Golpo romantic golpo অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়

অসম্ভব রকম ভালোবাসি পর্ব ৪৭ ( সারপ্রাইজ পর্ব)


অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়

লেখিকাসুমিচৌধুরী

অসম্ভব রকম ভালোবাসি পর্ব ৪৭ ( সারপ্রাইজ পর্ব)

গুনে গুনে তিনটা দিন পার হয়ে গেল। শুভ্র এই শহরের প্রতিটি ধূলিকণা তন্নতন্ন করে খুঁজেছে। কিন্তু রিদির কোনো অস্তিত্বই সে পাচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে রিদি যেন এই শহর থেকেই বিলীন হয়ে গেছে। শুভ্র এখন আর সেই দাপুটে মাফিয়া নেই। সে এখন পাবনার পাগলা গারদের কোনো উন্মাদের মতো হয়ে গেছে। খাওয়া-দাওয়া নেই। নিজের শরীরের প্রতি কোনো যত্ন নেই। তার ধ্যান-জ্ঞান শুধু রিদিকে খুঁজে বের করা। রাত হলে ক্লান্তিতে রাস্তার ধারের কোনো গাছের কোণায় শরীরটা এলিয়ে দিচ্ছে। আবার চোখ মেলতেই সেই পাগলামি তাকে তাড়া করে ফিরছে।

কিন্তু তার এই বিধ্বস্ত শরীর আর কত সইবে। হারতে তো তাকে হবেই। যেখানে সে অসম্ভবকেও সম্ভব করে ফেলে সেখানে তিন দিন ধরে নিজের সমস্ত ক্ষমতা লাগিয়েও সে রিদির নাগাল পাচ্ছে না। শুভ্রর ভেতরের মানুষটা ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে রিদিকে যদি কেউ বের করে দিতে পারে তবে তা একমাত্র তার পরিবার।

তিন দিন ধরে অনাহারী দুর্বল শরীর নিয়ে রাতের অন্ধকারে ঈশানকে সাথে করে শুভ্র শহরের সবচেয়ে বড় ক্লাবে এসে হাজির হলো। তার উদ্দেশ্য একটাই। বুকের ভেতরের এই হাহাকার আর কষ্টগুলোকে একটু শান্তির জন্য বিসর্জন দেওয়া। ক্লাবে তখন উন্মাতাল পরিবেশ। লাল-নীল বাতির ঝিলিক। স্টেজে গান চলছে। ছেলে-মেয়েরা ড্যান্স ফ্লোরে নাচছে। চারদিকে ড্রিংকসের গ্লাসের টুংটাং শব্দ।
হঠাৎ ক্লাবের এই জাঁকজমকের মাঝে শুভ্রর মতো এক জীবন্ত লাশকে দেখে ঈশান আঁতকে উঠল। সে অস্থির হয়ে বলল।

“বস আপনি এখানে কেন? এই অবস্থায় আপনার রেস্ট দরকার?”

শুভ্র কোনো উত্তর দিল না। তার সেই শূন্য আর ডার্ক দৃষ্টি ক্লাবের ভিড়ের মাঝে ঘুরতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে সে এক যুবকের সামনে এসে দাঁড়াল যে একা বসে খুব আয়েশ করে ড্রিংক করছে। ছেলেটা এমনভাবে চুমুক দিচ্ছে যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার খাচ্ছে। শুভ্র তার সেই হাড় জিরজিরে হাতটা দিয়ে ছেলেটার পিঠে সজোরে একটা চাপড় দিল। তারপর খসখসে গলায় জিজ্ঞেস করল।

“এই কী আছে এতে যে এত আয়েশ করে খেতে হয়?”

ছেলেটা ঝাপসা চোখে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে একটা মাতাল হাসি দিল। তারপর আধো-োলা গলায় বলল।

“আরে ইয়ার এতে যা আছে তা পৃথিবীর কোনো দামি খাবারেই নেই। এক চুমুক দিলেই বুঝবি দুনিয়াটা কত সুন্দর”

শুভ্র ড্রিংকের বোতলটা হাতে তুলে নিল। বোতলের গায়ের ঠান্ডা জলকণা তার তপ্ত হাতের তালু স্পর্শ করল। সে বোতলটার দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় প্রশ্ন করল।

“তার মানে এইটা খেলে কী হয়? কলিজার ভেতরের আগুন কি নেভে?”

যুবকটা গ্লাস নাড়াতে নাড়াতে বলল।
“এইটা খেলে সব কষ্ট ভুলে থাকা যায়। দুনিয়ার সব চিন্তা হাওয়া হয়ে যায় ভাই”

কথাটা শেষ হতে না হতেই শুভ্র দাঁত দিয়ে বোতলের ছিপিটা খুলে ফেলল। তারপর এক মুহূর্ত দেরি না করে ঢকঢক করে গলায় ঢালতে শুরু করল। ঈশান পাশে দাঁড়িয়ে আঁতকে উঠল। সে পাগলের মতো শুভ্রকে থামাতে গিয়ে চিৎকার করে বলল।

“বস স্টপ বস। প্লিজ থামুন। আপনার এই শরীর সইবে না”

কিন্তু শুভ্র থামছে না। পুরো এক বোতল শেষ করে সে শূন্য বোতলটা পাশে ছুড়ে মারল। তার এমনিতে লাল হয়ে থাকা চোখ দুটো এখন টকটকে আগুনের গোলার মতো দেখাচ্ছে। সে টলমল পায়ে ওয়েটারের কাছে গিয়ে তার কলার চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে কর্কশ গলায় বলল।

“আমাকে এর থেকেও বড় কিছু দেন। যা খেলে সামান্য হলেও এই বুকে শান্তি পাবো। এইটুকু নেশায় আমার কিচ্ছু হচ্ছে না”

ওয়েটার শুভ্রর সেই বিধ্বংসী আর ডার্ক রূপ দেখে ভয়ে কুঁকড়ে গেল। সে কাঁপাকাঁপা হাতে শুভ্রর সামনে একদম কড়া আর ডার্ক ড্রিংকস এনে দিল। শুভ্র পাগলের মতো আবার খেতে শুরু করল। ঈশান কিছুতেই তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। সে অসহায় ভাবে শুভ্রর হাত টেনে ধরে বলল।

“বস প্লিজ। আপনি এমনিতেই তিন দিন ধরে না খেয়ে দুর্বল হয়ে আছেন। তার ওপর এসব বিষাক্ত নেশা জিনিস প্লিজ থামুন”

শুভ্র শেষ ঢোকটা গলায় ঢেলে দিয়ে ধীরগতিতে ঈশানের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই চাহনি দেখে ঈশানের রক্ত হিম হয়ে গেল। শুভ্র একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বিষাদমাখা গলায় বলল।

“প্রিয় মানুষের চেয়ে বড় কোনো নেশা আছে নাকি ঈশান? রিদি নামের নেশাটা যে আমার রক্তে মিশে আছে তার কাছে এই বিষ তো সামান্য জল মাত্র”

ঈশান পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে জানে শুভ্রর ভেতরটা এখন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি যেখানে প্রতি মুহূর্তে রিদির স্মৃতিরা লাভা হয়ে ঝরছে। শুভ্র যে ভালো নেই সে কথা ঈশানের চেয়ে ভালো কেউ জানে না। কিন্তু তার করারই বা কী আছে। যে মানুষ নিজেই নিজের ধ্বংস কামনা করে তাকে বাঁচানোর সাধ্য কার।

শুভ্র তখন নেশার ঘোরে আর শরীরি দুর্বলতায় টলছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন ভারসাম্যহীনতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ। সে টলতে টলতে ভিড় ঠেলে সরাসরি স্টেজের ওপর উঠে গেল। সেখানে একটা ছেলে তখন চোখ বন্ধ করে মনের সুখে গিটার বাজাচ্ছিল আর গান গাইছিল। ক্লাবের রঙিন আলোগুলো ছেলেটার ওপর পড়ছিল।

শুভ্র স্টেজে উঠেই কোনো কথা নেই বার্তা নেই হিংস্র এক বাঘের মতো ছেলেটার হাত থেকে গিটারটা সজোরে এক টান দিয়ে ছিনিয়ে নিল। ছেলেটা অপ্রস্তুত হয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। গানের সুর মাঝপথেই থেমে গেল। ক্লাবের মিউজিক আর মানুষের গুঞ্জন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে এল। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে এই বিধ্বস্ত উশকোখুশকো আর ডার্ক চেহারার মানুষটার দিকে।

শুভ্রের চোখ দুটো আজ অস্বাভাবিক রক্তবর্ণ যেন কোনো এক আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভা সেই মণি দুটোর ভেতর টলমল করছে। দীর্ঘ নির্ঘুম রাত আর মনের ভেতরে পুষে রাখা অসহ্য দহনে তার চোখের পাতাগুলো ফুলে একাকার হয়ে আছে। গায়ের কালো শার্টের সামনের দুইটা বোতাম খোলা। বুকের কাছে ঘাম আর ধুলোর আস্তর। তার উশকোখুশকো চুলগুলো অবিন্যস্তভাবে কপালে আর কানে লেপ্টে আছে যা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে এখন আর স্বাভাবিক জগতের কোনো বাসিন্দা নয়। এক ভয়ংকর এবং অতিরিক্ত ডার্কনেস তাকে গ্রাস করে নিয়েছে। তার চেহারার করুণ আর শূন্য ভাবটা দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক অবুঝ শিশু তার সবচেয়ে প্রিয় খেলনাটা চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে এবং সেই হারানোর বিষাক্ত যন্ত্রণায় সে তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তার ঠোঁট দুটো ফ্যাকাশে। চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে আছে এক অব্যক্ত জেদে।

ঠিক তখনই ক্লাবের মিউজিক দানবীয় শব্দে বেজে উঠল। শুভ্র টলমল পায়ে শরীরের সবটুকু ভারসাম্যহীনতা নিয়ে হেলতে দুলতে স্টেজের মাঝখানে রাখা মাইক্রোফোন স্ট্যান্ডের সামনে এসে দাঁড়াল। হাতে তার কালো গিটার যা আজ তার যন্ত্রণার একমাত্র সাক্ষী। তাকে মঞ্চে এই অবস্থায় দেখে ক্লাবের মেয়েরা উন্মাদনায় চিৎকার করে উঠল। কিন্তু সেই কোলাহল শুভ্রের কানে পৌঁছাল না। সে ধীরস্থিরভাবে গিটারটা কাঁধে ঝুলিয়ে ঠিক করে ধরল।

তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এল। এক মুহূর্তের জন্য যেন তার নিশ্বাস থমকে গেল। ঠোঁট দুটো অবাধ্য হয়ে কাঁপতে লাগল। গিটারের তারে একটা সজোরে আর কর্কশ ঝংকার তুলে সে সুর বাঁধল। সেই সুর যেন এক বিলাপ। তারপর মাইক্রোফোনের একদম কাছে মুখ নিয়ে গিটার বাজাতে বাজাতে তার কলিজা ছিঁড়ে আসা এক বুক হাহাকার নিয়ে সে গেয়ে উঠল।

“কি হবে কাঁন্দিয়া মনের খাঁচা ভাঙ্গিয়া”
“উইড়া গেছে প্রাণের বিন্দিয়া”
“আদর যতন করিয়া বুকে রাখলাম জড়াইয়া”
“পুষ মানলো না গেল উড়িয়া”
“ও পাখি পুষ মানলো না গেল উড়িয়া”

শুভ্রের আঙুলগুলো গিটারের তারের ওপর উন্মাদের মতো আছড়ে পড়ছে। তার প্রতিটি আঙুলের ছোঁয়ায় গিটারের তারগুলো যেন যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠছে। আর সেই কম্পনে তার হৃদয়ের গভীর ক্ষতগুলো থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তার সেই ভাঙা খসখসে অথচ দরাজ কণ্ঠস্বর যখন পুরো ক্লাবে ছড়িয়ে পড়ল তখন চারদিকের সব হুল্লোড় আর নাচানাচি মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। গানের প্রতিটি সুরে ঝরে পড়ছিল এক এক ফোঁটা নীল বিষাদ। সে কোনো যন্ত্র বাজাচ্ছে না বরং গিটারের তার দিয়ে নিজের কলিজার ক্ষতগুলো খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সুর বের করছে। তার চোখ ফেটে তখন তপ্ত জল নামার উপক্রম। কিন্তু সে পাথরের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে গিটার বাজিয়ে শূন্যতায় সেই হাহাকার বিলিয়ে দিচ্ছে।

শুভ্রকে স্টেজে দেখে পুরো ক্লাবের পরিবেশে যেন এক নিমিষেই বিদ্যুদ্বেগে বদলে গেল। যারা একটু আগে নাচে মত্ত ছিল তারা সবাই স্থির হয়ে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে রইল। ভিড়ের মধ্য থেকে ফিসফাস আর অস্ফুট চিৎকার ভেসে আসতে লাগল। এক দল মেয়ে তখন বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে একে অপরের গায়ে চিমটি কাটছে।

একজন তো রীতিমতো চিৎকার করে উঠল।
“আরে এটা তো সাইফান শুভ্র চৌধুরী যে কিছুদিন আগে কুয়েত স্টেজে গান গেয়ে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ওর ওই ভিডিওটা তো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল।”

আরেকটা মেয়ে উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে বলল।
“আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না যে সামনে থেকে শুভ্রকে দেখছি। উফফ কুয়েতে কি গানটাই না গেয়েছিল। ওর স্টাইল আর গান গাওয়ার ভঙ্গি দেখে আমি তো ফিদা হয়ে গিয়েছি রে”

তার পাশের জন শুভ্রের সেই ডার্ক আর বিধ্বস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে বুঁদ হয়ে বলল।
“উফফ কি হ্যান্ডসাম। আর দেখ কেমন নেশালো পাগল পাগল লাগছে ওকে। উফ বান্ধবী প্লিজ একটু কথা বলিয়ে দিবি?।”

মেয়েরা যখন শুভ্রকে নিয়ে এমন উন্মাদনায় আর আলোচনায় ব্যস্ত শুভ্র তখন এই পৃথিবীর কোনো শব্দই শুনতে পাচ্ছে না। সে তার মতো কষ্ট বিসর্জন দিয়ে হাহাকারে গান গেয়ে যাচ্ছে। তার এই গান ক্লাবের অনেকে মন দিয়ে শুনছে।

গানটা শেষ হওয়া মাত্রই পুরো ক্লাবে যেন এক প্রবল বিস্ফোরণ ঘটল। মেয়েরা উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠল। হাততালিতে ফেটে পড়ল চারপাশ। কিন্তু শুভ্র। সে তো তখন এই জগতের কোনো কিছুর মাঝেই নেই। শরীরের ভেতর তপ্ত ড্রিংকসের নেশা আর হৃদয়ের ভেতরে রিদির বিরহের বিষ এই দুই মিলে তাকে এক চরম ঘোরে নিয়ে গেছে। শুভ্র টলমল পায়ে মাইক্রোফোন স্ট্যান্ডটা খামচে ধর। মাইক্রোফোনের একদম কাছে মুখ নিয়ে সমস্ত শক্তি দিয়ে পাগলের মতো চিৎকার করে বলতে লাগল।

“আই লাভ ইউ রিদিইইই। আই লাভ ইউ সো মাচ।”

শুভ্রের সেই গগনবিদারী চিৎকারে পুরো ক্লাব যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। যে মেয়েরা এতক্ষণ তাকে নিয়ে রঙিন স্বপ্নে বিভোর ছিল তারা একদম হা হয়ে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল। তাদের বুঝতে বাকি রইল না যে এই নেশালো ডার্ক চেহারার মানুষটার হৃদয়ে অন্য কারো রাজত্ব। মুহূর্তেই অনেক মেয়ের মন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কিন্তু জেদটা মরল না। তারা ভাবল প্রেমিকা থাকুক আর না থাকুক এমন একটা হট ছেলের সাথে অন্তত একটা ছবি বা কয়েকটা কথা তো বলতেই হবে।

শুভ্র তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সে মাতাল অবস্থায় টলতে টলতে ডিজে-র দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় চিৎকার করে বলল।

“মিউজিক প্লে ইট লাউড”

শুভ্রের হুকুম পাওয়া মাত্রই ক্লাবে তারস্বরে হাই-বিটের ডিজে মিউজিক বেজে উঠল। লে পাগলু ড্যান্স ড্যান্স গানের সেই উন্মাতাল তাল শুরু হতেই শুভ্রর ভেতরের সেই দমে থাকা ডার্কনেস যেন এক অদ্ভুত বন্যতায় রূপ নিল। সে গিটারটা একপাশে ছুড়ে মারল। শার্টের বাকি বোতামগুলো ছিঁড়ে ফেলার মতো করে খুলে শার্টটা খুলে ফেলল। তারপর সেটা কোমরে পেঁচিয়ে শক্ত করে একটা গিট্টু দিল।

হাতে মাইক্রোফোনটা নিয়ে শুভ্র পুরো স্টেজ জুড়ে নাচতে শুরু করল। তার সেই নাচে কোনো তাল নেই নিয়ম নেই আছে শুধু এক অস্থির মুক্তি। সে গানের সাথে তাল মিলিয়ে যেমন খুশি তেমন নাচতে নাচতে চিৎকার করে গেয়ে উঠল। স্টেজটা যেন শুভ্রর পায়ের তলায় কাঁপছে। শুভ্রর সেই বন্য আর পাগলামি ভরা নাচ দেখে পুরো ক্লাবে মুহূর্তেই ঝটকা লেগে গেল।

এতক্ষণ যারা বিষাদে ডুবে ছিল তারাও শুভ্রর এনার্জি দেখে ড্যান্স ফ্লোরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। অনেক নেশাখোর ছেলে তো উত্তেজনায় স্টেজে উঠে শুভ্রর সাথে তাল মিলিয়ে উদ্দাম নাচ শুরু করে দিল। শুভ্রর শরীরের প্রতিটি ভাঁজে তখন ঘাম চিকচিক করছে। চুলগুলো কপালের ওপর লেপ্টে আছে। আর সেই রক্তবর্ণ চোখে এক পৈশাচিক আনন্দ। শুভ্রর সেই দুর্ধর্ষ ড্যান্স দেখে নিচ থেকে মেয়েরা চিৎকার করে উঠল।

“এ বাবা এ তো ড্যান্সও পারে। উফফ দেখ বান্ধবী ও কি মুভস দিচ্ছে। পুরাই আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে স্টেজে”

নাচ শেষ হতেই শুভ্রর শরীরের অবশিষ্ট শক্তিটুকু যেন নিমিষেই কর্পূরের মতো উবে গেল। সে ডার্কনেসের এক গভীর নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে স্টেজের ওপর ঢলে পড়ল। ঈশান এক মুহূর্ত দেরি না করে ভিড় ঠেলে দৌড়ে স্টেজে উঠে শুভ্রকে জড়িয়ে ধরল। তার চোখেমুখে তখন তীব্র দুশ্চিন্তা। সে শুভ্রকে শক্ত করে ধরে কাঁপা গলায় বলল।

“বস আপনি ঠিক আছেন তো? কী করছেন এসব? কেন নিজের সাথে এই পাগলামি করছেন?”

শুভ্র তখন জ্বরে পোড়া রোগীর মতো কাঁপছে। তার চোখ দুটো আধবোঁজা। ঈশানের শার্টের কলারটা খামচে ধরে একদম ছোট শিশুর মতো করুণ স্বরে বলল।

“ঈশান আমার রিদিকে এনে দাও না। আমার না অনেক কষ্ট হচ্ছে । ও কোথায়? এভাবে কেন আমাকে ছেড়ে গেল? আমি যে ওকে ছাড়া নিশ্বাস নিতে পারছি না”

ঈশানের বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু তার কাছে কোনো উত্তর নেই। সে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুভ্রকে ধরে ধরে স্টেজ থেকে নামাতে লাগল। শুভ্র তখন এতই মাতাল যে যেকোনো সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। নিচে নামা মাত্রই একদল মেয়ে মৌমাছির মতো শুভ্রকে ঘিরে ধরল। তাদের হাতে মোবাইল ফোন। সবারই উদ্দেশ্য এই ভাইরাল হিরোর সাথে একটা ছবি তোলা। একটা মেয়ে খুব আবদার করে বলল।

“স্যার প্লিজ জাস্ট একটা ছবি। না করবেন না প্লিজ আমরা আপনার অনেক বড় ফ্যান”

শুভ্র টলতে টলতে মাথা তুলে মেয়েটার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই হাহাকার দেখে যে কেউ শিউরে উঠবে। শুভ্র অস্ফুট স্বরে বলল।

“একটা না হাজারটা ছবি তুলতে দিবো। শুধু আমার রিদিকে এনে দাও”

মেয়েটা একদম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে হতবাক হয়ে বলল।
“হোয়াট কে রিদি?”

ঈশান মেয়েদের ভিড় সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করার চেষ্টা করতে করতে বলল। “এক্সকিউজ মি বস এখন নিজের মাঝে নেই। দয়া করে আপনারা পথ ছাড়ুন ওনাকে গাড়িতে নিতে দিন”

কিন্তু মেয়েরা নাছোড়বান্দা। আরেকটা মেয়ে একটু স্টাইল করে শুভ্রর একদম কাছে এসে তার কাঁধ ছুঁয়ে বলল।
“এই হিরো ছবি না দাও অন্তত ফোন নাম্বারটা কি দেওয়া যাবে?”

শুভ্র একটা ম্লান হাসি দিল যে হাসিতে শুধু বিষাদ মাখানো। সে মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।

“আমার নাম্বার? আমি এই শহরের সব ছেলের নাম্বার এনে দিবো। শুধু তোমরা আমার রিদিকে এনে দাও। ও ছাড়া আমার পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে আছে”

শুভ্রর এমন অদ্ভুত আর পাগলামি ভরা কথা শুনে মেয়েরা একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল। তারা ফিসফাস করে বলাবলি করতে লাগল।

“পাগল নাকি এই লোকটা? স্টেজে উঠেও রিদিকে আই লাভ ইউ বলল আর এখন বলছে রিদিকে এনে দাও। কে এই রিদি? যে এই হ্যান্ডসাম আর পাওয়ারফুল ছেলেটাকে রাস্তায় নামিয়ে দিচ্ছে।”

রানিং…!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply