Golpo romantic golpo অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫৫( প্রথম অংশ)


#অসম্ভব_রকম_ভালোবাসি_তোমায়

#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী

#পর্ব ৫৫( প্রথম অংশ)

অতীত,,,

আজ রিদির বিয়ে। পুরো বাড়ি বক্সের সাউন্ডে কাঁপছে। আত্মীয়-স্বজনে ভরপুর চারপাশ। উৎসবের এই তীব্র কোলাহলের মাঝে রিদি সকাল থেকেই তার রুমে পাথরের মতো চুপচাপ বসে আছে। তার ঠোঁটে হাসি নেই। এমনকি চোখে এক ফোঁটা জলও নেই। আছে শুধু বুক চিরে আসা এক দীর্ঘশ্বাস। সে জানালার গ্রিল ধরে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। বেহায়া মনটা এই শেষ মুহূর্তেও একবার শুভ্র নামক সেই পুরুষটাকে দেখতে চাইছে। রিদি জানে। আজকেই হয়তো এই পৃথিবীতে তার শেষ দিন। এরপর থেকে তার পুরো অস্তিত্ব মুছে যাবে। শুধু কোথাও বেঁচে রবে এক টুকরো ধূসর স্মৃতি। এদিকে ঈশানের অবস্থা পাগলের মতো। দেখে মনে হচ্ছে শুভ্রের নয়। বরং তার নিজের ভালোবাসার মানুষের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে অন্য কোথাও। আজও সে শেষবারের মতো এয়ারপোর্টে গিয়ে খবর নিয়েছে। কিন্তু ফলাফল সেই শূন্য। শুভ্রের নাম্বারে পাগলের মতো কল দিয়ে যাচ্ছে সে। কিন্তু ওপাশ থেকে সেই পরিচিত যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর বলছে ফোনটি বন্ধ। শুভ্রের ওপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে ঈশানের। এভাবে কেউ নিখোঁজ হয়ে থাকে। ঈশান দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল।

“বিয়ে হয়ে যাক। হলেই ভালো। তাহলেই নিজের ইগো করার ফল ঠিকঠাক বুঝতে পারবে। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো না। যা বস করছে।”

দুপুর গড়াতেই বরের সারি সারি গাড়ি রিদিদের বাড়ির সামনে এসে থামল। গেটে হইহুল্লোড় শুরু হয়েছে। বাড়ির ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা বরকে গেটে আটকিয়েছে টাকার জন্য। সবার মুখে হাসি। আনন্দ আর ঠাট্টা। ঠিক সেই মুহূর্তেই ভেতরে রিদিকে কনে সাজানো হচ্ছে। পার্লারের দুইজন মেয়ে নিপুণ হাতে তাকে সাজিয়ে তুলছে। কিন্তু রিদির মনে হচ্ছে। তার পরনে লাল বেনারসি নয়। বরং শুভ্র সাদা কাফনের কাপড় পরানো হচ্ছে। সাজানো শেষ করে পার্লারের মেয়েরা চলে গেল। আয়নায় নিজেকে দেখে রিদির নিজেরই চেনা দায়। রিদিকে একদম আসমান থেকে নেমে আসা পরীর মতো লাগছে। শরীরে দামি দামি গহনা। পরনে জমকালো বেনারসি শাড়ি। দুই হাত ভর্তি মেহেদি আর চুড়ি। মাথার গোলাপ দিয়ে করা বড় খোঁপার ওপর দামি ম্যাচিং করা ঘোমটা। সব মিলিয়ে সে এখন আস্ত একটা কনে। রাবেয়া এহসান রুমে ঢুকে নিজের মেয়েকে এই সাজে দেখে আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি রিদিকে বুকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। রিদি কান্না করল না। বরং ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলল।

“কাঁদছো কেন মা? আমি চলে যাব সেই কারণে? তোমরা তো এটাই চেয়েছিলে যে আমি চলে যাই। হ্যাঁ মা। আমি অনেক দূরে চলে যাব। অনেক দূরে যেখানে চাইলেও তোমরা আর এই পাগলিটাকে কোনোদিন দেখতে পারবে না।”

রাবেয়া এহসান কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বললেন।

“চলে যাবি মানে? আমি সাদ বাবাকে বলবো সপ্তাহে সপ্তাহে যেন তোকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসে। না আসলে আমি নিজেই তোর শ্বশুরবাড়িতে চলে যাবো।”

রিদি হাসলো। তার অবুঝ মা তার গূঢ় কথাটি ধরতেই পারল না। রাবেয়া এহসান অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। ঘরের উৎসবের আমেজ যেন তাকে টেনে নিয়ে গেল। সবাই বেরিয়ে গেল নতুন বরকে এক পলক দেখার জন্য। রিদি নিঝুম পাথরের মতো একা বসে রইল। কিছুক্ষণ পর রুমে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলেন সাহেরা চৌধুরী আর তাঁর পিছু পিছু শুভ্রা। সাহেরা চৌধুরী সরাসরি রিদির সামনে এসে ওর দুমড়ানো বেনারসির কাঁধটা শক্ত করে ঝাঁকিয়ে বললেন।

“কী হয়েছে কী তোর? তুই না শুভ্রকে ভালোবাসিস? এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি আমার ছেলেকে? এখন অন্য কাউকে হাসিখুশি বিয়ে করছিস? তার মানে এতদিন যা করেছিস সব নাটক ছিল?”

সাহেরা চৌধুরী অস্থির হয়ে পড়েছেন। তিনি জানেন শুভ্র রিদির জন্য কতটা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। রিদির যদি আজ সত্যি বিয়ে হয়ে যায়। তবে তাঁর ছেলেটা যে জীবন্ত লাশ হয়ে যাবে তা মায়ের মন কু গাইছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে যে তিনি কিছুই করতে পারছেন না। রিদি সাহেরা চৌধুরীর কথা শুনে খিলখিল করে হেসে দিল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। ছিল এক বিভীষিকাময় সুর যা পুরো ঘরে প্রতিধ্বনি তুলল। ওকে এভাবে পাগলের মতো হাসতে দেখে শুভ্রা ভয় পেয়ে বলল।

“তুই এভাবে হাসছিস কেন রে রিদি?”

সাহেরা চৌধুরী গলার স্বর চড়িয়ে রাগ নিয়ে বললেন।

“খুব আনন্দ লাগছে তোর। তাই না? যেই দেখেছিস ছেলে অনেক বেশি সুন্দর আর হ্যান্ডসাম। অমনি আমার ছেলেকে ভুলে নাচতে নাচতে বিয়েতে বসে পড়লি? তাহলে কি তুই শুধু বাইরের চামড়ার সুন্দরটাই চিনলি?”

সাহেরা চৌধুরীর চোখে স্পষ্ট ঘৃণা আর রাগ। তিনি মনে মনে ভাবছেন সাদ দেখতে শুভ্রর চেয়েও ফর্সা আর বিত্তশালী। আর এই চাকচিক্য দেখেই হয়তো রিদি খুশিতে আত্মহারা হয়ে শুভ্রকে বিসর্জন দিচ্ছে। সাহেরা চৌধুরীর কথা শুনে রিদি আরও জোরে জোরে হেসে দিল। সেই হাসিতে কোনো সুখ নেই। আছে এক বুক জ্বালাময়ী হাহাকার। সাহেরা চৌধুরীর শরীরটা রিদির হাসিতে রি রি করে উঠল। মেয়েরা যে স্রেফ চামড়ার সৌন্দর্যে কতটা অন্ধ হতে পারে। তা তিনি আজ নিজের চোখে প্রমাণ পেলেন। তিনি সহ্য করতে না পেরে সরাসরি রিদির গালে সপাটে এক থাপ্পড় বসালেন। পুরো ঘরটা এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। সাহেরা চৌধুরী ঘৃণাভরে বললেন।

“নির্লজ্জ মেয়ে। তোকে দেখে আমার ঘৃণা লাগছে। তোর কারণে যদি আমার ছেলের কিছু হয়। তবে মনে রাখিস তোর এই নতুন সংসারেও আমি আগুন লাগিয়ে দেবো।”

বলেই সাহেরা চৌধুরী রাগে কাঁপতে কাঁপতে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলেন। ঠিক তখনই রিদি পিছন থেকে পাগলের মতো হাসতে হাসতে চি-ৎ-কা-র করে উঠল।

“হ্যাঁ মামি। তুমি ঠিকই বলেছো। আমি শুভ্র ভাইয়ের চেয়েও সুন্দর আর ফর্সা ছেলে দেখে পাগল হয়ে গেছি। আরে। কী আছে তোমার ছেলের মাঝে। গায়ের রঙও শ্যামলা। একগুঁয়ে। ঘাড়ত্যাড়া একটা মানুষ। কী আছে তোমার ছেলের মাঝে। কিছুই নেই। কী আছে তোমার ছেলের মাঝে। কী আছে। আহ্হহহ্হহ্হ্।”

কথাগুলো শেষ করতে পারল না রিদি। অট্টহাসির তোড়টা মাঝপথেই হঠাৎ ভেঙে গিয়ে ঘর ফাটানো এক বুকফাঁটা আর্তনা করল। রিদি নিজের লাল বেনারসিটা খামচে ধরে ফ্লোরে বসে পড়ল। এমন জোরে সে ডুকরে কেঁদে উঠল যেন আজ তার কলিজাটা ছিঁড়ে বাইরে চলে আসবে। সাহেরা চৌধুরী দরজার কাছে পাথরের মতো থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। রিদি কাঁদতে কাঁদতে পাগলের মতো চি-ৎ-কা-র করে বলতে লাগল।

“কী আছে তোমার ছেলের মাঝে যে তাকে ছাড়া আমি এক টুকরো শান্তিতে নিশ্বাস নিতে পারছি না মামি। বলো না কী আছে। কী আছে ওই শ্যামলা পুরুষটার মাঝে যার জন্য আমার প্রতিটা রক্তবিন্দু বিষাক্ত হয়ে গেছে। কী আছে তোমার ওই ঘাড়ত্যাড়া ছেলের মাঝে যে তাকে ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের ছায়াও আমি নিজের শরীরের ওপর কল্পনা করতে পারছি না। কী যাদু করেছে সে আমাকে?”

রিদি নিজের বুকটা দুই হাতে আঘাত করতে করতে আবার চেঁচিয়ে উঠল।

“কেন আমি অন্য কাউকে সহ্য করতে পারছি না মামি। কেন আমার মনে হচ্ছে শুভ্র ভাই ছাড়া এই পৃথিবীর বাতাস আমাকে পুড়িয়ে মারছে। কেন এই সুন্দর বর। এই হিরের গয়না আমার কাছে জ্যান্ত শ্মশান মনে হচ্ছে। কী আছে তোমার ছেলের মাঝে যে সে আমাকে মেরে ফেললেও আমি তাকেই চাইছি। কেন আমার এই অবাধ্য মনটা আজও তার ওই নিষ্ঠুর মায়ার কাছেই বন্দি হয়ে আছে?”

সাহেরা চৌধুরী রিদির এমন আর্তনাদ দেখে স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এসে মেঝেতে লুটিয়ে পড়া রিদিকে শক্ত করে জাপটে ধরলেন। রিদি তখন একদম ছোট বাচ্চাদের মতো ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে সাহেরা চৌধুরীর শাড়ি খামচে ধরে বলতে লাগল।

“আহহহহ মামি। আমি আর পারছি না। তোমার ছেলেকে বলো না আমাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে? আমি তো আজও তার পথ চেয়েই বসে আছি। ও যেন খবর পেয়েই চলে আসে মামি। বলো না ওকে আসতে। আমাকে এই জ্যান্ত নরক থেকে নিয়ে যেতে বলো। আমার পৃথিবীর সবটুকু শান্তি যে তোমার ওই একটা মানুষের মাঝে। শুভ্র ভাইকে বলো না আমাকে এসে নিয়ে যেতে।”

সাহেরা চৌধুরী পাথরের মতো থমকে গেলেন। তাঁর চোখের সামনে থেকে কুয়াশা সরে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন। এতক্ষণ রিদির ওই বিদ্রূপের হাসি আসলে নিজেকে আড়াল করার এক করুণ দেয়াল ছিল। তিনি তড়িঘড়ি করে রিদিকে সোজা করে বসালেন এবং নিজের আঁচল দিয়ে ওর চোখের লোনা পানি মুছতে মুছতে ভাঙা গলায় বললেন।

“আমাকে ক্ষমা করে দে মা। আমি বুঝতে পারিনি। আমি তোকে না বুঝে অনেক বড় আঘাত দিয়ে ফেলেছি।”

রিদি তখন সাহেরা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে একদম হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার কান্নার বেগে শুভ্রার চোখও ভিজে এল। রিদি কাঁদতে কাঁদতে হিক্কা তুলে বলতে লাগল।

“আমি পারছি না মামি। আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি। সবাই আমাকে আজ অনেক হাসিখুশি দেখছে। কিন্তু আমি ভালো নেই। প্রতিটা সেকেন্ডে আমি নতুন করে মরে যাচ্ছি। এই সাজ। এই আলো সবই আমাকে দাহ করছে মামি।”

রিদির চোখের পানিতে সাহেরা চৌধুরীর শাড়ির কাঁধ ভিজে একাকার। কান্নার তোড়ে রিদির সযত্নে করা বিয়ের সাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চোখের কাজল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। সাহেরা চৌধুরীও আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তিনিও রিদিকে বুকে চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। রিদি কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল।

“যাকে ভালোবেসে পাওয়া যায় না। সেই কষ্ট হয়তো মেনে নেওয়া যায় মামি কিন্তু আমি তো শুভ্র ভাইকে পেয়েছিলাম। তাঁর ওই নির্লিপ্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আমি পুরো জগত দেখেছিলাম। সেই মানুষটাকে নিজের করে পেয়েও এভাবে হারিয়ে ফেলা আমি কীভাবে সইবো। তোমার ছেলেটা আমাকে মেরে ফেলল মামি। কেন সে আমাকে একটুখানি ভালোবাসার মায়া দেখিয়ে চিরকালের মতো একা করে দিল। কেন আমাকে ছেড়ে গেল। কেন একটুখানি আমায় ভালোবাসলো না। এত ভালোবেসেও কেন আমি বিনিময়ে একটুও ভালোবাসা পেলাম না?”

রিদির কন্ঠস্বর এখন কান্নায় রুদ্ধ হয়ে আসছে। যেন প্রতিটি শব্দের সাথে তার আত্মাটা বের হয়ে আসছে। সে আবার আর্তনাদ করে বলল।

“তোমার ছেলে কেন এত আসক্তি মামি। সে দূরে গেলে ঘৃণার বদলে আমি তাকে আরও হাজার গুণ বেশি ভালোবেসে ফেলি। তোমার ছেলের মাঝে এমন কী মোহ আছে যে অবহেলার মাঝেও তাকেই সব থেকে বেশি আপন লাগে। তোমার ছেলে কেন এত আবেগ মাখা মামি। তাকে দেখলেই আমার সব আবেগ জমে পাথর হয়ে যায় কেন। বলো না মামি কেন।”

রিদির অবস্থা তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। কাঁদতে কাঁদতে প্রায় জ্ঞান হারানোর উপক্রম। ওর বুকফাটা কান্নার শব্দ শুনে সোহান চৌধুরী আর ইকবাল এহসান দ্রুত রুমে ঢুকলেন। নিজের আদরের মেয়েকে এভাবে মেঝেতে লুটিয়ে কাঁদতে দেখে ইকবাল এহসান পাথরের মতো থমকে দাঁড়ালেন। তিনি রিদির কাছে গিয়ে ওকে টেনে সোজা করে দাঁড় করালেন। রিদি তখন দিশেহারা। নিজের হূঁশ হারিয়ে সে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে জীবনের শেষ আকুতি নিয়ে রিদি বলল।

“আব্বু। আমাকে বিয়ে দিও না। আমি শুভ্র ভাইকে অনেক ভালোবাসি আব্বু। শুভ্র ভাইকে ছাড়া আমি অন্য কোনো পুরুষকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে পারব না। আমি মরে যাব আব্বু। হয় আমার শুভ্র ভাইকে এনে দাও। না হয় নিজের হাতে আমার গলা টিপে আমায় মেরে ফেলো।”

হুট করে রিদির এমন পাগলামি দেখে ইকবাল এহসান আর সোহান চৌধুরী চমকে উঠলেন। নিচে তখন কাজি সাহেব কনেকে ডাকার তাগাদা দিচ্ছেন। বিয়ের লগ্ন বয়ে যাচ্ছে। আর ঠিক এই মুহূর্তে রিদি আবার সেই পুরনো জেদ ধরে বসেছে। সোহান চৌধুরী পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে রুম থেকে কৌতূহলী আত্মীয়স্বজনদের মিথ্যা কথা বলে বের করে দিলেন। তিনি রিদির দিকে তাকিয়ে কড়া স্বরে বললেন।

“রিদি। তুই কি এটাকে ছেলেখেলা পেয়েছিস? নিচে শয়ে শয়ে আত্মীয়স্বজন। বর সাদ বসে আছে। আর তুই এখন এই সব পাগলামি করছিস? পাগলামি থামা রিদি। অনেক হয়েছে।”

রিদি কান্না থামাল না। বরং ওর কান্নার বেগ আরও বেড়ে গেল। সে ঝাপসা চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে বলল।

“আমাকে একটু বাঁচতে দাও তোমরা। কেন এভাবে তিলে তিলে মেরে ফেলছ আমাকে? একটু বাঁচতে দাও না আমায়?”

দরজার ওপাশ থেকে তখন বরপক্ষের লোকজন আর কাজি সাহেব বারবার তাড়া দিচ্ছেন কনেকে নিচে নিয়ে যাওয়ার জন্য। পুরো বাড়ির উৎসবের শব্দ রিদির কানে বিষের মতো বাজছে। ইকবাল এহসান মেয়ের মুখটা দুহাতে তুলে ধরলেন। ধরা গলায় তিনি বললেন।

“মা আমার। কেন এমন পাগলামি করছিস? দেখ নিচে তোর শ্বশুরবাড়ির লোকজন। তোর হবু স্বামী বসে আছে। এসব কথা এখন জানাজানি হলে অনেক বড় গণ্ডগোল হয়ে যাবে। পাগলামি করিস না মা। কান্না থামা। সব ঠিক হয়ে যাবে। সাদ অনেক ভালো ছেলে। সবাই ওর প্রশংসা করছে। দেখিস। তুই অনেক সুখী হবি সাদের সাথে।”

রিদি কিছুক্ষণ নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হঠাৎ তার কান্না থেমে গেল। এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা গ্রাস করল তাকে। সে রক্তবর্ণ চোখে সোহান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে একদম নিচু স্বরে বলল।

“মামা। একটা শেষ ইচ্ছা পূরণ করবে? আমি না শুভ্র ভাইয়ের সাথে একটু কথা বলতে চাই। উনাকে একটু ফোন দেবে? তোমাদের সামনেই কথা বলবো। কিন্তু এই বিয়ে বা এসব নিয়ে কিছুই বলবো না। একদম স্বাভাবিক কয়েকটা কথা বলবো।”

রিদির এই করুণ আকুতি দেখে সাহেরা চৌধুরী আর সইতে পারলেন না। তিনি ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। সোহান চৌধুরী কিছুক্ষণ থমকে থেকে ভাবলেন। তারপর পকেট থেকে ফোন বের করে শুভ্রর নাম্বারে কল দিলেন। কিন্তু ওপাশ থেকে সেই চিরচেনা যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

“দুঃখিত। আপনি যে নাম্বারে কল দিচ্ছেন সেটি বর্তমানে বন্ধ আছে। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করুন। ধন্যবাদ।”

সোহান চৌধুরী একবার নয়। পর পর পাঁচবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু ফোন বন্ধই রইল। পাশ থেকে শুভ্রা ভেজা গলায় বলল।

“চেষ্টা করে লাভ নেই আব্বু। ভাইয়ার ফোন বন্ধ।”

রিদি কথাটা শুনে ঠোঁটের কোণে এক টুকরো ম্লান হাসি ফোটাল। শেষ মুহূর্তে মানুষটার কণ্ঠস্বরটাও তার ভাগ্য সইল না। সে নিজের চোখের পানি সজোরে মুছে সবার দিকে তাকিয়ে বলল।

“একটু ইমন আর আম্মুকে আসতে বলো।”

শুভ্রা দ্রুত গিয়ে ইমন আর রাবেয়া এহসানকে ডেকে আনল। রিদি ছোট ভাই ইমনকে জড়িয়ে ধরে আবার ডুকরে কেঁদে উঠল। ইমনও তার আপুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল।

“আপু। তুমি কেঁদো না। আমি সাদ ভাইয়ার সাথে কথা বলে আসলাম। উনি অনেক ভালো। আমায় অনেক আদর করেছেন। দেখো। তোমাকেও অনেক আদর করবে। তুমি কষ্ট পেও না আপু।”

রিদি কোনো উত্তর দিল না। শুধু ইমন কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। তারপর সে রাবেয়া এহসানকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল। শুভ্রাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল। রুমের প্রতিটি মানুষের বুক ফেটে যাচ্ছিল রিদির এই বিদায়ি আলিঙ্গন দেখে। সবার থেকে আলাদা হয়ে রিদি তার চোখের জল মুছে ফেলে শান্ত স্বরে বলল।

“আমি একটু ওয়াশরুমে যাবো।”

সোহান চৌধুরী চিন্তিত চোখে শুভ্রাকে ইশারা দিলেন রিদির সাথে যেতে। শুভ্রা রিদির হাত ধরে ওয়াশরুমের দরজা পর্যন্ত নিয়ে গেল। রিদি ধীরস্থির পায়ে ভেতরে ঢুকল এবং সজোরে দরজাটা আটকে দিল। খিল আটকে দেওয়ার শব্দটা পুরো রুমে প্রতিধ্বনি তুলল। সবাই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করতে থাকল। এভাবে পাঁচ মিনিট কেটে গেল। কিন্তু রিদি বের হচ্ছে না। নিচ থেকে মানুষের তাড়া আর সানাইয়ের শব্দ যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। শুভ্রার বুকের ভেতরটা হঠাৎ অজানা আশঙ্কায় ধক করে উঠল। সে ওয়াশরুমের দরজায় জোরে কড়া নেড়ে বলল।

“রিদি। শুনতে পাচ্ছিস? হয়েছে তোর? অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে তো।”

কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই। কোনো পানির শব্দ নেই। কোনো নড়াচড়া নেই। এভাবে দশ মিনিট পার হয়ে গেল। এবার সবাই অস্থির হয়ে উঠল। সোহান চৌধুরী আর ইকবাল এহসান দরজায় পাগলের মতো ধাক্কাতে লাগলেন। চি-ৎ-কা-র করে রিদিকে ডাকতে লাগলেন। কিন্তু ভেতরটা যেন কবরের মতো নিস্তব্ধ। রুমের ভেতর লোকজনের চিল্লাহাল্লা আর কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে রাসেল হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকল। রাসেলের মনটা এমনিতেই ছ্যাঁকা খাওয়া অবস্থায় ছিল নিজের প্রিয় ক্রাশের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে অন্য কোথাও। এই কষ্ট সে সইবে কী করে। কিন্তু সবাইকে ওয়াশরুমের দরজায় এভাবে আছাড়িপিছাড়ি খেতে দেখে সে ঘাবড়ে গিয়ে বলল।

“কী হয়েছে? আপনারা সবাই এভাবে ওয়াশরুমের দরজা ধাক্কাচ্ছেন কেন?”

ইকবাল এহসান অস্থির হয়ে রাসেলের হাত চেপে ধরে আর্তনাদ করে বললেন।

“বাবা রাসেল। একটু দরজাটা ভেঙে দাও না। ভেতরে রিদি। ও দরজা খুলছে না। কোনো শব্দও করছে না। আমার খুব ভয় করছে রে বাবা।”

“কী বলছেন এসব।”

রাসেল আর দেরি করল না। সে পাগলের মতো দরজায় কাঁধ দিয়ে ধাক্কাতে লাগল। মুখে রিদির নাম নিয়ে বারবার চি-ৎ-কা-র করছে সে। কিন্তু কোনো উত্তর নেই। শেষমেশ রাসেল আর একটা ছেলে মিলে জানপ্রাণ দিয়ে দরজায় শেষ ধাক্কাটা দিল। কড়াত করে শব্দ হয়ে ছিটকিনিটা ভেঙে গেল এবং দরজাটা হাট হয়ে খুলে গেল। ভেতরের দৃশ্যটা দেখামাত্রই সবার চোখ কপালে উঠল। ঘরের বাতাস যেন এক নিমেষে জমাট বেঁধে গেল। রিদি ওয়াশরুমের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আছে। তার সেই দামি লাল বেনারসিটা মেঝেতে ছড়িয়ে আছে রক্তের মতো। রিদির ফর্সা মুখটা নীলচে হয়ে গেছে। আর তার মুখ থেকে সাদা ফিনকির মতো তরল ফেনা বের হচ্ছে। বিষের উগ্র গন্ধে পুরো ওয়াশরুমটা ভরে গেছে। ইকবাল এহসান কলিজা ফাটা এক চি-ৎ-কা-র দিয়ে মেয়ের নিথর দেহের ওপর আছড়ে পড়লেন।

“রিদিইইইইইইইই। মা আমার। কথা বল। চোখ মেল মা।”

মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়ির উৎসবের আলো যেন নিভে গেল। সবাই রিদির নিথর দেহের ওপর পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। রাবেয়া এহসান মেয়ের এই অবস্থা দেখে কলিজা ফাটা এক চি-ৎ-কা-র দিয়ে ওখানেই জ্ঞান হারালেন। চারদিকে তখন এক বীভৎস হাহাকার। শুভ্রা কাঁপতে কাঁপতে রাসেলের হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে ঈশানকে কল করল। খবর পাওয়া মাত্র ঈশান পাগলের মতো গাড়ি চালিয়ে রিদিদের বাড়িতে ছুটে আসল। সে ওয়াশরুমে ঢুকে রিদির অবস্থা দেখে পাথরের মতো থমকে গেল। সে মনে মনে যা সন্দেহ করেছিল। তা-ই হলো। জেদি মেয়েটা সত্যিই নিজেকে শেষ করে দিল। লাল বেনারসি পরা রিদি যেন এক টুকরো নিথর মার্বেল পাথরের মতো পড়ে আছে। বাড়ির লোকজন হুড়োহুড়ি করে রিদিকে পাঁজাকোলা করে ধরে হাসপাতালের দিকে ছুটল। এদিকে বরপক্ষ তো দারুণ ক্ষেপে গেছে। তারা চি-ৎ-কা-র করে বলতে লাগল যে। মেয়ের অমতে এভাবে জোর করে বিয়ে দেওয়া অপরাধ। তারা পুলিশের হুমকি পর্যন্ত দিয়ে বরের গাড়ি ঘুরিয়ে সজোরে গেট দিয়ে বেরিয়ে চলে গেল। পুরো ঘর তখন বিলাপের শব্দে ভারি হয়ে আছে। ঈশানের চোখ হঠাৎ ওয়াশরুমের বেসিনের ওপর পড়ল। সেখানে ধবধবে সাদা দুটি কাগজ নিখুঁতভাবে ভাঁজ করে রাখা। শুভ্রার চোখও সেখানে পড়ল। ঈশান এক বুক আতঙ্ক আর কাঁপা কাঁপা হাতে কাগজ দুটো হাতে নিল। সে বুঝতে পারল। এই কাগজগুলো শুধু সাদা পাতা নয়। এগুলো রিদির শেষ আর্তনাদ। ঈশান প্রথম কাগজটা ধীরে ধীরে খুলে পড়তে শুরু করল।

রানিং….!

৫৫ পর্বে চিঠির অংশ আছে,,পরে দিবো আর কালকে অনলাইনে আমি আসি নাই,আমার পেইজের মডারেটর পোস্ট করে কালকে তোমাদের গ্রুপে নিছে,কারন তোমরা কেউ গ্রুপে যাওনা কারনে😫😫

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply