Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ২৮


#আমার_আলাদিন

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা২৮

“আহ…আউচ! আস্তে!”

কপালের ক্ষতে সামিয়া ওষুধ লাগিয়ে দেয়ার হিসিয়ে উঠল সাইবান। অসন্তুষ্ট দৃষ্টিতে ছেলেকে একবার দেখে সামিয়া পুনরায় নিজের কাজ বহাল রাখলেন। গতকালের ব্যান্ডেজটা খুলে নতুন ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিতে দিতে তিনি বললেন,

“আমাদের বাসাটা কি হঠাৎ স্লিপারি হয়ে গেল? যেখানে সেখানে শুধু পিছলে যাস।”

“আ…মম, লাগছে লাগছে।”

“লাগাই উচিত। দিবাস্বপ্ন দেখতে দেখতে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলি নাকি? ২৫ বছরের একটা ধাড়ি ছেলে! জীবনের এতগুলো বছরেও একবারও এদিক সেদিক কোথাও পা হড়কে পড়লনা, সে আজকাল শুকনো মাটিতে আছাড় খায়। সুগন্ধা না দেখলে আমার কাছে আসতি বলে তো মনে হয়না।”

“ওই দুর্গন্ধ যত নষ্টের গোঁড়া। ওটাকে বিয়ে শাদী দিয়ে তাড়াতাড়ি এই বাড়ি থেকে বিদায় করো।”

“হ্যাঁ। তারপর উঠতে বসতে হুকুমের ছড়ি ঘোরাবি কার উপর? বিয়ে শাদী সৃষ্টিকর্তার দান। তাছাড়া ভালো ছেলে পাওয়ার ব্যাপার আছে। ওদের মধ্যে তো আবার কাস্ট, কুষ্ঠি কতকিছু মেলানো লাগে। আগে পড়ালেখা শেষ করুক মেয়ে, পরে ওইসব চিন্তা করা যাবে।”

সাইবান আর একটাও কথা বললনা। গোমড়া মুখ করে বসে থেকে সামিয়াকে কাজ করতে দিল। নিজের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে সামিয়া অবশেষে সরে দাঁড়ালেন। ছেলের গাল ফোলানো মুখটা দেখে তার ঠোঁটে হাসি খেলে গেল।

“কিরে ব্রো? অ্যাংরি বার্ড হয়ে বসে আছিস কেন?”

“তোমার কি ব্রো? তুমি যাও, তোমার হাসপাতালে যাও। শুধু যাও কেন? ওখানে তাবু টানিয়ে আস্তানা বানিয়ে নিতে পারনা? কষ্ট করে ওই এক দুই ঘণ্টার জন্য বাড়িতে না আসলেই তো চলে।”

“ওহহ, এজন্য রাগ করেছে চ্যাম্প? মম বেশি বিজি আজকাল, তাইনা?”

ছেলের পাশে বসে পড়লেন সামিয়া। প্রায় দিন পনেরো যাবৎ হাসপাতালে ভীষণ চাপ যাচ্ছে। সামনে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আছে, বিদেশ থেকে বেশ নামিদামি কয়েকজন ডাক্তার আসবেন, সবকিছু আয়োজন এবং রোগী দেখায় আজকাল তার বাসায় প্রায় ফেরা হয়না বললেই চলে। হাসপাতালের কাছেই তার ছোটবেলার এক বান্ধবীর বাড়ি। বেশি দেরী হলে মাঝে মধ্যে বান্ধবীর সাথেই থেকে যান। আহমদ আসার পর থেকে তার বাড়িতে ফিরে আসার তাড়নাটা অনেক কমে গিয়েছে। মনটা কেমন অশান্ত। কিন্তু ছেলেমেয়েদের সেসব বুঝতে দিতে চান না তাই হাসপাতালের বাহানা ব্যবহার করে চলেন।

হাত বাড়িয়ে সাইবানের মাথার চুলে বিলি কেটে দিতে লাগলেন তিনি। ছেলেও চোখ বুঁজে বিড়ালছানার মতন তার কোল ঘেঁষে শুয়ে পড়ল। এই সময়টা তার ভীষণ প্রিয়। যখন তার চঞ্চল ছেলেটা বাইরের জগৎ ছেড়ে এসে তার কোলে আশ্রয় নেয়।

“আমি তো ভাবলাম, বাড়িতে মানুষ প্রাইভেসি পাবে। কিন্তু দেখছি তো হিতে বিপরীত। তারপর বল ব্রো, আলাদা রুমে থেকে বিবাহিত জীবনের স্বাদ কেমন নিচ্ছিস?”

সাইবানের শান্ত মুখটা কুঁচকে গেল। জিভে চুক করে বিরক্তিবোধক একটা শব্দ তুলে সে বলল,

“জরিনার আম্মা সকিনার জন্য আমি কালকেই ছেলে দেখা শুরু করব। সিসিটিভিটা আমাকে এক দন্ড শান্তি যদি দিত!”

“এভাবে বলছিস কেন? খবর সারিকাও পাচার করে থাকতে পারে।”

“ওই ছেড়ির থেকে চিল মানুষ দুনিয়ায় দুইটা নেই। শি ক্যান নট কেয়ার লেস অ্যাবাউট দিস সাংসারিক ঝামেলা! সব দুর্গন্ধই করে। সারাদিন বসে বসে নাগিন সিরিয়াল দেখলে তো এই হবে।”

“সিরিয়াসলি ব্রো। টপিক চেঞ্জ করছিস কেন? মমকে বলবি না? কি হয়েছে?”

গলার সুর পরিবর্তন করলেন সামিয়া। নরম হলেন ভীষণ। সাইবানের মাথায় বিলি কাটতে লাগলেন। ছেলে তার আর কোনো কথা বললনা। শান্ত হয়ে চুপটি করে রইল।

“ইরাম কিছু বলেছে? সেদিনের ব্যাপারে?”

অবশেষে মুখ তুলে মায়ের দিকে তাকাল সাইবান।

“উনি আমাকে বলা কবে ছেড়েছে? সন্দেহ ওনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গিয়েছে।”

“এভাবে বলছিস কেন? তিতলির বাবা মায়ের কাণ্ডে এখনো নারাজ বুঝি?”

“আমি জানিনা। আজকাল কথা হয়না।”

সাইবান কাঁধ তুলে ঠোঁট উল্টে এমনভাবে বলল যেন ইরামের সঙ্গে সে কথাবার্তা বলেনা এতে তার কিছুই যায় আসেনা। অথচ সেই ডোন্ট কেয়ার মনোভাবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিষন্নতাটুকু সামিয়া মা বলেই বোধ হয় ধরতে পারলেন। বিলি কাটা থামিয়ে ছেলের বুকে হাত রেখে আলতো করে চাপড়াতে লাগলেন সামিয়া। যেন ঘুম পাড়াচ্ছেন। তার নমনীয় কন্ঠস্বর বাজল সাইবানের কানে,

“আমি ইরামকে বুঝতে পারছি, তোকেও বুঝতে পারছি। আর আমার মনে হয় তোরা কেউই দোষী না। ইরাম একটা কালো অতীত থেকে বেরিয়ে এসেছে। হুট করে ওর নতুনভাবে কাউকে জোর দিয়ে বিশ্বাস না করাটা স্বাভাবিক। ওর মনের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা কর। নিজের আগে সবসময় ওকে ওর বাচ্চার কথাই ভাবতে হচ্ছে। ও চাইলেই এই বাড়ি থেকে চলে যেতে পারবেনা, কারণ ওই বাচ্চা। দেখ, ভাগ্যের কাছে কতটা অসহায় একটা মানুষ! ওর ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে যাওয়াটাই নরমাল।”

“এইযে তুমি মাত্রই বললে, তুমি নাকি আমাকেও বুঝতে পারছ মম? তাহলে তোমার সমস্ত কথায় শুধু ওনার পক্ষে সাফাই কেন?”

সামিয়ার হাঁটু আঁকড়ে ধরে কোলে মুখ গুঁজে রাখল সাইবান। তার গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এলো,

“আ’ম ট্রায়িং, ওকে? কিন্তু চেষ্টা তো শুধু একজন করলে হবেনা। এক নৌকায় যদি দুজন মাঝি থাকে তাহলে দুজনকেই সমানতালে নৌকা বাইতে হবে। যদি একজনই বাইতে থাকে আর অন্যজন হাল ছেড়ে আয়েশ করে, তাহলে তো নৌকা বেশিদূর এগোবেনা।”

সামিয়া মুখ নামিয়ে ছেলের মাথায় একটা স্নেহের চুমু খেলেন। তারপর তার কানের কাছে গিয়ে মোলায়েম গলায় বললেন,

“যে কথাগুলো আমাকে বলছিস, সেগুলো ইরামকে সরাসরি কেন বলিস না? একটা সম্পর্ক ধরে রাখার মূল ভিত্তিই হলো কমিউনিকেশন। একে অপরকে না বোঝাটা কোনো ফ্যাক্ট না। ফ্যাক্ট হলো নিজেদের অনুভূতিগুলো সৎভাবে একে অন্যের সাথে শেয়ার না করাটা। ইরাম চাপা স্বভাবের। তাই যোগাযোগটা তোকেই আগ বাড়িয়ে শুরু করতে হবে। হ্যাঁ, যদি এরপরও সমাধান না হয় সেটা অন্য ব্যাপার, কিন্তু শুরু তো কাউকে না কাউকে করতে হবে বল?”

“তুমি আর ড্যাডও তো কমিউনিকেশন করো না, মম!”

সাইবান এমন একটা কথা একদম বেখেয়ালে বলবে সামিয়া আশাও করেননি। সম্পূর্ণ জমে গেলেন তিনি। ছেলে তার দিকে তাকিয়ে নেই, কোলে মুখ গুঁজে আছে। যদি তাকিয়ে থাকত, তাহলে অপরাধবোধ ছাড়া কি তিনি ওই চোখের দৃষ্টি দেখতে পারতেন? কোনোদিন না। সামিয়া ঝট করে পাশ ফিরে তাকালেন। হঠাৎ করেই তার সব শব্দ হারিয়ে গিয়েছে। ছেলেকে তিনি আর কোনো উপদেশ দিতে পারলেন না। যে অপরাধের অপরাধী তিনি নিজে, সেই উপদেশ ছেলেকে কীভাবে দেবেন?

মা ছেলে কারোরই আর একে অপরের সাথে কথা বলা হলোনা। দুজনই একদম চুপ করে রইল। অতঃপর সাইবানের ফোন ভাইব্রেট করে উঠল পকেটে। মায়ের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে সে ফোন রিসিভ করল। ওপাশ থেকে কথাগুলো শুনল বেশ মনোযোগ দিয়ে। তার নির্মল চেহারা ক্রমশ তীক্ষ্ণতর হয়ে উঠল। সামিয়া খানিক আশঙ্কা বোধ করলেন।

“কি হয়েছে?”

তিনি প্রশ্ন করলেন। সাইবান প্রথমটায় জবাব না দিয়ে উঠে দাঁড়াল। চেয়ারে ছুঁড়ে রাখা নিজের রংচঙে জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয়ে রুমের বাইরের দিকে এগোল। তবে বের হওয়ার আগে পিছন ফিরে সে মাকে জানাল,

“বখতিয়ারের লা*শ পাওয়া গিয়েছে। আমি থানায় যাচ্ছি। খবরটা ওনাকে জানানোর কোনো প্রয়োজন নেই।”

এটুকু বলেই সাইবান ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল। সামিয়া বিছানায় হতবাক হয়ে বসে রইলেন। উনি বলতে সে ইরামকে বুঝিয়ে গিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মাথা চেপে ধরলেন তিনি। বুকের ভেতর ভয় ভর করল। এ কোন অশুভ চক্রে জড়িয়ে যাচ্ছে তার পরিবার?

⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─

নিজের ক্লাস শেষে করিডোর ধরে এগিয়ে যাচ্ছে কায়সান। তখনি পিছন থেকে ডাক ভেসে এলো।

“কায়সান?”

ঝট করে ঘুরে তাকাল সে। ছুটে আসছে ইরাম। রমণীর পরনে একটা লাল বর্ণের তাঁতের শাড়ি। ঠিক কটকটে লাল নয়, একদম হালকা শেড। যার কারণে চোখ আরাম পায়। পরিপাটি করে জড়ানো বস্ত্রটি অন্যান্য দিনের তুলনায় ইরামকে একটু বেশিই আকর্ষণীয় করে তুলেছে। লম্বা চুলগুলো খোঁপা বাঁধা, তাতে আবার একটা বাগানবিলাস ফুল গুঁজে দেয়া। অসাধারণ লাগছে। পুরোদস্তুর বাংলাদেশী নারী। কায়সান ক্ষণিকের জন্য দৃষ্টি ফেরাতে পারলনা নিজের। অজান্তেই ইরামের ছুটে আসতে থাকা অবয়বে আটকে রইল তার গভীর চোখজোড়া। ইরাম কাছে এসে থামল। বিরাট করে হাসল,

“তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে।”

কায়সান ভ্রু উঁচু করে তাকাল। ইরাম কোর্সের ক্লাস করছে এক সপ্তাহ হয়ে গিয়েছে। এই এক সপ্তাহে শিক্ষক শিক্ষার্থীর বন্ধনের পাশাপাশি তাদের মাঝে পুরাতন বন্ধুত্বের আবহটা ফিরে এসেছে। উভয়েই এখন একে অপরকে নাম ধরে, তুমি বলে সম্বোধন করে। যদিও ক্লাসের ভেতর সে ইরামের জন্য মিস্টার রুশদী আর তার জন্য ইরাম মিসেস কিবরিয়া। সম্পূর্ণরূপে ইরামের দিকে ঘুরে দাঁড়াল কায়সান। শুধাল,

“সারপ্রাইজ?”

ইরাম মাথা দুলিয়ে নিজের হাতের ম্যাকবুকটা খুলে দেখাল। স্ক্রিনে তার ফাইভার অ্যাকাউন্টের ছবি। সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, একটা কাজের অনুরোধ পেয়েছে সে। ইরাম খানিকটা গর্বিত কন্ঠস্বরে জানাল,

“কোর্সের আগেই অ্যাকাউন্ট খুলে আমি অ্যাড দিয়ে রেখেছিলাম, ৫ ডলারে আর্টিকেলের কাজ করে দেব। বেশ কয়েকটা স্যাম্পল ও রেডি করে রেখেছি। যেহেতু কলেজ ভার্সিটিতে কম্পিউটারের টুকটাক কাজ শেখা হয়েছিল। একজন যোগাযোগ করেছে। সে আমার থেকে দুটো আর্টিকেল নিতে চায়। ৮ ডলার দেবে। একসাথে দুটো যেহেতু নিচ্ছে আমি রাজী হয়ে গিয়েছি ডিসকাউন্টে। আমার প্রথম ফ্রিল্যান্সিং কাজ!”

“ব্রিলিয়ান্ট!”

কায়সানের চোখজোড়া চকচক করে উঠল। বিস্তৃত হাসি ছেয়ে গেল তার তীক্ষ্ণ শ্যামলা মুখজুড়ে। ইরাম এক দেখাতেই বলতে পারবে, এই হাসি মিথ্যা নয়, অপরের খুশিতে সুখী হওয়ার পবিত্রতম হাসি। কায়সান উত্তেজিত হয়ে ইরামের কাঁধে সাবধানে হাত রেখে বলল,

“লিসেন গার্ল, আ’ম রিয়েলি রিয়েলি প্রাউড অব ইউ।”

“থ্যাংক ইউ।”

“এটা সবেমাত্র শুরু, ইরাম। দেখ, সামনে আরও কত সফলতা বাকি আছে তোমার জন্য। তোমার প্রথম কাজের জন্য আমার শুভকামনা। তবে বেশকিছু ব্যাপার অবশ্যই মাথায় রাখবে যেন কোনোভাবেই স্ক্যাম না হয়ে যাও। প্রথমত, অবশ্যই পেমেন্টের একটা অংশ রিসিভ করে তারপরই কাজ দেবে, এর আগে অতি বিশ্বাস করে দিয়ে দেবে না। আর টাকাটাও কিন্তু সরাসরি ব্যাংকে আসেনা। তুমি বিদেশ থেকে যেটা অর্জন করবে সেটা দেশের জন্য রেমিটেন্স হিসাব হবে কিন্তু। সো…”

ইরামকে হাজার রকম উপদেশ দিতে দিতে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল কায়সান। ইরামের ভালোই লাগল। একদম গুরুজনের মতন কোনটা কীভাবে করতে হবে, কোনটা করা যাবেনা সেসব বুঝিয়ে দিতে লাগল কায়সান। মনে মনে ভাবল সে, ৮ ডলার আহামরি কিছু নয়। কিন্তু এই সূচনাটাই দরকার ছিল ইরামের। প্রায় বাইরের সিঁড়িতে পৌঁছে গিয়েছে দুজনে। কায়সানের ক্লাস না থাকলে সে ইরামকে প্রতিদিন বাইরে গাড়ি অব্দি পৌঁছে দেয়। আজও ব্যতিক্রম ঘটেনি। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে হাসিমুখে সে বলল,

“তারপর বলো, নিজের প্রথম ফ্রি ল্যান্সিং উপার্জন দিয়ে কি কি করবে?”

“৮ ডলার বাংলাদেশি টাকায় ৯৮২ এর মতন পড়বে। ভ্যাট, ট্যাক্স আছে। তুমি কি চাও? তোমাকে কিছু গিফট করি?”

ইরামের প্রস্তাবে কায়সান হাসল,

“এক প্লেট ফুচকা খাওয়ালে কিন্তু কিছুই মনে করব না।”

“তুমি এত লো মেইনটেনেন্স? আচ্ছা ঠিক আছে। তোমার জন্য এক প্লেট ফুচকা তোলা থাকল। ইযানের জন্য নতুন বেবি লোশন।”

আরও একটা জিনিসের কথা ইরামের মাথায় এলো ঠিকই। কিন্তু কায়সানের সামনে সেটা বললনা। গাড়ির কাছে এসে গিয়েছে উভয়ে। আজ এসেছে নীরব। হাসিমুখে অপেক্ষা করছে। ইরাম চোখ উল্টে ভাবল, ঠিক কোন ধরণের শক্ত বন্ধুত্ব হলে বন্ধুর জন্য দিনের পর দিন মানুষ বিনা প্রশ্নে এভাবে হাজির হয়ে যায়। কায়সানকে বিদায় জানিয়ে নীরবের কাছে গেল ইরাম।

“তোমারও বিশেষ কোনো কর্ম নেই বুঝতে পেরেছি।”

“এটাই আমার কর্ম। এর জন্য বেতন পাই আপনি জানেন না?”

একগাল হেসে বলল নীরব। ইরাম সন্দেহের নজরে তাকাল। সত্যিই বেতন পায় নাকি মজা করল? মাথা ঘামালনা আর। শুধু দিন গুণছে সে। দেখবে আর কতদিন সাইবান এই চোর পুলিশ খেলা জারি রাখতে পারে তার সাথে।

“আচ্ছা। বাড়িতে ফেরার আগে একবার সুপারশপে নামব। চীজ কিনতে হবে। বাড়িতে ছিল না, চীজ পাস্তা বানাব আজ। তুমিও ইনভাইটেড।”

“আরে ভাবী, আপনি তো জোস!”

দুজনই গাড়ির ভেতর উঠে বসল। কিছুক্ষণ বাদে মাঝরাস্তায় সুপারশপের সামনে গাড়ি থামাল ড্রাইভার। ইরাম এবং নীরব বেরিয়ে ভেতরে ঢুকল। বাস্কেট নিয়ে চীজ, পাস্তা আর টুকটাক জিনিস ইরাম নিচ্ছে ঠিক এমন সময়েই বিপরীত দিক থেকে আসতে থাকা কারো সঙ্গে আস্তে ধাক্কা লাগল তার।

“ওহ, এক্সট্রিমলি সরি।”

ইরাম সরে দাঁড়াতেই খানিক অবাক হয়ে গেল। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিতলি। একটা কার্ট ঠেলে আসছিল। পরনে টাইট টপ আর ঢোলা ট্রাউজার। কি যেন চিবুচ্ছে, চিয়ুইং গাম বোধ হয়। ইরামকে দেখে চোখে বুঝি তারা ফুটে উঠল মেয়েটার।

“ওহ। হ্যালো। ভাবিনি আপনাকে এখানে এভাবে দেখতে পেয়ে যাব।”

“জি। আমি টুকটাক কেনাকাটা করতে এসেছিলাম।”

এটুকু বলেই ইরাম ইচ্ছাকৃতভাবে তিতলিকে এড়িয়ে যেতে চাইল। কিন্তু পারলনা। মেয়েটা তার পিছন পিছনেই এলো।

“দেখা হয়ে ভালোই হলো। আপনাকে কিছু বলার ছিল আমার।”

ইরাম থামলনা। তাক থেকে নামিয়ে জিনিস দেখতে দেখতেই জানাল,

“বলো।”

“সেদিনের জন্য আমি দুঃখিত। জিনির কাছে সরি বলেছি, কিন্তু আপনাকে বলা হয়নি।”

“জিনি?”

খানিকটা অবাক হলো ইরাম। এবার ফিরে তাকাল তিতলির দিকে। মেয়েটা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,

“ওহ, সাইবান। ওর আলাদিন নামটা খুব সুন্দর না? আলাদিনের রূপকথার জ্বীনকে মিলিয়ে ওকে ডাকি জিনি। আফটার অল হি ইয স্পেশাল।”

“আচ্ছা।”

শান্তভাবে মোকাবেলা করার চেষ্টা করল ইরাম। নিজের কাজে মনোযোগ দিল। তিতলি বলে গেল,

“দেখুন, আপনার কাছে অস্বীকার করার কিছুই নেই। এসব বিষয় লুকিয়ে রাখাও উচিত না। আমি আগে জিনিকে পছন্দ করতাম। বাবা মাও বুঝতে পারত। এজন্যই তারা ওইদিন সাহস করে আমাকে না জানিয়ে আগ বাড়িয়ে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন। পুরোটাই আমার দোষ। কাজের চাপে ওর বিয়ের বিষয়টা শেয়ার করা হয়নি। আমার বাবা মায়ের কোনো দোষ ছিলনা। আমি এজন্যই ক্ষমাও চেয়েছি এবং চাইছি। তবে আপনি আমার বাবা মায়ের সঙ্গে যে ব্যবহার করেছেন, সেটা কিন্তু বেয়াদবি ছিল।”

থমকাল ইরাম। তিতলির কথার মাঝে কোনো ভুল নেই। প্রত্যেকটা বাক্য সত্যি এবং সৎ। এতটা সৎভাবে উপস্থাপন, সূক্ষ্মভাবে ঘটনাগুলো স্তরে স্তরে মস্তিষ্কে সাজানো একপ্রকার ট্যালেন্ট। সেই ট্যালেন্ট তিতলির আছে সে ভালোমত বুঝে গেল। একটি নিঃশ্বাস ফেলল সে,

“দেখ তিতলি, আমারও ওনাদের সাথে বেয়াদবি করার ইচ্ছা ছিলনা। কিন্তু হঠাৎ করে বাড়ি বয়ে এসে কেউ তোমার হাসবেন্ডকে নিয়ে মনগড়া স্বপ্ন বুনলে তুমি কি করবে? মেয়ে হিসাবে ভেবে দেখ, আশা করি বুঝে যাবে। আর আমি আমার ঔদ্ধত্য স্বীকার করে নিচ্ছি, আমার মাথা তখন গরম ছিল। তাই আমার পক্ষ থেকে তোমার বাবা মাকে সরি বলো। কোনোদিন দেখা হলে আমি নিজে থেকেই বলব।”

“হাসবেন্ড? হাসবেন্ড হিসাবে আদৌ মানেন ওকে?”

ইরাম এতকিছু বলল অথচ তিতলি শুধু ওই অংশটুকু ধরল দেখে সে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে খানিকটা বিরক্তি এবং চাপা ক্রোধ নিয়ে তাকাল।

“মানে? কি বলতে চাইছ তুমি?”

“এটাই যে বৈবাহিক সম্পর্কে বিশ্বাস না থাকলে কিছুই টেকে না।”

ইরাম বরফের মতন চেয়ে রইল তিতলির দিকে। তিতলি অবশ্য বেশ স্বাভাবিক। সে তাক থেকে বেশকিছু রেডিমেড নাস্তার প্যাকেট নামিয়ে কার্টে রাখতে রাখতে বলল,

“আমি আপনাদের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি, তবুও না বলে পারছিনা। আপনি যেমন ভাবছেন, জিনি তেমন না। হ্যাঁ, একটু রগচটা, চঞ্চল বটে। তবে লয়ালও। ও জানে কীভাবে বাউন্ডারি দিতে হয়। এটাও বুঝতে পারছি আপনার অতীত সম্পর্কের ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসাটা কষ্টকর, তবে অনুরোধ থাকবে অতীতের দোহাই দিয়ে বর্তমানকে একই স্টেরিওটাইপে ফেলবেন না।”

“অতীত? কি জানো তুমি আমার অতীত সম্পর্কে?”

“আপনার এক্স হাসবেন্ড পরকীয়া করত, রাইট? এজন্য জিনিকে বিশ্বাস করতে আপনার কষ্ট হচ্ছে। মেয়ে হিসাবে আপনার কষ্ট আমি বুঝতে পারছি, আপনার প্রতি পূর্ণ সমর্থনও আমার আছে। তবে আপনার জন্য যেন অন্য কেউ বিনা দোষে কষ্ট না পায় সেই বিষয়টা দেখাও আপনার দায়িত্ব।”

ইরাম আর একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারলনা। ধারালো চোখে চেয়ে রইল তিতলির দিকে। একটানা, বিনা বাক্যে। এমন সময়েই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলো নীরব। সে এতক্ষণ যাবৎ দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিল। এখন এসে তিতলির বলা শেষ কথাগুলো শুনে ফেলেছে। দ্রুত এসে উভয় রমণীর মাঝে দাঁড়াল সে। হাত তুলে তিতলির কাঁধে রেখে সরিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“ব্যাক অফ ব্রো। এবার বাড়াবাড়ি করছিস।”

“ওহ! তুইও এখানে? জিনি বডিগার্ডের ডিউটিতে রেখেছে নাকি?”

“শাট আপ তিতলি। একটু বেশি কথা বলিস তুই।”

নীরবের চোখে স্পষ্ট সতর্ক সংকেত দেখা গেল। তাতে হাত তুলে পিছিয়ে গেল তিতলি।

“আমি শুধু সাহায্যই করতে চাইছিলাম।”

নীরব আর পাত্তা দিলনা। ইরামের দিকে ফিরল। তার হাত থেকে বাস্কেট নিয়ে ক্যাশিয়ারের দিকে যেতে যেতে বলল,

“আপনি প্লীজ আসুন ভাবী, দেরী হয়ে যাচ্ছে, আপনাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আমি কাজে যাব।”

ইরাম শেষ এক পলক তিতলির দিকে তাকাল। আর একটাও কথা বললনা। হনহন করে হেঁটে চলে গেল। তার হাঁটার ভঙ্গি এবং দুহাত শক্তভাবে মুঠো পাকানোর দৃশ্যে যে কেউ বুঝতে সক্ষম, ভীষণভাবে রেগে গিয়েছে সে।

⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─

সাইবান ডাইনিং টেবিলে বসেছে। আজকে ভাত খাওয়ার ইচ্ছা নেই তার। সারা সকাল বাইরে ছিল। পিৎজা অর্ডার করেছে সে। সঙ্গে বিশাল বড় কোলা। গ্লাসে কোলা ঢেলে আঙুল মটকে আয়েশ করে যখন পিৎজায় কামড় বসাবে ঠিক তখনি বাড়ির ভেতর ঢুকল ইরাম। সাইবান নিজের জায়গায় জমে গেল। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল কারণ ইরামকে মোটেও স্বাভাবিক দেখাচ্ছে না।

চোখের দৃষ্টি ভীষণ উদ্ভ্রান্ত মেয়েটার। কেমন যেন ধোঁয়াশা চোখের মাঝে। শান্ত, নির্মল মুখটায় গাঢ় আঁধার। চলনে তীক্ষ্ণতা। শাড়ি পড়া সত্ত্বেও বিন্দুমাত্র কোমলতা নেই। হনহন করে হেঁটে আসছে যে, ঘূর্ণিঝড় হয়ে। সাইবানের ভ্রু উঁচু হলো। তবে সে আর কিছুই করার সুযোগ পেলনা। হাতের ম্যাকবুকের ব্যাগটা ইরাম ঠাস করে টেবিলের উপর রাখল। তারপরই এগিয়ে এসে হুট করে সাইবানের শার্টের কলার টেনে ধরল। একটা মেয়ের গায়ে এত শক্তি থাকতে পারে সাইবান আজ ইরামকে না অনুভব করলে কোনোদিন হয়ত টের পেতনা। এক ঝটকায় চেয়ার থেকে টেনে তাকে দাঁড় করিয়ে ফেলল ইরাম। ক্রুব্ধ চোখে চেয়ে গর্জে উঠল,

“আমার অতীত নিয়ে কথা বলার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে?”

সাইবান হতভম্ব হয়ে পড়ল। চোখ মেলে অসহায়ের মতন তাকিয়ে রইল সে অর্ধাঙ্গিনীর দিকে। ইরাম তার কলার ধরে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,

“আমার এক্স হাসবেন্ড পরকীয়া করে, আমার প্রেজেন্ট হাসবেন্ডের সাথে আমার ঝগড়া চলে, এটা বাইরের মানুষ জানবে কেন? কেন জানবে আলাদিন? জবাব দাও! তোমার এত বড় আস্পর্ধা তুমি আমার অগোচরে ঘরের কথা বাইরে পাচার করো! ইউ ইডিয়ট, ইরেসপনসিবল, ইমম্যাচিওর, ইনসাফারেবল বয়!”

“শাট দ্যা ফাক আপ রাইট নাউ, সেলফিশ ওয়ান!”

পাল্টা চিৎকার করে উঠল সাইবানও। দুজনই যেন আজ দুজনার মাথা খূঁইয়ে বসেছে। ইরাম তাও যা গলা নিচে রেখেছিল, সাইবান একটুও নিয়ন্ত্রণে রাখলনা। তার পুরুষালী ধমকের আওয়াজে কিচেন থেকে সুগন্ধা ছুটে এলো। ইযানকে সবে ঘুম পাড়াতে সক্ষম হওয়া সারিকাও দৌঁড়ে এলো। সামিয়া আজ বাড়িতে ছিলেন। তিনি এমনকি সবসময় আড়ালে থাকা আহমদ অব্দি নিজের রুমের নির্বাসন ত্যাগ করে হলরুমে চলে এলেন। ইরাম সবাইকে আশেপাশে দেখে আঙুল তুলে সাইবানকে শাসাল,

“গলা নিচে! একদম নিচে!”

সাইবানের হাত খপ করে ধরে ফেলল সে। উদ্দেশ্য, স্বামীকে টেনে বেডরুমে নিয়ে যাওয়া। সকলের সামনে এসব বলতে ইচ্ছুক নয় সে, না তো ইচ্ছুক পশুর মতন ঝগড়া করতে। কিন্তু সাইবান আজ বোধ খুঁইয়ে বসেছে। এতদিন যাবৎ তার সঙ্গে কথা না বলা, অভিমান করে থাকা, পর্যাপ্ত আগ্রহ এবং যত্নের অভাবে তার মানসিক অবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। ঝটকা দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল সে। পাল্টা হুংকার দিয়ে ইরামকে সে বলল,

“মা লাগেন আমার? হ্যাঁ? মা লাগেন আপনি আমার? আমি আপনার বাচ্চা? যখন ইচ্ছা, যেখানে ইচ্ছা আপনি আমার মাথার উপর ফাটবেন আর আমি চুপচাপ দেখে যাব? তাই ভাবেন আপনি?”

“ওহ! তাহলে তুমি সারা বাড়ির মানুষকে শোনাতে চাও? সেটাই তো তোমার স্বভাব। সমাজে কথা ছড়াতে পারো আর বাড়িতে ছড়াবে না?”

“ছড়িয়েছি? বেশ করেছি! আপনার নামে আরও কিছু ছড়ানো উচিৎ!”

“পাগল হয়ে গিয়েছিস তুই?”

সামিয়া ছুটে যেতে চাইলেন ছেলে বউয়ের মাঝখানে, কিন্তু সারিকা মাকে চেপে ধরল।

“ওদের সমস্যা, ইন্টারফেয়ার করোনা। আজকে ফেটেছে যখন ফাটতে দাও, সত্যি বলুক অন্তত একে অপরকে।”

সামিয়া মেয়ের বাহুর মাঝে হতবাক হয়ে দেখতে লাগলেন কান্ড, অসহায়ের মতন। পাত্তাও দেয়নি ইরাম কিংবা সাইবানের কেউই। উভয়েই একে অপরের ক্রোধে ডুবে আছে।

“তোমার সমস্যাটা কোথায় আলাদিন? আমি তোমার কোন পাঁকা ধানে মই দিয়েছি? আমাকে মানুষের সামনে নীচ প্রমাণ করে তুমি কি পাও? ঠিক যে যে কথাগুলো আমি তোমাকে বলেছি আজকে সেগুলোরই প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে? তুমি বোঝো না? দুধ খাওয়া শিশু তুমি? আমাদের দাম্পত্য জীবনের গোপন কথা তোমার মেয়ে বান্ধবী কেন জানবে? কিসের পরামর্শ দরকার ছিল তোমার? বাসার মা বোনকে যে কথা বলতে পারনি, সেই কথা বলতে গিয়েছ বান্ধবীকে! আর আমি তোমাকে সন্দেহ করলেই দোষ?”

মাথায় র*ক্ত চড়ে গেল সাইবানের। সটান করে ঘুষি হাঁকাল সে। আঁতকে উঠল সবাই। এই বুঝি ইরাম আঘাত পায়। অথচ সাইবানের ঘুষিটা গিয়ে লাগল সিঁড়ির রেলিংয়ে। চামড়া ফে*টে র*ক্ত গড়াতে লাগল। দাঁত কিড়মিড় করল সে। দুপাশের তীক্ষ্ণ সুঁচালো দাঁতজোড়া বেরিয়ে এলো, তার সুদর্শন চেহারা হয়ে উঠল পাশবিক।

“সন্দেহ সন্দেহ সন্দেহ! আম ফাকিং টায়ার্ড অব দিস!”

সাইবানের চোখজোড়াও বুঝি লালচে হয়ে উঠেছে। ঘড়ঘড় শব্দ বেরোচ্ছে তার গলা থেকে। ইরামের সামনে বুঝি কোনো পশুই দাঁড়িয়ে আছে।

“আমি আপনার কাছে চকলেটের মোড়ক, যাকে চেটে ফেলে দেয়া হয় ডাস্টবিনে। অন্যের বেলায় চোখে ঠুলি পরে থাকেন আর আমার বেলায় অনুবীক্ষণের নিচে ফেলে মাপেন। আপনি এত স্বার্থপর কেন, ইরাম আপু?”

ইরাম জবাব দিতে পারলনা। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সাইবান আজ থেমে নেই। সে ভেতরের সবকিছু উগড়ে দিচ্ছে।

“সত্যি কথা কি জানেন? আমি আপনার মতন স্বার্থপর মানুষ জীবনে দুটো দেখিনি। আমার বান্ধবীর কথা বলছেন? তিতলি? আরে ও তো আমার জীবনে এমন সময়ে আমার পাশে ছিল যখন আপনার টিকিটাও খুঁজে পাওয়া যায়নি! আপনি তখন নিজের সংসারে নিজের স্বামীর সাথে আয়েশ করছিলেন! আপনি কি বুঝবেন আমাকে? আমার বন্ধুত্বকে? আমার প্রায়োরিটিকে? আপনার শিক্ষা, দীক্ষা সব ভুয়া! আপনি জানেন শুধু মানুষকে ব্যবহার করতে! আমাকে বিয়ে করে ব্যবহার করে যাচ্ছেন ইচ্ছামত। আমার টাকা, আমার নিরাপত্তা, আমার সবকিছু আপনি আর আপনার ছেলে মিলে লুটে নিচ্ছেন। এরপর সুযোগ বুঝে একটা সময় চলে যাবেন। লজ্জা করেনা আপনার? কোনোদিন সংকোচ হয়না?”

“সাই! দ্যা হেল? এবার অতিরিক্ত বলছিস তুই!”

সারিকা অব্দি আর না বলে থাকতে পারলনা। তবে সাইবান বোনের দিকে ঘুরে তাকালও না। আহমদ মেয়ে, স্ত্রীর পাশে থামে হেলান দিয়ে বিনোদনের সঙ্গে দেখতে দেখতে মন্তব্য করলেন,

“এটা আজ নাহয় কাল হওয়ারই ছিল। তুমিই এই পরিণতি ডেকে এনেছ, দেখছ সামিয়া?”

হাতের মুঠো শক্ত করে ফেললেন সামিয়া। এই মুহূর্তে স্বামীকে আর কিছুই বলতে পারলেন না। তার চোখে অশ্রু টলটল করছে।

সাইবান এবং ইরাম কেউই আর পরিবারের জন্য থেমে নেই। ইরাম অবশ্য নিশ্চুপ, কিন্ত সাইবানের একটা কথাও আর মাটিতে পড়ছেনা। সে ক্লান্ত।

“বারবার অতীতের দোহাই দিয়ে সিমপ্যাথি কামাতে আসবেন না। এই পৃথিবী দয়ালু না। কেউ আপনাকে দয়া করবেনা। আমাদের সবারই কোনো না কোনো অতীত আছে। পার্থক্য শুধু আমরা অতীত নিয়ে পরে থাকিনা। সেখানে আপনি অতীত থেকে বেরই হতে পারছেন না। বিশ্বাস করতে না চাইলে বিয়ে করেছেন কেন? নাচতে নাচতে তো আমি যাইনি আপনার কাছে। অসহায় হয়ে আপনিই এসেছেন! আর যখন আমি আপনার সাথে অ্যাডজাস্ট করে নিতে চাইলাম, তখনি আপনার সব সন্দেহ শুরু হয়ে গেল? হ্যাঁ, যান। আমি বাইরে প্রেম করি! আপনাকে রেখে বাইরে পাঁচটা দশটা প্রেম করি, তিতলি আমার গার্লফ্রেন্ড। আপনাকে ডিভোর্স দিয়ে আমি ওকেই বিয়ে করব! কারণ আপনার মত বউ থাকা আর না থাকা সমান!”

ইরাম তাকিয়েই রইল সাইবানের দিকে। নিষ্পলক। সাইবান এখন রীতিমত কাঁপতে কাঁপতে কথা বলছে, রাগ, দুঃখ, হতাশা সব বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে পড়েছে।

“আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন না। একফোঁটা বিশ্বাস করেন না। সারা দুনিয়া বিবস্ত্র হয়ে আমার সামনে ঘুরে বেড়ালেও আমার পৌরষে আমি একটা আঁচ আসতে দেব না। আমার সেই ক্ষমতা আছে। সেই ধৈর্য্য, সেই অধ্যবসায় আর সেই শিক্ষা আছে। কিন্তু না, আপনি তো বুঝবেন না। পরকীয়া, বিশ্বাস ভাঙা এইসব শব্দই তো চিনে নিয়েছেন আপনি, তাইনা? আপনার আগের স্বামী আর আমি একই মানুষ আপনার কাছে। স্রেফ জানোয়ার! এই জানোয়ারকে শুধু ব্যবহার করে যান, বিশ্বাস, ভরসা করতে হবেনা। অতীত নিয়েই থাকুন আপনি। ট্রমাতেই বসবাস করুন। স্বার্থপর মহিলা!”

সাইবান হাঁপাচ্ছে। তীক্ষ্ণ চোখে চেয়েই সে হঠাৎ করে জমে গেল। ইরামের চোখজোড়া টলটল করছে। অশ্রু জমেছে ঠিকই, কিন্তু উপচে পড়ছেনা অদম্য শক্তির জোরে। সাইবান চোখ পিটপিট করল। বুকের ভেতর দামামা বাজল তার।

শেষ! শেষ! শেষ!

সবকিছু শেষ করে ফেলেছে সে!

“আমি স্বার্থপর। আমি অবিশ্বাসী। আমি সন্দেহ করি। ঠিকই বলেছ আলাদিন। আমি তেমনি।”

ইরামের কন্ঠ খানিক কাঁপল। সাইবানের সামনে বুঝি তার গোটা দুনিয়া গুঁড়িয়ে গেল। হাত তুলল সে, কিন্তু ইরামকে ছুঁয়ে দেয়ার আগেই সেই হাত খপ করে ধরে ফেলল ইরাম। তাকে টানতে টানতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে নিয়ে গেল। বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্য স্তব্ধ হয়ে শুধু তাকিয়ে থাকতে পারল।

একটাও বাক্য খরচ না করে ইরাম সাইবানকে সোজা নিজেদের বেডরুমে নিয়ে এলো। ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দরজাটা বন্ধ করে নিল। সাইবান ভারসাম্য হারিয়ে বিছানায় বসে পড়ল। ফিরে তাকাল। তার মুখোমুখি দাঁড়াল ইরাম। ডাগর ডাগর চোখে তীব্র ক্ষোভ এবং অশ্রু নিয়ে অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখল সে সাইবানকে।

“স্বামী তুমি আমার। তাই আমার শরীর দেখার অধিকার জন্মেছে তোমার।”

“আ…আপু…”

বিড়বিড় করতে পারল শুধু সাইবান। তারপরই অবিশ্বাস্য ঘটনাটা ঘটল। এক টানে বুক থেকে শাড়ির আঁচল সরিয়ে ফেলল ইরাম। জিপার খুলে ঢিলে করে ফেলল ব্লাউজ। সাইবান ঝট করে দৃষ্টি সরিয়ে চোখ বুঁজে ফেলল।

“দ্যা হেল ইউ আর ডুয়িং?”

“আমার দিকে তাকাও, আলাদিন!”

ইরামের আদেশে চোখ খুলতে বাধ্য হলো সাইবান। অত্যন্ত সংকোচ নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। সেখানেই তার পৃথিবী থমকে গেল।

ইরামের কোমরে একটা হালকা ক্ষতের দাগ। কাপড় সরিয়ে ফেলায় তার উন্মুক্ত উদরজুড়ে লম্বা একটা তীক্ষ্ণ দাগ দেখা গেল। যেন অনেক সময় নিয়ে যত্ন করে মাংস কা*টা হয়েছে! বুকের দিকটায় ঢেউ খেলানো এলোপাথাড়ি পো*ড়ার দাগ! আরও অনেক কিছুই আছে। কিন্তু সাইবান দেখার সাহস পেলনা। তার হৃদস্পন্দন থমকে গিয়েছে। ইরামের অশ্রু অবশেষে গড়িয়ে পড়ল। নিজের বুকে হাত চেপে সে বলল,

“যে পুরুষ নিজের মুখে ভালোবাসার কথা বলতে বলতে শরীরে এই দাগ দিতে পারে, সেই পুরুষ জাতিকে এত সহজে বিশ্বাস করি কি করে, বলতে পারো আমার আলাদিন?”

—চলবে—

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply