Golpo romantic golpo অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা

অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৯৬


#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা

[পর্ব ৯৬]

#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম

(🚫 দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয় এবং প্রাপ্তমনস্কদের জন্য উন্মুক্ত)

(🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

[দ্বিতীয় খন্ড]

(📌 নোট: আজকের পর্বে অনেককিছু ক্লিয়ার হবে।সবাই মন দিয়ে পড়বেন। সাব্বির, নীলাদ্রি আফরিদের আপন ভাই কি-না, এবং মিস্টার আলবার্ট, মিখাইল ওদের রহস্য উন্মোচন করা হবে! বড়টা অনেক বড়,মেইন ফেসবুক থেকে পড়বেন!)

মিস্টার আলবার্ট এবং মুস্তাক এহসানের সখ্যতা কেবল পরিচয়ের সীমারেখায় আবদ্ধ ছিল না; বরং তা বহু বর্ষের আস্থাভাজন বন্ধুত্বের এক সুদৃঢ় মহীরুহে পরিণত হয়েছিল। ব্যবসায়িক মেলামেশা থেকে শুরু হওয়া সম্পর্ক একসময় পারিবারিক অন্তরঙ্গতায় এমনভাবে জড়িয়ে পড়ে যে, দুই পরিবারের সদস্যরা একে অপরের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে রূপান্তরিত হয়।

বিশেষত আফরিদের প্রতি আলবার্ট পরিবারের স্নেহ ছিল ঈর্ষণীয় রকমের কোমল। আর সেই স্নেহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মিসেস ইসাবেলা আলবার্ট। আফরিদ ছোটবেলা থেকেই তাকে এক অপার্থিব মমতার আধার বলে মনে করত। তার সান্নিধ্যে এলে শিশুমনের গভীরে ঠিক সেই প্রশান্ত আবেশ জন্ম নিত, যেটা সে অনুভব করত নিজের মা মাইমুনা এহসানের কাছে।

মাইমুনা এহসান যেমন নিবিড় সোহাগে সন্তানকে আগলে রাখতেন, ইসাবেলাও ঠিক তেমন করেই আফরিদকে পরম স্নেহচ্ছায়ায় আবৃত রাখতেন। কয়েক মাস পূর্বে মুস্তাক এহসান এবং মাইমুনা এহসান হঠাৎ এক জরুরি প্রয়োজনে বার্সেলোনার বাইরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে ঠিক সেই সময়টাতেই আফরিদের বার্ষিক পরীক্ষা চলছিল। ছেলেকে সঙ্গে নেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

তখন যেন এক অদৃশ্য মাতৃত্ববোধ নিয়ে ইসাবেলা আলবার্ট এগিয়ে এসেছিলেন। আফরিদের পড়াশোনা, খাওয়াদাওয়া, বিশ্রাম প্রতিটি বিষয়ে তিনি এমন নিখুঁত যত্ন নিয়েছিলেন যে, ছেলেটি এক মুহূর্তের জন্যও বাবা-মায়ের অনুপস্থিতি উপলব্ধি করেনি।

আজ বহুদিন পর পুনরায় প্রিয় মানুষটিকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে দশ বছরের আফরিদ আনন্দোচ্ছ্বাসে দীপ্ত হয়ে উঠল। ছোট ছোট পদক্ষেপে দৌড়ে গিয়ে সে জড়িয়ে ধরল ইসাবেলাকে।

“কেমন আছো আন্টি তুমি?”

স্প্যানিশ ভাষায় সাবলীল উচ্চারণে প্রশ্নটি করল সে। আফরিদের মধ্যে ভাষাগত প্রখরতা ছিল বিস্ময়কর। বাবা-মায়ের সুশৃঙ্খল শিক্ষাদীক্ষার ফলে বাংলা ও স্প্যানিশ উভয় ভাষাতেই সে সমান পারদর্শী হয়ে উঠেছে।

ইসাবেলা আলবার্ট শিশুটিকে বক্ষের সঙ্গে আলতোভাবে চেপে ধরে স্নিগ্ধ কণ্ঠে বললেন,

“হ্যাপি বার্থডে, চ্যাম্প! জন্মদিনের অফুরন্ত শুভেচ্ছা রইল তোমার জন্য।”

অতঃপর তিনি স্নেহভরে আফরিদের কপালে চুম্বন আঁকলেন। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় আফরিদও ইসাবেলার রক্তিম গালে চুমু এঁকে দিল। শিশুটি বুঝতেই পারল না কেন ইসাবেলার গালদুটি এত অস্বাভাবিক রকমের লালাভ হয়ে উঠেছে! যেন গোলাপের পাপড়িতে রক্তিম আভা মিশে আছে। ছুঁতেও ভীষণ কোমল।

মুচকি হেসে আফরিদ বলল,

“থ্যাংক ইউ, আন্টি!”

ইসাবেলা এবার একটি সুদৃশ্য মোড়কে আবৃত উপহার বাক্স এগিয়ে দিলেন তার দিকে।

“বার্থডে বয়ের জন্য স্পেশাল গিফট।”

উচ্ছ্বাসে দীপ্ত হয়ে উঠল আফরিদের চোখজোড়া। শিশুসুলভ আগ্রহ নিয়ে সে উপহারটি গ্রহণ করল। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ালেন মিস্টার আলবার্ট।

গম্ভীর অথচ রসিক ভঙ্গিতে তিনি বললেন,

“হ্যাপি বার্থডে, লিটল সায়েন্টিস্ট সাহেব!”

কথাটি শুনে আফরিদের কপালে মুহূর্তেই ক্ষীণ অভিমানের রেখা ফুটে উঠল।

“নো ওয়ে, আঙ্কেল! আমি মোটেও সায়েন্টিস্ট হবো না। আমি হবো লয়ার! বার্সেলোনার সবচেয়ে বড় লয়ার!”

তার দৃঢ় প্রত্যুত্তরে হাসিতে ফেটে পড়লেন মাইমুনা এহসান এবং মুস্তাক এহসান।

মিস্টার আলবার্ট ভান করা বিস্ময় নিয়ে বললেন,

“বাট হোয়াই, আফরিদ? তোমার পাপা এত বড় বিজ্ঞানী, আর তুমি কি-না উকিল হতে চাও?”

আফরিদ এবার গর্বিত দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

“না না! আমি অ্যাডভোকেট হবো। উকিলদের পোশাক আমার ভীষণ পছন্দ। আদালতে দাঁড়িয়ে যুক্তি দিয়ে কথা বলতেও আমার অসম্ভব ভালো লাগে।”

তার কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা ছিল, যা উপস্থিত সকলকেই খানিক বিস্মিত করে তুলল।

ঠিক সেই মুহূর্তেই আরেক অতিথির আগমন ঘটল।

পরণে হালকা নীলাভ আভাযুক্ত ওয়েস্টার্ন পোশাক যেটি মূলত মাইমুনা এহসানের দেওয়া উপহার। ঢেউ খেলানো কার্ল করা চুলগুলো কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে। ঠোঁটে অতিরিক্ত গাঢ় লিপস্টিকের প্রলেপ তাকে খানিক অদ্ভুত দেখালেও, অধরে ঝুলে থাকা প্রাণোচ্ছ্বল হাসিটি মুহূর্তেই সমস্ত অস্বস্তি মুছে দিচ্ছিল।

তিনি মেহমুনা আহমেদ।

মাইমুনা এহসানের একমাত্র জমজ বোন।

দুজন যেন একই আত্মার দুটি প্রতিবিম্ব। শৈশব থেকে যৌবন বাংলাদেশের মাটিতেই একসাথে বেড়ে ওঠা। পরস্পরের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, স্বপ্ন-ভাঙনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী।

মাইমুনার বিয়ের পর যখন তিনি মুস্তাক এহসানের সঙ্গে স্পেনে পাড়ি জমান, তখনও বোনদের হৃদ্যতা এতটুকু ক্ষীণ হয়নি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে কিছুদিনের মধ্যেই তাদের বাবা-মা এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন।

ততদিনে মেহমুনার বিয়ে হয়ে গেছে বাংলাদেশের অত্যন্ত সাধারণ এক যুবক অভ্র আহমেদের সঙ্গে।

অভ্রকে ভীষণ পছন্দ করতেন মাইমুনা ও মেহমুনার বাবা। ছেলেটির সততা, আত্মসম্মানবোধ এবং পরিশ্রমী মনোভাব তাকে মুগ্ধ করেছিল। তাই বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করেই তিনি ছোট মেয়েকে অভ্রর হাতে তুলে দেন।

কিন্তু বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি ক্রমশ প্রতিকূল হয়ে উঠতে থাকে। আর্থিক সংকট তাদের জীবনকে চেপে ধরলে মাইমুনা এহসান ও মুস্তাক এহসান আর নির্লিপ্ত থাকতে পারেননি।

তারা সস্নেহে মেহমুনা এবং অভ্রকে স্পেনে নিয়ে আসেন।

সেখানেই নতুন করে জীবন শুরু হয় তাদের। স্পেনের মাটিতেই জন্ম নেয় মেহমুনার দুই পুত্র নীলাদ্রি এবং সাব্বির। মুস্তাক এহসান নিজের প্রভাব খাটিয়ে অভ্রর জন্য একটি সম্মানজনক চাকরির ব্যবস্থাও করে দেন।

অভ্র আহমেদ ছিলেন বিরল ব্যক্তিত্বের একজন পুরুষ নিরহংকারী, কর্মনিষ্ঠ এবং আত্মমর্যাদাবোধে বলীয়ান। জীবনের প্রতিটি প্রতিকূলতার সামনে তিনি অবিচল ধৈর্যে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। আর সেই কারণেই হয়তো মেহমুনার চোখে আজও অভ্র কেবল একজন স্বামী নন; বরং নির্ভরতার এক অনমনীয় আশ্রয়।

“খালামনি!”

ছোট্ট আফরিদ উচ্ছাসে গিয়ে মেহমুনা আহমেদকে আলিঙ্গন করল! বোনের ছেলেকে একটু বেশি ভালোবাসেন মেহমুনা আহমেদ! আফরিদকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে বললেন,

“হ্যাপি বার্থডে বাবা!”

“থ্যাংক ইয়্যু।”

নীলাদ্রি, সাব্বির একে একে আফরিদের সাথে কুশল বিনিময় করল!

নিজের ভাইদের বারো বছরের আফরিদ কাছে টেনে নিলো!

তৎক্ষণাৎ মাইমুনা এহসান এসে বোনকে জড়িয়ে ধরে,

“এত দেরি করলি কেন হুঁ? কখন থেকে অপেক্ষা করছিলাম!”

মাইমুনা এহসানের কথায় মেহমুনা আহমেদ ভ্রুক্ষেপ নেই। সে তো মাইমুনা এহসানের পরণে ড্রেসটা দেখতেই ব্যস্ত, অতঃপর বলেই ফেলল,

“তোমার ড্রেসটা কি সুন্দর আপু!”

বোনের চোখে মুখে এমন উচ্ছ্বাস দেখে হাসলেন মাইমুনা এহসান।

“তোর পছন্দ হয়েছে?”

মেহমুনা আহমেদ তৎক্ষণাৎ মাথা দোলায়। মাইমুনা এহসান বললেন,

“ঠিক আছে তাহলে পার্টি শেষ হোক, তারপর তুই আমি একদিন আফরিদকে নিয়ে শপিংয়ে গিয়ে এমন ড্রেস নিয়ে আসবে।”

স্ত্রীর এমন চেয়ে বসাকে ভীষণ বিশ্রী ভাবে দেখলেন অভ্র; সূক্ষ্ম নিঃশ্বাস ছাড়ল আড়ালে!

**************

সময় ধীরলয়ে অতিক্রান্ত হতে লাগল।

রাতের আবরণে আলোকমালায় সজ্জিত এহসান ভিলার বাগানপ্রাঙ্গণ যেন রূপ নিয়েছিল এক অভিজাত উৎসবমঞ্চে! চারদিকে ঝুলন্ত স্বর্ণাভ ফেয়ারি লাইট, সুগন্ধি গোলাপ আর লিলির মাদকতা, নরম সুরে বাজতে থাকা পিয়ানোর মেলোডি সব মিলিয়ে পরিবেশটা ছিল পরিপূর্ণ উষ্ণতা আর পারিবারিক আনন্দে মোড়ানো।

মাঝখানে স্থাপিত বিশাল তিনতলা কেকের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে ছোট্ট আফরিদ।

আজ তার পরণে কালো রঙের ক্ষুদ্রাকৃতির উকিলের পোশাক! গলায় সাদা ব্যান্ড, চোখেমুখে দুষ্টু মিষ্টি উচ্ছ্বাস। এই পোশাকটি তাকে উপহার দিয়েছেন স্বয়ং মুস্তাক এহসান। কারণ আফরিদ প্রায়ই গর্বভরে বলে,

“আই উইল বি জাস্ট লাইক মাই পাপা!”

কেক কাটার মুহূর্তে চারদিক করতালিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠল।

“হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।”

সমবেত কণ্ঠের উল্লাসের মধ্যেই আফরিদ হাসিমুখে কেকের প্রথম টুকরোটা তুলে ধরল নিজের বাবার দিকে।

“পাপা, ফার্স্ট বাইট ইজ ফর ইউ!”

মুহূর্তেই মুস্তাক এহসানের কঠিন মুখাবয়বে নেমে এলো অপার্থিব কোমলতা। তিনি হাঁটু গেড়ে বসতেই আফরিদ আদুরে ভঙ্গিতে কেক তুলে দিল তার মুখে। পরক্ষণেই শিশুটি দু’হাত বাড়িয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে।

সেই দৃশ্য দেখে অতিথিদের অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ল।

মাইমুনা এহসান দূর থেকে প্রশান্ত হাসিতে তাকিয়ে ছিলেন বাবা-ছেলের দিকে। মেহমুনা আহমেদ মৃদু হেসে বললেন,

“আমাদের আফরিদ তো পাপা বলতে পুরো পাগল!”

অভ্র আদুরে ভঙ্গিতে ছেলেটার গাল টেনে দিল।

“লুক এট হিম! একদম কপি অব মুস্তাক ভাই!”

হাসি-আনন্দ-উচ্ছ্বাসে পুরো পার্টি তখন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। অতিথিরা ধীরে ধীরে ডিনার টেবিলের দিকে এগোচ্ছে।

ঠিক সেই মুহূর্তেই কর্কশ শব্দে বেজে উঠল মুস্তাক এহসানের ফোন!

তিনি প্রথমে গুরুত্ব দিলেন না। মাইমুনা দু’বার ডেকেও ফেলেছেন তাকে খাবারের জন্য।

“মুস্তাক! সবাই বসে গেছে!”

কিন্তু স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখামাত্রই যেন তার মুখাবয়বের প্রশান্তি নিমিষেই বিলীন হয়ে গেল। মারুফুল হক।

ভ্রু কুঁচকে গেল তার। অদ্ভুত এক আশঙ্কা হঠাৎ মনের ভেতর তীব্রভাবে আঘাত করল।

খাবারের টেবিলের দিকে যেতে গিয়েও থেমে গেলেন তিনি। কিছু একটা ভেবে ধীরপায়ে সরে গেলেন বাগানের এক নির্জন কোণে।

ফোন রিসিভ করতেই গম্ভীর স্বরে বললেন,

“হ্যালো?”

ওপাশে কি বলা হচ্ছিল তা আশেপাশের কেউ শুনতে পেল না। তবে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মুস্তাক এহসানের চোখ-মুখ ভয়ংকর রূপ ধারণ করল।

“হোয়্যাট দ্য হেল?! কি সব বলছো তুমি মারুফুল?”

তার কণ্ঠের বজ্রকঠোর গর্জনে আশেপাশের দু-একজন অতিথিও চমকে তাকাল।

ওপাশ থেকে একের পর এক তথ্য দিয়ে চলেছে মারুফুল।

মুস্তাক এহসানের শিরা ফুলে উঠল। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

“ওকে ফাইন! ইউ সেন্ড মি দ্য পিকচার্স রাইট নাও!”

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফোনে ভেসে উঠল কিছু ছবি। ছবিগুলোর দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তিনি।

তার নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। চোখের মণিতে জমাট বাঁধছে তীব্র ক্রোধ!

সেই ছবিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ল্যাবের গোপন গবেষণাগারের ভেতর দাঁড়িয়ে রয়েছে মিস্টার আলবার্ট। আর তার হাতে মুস্তাকের বহু বছরের গোপন ফর্মুলার নথি!

আরও কয়েকটি ছবিতে কেউ একজন অজ্ঞাত ব্যক্তির কাছে তথ্য হস্তান্তর করছে সে।

মুহূর্তেই যেন মাথার ভেতর বিস্ফোরণ ঘটল মুস্তাক এহসানের।

“আলবার্ট!”

দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে উঠলেন তিনি।

কস্মিনকালেও তিনি কল্পনা করেননি যাকে এতদিন ভাইয়ের মতো বিশ্বাস করেছেন, সেই মানুষটাই তার সঙ্গে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করবে!

ধীরে ধীরে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ঘুরে গেল ডিনার টেবিলের দিকে।

সেখানে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে রয়েছে মিস্টার আলবার্ট। মুখে প্রশস্ত হাসি। অতিথিদের সঙ্গে গল্প করতে করতে নির্বিকারভাবে খাবার খেয়ে চলেছে!

সেই হাসিটাই যেন মুহূর্তে মুস্তাকের রক্ত ফুটিয়ে তুলল।

আর এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না তিনি।

প্রচণ্ড ক্ষোভে হনহনিয়ে এগিয়ে গেলেন টেবিলের দিকে।

ঠিক তখনই ছোট্ট আফরিদ নিষ্পাপ কণ্ঠে বলে উঠল,

“মম , পাপা খাবেনা?”

মাইমুনা নরম হেসে বললেন,

“খাবে বেটা। তোমার পাপার জরুরি ফোন এসেছিল।”

কিন্তু কেউ বুঝতেই পারেনি পরবর্তী কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো পরিবেশ আমূল বদলে যেতে চলেছে!

মুহূর্তের মধ্যে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন মুস্তাক এহসান।

তার চোখ রক্তবর্ণ। মুখমণ্ডল ক্রোধে বিকৃত।

হঠাৎই সজোরে মিস্টার আলবার্টের বাহু চেপে ধরলেন তিনি!

“হাউ ডেয়ার ইউ, আলবার্ট?”

চারপাশ মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল।

“তোমার সাহস হলো কি করে এসব করার?! হাউ ডেয়ার ইউ?”

অতিথিরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই।

মিস্টার আলবার্ট সম্পূর্ণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন।

“মুস্তাক, হোয়াট হ্যাপেন্ড? তুমি এমন আচরণ করছো কেন?”

কিন্তু তার কথা যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল।

মুস্তাক এহসান তাকে টেনে নিয়ে গেলেন কিছুটা দূরে। পরক্ষণেই ফোনের স্ক্রিন তার চোখের সামনে ছুঁড়ে ধরলেন।

“দেখো এগুলো! এই হলো তোমার আসল চেহারা?”

আলবার্টের মুখের রঙ মুহূর্তেই বিবর্ণ হয়ে গেল।

তার চোখে ফুটে উঠল ধরা পড়ে যাওয়ার আতঙ্ক।

“লিসেন টু মি, মুস্তাক! আই ক্যান এক্সপ্লেইন!”

“শাট আপ!”

ভয়ংকর গর্জনে থামিয়ে দিলেন মুস্তাক।

পরক্ষণেই সজোরে ধাক্কা দিলেন আলবার্টের বাহুতে।

“ইউ ফ্রড! ইউ ব্লাডি ট্রেইটর! আমি তোমাকে বিশ্বাস করতাম!”

তার কণ্ঠ ক্রোধে কাঁপছে।

“টেরোরিস্ট! গেট আউট ফ্রম মাই হাউস! রাইট নাও!”

চারদিকে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ল।

ছোট্ট আফরিদ ভয়ে আঁকড়ে ধরল মাইমুনা এহসানকে।

“মম, পাপা ইজ স্কেয়ারি!”

মাইমুনার মুখও ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তিনি কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না।

অন্যদিকে ইসাবেলা যেন পুরোপুরি হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছে।

“আলবার্ট,হোয়াটস গোয়িং অন?”

কিন্তু মিস্টার আলবার্ট কোনো উত্তর দিলেন না।

তিনি বুঝে গেছেন সবকিছু ফাঁস হয়ে গেছে!

চোয়াল শক্ত করে দ্রুত ইসাবেলার হাত ধরে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি।

তাদের প্রস্থান করার পরও পুরো বাগানজুড়ে নেমে রইল ভয়ংকর নিস্তব্ধতা।

মুস্তাক এহসানের বুক ওঠানামা করছে ক্রোধে।

মাইমুনা হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তার দিকে।

কিন্তু নিজের ভেতরের জ্বলন্ত রাগ আর অপমান সংবরণ করতে পারলেন না মুস্তাক।

গটগট পায়ে বাগান ছেড়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলেন তিনি। আর ঠিক তার কয়েক মিনিট পরেই আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করা হলো আফরিদের জন্মদিনের পার্টি।

*****************

“নো, মিস্টার আলবার্ট নো!”

ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা মিখাইলের কণ্ঠস্বর ছিল অস্বাভাবিক রকম শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত স্বরের আড়ালে লুকিয়ে ছিল ভয়ংকর এক হিংস্রতা! যেন ধীরে ধীরে শিকারকে ঘিরে ধরছে কোনো বিষধর সরীসৃপ।

“মুস্তাক এহসান এতটা সহজে সেই ফাইল তোমার হাতে তুলে দেবে না। আর না তোমাকে এত সহজে ছেড়ে দেবে! এখন কিন্তু সে জেনে গেছে তুমি তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছো!”

মাদ্রিদের অভিজাত হোটেলের সর্বোচ্চ তলার প্রাইভেট স্যুটে দাঁড়িয়ে ছিল মিখাইল। দেয়ালজুড়ে কাঁচের জানালার ওপাশে ঝলমল করছে রাতের স্পেন। অন্ধকার আকাশের নিচে শহরের আলো যেন অগণিত জোনাকির মতো জ্বলছে।

কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মাঝেও মিখাইলের মুখে ছিল কেবল শীতল নির্মমতা।

অন্যদিকে ফোনের ওপাশে বসে থাকা মিস্টার আলবার্টের ঠোঁটে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক বিকৃত হাসি।

লোভ! এই একটি শব্দই যেন পুরো মানুষটার অস্তিত্ব নিয়ন্ত্রণ করে।

অর্থ, প্রতিপত্তি, বিলাসিতা এসবের জন্য সে যেকোনো সীমা অতিক্রম করতে পারে! প্রয়োজনে নিজের আপনজনের জীবনও বিক্রি করে দিতে তার দ্বিধা নেই।

তার কাছে সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই। বিশ্বাস? ভালোবাসা? নৈতিকতা?

সবকিছুই তার কাছে অর্থের নিচে তুচ্ছ!

সে শুধু টাকা চায়। প্রচুর টাকা! এত টাকা, যার সামনে মানবতা পর্যন্ত মাথা নত করবে!

আলবার্ট সিগারের ধোঁয়া ছেড়ে নিচু স্বরে হেসে উঠল।

“নো ওয়ে! মুস্তাক নিজের মৃত্যু নিজেই ডেকে আনছে।”

তার কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাস আর পৈশাচিক লোভের মিশ্রণ।

“তুমি শুধু আমার পাওনা রেডি রেখো, মিখাইল! আই ডোন্ট কেয়ার অ্যাবাউট দ্য রেস্ট!”

ফোন কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চারদিকে নেমে এলো কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর

মিখাইলের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক ভয়ংকর বাঁকা হাসি।

যে হাসি কোনো মানুষের নয় বরং কোনো শিকারির!

ঠিক তখনই তার ডানহাত ভিক্টর ধীরপায়ে এগিয়ে এলো।

কালো গ্লাভস পরিহিত হাতে ধরে আছে ক্রিস্টালের শ্যাম্পেন গ্লাস। নতমস্তকে সেটি বাড়িয়ে দিল মিখাইলের দিকে।

মিখাইল নির্বিকার ভঙ্গিতে গ্লাসটি হাতে নিল।

স্বচ্ছ সোনালি তরলে শহরের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। সে ধীরে এক চুমুক দিল।

অতঃপর নিচু, কর্কশ কণ্ঠে বলল,

“টাকার কাছে প্রতিটি মানুষ একসময় বিক্রি হতে বাধ্য, ভিক্টর।”

তার ধূসর চোখজোড়া ধীরে ধীরে অন্ধকার শহরের দিকে স্থির হলো।

“আর যে বিক্রি হয় না,,,

সে থামল। ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও গভীর হলো।

“তাকে নৈঃশব্দ্যে এই পৃথিবী থেকে মুছে দেয় রাশিয়ার আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদার!”

শেষ বাক্যটির সঙ্গে সঙ্গে পুরো কক্ষ যেন আরও শীতল হয়ে উঠল। ভিক্টরও মৃদু হেসে মাথা নত করল।

দ্যাটস হোয়াই দে ফিয়ার ইউ, বস!

মিখাইল কোনো উত্তর দিল না।

শুধু ধীর পায়ে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

তার চোখে তখন এক অদ্ভুত অন্ধকার ঝিলিক।

কারণ খেলাটা এখনই শুরু হয়েছে!

****************

“হোয়্যাট হ্যাপেন্ড, পাপা?”

রজনীর গভীরতা তখন ধীরে ধীরে সমগ্র এহসান ভিলাকে গ্রাস করছে। নিস্তব্ধ প্রাসাদোপম ভবনের একমাত্র আলোকিত কক্ষ আফরিদের শয়নকক্ষ। মৃদু স্বর্ণাভ আলোর আবরণে ঘরটিকে অলৌকিক লাগছিল।

কিন্তু সেই কোমল আবহের মাঝেও মুস্তাক এহসানের অন্তর্জগৎ যেন তীব্র অস্থিরতায় বিপর্যস্ত।

শয্যার প্রান্তদেশে অনড় হয়ে বসে ছিলেন তিনি। চোয়াল শক্ত। কপালের শিরা স্ফীত। দৃষ্টিতে জমাটবাঁধা উদ্বেগের ছায়া।

আজকের ঘটনাপ্রবাহ তার মানসিক স্থিতি সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।

বিশ্বাসঘাতকতা! এক ভয়ংকর শব্দ। যে শব্দ মানুষকে মুহূর্তেই ভেতর থেকে শূন্য করে দেয়।

মিস্টার আলবার্ট যাকে তিনি বছরের পর বছর সহকর্মী নয়, প্রায় আত্মীয়সম মনে করেছেন সেই মানুষটিই গোপনে তার গবেষণালব্ধ তথ্য পাচার করেছে!

আর এই ষড়যন্ত্রের অন্তরালে রয়েছে রুশ আন্ডারওয়ার্ল্ডের অদৃশ্য সম্রাট, মিখাইল!

এই নামটি উচ্চারণ করলেই আন্তর্জাতিক গোপন সংস্থাগুলো পর্যন্ত সতর্ক হয়ে ওঠে।

আফরিদের কোমল কণ্ঠস্বর তাকে চিন্তার অতল গহ্বর থেকে টেনে তুলল।

“তোমাকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন, পাপা?”

মুহূর্তেই মুস্তাকের অন্তর্দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়ে উঠল।

এই নিষ্পাপ শিশুটির সামনে তিনি কিছুতেই নিজের আতঙ্ক প্রকাশ করতে পারবেন না। কখনোই না!

তিনি কষ্টসাধ্য এক হাসি ফুটিয়ে বললেন,

“নাথিং, আফরিদ। কিছু হয়নি। ইউ শুড স্লিপ।”

কিন্তু শিশুর অনুভূতি প্রখর হয়।

আফরিদ ধীরে ধীরে বাবার বক্ষদেশে আশ্রয় নিল। ছোট্ট আঙুল দিয়ে মুস্তাকের শার্ট খামচে ধরল।

তার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক উপলব্ধি করতে পারছে আজ কোনো এক গভীর অন্ধকার তাদের পরিবারকে ঘিরে ধরেছে।

এবং সেই অন্ধকারের সঙ্গে জড়িত মিস্টার আলবার্ট।

তার ভেতরে ক্ষুদ্র অথচ প্রবল ক্ষোভ জন্ম নিল।

“আই ডোন্ট লাইক আলবার্ট আঙ্কেল! সে তোমাকে হার্ট করেছে পাপা।”

বাক্যটি ফিসফিস করে উচ্চারণ করতেই মুস্তাকের অন্তর বিদীর্ণ হয়ে উঠল।

তিনি সন্তানের কেশে স্নেহস্পর্শ বুলিয়ে দিলেন।

“স্লিপ, চ্যাম্প।”

ধীরে ধীরে নিদ্রার কোলে ঢলে পড়ল আফরিদ।

মুস্তাক কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন স্ত্রী ও সন্তানের দিকে।

মাইমুনা এহসান নিদ্রিত অবস্থায়ও ছেলেকে বুকে আগলে রেখেছেন। এই মানুষ দু’জনই তার সমগ্র পৃথিবী।

আর সেই পৃথিবীর দিকে কেউ হিংস্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে তিনি তাকে ধ্বংস করতে দ্বিধাবোধ করবেন না!

মুহূর্তেই তার মুখাবয়বের কোমলতা বিলুপ্ত হলো। স্থলাভিষিক্ত হলো কঠোর, শীতল সংকল্প।

অতঃপর ধীর অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে তিনি কক্ষ ত্যাগ করলেন।

*************

দীর্ঘ করিডোরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল তার পদধ্বনি।

স্টাডি রুমে প্রবেশ করেই তিনি সজোরে দরজা বন্ধ করলেন।

ঘরজুড়ে সুবিশাল বুকশেলফ, গবেষণালব্ধ নথিপত্র, গোপন ফাইল এবং জ্বলজ্বলে ডিজিটাল স্ক্রিন। পরিবেশটিই যেন ষড়যন্ত্র আর রহস্যে আচ্ছন্ন।

মুস্তাক ধীরগতিতে ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়ালেন।

তার দৃষ্টি তখন ভয়ংকর স্থির।

পকেট থেকে ফোন বের করে কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অতঃপর একটি নম্বরে কল করলেন।

এই ব্যক্তিটিই এখন তার একমাত্র গোপন অস্ত্র। যার মাধ্যমে প্রকাশ্যে উন্মোচিত হবে আলবার্টের মুখোশ।

কল রিসিভ হতেই মুস্তাক কর্কশ নিম্নস্বরে বললেন,

“It’s time to expose the traitor.”

************

মধ্যরাত্রি। স্পেনের উপকণ্ঠে অবস্থিত এক পরিত্যক্ত শিল্পকারখানা।

চারদিকে ঘন কুয়াশার আবরণ। ভাঙাচোরা কংক্রিটের দেয়ালগুলো অদ্ভুত ভৌতিক আবহ সৃষ্টি করেছে। দূরে সমুদ্রের ঢেউয়ের মৃদু গর্জন যেন রাতের নিস্তব্ধতাকে আরও বিভীষিকাময় করে তুলেছে।

সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানে উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে মিস্টার আলবার্ট।

তার কপাল ঘামে সিক্ত। দৃষ্টিতে উৎকণ্ঠা।

কিছুক্ষণ পূর্বেই এক নিরাপত্তারক্ষী এসে জানিয়েছে কেউ একজন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছে।

এই নিশীথরাতে? কে হতে পারে?

তার মস্তিষ্ক শঙ্কা ও সন্দেহে আচ্ছন্ন হয়ে উঠল।

ঠিক তখনই টক, টক, টক,

ধীর অথচ ভারী জুতোর শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো দীর্ঘ করিডোরজুড়ে।

আলবার্ট সতর্ক দৃষ্টিতে তাকাল।

অন্ধকার ভেদ করে সামনে এগিয়ে এলো দু’টি অবয়ব। একজন সিকিউরিটি গার্ড।

আর তার পিছনে কৃষ্ণবর্ণ দীর্ঘ কোটে আবৃত এক রহস্যময় ব্যক্তি।

মুখের অধিকাংশ ছায়ায় আচ্ছন্ন। শুধু তীক্ষ্ণ দৃষ্টি জ্বলজ্বল করছে অন্ধকারে।

তাকে দেখামাত্রই আলবার্টের মুখাবয়ব বিবর্ণ হয়ে গেল। চক্ষু্দ্বয় ক্রোধা’গ্নিতে জ্বলে ওঠে।

বিস্ময়ে তার ওষ্ঠ ফাঁক হয়ে বেরিয়ে এলো,

“তুমি?”

আগন্তুকের ঠোঁটে ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হলো এক রহস্যঘন হাসি।

“হ্যাঁ আমি।”

তার কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক শান্ত। কিন্তু সেই শান্তির অন্তরালে ছিল অদ্ভুত বিপজ্জনক ইঙ্গিত।

“আপনার সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আছে, মিস্টার আলবার্ট।”

আলবার্ট কয়েক মুহূর্ত নির্বাক রইল।

স্পষ্টতই সে এই সাক্ষাৎ প্রত্যাশা করেনি।

“কি চাও?”

আগন্তুক ধীর পায়ে আরও সন্নিকটে এগিয়ে এলো।

“ওয়েল, যেহেতু সরাসরি জানতে চাইলেন, আমিও সরাসরি বলছি।”

তার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যপূর্ণ হাসি।

“আপনার তো সেই ফর্মুলার ফাইলটি প্রয়োজন রাইট?”

মুহূর্তেই আলবার্টের চোখে লোভের ঝলকানি দেখা দিল। আগন্তুক পুনরায় বলল,

“কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ওটা এখনো মুস্তাক এহসানের হেফাজতেই রয়েছে।”

চারপাশের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।

আলবার্টের ক্ষুরধার মস্তিষ্ক তৎক্ষণাৎ সজাগ হলো।

সে আঙুল নাড়িয়ে নিম্নস্বরে বলল,

“ফাইলটা আমি এনে দিতে পারি বাট একটা শর্ত আছে।”

আগন্তুকের ভ্রু সামান্য উঁচু হলো।

“শর্ত?”

আলবার্ট এবার সম্পূর্ণ সোজা হয়ে দাঁড়াল।

“তুমি আমাকে সাহায্য করবে কেন? হোয়াটস ইয়োর ইন্টেনশন?”

আগন্তুক মৃদু হাসল।

“ইমপ্রেসিভ। আপনি সত্যিই অসাধারণ বুদ্ধিমান, মিস্টার আলবার্ট।”

তার কণ্ঠে সূক্ষ্ম ব্যঙ্গের সুর।

“হ্যাঁ, আমারও একটি উদ্দেশ্য রয়েছে।”

আলবার্টের দৃষ্টি সন্দেহে আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।

“কি চাও?”

আগন্তুক এক মুহূর্ত নীরব থেকে উত্তর দিল,

“অংশ।”

আলবার্ট হকচকিয়ে গেল।

“কিসের অংশ?”

আগন্তুক ধীরে মুখ তুলল। তার দৃষ্টিতে তখন লোভ, ষড়যন্ত্র এবং ক্ষমতালিপ্সার ভয়ংকর সমন্বয়।

“মিখাইল যে বিলিয়ন ডলারের ডিল করতে চলেছে চলেছে সেই অংশ।”

*******************

প্রভাতের কোমল সূর্যালোক ধীরে ধীরে আচ্ছাদিত করছিল বার্সেলোনার অভিজাত আবাসিক অঞ্চলটিকে।

শহরের ব্যস্ত সড়ক তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। শীতল বাতাসে মিশে ছিল সমুদ্রঘেঁষা নগরীর স্বতন্ত্র স্নিগ্ধতা।

এহসান ভিলার সামনের ড্রাইভওয়েতে গাড়ি থামিয়ে নেমে এলেন মাইমুনা এহসান।

তার পাশেই স্কুলব্যাগ কাঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে ছোট্ট আফরিদ।

আজও ছেলেটি বারবার চারপাশে তাকাচ্ছে।

কারণ প্রতিদিন এই সময়টায় তাকে স্কুলে পৌঁছে দেন মুস্তাক এহসান নিজে।

এটা যেন তাদের ছোট্ট এক অলিখিত রুটিন।

গাড়িতে ওঠার আগে বাবার কপালে চুমু। পথে যেতে যেতে গল্প। আর স্কুলের সামনে নামার আগে,

“বিহেভ লাইক এ জেন্টলম্যান, চ্যাম্প!”

কিন্তু আজ সবকিছু অদ্ভুত রকম ব্যতিক্রম।

আজ মুস্তাক আসেননি।

আফরিদের নিষ্পাপ চোখেমুখে স্পষ্ট প্রশ্নের ছায়া।

“পাপা কি খুব বিজি, মম?”

প্রশ্নটি শুনে মাইমুনা এহসানের বুকের ভেতর হালকা মোচড় দিল।

তিনি কষ্টসাধ্য এক হাসি ফুটিয়ে বললেন,

“ইয়েস বেটা,পাপার একটু ইম্পর্ট্যান্ট কাজ আছে।”

কিন্তু অন্তরে অন্তরে তিনিও ভীষণ বিচলিত।

গতরাতের ঘটনার পর থেকে মুস্তাক যেন সম্পূর্ণ পাল্টে গেছেন।

রাতভর স্টাডি রুমে নিজেকে আবদ্ধ রেখেছিলেন তিনি। চোখেমুখে ছিল চাপা উত্তেজনা আর ক্রোধের ছাপ।

মাইমুনা বহুবার জিজ্ঞেস করেছেন,

“কি হয়েছে, মুস্তাক?”

কিন্তু প্রতিবারই তিনি এড়িয়ে গেছেন প্রশ্ন।

“নো ইস্যুস, জাস্ট অফিস ম্যাটার্স।”

এইটুকুই। এর বেশি একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি।

স্বামীর এই অস্বাভাবিক নীরবতা মাইমুনাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ঠিক তখনই

“আপু!”

পেছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠস্বর।

মাইমুনা ঘুরে তাকাতেই দেখতে পেলেন মেহমুনা আহমেদকে।

মুহূর্তেই তার ক্লান্ত মুখে ফুটে উঠল ম্লান হাসি।

মুস্তাক এহসানের সহায়তাতেই মেহমুনার দুই ছেলে, নীলাদ্রি এবং সাব্বির বার্সেলোনার অন্যতম প্রেস্টিজিয়াস স্কুলটিতে ভর্তি হতে পেরেছে।

এই বিষয়টি নিয়ে মেহমুনা আজও কৃতজ্ঞ।

সে এগিয়ে এসে বলল,

“আজ তুমি এলে যে, আপু? ভাইয়া আসেনি?”

মাইমুনা গভীর নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তার কণ্ঠে অদ্ভুত ক্লান্তি।

“না রে,তোর ভাইয়ার একটা আর্জেন্ট কাজ পড়েছে।”

মেহমুনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বোনের মুখ পর্যবেক্ষণ করল।

মাইমুনার চোখের নিচে স্পষ্ট অবসাদের ছাপ।

সে উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করল,

“কোনো সমস্যা হয়েছে, আপু? তোমাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে।”

এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন মাইমুনা।

কিন্তু পরক্ষণেই ঠোঁটে জোরপূর্বক হাসি টেনে বললেন,

“নো, নাথিং সিরিয়াস। চল, ভেতরে গিয়ে বসি।”

প্রশ্নটি অত্যন্ত কৌশলে উপেক্ষা করে গেলেন তিনি।

**************

অন্যদিকে বার্সেলোনার গবেষণা কেন্দ্রে তখন ভয়ংকর ব্যস্ততায় নিমগ্ন মুস্তাক এহসান।

বিশাল কনফারেন্স টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য গোপন নথিপত্র, ডিজিটাল ফাইল এবং প্রিন্টেড রিপোর্ট।

প্রতিটি ফাইলের ভেতর লুকিয়ে আছে ভয়াবহ তথ্য।

তথ্য ! বিকৃত কিছু মানুষের অবৈধ কর্মকান্ড! আর রয়েছে সেই ফর্মুলার ফাইলটা।

সবকিছুই অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নথিবদ্ধ।

এই তথ্যগুলো পড়লেই স্পষ্ট বোঝা যায় কোনো এক বিকৃত, ক্ষমতালোভী মস্তিষ্ক এর অন্তরালে কাজ করছে।

ঘৃণায় মুস্তাক এহসানের অন্তর পর্যন্ত বিষিয়ে উঠল।

তিনি দাঁতে দাঁত চেপে দ্রুত একের পর এক ফাইল সংগ্রহ করতে লাগলেন।

ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়াল মারুফুল হক।

তার চোখেমুখেও তীব্র উৎকণ্ঠা।

তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে সে বলল,

“এখন কি করবেন, স্যার?”

মুস্তাক ব্যস্ত হাতে নথিগুলো গুছাতে গুছাতে বললেন,

“হোয়াট আই প্ল্যানড দ্যাটস এক্সাক্টলি হোয়াট আই’ম গোয়িং টু ডু।”

তার কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক কঠোর।

মারুফুল ইতস্তত করল।

“কিন্তু একবারও কি ভেবেছেন ম্যাম আর আফরিদের কথা?”

মুহূর্তেই থেমে গেল মুস্তাকের হাত।

তার চোখের সামনে ভেসে উঠল আফরিদের নিষ্পাপ মুখ। ছেলেটি তাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না।

একেবারে বাবা-ভক্ত।

মুস্তাকের কঠিন মুখে হঠাৎই ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।

তিনি ধীরে মাথা তুলে তাকালেন মারুফুলের দিকে।

“জানো মারুফুল কখনো কখনো আমাদের বুকের উপর পাথর চাপিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।”

কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে পুনরায় বললেন,

“তুমি কি ভয় পাচ্ছ?”

প্রশ্নটি শুনে মারুফুলের অন্তর কেঁপে উঠল।

এই মানুষটিকে সে নিজের আদর্শ হিসেবে দেখেছে সারাজীবন। মৃত্যুকে সে ভয় পায় না।

কিন্তু তার ছোট্ট মেয়ে ফাহমিদা?

মা-হারা সেই শিশুটি কি আদৌ তাকে ছাড়া বাঁচতে পারবে? এই চিন্তাটাই তাকে দুর্বল করে দেয়।

মারুফুল ধীরে দৃষ্টি নামিয়ে ফেলল।

****************

অন্যদিকে,

বার্সেলোনার অভিজাত এক অ্যাপার্টমেন্টে দাঁড়িয়ে রয়েছে মিস্টার আলবার্ট।

হাতে ওয়াইনের গ্লাস। কিন্তু তার মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ অন্যত্র নিমগ্ন। সে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সাজাচ্ছে।

ঠিক তখনই পিছন থেকে ইসাবেলার কণ্ঠ ভেসে এলো,

“টেল মি অনেস্টলি, আলবার্ট তুমি কোনো অন্যায় করছো না তো?”

প্রশ্নটি শুনে থমকে গেল আলবার্ট। ধীরে ঘুরে স্ত্রীর দিকে তাকাল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময়ের ছায়া ফুটে উঠলেও দ্রুত তা আড়াল করল সে।

“মানে?”

ইসাবেলা দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

“আই জাস্ট ওয়ান্ট টু নো মুস্তাক ভাইয়া তোমার উপর এত রেগে গেল কেন?”

তার চোখেমুখে স্পষ্ট অস্থিরতা। মিস্টার আলবার্ট সবটাই প্রত্যক্ষ করছেন! ইসাবেলা কম্পিত স্বরে বলল,

“পার্টিতে যা হয়েছে ওটা নরমাল ছিল না।”

আলবার্টের ক্ষুরধার মস্তিষ্ক মুহূর্তেই নতুন ছক কষতে শুরু করল। সে অত্যন্ত নিপুণভাবে ঠোঁটে অনুতপ্ত হাসি ফুটিয়ে বলল,

“অ্যাকচুয়ালি আমার দ্বারা ছোট্ট একটা মিসটেক হয়েছে, ডার্লিং।”

ইসাবেলা আরও কাছে এগিয়ে এলো।

“তাহলে সবকিছু মিটিয়ে নিচ্ছো না কেন?”

আলবার্ট মিথ্যা আশ্বাসের সুরে বলল,

“কাম ডাউন, সুইটহার্ট। আমি কালই মুস্তাকের সঙ্গে কথা বলব।”

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভিনয়পূর্ণ কণ্ঠে বলল,

“আই উইল অ্যাডমিট মাই ফল্ট।”

কিন্তু তার চোখের গভীরে তখনও জ্বলছিল ভয়ংকর লোভের আগুন। কারণ সে জানে, এখন আর ফিরে যাওয়ার পথ নেই! আর এবার সে যা করতে চলেছে তা কেউ আটকাতে পারবেনা!

****************

বিকেলের শেষ প্রহর। বার্সেলোনার আকাশজুড়ে তখন অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা। এহসান ভিলার বিশাল কাঁচঘেরা স্টাডি রুমে নথিপত্র ছড়িয়ে বসে ছিলেন মুস্তাক এহসান।

চোখেমুখে তীব্র ক্লান্তি। গত কয়েকদিনে যেন বহু বছর বয়স বেড়ে গেছে তার।

টেবিলজুড়ে স্তূপীকৃত গোপন ফাইল। প্রতিটি নথির ভেতরে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর সব তথ্য অবৈধ কাজ কর্ম এবং রাশিয়ান আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত গোপন চুক্তির প্রমাণ! ঠিক তখনই

টিং টং! হঠাৎ কর্কশ কলিংবেলের শব্দে সম্বিৎ ফিরল মুস্তাকের।

তিনি কপাল কুঁচকে ঘড়ির দিকে তাকালেন।

মাইমুনা বোধহয় আফরিদকে নিয়ে ফিরেছে।

নিজেকেই ফিসফিস করে বললেন তিনি।

ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গেলেন সদর দরজার দিকে।

কিন্তু দরজা খুলতেই তার মুখমণ্ডলের রঙ মুহূর্তেই পাল্টে গেল।

সম্মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে মিস্টার আলবার্ট!

মুহূর্তেই মুস্তাকের মস্তিষ্কে যেন দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল।

চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল তার।

“তুমি?!”

চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

“তুমি এখানে কি করছো? হাউ ডেয়ার ইউ টু কাম টু মাই হাউস?”

মিস্টার আলবার্ট আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত রইল।

যেন পূর্বপ্রস্তুত নাটকের সংলাপ উচ্চারণ করছে।

“মুস্তাক, প্লিজ একবার আমার কথাটা শুনো।”

“কি শুনব? নিজের কুকর্মের ব্যাখ্যা?”

মুস্তাকের কণ্ঠে তীব্র ঘৃণা। কিন্তু আলবার্ট বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না।

বরং নির্বিকার ভঙ্গিতে ভেতরে প্রবেশ করল।

ক্লান্ত সুরে বলল,

“জাস্ট টেন মিনিটস, মুস্তাক। দশ মিনিট সময় দাও আমাকে।”

মুস্তাক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।

অতঃপর ধীরগতিতে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,

“ওকে। তোমার কাছে ঠিক দশ মিনিট আছে। স্পিক!”

***************

স্টাডি রুমজুড়ে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা।

ঘরের কাঁচের জানালায় প্রতিফলিত হচ্ছিল অস্তরাগের লাল আভা। মিস্টার আলবার্ট ধীরে সোফায় বসল।

তার চোখে অদ্ভুত এক লোভের ঝিলিক।

“মুস্তাক মিখাইল আমাদের যা ডিমান্ড করব, ঠিক তাই দেবে।”

মুস্তাক নির্বিকার।আলবার্ট আরও এগিয়ে এলো কথায়।

“থিংক অ্যাবাউট ইট! এই দেশ ,এই সরকার, আমাদের কি দিয়েছে?”

তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে লোভে ভারী হয়ে উঠল।

“নাথিং!”

সে টেবিলে আঙুল ঠুকল।

“আমরা সারা জীবন গবেষণা করেছি। দিনরাত পরিশ্রম করেছি। কিন্তু শেষমেশ কি পেয়েছি?”

তার ঠোঁটে বিদ্রূপাত্মক হাসি ফুটল।

“নিজের আখের গোছানোই বেটার, মাই ফ্রেন্ড! এত আদর্শবাদ দিয়ে কি হবে?”

মুস্তাক এহসান সম্পূর্ণ নীরবে শুনলেন সবকিছু।

তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

তার দৃষ্টি ভয়ংকর স্থির। পরক্ষণেই ঠাস!

সজোরে এক চড় বসালেন আলবার্টের গালে!

পুরো ঘর কেঁপে উঠল শব্দে। ঠিক সেই মুহূর্তেই

বাড়ির প্রধান দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন মাইমুনা এহসান এবং আফরিদ। চড় খেয়ে টলমল করে উঠল আলবার্ট। সে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,

“হাউ ডেয়ার ইউ, মুস্তাক? তুমি কোন সাহসে আমার গায়ে হাত তুললে?”

ভেতরের চিৎকার শুনে ছুটে এলো সবাই।

আফরিদ বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল দৃশ্যটার দিকে।

অন্যদিকে মুস্তাক এহসান ক্রোধে কাঁপছেন।

তিনি আঙুল তুলে আলবার্টের দিকে নির্দেশ করলেন।

“তোমাদের মতো মানুষদের কারণেই বিজ্ঞানীরা আজ বিক্রি হয়ে যায়! তোমাদের মতো লোভী বিশ্বাসঘাতকদের কারণেই মিখাইলের মতো আন্ডারওয়ার্ল্ড গডফাদাররা ক্ষমতা পায়!”

তার কণ্ঠ বজ্রের মতো গর্জে উঠল।

“তোমরা দেশের শত্রু!”

আলবার্ট গাল চেপে ধরে ধীরে হাসল।

হিসহিসে স্বরে বলল,

“ইউ উইল পে ফর দিস, মুস্তাক!”

তার চোখে তখন বিষাক্ত বিদ্বেষ।

“তোমাকে শেষ করে দিতে মিখাইলের দু’মিনিটও লাগবে না!”

এই কথাটা শুনে ছোট্ট আফরিদের ভেতর তীব্র ঘৃণা জন্ম নিল। তার সামনে দাঁড়িয়ে কেউ তার পাপাকে হুমকি দিচ্ছে! শিশুটির ছোট্ট মুঠি শক্ত হয়ে গেল।

সে ফুঁসতে লাগল ক্রোধে।

***************

রাত। বারান্দার ওপারে নেমে এসেছে অন্ধকার।

মাইমুনা এহসান উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে আছেন মুস্তাকের দিকে।

“এখন কি করবে তুমি, মুস্তাক? তুমি কি সত্যিই পারবে ওদের সঙ্গে লড়তে?”

তার কণ্ঠ কাঁপছিল। মুস্তাক তপ্ত নিঃশ্বাস ফেললেন।

হয়তো সত্যিই তিনি জানেন না তিনি পারবেন কিনা।

কিন্তু এখন আর পিছু হটার উপায় নেই।

তিনি ধীরে স্ত্রীর কপালে চুম্বন এঁকে দিলেন।

“চিন্তা কোরো না। কাল আমি খুব বড় একটা সিদ্ধান্ত নিতে চলেছি। হোপফুলি সরকার আমাদের প্রপার প্রটেকশন দেবে।”

মাইমুনার বুকের ভেতর অকারণ আতঙ্ক জমতে লাগল। অদ্ভুত এক রক্তক্ষয়ী আশঙ্কা গ্রাস করল তাকে। মনে হচ্ছিল ভয়ংকর কিছু আসন্ন।

**********

একদিন পর…

বার্সেলোনার মুস্তাক এহসানের ল্যাব।

মুস্তাক এহসান ত্রস্ত হাতে দ্রুত ফাইলগুলো গুছিয়ে নিচ্ছেন। তার পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করছে মারুফুল হক।

মারুফুল উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,

“বাইরে গাড়ি প্রস্তুত আছে, স্যার। আমাদের এখনই বের হতে হবে।”

ঠিক তখনই ঠক ঠক! ল্যাবের মূল দরজায় শব্দ হলো।

পুরো ল্যাবটি ছিল বায়োমেট্রিক সিকিউরিটিতে সুরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এখানে প্রবেশ করা কার্যত অসম্ভব।

মুস্তাক দ্রুত বললেন,

“মারুফুল, দেখে আসো কে এসেছে।”

মারুফুল ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলল,

“স্যার, মাইমুনা ম্যাম এসেছেন।”

মুহূর্তেই থমকে গেল মুস্তাক।

“মাইমুনা?”

তার কপাল কুঁচকে উঠল।

দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে দরজা খুললেন তিনি। পরক্ষণেই ভেতরে প্রবেশ করল মাইমুনা।

ঠোঁটে প্রশস্ত হাসি।

“মুস্তাক,,

কিন্তু অদ্ভুত কিছু যেন খচখচ করতে লাগল মুস্তাকের অন্তরে।

“তুমি এখানে কি করছো? আর আফরিদ কোথায়?”

মেয়েটি অদ্ভুত শান্ত সুরে বলল,

“আফরিদ স্কুলে। আমি ভাবলাম তোমার সঙ্গে একটু দেখা করি।”

মুস্তাকের মুখমণ্ডল কঠিন হয়ে উঠল।

“তোমার এখানে আসাটা ভুল হয়েছে। আমি তো বলেছিলাম,,

“হ্যালো, মুস্তাক… মাই ফ্রেন্ড!”

হঠাৎ কর্ণকুহরে ভেসে এলো আরেকটি পরিচিত কণ্ঠ।

মুহূর্তেই মুস্তাকের চেহারা পরিবর্তিত হয়ে গেল।

“আলবার্ট?”

মিস্টার আলবার্ট ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করল।

তার সঙ্গে রয়েছে আরও দু’জন অচেনা লোক।

মুস্তাক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।

“তোমাকে ভেতরে ঢুকতে কে দিয়েছে? সিকিউরিটি! সিকিউরিটি!”

আলবার্ট ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।

“কুল ডাউন, মাই ফ্রেন্ড। এত প্যানিক করছো কেন?”

পরক্ষণেই দু’জন লোক ঝাঁপিয়ে পড়ে মারুফুলকে চেপে ধরল।

মারুফুল ছটফট করতে লাগল।

“স্যার!”

মুস্তাক ক্ষিপ্ত হয়ে চিৎকার করলেন,

“কি হচ্ছে এসব?! ছাড়ো ওকে! আলবার্ট!”

ঠিক তখনই, পেছন থেকে ভেসে এলো নারীকণ্ঠ।

আস্তে, দুলাভাই এত চিৎকার করছেন কেন?”

স্তব্ধ হয়ে গেল মুস্তাক। তার শরীর হিম হয়ে এলো।

এই কণ্ঠ তিনি ধীরে ধীরে ঘুরে তাকালেন।

আর পরক্ষণেই তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।

“মেহমুনা? তুমি?”

মাইমুনার অবিকল মুখশ্রীধারী নারীটি ধীরে হাসল।

“ইয়েস, দুলাভাই। আমি।”

মুস্তাক যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। মেহমুনা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।

তার চোখে তখন অদ্ভুত লোভের ঝিলিক।

“দুলাভাই প্লিজ রাজি হয়ে যান।”

সে নিচু স্বরে বলল,

“আপনি যদি ফর্মুলার ফাইলটা দিয়ে দেন বিশ্বাস করুন আমাদের সবার জীবন পাল্টে যাবে।”

মুহূর্তেই মুস্তাকের সমগ্র পৃথিবী যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তিনি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মেহমুনার দিকে। এ কি সত্যিই মাইমুনার ছোট বোন?

এই মেয়েটিও বিশ্বাসঘাতক?

চলবে…………..।

(📌৪ হাজার প্লাস শব্দ)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply