অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)
নুসাইবা_ইভানা
পর্ব -৩৬( সম্পূর্ণ)
অন্তর বসে আছে নীলাঞ্জনার ছেলেকে কোলে নিয়ে। এসেছিল সুনয়নার সঙ্গে দেখা করতে। সুনয়নাকে বাসায় পায়নি। নিবিড় হঠাৎ দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল অন্তরের কোলে, “বাবা!”
প্রথমে অন্তর বেশ অবাক হয়ে গেল! তারপর নিবিড়কে কোলে তুলে নিল।
নীলাঞ্জনা বলল, “সরি, কিছু মনে করবেন না। আসলে নিবিড় মাঝেমধ্যেই যাকে-তাকে বাবা ডাকতে শুরু করে। ছেলেটার জন্য বাইরে গেলেও শান্তি পাই না। মানুষকে বিব্রত করে ফেলে।”
“সমস্যা নেই আপু। নিবিড় মাশাআল্লাহ অনেক কিউট, আর ওর আধো-আধো বুলি আরও কিউট।”
“নিবিড়, এদিকে আয় আম্মুর কাছে। মামাকে নাস্তা করতে দে।”
নিবিড় একবার অন্তরের দিকে তাকাচ্ছে, একবার নীলাঞ্জনার দিকে। হঠাৎ টুপ করে অন্তরের গালে চুমু দিয়ে বলল, “বাবা… বাবা…”
অন্তর নিবিড়ের কপালে চুমু খেল।
নীলাঞ্জনার বুকটা ভারী হয়ে আসছে। যেকোনো সময় টুপ করে অশ্রু ঝরে পড়বে। সে অন্তরের কোল থেকে নিবিড়কে ছিনিয়ে নিল। একটু থেমে বলল, “তুমি নাস্তা করো, আমি একটু আসছি।”
নিজের ঘরে এসে আর কান্না আটকাতে পারল না। ইদানীং এই কষ্টটা খুব বেশি করে অনুভব করে নীলাঞ্জনা। হঠাৎ বুক ভারী হয়ে কেমন দম বন্ধ হয়ে আসে। ইচ্ছে করে চিৎকার করে কাঁদতে। আচ্ছা, বিয়ের পর স্বামী ভালো না হলে মেয়েরা কি একদম নিঃস্ব হয়ে যায়? এই যে দমবন্ধ করা অনুভূতি, এই যে বাড়িতে এত মানুষ—কেউ তো একটু মাথায় বা পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দেয় না। কেউ তো অনুভব করতে পারে না তার দুঃখগুলোকে। এত মানুষের ভিড়েও নিজেকে এত একা লাগার মতো অসহায়ত্ব কি আর কিছুতে আছে?
অন্তর কিছুক্ষণ বসে থেকে জাহানারা বেগমের সঙ্গে দুটো কথা বলল, তারপর চলে গেল তালুকদার ম্যানশন ছেড়ে।
নীলাঞ্জনা জানালায় দাঁড়িয়ে দেখছে অন্তরের চলে যাওয়া। চোখ বেয়ে টুপটুপ করে অশ্রু ঝরে পড়ছে। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে একটা দীর্ঘশ্বাস। কেমন অদ্ভুতভাবে লাবিবের চেহারার সঙ্গে অন্তরের চেহারার একটা মিল আছে। বিশেষ করে চোখ আর নাকটা। হঠাৎ নীলাঞ্জনার মনে হলো—আচ্ছা, লাবিব কি ভালো আছে? আমার মতো দমবন্ধ করা যন্ত্রণা লাবিবেরও হয়?
সূচনা এসে বলল, “আপি, তুমি কাঁদছ কেন?”
“তোকে না কতবার বলেছি, আমার রুমে অনুমতি ছাড়া ঢুকবি না?”
“আমি তো তোমাকে ডেকেছি, তুমিই তো শোনোনি। আচ্ছা বলো তো, আমার সঙ্গে কি ছাব্বিশ বছর বয়সের ছেলের বিয়ে হওয়া সম্ভব?”
নীলাঞ্জনা রাগী চোখে সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল, “সূচনা, আর একটা উল্টোপাল্টা কথা বললে মাইর লাগাব। যা, নিজের রুমে যা। থাপ্পড় খেতে না চাইলে আমার চোখের সামনে থেকে সর।”
সূচনা রুম থেকে বেরোতে বেরোতে বলল, “চিন্তা কইরো না জাংকুক, আমি শুধু তোমার।ভালোবাসা থাকলে বয়স কোনো ম্যাটার করে না। সূচনা শুধু তোমার। আর একটু বড় হয়েই আমি তোমার কাছে চলে আসব।”
🌿
“হাত ছাড়ুন। আমাকে স্পর্শ করার সাহস কে দিয়েছে আপনাকে?”
“আল্লাহ তায়ালা। আল্লাহ তায়ালার কালাম পড়ে কবুল বলে তোমাকে বিয়ে করেছি। বিশ্বাস করো, মাত্র একটা চুমু খেয়ে সরে যাব।”
নয়না এক ছটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “কবুল বললেই স্বামী হওয়া যায়, কিন্তু জীবনসঙ্গী হওয়া যায় না। লজ্জা করে না আপনার এসব বলতে? তিন বছর যে স্ত্রীর খোঁজ নেননি, আজ হঠাৎ তার প্রতি ভালোবাসা উথলে পড়ছে!”
জিয়ান নয়নার সামনের দেয়ালে হেলান দিয়ে পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি কিন্তু অনেক সুন্দরী হয়ে গেছ। ভাগ্যিস আগেই তোমাকে আমার নামে দলিল করে নিয়েছিলাম। নইলে আমার মতো হতভাগার কপালে এত সুন্দরী বউ জুটত না। আচ্ছা, তুমি তো প্রেম করার সুযোগই পাওনি। মানে, প্রেম করার আগেই তো আমার অর্ধাঙ্গিনী হয়ে গেছ। চলো, প্রেম করি সুন্দরী। আমি রোডসাইড সিনিয়র রোমিও আর তুমি প্রিটি লিটল বেবি—মানে ভার্সিটির জুনিয়র।”
নয়না কড়া স্বরে বলল, “এসব আপনাকে একদম মানাচ্ছে না। জোকার মনে হচ্ছে। আর হ্যাঁ, তখন সুযোগ পাইনি মানে এই না যে সুযোগ চিরতরে চলে গেছে।”
“দর্শক যদি হয় আমার বউ, আমি তো মিস্টার বিন হতেও রাজি। তোমার প্রেম করার সুযোগ শুধু চলে যায়নি, একদম নিষিদ্ধ হয়ে গেছে।”
“সামনে থেকে সরে দাঁড়ান।”
“সরে দাঁড়াব বলে তো সামনে এসে দাঁড়াইনি, বাটার মাশরুম।”
নয়না নিজের ফোন বের করল। মোবাইলে কিছু একটা টাইপ করে জিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি কি সত্যিই মনে করেন, শুধু দলিলের জোরে আমাকে ভয় দেখাতে পারবেন? আরে, সরে দাঁড়াননি ঠিকই, কিন্তু অনেক আগেই ছেড়ে গেছেন, মিস্টার চৌধুরী।”
জিয়ান এক হাতে দেয়াল ধরে, অন্য হাত হালকা করে নয়নার কাঁধে রেখে বলল, “ভয় না, নয়না। আমি চাই শুধু তুমি আমাকে একটা শেষ সুযোগ দাও। আমি নিজের ভুলটা সংশোধন করতে চাই। আর এতদিন ধরে যে দূরত্বটা আমাদের মধ্যে ছিল, তা আর কখনো হবে না—কথা দিচ্ছি তোমাকে।”
নয়না চোখ বড় করে বলল, “তিন বছর… আপনি কি এই তিন বছর আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন? ফিরিয়ে দিতে পারবেন আমার সন্তানকে? যে এই পৃথিবীর আলো দেখার আগেই বিদায় নিয়েছে?”
জিয়ান হঠাৎ নয়নাকে জড়িয়ে ধরে একদম নিজের বুকে মিশিয়ে নিল।
নয়না কাঁদছে। নয়নার চোখের জলে জিয়ানের শার্ট ভিজে যাচ্ছে। জিয়ানের চোখের কোণেও জমা হয়েছে নোনা জল। টপ করে তা ঝরে পড়ল নয়নার পিঠে।
নয়না জিয়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগল। কিছুক্ষণ পর জিয়ানের বাহু থেকে ছুটে আসার চেষ্টা করল। জিয়ান আরও শক্ত করে ধরে রাখার চেষ্টা করছে নয়নাকে। জিয়ানের শক্তির সাথে না পেরে নয়না তার ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে দিল। জিয়ান চুপচাপ আঘাত সহ্য করে নিল। মনে হচ্ছে রক্ত বেরিয়ে গেছে জায়গাটা থেকে। তবুও নয়না দাঁত সরাচ্ছে না।
জিয়ান মৃদু স্বরে বলল, “আমি তোমার অপরাধী। তোমার হাতে মৃত্যু হলেও আমি তা মাথা পেতে নেব।”
নয়না নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে জিয়ানকে ধাক্কা দিল। তাল না সামলাতে পেরে জিয়ান টেবিলের কোণে বাড়ি খেল। পা কেটে রক্ত বের হয়ে গেল।
নয়না জিয়ানের দিকে আঙুল তুলে বলল, “এসব লুতুপুতু প্রেমে মন গলানোর বয়স আমার নেই। আমি আমার বয়সের চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। একটা মেয়ে যার বিয়ে হয় ষোল বছর বয়সে, সেই ষোড়শী বয়সে স্বামীর হাতে বাসর রাতে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়, আর আঠারো বছর বয়সে যার মিসক্যারেজ হয়—তাকে আপনি এই সস্তা ভালোবাসায় ভোলাতে এসেছেন! ঘৃণা করি আপনাকে আমি। আপনাকে দেখলেই আমার ভেতরের যন্ত্রণাগুলো দগদগে হয়ে ওঠে। মনে হয় কেউ যেন ধারালো ছুরি দিয়ে আমার ভেতরটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে। প্লিজ আমার জীবন থেকে চলে যান। আমাকে আমার মতো ভালো থাকতে দিন। এসব সস্তা ভালোবাসা আমার চাই না। না আপনি, না আপনার ভালোবাসা—আমার কোনোটারই দরকার নেই। দয়া করুন আমার প্রতি।”
জিয়ান পা টেনে সামনে এগিয়ে এসে নয়নার পায়ের কাছে বসে পড়ল। নয়নার পা দুটো জড়িয়ে ধরে বলল, “আমার ওপর একটু রহম করো নয়না। এত নিষ্ঠুর হইও না। আমি জানি আমি তোমার সাথে অনেক অন্যায় করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার মায়ের ঋণের কাছে আমি অপারগ হয়ে পড়েছিলাম। আমার মস্তিষ্ক কাজ করছিল না। আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। একবার মনে হতো তুমি যদি কোর্টে না যাও তাহলে কী হয়। আবার মনে হতো তুমিই সঠিক। ওই মুহূর্তে নিজেকে পাগল-পাগল লাগছিল। আমি নিজের ওপর রাগ করে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো, এক মুহূর্তের জন্যও ভালো থাকতে পারিনি।”
নয়না নিজের পা দুটো ছাড়িয়ে নিয়ে রুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলল, “আমাকে বিরক্ত করলে আমি ভুলভাল কিছু করে বসব।”
জিয়ান দরজার বাইরে হেলান দিয়ে কাঁদছে। নয়না দরজার ভেতরে হেলান দিয়ে কাঁদছে। এই দরজাটা যেন দুজন ভালোবাসার মানুষের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন এই দেয়াল পার হলেই দুজন মানুষ একে অপরের মাঝে মিশে যেত, সব মান-অভিমান ভুলে।
🌿
সায়না ওদিকে যেতে চাইলে অনিকেত সায়নার হাত ধরে রেখে বলল, “ওদেরকে স্পেস দাও। নিজেদের মধ্যে জমে থাকা কথাগুলো একে অপরকে শোনার সুযোগ দরকার। আমরা চাইলেও এই সমস্যার সমাধান করতে পারব না। এর সমাধান ওদের দুজনকেই করতে হবে। হয়ত সব ঠিক হয়ে যাবে, নয়ত চিরদিনের জন্য ওদের রাস্তা আলাদা হয়ে যাবে।”
সায়না অনিকেতের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, “মহান রব্বুল আলামীনের কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া। উনি তোমাকে আমার জীবনসঙ্গী করেছেন। তোমার মতো বর পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। আর আমি সেই সৌভাগ্যবতী।”
অনিকেত সায়নাকে কোলে তুলে নিয়ে নাকে নাক ঘষে বলল, “ওরে আমার সৌভাগ্যবতী, আসো তোমাকে ভালোবাসার চাদরে আড়াল করে দেই।”
সায়না লাজুক স্বরে বলল, “মাহি তো উঠে যাবে।”
অনিকেত সায়নাকে দাঁড় করিয়ে রেখে বেড থেকে কম্ফোর্টার নিয়ে দু’ভাঁজ করে ফ্লোরে বিছিয়ে দিল। তারপর সায়নার দিকে এগিয়ে এল।
সায়না চোখ বন্ধ করে রেখেছে। তার হৃৎস্পন্দন দ্রুত চলছে। শরীর জুড়ে বয়ে যাচ্ছে অজানা এক শিহরণ।
অনিকেত সায়নার একদম কাছে এসে এক টানে নিজের দিকে টেনে আনল। সায়না কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ঠোঁট দুটো চেপে ধরল নিজের ঠোঁট দিয়ে।
চলবে
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩০
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১০
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৪
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৬