#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা
[পর্ব ৯১]
#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম
( দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
[দ্বিতীয় খন্ড]
মুখাবরণের আড়াল হতে আজ স্বীয় পরিচয়ের পর্দা অপসৃত করল মনস্টার মাফিয়া কিং আফরিদ এহসান।
চক্ষুগোচর হইতেই সেই নীলাভ দীপ্তিময় নেত্রযুগল, অতীতের বিভীষিকাময় দিনগুলোর র’ক্তাক্ত স্মৃতি বিদীর্ণ করে তুললো মস্তিষ্কপট।
উত্তে’জনার অভিঘা’তে হৃদপিণ্ড যেন স্ফীত ও স্পন্দনোন্মত্ত; মিস্টার আলবার্ট দুর্বল পদক্ষেপে সম্মুখে অগ্রসর হইয়া, কাঁপা কণ্ঠে অস্ফুট উচ্চারণ করিলেন,
“মুস্তাক? সায়েন্টিস্ট মুস্তাক?”
আফরিদ কর্কশ রসিকতায় গর্জমান হাস্যে উদ্গীরণ হল; তার হাস্যধ্বনির কম্পনে বক্ষঃস্থল প্রকম্পিত হতে লাগল।
পেছনে দণ্ডায়মান ঈশান, করবদ্ধ অবস্থায় কর্তব্যপরায়ণ প্রহরীর ন্যায় নিশ্চল; তাদের পেছনে সারিবদ্ধ আরও ব্ল্যাক ফোর্স, যেন যান্ত্রিক নিষ্ঠুরতায় স্থবির প্রতিমূর্তি।
আফরিদ ধীরগামিতায় অগ্রসর হয়ে চেয়ারে বসল; এক পা অপর পায়ের উপর পা রেখে তির্যক-হাস্যে উচ্চারণ করল,
“চেনা চেনা মনে হচ্ছে কি? মুস্তাক এহসানের স্মৃতি কি জাগ্রত হয়েছে, মিস্টার আলবার্ট?”
আলবার্টের অন্তঃকরণে ধুকপুক শব্দ তীব্রতর হচ্ছে; বিস্ময়, ভীতি ও সংশয়ের ঘূর্ণিপাকে তিনি বিপর্যস্ত।
“কে তুমি? তুমি কি করে জানো মুস্তাক..
আফরিদ তৎক্ষণাৎ বাক্যবিভঙ্গ ঘটিয়ে কঠোর স্বরে ঘোষণা করল,
“আমি আফরিদ এহসান! মনস্টার মাফিয়া কিং যার নাম উচ্চারিত হলেও বিশ্বব্যাপী আন্ডারওয়ার্ল্ডে অন্ধকারের ছায়া নেমে আসে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদাররাও যার কর্তৃত্বে নতশির। হ্যাঁ, আমি সেই অভিশ’প্ত প্রতিভা মুস্তাক এহসানের ছেলে আফরিদ এহসান!”
এই ঘোষণা শ্রবণে আলবার্টের দেহ কেঁপে উঠল; শ্বাস যেন কণ্ঠদেশে অবরুদ্ধ।
পদতলে মাটি স্খলিত হবার ন্যায় অনুভূত হলো। দৃষ্টি বিস্ফারিত, মুখাবয়বে আতঙ্ক ও বিস্ময়ের সম্মিলিত ছাপ।
এই সেই সন্তান। যার বাবাকে নির্মমভাবে নিশ্চিহ্ন করিয়াছিল তারাই যার মা’কে চিরতরে নিঃস্ব করে দিয়েছে। ভাগ্যের নিষ্ঠুর প্রহসনে নিক্ষেপ করেছে অনাথ অন্ধকারে।
“আ… আফরিদ? আফরিদ এহসান? তুমি?”
আফরিদ ওষ্ঠদ্বয় কুটিলভাবে বাঁকাইয়া, সর্পিল হিসহিসে স্বরে উচ্চারণ করল,
“Surprised? এত বছর পর আমাকে দেখে বেশ অবাক হয়েছে, তাই না?”
কথাগুলো যেন অন্ধকারের বুক চিরে বের হওয়া বিষাক্ত ধোঁয়া।
মিস্টার আলবার্টের দেহ হঠাৎ করে শক্তিহীন হয়ে পড়ল; ধপ শব্দে শীতল ফ্লোরে লুটিয়ে পড়লেন তিনি।
চারিদিকের পরিবেশ দমবন্ধকর পরিবেশে ।
ভীষণ কষ্ট হচ্ছে এখানে বাতাসও বুঝি আফরিদের অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করার সাহস পায় না।
প্রতিটি শ্বাস গ্রহণ যেন মৃত্যুর সহিত লড়াই।
আফরিদ ধীর পদক্ষেপে অগ্রসর হলো, জুতোর শব্দ প্রতিধ্বনিত হইতে লাগল অদ্ভুত শব্দে।
একটি শিকারকে ঘিরে ধীরে ধীরে এগাইয়া আসা শিকা’রীর ন্যায়।
গভীর, শীতল, ভয়ংকর কণ্ঠে পুনরায় বলল,
“কি ভেবেছিলে? আই ওয়াজ জাস্ট আ কিড? কিছুই মনে রাখবো না?”
সে সামান্য ঝুঁকে এল, চোখে জ্ব’লে প্রতিহিংসার দাউদাউ আ’গুন।
“তুমি, তোমার ওয়াইফ, বাচ্চা তোমার পরিবার বাংলাদেশে পালিয়ে যাবে আর তারপর খুশিতে থাকবে?দ্যাটস ফানি,,,,রিয়েলি ফানি!”
একটি শীতল, তাচ্ছিল্যের হাসি ছড়িয়ে পড়ল তার ওষ্ঠে।
“Not that easy, Mr. Albert not that easy.
প্রতিটি কথা যেন ছু’রি, ধীরে ধীরে মাংস বিদীর্ণ করছে।
“আমি আফরিদ এহসান, যে নিজেকে তৈরি করেছে । only to destroy people like you. You remember now?”
মিস্টার আলবার্ট থরথর করে কাঁপছেন; শুকনো কণ্ঠে ঢোক গিলে চলেছেন বারংবার।
চক্ষু বিস্ফারিত, দৃষ্টি অসংলগ্ন! কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘামের কণা।
আফরিদ মাথা কাত করে অদ্ভুত এক উন্মা’দ হাসি হেসে উঠল,
“হেই এত তাড়াতাড়ি ভয় পেয়ে গেলে চলবে?”
সে ধীরে ধীরে নিচু হইয়া, আলবার্টের মুখের নিকটে মুখ এনে ফিসফিস করল,
“I’ve got some very interesting news for you.”
তার ভয়ংকর কন্ঠস্বর ফের শ্রবণন্দ্রেণিকে ছুঁয়ে গেল,
“মিস্টার আলবার্ট,,এখনই যদি ভেঙে পড়ো, তাহলে গেম তো শুরুই হলো না। এখুনি এমন করলে কিভাবে হবে?”
কণ্ঠস্বর প্রায় স্তব্ধপ্রায়। হৃদয়ের অতল গহ্বরে সঞ্চিত অন্তর্নীল য’ন্ত্রণাগুলো নীরব গলাধঃকরণে গ্রাস করছেন তিনি।
আকস্মিকভাবে বিপর্যস্ত স্বরে উচ্চারিত হলো,
“আমাকে ক্ষমা করে দাও, আফরিদ।ফরগিভ মি, প্লিজ!”
অধরকোণে ধীরে ধীরে বিকশিত হলো এক বিভীষিকাময় পৈশাচিক হাস্যরেখা। আফরিদ হাসল নির্মম, নিস্পৃহ, শীতল সেই হাসি। অতঃপর তাকে বিস্ময়ের চরম প্রান্তে উপনীত করে নিম্ন, সংযত স্বরে বলল,
“আপনার জন্য আরও একটি নিউজ রয়েছে, মিস্টার আলবার্ট।”
চোখ তুলে তাকালেন মিস্টার আলবার্ট। দৃষ্টিজুড়ে তীব্র বিষাদ আর অবদমিত আত’ঙ্কের রেশ স্পষ্ট। আফরিদ স্বর আরও নিম্নে নামিয়ে বলল,
“কংগ্র্যাচুলেশনস, মিস্টার আলবার্ট। আপনি নানা হয়েছেন।”
মুহূর্তেই তাঁর মুখাবয়বে বিস্ফোরিত হলো স্তম্ভিত বিস্ময়। সমগ্র সত্তা যেন বাকরুদ্ধ নিথরতায় অবশ হয়ে গেল।
থরথর কাঁপা কণ্ঠে শুধালেন,
“মা… মানে?”
আফরিদ মৃদু হেসে বলল,
“আপনার কন্যা আমার সন্তানের মা হয়েছে, মিস্টার আলবার্ট। আর আপনি আমার সন্তানের নানা।”
মিস্টার আলবার্টের বক্ষগহ্বর তীব্র অভিঘা’তে কেঁপে উঠল। অন্তরজুড়ে মোচড় খেল অসহনীয় দহন।
বিক্ষিপ্ত স্বরে বলে উঠলেন,
“এ… এসব কী প্রলাপ বকছ তুমি?”
আজ যেন আফরিদ এহসান এক অদ্ভুত উন্মত্ত প্রফুল্লতায় আচ্ছন্ন। অধর গোলাকারে সংকুচিত করে শিস বাজিয়ে বলল,
“নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস দেখুন, মিস্টার আলবার্ট! আমি আমার বাবার খুনির মেয়েকেই উন্মত্তের ন্যায় ভালোবেসে ফেলেছি। আর সেই ভালোবাসার অবিনশ্বর স্বাক্ষর হয়ে আজ আমার জীবনে আগমন ঘটেছে এক ফুটফুটে সন্তানের। আমার র’ক্ত মিস্টার আলবার্ট। আফরিদ এহসানের র’ক্ত!”
মুহূর্তেই উন্মত্ত ক্রোধে বিকৃত হয়ে উঠলেন মিস্টার আলবার্ট। আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে আফরিদের কলার চেপে ধরলেন তিনি।
কিন্তু আফরিদ? সম্পূর্ণ নির্বিকার। অধরপ্রান্তে তখনও জ্বলজ্বল করছে সেই ভয়ংকর পৈশাচিক হাসি।
“হাউ ডেয়ার ইউ, আফরিদ? হাউ ডেয়ার ইউ! তুমি,,,,তুমি আমার মেয়ের সঙ্গে…
আফরিদ অনায়াসে তাঁর কম্পমান হাতদ্বয় সরিয়ে দিল। কলার মুক্ত করতে করতে শীতল স্বরে বলল,
“রিল্যাক্স, মিস্টার আলবার্ট। হোয়াটস গোয়িং অন, ফাদার-ইন-ল?”
পরক্ষণেই প্রবল ধাক্কায় তাকে নিজের থেকে দূরে নিক্ষেপ করল আফরিদ। অতঃপর ধীর, বিষাক্ত স্বরে উচ্চারণ করল,
“আপনার সময় প্রায় শেষ, মিস্টার আলবার্ট। অতি শীঘ্রই আপনি আপনার ঈশ্বরের কাছে যেতে চলেছেন।”
কথাগুলো ব্যঙ্গাত্মক হেসে বলল আফরিদ! স্থবির হয়ে গেলেন মিস্টার আলবার্ট। কন্ঠনালি ফুঁড়ে আর একটি শব্দও বেরুলো না।
******************
কক্ষের নিরবতা ভেঙ্গে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে শিশুর করুণ আর্ত’নাদে। তীক্ষ্ণ আ’র্তচিৎকারে যেন প্রকম্পিত হচ্ছে সমগ্র এহসান মঞ্জিল।
কখনো মাইমুনা এহসান তো কখনো তিতলি, আবার কখনো কল্পনা ব্যাকুলতায় কোলে তুলে নিচ্ছে এহসান মঞ্জিলের রাজপুত্র আয়াশ এহসানকে। এহসান বংশের ক্ষুদ্র উত্তরাধিকারী যেন আজ থামবে না বলেই পণ করেছে।
অথচ এই নবজাতকের বয়স মাত্র চার মাস! নিজের যন্ত্রনা ব্যক্ত করার সামর্থটুকুও যার হয়নি এখনো। একনাগাড়ে কেঁদেই চলেছে! ফলত অবিরাম কান্নার মাধ্যমেই প্রকাশ পাচ্ছে তার সমস্ত অস্বস্তি। দৃশ্যটি এতটাই মর্মান্তিক যে সকলের অন্তঃস্থল অস্থির হয়ে উঠছে!
এই মূহুর্তে মাইমুনা এহসানের কোলে রয়েছে ছোট্ট রাজপুত্র! উৎকন্ঠা এবং বিরক্তির মিশ্রে ন্যান্সিকে তীব্র ভৎর্সনা করে বললেন,
“মম হয়েছো অথচ বুঝতে পারছো না নিজের সন্তানের কষ্টটা কোথায় হচ্ছে?”
কল্পনা এহসানও তার কথায় সহমত পোষণ করে কটাক্ষ ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
“তুমি ওকে খাবার খাইয়েছো তো, ইলহাম? আমার মনে হয় আয়াশ খাবারের জন্য কাঁদছে!”
ন্যান্সি স্থির থাকতে পারছেনা! শিশু তার কেঁদে কেঁদে মুখশ্রী রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে,
ন্যান্সি বিচলিত হয়ে বলে,
“খাইয়েছি কিন্তু তারপরেও যে কেন কাঁদছে বুঝতে পারছি না!”
তৎক্ষণাৎ কর্ণ গোচরে তীব্র মাইমুনা এহসানের কন্ঠ থেকে পুনরায় ঝরে পড়ল তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ!
“জানবে কি করে ঠিকঠাক খেয়াল রাখো আয়াশের? যত্তসব!”
এহেন তীর্যক মন্তব্যে আহত চোখে তাকায় ন্যান্সি! বাক্যগুলো তীক্ষ্ণ ফলার ন্যায় হৃদয়ে বিদ্ধ করল। অপমান, অভিমানে সজল হয়ে উঠল তার নয়ন যুগল।
সেই তো রাত দিন নির্ঘুম প্রহর জেগে এই শিশুকে যত্ন করে ভালোবেসে আগলে রাখছে। সেই তো দশমাস দশদিন গর্ভে রেখেছে অথচ আজ এমন মন্তব্য করছে সকলে?
অন্তরাত্মা বিদীর্ণ করে বুকচেরা এক উষ্ণ নিঃশ্বাস নিঃসৃত হয় ন্যান্সির অধরপ্রান্ত থেকে।
এমন পরিস্থিতিতে বাড়িতে প্রবেশ করল আফরিদ এহসান। কর্ণকুহুতে অবিরাম প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো শিশুর আর্তনাদ । মূহুর্তেই শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল মনস্টার মাফিয়ার। আঁতকে উঠলেন তিনি। বিস্ময় এবং উৎকণ্ঠাৎ দৃষ্টি ছুটে গেল দোতলার দিকে তাকালো। আচ্ছা বাড়িতে কি কেউ নেই? ন্যান্সি কোথায়? সে থাকা সত্বেও শিশু তার কেন কাঁদছে?
হৃদয় কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো মনস্টার মাফিয়ার। বক্ষগহ্বরে অস্থির কম্পন অনুভূত হতে লাগলো।
আফরিদ ত্বরিত ভঙ্গিতে দেহাবৃত স্যুটখানি খুলে ছুড়ে ফেলল সোফার উপর। অতঃপর দীর্ঘ পদক্ষেপে ছুটে গেল সিঁড়ির দিকে। ক্ষিপ্র গতিতে উঠতে উঠতে কব্জিতে ঝুলতে থাকা ঘড়িটা খুলে ফেলল।
ব্যস্ত রুমে পা রাখতেই নজরে এলো একদল নারী।
কল্পনা, মাইমুনা এহসান, ন্যান্সি, তিতলি সকলে এখানেই রয়েছে!
মাইমুনা এহসানের কোলে থাকা চার মাসের আয়াশ এহসান গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদছে!
দৃশ্যখানি দেখে অন্তঃস্থল মোচড় দিয়ে উঠল আফরিদের। দীর্ঘ নিঃশ্বাস টেনে ধীরপদে অগ্রসর হল সে। পুত্রকে দেখামাত্রই মাইমুনা এহসান আয়াশকে নিয়ে তার সম্মুখে আসলেন। আফরিদ বাহু প্রসারিত করতেই শিশুটিকে তার বক্ষে সমর্পণ করলেন।
গভীর ও কর্কশ স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল সে,
“ও এভাবে কাঁদছে কেন?”
প্রশ্নখানি নিক্ষিপ্ত হল ন্যান্সির উদ্দেশে। প্রত্যুত্তরের প্রতীক্ষায় যেন প্রতিটি ক্ষণ অসহনীয় হয়ে উঠল। কিন্তু ন্যান্সি নিশ্চুপ। কক্ষে উপস্থিত সকলেই আফরিদের দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা অনুভব করিতেছে, অথচ ন্যান্সি কোনো জবাব প্রদান করতে নারাজ।
অবশেষে কপট বিরক্তি দেখিয়ে সে কক্ষ ত্যাগ করল।
বিছানায় শোয়া আয়াশ হাসছে। আফরিদ তার দিকে ঝুঁকে আছে। সেও মিটিমিটি হাসছে। তর্জনী আঙ্গুল বাড়াতেই তা মুঠো করে ধরলো আয়াশ। বাবার সান্নিধ্য পেয়ে খুশিতে আত্মহারা তার ছেলে।
আফরিদ গ্রীবা ঝুঁকিয়ে চুমু খেল ওই আদুরে আদলে। তার সন্তান,তার রক্ত,তার অংশ। তার রাজ্যের রাজপুত্র সে। আয়াশকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে আফরিদ। একদম তার মতো, শুধু নাকটা মায়ের মতো। চোখ দুটোও তার মতো নীলাভ। যেকেউ দেখলে নিঃসন্দেহে বলবে সে আফরিদ এহসানের দুষ্টুমির প্রতিক।
আয়াশের পাশেই বাচ্চাদের মতো ঘুমোচ্ছে ন্যান্সি। অন্যদিন হলে খিদের জ্বালায় কান্না করতো আয়াশ। কিন্তু আজ করছে না। বাবাকে পেয়ে বুঝি খাবারের কথা ভুলে গেছে সে। হাত পা কি চমৎকার ভঙ্গিতে নাড়াচ্ছে।
আফরিদ আড়চোখে দেখে ন্যান্সি কে। স্নিগ্ধ মুখশ্রী ফ্যাকাশে হয়ে আছে। চারমাসে শুকিয়ে কি অবস্থা করেছে তার রাজরানী। এই বেয়াদব নারী তাকে জ্বা’লিয়ে পু’ড়িয়ে ছারখার করে দিতে চাইছে।
আয়াশের নড়াচড়ায় ঘুম ছুটে গেল ন্যান্সির। ধড়ফড় করে উঠে বসলো সে। কিন্তু আশ্চর্য হয় যখন দেখল আফরিদ আয়াশের পাশে বসে আছে। তার আঙ্গুল ধরে আছে বাচ্চা। কি চমৎকার সেই দৃশ্য। সকালটা এরকম চমৎকার দৃশ্যে শুরু হবে কল্পনা করেনি।
ক্লান্ত ন্যান্সি তো এটাই চেয়েছিল! একটা ছোট্ট সংসার, স্বামী সন্তান।
ন্যান্সি ধীর পায়ে বিছানা ত্যাগ করল। মুখাবয়বজুড়ে অভিমানের গাঢ় ছায়া, ভ্রুযুগল সামান্য কুঞ্চিত। আফরিদের দৃষ্টি এড়াল না কিছুই। কালকের ঘটনাটির রেশ যে এখনো তার প্রিয়তমার অন্তরে অমোচনীয় হয়ে আছে, তা বুঝতে বাকি রইল না তার।
আফরিদ নিঃশব্দে আয়াশকে কোলে তুলে নিল। শিশুটিকে বুকের সঙ্গে সযত্নে সংলগ্ন করে নিয়ে ব্যালকনির বেতের সোফায় গিয়ে বসল। কয়েক মুহূর্ত নীরবে তাকিয়ে থেকে ডাকল,
“অ্যাঞ্জেলিনা!”
ওয়াশরুমের দিকে অগ্রসর হতে গিয়েও থেমে গেল ন্যান্সির পদযুগল।পেছন ফিরে তাকাতেই দেখল, আফরিদ এক হাতের ইশারায় তাকে নিজের কাছে আহ্বান করছে।উরুর ওপর বসার ইঙ্গিত।ন্যান্সি কোনো উত্তর দিল না। নিঃশব্দে এগিয়ে এলো। কিন্তু আফরিদের পাশে গিয়েও বসতে নারাজ সে।
আফরিদ মৃদু টানে তাকে নিজের নিকটে এনে বসিয়ে নিল।
চুলের ভাঁজে আঙুল গলিয়ে অত্যন্ত সযত্নে তার মাথাটা সামান্য নিচু করে কপালে এঁকে দিল একটি দীর্ঘ চুম্বন।
অনুতাপের কোমলতা মেশানো কন্ঠে বলে,
“এত অভিমান?”
ন্যান্সি মুখ ফিরিয়ে নিল।
“আমার কোনো অভিমান নেই। আপনার মা, আপনার ভাইয়ের বউ ওরাই তো আমার থেকে বেশি আয়াশকে বোঝে। তাদেরই বলবেন, আজ থেকে আয়াশকে তারাই রাখুক।”
আফরিদের অধরপ্রান্তে চাপা হাসির রেখা ফুটে উঠল।চুলের ভাঁজ থেকে হাত সরিয়ে ধীরে ধীরে ন্যান্সির কটিদেশে জড়িয়ে নিল তাকে। অপর বাহুতে তখনও আয়াশ নিরাপদ আশ্রয়ে আবদ্ধ।
“তোর খোদার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে আসা এই মিষ্টি সত্তাটা কাঁদলে যে আমার বুকের ভেতরটাও কেমন অস্থির হয়ে ওঠে।”
ন্যান্সি ধীরে ধীরে চোখ তুলল।দু’জনের দৃষ্টি এক বিন্দুতে এসে স্থির হলো।আফরিদ আরও একটু ঝুঁকে এলো। নাকের ডগা ছুঁয়ে গেল ন্যান্সির নাকের ডগায়। তারপর চোখ বুজে তার গলার কাছে মুখ নামিয়ে নিয়ে পরিচিত সেই মায়াময় সুবাসটা গভীরভাবে টেনে নিল।
অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল,
“এই মিষ্টি খুশবুর মেয়েটাকে সরি। সবার হয়ে সরি।”
ন্যান্সির চোখের কোণ ইতিমধ্যেই অশ্রুসিক্ত।আফরিদ তার কপালে আবারও ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“জান্নাতের ফুলকে খুব সরি।”
ন্যান্সির চোখে এবার বিস্ময়ের আভা।
“জান্নাতের ফুল?”
সামান্য অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কে বলল আমি জান্নাতের ফুল?”
আফরিদ দৃষ্টি তুলে তাকাল।
“জান্নাত ছাড়া তোকে কোথাও কল্পনাই করা যায় না।আর না জান্নাত ব্যতীত তোকে অন্য কোথাও রাখা যায়।”
কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে ন্যান্সি মৃদু স্বরে শুধাল,
“আর আপনি?”
আফরিদের ঠোঁটে ফুটে উঠল এক নিঃসঙ্গ হাসি।
“আমি?”
সে আয়াশের নিষ্পাপ মুখের দিকে একবার তাকাল। তারপর দৃষ্টি ফিরিয়ে আনল ন্যান্সির চোখে।
“আমি জাহান্নামি।”
শব্দ দুটি ন্যান্সির হৃদয়ে কেমন যেন আঘাত করল।মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।আফরিদ অবশ্য নির্বিকার থাকার চেষ্টা করল। আয়াশের ক্ষুদ্র আঙুলগুলো নিজের আঙুলের মাঝে আবদ্ধ করে ধীর স্বরে বলল,
“যদি কোনোদিন আমার জন্য তোর করুণা হয়, তাহলে রবের কাছে প্রার্থনা করিস,আমাকে যেন জান্নাতে ডেকে নেন।”
ন্যান্সির ঠোঁটের কোণে অশ্রুভেজা এক ফিচেল হাসি ফুটে উঠল।দুই বাহু আফরিদের গলায় জড়িয়ে ধরল সে।তারপর অপর হাতটি বাড়িয়ে আয়াশের ক্ষুদ্র হাতটাও আলতো করে ছুঁয়ে রাখল।কণ্ঠে ছিল শিশুসুলভ সরলতা, অথচ প্রার্থনাটুকু ছিল হৃদয়ের গভীরতম প্রকোষ্ঠ থেকে উঠে আসা,
“কেন মনে হয়, আমার সব দোয়া কবুল হয়?”
আফরিদ মৃদু হেসে বলল,
“কারণ তোর দোয়ায় নিষ্ঠা আছে।”
একটু থামল।
“বিশ্বাস আছে। ভালোবাসা আছে। আর আছে এমন এক নির্মল অন্তর, যার সামনে হয়তো রব কোনো প্রার্থনাই ফিরিয়ে দিতে চান না।”
ন্যান্সি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না।আফরিদকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে আয়াশের হাতের ওপর নিজের হাত রেখে বিড়বিড় করে বলল,
“আমার সঙ্গে আপনিও জান্নাতবাসী হোন। আমিন।”
আফরিদের চোখের পাতা কেঁপে উঠল।অধরে ক্লান্ত এক হাসি ফুটল।সে জানে তার অতীত কলঙ্কে পরিপূর্ণ। কত মানুষের কান্না, কত অপরাধ, কত অন্ধকার তার অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তার হিসাব হয়তো কোনোদিন নিজেকেও দিতে পারবে না।তবুও আজ এই দুইটি প্রাণ তার বুকের কাছে।একজন তার ভালোবাসা।অন্যজন তার রক্তের উত্তরাধিকার। আর ন্যান্সির সরল প্রার্থনা সেই প্রার্থনাটুকুই যেন একজন গুনাহগার মানুষের হৃদয়ে প্রথমবারের মতো জান্নাতের কোনো ক্ষীণ আলোকরেখা এঁকে দিল।
চলবে……….।
(এত শীতল শীতল পর্ব লিখতে মন চাচ্ছে না। পরের পর্বে একটা ছোটখাটো হার্ট অ্যাটাক লিখব।বাই দ্য ওয়ে আর মাত্র দশ পর্বের মতো হবে গল্প, এরপর শেষ। এতদিন যেহেতু গঠনমূলক মন্তব্য করেছেন আশা করব আর কটা পর্ব সেটাই করবেন। তাছাড়া আমি আপনাদের কাছে একটু রেসপন্স আশা করি, বাপের সম্পত্তি নহেএএ
Share On:
TAGS: অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা, ফারহানা নিঝুম
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৯
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪৫
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৫৯
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৬৩+৬৪
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৭৭
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ২৯(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৮২
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৫৮
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৩১
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৯২