Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৪৫


যেখানেপ্রেমনিষিদ্ধ

ইশরাতজাহানজেরিন

পর্ব_৪৫

আরযানের ঘর থেকে একপ্রকার প্রায় উড়ে এসে নিজের ঘরে ঢুকে ধপাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল সাঁঝ। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে সে হাঁপাচ্ছে, বুকের ভেতর হৎস্পন্দন যেন অলিম্পিকের রেস ড্রাম বাজাচ্ছে। ডান পায়ের পাতায় আরযানের সেই আলতো ম্যাসাজ করে দেওয়া জায়গাটাতে এখনো কেমন যেন এক অদ্ভুত উষ্ণ অনুভূতি লেগে আছে। কিন্তু সাঁঝের হঠাৎ মনে পড়ে গেল সবচেয়ে মারাত্মক সত্যিটা আরযান ভাইয়া তো সম্পর্কের দিক থেকে তার রক্তের নিজের আপন চাচাতো ভাই! ছোটবেলা থেকে যে মানুষটাকে কড়া স্বভাবের বড় ভাই হিসেবে দেখে এসেছে, যে ভাইয়ার ভয় দেখিয়ে পুরো মীর বাড়ির ছোটদের শৃঙ্খলায় রাখা হতো, সেই চাচাতো ভাইটির বুকের ওপর এমনভাবে আছড়ে পড়া আর তার সেই বেপরোয়া কড়া অধিকার ভাবতেই সাঁঝের দুই গাল লজ্জায় আর চরম অপরাধবোধে একবারে লাল-গোলাপি হয়ে উঠল।
“আল্লাহ গো! আমি কী করলাম!” সাঁঝ দুই হাতে মুখ ঢেকে খাটের ওপর গিয়ে ধুপ করে বসে পড়ল। “আরযান ভাইয়া তো আমার ভাই! উনি অমন মিষ্টি মিষ্টি ডায়লগ দিয়ে, আমাকে পুরো ছাগল বানিয়ে ফেললেন, আর আমি বোকার মতো উনার বুকে মাথা দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম? কাল সকালে উনি যখন চশমা চোখে সোফায় বসে চা খাবেন, আমি উনার মুখের দিকে তাকাব কীভাবে?”
সাঁঝের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরা ছিল আরযানের সেই কালো রঙের সিক্রেট ডায়েরিটা। সাঁঝ ভেবেছিল ডায়েরি খুললেই হয়তো সিসিটিভি ফুটেজের কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের কথা দেখতে পাবে, কিংবা তার বিরুদ্ধে লেখা কোনো খতরনাক কড়া প্রেসক্রিপশন পাবে। কিন্তু টেবিল ল্যাম্পের আবছা আলোয় ডায়েরির প্রথম পাতাটা উল্টাতেই সাঁঝের চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল!
পুরো ডায়েরির প্রথম পাতায় বোল্ড অক্ষরে আরযানের সেই ধারালো হাতে লেখা, “সাঁঝ তোর জন্য নিষিদ্ধ, এমন অপরাধ যদি আবার করিস মেরে ঠ্যাং গুড়ো করে দিব।”

সাঁঝের বুক কেঁপে উঠল। সারা ডায়েরি খালি আর কেবল একটা কথা লেখা তাও তাকে নিয়ে? এমা ঠ্যাং গুড়ো করলে সাঁঝের প্রেম করার শেষ ইচ্ছে তো কোনোদিন পূরণ হবে না। জীবনে সাঁঝ একটাই ইচ্ছে পূরন করতে চেয়েছিল আর তা হলো কড়া লিকারের মতো কড়া একটা প্রেম করার। ওই স্বৈরাচার ভাইটার জন্য তাও হলো না…..এটা কোনো জীবন হলো? পুরোটাই কেমন যেন চিনি ছাড়া চা। সাঁঝ তো সব ছেড়ে ভালো হয়েই গিয়েছিল তাও কারো জ্বালা কমল না। টিশার্ট ছেড়ে কামিজ ধরেছে, দূরবীন রেখে হাতে তসবি নিয়েছে তাও এই লোকের শাসন কমে না। আবার সে নাকি সাঁঝকে বাঁচানোর জন্য সবাইকে বলেছে সাঁঝ তার হবু স্ত্রী। এ ভাই, ২ দিন পর যখন মিডিয়া দেখবে সাঁঝের বিয়ে হচ্ছে না তখন তো আরযান ভাইয়ের টক্সিক ফ্যানরা ওই বেরসিককে নিয়ে নয় বরং তাকে নিয়েই ট্রল করবে……

রাত তখন প্রায় পৌনে দুইটা। মীর বাড়ির দোতলার শেষ মাথার চার নম্বর বেডরুমের দরজাটা হালকা বাতাসে কাঁপছে। ঘরের ভেতরের আলোটা একদম হালকা গোলাপি রঙের নাইট ল্যাম্পের আলোয় আচ্ছন্ন। পুরো বেডরুমটা আষাঢ়ের কড়া বেলি আর গোলাপ ফুল দিয়ে রাজকীয়ভাবে সাজানো হয়েছে। কিন্তু খাটের ঠিক মাঝখানে বসে থাকা সিয়ার জন্য এই ফুলের গন্ধে ভরা ঘরের বাতাসটাও যেন বোয়িং ৭৭৭ বিমানের জরুরি ল্যান্ডিংয়ের অক্সিজেনের মতো কম মনে হচ্ছিল! সিয়া খাটের একদম এক কোনায়, নিজের হাঁটুর ওপর দুই হাত জড়ো করে ফ্যাকাশে মুখে বসেছিল। তার পরনে এই বাড়িতে এসে পরা সেই গাঢ় লাল রঙের ভারী বেনারসি শাড়ি, মাথায় ঘোমটা টানা। ধানমন্ডির বাড়িতে পা রাখার পর বড় মা আর সেজো মা কত আদর করে বউ বরণ করে নিলেন, কিন্তু সিয়ার মাথায় তখন একটাই চিন্তা ক্যাপ্টেন তাজ! যাকে এতদিন সে ককপিটের ‘চিফ ক্যাপ্টেন’ আর ‘স্যার’ হিসেবে দেখে এসেছে, যার একটা চোখ রাঙানিতে পুরো ফ্লাইটের কেবিন ক্রুরা থরথর করে কাঁপে… সেই খতরনাক, গম্ভীর আর একগুঁয়ে মানুষটা আজ তার বর! সিয়া তাজকে ভালোবাসে, তাকে নিজের খাঁচায় বন্দি করার জন্যই তো প্লেনে ছিঁড়ে যাওয়া জামার ড্রামা আর ইমোশনাল ফাঁদ পেতেছিল। কিন্তু তা বলে মীর তাজ যে তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য, তার অহংকার চূর্ণ করতে সোজা এয়ারপোর্টে কাজী ডেকে এনে এভাবে ‘লকড’ করে ফেলবে, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি! ঠিক তখনই বেডরুমের ভারী কাঠের দরজাটা একটা গম্ভীর শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল! সিয়া শিউরে উঠে এক ঝটকায় মাথা তুলল।
দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং চিফ ক্যাপ্টেন মীর তাজ! পরনে তাঁর এখন আর চার স্ট্রাইপ ওয়ালা অফিশিয়াল শার্ট নেই। গাঢ় নীল রঙের একটা সিল্কের পাঞ্জাবি-পাজামা, হাতের ঘড়িটা খোলা, আর চুলগুলো সামান্য উসকোখুসকো।
তাজ মাপা কদমে খাটের দিকে এগোতে শুরু করল। তার প্রতিটা পদক্ষেপে যেন সিয়ার বুকের ভেতর হাজারটা ককপিটের অ্যালার্ম বেজে উঠছে।
“ক্যা… ক্যাপ্টেন তাজ!” সিয়া বেনারসির আঁচলটা খামচে ধরে ভয়ে তোতলাতে তোতলাতে ব্যাকফুটে হাঁটার চেষ্টা করল। “আপ… আপনি দরজায় খিল দিলেন কেন? মানে… ঘরের ভেতরে ফুল কেন এত? আর আপনি আমার দিকে এভাবে বাঘের মতো তাকিয়ে এগোচ্ছেন কেন?”
তাজ খাটের একদম গা ঘেঁষে দাঁড়াল। সে পাঞ্জাবির হাতার বোতামটা খুলতে খুলতে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলল।
“ক্যাপ্টেন তাজ?” তাজ ভারী আর থমথমে গলায় বলল। সে খাটে এক হাঁটু গেড়ে বসে সিয়ার একদম মুখোমুখি চলে এল। “সকালেই অফিশিয়াল সাইন হয়ে গেছে, মিস সিয়া। এখন বেডরুমে এসেও কি অফিশিয়াল ‘স্যার’ ডাক শুনেই মীর তাজকে ডিউটি পালন করতে হবে?”
সিয়া ভয়ে চোখ দুটো গোল গোল করে সোজাসুজি খাটের কাঠের হেডবোর্ডে গিয়ে পিঠ ঠেকিয়ে দিল। পলায়নের সব রাস্তা বন্ধ!
“আমি… আমি তো আপনাকে স্যার বলেই ডেকে অভ্যস্ত,” সিয়া বুকের ভেতর কাঁপন চেপে বড্ড আদুড়ে আর ভীতিপ্রদ গলায় বলল। “আর আপনি তো আমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্যই এভাবে বিয়েটা করলেন! কিন্তু প্লিজ… আজকে আমাকে ক্ষমা করে দিন! আমি আর কোনোদিন আপনার প্লেনে নাটক করব না, আপনার সাথে উল্টাপাল্টা শর্ত রাখব না… এমনকি ফ্লাইটে জুস ফেলার বাহানায় আপনার গায়েও পড়ব না! প্রমিস!”
তাজ সিয়ার একদম ভেজা গালের কাছাকাছি নিজের মুখটা নিয়ে এল। তাজের কড়া পারফিউমের সুবাস আর গরম নিশ্বাস সিয়ার কানের লতিতে এসে আছড়ে পড়তেই সিয়া চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলল। তার হৃদস্পন্দন তখন অলরেডি তিনশো স্পিডে দৌড়াচ্ছে!
“শাস্তি?” তাজ সিয়ার গালের ওপরে বুড়ো আঙুলটা আলতো করে বুলালো। “তুমি যে ফাঁদ পেতে আমার চার স্ট্রাইপের অহংকার কেড়ে নিতে চেয়েছিলে সিয়া, সেই ফাঁদে তো তোমাকেই সারাজীবনের মতো বন্দি হতে হতো। এখন বাসর রাতে এসে ক্ষমার আবেদন করলে কি ককপিটের ইমার্জেন্সি রুল বাতিল হয়ে যায়?”
সিয়া ভয়ে আর লজ্জায় চোখ বন্ধ রেখেই ফুঁপিয়ে উঠে বলল, “আপনি একটা আস্ত জল্লাদ, তাজ! স্যার বললেও দোষ, না বললেও দোষ! আমি জানতাম আপনি সোজা লোক না! আমাকে মেরে ফেলবেন নাকি আপনি আজ রাতে?”
তাজ সিয়ার এই চরম ভয় পাওয়া আর থরথর করে কাঁপতে থাকা ফুটফুটে মুখটা দেখে নিজের পাথুরে বুকের ভেতর হঠাৎই এক অদ্ভুত হাসির বন্যা টের পেল। তবে সে তো তাজ! এত সহজে শিকারকে ছেড়ে দিলে তার ‘ক্যাপ্টেন’ নামের গাম্ভীর্য কোথায় থাকে?
তাজ হঠাৎ বড্ড ধীর শান্ত ভঙ্গিতে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সিয়া ভয়ে চোখ একটা সামান্য ফাঁক করে দেখল তাজ কী করছে। তাজ খাটের ওপর সাজিয়ে রাখা চারটে গোল লাল-গোলাপি কভারের এক্সট্রা কড়া তুলোর ভারী বালিশের দিকে তাকাল। তারপর এক এক করে চারটে বালিশই একহাতে তুলে নিয়ে সোজা হেঁটে গেল ঘরের এক কোণায় রাখা মখমলের সোফাটার দিকে! তাজ সোফার ওপর বালিশগুলো একে একে কায়দা করে সাজিয়ে রাখল। তারপর সিয়ার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে গম্ভীর ভাবে বলল,
“মিস সিয়া!”
সিয়া খাটের ওপর এক লাফে সোজা হয়ে বসে বেনারসির আঁচল সামলে বলল, “জি… জি স্যার!”
তাজ ঘড়ির দিকে এক নজর তাকিয়ে বড্ড গম্ভীর মুখে বলল, “আকাশে ৩৫ হাজার ফুট উঁচুতে ক্রু হয়ে চিফ ক্যাপ্টেনের গায়ে পড়ার অপরাধের শাস্তি হিসেবে আজকের বাসর রাতে আপনার অফিশিয়াল ডিউটি বরাদ্দ করা হলো ওই সোফায়!”
সিয়া হা করে দাঁড়িয়ে রইল! “কীইইই? সোফায়?”
“ইয়েস,” তাজ বাঁকা হেসে নিজের পাঞ্জাবির ওপরের দুটো বোতাম খুলে ফেলল। “এত বড় বেনারসি শাড়ি পরা বউকে মীর তাজের খাটে জায়গা দেওয়ার মতো উদারতা আজ আমার নাই। সোফায় ওই চারটা এক্সট্রা বালিশ দেওয়া আছে। গিয়ে চুপচাপ ঘুমান। আর হ্যাঁ… রাতে যদি ঘুম না আসে, তবে সোফায় বসেই ককপিটের ম্যানুয়ালটা মুখস্থ করতে পারেন। কাল সকাল ৮টায় অফিশিয়াল ব্রেকফাস্টের আগেই আমি হিয়ারিং নেব!”
সিয়া নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না! সে তো ভেবেছিল তাজ হয়তো আজ তাকে ভালোবাসার সুদে-আসলে চেপে ধরবে, আর লোকটা কিনা বাসর রাতে তাকে বেনারসি পরা অবস্থায় সোফায় চালান করে দিল! সিয়া চোখ বড় বড় করে বলল, “আপনি… আপনি আমাকে এই বেনারসি আর গয়না পরিয়ে সোফায় পাঠাচ্ছেন? আপনি সত্যিই একটা বেরসিক, নিষ্ঠুর আর খতরনাক ককপিটের রোবট!”
তাজ খাটের পরম আরামের ডাবল ম্যাট্রেসে শুয়ে একখানা বালিশ মাথার নিচে দিল। সে চোখ দুটো বুজে পরম শান্তিতে বলল, “একদম ঠিক ধরেছেন, মিস সিয়া। এবার দয়া করে লাইটটা অফ করে সোফায় যান, নইলে কিন্তু সোফা থেকেও ডিপোর্ট করে ফ্লোরে পাঠাব!”
সিয়া রাগে, লজ্জায় আর তাজের এই চরম শয়তানির ওপর দাঁতে দাঁত চেপে একগুচ্ছ বেনারসির কুঁচি সামলে খাট থেকে নামল। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “অসভ্য লোক! জল্লাদ ক্যাপ্টেন! বিয়ের আগে কত ডায়লগ, তুমি আমার খাঁচার কয়েদি’… আর এখন বাসর রাতে সোফায় বালিশ ছুড়ে দিচ্ছে! দাঁড়ান আপনি, কাল থেকে যদি আপনার কফিতে কড়া লবণ না মিশিয়েছি, তবে আমার নামও সিয়া না!”
সিয়া সোফায় গিয়ে ধুপ করে বসে দুটো বালিশ বুকে জড়িয়ে ধরে তাজের দিকে রাগী চোখে তাকাল।

তাজ তখন চাদরটা গায়ে দিয়ে উল্টো দিকে ফিরে চোখ বন্ধ করল।

রাত তখন প্রায় আড়াইটে। মীর বাড়ির তিনতলার একেবারে শেষ প্রান্তের ঘরটা অস্বাভাবিক রকমের শান্ত। জানালার কাঁচে টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। বাইরে দূরে কোথাও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আর ঘরের ভেতর…একটা ভারী শব্দ হতেই তেজ ঘুমের মাঝখান থেকে এমনভাবে লাফিয়ে উঠল যেন কেউ তাকে বিছানা থেকে ছুড়ে ফেলেছে।
“আল্লাহ! ভূমিকম্প!” চোখ বন্ধ রেখেই সে বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরল। তার ঠিক পরের মুহূর্তেই কানের পাশে ভেসে এল পরিচিত সেই দুষ্টু হাসি।
“ভূমিকম্প না, আমি।” তেজ এক ঝটকায় চোখ খুলে তাকাতেই দেখল, আর্যা দু’হাত কোমরে দিয়ে বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর বৃথা চেষ্টা করছে। তার ডান হাতে একটা ছোট্ট বালিশ। তেজের চোখ রাগে কটমট করে উঠল।
“তুমি… আমাকে বালিশ ছুড়ে মারলে?”
আর্যা ভীষণ নিরীহ মুখ বানিয়ে মাথা কাত করল। “আমি?”
“হ্যাঁ, তুমি!”
“প্রমাণ?”
তেজ নিচে তাকাতেই মেঝেতে পড়ে থাকা বালিশটা দেখতে পেল। সে সেটা তুলে ধরে রাগে গর্জে উঠল, “এই যে! এটা কী?”
আর্যা দু’পা এগিয়ে এসে বালিশটার দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ের ভান করে বলল, “ওমা! এটা এখানে এল কীভাবে?”
তেজ অবিশ্বাসে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। “আর্যা…”
“হুম?”
“আমাকে নিয়ে নাটক কোরো না।”
“আমি আবার কবে নাটক করি?”
“চব্বিশ ঘণ্টা!”
আর্যা এবার হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বিছানার এক কোণায় বসে পড়ে বলল, “আচ্ছা, সত্যি বলছি… আমি দেখতে চেয়েছিলাম, তোমাকে জাগাতে কয়টা বালিশ লাগে।”
তেজ কয়েক সেকেন্ড নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে দাঁত চেপে বলল,
“কয়টা লেগেছে?”
আর্যা গম্ভীর মুখে আঙুল গুনতে লাগল। “প্রথমটা বিছানায় পড়ল… তুমি নড়লে না।”
“হুম।”
“দ্বিতীয়টা তোমার পায়ে লাগল… তবুও উঠলে না।”
তেজের কপালের রগ ফুলে উঠল। “তারপর?”
“তৃতীয়টা সরাসরি তোমার পেটে মারতেই ‘ধপ’ করে উঠলে।” কথাটা শেষ করেই সে হো হো করে হেসে উঠল। তেজ গভীর শ্বাস নিল। এক… দুই…তিন… তারপর নিজের মাথায় হাত ঠুকে বলল,
“ইয়া আল্লাহ! আমি কী পাপ করেছিলাম?”
আর্যা মিষ্টি করে হেসে বলল, “আমাকে বিয়ে করেছ।”
“এটাই তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা।”
“ধন্যবাদ।”
“ধন্যবাদ কেন?”
“দুর্ঘটনা হলেও তো জীবনের সবচেয়ে বড়।”
তেজ এবার সত্যিই কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর খুঁজে পেল না।
সে বিরক্ত হয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বিড়বিড় করল,
“তোমার সঙ্গে তর্ক করা মানে দেয়ালের সঙ্গে ক্রিকেট খেলা।”
আর্যা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, “তবুও তো প্রতিদিন খেলো।”
“কারণ পালানোর রাস্তা নেই!”
“আছে।”
তেজ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “কোথায়?”
আর্যা নিজের দুই হাত মেলে দিয়ে দুষ্টু হেসে বলল,
“এই যে… আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ো। তাহলে আমি আর বিরক্ত করব না।”
তেজ এমনভাবে তাকাল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে আজব কথা শুনেছে। “অসম্ভব।”
“কেন?”
“কারণ তুমি পাঁচ মিনিট পর আবার কোনো দুষ্টুমি করবে।”
আর্যা নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে ধরল। “আমার ওপর এত অবিশ্বাস?”
“একশো ভাগ।”
“দুইশো ভাগ করো।”
“তিনশো ভাগ।”
“আরও বাড়াও।”
“পাঁচশো ভাগ!” আর্যা হঠাৎ এত জোরে হেসে উঠল যে হাসতে হাসতেই বিছানার ওপর গড়িয়ে পড়ল।
তেজ বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু আর্যার সেই প্রাণখোলা হাসিটা দেখে নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল। আর্যা সেটা চোখ এড়াতে দিল না। সে মুহূর্তেই হাসি থামিয়ে উঠে বসল।
চোখ দুটো চিকন করে সন্দেহভরা গলায় বলল,
“এই যে…” তেজ সঙ্গে সঙ্গে মুখ শক্ত করে ফেলল।
“কী?”
“তুমি হাসলে?”
“না।”
“হাসলে তো। আমি দেখেছি।”
“তোমার চোখের সমস্যা হয়েছে।”
“না, আমার চোখ একদম ঠিক আছে।”
সে ধীরে ধীরে তেজের একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দু’হাত পেছনে রেখে মুখটা একটু সামনে বাড়িয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
“একটু আগে তুমি হেসেছো”
তেজ জোর করে গম্ভীর মুখে বলল, “আমি জন্ম থেকেই রাগী।”
“মিথ্যা।”
“কেন?”
“কারণ রাগী মানুষ এভাবে ঠোঁটের কোণে হাসি লুকাতে পারে না।” তেজ এবার সত্যিই অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
সে কাশির ভান করে অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করতেই আর্যা তার পথ আটকে দাঁড়াল।
“আজকে আমি প্রমাণ পেয়েছি।”
“কিসের?”
“তোমার এই রাগটা পুরো নকল।”
“নকল?”
“হ্যাঁ। বাইরে সিংহ, ভেতরে একদম তুলতুলে বিড়াল।”
“আর্যা!”
তেজ এমন গর্জে উঠল যে ঘরের জানালার কাঁচ পর্যন্ত কেঁপে উঠল। কিন্তু আর্যা ভয় পাওয়ার বদলে খিলখিল করে হেসে উঠল। সে এক ঝটকায় তেজের হাত ধরে দুষ্টু চোখে তাকিয়ে বলল,
“এই রাগটাই তো আমার সবচেয়ে পছন্দ, জানো?”
তেজ হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার ভান করল, কিন্তু পুরোপুরি ছাড়াল না। গম্ভীর মুখেই বলল,
“একদিন কিন্তু সত্যিই রেগে যাব।”
আর্যা মুচকি হেসে ফিসফিস করে উত্তর দিল,

“সেদিনও তোমাকেই মান ভাঙাতে হবে। কারণ রাগ করতে তুমি যতটা ওস্তাদ… তোমাকে ভালোবাসতে আমি তার চেয়েও বড় ওস্তাদ।” কথাটা শুনে তেজ আর কিছু বলল না। শুধু বিরক্তির ভান করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিন্তু ম্লান আলোয় তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা হাসিটা এবার আর আর্যার চোখ এড়াল না।

মীর বাড়ির ছয় নম্বর ঘরের বারান্দার কাঁচের দরজাটা আধখোলা। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। ঘরের ভেতরে জ্বলছে শুধু একটা হলুদ নাইট ল্যাম্প। অবনী বারান্দার রেলিংয়ে দু’হাত রেখে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে। ভারী গয়নাগুলো অনেক আগেই খুলে রেখেছে। লাল শাড়ির আঁচলটা বাতাসে বারবার উড়ে এসে তার গালে লাগছে।
পেছন থেকে রাজ ধীর পায়ে এগিয়ে এল। তার চোখে আজ কোনো দুষ্টুমি নেই। শুধু একরাশ মুগ্ধতা। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে অবনীকে দেখল সে। তারপর খুব নরম স্বরে ডাকল,
“অবনী…”
অবনী মুখ ঘুরিয়ে তাকাতেই রাজের চোখের দৃষ্টিটা দেখে লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে গেল। রাজ হালকা হেসে আরও একটু কাছে এল।
“এতক্ষণ ধরে বৃষ্টি দেখছ?”
অবনী ছোট্ট করে মাথা নাড়ল। “ঘুম আসছে না।”
“ভয় লাগছে?”
অবনী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আস্তে করে বলল, “ভয় না… সবকিছু এত তাড়াতাড়ি বদলে গেল… তাই কেমন যেন লাগছে।”
রাজ কোনো উত্তর দিল না। শুধু ধীরে ধীরে অবনীর পাশে এসে দাঁড়াল। দু’জনেই কয়েক সেকেন্ড বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর রাজ আলতো করে অবনীর হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।
“একটা কথা বলব?”
অবনী তার দিকে তাকাল। “হুম।”
রাজ গভীর শ্বাস নিয়ে মৃদু হেসে বলল, “বাড়ির সবাই তোমাকে রাজের স্ত্রী বলে ডাকে।”
“হ্যাঁ…”
“কিন্তু আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না।”
অবনী অবাক হয়ে হেসে ফেলল। “কেন?”
“কারণ এতদিন যাকে দূর থেকে ভালোবেসেছি… সে আজ আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।”
অবনীর চোখের পাতা কেঁপে উঠল। রাজ আবার বলল, “ এইযে সারাদিন সবাই তোমাকে নিয়ে কত কি করে, মেতে থাকে অথচ আমি সারাদিন একটা কথাই ভাবি।”
“কী?”
“তুমি ঠিকমতো খেয়েছ কি না।”
অবনী হঠাৎ হেসে ফেলল। “আপনি এত রোমান্টিক কথা বলতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত খাবারে এসে থামলেন?”
রাজ মাথা চুলকে একটু লজ্জা পেল। “আমি তো এমনই।”
অবনী এবার আর হাসি থামাতে পারল না। তার সেই হাসিটা দেখে রাজও হেসে উঠল।
একসময় রাজ খুব ধীরে অবনীর কানের পাশ থেকে এলোমেলো হয়ে থাকা চুলের গোছাটা সরিয়ে দিল।
তার কণ্ঠটা আরও কোমল হয়ে এল।
“শোনো…”
“হুম?”
“আজকের নতুন করে তোমাকেও সিয়ার সাথে আনুষ্ঠানিক ভাবে বরণ করা হয়েছে। তাই পারিবারিক হিসেবে আজ তোমার প্রথম রাত। রাতটা নিয়ে তোমার যদি কোনো অস্বস্তি থাকে… কোনো ভয় থাকে… তাহলে শুধু আমার পাশে বসে গল্প করব। কোনো তাড়া নেই।”
অবনী বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“সত্যি?”
“সত্যি।”
রাজ মুচকি হেসে বলল,
“আমাদের সামনে পুরো একটা জীবন পড়ে আছে। একটা রাত দিয়ে সেই জীবনকে প্রমাণ করার দরকার নেই।”
অবনীর চোখ দুটো অজান্তেই ভিজে উঠল। সে ধীরে ধীরে রাজের বুকের ওপর মাথা রাখল। রাজ নিঃশব্দে তাকে নিজের বাহুর উষ্ণ আশ্রয়ে জড়িয়ে নিল।
ঘরের বাইরে তখনও টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে।

আর সেই নরম বৃষ্টির শব্দের মাঝেই দু’জন মানুষ কোনো বড় প্রতিশ্রুতি নয়, শুধু একে অপরের হাতটা একটু শক্ত করে ধরে নতুন জীবনের এই রাতটাকে ভালোবাসা আর বিশ্বাস দিয়ে মনে রাখার মতো করে তুলল।

রাত তিনটা বাজে। মীর বাড়ির বিশাল অট্টালিকা এখন নিঝুম দ্বীপের মতো স্তব্ধ। বাইরে ঝুম বৃষ্টির পর জমানো পানিতে গোটা পাঁচেক ব্যাঙ ব্যাকুল হয়ে ডাকছে। দেয়ালঘড়িটার টিক… টিক… শব্দে সেই নির্জনতা আরও গাঢ় হয়। তবে দোতলার মাঝের ঘরটিতে পরিস্থিতি ভিন্ন। ঘরের পরিবেশ থমথম করছে। নৈশি বিছানার মাঝখানে পা গুটিয়ে বসে আছে। তার মুখখানা থমথমে। যাকে বলে মেঘলা আবহাওয়া। সামনে দাঁড়িয়ে আব্রাজ বিরক্ত মুখে নিজের কপাল ডলছে।
আব্রাজ নিচু গলায় বলল, “সরে বসবেন কি? আমার ঘুম পাচ্ছে।”
নৈশি গম্ভীর গলায় জবাব দিল, “না। আমি সরব না।”
“এটা আমার ঘর।”
“অর্ধেকটা এখন আমারও। অন্তত আইনের চোখে।”
“তাহলে সোফায় গিয়ে বসুন।”
নৈশি বালিশে আরও একটু ভালো করে হেলান দিয়ে বলল, “আপনি বিজয়ী প্রার্থী। জনগণের সেবক। ত্যাগ স্বীকার করার অভ্যাস আপনার থাকা উচিত। সোফায় আপনি যান।”
আব্রাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গভীর দীর্ঘশ্বাস। তারপর চোখ বন্ধ করে বলল, “আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।”
“তাহলে ধৈর্য ধরুন। চিৎকার করছেন কেন?”
“আপনার সঙ্গে কথা বলা আর দেয়ালে মাথা কোটা একই কথা।”
“তবু তো প্রতিদিন কূটনীত চর্চা করতে আসেন।”
“কারণ আমার আর কোনো উপায় রাখা হয়নি।”
নৈশি হাসল। রাজনীতির ময়দানে না জিতুক, এই ঘরের ভেতর আব্রাজকে কোণঠাসা করার আনন্দই আলাদা। সে হঠাৎ কৌতুক ভরা চোখে তাকাল।
“একটা প্রশ্ন করি, মীর আব্রাজ সাহেব?”
আব্রাজ সতর্ক হয়ে বলল, “না। কোনো প্রয়োজন নেই।”
“জনগণের প্রতিনিধির কি প্রশ্নের উত্তর দিতে ভয় লাগে?”
“আপনার অহেতুক প্রশ্নের উত্তর দিতে ভয় লাগে।”
নৈশি হাত নাচিয়ে বলল, “শুনেছি আপনি নাকি ছোটবেলায় ভীষণ বাহাদুর ছিলেন? কুস্তি লড়তেন?”
“ছিলাম হয়তো।”
“এখনো কি সেই শক্তি আছে? নাকি শুধু নির্বাচনী মঞ্চেই গলার জোর দেখান?”
আব্রাজের চোখে মুখ ফুটে উঠল বিরক্তি। “আপনি ঠিক কি বোঝাতে চাইছেন?”
“বলছি, আমাকে কোলে তুলে নিতে পারবেন? দেখে তো মনে হয় আপনার গায়ে জোর বলতে কিছু নেই।”
আব্রাজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর অতি শান্ত গলায় বলল, “আপনি আমাকে চ্যালেঞ্জ করছেন?”
“হুম।”
“ভাবছেন পারব না?”
“চেহারা দেখে তো তা-ই মনে হচ্ছে।”
আব্রাজ আর কথা বাড়াল না। পাঞ্জাবির হাতা দুটো আস্তে আস্তে গুটাল। নৈশি ভেবেছিল লোকটা একটু টানাটানি করে হাল ছেড়ে দেবে, আর সে হাসবে। কিন্তু আব্রাজ হঠাৎ ঝুঁকে নৈশিকে এক ঝটকায় পাঁজাকোলা করে তুলে ফেলল। নৈশির মুখ দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে এক তীব্র চিৎকার বের হয়ে গেল, “ইইই! ছাড়ুন! ছেড়ে দিন বলছি!” সে প্রাণভয়ে আব্রাজের গলা জড়িয়ে ধরল।
আব্রাজ একগাল হেসে বলল, “নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ না করলেও, এই চ্যালেঞ্জ আমি হারব না।”
“আমি পড়ে যাব! আপনার হাত কাঁপছে!”
“কাঁপছে না।”
“কাঁপছে! নামান বলছি!” ঠিক এই সময়ে জানালার পাশের খাঁচা থেকে চিকু পাখিটা হঠাৎ ডেকে উঠল।
“উঠা! উঠা! পড়বি! পড়বি!”
দুজনেই চমকে পাখির দিকে তাকাল। চিকু খাঁচার ভেতর ডানাপাঁখা ঝাপটে পরম আনন্দে চিল্লাচ্ছে।
আব্রাজ ফিসফিস করে বলল, “এই পাখিটাকে একদিন আমি সর্ষে-বাটা দিয়ে ভুনা করব।”
চিকু উত্তর দিল, “খাব! খাব! আব্রাজ খাব!”
নৈশি ভয়ে জড়সড় হয়েও না হেসে পারল না। “দেখলেন? পশুপাখিও বুঝতে পারে আপনার ক্ষমতার জোর কতটুকু।”
ঠিক তখনই করিডোরে পায়ের শব্দ হলো। সাঁঝ দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল। তার চোখ কপালে উঠল। আব্রাজ বিজয়ী বেশে নৈশিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে, নৈশি তার গলা জড়িয়ে ধরে আছে, আর শালিক পাখিটা চেঁচাচ্ছে। সাঁঝ মুখ চেপে ফিসফিস করল, “ও মা! বিরোধী দলকে একেবারে কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছে দেখছি!”
নৈশি লজ্জায় লাল হয়ে বলল, “সাঁঝ! এখান থেকে যাও!”
সাঁঝ আরও মজা পেয়ে বলল, “না না, ক্ষমতার এই লড়াই তো রোজ দেখা যায় না।”
আব্রাজ গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “সাঁঝ, ঘরে যাহ।”
“না গেলে কি করবে? বিরোধী দলের মতো আমাকেও বরখাস্ত করবে বাড়ি থেকে?”
চিকু বলল, “সাঁঝ উঠা! সাঁঝ উঠা!”
নৈশি এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। হাসির তোড়ে তার শরীর কেঁপে উঠল। আর সেই কম্পনেই ঘটে গেল অঘটন। আব্রাজের পায়ের ভারসাম্য পেছনের খাটের কোণায় গিয়ে ধাক্কা খেল।
“নৈশি, নড়বেন না!”
“আমি নড়ছি না, আপনিই পড়ে যাচ্ছেন!”
পরের মুহূর্তেই খাটের কাঠের পায়া ভেঙে পুরো খাটটা কাত হয়ে নিচে বসে গেল। আব্রাজ ও নৈশি দুজনই ধপাস করে নিচে পড়ে গেল। নৈশি গিয়ে পড়ল আব্রাজের বুকের ওপর। আব্রাজ দম আটকে আসা গলায় বলল, “ইয়া আল্লাহ… বিরোধী দলের হামলায় আমি কি শেষ?”
চিকু উল্লাসে ফেটে পড়ল, “পড়ছে! পড়ছে! বাঁচাও!”
শব্দে পুরো মীর বাড়ি যেন জেগে উঠল। করিডোরে ধুপধাপ পায়ের শব্দ। কয়েক মিনিটের মধ্যে দরজা ঠেলে সবাই ভেতরে ঢুকে পড়ল আরযান, তাজ, রাজ, তেজ, সিয়া, আর্যা, অবনী, বড় মা, সেজো মা।
ঘরের দৃশ্য দেখে তেজ দেয়াল ধরে হেসে উঠল, “হাহাহা! ভাইয়া, এটা রাজনৈতিক জোট হলো না কি খাট ভাঙার প্রতিযোগিতা?”
রাজ হেসে বলল, “পরাজিত প্রার্থীর ভার কি এতই বেশি ছিল আব্রাজ ভাই?”
বড় মা কপালে হাত দিলেন, “হায় রে আল্লাহ! রাত তিনটায় ঘরের খাট ভাঙার ইতিহাস তো এই বাড়িতে প্রথম।”
নৈশি লজ্জায় আব্রাজের বুকে মুখ লুকিয়ে রইল। আব্রাজ নিজেকে সামলে নিয়ে মর্যাদা রক্ষার শেষ চেষ্টা করে বলল, “আম্মু, বিষয়টাকে অন্যভাবে দেখবেন না…”
সাঁঝ সামনে এসে হাততালি দিয়ে বলল, “বাহ! বিজয়ী প্রার্থী চ্যালেঞ্জ নিতে গিয়ে খাট সমেত পতন ঘটালেন!”
চিকু সঙ্গে সঙ্গে আওড়াল, “পড়ছে! ফ্রি! ফ্রি!”
সাঁঝ এবার ধারাভাষ্যকারের গলায় বলল, “শ্রোতা বন্ধুরা, নৈশি আপার সুনির্দিষ্ট চালে আব্রাজ ভাই সম্পূর্ণ ধরাশায়ী!”
ঠিক তখনই আরযান ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তার চেহারা গম্ভীর। সে সাঁঝের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, “এত হাসছিস কেন?”
সাঁঝ হাসতে হাসতেই বলল, “আরে আরযান ভাইয়া, দৃশ্যটা দেখেছেন?”
আরযান অতি শান্ত গলায় বলল, “দেখেছি। খুব মজা লাগছে, তাই না?”
“হ্যাঁ, ভীষণ!”
আরযান এক পা এগিয়ে এসে নিচু গলায় বলল, “তোর যদি এতই শখ হয়, আজ রাতেই একটা ট্রায়াল দিয়ে দেখা যাক? আমার কোলে ওঠার সাহস হবে?”
সাঁঝের হাসি এক মুহূর্তের মধ্যে গায়েব হয়ে গেল। “কী?!”
তেজ মুখ চেপে ধরল। আর্যা চোখ বড় বড় করল। আরযান নির্বিকার মুখে আবার বলল, “চল, পরীক্ষা করে দেখি তোর ভারে আমার ঘর বা খাট টিকতে পারে কি না।”
সাঁঝ পিছিয়ে গিয়ে বলল, “না না না! আমি তো ঠাট্টা করছিলাম!”
আরযান ভ্রু তুলে বলল, “আমিও তো ঠাট্টাই করছি।”
করিডোর জুড়ে এবার এমন হাসির রোল উঠল যে বাইরের ব্যাঙগুলোর ডাকও তাতে চাপা পড়ে গেল।
সাঁঝ দুই হাতে মুখ ঢেকে বলল, “আল্লাহ! আমাকে রক্ষা করো!”
চিকু খাঁচা থেকে শেষ মন্তব্যটি ছুঁড়ে দিল,
“সাঁঝ পালা! আরযান ধরছে! পালা! পালা!”
চলবে? See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply