভড়কায় । চোখ মুছে ঢোক গিলে বলে…..
” কেটে দিলেন কেনো ?
দাঁত খিচলো ইয়াশ । কিড়মিড় করে চিবিয়ে বললো…..
” আজ থেকে আর বাড়িতে কথা বলতে পারবে না তুমি । এইই শেষ । আমার নামে সুনাম গাইতে বলিনি আমি তোমায় ! বেকার বেকার সবার সামনে ভালো সাজাচ্ছো কেনো আমায় ?
” আপনি তো খারাপ নন !
” খারাপ হয়ে দেখাই এবার ?
কন্ঠ আরো বেশি চড়ে এলো এ বেলায় । চোখ মুখ টাটিয়ে মেয়েটার দিকে ঝুঁকে পড়লো তপ্ত যুবক । যেনো হাত উদ্যত করবে এক্ষুনি । শাফাহ্ চিবুক নামিয়ে সিটিয়ে যায় একই অবস্থানে । নড়ে না একটুও । ভয় পায় না । বলে নির্ভয়ে….
” কি খারাপি করবেন ?
” যা সহ্য করতে পারবে না !
” মেয়েরা অলৌকিক সহ্য শক্তি নিয়ে জন্মায় । কি করবেন আর,, মারবেন ?
ইয়াশ তাজ্জব হয় মেয়েটার কথায় । কেমন সিরিয়াস ভঙ্গিতে কথা বলছে এই মেয়ে । যেনো কত কি বোঝে । কত বিজ্ঞ সে ! অথচ সে বড্ড অবুঝ । তাকে সেই হিসেবেই চেনে সবাই । জানে তার বোকামি । রাগ উঠলো ইয়াশের । রমনীর কথার পৃষ্ঠে তাল জোগাতে পারলো না ।
রাগ সামলাতে দাঁতে দাঁত চিপে পিষে নিজের চুল নিজেই টেনে ধরলো । ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বজ্র ঝাড়ি মারলো….
” চুপচাপ ঘুমাও স্টুপিড ।
দরজার কাছে গিয়ে থামলো আকস্মিক । কিছু মনে পড়তেই পিছু ফিরে রগরগে দৃষ্টিতে তাকালো । আবারো তপ্ত স্বরে বললো…..
” এইইই মেয়ে,, তখন ঐ ছেলেটা তোমাকে জান বলে ডাকলো কেনো ?
শাফাহ্’র এক মুহুর্তেই বুঝতে বাকি রয় না । নিশ্চয়ই সায়ানের কথা বলছে এই লোক । সেই তো জান বললো । আর শাফাহ্, পরিপ্রেক্ষিতে ভাইয়া বলে গুঁড়িয়ে দিলো তাকে । ভাবতেই অস্বাভাবিক হাসলো মেয়েটা । গলা বাড়িয়ে নির্দ্বিধায় উত্তর করলো ভেজা কন্ঠ চিরে….
” জান ? কারন উনি আমাকে ভালোবাসেন, তাই । জান সম্বোধনে তীব্র ভালোবাসা প্রকাশ পায় জানেন ? ভালোই লাগে শুনতে ।
” ভালোবাসে মানে ?
ইয়াশের কন্ঠ গর্জে এলো । সে আবারো তেড়ে এলো ঘরে ।
” বাহ্ রে,,, আমাকে বুঝি কেউ ভালোবাসতে পারে না ?
সবাই আমায় ভালোবাসে, বুঝলেন ? সবার ভালোবাসা এক হয় না । সেও ভালোবাসে আমায় । নিঃস্বার্থ ভাবে । আমার বাডি আমাকে খুব ভালোবাসে । খুব বেশি । সবাই জানে । আমিও জানি এটা । কিন্তু সে না জানুক । তার ভালোবাসা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না । এটাই মানুক ।
আন্দাজে কথা ছুড়ে নিস্তেজ কদমে ওয়াশ রুমের দিকে এগোলো মেয়েটা । চোখ থেকে টপাটপ পানি ঝড়লো । অগোচরে হাতের উল্টো পিঠে ভেজা কপোল মুছে নিলো । ইয়াশ কিছু বুঝে পায় না । চোখ সরু করে তাকিয়ে রয় । কি বললো এই বোকা মেয়েটা ? অর্থ এতো জটিল লাগছে কেনো ?
এদিকে ফোন কাটতেই মেঘার মুখখানা মলিন হয়ে আসে । অবস হয়ে আসে শরীর । শুভ্রর ফোন শুভ্রর দিকে বাড়িয়ে দেয় সে । ফোন হাতে পেয়েই ধক্ করে ওঠে শুভ্র । এতক্ষণে আঁতকে পিছু ফেরে । ঝটপট ঘাড় ঘুরিয়ে এপাশ ওপাশ তাকায় । বাড়ির সবাই উপস্থিত ড্রইং রুমে । শুভ্র গলা বাড়িয়ে বললো….
” মেহের, সায়ান কোথায় ?
মেহের ও এপাশ ওপাশ চাইলো তড়াক করে ।
” এখানেই তো ছিলো । কোথায় ভাইয়া !
শুভ্র ধড়ফড়িয়ে সদরের দিকে চায় । দরজা খোলা । সেদিকে কেউ নজর দেয়নি এতক্ষণ । ব্যস্ত ছিলো মেয়েকে নিয়ে । কিছু একটা আন্দাজ করেই ভড়কে গেলো শুভ্র । কপালের ধারে তর্জনী আর মধ্যমা বুলিয়ে বিড়বিড় করলো….
” ওওও নো…..
বলেই এলোমেলো কদমে বাইরের দিকে ছুটলো হন্তদন্ত হয়ে । পেছন থেকে ডাকলেন শাহিনা কাবির…..
” শুভ্র ,, কোথায় যাচ্ছিস এখন ?
” আমি আসছি আম্মু ।
ক্যালিফোর্নিয়ায় রাত সাড়ে দশটা ।
শাফাহ্ তখন ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে ইয়াশ কে দেখেনি আর । শাড়ি পাল্টে ইয়াশের একটা ধূসর রঙা টি শার্ট পড়ে নিয়েছে মেয়েটা । যদিও ওর শরীরে এটা খুব ঢিল । তার মতো রাক্ষুসে শরীর তো নয় অনুচ্চ রমনীর । সে নিতান্তই ছিমছাম গড়নের । কাঁধ থেকে পিছলে খুলে যাচ্ছিলো টিশার্টের গলা । শাফাহ্ কাঁধের কাছে একটা গিট্টু দিয়ে টাইট করে আটকেছে কোনো রকমে । টি শার্টের সাথে মিলিয়ে শর্ট’স পড়েছে একটা । ক্লজেট ঘেঁটে খুঁজে বের করেছে এটা । ইয়াশের হাঁটু সমান নিকার্স রমনীর পায়ের টাখনু অবধি পৌঁছেছে অনেকটা ।
শাড়িতে বেহাল হচ্ছিলো এতক্ষণ । এখন কম্ফোর্ট লাগছে । ঘুম আসছে না একলা একা । তার উপর ঘরের এমন হলদেটে আলোয় মাথা ভনভন করছে কেমন । চোখ দুটোতে অন্ধকার নামছে । খুলে রাখাও অসহনীয় । আবার ঘুম ও আসছে না । মেয়েটা বসে থাকতে থাকতে শুয়ে পড়েছে এক সময় । বুজে নিয়েছে দু’চোখ । চেষ্টায় আছে ঘুম টানার । দরজায় শব্দ হলো । খানিক চমকালেও নড়লো না মেয়েটা । ঘাপটি মেরে শুয়ে রইলো । ইয়াশ এসেছে, বুঝতে বাকি নেই । ঘুমানোর ভান ধরলো সে । তবে শ্বাস টানার সাথে সাথে ধক্ করে উঠলো অসহ্যকর বিদঘুটে গন্ধে । সিগারেটের ভ্যাপসা গন্ধ । এক লাফে উঠে বসলো মেয়েটা । গমগমে স্বরে বলল……
” সিগারেট খাচ্ছেন ?
ইয়াশ নিস্পৃহ । বেডের উপর থেকে বালিশ নিয়ে সরে আসতে আসতে জবাব করলো গা ছাড়া ভাবে….
” খেয়ে এসেছি !
” সিগারেটের ধোঁয়া সহ্য হয় না আমার । অ্যালার্জি আছে । শ্বাস নিতে কষ্ট হয় ।
” জানা আছে ।
” স্মেল ছড়াচ্ছে এখনো ।
কিছু বললো না অটল যুবক ।
মেয়েটা চেয়ে রইলো । তার পিটপিট দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে বালিশ আর কম্ফোর্টার নিয়ে ফের বাইরে বেরোনোর জন্য পা বাড়ালো যুবক । শাফাহ্ পেছন থেকে ডাকে…..
” আবার কোথায় যাচ্ছেন ?
” ঘুমোতে !
” আমি একা থাকবো ?
খাট থেকে নেমে এসেছে মেয়েটা । পেছনে এসে দাঁড়ালো গুটিসুটি মেরে । ছোট ছোট হাত দুটো জড়ো করে বললো আবার…..
” ভয় লাগে আমার ! আমি ঘুমোনোর পর আপনি অন্য রুমে যাবেন, বাঁধা দেবো না ।
তার কথা শেষ হতে না হতেই হেঁচকা টান পড়লো হাতে । মেয়েটাকে এক টানে দেয়ালে ঠাস করে আছড়ে ফেলে চেপে ধরলো যুবক । শাফাহ্ চমকে যায় আকস্মিক কান্ডে । ভয়ার্ত চোখে তাকায় । ইয়াশ ঝুঁকে হিসহিসিয়ে ওঠে ক্রোধিত স্বরে….
” এইই , আমি তোমার বডিগার্ড নই । ওকে ? একদম আদেশ করবে না আমায় । বলেছি তো, তোমায় সুখে রাখার জন্য এখানে আনিনি আমি । অনেক সহ্য করছি তোমায়, আর তোমার এই বকবকানি । ভালো আছি, ভালো থাকতে দাও । তোমার উপর রাগ ঝাড়তে বাধ্য করো না আমায় ।
ছলছল করে ওঠে রমনীর আঁখি জোড়া । নামিয়ে নেয় ভরা চোখ । নিঃশব্দে পাশ কাটিয়ে আলগোছে সরে আসে । চুপচাপ বিছানায় গিয়ে গুটিয়ে শুয়ে পড়ে । ইয়াশ তাকালো । রাগে ক্ষোভে রক্তবর্ণ তার অক্ষি যুগল । মেয়েটার এমন হঠাৎ বদলে যাওয়া নিস্পৃহ ভাব দেখে রাগ বাড়লো আরো । তবে তা নিজের উপর ।
ক্ষোভের দরুন সপাটে একটা লাথি বসালো দরজায় । অতঃপর ঠাস করে কপাট আটকে দিলো । বালিশ, কম্ফোর্টার বিছানায় ছুড়ে মারলো আবার । গজগজ করে একপাশে এসে মাথা চেপে ধরে বসলো ।
মিনিট কয়েক লাগলো রাগ দমাতে । রমনী পাশ ফিরে যুবককে দেখে ঠোঁট চেপে বললো এবারে….
” এই যে শুনুন, সকাল দশটার আগে আমি ঘুম থেকে উঠতে পারি না । সো, সকাল হলে প্যান প্যান করে ডিস্টার্ব করবেন না আমায় । আমি ঘুম থেকে ওঠার আগেই নিজ দায়িত্বে ব্রেকফাস্ট রেডি করে রাখবেন । কাল ব্রেকফাস্টে পরোটা খাবো আমি । ঠিকমতো সব রেডি করে রাখবেন, ওকে ? আমি আবার খিদে সহ্য করতে পারি না ।
ইয়াশ ঝট করে তাকালো অগ্নি চক্ষু নিয়ে । শাফাহ্ ফিক করে হেসে উঠলো । তা দেখে ফোঁস করে ওঠে যুবক ! কুশন ছুড়ে মারে রমনীর উপর । তেঁতে বলে…..
” ওওও শাট আপ টকেটিভ লেডি,,,, ঘুমাও চুপচাপ ।
,,,,,
বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী বাজে বিকেল চারটে ।
রৌদ্রের ফোন ভেঙেছে মেঘা । খানিক আগে নিজের জন্য একটা নতুন ফোন কিনে এনেছে রৌদ্র । সেটাতে সিমকার্ড ইন করে ওপেন করলো । মেঘার অনুপস্থিতির সুযোগে চুপিচুপি একটা নাম্বার তুলে ডায়াল করলো । রিসিভ হতেই কথা শুরু হলো তার । বেশ কদিনের ঝঞ্ঝাটে মিনির সাথে কথা হয়নি সেভাবে । বাচ্চাটা নিশ্চয়ই গাল ফুলিয়ে রেখেছে । তার ধারনাই সঠিক । আদুরে বাচ্চাটা অভিমান করেছে । মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে । কিছুতেই কথা বলবে না রৌদ্রের সাথে । রৌদ্র ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে টান দিয়ে ডাকলো আদুরে গলায়…..
” মাম্মাআআ !
মিনি ডাক শুনে ওষ্ঠ উল্টায় ।
ফিক করে হাসে রিসা । এই মেয়ের অভিমান গলে জল এক ডাকেই । রিসা মিনির দিকে ফোন বাড়িয়ে দিয়েও সরিয়ে নিলো,, বললো…..
” মিনি তোমার সাথে কথা বলবে না রৌদ্র ! ছাড়ো ওকে…..
হাসলো রৌদ্র । বললো…..
” তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে রিসা । বলা হচ্ছে না । বলাটা প্রয়োজন । আগে মেয়েকে দাও, ওর সাথে কথা বলি । কদিন কথা হয়নি, ভালো লাগছে না ।
রিসা হেসে আবারো মিনির দিকে ফোন বাড়িয়ে দিলো । এ বেলায় চট করে ফোন কেড়ে নিলো বাচ্চাটা । কানে ঠেকিয়েই আহ্লাদী সুরে ওষ্ঠ উল্টে ডাকলো….
” পাপা !
” ইয়াহহ্ মাম্মা !
” মিনিল পাপা মিনিল কাচে আচে না । মিনি লাগ কলেচে ।
” ওওও মাম্মাআআ,, এইতো পাপা কথা বলছে । ইউ নো, আমি পাপা বিজি আছি । মিনি এ্যাজ অ্যা গুড গার্ল , সব বোঝে । রাইট ? পাপা তো চলে আসবে খুব তাড়াতাড়ি । রাগ করতে নেই মাম্মা !
” তুমি আচো না !
নাক টেনে বললো বাচ্চাটা । বোধহয় কেঁদে ফেলবে । কাঁদলো কিনা সন্দেহ । রৌদ্র ঠাহর করতেই ধক্ করে ওঠে । আরাফের কথা মনে পড়ে । সে বলেছিলো, যেনো তার ভবিষ্যৎ বাচ্চাকে বীনা কারনে কখনো কাঁদতে না দেয় রৌদ্র । রৌদ্রের হাতেই তো সঁপে ছিলো দায়িত্ব । রৌদ্র ভোলে কি করে ? সে হাপুসহুপুস করে শান্তনা দেয়….
” মাম্মা,,, কাঁদছো তুমি ? কাঁদে না মা । আমি চলে আসবো তো । নেক্সট মানথ,, ওকে ?
” প্লমিস ?
” পাক্কা প্রমিস !
” কাকে কি প্রমিস করছেন ?
আকস্মিক একবিংশীর স্বর । তড়াক করে পিছু ফেরে রৌদ্র । কান থেকে ফোন নামায় ঝট করে । অগোচরে কল কেটে দেয় সহসা । ব্যালকনির দরজার কাছে বুকে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেঘা । দৃষ্টি তীক্ষ্ণ । কপালে ভাঁজ সূক্ষ্ম । রৌদ্রের নিরেট মুখাবয়বে কিঞ্চিত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো । রমনী তা লক্ষ্য করে এগিয়ে আবার শুধালো…..
” কি হলো ? এভাবে ভুত দেখার ন্যায় চমকালেন কেনো ? কার সাথে কথা বলছিলেন ?
হাসার চেষ্টা চালায় রৌদ্র । বলে কথা কাটিয়ে…
” ঐ , কিছু না । ক্লাইন্ট ছিলো । একটা ডিলে আটকে আছি । সেটা ক্লোজ করতে হবে ।
মেঘা দৃষ্টি সূচালো করলো আরো বেশি । বললো তীক্ষ্ণ স্বরে….
” প্রমিস করছিলেন কাকে ?
” এটার জন্যই । আমার জন্য আটকে আছে কিনা ,, তাই । তুই বুঝবি না ।
হঠাৎ তুই সম্বোধনে মেঘার কপালে তিতি বিরক্তির ভাঁজ পড়ে । ঝেড়ে ওঠে…..
” কি বললেন ?
” উপসস্, সরি সুইটহার্ট । মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে ।
” এবার মুখ ফসকালে মুখ সেলাই করে দেবো একদম ।
হাসলো রৌদ্র । খানিক বাদ মেঘাও ।
কাছে গিয়ে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াতেই রমনীকে আরো কাছে টেনে নিলো বেপরোয়া যুবক । খোঁপার বাঁধন খুলে এক গোছা চুল টেনে চেপে ধরলো নাসিকার ডগায় । ঘ্রাণ টানলো উন্মত্তের ন্যায় । মেঘা ওর পাগলামো দেখে মিটিমিটি হাসে । হাঁফ ছেড়ে লোকটার সুঠাম বুকের বাঁ পাশে মাথা নামিয়ে বলে বিষন্ন কন্ঠে……
” বাড়ির সব ঠিকঠাক হচ্ছে ধীরে ধীরে ।
” হু ।
” ভাইয়ার সাথে কথা বলা প্রয়োজন ।
” সময় দাও, সব ঠিক হয়ে যাবে ।
” নতুন ফোন কিনেছেন ?
” হু ।
” দেখি !
রৌদ্র সহসা ফোন বাড়িয়ে দিলো । মেঘা সেটা হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বললো…..
” সরি ।
” ফর হোয়াই ?
” ফোন ভাঙ্গার জন্য !
ঠোঁট ঠেলে হাসলো রৌদ্র । একবিংশীর অবিন্যস্ত কেশরাশী কানের পাশে গুছিয়ে দিতে দিতে বললো…..
” আমাকেই ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়েছো,, ফোন আর এমন কি ? হাজার টা আসবে যাবে । তবে এই রৌদ্র কিন্তু একটাই থাকবে ।
একটু থেমে ডাকলো….
” ইভারা ?
” উমম !
” আ… আমাকে একটু বাইরে যেতে হবে !
” কোথায় ?
” সুইজারল্যান্ড ফিরতে হবে একটু !
মেঘা ছ্যাঁত করে উঠলো । দ্রুত মাথা তুলে চাইলো । গোল গোল মুখে বললো সহসা…..
” কেনো ?
” কাজ আছে জান ! যেতে হবে কদিনের জন্য !
শুষ্ক ঢোক গেলে রমনী । রৌদ্রের পিঠের জামার অংশ খামচে ধরে বলে ভেজা গলায়….
” কি কাজ ওখানে ? সব ছেড়ে দিন । আপনি শুভ্র ভাইয়ার সাথে বাবার বিজনেসে জয়েন করুন । আমরা দেশে সেটেল হবো ।
” হবো তো । বাট তার আগে ওখানে যেতে হবে ।
” না , যাবেন না ।
মেঘা আবারো মাথা নামিয়ে রৌদ্রের বুকে রাখলো । জেদ ধরে বললো শেষের কথা । রৌদ্রের কপালে ভাঁজ । মুখে গুরুত্বর ছাপ চিন্তার । হয়তো ভাবছে কিছু । চরম দোটানায় সে । দু পক্ষের টানে অস্থির তার অন্তরাত্মা । প্রকাশ করতে পারছে না । সে ঢোক গিললো । শক্ত করে জড়িয়ে নিলো স্ত্রীকে । রমনীর সিঁথির নিকট ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো কন্ঠ খাদে নামিয়ে…..
” জেদ করে না ইভারা । তুমি বুঝতে পারছো না । আমার কাজ আছে ওখানে । শুধু কদিনের জন্য যেতে হবে । চলে আসবো তো আবার ।
” তারপর পার্মানেন্ট চলে আসবেন ?
” হু ।
” বলেছিলেন যে ওখানে আমার জন্য সংসার সাজিয়ে রেখেছেন !
” না , ওখানে তোমায় নিয়ে সংসার পাতবো না । সাজানো সংসার গুছিয়ে এখানে নিয়ে আসবো । আমরা এখানেই ঠিক আছি সানি ।
,,,,
অবিষন্ন শরীরে ঘরে ঢুকলো শুভ্র । চোখ মুখ পুরো দেবে গেছে । তখন প্রায় সন্ধ্যা । সারাদিন এপাশ ওপাশ ছোটাছুটি করেছে । দুপুরে ফিরেছিলো একবার ।
সে ঘরে ঢুকতেই মেহের ঘিরে ধরে ওকে….
ধড়ফড় করে বলে…..
” এসেছো তুমি,,, ভাইয়ার খোঁজ পেলে ?
শুভ্র পড়নের শার্ট টা খুলে ছুড়ে মারলো এক পাশে । ধপ করে বসে পড়লো সোফায় । দুহাতে মাথা চেপে ধরলো । মেহের বুঝলো যা বোঝার । ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠলো মেয়েটা । শুভ্রর পাশে বসে বাহু চেপে ধরলো ওর । ঝাকালো দূর্বল হাতে । বললো থেমে থেমে…..
” কি হলো , বলো না । ভাইয়া কোথায় গেছে, খোঁজ পাওনি এখনো ?
” ……..
” বলবে না কিছু ? চুপ করে আছো কেনো এভাবে ? কোথায় গেছে ভাইয়া ? খোঁজ পেয়েছো কি পাওনি ! বলো আমায় !
#চলবে…….
সময় খারাপ গেলে চারদিক থেকে খারাপ যায় । দুইদিন ধরে সাড়ে চার হাজার শব্দ লিখেছি । কপি করতে গিয়ে পুরোটাই কাট । ক্লিপ বোর্ডে এটুকুই পেলাম । মানে, নিজের উপর কি যে রাগ উঠতেছে বলে বোঝাতে পারবো না । স্পয়লার সহ আগপিছ বাক্যগুলো কত ভেবে চিন্তে কাল রাতে গুছিয়ে লিখলাম । কিন্তু সব এক সেকেন্ডেই শেষ । রিতিমত কান্না পাচ্ছে আমার
। একবার লেখা শব্দ আরেকবার ঠিকমতো গোছানো যায় না । আমি গোছাতে পারি না । কি কি লিখেছিলাম আল্লাহ জানে । সবটা কেটে গেছে ।
যাই হোক, আজ এটুকুই পড়ুন । ছোট তাই পর্ব আকারে না দিয়ে বোনাস করে দিলাম । রেসপন্স করবেন সবাই
। কালকে সুন্দর একটা পর্ব পাবেন, ইনশাআল্লাহ । 
Share On:
TAGS: আসবো ফিরে আবারো, সুরভী আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৭
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩০
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৭০
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৭
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫৮
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪৯
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৬
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৩
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৩