Golpo romantic golpo অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা

অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা


অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৮১

[পর্ব ৮১]

লেখিকাফারহানানিঝুম

(
দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)
(
কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
[দ্বিতীয় খন্ড]
Port Vell এর শান্ত জলে কয়েকটি নৌকা নিশ্চুপ ভেসে আছে। সারা রাতের ক্লান্তির পর যেন তারাও বিশ্রাম নিচ্ছে। চারপাশে এমন এক নিস্তব্ধতা, যেখানে শহরের কোলাহলও যেন ঘুমিয়ে আছে।
ঠিক সেই সময়ই রাস্তার একপাশ দিয়ে হেঁটে চলেছে ইস্ক্রিয়াস।
পরনে অ্যাশ রঙের একটি জ্যাকেট, দু’হাত গুঁজে রেখেছে পকেটে। পদক্ষেপগুলো ধীর ক্লান্ত, ভারী। যেন প্রতিটি কদমে তার শরীরের সাথে সাথে মনটাও একটু একটু করে নুয়ে পড়ছে। ভোরের হালকা ঠান্ডা বাতাস তার চুল ছুঁয়ে যায়, কিন্তু তাতে কোনো সাড়া দেয় না সে।
সবে সকাল সাতটা। এই এত ভোরে শহরের রাস্তা প্রায় ফাঁকা। কোথাও কোনো তাড়াহুড়ো নেই, নেই মানুষের কোলাহল শুধু দূরে কোথাও এক-দু’টি গাড়ির ক্ষীণ শব্দ।
সতর্ক ভঙ্গিতে এগোতে এগোতে ইস্ক্রিয়াস পৌঁছে গেল একটি পেট্রোল পাম্পের কাছে। চারপাশে তাকিয়ে নিল একবার অভ্যাসবশত, যেন অদৃশ্য কোনো বিপদকে আগেভাগেই চিনে নিতে চায় সে।
হঠাৎই নিস্তব্ধতা ভেঙে পিছন থেকে ভেসে এলো এক নারীকণ্ঠ,
“ইন্সপেক্টর,ডিড ইউ মিস মি?”
কণ্ঠস্বরটি পরিচিত। অত্যন্ত পরিচিত।চকিতে ঘুরে দাঁড়ালো ইস্ক্রিয়াস। তার চোখে মুহূর্তেই নেমে এলো হিমশীতল এক দৃষ্টি যে দৃষ্টি মানুষের বুকের গভীরতম কোণ পর্যন্ত জমিয়ে দিতে পারে।
দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাইসা।
ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি, চোখে অদ্ভুত এক খেলা দুষ্টুমি, রহস্য আর আত্মবিশ্বাসের মিশেল। যেন সে জানে, এই হঠাৎ উপস্থিতি ইস্ক্রিয়াসকে ঠিক কতটা বিস্মিত করবে।
ইস্ক্রিয়াসের মুখমণ্ডল ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠলো।
চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি আরও গম্ভীর।
“ক্রিমিনাল।”
রাইসা এমন প্রত্যুত্তরে হালকা হাসলো, বোধহয় প্রথম থেকেই প্রস্তুত ছিল সে। দেয়াল ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। এদিক ওদিক তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“এ কেমন আপ্যায়ন ইন্সপেক্টর? আফটার অল এতদিন পর ফিরেছি এভাবে তুমি ক্রিমিনাল বলতে পারো না!”
ইস্ক্রিয়াস ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“তোমাদের মতো ঠকবাজ ক্রিমিনালকে আপ্যায়ন করব? লাইক সিরিয়াসলি, রাইসা?”
রাইসা তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ইস্ক্রিয়াসের সেই তীক্ষ্ণ, কঠিন চোখের দৃষ্টি যেন অনেককেই কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে কিন্তু রাইসার চোখে কোনো ভয় নেই। বরং সেখানে এক অদ্ভুত নির্ভারতা। অকস্মাৎ চোখ টিপে ইস্ক্রিয়াসের দিকে চেয়ে। ক্ষণিকের জন্য হৃদস্পন্দন থমকে গেল আইনের লোকটির।
স্বতঃস্ফূর্ত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে রাইসা হালকা হাসল।বলল সে শান্ত গলায়।
“ওকে, ওকে। কুল ডাউন
তারপর একটু ঝুঁকে, যেন মজা করেই যোগ করল,
“আচ্ছা একটা কথা বলো, ক্রিমিনাল এখানে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তাও আবার পলাতক তাকে ধরবে না?”
কথাগুলো ঝুলে রইল কয়েক সেকেন্ড।
ইস্ক্রিয়াসের চোখ সরু হয়ে এলো। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হঠাৎই সতর্ক সংকেত দিতে শুরু করেছে। যেন এই নিরীহ কথোপকথনের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো চাল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই রাইসা হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল।
পরের মুহূর্তে সে ছুটতে শুরু করল খোলা রাস্তায়, বজ্রগতিতে।
“কাম অন ইন্সপেক্টর, ধরো আমায়!”
তার দৌড় ছিল অবিশ্বাস্য দ্রুত, অথচ নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রিত। যেন শহরের প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি মোড় তার মুখস্থ। ইস্ক্রিয়াস এক মুহূর্তও দেরি করল না।
তার পেশীগুলো মুহূর্তে সজাগ হয়ে উঠল। শক্ত পদক্ষেপে সে রাইসার পিছু নিল।
ভোরের শান্ত রাস্তা হঠাৎই রূপ নিল এক উত্তেজনাপূর্ণ ধাওয়ায়।
রাইসা দৌড়াতে দৌড়াতে রাস্তার পাশে রাখা ধাতব ব্যারিকেডের ওপর হাত রেখে শরীরটাকে ভর দিয়ে এক লাফে টপকে গেল। তার চলাফেরায় ছিল এক ধরনের প্রশিক্ষিত স্বচ্ছন্দতা।
ইস্ক্রিয়াসও পিছিয়ে রইল না। লম্বা পা ফেলে দ্রুত সেই ব্যারিকেড পার হয়ে আবার গতি বাড়াল।
রাস্তার পাশে কয়েকটি ডেলিভারি ভ্যান দাঁড়িয়ে ছিল। রাইসা হঠাৎই সেগুলোর মাঝখানের সরু ফাঁক দিয়ে সা’পের মতো সরে গেল।
ইস্ক্রিয়াস তার পিছু পিছু ঢুকে পড়ল সেই ফাঁকে, গাড়ির ধাতব গায়ে তার কাঁধ হালকা ধাক্কা খেলেও গতি কমাল না।
একসময় সামনে পড়ল ছোট্ট একটি বাজারের পথ। সেখানে কিছু কাঠের বাক্স আর ফলের খালি ক্রেট এলোমেলোভাবে পড়ে আছে।
রাইসা দৌড়ের মাঝেই একটি ক্রেটের ওপর পা রেখে শরীর ঘুরিয়ে পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল চলাফেরাটা এতটাই দ্রুত যে চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল।
ইস্ক্রিয়াস সেই ক্রেটগুলোকে পাশ কাটিয়ে এগোল, একটিকে পায়ের ধাক্কায় সরিয়ে দিল, যেন এগুলো তার পথ আটকানোর মতো কিছুই নয়।
ভোরের ঠান্ডা বাতাসে এখন দুজনের দম নেওয়ার শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। রাইসার চুল বাতাসে উড়ছে, তার দৌড়ে আছে বুনো স্বাধীনতার ছন্দ।
আর ইস্ক্রিয়াস তার দৌড়ে আছে শিকারির ধৈর্য আর দৃঢ়তা। এই কন্যাকে তার যেকরেই হোক আয়ত্তে আনতেই হবে।
দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎই রাস্তার শেষ প্রান্তটা খুলে গেল সমুদ্রের দিকে। সামনে বিস্তৃত নীল জলরাশি, ভোরের আলোয় যার গায়ে ঝিকিমিকি করছে রুপালি আভা। বাতাসে লবণের গন্ধ, আর ঢেউয়ের মৃদু শব্দ যেন দূরের কোনো অজানা সুরের মতো কানে বাজছে।
কাঠের লম্বা বোর্ডওয়াকটা সমুদ্রের ওপর এগিয়ে গেছে অনেকটা দূর পর্যন্ত। পাশে সারি সারি বাঁধা আছে কিছু বোর্ড জল কেটে চলার জন্য ব্যবহৃত দ্রুতগতির সার্ফবোর্ড।
রাইসা এক মুহূর্তও থামল না। দৌড়ের গতি কমাতে কমাতেই সে একটা বোর্ডের ওপর লাফ দিয়ে উঠল। অবলীলায় দু’পা সামলে নিল, যেন এই বোর্ড তার বহুদিনের সঙ্গী। হাতের কাছে রাখা ছোট মোটরটা টান দিতেই বোর্ডটা কেঁপে উঠল, তারপর মুহূর্তের মধ্যে জলের ওপর ছুটে চলতে শুরু করল।
পেছনে দাঁড়িয়ে ইস্ক্রিয়াস সবকিছু এক ঝলকে দেখে নিল। তার চোখে তখন তীক্ষ্ণ দৃঢ়তা।
সে-ও পাশের আরেকটা বোর্ডে লাফিয়ে উঠল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভারসাম্য ঠিক করে মোটর চালু করতেই বোর্ডটা গর্জে উঠল।
পরের মুহূর্তেই দুটো বোর্ড সমুদ্রের বুক চিরে ছুটতে শুরু করল।জলের ওপর দিয়ে এগোতে এগোতে বোর্ডের নিচে ঢেউগুলো ছিটকে সাদা ফেনা হয়ে উঠছে। বাতাস তীব্র বেগে এসে আ’ঘাত করছে মুখে, চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে।
রাইসা সামনে। তার বোর্ডটা ঢেউয়ের ওপর দিয়ে তীরের মতো ছুটছে। মাঝে মাঝে শরীর হালকা বাঁকিয়ে দিক বদলাচ্ছে, কখনো ঢেউয়ের চূড়া ছুঁয়ে আবার নিচে নেমে যাচ্ছে।
ইস্ক্রিয়াস খুব বেশি পিছিয়ে নেই। তার দৃষ্টি স্থির রাইসার ওপর। বোর্ডের ভারসাম্য ধরে রেখে সে গতি বাড়াল। ঢেউ আছড়ে পড়ছে, বোর্ড লাফিয়ে উঠছে, কিন্তু তার শরীরের নিয়ন্ত্রণ একটুও নড়ছে না।
একসময় সমুদ্রের মাঝামাঝি এসে দৃশ্যটা বদলে গেল।
দূরে কুয়াশার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল এক বিশাল অন্ধকার ছায়া।
একটি বিশাল জাহাজ। জাহাজটা যেন সমুদ্রের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃশব্দ দানব। ইস্পাতের গায়ে ভোরের আলো পড়ে ম্লান ঝিলিক দিচ্ছে। বিশাল কাঠামোটা এতটাই উঁচু যে কাছাকাছি আসতেই বোঝা যায় তার প্রকৃত আকার।
রাইসা বোর্ডের গতি একটু কমাল। জলের ওপর দিয়ে সরু রেখা এঁকে তার বোর্ডটা ধীরে ধীরে গিয়ে থামল সেই বিশাল জাহাজের পাশ ঘেঁষে।
কয়েক সেকেন্ড পরেই ইস্ক্রিয়াসের বোর্ডটাও এসে দাঁড়াল ঠিক তার পাশে।
চারদিকে শুধু সমুদ্র আর সেই বিশাল ইস্পাতের দেয়াল। ঢেউ এসে ধাক্কা দিচ্ছে জাহাজের গায়ে, আর তার প্রতিধ্বনি ভেসে যাচ্ছে চারদিকে।
রাইসা ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল ইস্ক্রিয়াসের দিকে। তার ঠোঁটের কোণে আবারও সেই রহস্যময় হাসি। আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই অজানা, বিশাল জাহাজ যেন এই ধাওয়ার আসল গন্তব্য এখানেই। রাইসা ঠোঁট কামড়ে তার দিকে তাকালো। ধীরে ধীরে ওই গোলাপী আভা যুক্ত ওষ্ঠোদ্বয় গোল করে ছুঁড়ে দিল উড়ন্ত চুম্বন।
ইস্ক্রিয়াস কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারদিকের সমুদ্র যেন হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠল।
একটির পর একটি জেট বোর্ড জলের বুক চিরে এসে তাকে ঘিরে ফেলল। মুহূর্তের মধ্যে গোল করে দাঁড়িয়ে গেল তারা ইস্পাতের বৃত্তের মতো শক্ত, নিখুঁত।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ইস্ক্রিয়াসের মুখে বিন্দুমাত্র বিস্ময় নেই। বরং তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল হালকা এক হাসি।
কারণ সে জানে এটাই ছিল তার পরিকল্পনার অংশ।
এই ধাওয়া, এই পালানো, এই সমুদ্রের মাঝখানে এসে পড়া সবকিছুই ছিল একটাই উদ্দেশ্যে।
মাস্টারমাইন্ডকে সামনে আনার জন্য।
ঠিক তখনই উপরের দিক থেকে ভেসে এলো এক হাস্যরসাত্মক কণ্ঠ,
” অফিসার, ওয়েল কাম টু আওয়্যার ব্ল্যাক ওয়ার্ল্ড!”
কণ্ঠস্বরটা কর্ণগোচর হতেই ইস্ক্রিয়াস ধীরে ধীরে মাথা তুলল। বিশাল জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছে একজন। সে আর কেউ নয় ইদ্রান।
দুই হাত রেলিংয়ে রেখে দাঁড়িয়ে আছে সে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা, আত্মবিশ্বাসী হাসি যেন পুরো খেলাটাই তার নিয়ন্ত্রণে।
ভোরের আলোয় তার ছায়া দীর্ঘ হয়ে পড়েছে জাহাজের ধাতব ডেকে। ইস্ক্রিয়াস হালকা হেসে উঠল।
ঠিক তখনই রাইসা নিজের বোর্ড ছেড়ে চটপট ভঙ্গিতে জাহাজের ধাতব সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে ডেকে পৌঁছে দাঁড়াল।
ইদ্রান একটু ঝুঁকে নিচের দিকে তাকাল।
“ভয় করছে না?”
তার গলায় মৃদু বিদ্রুপ। ইস্ক্রিয়াস ধীরেসুস্থে একটা হাই তুলল। যেন এই পুরো পরিস্থিতিটা তার কাছে বিরক্তিকরভাবে স্বাভাবিক। দুহাত পকেটে গুঁজে টানটান ভঙিতে দাঁড়ালো।
ঘাড়টা একটু বাঁকিয়ে সে বলল,
“সরি ,বাট আমি ভয় পাচ্ছি না।”
কথাটা বলতে বলতে সে নিজের বোর্ড ছেড়ে জাহাজের ধাতব সিঁড়িতে পা রাখল। ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে লাগল।প্রতিটি ধাপেই তার পায়ের শব্দ ধাতব গায়ে ঠুকরে প্রতিধ্বনি তুলছে।
কয়েক মুহূর্ত পরই সে ডেকে উঠে দাঁড়াল ঠিক ইদ্রানের সামনে।
জাহাজটা দুই তলা বিশিষ্ট।নিচের ডেকে দাঁড়িয়ে আছে ইদ্রান আর ইস্ক্রিয়াস।
আর নিচের তলায়, তাদের থেকে কিছুটা দূরে, রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে রাইসা। সমুদ্রের হাওয়ায় তার চুল উড়ছে, আর চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মানুষের দিকে।
চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে ইদ্রানের লোকজন।
দুই মস্তিষ্ক। দুই পরিকল্পনা।
“ওয়েল। অফিসার তোমাকে এখানে কেন আনা হয়েছে জানো?”
ইস্ক্রিয়াস কাঁধ নাচিয়ে বলল,
“আনা হয়নি, আমি এসেছি। আরে ভাই তোমরা যেভাবে প্ল্যান বানাও, আমিও তেমন ছোটখাটো একটা প্ল্যান করলাম। বলতে পারো গেইম খেললাম।”
ইস্ক্রিয়াসের প্রশ্নে ইদ্রানের দৃষ্টি মুহূর্তেই ইস্পাতের ফলার মতো শাণিত হয়ে উঠল। ঠিক তখনই রাইসা আঙুলের তুড়ি বাজিয়ে দু’জনের মনোযোগ নিজের দিকে ফিরিয়ে আনল। অধরবক্রে প্রশান্ত এক হাসি টেনে সে মৃদুস্বরে বলল,
“ইন্সপেক্টর, আজ তোমার ভাগ্যের দিন। এতদিন যার ছায়ার পিছু ছুটেছ, আজ তাকে সামনাসামনি দেখবে।”
বাক্যটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উপরতলার ডেক থেকে ভেসে এলো এক গভীর, স্থির অথচ শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নামিয়ে দেওয়া কণ্ঠস্বর,
“Hello, Brother.”
মাত্র দুটি শব্দ।তবু সেই দুটি শব্দ যেন সমুদ্রের উত্তাল বুকে বজ্রধ্বনির মতো প্রতিধ্বনিত হলো। মুহূর্তেই ইস্ক্রিয়াস, ইদ্রান ও রাইসা তিনজনের দৃষ্টিই একসঙ্গে উঠে গেল ডেকের সর্বোচ্চ প্রান্তে।
ইস্ক্রিয়াস মাথা তুলতেই তার দৃষ্টি স্তব্ধ হয়ে গেল।
প্রথমে চোখ।তারপর ধীরে ধীরে সমগ্র অবয়ব।সময় যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে রইল।
উপরে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক যাকে কেবল সুদর্শন বললে তার প্রতি অবিচার করা হবে। সে ছিল এমন এক ব্যক্তিত্ব, যার উপস্থিতি সৌন্দর্যের সংজ্ঞাকেও অতিক্রম করে কর্তৃত্বের অভিধানে স্থান করে নেয়।
গভীর নীলাভ নয়নযুগল তীক্ষ্ণ, শীতল, নিষ্ঠুর; যেন আকাশের রং ধার করে বাজপাখির দৃষ্টিতে শিকার নিরীক্ষণ করছে। সেই চাহনির সঙ্গে একবার চোখ মিললে দ্বিতীয়বার দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়াটাই কঠিন হয়ে ওঠে।
সমুদ্রের লবণাক্ত বাতাসে এলোমেলো হয়ে উড়ছে তার কৃষ্ণবর্ণ কোঁকড়ানো কেশরাশি। নিখুঁতভাবে পরিহিত ম্যাট-ব্ল্যাক সিল্ক শার্টের উপরের দুটি বোতাম খোলা, ফলে সুগঠিত কণ্ঠাস্থি ও গলার শিরাগুলো স্পষ্ট দৃশ্যমান। শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো; দৃঢ় বাহুতে টানটান পেশির রেখা যেন মার্বেলে খোদাই করা ভাস্কর্য। কব্জিতে কালো ডায়ালের বিলাসবহুল ঘড়ি, আর ডান হাতের অনামিকায় জ্বলজ্বল করছে ঈগলখচিত প্লাটিনামের আংটি ক্ষম’তার প্রতীক, মৃ’ত্যুর স্বাক্ষর।
গাঢ় কালো ফর্মাল ট্রাউজার, ইতালীয় চামড়ার অক্সফোর্ড জুতা, প্রশস্ত স্কন্ধ, দুর্ভেদ্য দুর্গপ্রাচীরের মতো বক্ষ, দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ অবয়ব সমস্ত সাজসজ্জার মধ্যেও সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল তার নির্বিকার ভঙ্গি।
দুই হাত নিশ্চিন্তে প্যান্টের পকেটে। যেন এই পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাকে বিচলিত করতে পারে না।
তার চারপাশে কোনো গার্ড ছিল না, তবু মনে হচ্ছিল পুরো প্রমোদতরীটির নিরাপত্তাই যেন একা সেই মানুষটির উপস্থিতির উপর নির্ভরশীল।
কিছু মানুষ নিজেদের পরিচয় দেয় না।তাদের উপস্থিতিই পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। তাদের নীরবতাই আদেশ।
তাদের হাসিই হুমকি।ইস্ক্রিয়াস নিঃশ্বাস নিতেও যেন ভুলে গেল।মস্তিষ্কে বিদ্যুতের ঝলকের মতো ফিরে এলো সেই ভিডিও ফুটেজ। নীল চোখ,ঈগলখচিত আংটি,একই দৃষ্টি বুকের ভেতর প্রচণ্ড অভিঘাত আছড়ে পড়ল।
তাহলে এই মানুষটিই? এই-ই কি সেই মাস্টারমাইন্ড?
কয়েক মুহূর্তের জন্য ভাষা হারিয়ে ফেলল ইস্ক্রিয়াস।
একজন পুরুষ হয়েও সে অনায়াসে স্বীকার করতে বাধ্য এই যুবকের ব্যক্তিত্বে এমন এক দুর্বার আকর্ষণ রয়েছে, যা যুক্তিকে পরাস্ত করে দেয়। চোখ সরাতে ইচ্ছে করে না।
মনে হয়, সে নয় তার চারপাশের পৃথিবীই যেন তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।
উপরে দাঁড়িয়েই আফরিদ এহসান নিচের বিস্মিত মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে উঠল। জানকির কথাটা হঠাৎই মনে পড়ে গেল তার,
“এহসান, আপনি ভীষণ সুন্দর।”
সম্ভবত মেয়েটি ভুল বলেনি।নইলে কেন তাকে দেখলেই মানুষ কয়েক মুহূর্তের জন্য নির্বাক হয়ে যায়?
ওষ্ঠকোণে কৌতুকের রেখা টেনে আফরিদ ধীরস্বরে বলল,
“দেখা শেষ, ব্রাদার? ছেলে হয়ে আর কতক্ষণ এভাবে তাকিয়ে থাকবে?”
বাক্যটি শুনেই যেন ঘোর ভাঙল ইস্ক্রিয়াসের।সে সত্যিই অপলক তাকিয়ে ছিল।আফরিদ রেলিংয়ে কনুই রেখে অলস ভঙ্গিতে হেলান দিল। অধরপুটে দুর্বোধ্য, দুর্লভ এক হাসি ফুটিয়ে উচ্চারণ করল,
“Welcome to our blood world Inspector Iskrias.”
ইস্ক্রিয়াসের দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল।
“তাহলে,তুমিই সেই মাস্টারমাইন্ড?”
আফরিদ হালকা মাথা কাত করল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
“মাস্টার? না ওটা খুব ছোট উপাধি। চাইলে আমাকে প্রিন্সিপাল বলতে পারো।”
ইদ্রানের ঠোঁটের কোণে অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাসি ফুটে উঠল। রাইসা অস্বস্তিতে নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইল।
পরের মুহূর্তেই আফরিদ ডেকের রেলিং টপকে প্রায় দশ ফুট নিচে অবলীলায় লাফিয়ে পড়ল।
অবতরণের পর যেন কিছুই ঘটেনি এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাতের ধুলো ঝেড়ে সোজা ইস্ক্রিয়াসের সামনে এসে দাঁড়াল।
দু’জনের মাঝখানে এখন মাত্র কয়েক হাত দূরত্ব।
আফরিদ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“এই তো চলে এলাম। এতদিন ধরে দেখতে চাইছিলে না?”
ইস্ক্রিয়াসের চোখ অনিবার্যভাবে গিয়ে থামল সেই ঈগলখচিত আংটিতে। একই প্রতীক,যা প্রতিটি হ’ত্যা’কাণ্ডের শেষে মৃ’তদেহের গায়ে রেখে যাওয়া হতো।
তারপর ধীরে ধীরে দৃষ্টি উঠে এলো আফরিদের নীলাভ, ধারালো নয়নযুগলে।
আফরিদ ঠোঁট কামড়ে চাপা হাসল।
“কী ব্যাপার, অফিসার আমাকে দেখে নাকি ক্রাশ খেয়ে বসেছ?”
রাইসার ঠোঁট ফসকে চাপা হাসি বেরিয়ে এলো। আফরিদ যে ইস্ক্রিয়াসকে বড্ড জ্বা’লা’চ্ছে!
ইস্ক্রিয়াসের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। আফরিদ দুই হাত প্রসারিত করে নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ছেলেদের কাছেই যদি একটা ছেলে সেফ না থাকে, তাহলে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সত্যিই অন্ধকার। দৃষ্টি সরাও, ভাই আমার কিন্তু লজ্জা লাগছে।”
ইস্ক্রিয়াস চোয়াল শক্ত করে এক পা এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠে বিদ্রূপের বদলে ছিল কেবল ঘৃ’ণা।
“তোমার রসিকতা শেষ হলে শুনে রাখো, আফরিদ এহসান। সৌন্দর্য মানুষকে বিস্মিত করতে পারে, কিন্তু তোমার হাতে লেগে থাকা রক্ত সেই মুখোশ বেশিক্ষণ টিকতে দেবে না। যেদিন হাতকড়া পরাব, সেদিন এই অহংকারটাও খুলে পড়বে।”
আফরিদ কয়েক সেকেন্ড নির্বাক তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে জিভ দিয়ে দাঁত ছুঁয়ে হাসল। যেন কথাগুলো তাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শই করেনি। দু’হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে অলস ভঙ্গিতে মাথা কাত করল।
“উফফ… এতক্ষণে বুঝলাম!”
ইস্ক্রিয়াস ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আফরিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাটকীয় গলায় বলল,
“প্রথমে ভেবেছিলাম আমার চেহারা দেখে ক্রাশ খেয়েছ। এখন বুঝছি ব্যাপারটা আরও সিরিয়াস।আমাকে হাতকড়া পরানোর অজুহাতে হাত ধরতে চাও!”
রাইসা ঠোঁট চেপে হাসি আটকে রাখল। ইদ্রান কপালে হাত ঠেকিয়ে মাথা নাড়ল।আফরিদ আবারও থামল না।
ইস্ক্রিয়াসের দিকে এক পা এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,
“শোনো অফিসার, এতক্ষণ ধরে যেভাবে আমাকে দেখছ, বাইরে কেউ দেখলে কিন্তু ভুল বুঝবে। আমার ওয়াইফ যদি শুনে কোনো পুলিশ অফিসার আমাকে নিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখছে, তাহলে আগে তোমাকে জেরা করবে, পরে আমাকে!”
ইস্ক্রিয়াসের চোখে এবার রীতিমতো আ’গুন জ্বলে উঠল।
আফরিদ নিষ্পাপ মুখ করে দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করল।
“আচ্ছা আচ্ছা, রাগ কোরো না। আমি কিন্তু স্ট্রেইট! আমার জানকি বাচ্চা ছাড়া অন্য কারও জন্য হৃদয়ে এক ইঞ্চি জায়গাও খালি নেই। তাই দৃষ্টি একটু সামলে রাখো, ব্রাদার আমার চরিত্র নষ্ট করার চেষ্টা কোরো না!”
ইদ্রান এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। নিচু স্বরে হেসে ফেলল, আর রাইসা মুখ ফিরিয়ে কাঁধ কাঁপিয়ে হাসি চাপার বৃথা চেষ্টা করতে লাগল। ইস্ক্রিয়াস অবশ্য ক্রোধে মুষ্টিবদ্ধ হাত আরও শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল।


রাতের গভীরতা তখন প্রায় নিঃশব্দ। সমগ্র এহসান মঞ্জিল ঘুমের অতলে নিমজ্জিত। কেবল একটি কক্ষে আতঙ্কের দমবন্ধ করা শ্বাসপ্রশ্বাস প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
হসপিটালের শীতল মর্গ। সাদা আলোয় ভেসে থাকা নির্জন কক্ষ।
দরজাটি সশব্দে খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল ন্যান্সি।
তার চোখদুটি রক্তাভ, অশ্রুতে ঝাপসা দৃষ্টি। কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গেল মাঝখানে রাখা স্ট্রেচারের দিকে।
সেখানে শায়িত এক দীর্ঘদেহী পুরুষ।সম্পূর্ণ দেহ শুভ্র কাফনে আবৃত। ন্যান্সির বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই শূন্য হয়ে গেল।
কাঁপা হাতে কাপড়টা সরাতেই পরিচিত সেই মুখশ্রী।
আফরিদ এহসান।
“না…
গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না।পরমুহূর্তেই হুঙ্কারের মতো আর্ত’নাদ বেরিয়ে এলো তার বুক চিরে।সে ঝাঁপিয়ে পড়ল আফরিদের বুকে।দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে উন্মাদের মতো ঝাঁকাতে লাগল তাকে।
“আফরিদ? উঠুন… শুনছেন? প্লিজ উঠুন…
কোনো সাড়া নেই। ন্যান্সির স্পন্দন বেগতিক হলো! স্তব্ধের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। কাঁপা কাঁপা গলায় অধর ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো।
“এই আফরিদ… আমার দিকে তাকান… আল্লাহর দোহাই লাগে… উঠুন না…
কণ্ঠ ভেঙে করুণ বিলাপে পরিণত হলো।অশ্রু ঝরে পড়ছে কাফনের ওপর।
“আমাকে ছেড়ে যেতে পারেন না আপনি… শুনছেন? আমাদের বাচ্চাটা… আমাদের বাচ্চার কী হবে?”
কিন্তু নিথর দেহটি একবারও সাড়া দিল না।ন্যান্সির শ্বাস আটকে আসতে লাগল। হঠাৎ সে বুকফাটা চিৎকার করে উঠল,
“আফরিদ…
ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল ন্যান্সি।হাঁপাচ্ছে।মনে হচ্ছে ফুসফুসে বাতাস পৌঁছাচ্ছে না।
কপাল, গলা, ঘাড় সব ভিজে গেছে ঠান্ডা ঘামে।
চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে কয়েক সেকেন্ড লেগে গেল।
না এটা মর্গ নয়। এটা তার নিজের বেডরুম।
ঘরজুড়ে আধো অন্ধকার। জানালার ফাঁক গলে চাঁদের ফ্যাকাশে আলো এসে পড়েছে দেয়ালে ঝোলানো একটি ছবির ওপর। ছবিটিতে আফরিদের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ ন্যান্সি। দু’জনের মুখেই নির্মল হাসি। ন্যান্সি কয়েক মুহূর্ত নির্বাক তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁপতে কাঁপতে বেডসাইড টেবিল থেকে পানিভর্তি গ্লাস তুলে এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেলল। তবুও বুকের ধুকপুকানি কমল না। চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট ফটোফ্রেমে।আফরিদের একরাশ দুষ্টু হাসি।সেই হাসিটাই ন্যান্সির সবচেয়ে প্রিয়।
কাঁপা আঙুল দিয়ে ছবিটার কাঁচ ছুঁয়ে দিল সে।
“আফরিদ, কোথায় আপনি?”
চোখ বেয়ে আবারও অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
“ঠিক আছেন তো? কেন এমন স্বপ্ন দেখলাম?কেন মৃ’ত্যুর সেই বিভী’ষিকাময় দৃশ্য?”
অকারণেই মনের ভেতর এক অশুভ আশঙ্কা বিষাক্ত লতার মতো বিস্তার লাভ করল।
জানালার বাইরের ঘন অন্ধকারে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এক ছায়ামূর্তি ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকিয়ে রইল ন্যান্সির দিকে।
দীর্ঘাঙ্গী এক রমণী। রক্তিম লিপগ্লসে চকচক করছে তার অধরযুগল।তীক্ষ্ণ নয়নে অদ্ভুত এক শিকারির ধৈর্য।
তার মুখে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল শীতল, রহস্যময় হাসি।
অতঃপর অত্যন্ত নিম্নস্বরে, যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলল “লিটল মাউস!”
চলবে…………।
(
প্রজাপতিরা পেইজে পঞ্চাশ হাজার পূর্ণ হওয়াতে ছোটখাটো প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। বিস্তারিত কমেন্ট বক্সে
!)
আমার আইডি Farhana Nijum See less

[পর্ব ৮১]

লেখিকাফারহানানিঝুম

(
দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)
(
কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
[দ্বিতীয় খন্ড]
Port Vell এর শান্ত জলে কয়েকটি নৌকা নিশ্চুপ ভেসে আছে। সারা রাতের ক্লান্তির পর যেন তারাও বিশ্রাম নিচ্ছে। চারপাশে এমন এক নিস্তব্ধতা, যেখানে শহরের কোলাহলও যেন ঘুমিয়ে আছে।
ঠিক সেই সময়ই রাস্তার একপাশ দিয়ে হেঁটে চলেছে ইস্ক্রিয়াস।
পরনে অ্যাশ রঙের একটি জ্যাকেট, দু’হাত গুঁজে রেখেছে পকেটে। পদক্ষেপগুলো ধীর ক্লান্ত, ভারী। যেন প্রতিটি কদমে তার শরীরের সাথে সাথে মনটাও একটু একটু করে নুয়ে পড়ছে। ভোরের হালকা ঠান্ডা বাতাস তার চুল ছুঁয়ে যায়, কিন্তু তাতে কোনো সাড়া দেয় না সে।
সবে সকাল সাতটা। এই এত ভোরে শহরের রাস্তা প্রায় ফাঁকা। কোথাও কোনো তাড়াহুড়ো নেই, নেই মানুষের কোলাহল শুধু দূরে কোথাও এক-দু’টি গাড়ির ক্ষীণ শব্দ।
সতর্ক ভঙ্গিতে এগোতে এগোতে ইস্ক্রিয়াস পৌঁছে গেল একটি পেট্রোল পাম্পের কাছে। চারপাশে তাকিয়ে নিল একবার অভ্যাসবশত, যেন অদৃশ্য কোনো বিপদকে আগেভাগেই চিনে নিতে চায় সে।
হঠাৎই নিস্তব্ধতা ভেঙে পিছন থেকে ভেসে এলো এক নারীকণ্ঠ,
“ইন্সপেক্টর,ডিড ইউ মিস মি?”
কণ্ঠস্বরটি পরিচিত। অত্যন্ত পরিচিত।চকিতে ঘুরে দাঁড়ালো ইস্ক্রিয়াস। তার চোখে মুহূর্তেই নেমে এলো হিমশীতল এক দৃষ্টি যে দৃষ্টি মানুষের বুকের গভীরতম কোণ পর্যন্ত জমিয়ে দিতে পারে।
দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাইসা।
ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি, চোখে অদ্ভুত এক খেলা দুষ্টুমি, রহস্য আর আত্মবিশ্বাসের মিশেল। যেন সে জানে, এই হঠাৎ উপস্থিতি ইস্ক্রিয়াসকে ঠিক কতটা বিস্মিত করবে।
ইস্ক্রিয়াসের মুখমণ্ডল ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠলো।
চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি আরও গম্ভীর।
“ক্রিমিনাল।”
রাইসা এমন প্রত্যুত্তরে হালকা হাসলো, বোধহয় প্রথম থেকেই প্রস্তুত ছিল সে। দেয়াল ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। এদিক ওদিক তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“এ কেমন আপ্যায়ন ইন্সপেক্টর? আফটার অল এতদিন পর ফিরেছি এভাবে তুমি ক্রিমিনাল বলতে পারো না!”
ইস্ক্রিয়াস ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“তোমাদের মতো ঠকবাজ ক্রিমিনালকে আপ্যায়ন করব? লাইক সিরিয়াসলি, রাইসা?”
রাইসা তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ইস্ক্রিয়াসের সেই তীক্ষ্ণ, কঠিন চোখের দৃষ্টি যেন অনেককেই কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে কিন্তু রাইসার চোখে কোনো ভয় নেই। বরং সেখানে এক অদ্ভুত নির্ভারতা। অকস্মাৎ চোখ টিপে ইস্ক্রিয়াসের দিকে চেয়ে। ক্ষণিকের জন্য হৃদস্পন্দন থমকে গেল আইনের লোকটির।
স্বতঃস্ফূর্ত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে রাইসা হালকা হাসল।বলল সে শান্ত গলায়।
“ওকে, ওকে। কুল ডাউন
তারপর একটু ঝুঁকে, যেন মজা করেই যোগ করল,
“আচ্ছা একটা কথা বলো, ক্রিমিনাল এখানে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তাও আবার পলাতক তাকে ধরবে না?”
কথাগুলো ঝুলে রইল কয়েক সেকেন্ড।
ইস্ক্রিয়াসের চোখ সরু হয়ে এলো। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হঠাৎই সতর্ক সংকেত দিতে শুরু করেছে। যেন এই নিরীহ কথোপকথনের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো চাল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই রাইসা হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল।
পরের মুহূর্তে সে ছুটতে শুরু করল খোলা রাস্তায়, বজ্রগতিতে।
“কাম অন ইন্সপেক্টর, ধরো আমায়!”
তার দৌড় ছিল অবিশ্বাস্য দ্রুত, অথচ নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রিত। যেন শহরের প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি মোড় তার মুখস্থ। ইস্ক্রিয়াস এক মুহূর্তও দেরি করল না।
তার পেশীগুলো মুহূর্তে সজাগ হয়ে উঠল। শক্ত পদক্ষেপে সে রাইসার পিছু নিল।
ভোরের শান্ত রাস্তা হঠাৎই রূপ নিল এক উত্তেজনাপূর্ণ ধাওয়ায়।
রাইসা দৌড়াতে দৌড়াতে রাস্তার পাশে রাখা ধাতব ব্যারিকেডের ওপর হাত রেখে শরীরটাকে ভর দিয়ে এক লাফে টপকে গেল। তার চলাফেরায় ছিল এক ধরনের প্রশিক্ষিত স্বচ্ছন্দতা।
ইস্ক্রিয়াসও পিছিয়ে রইল না। লম্বা পা ফেলে দ্রুত সেই ব্যারিকেড পার হয়ে আবার গতি বাড়াল।
রাস্তার পাশে কয়েকটি ডেলিভারি ভ্যান দাঁড়িয়ে ছিল। রাইসা হঠাৎই সেগুলোর মাঝখানের সরু ফাঁক দিয়ে সা’পের মতো সরে গেল।
ইস্ক্রিয়াস তার পিছু পিছু ঢুকে পড়ল সেই ফাঁকে, গাড়ির ধাতব গায়ে তার কাঁধ হালকা ধাক্কা খেলেও গতি কমাল না।
একসময় সামনে পড়ল ছোট্ট একটি বাজারের পথ। সেখানে কিছু কাঠের বাক্স আর ফলের খালি ক্রেট এলোমেলোভাবে পড়ে আছে।
রাইসা দৌড়ের মাঝেই একটি ক্রেটের ওপর পা রেখে শরীর ঘুরিয়ে পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল চলাফেরাটা এতটাই দ্রুত যে চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল।
ইস্ক্রিয়াস সেই ক্রেটগুলোকে পাশ কাটিয়ে এগোল, একটিকে পায়ের ধাক্কায় সরিয়ে দিল, যেন এগুলো তার পথ আটকানোর মতো কিছুই নয়।
ভোরের ঠান্ডা বাতাসে এখন দুজনের দম নেওয়ার শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। রাইসার চুল বাতাসে উড়ছে, তার দৌড়ে আছে বুনো স্বাধীনতার ছন্দ।
আর ইস্ক্রিয়াস তার দৌড়ে আছে শিকারির ধৈর্য আর দৃঢ়তা। এই কন্যাকে তার যেকরেই হোক আয়ত্তে আনতেই হবে।
দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎই রাস্তার শেষ প্রান্তটা খুলে গেল সমুদ্রের দিকে। সামনে বিস্তৃত নীল জলরাশি, ভোরের আলোয় যার গায়ে ঝিকিমিকি করছে রুপালি আভা। বাতাসে লবণের গন্ধ, আর ঢেউয়ের মৃদু শব্দ যেন দূরের কোনো অজানা সুরের মতো কানে বাজছে।
কাঠের লম্বা বোর্ডওয়াকটা সমুদ্রের ওপর এগিয়ে গেছে অনেকটা দূর পর্যন্ত। পাশে সারি সারি বাঁধা আছে কিছু বোর্ড জল কেটে চলার জন্য ব্যবহৃত দ্রুতগতির সার্ফবোর্ড।
রাইসা এক মুহূর্তও থামল না। দৌড়ের গতি কমাতে কমাতেই সে একটা বোর্ডের ওপর লাফ দিয়ে উঠল। অবলীলায় দু’পা সামলে নিল, যেন এই বোর্ড তার বহুদিনের সঙ্গী। হাতের কাছে রাখা ছোট মোটরটা টান দিতেই বোর্ডটা কেঁপে উঠল, তারপর মুহূর্তের মধ্যে জলের ওপর ছুটে চলতে শুরু করল।
পেছনে দাঁড়িয়ে ইস্ক্রিয়াস সবকিছু এক ঝলকে দেখে নিল। তার চোখে তখন তীক্ষ্ণ দৃঢ়তা।
সে-ও পাশের আরেকটা বোর্ডে লাফিয়ে উঠল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভারসাম্য ঠিক করে মোটর চালু করতেই বোর্ডটা গর্জে উঠল।
পরের মুহূর্তেই দুটো বোর্ড সমুদ্রের বুক চিরে ছুটতে শুরু করল।জলের ওপর দিয়ে এগোতে এগোতে বোর্ডের নিচে ঢেউগুলো ছিটকে সাদা ফেনা হয়ে উঠছে। বাতাস তীব্র বেগে এসে আ’ঘাত করছে মুখে, চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে।
রাইসা সামনে। তার বোর্ডটা ঢেউয়ের ওপর দিয়ে তীরের মতো ছুটছে। মাঝে মাঝে শরীর হালকা বাঁকিয়ে দিক বদলাচ্ছে, কখনো ঢেউয়ের চূড়া ছুঁয়ে আবার নিচে নেমে যাচ্ছে।
ইস্ক্রিয়াস খুব বেশি পিছিয়ে নেই। তার দৃষ্টি স্থির রাইসার ওপর। বোর্ডের ভারসাম্য ধরে রেখে সে গতি বাড়াল। ঢেউ আছড়ে পড়ছে, বোর্ড লাফিয়ে উঠছে, কিন্তু তার শরীরের নিয়ন্ত্রণ একটুও নড়ছে না।
একসময় সমুদ্রের মাঝামাঝি এসে দৃশ্যটা বদলে গেল।
দূরে কুয়াশার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল এক বিশাল অন্ধকার ছায়া।
একটি বিশাল জাহাজ। জাহাজটা যেন সমুদ্রের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃশব্দ দানব। ইস্পাতের গায়ে ভোরের আলো পড়ে ম্লান ঝিলিক দিচ্ছে। বিশাল কাঠামোটা এতটাই উঁচু যে কাছাকাছি আসতেই বোঝা যায় তার প্রকৃত আকার।
রাইসা বোর্ডের গতি একটু কমাল। জলের ওপর দিয়ে সরু রেখা এঁকে তার বোর্ডটা ধীরে ধীরে গিয়ে থামল সেই বিশাল জাহাজের পাশ ঘেঁষে।
কয়েক সেকেন্ড পরেই ইস্ক্রিয়াসের বোর্ডটাও এসে দাঁড়াল ঠিক তার পাশে।
চারদিকে শুধু সমুদ্র আর সেই বিশাল ইস্পাতের দেয়াল। ঢেউ এসে ধাক্কা দিচ্ছে জাহাজের গায়ে, আর তার প্রতিধ্বনি ভেসে যাচ্ছে চারদিকে।
রাইসা ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল ইস্ক্রিয়াসের দিকে। তার ঠোঁটের কোণে আবারও সেই রহস্যময় হাসি। আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই অজানা, বিশাল জাহাজ যেন এই ধাওয়ার আসল গন্তব্য এখানেই। রাইসা ঠোঁট কামড়ে তার দিকে তাকালো। ধীরে ধীরে ওই গোলাপী আভা যুক্ত ওষ্ঠোদ্বয় গোল করে ছুঁড়ে দিল উড়ন্ত চুম্বন।
ইস্ক্রিয়াস কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারদিকের সমুদ্র যেন হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠল।
একটির পর একটি জেট বোর্ড জলের বুক চিরে এসে তাকে ঘিরে ফেলল। মুহূর্তের মধ্যে গোল করে দাঁড়িয়ে গেল তারা ইস্পাতের বৃত্তের মতো শক্ত, নিখুঁত।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ইস্ক্রিয়াসের মুখে বিন্দুমাত্র বিস্ময় নেই। বরং তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল হালকা এক হাসি।
কারণ সে জানে এটাই ছিল তার পরিকল্পনার অংশ।
এই ধাওয়া, এই পালানো, এই সমুদ্রের মাঝখানে এসে পড়া সবকিছুই ছিল একটাই উদ্দেশ্যে।
মাস্টারমাইন্ডকে সামনে আনার জন্য।
ঠিক তখনই উপরের দিক থেকে ভেসে এলো এক হাস্যরসাত্মক কণ্ঠ,
” অফিসার, ওয়েল কাম টু আওয়্যার ব্ল্যাক ওয়ার্ল্ড!”
কণ্ঠস্বরটা কর্ণগোচর হতেই ইস্ক্রিয়াস ধীরে ধীরে মাথা তুলল। বিশাল জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছে একজন। সে আর কেউ নয় ইদ্রান।
দুই হাত রেলিংয়ে রেখে দাঁড়িয়ে আছে সে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা, আত্মবিশ্বাসী হাসি যেন পুরো খেলাটাই তার নিয়ন্ত্রণে।
ভোরের আলোয় তার ছায়া দীর্ঘ হয়ে পড়েছে জাহাজের ধাতব ডেকে। ইস্ক্রিয়াস হালকা হেসে উঠল।
ঠিক তখনই রাইসা নিজের বোর্ড ছেড়ে চটপট ভঙ্গিতে জাহাজের ধাতব সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে ডেকে পৌঁছে দাঁড়াল।
ইদ্রান একটু ঝুঁকে নিচের দিকে তাকাল।
“ভয় করছে না?”
তার গলায় মৃদু বিদ্রুপ। ইস্ক্রিয়াস ধীরেসুস্থে একটা হাই তুলল। যেন এই পুরো পরিস্থিতিটা তার কাছে বিরক্তিকরভাবে স্বাভাবিক। দুহাত পকেটে গুঁজে টানটান ভঙিতে দাঁড়ালো।
ঘাড়টা একটু বাঁকিয়ে সে বলল,
“সরি ,বাট আমি ভয় পাচ্ছি না।”
কথাটা বলতে বলতে সে নিজের বোর্ড ছেড়ে জাহাজের ধাতব সিঁড়িতে পা রাখল। ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে লাগল।প্রতিটি ধাপেই তার পায়ের শব্দ ধাতব গায়ে ঠুকরে প্রতিধ্বনি তুলছে।
কয়েক মুহূর্ত পরই সে ডেকে উঠে দাঁড়াল ঠিক ইদ্রানের সামনে।
জাহাজটা দুই তলা বিশিষ্ট।নিচের ডেকে দাঁড়িয়ে আছে ইদ্রান আর ইস্ক্রিয়াস।
আর নিচের তলায়, তাদের থেকে কিছুটা দূরে, রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে রাইসা। সমুদ্রের হাওয়ায় তার চুল উড়ছে, আর চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মানুষের দিকে।
চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে ইদ্রানের লোকজন।
দুই মস্তিষ্ক। দুই পরিকল্পনা।
“ওয়েল। অফিসার তোমাকে এখানে কেন আনা হয়েছে জানো?”
ইস্ক্রিয়াস কাঁধ নাচিয়ে বলল,
“আনা হয়নি, আমি এসেছি। আরে ভাই তোমরা যেভাবে প্ল্যান বানাও, আমিও তেমন ছোটখাটো একটা প্ল্যান করলাম। বলতে পারো গেইম খেললাম।”
ইস্ক্রিয়াসের প্রশ্নে ইদ্রানের দৃষ্টি মুহূর্তেই ইস্পাতের ফলার মতো শাণিত হয়ে উঠল। ঠিক তখনই রাইসা আঙুলের তুড়ি বাজিয়ে দু’জনের মনোযোগ নিজের দিকে ফিরিয়ে আনল। অধরবক্রে প্রশান্ত এক হাসি টেনে সে মৃদুস্বরে বলল,
“ইন্সপেক্টর, আজ তোমার ভাগ্যের দিন। এতদিন যার ছায়ার পিছু ছুটেছ, আজ তাকে সামনাসামনি দেখবে।”
বাক্যটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উপরতলার ডেক থেকে ভেসে এলো এক গভীর, স্থির অথচ শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নামিয়ে দেওয়া কণ্ঠস্বর,
“Hello, Brother.”
মাত্র দুটি শব্দ।তবু সেই দুটি শব্দ যেন সমুদ্রের উত্তাল বুকে বজ্রধ্বনির মতো প্রতিধ্বনিত হলো। মুহূর্তেই ইস্ক্রিয়াস, ইদ্রান ও রাইসা তিনজনের দৃষ্টিই একসঙ্গে উঠে গেল ডেকের সর্বোচ্চ প্রান্তে।
ইস্ক্রিয়াস মাথা তুলতেই তার দৃষ্টি স্তব্ধ হয়ে গেল।
প্রথমে চোখ।তারপর ধীরে ধীরে সমগ্র অবয়ব।সময় যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে রইল।
উপরে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক যাকে কেবল সুদর্শন বললে তার প্রতি অবিচার করা হবে। সে ছিল এমন এক ব্যক্তিত্ব, যার উপস্থিতি সৌন্দর্যের সংজ্ঞাকেও অতিক্রম করে কর্তৃত্বের অভিধানে স্থান করে নেয়।
গভীর নীলাভ নয়নযুগল তীক্ষ্ণ, শীতল, নিষ্ঠুর; যেন আকাশের রং ধার করে বাজপাখির দৃষ্টিতে শিকার নিরীক্ষণ করছে। সেই চাহনির সঙ্গে একবার চোখ মিললে দ্বিতীয়বার দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়াটাই কঠিন হয়ে ওঠে।
সমুদ্রের লবণাক্ত বাতাসে এলোমেলো হয়ে উড়ছে তার কৃষ্ণবর্ণ কোঁকড়ানো কেশরাশি। নিখুঁতভাবে পরিহিত ম্যাট-ব্ল্যাক সিল্ক শার্টের উপরের দুটি বোতাম খোলা, ফলে সুগঠিত কণ্ঠাস্থি ও গলার শিরাগুলো স্পষ্ট দৃশ্যমান। শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো; দৃঢ় বাহুতে টানটান পেশির রেখা যেন মার্বেলে খোদাই করা ভাস্কর্য। কব্জিতে কালো ডায়ালের বিলাসবহুল ঘড়ি, আর ডান হাতের অনামিকায় জ্বলজ্বল করছে ঈগলখচিত প্লাটিনামের আংটি ক্ষম’তার প্রতীক, মৃ’ত্যুর স্বাক্ষর।
গাঢ় কালো ফর্মাল ট্রাউজার, ইতালীয় চামড়ার অক্সফোর্ড জুতা, প্রশস্ত স্কন্ধ, দুর্ভেদ্য দুর্গপ্রাচীরের মতো বক্ষ, দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ অবয়ব সমস্ত সাজসজ্জার মধ্যেও সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল তার নির্বিকার ভঙ্গি।
দুই হাত নিশ্চিন্তে প্যান্টের পকেটে। যেন এই পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাকে বিচলিত করতে পারে না।
তার চারপাশে কোনো গার্ড ছিল না, তবু মনে হচ্ছিল পুরো প্রমোদতরীটির নিরাপত্তাই যেন একা সেই মানুষটির উপস্থিতির উপর নির্ভরশীল।
কিছু মানুষ নিজেদের পরিচয় দেয় না।তাদের উপস্থিতিই পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। তাদের নীরবতাই আদেশ।
তাদের হাসিই হুমকি।ইস্ক্রিয়াস নিঃশ্বাস নিতেও যেন ভুলে গেল।মস্তিষ্কে বিদ্যুতের ঝলকের মতো ফিরে এলো সেই ভিডিও ফুটেজ। নীল চোখ,ঈগলখচিত আংটি,একই দৃষ্টি বুকের ভেতর প্রচণ্ড অভিঘাত আছড়ে পড়ল।
তাহলে এই মানুষটিই? এই-ই কি সেই মাস্টারমাইন্ড?
কয়েক মুহূর্তের জন্য ভাষা হারিয়ে ফেলল ইস্ক্রিয়াস।
একজন পুরুষ হয়েও সে অনায়াসে স্বীকার করতে বাধ্য এই যুবকের ব্যক্তিত্বে এমন এক দুর্বার আকর্ষণ রয়েছে, যা যুক্তিকে পরাস্ত করে দেয়। চোখ সরাতে ইচ্ছে করে না।
মনে হয়, সে নয় তার চারপাশের পৃথিবীই যেন তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।
উপরে দাঁড়িয়েই আফরিদ এহসান নিচের বিস্মিত মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে উঠল। জানকির কথাটা হঠাৎই মনে পড়ে গেল তার,
“এহসান, আপনি ভীষণ সুন্দর।”
সম্ভবত মেয়েটি ভুল বলেনি।নইলে কেন তাকে দেখলেই মানুষ কয়েক মুহূর্তের জন্য নির্বাক হয়ে যায়?
ওষ্ঠকোণে কৌতুকের রেখা টেনে আফরিদ ধীরস্বরে বলল,
“দেখা শেষ, ব্রাদার? ছেলে হয়ে আর কতক্ষণ এভাবে তাকিয়ে থাকবে?”
বাক্যটি শুনেই যেন ঘোর ভাঙল ইস্ক্রিয়াসের।সে সত্যিই অপলক তাকিয়ে ছিল।আফরিদ রেলিংয়ে কনুই রেখে অলস ভঙ্গিতে হেলান দিল। অধরপুটে দুর্বোধ্য, দুর্লভ এক হাসি ফুটিয়ে উচ্চারণ করল,
“Welcome to our blood world Inspector Iskrias.”
ইস্ক্রিয়াসের দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল।
“তাহলে,তুমিই সেই মাস্টারমাইন্ড?”
আফরিদ হালকা মাথা কাত করল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
“মাস্টার? না ওটা খুব ছোট উপাধি। চাইলে আমাকে প্রিন্সিপাল বলতে পারো।”
ইদ্রানের ঠোঁটের কোণে অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাসি ফুটে উঠল। রাইসা অস্বস্তিতে নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইল।
পরের মুহূর্তেই আফরিদ ডেকের রেলিং টপকে প্রায় দশ ফুট নিচে অবলীলায় লাফিয়ে পড়ল।
অবতরণের পর যেন কিছুই ঘটেনি এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাতের ধুলো ঝেড়ে সোজা ইস্ক্রিয়াসের সামনে এসে দাঁড়াল।
দু’জনের মাঝখানে এখন মাত্র কয়েক হাত দূরত্ব।
আফরিদ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“এই তো চলে এলাম। এতদিন ধরে দেখতে চাইছিলে না?”
ইস্ক্রিয়াসের চোখ অনিবার্যভাবে গিয়ে থামল সেই ঈগলখচিত আংটিতে। একই প্রতীক,যা প্রতিটি হ’ত্যা’কাণ্ডের শেষে মৃ’তদেহের গায়ে রেখে যাওয়া হতো।
তারপর ধীরে ধীরে দৃষ্টি উঠে এলো আফরিদের নীলাভ, ধারালো নয়নযুগলে।
আফরিদ ঠোঁট কামড়ে চাপা হাসল।
“কী ব্যাপার, অফিসার আমাকে দেখে নাকি ক্রাশ খেয়ে বসেছ?”
রাইসার ঠোঁট ফসকে চাপা হাসি বেরিয়ে এলো। আফরিদ যে ইস্ক্রিয়াসকে বড্ড জ্বা’লা’চ্ছে!
ইস্ক্রিয়াসের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। আফরিদ দুই হাত প্রসারিত করে নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ছেলেদের কাছেই যদি একটা ছেলে সেফ না থাকে, তাহলে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সত্যিই অন্ধকার। দৃষ্টি সরাও, ভাই আমার কিন্তু লজ্জা লাগছে।”
ইস্ক্রিয়াস চোয়াল শক্ত করে এক পা এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠে বিদ্রূপের বদলে ছিল কেবল ঘৃ’ণা।
“তোমার রসিকতা শেষ হলে শুনে রাখো, আফরিদ এহসান। সৌন্দর্য মানুষকে বিস্মিত করতে পারে, কিন্তু তোমার হাতে লেগে থাকা রক্ত সেই মুখোশ বেশিক্ষণ টিকতে দেবে না। যেদিন হাতকড়া পরাব, সেদিন এই অহংকারটাও খুলে পড়বে।”
আফরিদ কয়েক সেকেন্ড নির্বাক তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে জিভ দিয়ে দাঁত ছুঁয়ে হাসল। যেন কথাগুলো তাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শই করেনি। দু’হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে অলস ভঙ্গিতে মাথা কাত করল।
“উফফ… এতক্ষণে বুঝলাম!”
ইস্ক্রিয়াস ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আফরিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাটকীয় গলায় বলল,
“প্রথমে ভেবেছিলাম আমার চেহারা দেখে ক্রাশ খেয়েছ। এখন বুঝছি ব্যাপারটা আরও সিরিয়াস।আমাকে হাতকড়া পরানোর অজুহাতে হাত ধরতে চাও!”
রাইসা ঠোঁট চেপে হাসি আটকে রাখল। ইদ্রান কপালে হাত ঠেকিয়ে মাথা নাড়ল।আফরিদ আবারও থামল না।
ইস্ক্রিয়াসের দিকে এক পা এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,
“শোনো অফিসার, এতক্ষণ ধরে যেভাবে আমাকে দেখছ, বাইরে কেউ দেখলে কিন্তু ভুল বুঝবে। আমার ওয়াইফ যদি শুনে কোনো পুলিশ অফিসার আমাকে নিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখছে, তাহলে আগে তোমাকে জেরা করবে, পরে আমাকে!”
ইস্ক্রিয়াসের চোখে এবার রীতিমতো আ’গুন জ্বলে উঠল।
আফরিদ নিষ্পাপ মুখ করে দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করল।
“আচ্ছা আচ্ছা, রাগ কোরো না। আমি কিন্তু স্ট্রেইট! আমার জানকি বাচ্চা ছাড়া অন্য কারও জন্য হৃদয়ে এক ইঞ্চি জায়গাও খালি নেই। তাই দৃষ্টি একটু সামলে রাখো, ব্রাদার আমার চরিত্র নষ্ট করার চেষ্টা কোরো না!”
ইদ্রান এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। নিচু স্বরে হেসে ফেলল, আর রাইসা মুখ ফিরিয়ে কাঁধ কাঁপিয়ে হাসি চাপার বৃথা চেষ্টা করতে লাগল। ইস্ক্রিয়াস অবশ্য ক্রোধে মুষ্টিবদ্ধ হাত আরও শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল।


রাতের গভীরতা তখন প্রায় নিঃশব্দ। সমগ্র এহসান মঞ্জিল ঘুমের অতলে নিমজ্জিত। কেবল একটি কক্ষে আতঙ্কের দমবন্ধ করা শ্বাসপ্রশ্বাস প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
হসপিটালের শীতল মর্গ। সাদা আলোয় ভেসে থাকা নির্জন কক্ষ।
দরজাটি সশব্দে খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল ন্যান্সি।
তার চোখদুটি রক্তাভ, অশ্রুতে ঝাপসা দৃষ্টি। কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গেল মাঝখানে রাখা স্ট্রেচারের দিকে।
সেখানে শায়িত এক দীর্ঘদেহী পুরুষ।সম্পূর্ণ দেহ শুভ্র কাফনে আবৃত। ন্যান্সির বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই শূন্য হয়ে গেল।
কাঁপা হাতে কাপড়টা সরাতেই পরিচিত সেই মুখশ্রী।
আফরিদ এহসান।
“না…
গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না।পরমুহূর্তেই হুঙ্কারের মতো আর্ত’নাদ বেরিয়ে এলো তার বুক চিরে।সে ঝাঁপিয়ে পড়ল আফরিদের বুকে।দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে উন্মাদের মতো ঝাঁকাতে লাগল তাকে।
“আফরিদ? উঠুন… শুনছেন? প্লিজ উঠুন…
কোনো সাড়া নেই। ন্যান্সির স্পন্দন বেগতিক হলো! স্তব্ধের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। কাঁপা কাঁপা গলায় অধর ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো।
“এই আফরিদ… আমার দিকে তাকান… আল্লাহর দোহাই লাগে… উঠুন না…
কণ্ঠ ভেঙে করুণ বিলাপে পরিণত হলো।অশ্রু ঝরে পড়ছে কাফনের ওপর।
“আমাকে ছেড়ে যেতে পারেন না আপনি… শুনছেন? আমাদের বাচ্চাটা… আমাদের বাচ্চার কী হবে?”
কিন্তু নিথর দেহটি একবারও সাড়া দিল না।ন্যান্সির শ্বাস আটকে আসতে লাগল। হঠাৎ সে বুকফাটা চিৎকার করে উঠল,
“আফরিদ…
ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল ন্যান্সি।হাঁপাচ্ছে।মনে হচ্ছে ফুসফুসে বাতাস পৌঁছাচ্ছে না।
কপাল, গলা, ঘাড় সব ভিজে গেছে ঠান্ডা ঘামে।
চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে কয়েক সেকেন্ড লেগে গেল।
না এটা মর্গ নয়। এটা তার নিজের বেডরুম।
ঘরজুড়ে আধো অন্ধকার। জানালার ফাঁক গলে চাঁদের ফ্যাকাশে আলো এসে পড়েছে দেয়ালে ঝোলানো একটি ছবির ওপর। ছবিটিতে আফরিদের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ ন্যান্সি। দু’জনের মুখেই নির্মল হাসি। ন্যান্সি কয়েক মুহূর্ত নির্বাক তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁপতে কাঁপতে বেডসাইড টেবিল থেকে পানিভর্তি গ্লাস তুলে এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেলল। তবুও বুকের ধুকপুকানি কমল না। চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট ফটোফ্রেমে।আফরিদের একরাশ দুষ্টু হাসি।সেই হাসিটাই ন্যান্সির সবচেয়ে প্রিয়।
কাঁপা আঙুল দিয়ে ছবিটার কাঁচ ছুঁয়ে দিল সে।
“আফরিদ, কোথায় আপনি?”
চোখ বেয়ে আবারও অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
“ঠিক আছেন তো? কেন এমন স্বপ্ন দেখলাম?কেন মৃ’ত্যুর সেই বিভী’ষিকাময় দৃশ্য?”
অকারণেই মনের ভেতর এক অশুভ আশঙ্কা বিষাক্ত লতার মতো বিস্তার লাভ করল।
জানালার বাইরের ঘন অন্ধকারে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এক ছায়ামূর্তি ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকিয়ে রইল ন্যান্সির দিকে।
দীর্ঘাঙ্গী এক রমণী। রক্তিম লিপগ্লসে চকচক করছে তার অধরযুগল।তীক্ষ্ণ নয়নে অদ্ভুত এক শিকারির ধৈর্য।
তার মুখে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল শীতল, রহস্যময় হাসি।
অতঃপর অত্যন্ত নিম্নস্বরে, যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলল “লিটল মাউস!”
চলবে…………।
(
প্রজাপতিরা পেইজে পঞ্চাশ হাজার পূর্ণ হওয়াতে ছোটখাটো প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। বিস্তারিত কমেন্ট বক্সে
!)
আমার আইডি Farhana Nijum See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply