লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ৪৩
ঈশান গাড়ি থেকে নেমে এল। কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকারের আবছায়া আলোয় রিদির ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকিয়ে সে বিস্ময় আর আতঙ্ক মেশানো গলায় বলল।
“রিদি, তুমি এই রাতে এই জনমানবহীন রাস্তায় একা দাঁড়িয়ে ছিলে? ভয় করছিল না তোমার?”
রিদি কোনো দিকে তাকাল না। তার স্থির দৃষ্টি তখন শুভ্রর চোখের ওপর নিবদ্ধ। সে খুব ছোট করে, নিস্পৃহ গলায় জবাব দিল।
“একটুও না।”
ঈশান অবিশ্বাসের সুরে পুনরায় শুধাল।
“কিন্তু তুমি বের হলে কীভাবে? তোমাকে তো আমরা বাড়িতেই দেখলাম না।”
রিদি শীতল গলায় বলল।
“পেছনের বাগানের ছোট দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসেছি।”
শুভ্রর ধৈর্যের শেষ সীমাটুকুও যেন পার হয়ে যাচ্ছে। ফ্লাইটের সময় এগিয়ে আসছে, আর রিদি এখানে নিজের জীবন বাজি রেখে তামাশা করছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে চরম রুক্ষ স্বরে বলল।
“থাপ্পড় খেতে না চাইলে এখনই বাড়ি যা রিদি। আমি বলছি, যা এখান থেকে!”
রিদি এক ইঞ্চিও নড়ল না। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বলল।
“থাপ্পড় খাব, কিন্তু বাড়ি যাব না।”
শুভ্রর কপাল বেয়ে এক চিলতে ঘাম গড়িয়ে পড়ল। তার ভেতরের সেই ভয়ংকর রাগটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সে রিদির খুব কাছে এগিয়ে গিয়ে তার চোখের মণি বরাবর তাকিয়ে হিসহিসিয়ে বলল।
“রিদি, আমার রাগ তুই খুব ভালো করেই জানিস। ওটা তুলাবি না। ফল কিন্তু একদম ভালো হবে না।”
রিদি ম্লান হাসল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে এক গভীর বিষাদ আর জেদ। সে শুভ্রর বুকে নিজের হাত রেখে শান্ত কিন্তু পৈশাচিক এক দঢ়তা নিয়ে বলল।
“কী করবেন আপনি? মেরে ফেলবেন? তবে মেরেই চলে যান। আপনি যাওয়ার পর এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে আপনার হাতে মরে যাওয়া অনেক বেশি শান্তি।”
শুভ্রের কলিজাটা ধক করে উঠল। বুকের ভেতরটা এক তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে গেল তার, সেই অসহ্য ব্যথায় ঠিকমতো শ্বাসটুকু নিতেও যেন কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল। সে দাঁত দিয়ে নিজের ঠোঁট এত জোরে কামড়ে ধরল যে রক্ত বের হওয়ার উপক্রম। তার শরীর রাগে আর অস্থিরতায় কাঁপছে। শুভ্র তার হাড়হিম করা দৃষ্টি ঈশানের দিকে ফিরিয়ে এক ভয়াবহ শান্ত গলায় বলল।
“ঈশান, ওকে এখান থেকে যেতে বলো। ওকে যেতে বলো ঈশান, নাহলে আজ আমি সত্যিই ওকে মে’রে ফেলব। আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছি না।”
ঈশান পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রিদির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সে মিনতিমাখা স্বরে বোঝানোর চেষ্টা করল।
“রিদি, প্লিজ এমন পাগলামি করো না। বাসায় চলে যাও। বস তো মাত্র কিছুদিনের জন্যই কুয়েত যাচ্ছেন, কাজ শেষ হলেই ফিরে আসবেন। কেন ঝামেলা বাড়াচ্ছো?”
রিদি এক চুলও নড়ল না। তার চোখের মণি তখন বিষাদে টলমল করছে, কিন্তু কণ্ঠস্বর ইস্পাতের মতো শক্ত। সে সরাসরি ঈশানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।
“না, আপনি মিথ্যা বলছেন ঈশান ভাই। উনি আমাকে চিরতরে ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। আমি খুব ভালো করে জানি, আজ উনি একবার গেলে আর সহজে ফিরে আসবেন না। উনি পালাচ্ছেন আমার কাছ থেকে।”
শুভ্রের ধৈর্যের প্রতিটি বাঁধ যেন আজ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। তার মনে হচ্ছে কেউ তার ফুসফুস চেপে ধরেছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে দুহাতে নিজের কপাল টিপে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে কয়েকটা দীর্ঘ আর তপ্ত শ্বাস নিল। নিজেকে চরমভাবে সংযত করার এক ব্যর্থ চেষ্টা করে সে পুনরায় রিদির দিকে তাকাল। এবার তার গলার স্বর অস্বাভাবিক রকমের শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির পেছনে এক ভয়ংকর ঝড় লুকিয়ে আছে। সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল।
“রিদি, শেষবারের মতো বলছি পাগলামি করিস না। বাড়ি যা।”
রিদি স্থির দৃষ্টিতে শুভ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। তার কণ্ঠে কোনো কম্পন নেই, বরং এক অদ্ভুত জেদ খেলা করছে। সে অটল স্বরে বলল।
“বাড়ি গেলে আপনাকেই নিয়ে যাব। চলেন, যেতে হবে না। এত টাকা কামিয়ে কী করবেন? যে টাকা আপনাদের আছে, তাতে আপনার, আমার আর মামা-মামির সাত জনম অনায়াসে চলে যাবে তবুও মনে হবে না যে অর্ধেক শেষ হয়েছে।”
শুভ্রর ভেতরের সেই দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা রাগটা আর নিয়ন্ত্রণে থাকল না। সে ক্ষিপ্ত হয়ে রিদির দিকে তেড়ে গেল এবং তাকে থাপ্পড় মারার জন্য হাত উঁচাল। কিন্তু মাঝপথেই তার হাতটা বাতাসের মধ্যে স্থির হয়ে গেল। এক অসহ্য যন্ত্রণায় শুভ্রর হাতটা সেখানেই মুঠো হয়ে কাঁপতে লাগল। সে পারছে না, এই মায়াবী মুখটার ওপর নিজের কঠোর হাত চালাতে সে কিছুতেই পারছে না।রিদি ভয়ের বদলে এক পৈশাচিক তৃপ্তি নিয়ে হেসে ফেলল। তার সেই ম্লান হাসিতে বিষাদের ছায়া স্পষ্ট। সে শুভ্রর ওই থেমে যাওয়া মুষ্টিবদ্ধ হাতের দিকে তাকিয়ে বলল।
“থামালেন কেন? মারেন। একটা নয়, হাজারটা মারেন। দরকার পড়লে মেরেই ফেলেন, তবু আমি এখান থেকে এক কদমও নড়ব না। আপনার এই মার খাওয়াটাও আমার কাছে আপনার ছেড়ে যাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি সম্মানের।”
শুভ্র শেষ হয়ে যাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে বুকের ভেতরটা কেউ ধারালো কোনো অস্ত্র দিয়ে অবিরত খুঁচিয়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে, আর কিছুক্ষণ এভাবে থাকলে তার সমস্ত কাঠিন্য ধূলিসাৎ হয়ে যাবে; সে হয়তো এই রাস্তার মাঝখানেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়বে। শুভ্র আর কথা বাড়াতে চাইল না। সে জানে, এই মায়ার বাঁধন কাটতে হলে তাকেই নিষ্ঠুর হতে হবে।
শুভ্র নিঃশব্দে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে উঠতে নিল। কিন্তু ঠিক তখনই তার পিঠের দিক থেকে শার্টে একটা টান পড়ল। সে ঘাড় বাঁকিয়ে দেখল, রিদি তার শার্টের কাপড়টা মুচড়ে ধরে আছে। রিদি ধরা গলায় ডুকরে কেঁদে উঠে বলল।
“আমাকে ছেড়ে যাবেন না শুভ্র ভাই। বিশ্বাস করুন আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি।”
শুভ্র মুহূর্তের মধ্যে চোখ সরিয়ে নিল। তার হৃৎপিণ্ডটা যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। রিদি আজ তাকে পাগল করে ফেলবে একদম নিশ্চিতভাবে উন্মাদ বানিয়ে ছাড়বে। শুভ্রর কপাল বেয়ে নোনা ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। সে গাড়ির জানালার কাঁচের ওপর কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে রইল। তার কণ্ঠস্বর এখন এতটাই ভাঙা যে মনে হচ্ছে ভেতর থেকে কেউ আর্তনাদ করছে। সে ঈশানের উদ্দেশ্যে আর্তনাদ স্বরে বলল।
“ঈশান, ‘আই জাস্ট কান্ট ডু দিস এনিমোর’। আমি আর পারছি না ঈশান। প্লিজ কিছু একটা করো। ওকে এখান থেকে সরাও। ‘জাস্ট গেট হার অ্যাওয়ে ফ্রম মি।”
ঈশান রিদির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখেমুখেও এখন চরম অস্থিরতা। সে রিদির শার্ট আঁকড়ে ধরা হাতটার ওপর নিজের হাত রেখে শান্ত করার গলায় বলল।
“রিদি, ‘প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড’, আমাদের অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। বস তোমাকে ছেড়ে একদম হারিয়ে যাচ্ছে না, সে ঠিক চলে আসবে। আমি প্রমিস করছি রিদি, যদি বস সময়মতো ফিরে না আসে, তবে আমি নিজে তোমাকে বসের কাছে পাঠিয়ে দেব। ‘জাস্ট ট্রাস্ট মি দিস ওয়ান টাইম’।”
রিদি তবুও শুভ্রর শার্ট ছাড়ল না। তার অবচেতন মন বারবার বলছে আজ এই হাত ফসকে গেলে এই পুরুষটি চিরতরে অন্য দিগন্তে মিলিয়ে যাবে। এক সময় ঈশান নিরুপায় হয়ে জোর করেই রিদির হাতের মুঠি থেকে শুভ্রর শার্ট ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। মাঝরাস্তায় শুরু হলো এক অদ্ভুত ধস্তাধস্তি। শুভ্র এতক্ষণ পাথরের মতো জানালার কাঁচের ওপর কপাল ঠেকিয়ে ছিল। কিন্তু হুট করেই সে প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতায় ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো এখন টকটকে লাল। সে সরাসরি রিদির কবজি চেপে ধরে আর্তনাদ করে বলে উঠল।
“ওকে, ‘ফাইন’! যাব না আমি। ‘আই অ্যাম নট গোয়িং এনিহয়ার’। চল আজ তোর সাথে বাসর করব। দুইটা বাচ্চা দিয়ে তারপর যাব। তখন তুই ঘরে বসে বাচ্চা সামলাবি আর আমি বিদেশে গিয়ে ‘ফুল এনজয়’ করব। চল, আজ আর কুয়েত যাওয়া হবে না!”
বলেই শুভ্র রিদিকে এক প্রকার হ্যাঁচকা টানে রাস্তা দিয়ে বাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগল। ঈশান একদম স্থাণু হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল। সে যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। বস কি আসলেই ফ্লাইট মিস করে ফিরে যাচ্ছে? আর শেষে কী বলল? বাসর করবে? এই কঠোর বস আবার বাসর করার রোমান্টিকতাও জানে নাকি!
এদিকে রিদি মনে মনে খুশিতে আত্মহারা। সে ভেবে নিল শুভ্র সত্যিই হয়তো যাবে না। শুভ্রর রাগ উঠেছে ঠিকই, কিন্তু সে তো বাড়িতে ফিরে যাচ্ছে! বাড়ির গেটের একদম কাছাকাছি আসার পর শুভ্র হঠাৎ থেমে গেল। তার দৃষ্টি এখন অস্বাভাবিক স্থির। সে রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।
“তুই কি জানি বলছিলি রিদি? ‘ইউ ওয়ান্ট মি টু ফরগিভ ইউ’, তাই না? তুই আমার কাছে মাফ চাস?”
রিদি হন্তদন্ত হয়ে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। শুভ্রর ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় আর শীতল হাসি ফুটে উঠল। সে পুনরায় বলল।
“ঠিক আছে, যা তোকে আমি মাফ করে দেব। তবে ‘আই হ্যাভ আ কন্ডিশন’। একটা শর্তে তোকে ক্ষমা করব।”
রিদি এক মুহূর্ত না ভেবেই বলল।
“কী শর্ত? আমি আপনার সব শর্ত মানতে রাজি আছি শুভ্র ভাই। শুধু বলেন আপনি কী চান?”
শুভ্র তার হাত দুটো পকেটে পুরে নিল। এক পৈশাচিক নির্দয়তা নিয়ে সে রিদির দিকে তাকিয়ে বলল।
“এখানে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বিশ বার কান ধরে উঠবস কর। এখনই করবি। ‘ইফ ইউ ডু দিস’, তবেই আমি তোকে মাফ করব। নাহলে কোনোদিন তোর মুখ আমি দেখব না।”
রিদি অবিশ্বাসের চোখে শুভ্রর দিকে তাকালো। তার কণ্ঠে এক বুক আশা আর বুকচাপা কান্না দলা পাকিয়ে আছে। সে ধরা গলায় শুধাল।
“সত্যি? আমি যদি উঠবস করি তাহলে আপনি আমাকে মাফ করবেন? আমাকে ছেড়ে যাবেন না তো শুভ্র ভাই? ‘প্রমিস মি’?”
শুভ্র পকেটে দুই হাত গুঁজে একদম পাথরের মূর্তির মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখেমুখে কোনো ভাবান্তর নেই। সে শীতল গলায় আদেশের সুরে বলল।
“না, ‘জাস্ট ডু ইট’। তুই আগে উঠবস কর।”
রিদি কালবিলম্ব না করে সাথে সাথেই কান ধরে উঠবস করতে শুরু করল। তার মনে হলো এই সামান্য শাস্তির বিনিময়ে যদি সে শুভ্রর ক্ষমা আর সান্নিধ্য পায়, তবে সে হাজার বার এটা করতে রাজি। শুভ্র নির্লিপ্ত মুখে সংখ্যা গুনতে লাগল।
“ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর, ফাইভ…”
পাঁচ পর্যন্ত গুনার পরই শুভ্র অত্যন্ত সুকৌশলে রিদির অজান্তেই পা টিপে টিপে পেছাতে শুরু করল। রিদি তখন নিজের অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাওয়ার নেশায় মত্ত, সে বুঝতেই পারছে না তার পরম নির্ভরতার মানুষটি তার সাথে এক নিষ্ঠুর খেলায় মেতেছে। শুভ্র সংখ্যা গুনে যাচ্ছে আর রিদির থেকে দূরত্ব বাড়াচ্ছে। রিদি যখন ঠিক পনেরো নম্বর উঠবসটি দিতে যাবে, ঠিক তখনই শুভ্র আচমকা ঘুরে এক দৌড় দিল।
রিদির হৃৎপিণ্ডটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে যেন নড়ার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। সে হা করে তাকিয়ে দেখল শুভ্র বিদ্যুৎগতিতে দৌড়ে গিয়ে এক লাফে গাড়িতে উঠে পড়ল। শুভ্রর সেই নেশাল চোখের জায়গায় এখন এক তীব্র জেদ। সে গাড়িতে বসেই ঈশানের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল।
“ঈশান, ‘গেট ইন ফাস্ট’! স্টার্ট দাও!”
ঈশান হন্তদন্ত হয়ে গাড়িতে উঠতেই শুভ্র নিজেই স্টিয়ারিং দখল করে নিল। সে এক্সিলারেটরে সজোরে চাপ দিল। গাড়িটা এক বিকট শব্দ করে মাটির রাস্তা থেকে ধুলো উড়িয়ে তীরের মতো ছুটে বেরিয়ে গেল। শুভ্রর গাড়ি চালানোর ধরন দেখে ঈশান ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। গাড়িটা এখন যেন বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে উড়ছে। সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল।
“বস, ‘প্লিজ স্লো ডাউন’! বস আস্তে!”
এদিকে রিদি যখন বুঝতে পারল গাড়িটা সত্যিই তাকে ফেলে চলে যাচ্ছে, সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। একরাশ হাহাকার আর আর্তনাদ নিয়ে সে পাগলের মতো গাড়িটার পিছু পিছু দৌড় শুরু করল। সে চিৎকার করে ডাকতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। তার মনে হলো কেউ তার জ্যান্ত কলিজাটা শরীর থেকে ছিঁড়ে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।
রিদি কতটুকুই বা দৌড়াতে পারত? মুহূর্তের মধ্যেই গাড়িটা তার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেল। ভোরের ওই কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকারে গাড়িটা এক সময় বিন্দুতে পরিণত হয়ে মিলিয়ে গেল। চারপাশটা হঠাৎ করে বড্ড বেশি নিস্তব্ধ হয়ে এল। রিদি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার সমস্ত শক্তি যেন এক নিমিষে নিঃশেষ হয়ে গেল। সে মাঝরাস্তায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার সেই বুকফাটা আর্তনাদ ভোরের আকাশ-বাতাসকে ভারী করে তুলল।
রিদি রাস্তার ধুলোবালির ওপর এক জীবন্ত লাশের মতো বসে রইল। তার চোখ দুটি স্থির হয়ে আছে সেই শূন্য রাস্তার দিকে, যেখান দিয়ে একটু আগেই তার পৃথিবীটা তাকে ফেলে ধুলো উড়িয়ে পালিয়ে গেছে। সে অস্ফুট স্বরে, ভাঙা গলায় শূন্যের উদ্দেশে বলে উঠল।
“বাচ্চা সেজে রাস্তার পথ আটকালাম, আর আপনি চকোলেটের লোভ দেখিয়ে মাঝরাস্তায় আমাকে একা ফেলে দিয়ে চলে গেলেন শুভ্র ভাই? এত বড় নিষ্ঠুরতা আপনি কীভাবে পারলেন?”
অঝোরে ঝরতে থাকা চোখের জলগুলো এখন গালের ওপর শুকিয়ে লবণের রেখা তৈরি করেছে। দীর্ঘক্ষণ একাকী সেই জনমানবহীন পথে কান্নাকাটি করার পর, অবশ শরীরটা টেনে হিঁচড়ে রিদি বাড়ির ভেতরে ঢুকল।
উঠোনে তখন থমথমে পরিবেশ। বাড়ির সবাই যেন এক সারিতে দাঁড়িয়ে তার জন্যই অপেক্ষা করছিল। রিদিকে দেখামাত্রই ইকবাল এহসান দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন। তার চোখেমুখে উৎকণ্ঠা আর চাপা ক্রোধের সংমিশ্রণ। তিনি গর্জে উঠে বললেন।
“কোথায় গিয়েছিলি এত রাতে তুই?”
রিদি কোনো উত্তর দিল না। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার দৃষ্টি এখন হাড়হিম করা শূন্য। মনে হচ্ছে সে এই পৃথিবীতে নেই, অন্য কোনো এক অন্ধকার জগতে হারিয়ে গেছে। রিদির এই নির্বাক থাকা দেখে এবার রাবেয়া এহসান কড়া পায়ে এগিয়ে এলেন। তিনি রিদির দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে সজোরে ঝাঁকিয়ে উঠলেন।
“শুনতে পাসনি তোর আব্বু কী বলছে? মুখ খোল! কোথায় গিয়েছিলি এই নিশুতি রাতে?”
রাবেয়া এহসানের কণ্ঠস্বর উঠোনের নিস্তব্ধতা চিরে যেন এক চিলতে আগুনের মতো ঝরল। রিদি তবুও নড়ল না। তার সমস্ত অস্তিত্ব তখন কেবল একজোড়া হেডলাইটের আলো আর একটা কর্কশ ইঞ্জিনের শব্দের মধ্যে আটকে আছে।
মাহবুব চৌধুরী ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। চারপাশের থমথমে পরিস্থিতিটা সামাল দেওয়ার জন্য তিনি শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বললেন।
“আহ থাম! এখন অনেক রাত হয়েছে। এভাবে চিল্লাচিল্লি করলে গ্রামের মানুষ নানা কথা বের করবে। কোথায় গিয়েছিল না গিয়েছিল, সব প্রশ্ন সকালেই করিস। এখন আর সিন ক্রিয়েট করিস না।”
মাহবুব চৌধুরীর কথায় রাবেয়া এহসান আর কথা বাড়ালেন না, তবে তার চোখমুখ থেকে ক্ষোভ কমল না। ইকবাল এহসান রিদির দিকে এক বিষাক্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কঠিন গলায় বললেন।
“রুমে যা। তোর ভাবসাব আমি দুদিন ধরে দেখছি রিদি। যদি উল্টাপাল্টা কিছু শুনি, তবে আমার চেয়ে খারাপ কিন্তু আর কেউ হবে না। মাথায় রাখিস কথাটা।”
বলেই ইকবাল এহসান গটগট করে নিজের রুমে চলে গেলেন। তার দেখাদেখি বাড়ির বাকি সবাই একে একে অন্ধকারের মাঝে বিলীন হয়ে গেল। উঠোনটা মুহূর্তেই জনশূন্য হয়ে পড়ল। রিদি যেন এক যান্ত্রিক পুতুল, পা টেনে টেনে সে নিজের রুমে এসে ঢুকল।
রুমে হালকা নীল বাতি জ্বলছে। শুভ্রা তখন সব দুশ্চিন্তার ঊর্ধ্বে থেকে অঘোরে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। রিদি আলগোছে বিছানার এক কোণে গিয়ে বসল। চারপাশের দেয়ালগুলো যেন তাকে গিলে খেতে আসছে। মস্তিষ্কের ভেতর কেবল একটা কথাই হাতুড়ি পেটা করছে শুভ্র কি তবে সত্যিই চলে গেল? সে কি আদৌ তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে? নাকি এই বিচ্ছেদটাই ছিল তার শেষ চাল?
ভাবতেই রিদির বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। সে নিজের মুখটা হাঁটুতে গুঁজল। কোনো শব্দ ছাড়াই তার শরীরটা বার বার কেঁপে উঠতে লাগল। নিস্তব্ধ ঘরে কেবল তার ফুঁপিয়ে ওঠার শব্দটুকু দেওয়ালে আছড়ে পড়তে লাগল।
‘
‘
‘
‘
কেটে গেছে দীর্ঘ দুটো দিন। এই ৪৮ ঘণ্টায় একটিবারের জন্যও শুভ্রর কোনো হদিস মেলেনি। সোহান চৌধুরী কয়েকবার কল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ওপাশ থেকে সেই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ‘ফোনটি বন্ধ আছে’। তিনি আর কথা বাড়াননি। শুভ্রর এই পুরনো অভ্যাসটা তার জানা সে সীমানা পেরোলে দুনিয়া থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে ভালোবাসে। নিজের একাকীত্বে কেউ বাগড়া দিক, সেটা সে একদমই সয় না।
কিন্তু এই দুদিন রিদির জন্য যেন একেকটা অনন্তকালের সমান। প্রতিটা সেকেন্ডে সেকেন্ডে শুভ্রের অবয়ব তাকে তাড়া করে বেড়ায়। এক মুহূর্তের জন্য হলেও তার গলার স্বর শোনার জন্য ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। ঠিকমতো খাওয়া নেই, কারো সাথে দুটো কথা বলা নেই সারাক্ষণ কেবল নির্জীবের মতো এক জায়গায় বসে থাকা। রিদির এই ভুতুড়ে পরিবর্তন বাড়ির সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। যে মেয়েটা দুদিন আগেও বাড়ি মাতিয়ে রাখত, সে হঠাৎ কোন জাদুমন্ত্রে জ্যান্ত লাশ হয়ে গেল, তা কারো মাথায় ধরছে না।
দুপুরবেলা। তপ্ত রোদ জানালা গলে মেঝেতে আছড়ে পড়ছে। রিদির গলাটা তৃষ্ণায় ফেটে যাচ্ছে, তাই এক প্রকার বাধ্য হয়েই সে ড্রয়িং রুমে এল পানির খোঁজে। টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি খেয়ে যখনই সে ফিরে যেতে নিবে, ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন সাহেরা চৌধুরী। রিদিকে দেখামাত্রই তিনি তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠলেন।
“দাঁড়া, রিদি!”
রিদি থমকে গেল। কিন্তু সে কোনো শব্দ করল না, যান্ত্রিক পুতুলের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। সাহেরা চৌধুরী চারপাশটা একবার সন্তর্পণে দেখে নিলেন, তারপর রিদির হাতটা একপ্রকার হ্যাঁচকা টানে ধরে নিজের রুমে নিয়ে এলেন। বিছানায় বসিয়ে শক্ত করে রিদির কাঁধ চেপে ধরলেন তিনি। তার চোখেমুখে অনেক প্রশ্ন জমা হয়ে আছে।
“কী হয়েছে তোর শুনি? খাস না, কথা বলিস না, সারাক্ষণ একভাবে চুপচাপ থাকিস। সমস্যাটা কী তোর?”
রিদি কোনো উত্তর দিল না। সে মাথা নিচু করে নিজের আঙুল খুঁটতে লাগল। এই মুহূর্তে নিজের মনের ক্ষতগুলো নিয়ে কথা বলা মানেই নিজেকে আরও বেশি দুর্বল করে ফেলা। কিন্তু সাহেরা চৌধুরী ছাড়ার পাত্রী নন। তিনি রিদির থুতনি ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরলেন। তার দৃষ্টি এখন হাড়হিম করা স্থির।
“কী হলো? কথা বলছিস না কেন? আমাকে বল কী হয়েছে তোর?।”
রিদি তবুও কিছু বলল না। সে একদম পাথরের মূর্তির মতো সাহেরা চৌধুরীর সামনে বসে রইল। তার এই অস্বাভাবিক নীরবতা সাহেরা চৌধুরীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব নিচু স্বরে, এক প্রকার নিশ্চিত হয়েই শুধালেন।
“শুভ্রের জন্য মন খারাপ লাগছে?”
ঠিক এই একটা বাক্যই যেন কাজ করল জাদুর মতো। এতক্ষণের জমে থাকা পাথরটা মুহূর্তেই গলতে শুরু করল। রিদি যেন এক জ্যান্ত লাশ থেকে হঠাৎ জীবন ফিরে পেল। সে কোনো কিছু না ভেবেই সাহেরা চৌধুরীর কোমর জড়িয়ে ধরে মুখ লুকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার সেই কান্নায় ছিল গত দুদিনের জমাটবদ্ধ হাহাকার।
সাহেরা চৌধুরী যা বোঝার বুঝে গেলেন। তাঁর মাতৃত্বের টান আজ এই অবুঝ মেয়েটার কান্নায় সায় দিল। তিনি রিদির মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত করার গলায় বললেন।
“কাঁদিস না রে মা! এর জন্য কেউ এভাবে মন খারাপ করে? ও কি আর চিরদিনের জন্য চলে গেছে নাকি? এই তো মাত্র কিছুদিনের ব্যাপার, তারপর দেখবি ঠিকই তোর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।”
রিদি ডুকরে কেঁদে উঠে ঝাপসা গলায় বলল।
“আমি একটুও ভালো নেই মামি। খুব মনে পড়ছে তোমার ছেলেকে। ‘আই জাস্ট ওয়ান্ট টু টক টু হিম’। একটু কথা বলতে ইচ্ছে করছে। প্লিজ মামি, কোনোভাবে একটু কথা বলিয়ে দেবে ওনার সাথে?”
সাহেরা চৌধুরী অসহায় বোধ করলেন। তিনি রিদির চোখের জল মুছে দিয়ে ধরা গলায় বললেন।
“তুই তো জানিস মা, আমার ছেলেটা একটু অদ্ভুত। বাইরে গেলে ও যেন নিজেকে কোনো এক অজানা দুনিয়ায় লুকিয়ে ফেলে। একা সময় কাটায়। কারো সাথে কথা বলবে না বলেই তো ও নিজের সব ফোন বন্ধ করে রাখে।তুই কাঁদিস না মা, ও ফিরে আসুক তখন দেখবি আমি ওকে অনেক বকা দেব।”
রিদি সাহেরা চৌধুরীর কোমরে মাথা ঘষে পাগলের মতো মাথা নাড়ল। তার বুকের ভেতরটা যেন আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছে। সে আর্তনাদ করে বলল।
“পারছি না মামি, আমি আর পারছি না। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আমার। ‘আই ফিল লাইক আই এম চোকিং’। দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার। কিচ্ছু ভালো লাগছে না মামি, সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।”
সাহেরা চৌধুরী নির্বাক হয়ে রিদির মাথায় হাত বুলাতে থাকলেন। তাঁর নিজের পেটের ছেলেকেও তিনি মাঝে মাঝে চিনে উঠতে পারেন না শুভ্র যেন এক অগাধ রহস্যের আধার। রিদি তখন কান্নায় ভেঙে পড়েছে, তার নোনা জলে সাহেরা চৌধুরীর শাড়ির আঁচল ভিজে একাকার। রিদি ধরা গলায় আবার বলে উঠল।
“মামি, তোমার ছেলে এত পাষাণ কেন? আমার জন্য কি তোমার ছেলের এক ফোঁটাও মায়া হয় না? মায়াহীন মানুষ এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকে কীভাবে মামি? ওনার কি একবারও মনে পড়ছে না যে আমি এখানে ওনার জন্য মরে যাচ্ছি?”
সাহেরা চৌধুরী বিষাদমাখা এক টুকরো মুচকি হাসলেন। এই বোকা মেয়েটা যদি জানত ওই পাষাণ ছেলেটা আড়ালে রিদির জন্য কতটা দগ্ধ হয়! ছেলেটা যে এই অবুঝ মেয়েটাকে কতটা পাগলের মতো ভালোবাসে, তা মা হিসেবে তিনি ঠিকই আঁচ করতে পারেন। তিনি রিদির চোখের জল মুছে দিয়ে পরম মমতায় বললেন।
“শান্ত হ রে মা। মাত্র তো কয়েকটা দিন। দেখিস, এবার ও যখন ফিরে আসবে, তখন আর কোনো দেরি করব না। একদম ঘটা করে তোকে বউ বানিয়ে ঘরে তুলে নেব। তারপর আর ও তোকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না।”
সাহেরা চৌধুরী পরম মমতায় রিদিকে সান্ত্বনা দিতে থাকলেন। রিদির কান্নার বেগটা তখন একটু কমে এসেছে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘরের দরজায় কোনো একটা ভারী জিনিস পড়ার কর্কশ শব্দ হলো। নিস্তব্ধ দুপুরে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দে সাহেরা চৌধুরী আর রিদি দুজনেই তীব্রভাবে চমকে দরজার দিকে তাকালেন।
দরজার দিকে তাকাতেই সাহেরা চৌধুরীর চোখ দুটো বিস্ময়ে আর আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল। তাঁর কপালে মুহূর্তেই ভয়ের রেখা ফুটে উঠল। অন্যদিকে রিদি ভয়ে রীতিমতো কুঁকড়ে গেল। তার বুকের ধকপকানি বেড়ে গেল, সে বড় বড় ঢোক গিলতে লাগল।
রানিং…!
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৯
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৯(সমাপ্ত)
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮১
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে পর্ব ১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৩
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪১
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪০
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৪