নদীর_ওপারে_সুখ#
সিমরান_মিমি#পর্ব ০৭
বখতিয়ার মাহমুদ এবং ইখতিয়ার মাহমুদ দুজনেই সকল কাজ ফেলে হন্নে হয়ে বাড়িতে ঢুকলেন। ড্রয়িংরুমে মনমরা হয়ে বসে আছে অনামিকা। তার কোলে শুয়ে পান্না কার্টুন দেখছে মোবাইলে। সেঁজুতি মাহমুদ স্বামীকে নিয়ে চিন্তিত। সায়মাকে তিনি কত ভালোবাসেন তা সে ভালো করেই জানে। সেই সায়মার মেয়ে অপমানিত হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন, এটা শোনার পর হিমাদ্রির উপর ভীষণ ক্ষেপে যাবেন। সংসারে তিনি সেই অশান্তি চান না। জ্যোতি মাহমুদের চোখেমুখে আতংক। ছেলেটা রেগেমেগে বের হয়ে গেছে। ফোনটাও নিয়ে যায়নি। এমনিতেই বেজায় রাগ। কোথায় গিয়ে বসে আছে কে জানে? লিখন চুপচাপ বসে আছে সোফায়। মাথা নত করে পা দুলিয়ে দুলিয়ে ভাবছে। ইখতিয়ার বলেছে বাড়িতেই থাকতে। তবে আপাতত বাড়ির অশান্তি নিয়ে তার ভাবনা নেই। তার মনে নিভি’কে নিয়ে দুশ্চিন্তা। গ্রাম থেকে এসেছে। দেখতেও বেশ সুন্দরী। রাস্তাঘাট ঠিকমতো চেনে না৷ এই রাতের আধারে কাকে না কাকে বিশ্বাস করে বসে কে জানে!
ইখতিয়ার বাড়িতে ঢুকে হুংকার ছুড়লেন। “ হিমাদ্রি! হিমাদ্রি কোথায় ভাবি? ”
“ রেগেমেগে বের হয়ে গেছে। ”
“ওকে আমি এতোবার বোঝানোর পরেও কেন এমনটা করলো? বলেছিলাম না নিভি’কে নিয়ে না ভাবতে। ”
জ্যোতি চুপ রইলেন। অনামিকা রয়েসয়ে জবাব দিলো,
“ ভাইয়া কেন এমনটা করতে যাবে চাচ্চু? নিভি তো সারাদিন আমার সঙ্গেই ছিলো। সন্ধ্যার দিকে একটু ছাদে গেছিলাম। তখনই কি এসব হলো! এসব বাদ দাও। নিভিকে খুঁজে আনো। ও তো রাস্তাঘাট চেনে না। ”
“ দুপুরে নিভি’কে নিয়ে বড় বাবার ঘরে হিমাদ্রি ভাই অনেক কথা বলেছে। আমার মনে হয়, ও সেটাই শুনেছে। ”
লিখন ভাবুক হয়ে উত্তর দিলো। অনামিকা তৎক্ষনাৎ কপাল কুঁচকে নেয়৷ বলে,
“ দুপুরে খাওয়ার পর ও অনেকক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলো। এরপর হুট করে আমায় এসে বললো, আপু একটা টিউশন খুঁজে দাও। আমি ভাবলাম, টাকার প্রয়োজন। তাই দিতে গেলাম। কিন্তু ও এতে আরো গম্ভীর হয়ে গেলো। টাকা তো নিলোই না, উলটো বললো – “আমি স্বাবলম্বী হতে চাই। কারোর কাছে হাত পাততে কষ্ট হয়। ”তবে কি তোমাদের কথাগুলো শুনেই আমার কাছে টিউশন খোঁজার কথা বলেছে? ”
“ এটাই হবে। তবে আমার মনে হয় সন্ধ্যায় হিমাদ্রি ভাই ওকে সরাসরি আরো অপমান করেছে। যার জন্য ব্যাগ খুলে কাপড় ঝেড়ে ঝেড়ে দেখিয়েছে। ”
লিখন এবং অনামিকার কথোপকথনের মধ্যেই বখতিয়ার তেতে উঠলেন। লিখনের উদ্দেশ্যে বললেন,
“ ওকে আটকালে না কেন? না পারলে পিছু নিতে। তবুও একা কেন ছেড়েছো, আহাম্মক। ”
লিখন উত্তর দিলো না৷ আজকেই দেখা হয়েছে মেয়েটার সাথে। এরমধ্যে কথাও হয়নি। যাও বলতে গেছিলো, নিভি দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। তার ও তো অসস্তি আছে নাকি! সে কি নিভি’র হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে আটকাতে পারতো? পিছু নিলেও বা কি লাভ! উলটো রাস্তার মধ্যে সিনক্রিয়েট হতো। বাবা রেগে যাচ্ছে দেখে লিখন মুখ খুললো৷ বললো,
“ ও ভীষণ রেগে ছিলো। পিছু নিলে রাস্তায় বসে সিনক্রিয়েট হতো ভেবেই আর যাই নি। ”
ইখতিয়ার দাঁড়ালেন না আর। বড় ভাইকে নিয়ে দ্রুত বের হলেন ভাগ্নীকে খুঁজতে। যাওয়ার আগে বাড়ির সকলের উদ্দেশ্যে বলে গেলেন,
“ ও যে সায়মার’ই মেয়ে, তার জন্য এর থেকে বড় কোনো প্রমাণ লাগবে না। ”
মিরপুর বাস স্ট্যান্ড। কাউন্টারের সামনে দুটো বাস সারিবদ্ধ করে রাখা। ভেতরে ছোট ছোট কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার। নিভি তার একটাতে বসে কপালে হাত ঠেকিয়ে আছে। চারপাশে এতো মানুষ থাকায়, সে কাঁদলো না। কিন্তু বুকের ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরিয়েই একটা রিকশা পেয়ে গেছিলো। তাতে করেই চলে এসেছে বাস স্ট্যান্ডে। ইতোমধ্যে সাড়ে আটশো টাকায় সামনের জানালার পাশের সিট কেটে ফেলেছে সে। কাউন্টার ম্যানেজার বলেছেন, গাড়ি ছাড়বে সাড়ে আটটায়। এক্ষেত্রে পিরোজপুর গিয়ে পৌছাতে পৌঁছাতে আড়াইটা থেকে তিনটা বেজে যাবে। এ নিয়ে নিভি পড়েছে বিরাট বিপাকে। ওতো গভীর রাতে নেমে সে কোথায় যাবে, কার কাছে থাকবে। ঝোঁকে ঝোঁকে এতোগুলো টাকার টিকিট কেটে ফেললো। এখন এ টাকা ফেরত ও আনা যাবে না। ফেরত এনেও বা কি হবে? আবারো যেতে হবে চৌঁধুরী বাড়িতে৷ কিন্তু এতো এতো রুঢ় কথা বলার পর বেহায়ার মতো সেই বাড়িতে আবার ঢুকতে হবে, ভাবতেই লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যাচ্ছে। নাহ, সে কিছুতেই ফিরতে পারবে না। এর থেকে বাসেই নাহয় উঠুক। পিরোজপুর পৌঁছানোর পর আল্লাহ ভাগ্যে যা রেখেছে তাই হবে।
লিখন মাহমুদ ব্যস্ত পায়ে বাইক থেকে নামলো। হেলমেট খুলে আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজতে লাগলো নিভি’কে। তার ধারণা নিভি এখানেই আছে। অবশেষে ধারণা সত্যি হলো। এতো এতো লোক চিরে তার নজর পড়লো কাউন্টার ম্যানেজারের পাশের চেয়ারে গুটিশুটি পাকিয়ে বসে থাকা নিভি’কে। সে কাপড়ের ব্যাগ’টা শক্ত হাতে ধরে মাথা নিচু করে আছে। লিখন ভেতরে গেলো না। কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বাবা’কে কল করলো। বললো,
“ তোমার ভাগ্নীকে পেয়েছি। দ্রুত আসো, নাহলে বাস ছেড়ে দেবে। ”
এরপর ধীর পায়ে কাউন্টারের ভেতরে ঢুকে নিভি’র পাশের চেয়ারে বসলো। মেয়েটা তখনো মাথা তুলে লিখনকে দেখেনি। হয়তো ভেবেছে নতুন কোনো যাত্রী। বেশ কিছুক্ষণ তাকে ওভাবেই পরোখ করলো লিখন মাহমুদ। হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো,
“ পিরোজপুর যাচ্ছো? ”
“জি।”
স্বভাববশত উত্তর দিয়েই নিভি মুখ তুলে চাইলো৷ লিখনকে পাশে বসে থাকতে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে আবারো মাথা নামালো।
“ বাস কয়টায় ছাড়বে? ”
“ সাড়ে আটটায়। ”
লিখন সময় দেখে নিলো। হিসেব করে বললো,
“পৌঁছাতে তো গভীর রাত। তখন কোথায় যাবে? ”
উত্তর দিতে পারলো না নিভি। চুপচাপ চোখ নামিয়ে বসে রইলো। কয়েক মুহুর্ত পর নিজে থেকেই প্রশ্ন ছুড়লো লিখনকে।
“এখানে এসেছেন কেন? ”
“তোমায় দেখেশুনে ঠিক বাসে উঠিয়ে দেওয়ার জন্য। ”
নিভি এক মুহুর্তের জন্য চমকে গেলো। ভেবেছিলো, হয়তো লোকটা তাকে বাড়িতে নিতে এসেছে। কিন্তু এ ধরণের জবাব পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। নিচু আওয়াজে বলে,
“ আমি যেতে পারবো। আপনি চলে যান। ”
“উহু! আব্বু বলেছে তোমায় ঠিকমত এগিয়ে দিয়ে আসতে। তুমি বাসে না ওঠা পর্যন্ত যাবো না। ”
লিখনের একাগ্রতায় আর কোনো বাড়তি কথা বললো না। নিরব হয়ে হাতের নখ খুটতে লাগলো। ভাবলো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো সম্পর্কে। প্রথমে সবাই’ই তো কি আপ্যায়ন করেছিলো! বলেছিলো সারাজীবন থাকতে। এমনকি আলাদা রুমও পরিস্কার করা হয়েছে। অথচ, রাত নামার সঙ্গে সঙ্গেই বিদায়৷ তবে কি নিভি’র ব্যবহার কারোর ভালো লাগেনি? লাগবেই বা কি করে? সকলের সামনে দাঁড়িয়ে বাড়ির বড় ছেলেকে অপমান করেছে নিভি৷ সে তো সিনিওরা মাহমুদের ও প্রিয় নাতি। এ কারনেই বুঝি এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিলো৷
এসব ভেবে নিভি হতাশ হয়না। শুরু থেকেই কারোর উপর তার প্রত্যাশা নেই৷ অচেনা, অপরিচিত হয়ে একদিনের সম্পর্কে এভাবে খারাপ ব্যবহার করলে যে কেউ রেগে যাবে, এটাও স্বাভাবিক।
“তুমি কি শুধু হিমাদ্রি ভাই’র উপর রাগ করে বাড়ি ছেড়েছো? ”
লিখনের প্রশ্নে নিভি অপ্রস্তুত হলো। মাথার ওড়না সামান্য একটু টেনে মিহি স্বরে বললো,
“ উনি আমাকে নিয়ে সন্দেহ ছড়াচ্ছেন। চোর, ডাকাত, চক্রের মেয়ে বলে নানা অপমান করেছেন। বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন। এসব শোনার পর কেই বা থাকে? ”
“ ওকে বাদ দিয়ে বাকিরা কেউ কিছু বলেছে? সন্দেহ করেছে? ”
“ জি, নাহ। ”
“ তাহলে বাকিরা থাকতে বললেও চলে এসেছো কেন? ও বাড়িতে কি শুধু হিমাদ্রি ভাইয়ের কথা শুনেই তুমি সিদ্ধান্ত নিবে? ”
এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে নিভি আটকে গেলো। সত্যিই সে বাকিদের কথা ভাবিনি। আসার সময় এতো করে বলার পর থাকেনি। শুধুমাত্র হিমাদ্রি মাহমুদের কথা শুনেই বাড়ি ছাড়লো। অথচ, এই লোকের কোনো অস্তিত্বই নেই তার সামনে। কেন, তার বলা অপমান গুলো এভাবে গায়ে মাখলো?
লিখনের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পূর্বেই বখতিয়ার মাহমুদ এবং ইখতিয়ার মাহমুদ কাউন্টারের ভেতরে ঢুকলেন। নিভি’কে দেখে ইখতিয়ার কড়া করে ধমক মারলেন। বললেন,
“ বাড়ি থেকে বের হয়েছো কোন সাহসে? আমাদের জানিয়ে বের হয়েছো? মায়ের মতো পদে পদে এতো পাগলামি কেন করো নিভি? তুমি কি অবুঝ! এই রাতে কোন সাহসে বের হয়েছো? ”
নিভি এক মুহুর্তে’র জন্য কেঁপে উঠলো। অসস্তিতে আশেপাশের যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে দেখলো। তারা প্রত্যেকেই তাকে দেখছে। বখতিয়ার মাহমুদ ছোটো ভাইকে ইশারা করলেন থামতে। এরপর নিভির মাথায় হাত রেখে নরম স্বরে বললেন,
“ কোথায় যাচ্ছো মামণি? ”
“পিরোজপুর। ”
“ওখানে গিয়ে কি করবে? কার কাছে থাকবে? ”
“ আমি থাকতে পারবো । আর ওখানে টিউশন পাওয়া যায়, আমি সেলাইয়ের কাজও জানি। মা শিখিয়েছিলেন। ঠিক কোনো না কোনো ভাবে চলে যাবে। ”
বখতিয়ার ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লেন। সায়মা সেলাইয়ের কাজ করতো শুনে বুকটা চিনচিন করে উঠলো। তবুও কিছু বললেন না। নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরকন্ঠে বললেন,
“ হিমাদ্রির কথায় খারাপ লেগেছে? একবার ভেবে দেখো, তোমাকে তো এর আগে আমরা কখনোই দেখিনি। তাই সন্দেহ জাগা টা কি ঠিক নয়? ”
নিভি সরাসরি দৃষ্টি ফেললো বড় মামার দিকে। বললো,
“ সন্দেহ করা স্বাভাবিকই ছিলো। কিন্তু উনি নিশ্চিত ভাবেই আমাকে নকল বলেছেন। চোর, ডাকাত, গ্যাঙের মেয়ে, ব্যাগে অস্ত্র রেখে ঢুকেছি, দ্রুত বাড়ি থেকে বের না হয়ে গেলে উনি দেখে নেবেন — এ ধরণের নানা হুমকি দিয়েছেন। মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে কতভাবে হেনস্তা করলেন। অথচ উনি চাইলেই বাড়ির সবার সামনে আমাকে জিজ্ঞাসা করতে পারতেন। প্রমাণ চাইতে পারতেন। আমার ন্যাশনাল আইডি কার্ড নাহয় হয়নি, কিন্তু জন্মনিবন্ধন কাগজ তো ছিলো। কতগুলো সার্টিফিকেট, মায়ের ন্যাশনাল আইডি কার্ড, এমনকি বেঁচে থাকা কালীন বেশ কিছু ছবিও আছে। আমি এখনো ডিলিট করার সময় পায়নি। কিন্তু এসব না করে উনি…..। ”
লিখনের ভালো লাগছে না এসব। আশেপাশের লোক উদগ্রীব হয়ে দেখছে। সে দ্রুত তাড়া দিলো। বললো,
“ এসব কথাবার্তা বাড়িতে গিয়ে বলি। ”
বখতিয়ার সম্মতি জানালেন। কাপড়ের ব্যাগ লিখনকে তুলে নিতে বলতেই আপত্তি জানালো নিভি। ভাঙা স্বরে বললো,
“ আমি বাড়ি যাবো মামা। ”
“ চৌধুরী বাড়ি ছাড়া তোমার কোনো বাড়ি নেই। এটা যত দ্রুত বুঝবে, ততই ভালো। ”
ইখতিয়ার আবারো ক্ষ্যাপা কন্ঠে জবাব দিলো। বখতিয়ার ভাইকে থামিয়ে পুণরায় ঠান্ডা গলায় বললেন,
“ নিভি, আর না করোনা। বাড়িতে চলো। ”
ভীষণ লজ্জা লাগছে নিভির। অসস্তিতে জড়িয়ে নিভু নিভু কন্ঠে বললো,
“ আমি সবাইকে অনেক বাজে কথা বলেছি, অপমান করেছি। ও বাড়িতে আর যাবো না। ”
লিখন এ পর্যায়ে বিরক্ত। মেয়েরা এতো পদের ঢং করতে পারে, তা উপলব্ধি করে সে তাকিয়ে রইলো। বখতিয়ার আবারো সাধলেন নিভি’কে। উত্তরে সে বললো,
“ আমি পড়ে আপনাদের বাড়িতে বেড়াতে আসবো মামা। এখন যেতে দিন। টিকিট কেটে ফেলেছি। তাছাড়াও পিরোজপুর সহজেই টিউশন পাওয়া যায়। আমার জন্য এতে সুবিধা হবে। ”
ইখতিয়ার আর চুপ থাকতে পারলেন না। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
“ এটাই তাহলে মেইন কথা৷ মায়ের মতো খেটে খেতে চাও? বেশ ঠিক আছে। তোমাকে টিউশন জোগাড় করিয়ে দেবো। তবুও দয়া করে এখন সাথে চলো। মিটিং ফেলে চলে এসেছি। ”
নিভি আর বাধা দিলো না। মামাদের সঙ্গে এসে গাড়িতে বসলো। তবে ভীষণ লজ্জা করছে তার। এতো ঝামেলার পর আবার সেখানেই ফিরতে হবে ভেবে দু-ফোঁটা চোখের জল বিসর্জন দিলো।
চৌধুরী বাড়িতে দ্বিতীয়বার ঢোকার পর নিভি খেয়াল করলো সবকিছু স্বাভাবিক। যে যার কাজে ব্যস্ত। ঝুমুর, সেঁজুতি রাতের খাবার রান্না করছেন। পান্না একের পর এক উদ্ভট প্রশ্ন করে অনামিকাকে বিরক্ত করছে। নিভি তাদের থেকেই কিছুটা দুরত্বে মাথা নত করে বসে আছে বিছানায়। এক ফাঁকে সেঁজুতি মাহমুদ রুমে ঢুকে একগাল হেসে বললেন,
“ নিভি, ইলিশ মাছ কি খাবে, নাকি তোমার জন্য অন্য কিছু রান্না করবো? ”
এতো যত্নে নিভি’র আরো বেশি লজ্জা লাগছে। সে মাথা নত করে বললো,
“ জি! আলাদা করে কিছু রান্না করতে হবে না মামী। ”
অনামিকা কিছুক্ষণ পর এক প্লেট চিকেন ফ্রাই এনে বিছানায় রাখলো। নিভি’র উদ্দেশ্যে খানিক দুষ্টুমির ছলে বললো,
“ তা ক’টা টিউশন পেলে? ছোট চাচ্চু বকেনি? ”
মুখ কাচুমাচু করে অনামিকার দিকে তাকালো নিভি। মিহি স্বরে বললো,
“ একটু বকেছে। অবশ্য দোষ’টা আমারই ছিলো। ”
অনামিকা হেসে ফেললো। খাওয়ার এক পর্যায়ে নিভি হাত ধরলো অনামিকার। খানিকটা কৃতজ্ঞতার সুরে বললো,
“ আমি ভেবেছিলাম, আপনি আর আমার সঙ্গে কথা বলবেন না। খুব রেগে যাবেন। ”
“এমা, তা কেন? ”
“ এই যে আপনার বড় ভাইয়াকে অনেক বাজে কথা বলেছি, এজন্য। ”
অনামিকা কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ করে গেলো। বললো,
“ তুমি যেভাবে ভাইয়ার সঙ্গে কথা বলেছো, এমনটা এ বাড়ির কেউ কল্পনাও করেনি। খারাপ অবশ্যই লেগেছে। তবে আমার মনে হচ্ছে একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। সেজন্যই ভুলে যেতে চাইছি। এসব আর মনে করিও না। ছোট চাচ্চু বললো, অতি দ্রুতসময়ের মধ্যে তোমায় টিউশন খুঁজে দিতে। নাহলে নাকি আবার পালাবে। ”
নিভি হেসে ফেললো। বললো,
“ আর যাবো না। ”
সন্ধ্যার ঘটনা নিয়ে সারা রাতেও বাড়িতে কেউ কোনো কথা তুললো না। তবে জ্যোতি মাহমুদের মুখ ভার।
নিভি সে রাতে নানুর কাছে ঘুমালো। অনামিকাও বাঁধা দেয়নি। সারাদিন তো তার কাছেই থাকলো, রাতে নাহয় দাদির সঙ্গেই ঘুমাক। সিনিওরা প্রায় ঘন্টাখানেক তার বিয়ের ব্যাপারে গল্প করলেন। এরপর শুয়ে পড়লেন আপন মনে।
নিভি’র ঘুম ভাঙলো খুব ভোরে। ফজরের আজান তখন মাত্র দিয়েছে। সে গুটি গুটি পায়ে বিছানার পাশ থেকে উঠলো। বাঁ দিকের জানালার সামান্য একটু পর্দা মেলে বাইরের আবহাওয়া দেখলো। এখনো আবছা অন্ধকার। সিনিওরা মাহমুদ নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন। নিভি ওযু করে সবার প্রথমে নামাজ পড়ে নিলো। মনটা বিশুদ্ধ হয়ে গেছে। গতদিনের সকল ভুল-ত্রুটিকে মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে সে ব্যাগে হাত দিলো। গুরুত্বপূর্ণ সার্টিফিকেট গুলো কাপড়ের ব্যাগেই রাখা আছে ফাইলের মধ্যে। সে একে একে মায়ের ভোটার আইডি কার্ড, বাবার কার্ডের ফটোকপি, তার জন্মনিবন্ধন কার্ড সহ পিএসসি, জেএসসি এবং এসএসসির সার্টিফিকেট বেছে আলাদা করলো। হাতের মুঠো ফোন’টি সায়মা মাহমুদের। তিনি মারা যাওয়ার পর নিভি সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। এটার মধ্যে ছোট্ট একটা মেমোরি কার্ড আছে। সময়ে অসময় একটু মন চাইলেই ছোট্ট ফোনটাতে মায়ের ছবি তুলতো সে। কখনো বা একসাথেও ছবি তুলেছে। চাচাতো ভাই জামালের বিয়ের সময় তার গায়ে হলুদে বড় এন্ড্রয়েড ফোন দিয়ে ছবি তোলা হয়েছিলো। সেখান থেকে কয়েকটা মেমোরিতে সংরক্ষণ করেও রেখেছিলো। মৃত মানুষের ছবি রাখতে হয়না, নিভি তা জানে। তবুও এ কদিনে এগুলো ডিলিট দেওয়া হয়নি। মায়ের মুখ দেখলেই হাত কাঁপতো। ভেবেছিলো দু-এক সপ্তাহ পর মন শান্ত হলে ডিলিট করবে। কিন্তু এগুলো যে এভাবে প্রয়োজন হবে তা কেইবা জানতো?
সকাল সাড়ে সাতটা। ড্রয়িংরুমে বখতিয়ার মাহমুদ এবং ইখতিয়ার মাহমুদ বসে আছেন কফি হাতে। তার পাশেই হিমাদ্রি এবং লিখন বসা। গত রাতের ঘটনা নিয়েই হয়তো তারা আলোচনা করছেন। নিভি এক পা এগিয়ে আবারো থেমে গেলো। বুঝতে পারলো না এই মুহুর্তে তাদের সামনে যাওয়া ঠিক হবে কি-না। পরক্ষণেই মন নরম হলো। সেতো আশ্রয়হীন, এতোটা অপমানের পরেও যখন এ বাড়িতেই থাকতে হয়েছে — তাহলে সন্দেহের মুখেই বা কেনো থাকবে?
নিভি নানুর রুম থেকে বেরিয়ে বড় মামার সোফার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। মিহি স্বরে বললো,
“ আসসালামু আলাইকুম, মামা। ”
“ আরে মামণি, আসো আসো। কখন উঠলে? ”
“ জি, ফজরের সময়। ”
“নামাজ পড়েছো? ”
“ জি। ”
বখতিয়ার সন্তুষ্ট হলেন। বললেন,
“ তুমি একটু তোমার পান্না আপুকে নামাজ পড়াতে পারবে? মেয়েটা আট’টা অবধি ঘুমায়। ”
নিভি কি বলবে বুঝে উঠতে পারলো না। তাই চুপ থাকলো। হিমাদ্রি আড়চোখে দাঁতে দাঁত চেপে তাকে দেখছে। সেসব লক্ষ্য করেই সামনে এগিয়ে গেলো নিভি। সবাইকে অবাক করে দিয়ে শীতল কন্ঠে বললো,
“ কাল রাতের জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন, ভাইয়া। ওভাবে অপমান করেছেন, তাই সহ্য করতে পারিনি। হয়তো বেশি বলে ফেলেছিলাম। ”
হিমাদ্রি কোনো উত্তর দিলো না। বাবার দিকে তাকিয়ে ঘটনাটা বোঝার চেষ্টা করলো। নিভি কিছুই গায়ে মাখলো না। যা যা ভেবে এসেছে, সেভাবেই চলতে লাগলো। হাতের সার্টিফিকেট এবং আইডি কার্ড গুলো বের করে দু -মামার হাতে ভাগ করে দিলো। বললো,
“ আমার তো ন্যাশনাল আইডি কার্ড হয়নি। এগুলো মা আর আব্বুর। আর বাদবাকি আমার সার্টিফিকেট। ”
এরপর লিখনের হাতে ছোট্ট মুঠোফোনটা দিলো ফটো বের করে। বললো,
“ এখানে মায়ের অনেক ছবি আছে। আপনারা সবাই দেখে নিলে, আমি ডিলিট দিয়ে দেবো। ”
ইখতিয়ার হতভম্ব হয়ে গেলেন। কিন্তু রেগে গেলেন না। নিভি কষ্ট পেয়ে এগুলো দিচ্ছে শুনে সে আহত হলো। বললো,
“ আম্মু, তোমাকে কেউই সন্দেহ করছে না। এমন পাগলামি কেন করছো? ”
মৃদু হাসলো নিভি। হিমাদ্রির দিকে তাকিয়ে বললো,
“ সন্দেহের কথা মনে করতে চাইনা মামা। মাকে তো দীর্ঘ বছর আপনারা দেখেননি। বেশ কিছু ছবি আছে। ওগুলো দেখে নিন। এরপর ডিলিট করে দিবো। ”
কেউ আর আপত্তি জানাতে পারলো না। হিমাদ্রি লিখনের কাছে ইশারায় মুঠো ফোনটা চাইলো। এরপর একেক করে বোতাম চেপে দেখার পর মোবাইল দিয়ে দিলো ছোটো চাচার হাতে। ছবিগুলো লো কোয়ালিটির। অসংখ্য ছবি। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এগুলো অরিজিনাল। সে একবার নিভির দিকে তাকালো। মেয়েটা তাহলে সত্যিই তার ফুপির মেয়ে। কিন্তু এতে আলাদা করে কোনো মায়া না জাগলেও ভেতরে ভেতরে ভীষণ খালি খালি লাগছে। তবে কি সত্যিই তার ফুপি মারা গেছে। যার সঙ্গে পুরো শৈশব একসাথে কাটিয়েছে সেই লম্বা বেনুনীর, সুন্দরী রাজকুমারী আর নেই।
বলাবাহুল্য, সায়মার ছবি আছে শুনে সেজুতিও ছুটে এলেন ড্রয়িংরুমে। বখতিয়ার, ইখতিয়ারেরও দেখার খুব সাধ৷ সিনিওরা’কেও ডেকে এনেছে অনামিকা। অবশেষে লিখন ব্যবস্থা করলো। ড্রয়িংরুমের বড় পর্দাটাতে দেখানো হলো একের পর এক ছবি। সুতির ফিনফিনে, পুরোনো শাড়ি পড়ে হাসিমুখে কখনো কাজ করছে সায়মা। আবার কখনো বা নিভি’কে জড়িয়ে তার গালে চুমু দেওয়া ছবি। মুখে প্রসাধনীর কোনো ছাপ নেই। রোদে পোড়া, মলিনতায় মাখামাখি হয়ে আছে সুশ্রী মুখ। অনেকগুলো ছবি দেখার পর হঠাৎ থমকে গেলো সকলে। মাথায় কোনো চুল নেই, মোটা একজন ভদ্রমহিলা। তার সঙ্গে হাসিমুখে নিভি। সকলের অবাক চাহনি দেখে নিভি বললো,
“ এটা চার মাস আগের ছবি। শরীর মোটা হয়ে গেছিলো অনেক। ”
ড্রয়িংরুমে চাপা আর্তনাদ শোনা গেলো। নিভি উঠে গেলো সেখান থেকে। এই ছবিগুলো দেখলে তার বুক হু হু করে কাঁদে। যাওয়ার আগে লিখনকে নরম গলায় শুধালো,
“ ভাইয়া, সবাইকে দেখিয়ে এগুলো ডিলিট করে ফেলবেন। ”
চলবে?
মহা সমস্যায় পড়লাম তো! একদিন না লিখলে পরবর্তী চার দিনেও নোটপ্যাডে ঢুকতে ইচ্ছে করে না। 🥲
Share On:
TAGS: নদীর ওপারে সুখ, সিমরান মিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নদীর ওপারে সুখ পর্ব ৩
-
নদীর ওপারে সুখ পর্ব ২
-
নদীর ওপারে সুখ গল্পের লিংক
-
নদীর ওপারে সুখ পর্ব ১
-
নদীর ওপারে সুখ পর্ব ৫
-
নদীর ওপারে সুখ পর্ব ৪
-
নদীর ওপারে সুখ পর্ব ৬