✍️সাবিলা সাবি
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪৫
স্ট্রোম হাউসের দীর্ঘ করিডোর আজ যেন কোনো এক জনশূন্য শ্মশানের হাহাকার নিয়ে নিথর হয়ে আছে। সেই গা ছমছমে অন্ধকারের ভেতর মূর্তির মতো নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে মেইলস্ট্রোম। তার ডান হাতের লোডেড রিভলবারটি ইসাবেলার দিকে তাক করা; একসময়ের সেই মমতাময়ী মা, যিনি আজ মেক্সিকোর আন্ডারওয়ার্ল্ডে ‘ডার্ক কুইন’ নামে পরিচিত। ইভানের চোখের মণি আজ স্থির, কোনো এক অজানা প্রতিহিংসায় সেই দৃষ্টি পাথরের মতো শীতল হয়ে আছে। শান্ত অথচ ঘাতক কণ্ঠে ইভান বলতে শুরু করল, “তুমি বেঁচে থাকলে আমি কোনোদিন শান্তিতে আমার রাজত্ব চালাতে পারব না, মম। তুমি এখনো সেই জাভিয়ানের পক্ষ নাও যাকে আমি ঘৃণা করি, তাকে আমার চেয়েও বেশি ভালোবাসো। আমি জানি আমার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো তুমি কোনদিনও মেনে নিতে পারবে না, বরং প্রতিটি পদক্ষেপে তুমি বাধা হয়ে দাঁড়াবে কিংবা আমাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করবে।”
ইসাবেলা স্থির চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ইভানের কণ্ঠে আজ কোনো আবেগের লেশমাত্র নেই। সে পুনরায় বলে উঠল, “সবচেয়ে বড় সত্য কী জানো? তুমি আজও ওই সাইফ চৌধুরীকে ভুলতে পারোনি। যে লোকটা তোমাকে অপমান করে বের করে দিয়েছে, প্রতিদিন তার জন্য তুমি তিল তিল করে দগ্ধ হও। আমি আজ তোমার সেই দীর্ঘ যন্ত্রণার অবসান ঘটাব; তুমি সরে গেলে অন্তত এই উছিলায় তান্বী এই বাড়িতে পা রাখবে। আর আমি আমার সব কাজ নিজের মন মতো করতে পারবো কেউ থাকবেনা বাধা দেয়ার।”
ইভানের আঙুল যখন ট্রিগারে চাপ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত, ঠিক তখনই ইসাবেলা হো হো করে হেসে উঠলেন। সেই হাসিতে মৃত্যুভয় ছিল না, ছিল প্রগাঢ় এক বিদ্রূপ। “তুই ভাবছিস তুই আমাকে মারবি?” ইসাবেলা গর্জে উঠলেন, “ইভান, আমি ডার্ক লর্ডের মেয়ে, আমি মাফিয়া কুইন ইসাবেলা মোরেলাস। হার মানা আমার রক্তে নেই। আমি সবসময়ই চেয়েছিলাম তুই ভালো থাকিস, তোর যাতে কোনো ক্ষতি না হয়। কিন্তু তুই আজ যে অন্ধকার পথে পা বাড়িয়েছিস, এই পথ তোকে ধ্বংসের অতলে নিয়ে যাবে একদিন।”
ইসাবেলা এক পা এগিয়ে এসে ইভানের রিভলবার ধরা হাতটি নিজের দিকে টেনে নিলেন। ইভানের পাথুরে চোখে প্রথমবার বিস্ময়ের ঝিলিক দেখা দিল। ইসাবেলার ঠোঁটে তখন এক পৈশাচিক হাসি। তিনি খুব নিচু স্বরে বললেন, “আমি চাইলে এই মুহূর্তেই তোকে শেষ করে দিতে পারি ইভান। কিন্তু আমি চাই তুই বেঁচে থাক। তুই বেঁচে থেকে নিজের তৈরি এই নরকে তিলে তিলে দগ্ধ হয়ে মর। তোর প্রতিটি নিশ্বাস যেন এক একটা অভিশাপ হয়ে তোকে তাড়া করে ফেরে।”
ইসাবেলার কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত দৃঢ়তা, “আমাকে মারার সাহস তোর নেই ইভান। আর আমি তোর হাতে মরে তোকে ‘মাতৃঘাতী’ কলঙ্ক নিতে দেব না। তুই চেয়েছিস আমি সরে যাই তোর পথ থেকে? ঠিক আছে, আমি হারব না, কিন্তু তোকে জিততেও দেব না।” কথাটি শেষ হওয়ার আগেই ইসাবেলা বিদ্যুৎবেগে তার কোমর থেকে একটি ছোট পিস্তল বের করলেন। ইভান কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি সেটি নিজের কপালে ঠেকালেন। শীতল হাসিতে তার শেষ কথাটি উচ্চারিত হলো, “গুড বায় ইভান। রিমেম্বার! মাফিয়া কুইনরা মরে যায়, তবুও কারো কাছে আত্মসমর্পণ করে না।”
একটি তীক্ষ্ণ গুলির শব্দে পুরো স্ট্রোম হাউস কেঁপে উঠল। মেক্সিকোর ডার্ক কুইন নিজের হাতেই নিজের জীবনের যবনিকাপাত ঘটালেন, আর পেছনে ফেলে গেলেন এক জীবিত মৃতদেহ—তার নিজের পুত্র ইভানকে।
গু/লিবিদ্ধ ইসাবেলার নিথর দেহটি যখন মেঝেতে আছড়ে পড়ল, স্ট্রোম হাউসের সেই করিডোরে এক মরণাতুর স্তব্ধতা জেঁকে বসল। হাতের রিভলবারটি ইভানের অজান্তেই আঙুলের ফাঁক দিয়ে খসে পড়েছে। সে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে দেখল সেই নারীকে, যিনি তাকে এই নৃশংস পৃথিবীতে লড়াই করে বাঁচতে শিখিয়েছিলেন; যিনি নিজের মমতা বিসর্জন দিয়ে কেবল সন্তানের সুরক্ষায় হয়েছিলেন প্রতাপশালী ‘মাফিয়া কুইন’। সেই মা আজ তারই চোখের সামনে স্থির, চিরনিদ্রায় আচ্ছন্ন। ইভানের মস্তিষ্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। সে কি সত্যিই মায়ের মৃ/ত্যু চেয়েছিল? নাকি চেয়েছিল তার লক্ষ্য অর্জনের পথে থাকা শেষ বাধাটুকু সরে যাক? ইভানের পা দুটো আজ বিশ্বাসঘাতকতা করতে শুরু করল। সে টলতে টলতে এগিয়ে গিয়ে ইসাবেলার লা/শের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। মায়ের কপালে তখনো সেই চিরচেনা জেদ আর আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। ইভান তার কাঁপা হাতে মায়ের শীতল হয়ে আসা মুখটি স্পর্শ করল। শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইভান অস্ফুট স্বরে বলল, “মম, এই অভিশপ্ত পৃথিবী থেকে তুমি চিরতরে মুক্তি পেয়ে গেলে। এখন আর তোমাকে কাউকে ভালোবাসতে হবে না, কারো জন্য কষ্ট পেতে হবে না। তোমার শরীরটা হয়তো নিথর, কিন্তু তোমার এই জেদ, তোমার এই রক্ত—সবই তো এখন আমার ভেতরে। তুমি তো কোথাও যাওনি মম, তুমি এখন আমার পুরোপুরি দখলে।” নিস্তব্ধ ঘরের আলো-আঁধারিতে কোনো উত্তর এল না। যে
মেইলস্ট্রোমের নাম শুনলে মেক্সিকোর মাটি কাঁপে, সেই দুর্ধর্ষ সম্রাট আজ এক ঘোরগ্রস্ত উন্মাদনায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সে ধীরে ধীরে মায়ের নিথর বুকের ওপর মাথা রাখল। শৈশবে যেভাবে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে সে যাবতীয় ঝড় সামলে নিত, ঠিক সেভাবেই আজ সে রক্তমাখা লা/শের ওপর নিজেকে সঁপে দিল।
সেই রাতে এতোবছর পর দ্বিতীয়বারের মতো ইভানের চোখের বাঁধ ভেঙে গেল। প্রথমবার সে কেঁদেছিল যেদিন তাকে মাকে আর তাকে ‘জারজ’ অপবাদ দিয়ে বাড়ি থেকে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল। আজ সে আবার অঝোরে কাঁদছে; তার সেই গগনবিদারী আর্তনাদ স্ট্রোম হাউসের দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে, কিন্তু সেই কান্না থামানোর মতো কেউ নেই। পুরো রাত সে মায়ের লাশে/র ওপর নিঃসাড় হয়ে পড়ে রইল। রক্তে তার দামী শার্ট ভিজে একাকার হয়ে গেছে, অথচ সেদিকে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। ইভানের মনে হতে লাগল, সে আজ শুধু তার মাকে হারায়নি, বরং নিজের অস্তিত্বের শেষ প্রদীপটিও স্বহস্তে নিভিয়ে দিয়েছে। ফুঁপিয়ে কেঁদে ইভান বলে উঠল, “সবাই আমায় ঘৃণা করে মম। তুমিও কি ঘৃণা নিয়েই বিদায় নিলে? আমি তো চেয়েছিলাম ওই চৌধুরী বংশকে ধ্বংস করে তোমাকে পৃথিবীর সব সুখ এনে দিতে। কিন্তু বিনিময়ে আমি তোমাকেই ধ্বংস করে ফেললাম! এখন আমার আর হারাবার কিছু নেই মা, এখন আমি সম্পুর্ন স্বাধীন।”
ভোর যখন হলো, ইভানের চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে আছে। কান্না থেমে গেলেও শুকিয়ে যাওয়া চোখের জল তার গালে নোনতা দাগ ফেলে গেছে। সে যখন উঠে দাঁড়াল, তার ভেতরের নরম মনের মানুষটি চিরতরে মরে গেছে। সেখানে জন্ম নিয়েছে এক দগ্ধ ‘মেইলস্ট্রোম’, যার হারানোর আর কিছু অবশিষ্ট নেই। এখন তার প্রতিহিংসা হবে আরও ভয়াবহ, আরও প্রলয়ঙ্কারী—যা সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে।
মেক্সিকোর সেই প্রাচীন চার্চের ভেতরটা আজ এক ভারী নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। রঙিন কাঁচের জানালা দিয়ে বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়েছে ইসাবেলার শান্ত মুখের ওপর। কফিনে শুয়ে থাকা সেই প্রতাপশালী নারীকে ঘিরে আজ চৌধুরী পরিবারের সবাই সমবেত হয়েছে, কিন্তু কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। সাইফ চৌধুরী পাথরের মূর্তির মতো কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত অপরাধবোধ আর বিস্ময়ের ছাপ। সারাজীবন তিনি ইসাবেলাকে ঘৃণা করেছেন, প্রতি পদে পদে তাকে সন্দেহ করেছেন; কিন্তু সেই ঘৃণার মানুষটিকে এভাবে নিস্পন্দ দেখার কথা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। আজ তার দীর্ঘ বছরের পুঞ্জীভূত সব ক্ষোভ যেন এই শবাচ্ছাদনের সামনে এসে মুখ থুবড়ে পড়েছে। একপাশে মার্কো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। শোকের চেয়ে হারানো ক্ষমতার আফসোসই তার চোখে বেশি ফুটে উঠছে। কিন্তু উপস্থিত সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল জাভিয়ানের ওপর। জাভিয়ান আজ কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। সে স্থির, অপলক চোখে ইসাবেলার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তান্বী তার পাশে দাঁড়িয়ে বারবার জাভিয়ানের হাতটা ধরার চেষ্টা করছে, তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল নামছে। জাভিয়ানের এই অস্বাভাবিক স্তব্ধতা তান্বীকে ভেতরে ভেতরে আতঙ্কিত করে তুলছে।
জাভিয়ানের চোখের সামনে তখন একের পর এক ভেসে উঠছে বহু বছর আগের সেই দিনগুলো। যখন তার নিজের মা বন্ধুদের নিয়ে উৎসবে মত্ত থাকতেন, তখন এই ইসাবেলা চাচিই তাকে আর তার ভাই রাহিয়ানকে পরম স্নেহে আগলে রাখতেন। তিনি নিজের হাতে ওদের খাবার খাইয়ে দিতেন, নিজের টাকা দিয়ে খেলনা কিনে দিতেন। কত রাত যে এই মমতাময়ী নারীর কোলে মুখ লুকিয়ে তারা দুই ভাই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে, তার কোনো হিসেব নেই। যে আশ্রয় তার জন্মদাত্রী মা দিতে পারেননি, ইসাবেলা ছিলেন সেই শূন্যতার একমাত্র পূর্ণতা। জাভিয়ানের আজ মনে হচ্ছে, কেবল তার প্রিয় এক চাচি মারা যাননি, বরং তার শৈশবের অবশিষ্টাংশ এবং জীবনের শেষ কোমল অংশটুকুও এই কফিনের অন্ধকারে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। চার্চের ঘণ্টাধ্বনি যখন বেজে উঠল, জাভিয়ানের মনে হলো সেই শব্দ যেন তার বুকের ভেতরের কোনো এক গোপন দেয়ালে আঘাত করছে। ইসাবেলার মৃত্যু কেবল একটি জীবনের অবসান নয়, বরং এক যুগের সমাপ্তি—যা জাভিয়ানকে একাকী এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিল।
চার্চের গুমোট জমায়েত ছিন্নভিন্ন করে ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল ইভান। পরনে কুচকুচে কালো কোট, চোখে সেই চেনা হিমশীতল শূন্যতা। তাকে দেখামাত্র উপস্থিত সবাই এক অজানা আতঙ্কে পিছিয়ে গেল, যেন কোনো এক নরকপুরীর রাজপুত্র সরাসরি চার্চের পবিত্র চত্বরে পা রেখেছে। কিন্তু ইভানের নজর কারো দিকে নেই; সে আজ এখানে শোকাতুর হতে আসেনি, এসেছে তার ‘সম্পদ’ বুঝে নিতে।
ইভানের হাতে একটি স্বচ্ছ কাঁচের জার, যাতে নীলচে এক রাসায়নিক তরল ভরা। কেউ জানল না, কিন্তু ইভানের ভেতরের সেই দানবটি আজ এক চরম নৃশংসতা সম্পন্ন করে এসেছে। ময়নাতদন্তের সময় চিকিৎসকদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সে তার মায়ের হৃৎপিণ্ড শরীর থেকে আলাদা করে নিয়েছে। ইভানের বিকৃত মস্তিষ্কের বিশ্বাস—শরীরের বিনাশ হলেও এই রক্তমাংসের পিণ্ডটির ভেতরেই মায়ের সব ভালোবাসা আর জেদ জমা ছিল।
ইভান কফিনের সামনে এসে স্থির হয়ে দাঁড়াল। সাইফ চৌধুরীর দিকে একবার ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে জারটি সজোরে আঁকড়ে ধরল সে। এরপর কফিনের নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “তোমরা মমকে মাটি দেবে কিন্তু আমি মায়ের হৃদয়টা তোমাদের নাগালের বাইরে নিয়ে এলাম। এই হৃৎপিণ্ড সারাজীবন আমার চোখের সামনে স্পন্দিত হবে। এটা আমাকে প্রতিমুহূর্তে মনে করিয়ে দেবে—এই বংশের কেউ কারো আপন নয়। মম, তুমি বলেছিলে তুমি হারবে না। দেখো, আমি তোমাকে হারতে দিইনি; আমার এই অন্ধকারের সাম্রাজ্যে আমি তোমাকে অমর করে রাখব।”
ইভানের এই চরম উন্মাদনা দেখে জাভিয়ান প্রথমবারের মতো চোখ সরিয়ে নিতে বাধ্য হলো। তার মনে হলো, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কেবল একজন মাফিয়া নয়, বরং এক পৈশাচিক মানসিক বিকারগ্রস্ত দানবে পরিণত হয়েছে। তান্বী আতঙ্কে শিউরে উঠে জাভিয়ানের বুকে মুখ লুকাল। সে বুঝতে পারল, ইসাবেলার এই মৃত্যু কোনো বিয়োগান্তক সমাপ্তি নয়, বরং এক মহাপ্রলয়ের রক্তিম সংকেত মাত্র।
চার্চের এক অন্ধকার কোণে, যেখানে বিকেলের আলো পৌঁছায় না, সেখানে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে লুসিয়া। ফারহান তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। লুসিয়া আজ নিজের পরিবারের সামনে যাওয়ার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। যেদিন সে ফারহানের জন্যে ভিলা এস্পেরেন্জার রাজকীয় আভিজাত্য আর চৌধুরী পরিবারের পরিচয় তুচ্ছ করে বেরিয়ে এসেছিল, সেদিনই তার জন্য ওই বাড়ির সদর দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। লুসিয়া ফারহানের বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে ধরা গলায় বলতে লাগল, “মা আমাকে খুব ছোট রেখেই চলে গিয়েছিলেন ফারহান। কোনোদিনও আমি মায়ের সেই মমতাময়ী আদর পাইনি। মা থাকতেও আমার কেউ ছিল না, আর আজ তিনি চলে গেলেন সারাজীবনের জন্য। একটা আস্ত জীবন আমি মা হীন কাটিয়ে দিলাম।”
ফারহান কোনো কথা না বলে লুসিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। সে জানে, এই শোকের কোনো সান্ত্বনা নেই। লুসিয়ার কান্না থামছে না, তার কন্ঠস্বর কান্নায় ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সে আবার অস্ফুট স্বরে বলল, “সবাই যখন ভেতরে মাকে শেষ বিদায় জানাচ্ছে, আমি তখন এই অন্ধকারে চোরের মতো লুকিয়ে আছি। মা বেঁচে থাকতেও আমি তার কাছে যেতে পারিনি, আর আজ তিনি নিথর হয়ে শুয়ে আছেন, সেখানেও আমার কোনো অধিকার নেই। ফারহান, আমার কলিজাটা ফেটে যাচ্ছে!” দূরে চার্চের ভেতর থেকে ভেসে আসা গম্ভীর প্রার্থনা আর ঘণ্টাধ্বনি লুসিয়ার বুকে তীরের মতো বিঁধছে। সে দেখল ইভান সেই জারটি নিয়ে বেরিয়ে আসছে, দেখল জাভিয়ান আর তান্বীর বিধ্বস্ত মুখ। কিন্তু সে ওই ভিড়ে মিশে যেতে পারল না। তার শৈশব, তার মা আর তার অতীত আজ একসাথেই কফিনের অন্ধকারে তলিয়ে গেল। ফারহানের বুকে মুখ গুঁজে লুসিয়া কেবল নিজের অভাগা ভাগ্যের জন্য নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগল।
ইসাবেলার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ হলেও চার্চের সেই বিশাল হলরুমে বিষাদের এক আড়ষ্ট চাদর যেন লেপ্টে রইল। পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী আগামী কিছু সময় বংশের সবাইকে একসাথেই অবস্থান করতে হবে। বংশগত ঐতিহ্যের কঠোর নিয়ম আর কিছু অনিবার্য রিচুয়ালের দায়বদ্ধতায় আগামী দুদিন সবাইকে থাকতে হবে স্ট্রোম হাউসে। জাভিয়ানের কাছে এই সিদ্ধান্তটি এক জীবন্ত নরকে প্রবেশের আমন্ত্রণের মতো শোনাল। একদিকে শৈশবের আশ্রয়ের মৃত্যুশোক, অন্যদিকে সেই শোকের বাড়িতেই এক উন্মাদ ঘাতকের সাথে একই ছাদের নিচে অবস্থানের বাধ্যবাধকতা। জাভিয়ানের স্নায়ুগুলো এক চরম উত্তেজনায় কাঁপছে।
তারা মেইলস্ট্রোমের বাড়িতে হাজির হলো। পুরো স্ট্রোম হাউস এখন ইভানের একচ্ছত্র আধিপত্যে এক অন্ধকার দুর্গের রূপ নিয়েছে। ইভান তার মায়ের সেই হৃৎপিণ্ডভর্তি জারটি নিয়ে নিজের ঘরের গহীনে অদৃশ্য হয়ে গেছে। বাইরের পৃথিবীতে কী ঘটছে, সেদিকে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই; কিন্তু বাড়ির প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে আছে তার পৈশাচিক অস্তিত্বের ছাপ। জাভিয়ানের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এখন তান্বীকে নিয়ে। সে জানে, ইভান তান্বীর প্রতি কতটা বিকৃতভাবে আসক্ত। এই বাড়িতে থাকা মানেই প্রতি মুহূর্তে সেই লোলুপ দৃষ্টির শিকার হওয়া। জাভিয়ান এক মুহূর্তের জন্য ভেবেছিল তান্বীকে ভিলা এস্পেরেন্জায় পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো, তন্বীকে সেখানে একা পাঠানো হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আবার জাভিয়ানের নিজেরও এখানে থাকা বাধ্যতামূলক; কারণ এটি তার প্রিয় চাচির শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠান। নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয় চাচির সম্মানে তাকে এই বিষাক্ত প্রাসাদে থাকতেই হবে। এক তীব্র অস্থিরতা নিয়ে জাভিয়ান দেখল, প্রাসাদের খিলানে খিলানে ইভানের লোকেরা নিঃশব্দে বিচরণ করছে। সে তান্বীর হাতটা সজোরে নিজের মুঠোর ভেতর চেপে ধরল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে তান্বীর কানের কাছে মুখ নিয়ে সতর্ক গলায় ফিসফিস করে বলল—”এই বাড়ির প্রতিটি নিশ্বাস এখন বিষাক্ত তন্বী। এই দুদিন তোমার চারপাশের বাতাসকেও আমি বিশ্বাস করি না। এক মুহূর্তের জন্যও আমার চোখের আড়াল হওয়ার চেষ্টা করবে না। আমি তোমাকে একা ভিলা এস্পেরেন্জায় পাঠাতে পারছি না, কারণ সেখানে তুমি আরও বেশি অসুরক্ষিত হবে। তোমাকে আমার বুকের সাথেই থাকতে হবে।”
স্ট্রোম হাউসের বিশাল গেস্ট রুমের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তান্বী থরথর করে কাঁপছে। বাইরের ঘুটঘুটে অন্ধকারে প্রাসাদের বাগানটি যেন কোনো এক নরকীয় অরণ্যের মতো নিথর হয়ে আছে। জাভিয়ান ঘরের ভারী দরজাটি ভেতর থেকে শক্ত করে লক করে তান্বীর পাশে এসে দাঁড়াল। তান্বীর হিমশীতল হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে সে অভয় দেওয়ার চেষ্টা করল “জিন্নীয়া রিল্যাক্স। আমি জানি এই বাড়ি আর এই ঘরটা এখন দমবন্ধকর লাগছে। কিন্তু মাত্র দুটো দিন। এই সময়টুকু পার করতে পারলেই আমরা এখান থেকে চলে যাব, যেখানে ইভানের ছায়াও আমাদের ছুঁতে পারবে না।” তান্বী জাভিয়ানের বাহু আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ফিসফিস করে বলল, “জাভিয়ান, ঝড় তুফান লোকটাকে আমার খুব ভয় লাগছে। উনি যেভাবে কদবেল চাচির হৃৎপিণ্ডটা নিয়ে গেলেন… উনার চোখে আজ কোনো মানুষের ছায়া নেই। আমরা কেন আজই চলে যাচ্ছি না? এই বিষাক্ত পরিবেশে আমার প্রতিটা নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।”
জাভিয়ান তান্বীকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখের দৃষ্টিতে তখন গভীর বিষাদ “ইচ্ছে থাকলেও এই মুহূর্তে পারছি না তান্বী। চাচি আমার কাছে কী ছিলেন, সেটা তো তোমার অজানা নয়। আমার জন্মদাত্রী মা পাশে থাকতেও আমি কার্যত অনাথ ছিলাম; ওই মানুষটাই আমাকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার খাতিরে এই শেষ কটা দিন আমাকে এই বাড়িতে থাকতেই হবে। তুমি এক মুহূর্তের জন্যও আমার চোখের আড়াল হবে না, এমনকি ঘরের ভেতরেও আমাকে ছাড়া নড়াচড়া করবে না।”
জাভিয়ানের চোখে আজ এক তীব্র অপরাধবোধের ছায়া। সে নির্নিমেষ তান্বীর মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবল, কেন সে তার প্রিয়তমাকে এই হিংস্র পরিবারের মাঝে নিয়ে এল। জাভিয়ানের একমাত্র যুদ্ধ—তার অনাগত সন্তানের মাকে এই নরক থেকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। স্ট্রোম হাউসের সেই নিস্তব্ধ গেস্ট রুমের ভেতর কেবল ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর দুজনের ভারী নিঃশ্বাস শোনা যাচ্ছে। জাভিয়ান জানে, এই দরজার ওপাশেই করিডোরের অন্ধকারে হয়তো কোনো এক উন্মাদ মস্তিষ্কে চলছে নতুন কোনো মরণখেলার নীল নকশা।
সারারাত স্ট্রোম হাউসের প্রতিটি ইটে এক বীভৎস নিস্তব্ধতা জেঁকে ছিল। ইভানের ঘরের দরজা সারারাত রুদ্ধ থাকলেও ভেতর থেকে ভেসে আসা অস্পষ্ট বিড়বিড়ানি শব্দগুলো এক ভয়ানক বার্তা দিচ্ছিল—সে পুরোটা রাত কাটিয়েছে রাসায়নিক জারে রাখা মায়ের সেই নিথর হৃৎপিণ্ডটার সাথে গল্প করে।
সকাল হয়েছে। ডাইনিং টেবিলে তান্বী একা বসে আছে। ইদানীং শারীরিক দুর্বলতা তাকে বেশ কাবু করে ফেলেছে; সময়মতো খাবার না খেলে তার মাথা ঘোরে। জাভিয়ান তান্বীর পাশেই ছিল, কিন্তু হঠাৎ রায়হানের একটি জরুরি ফোন আসায় তান্বীকে সাবধানে থাকার সতর্কবার্তা দিয়ে সে একটু দূরে ব্যালকনিতে গিয়েছে কথা বলতে। তান্বী মাথা নিচু করে বসে ছিল, ঠিক তখনই তার সামনে ভারী কিছু রাখার শব্দ হলো। ধপ করে একটি কাঁচের দুধের গ্লাস রাখা হয়েছে তার সামনে। চমকে তাকিয়ে সে দেখল—মেইলস্ট্রোম। ইভানের চোখের নিচে কালশিটে দাগ, উশকোখুশকো চুল, কিন্তু ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত বিভ্রম মাখানো হাসি।
ইভান ধীরস্থিরভাবে তান্বীর ঠিক উল্টো পাশের চেয়ারটি টেনে বসল। তার এক হাতে একটি ধারালো ছুরি, অন্য হাতে একটি আপেল। অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আপেলটি কাটতে কাটতে সে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। “খাও তান্বী… থেমে গেলে কেন?” ইভানের কণ্ঠস্বর যেন কোনো এক হিমশীতল গভীর গুহা থেকে আসছে। “কী হলো? ভাবছো এতে বিষ মিশিয়েছি?”
তান্বী ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। তার হাত-পা হিম হয়ে আসছে, হৃৎপিণ্ডের গতি তীব্র। সে কোনোমতে তোতো করে বলল, “না… আমি আসলে…” ইভান তাকে কথা শেষ করতে দিল না। সে বাঁকা হেসে বলল, “আমি তো এই খাবার তোমার জন্য আনিনি। আমি এনেছি আমার ওই লিটল বেবিটার জন্য। আমার রক্তের উত্তরাধিকারী তোমার ভেতরে বড় হচ্ছে, তার যত্ন নেওয়া তো বড় চাচ্চু হিসেবে আমার দায়িত্ব, তাই না?”
হঠাৎ ইভান টেবিলের ওপর কিছুটা ঝুঁকে এল। তার হাতের সেই ধারালো ছুরিটি ডাইনিং টেবিলের কাঁচের ওপর ঠকঠক করে এক ছন্দময় কিন্তু ভয়ংকর শব্দ করছে। তান্বী ভয়ে চেয়ারের সাথে মিশে গেল। ইভানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তান্বীর অস্তিত্ব খুঁড়ে দেখছে। “ভয় পাচ্ছো কেন?” ইভান ফিসফিস করে বলল। “আমি তো তোমাকে কেবল খাবার দিচ্ছি, তোমাকে খেয়ে ফেলছি না।” তান্বীর গলা শুকিয়ে কাঠ। পাশের ব্যালকনিতে জাভিয়ান থাকলেও তাকে ডাকার সাহসটুকু সে হারিয়ে ফেলেছে। ইভানের প্রতিটি শব্দ চাবুকের মতো তার গায়ে লাগছে। ইভান আপেলের একটি টুকরো ছুরির ডগায় গেঁথে তান্বীর মুখের সামনে বাড়িয়ে ধরল। ডাইনিং টেবিলের সেই থমথমে পরিবেশে তান্বী যখন পাথরের মতো জমে আছে, ইভান তখন আপেল কাটার ছুরিটা টেবিলের ওপর সরিয়ে রেখে আরও একটু ঝুঁকে এল। তার চোখের মণি দুটো অস্বাভাবিক স্থির, যেন কোনো শিকারী তার শিকারকে সম্মোহন করছে। সে খুব নরম গলায়, প্রায় ফিসফিস করে বলতে শুরু করল—”জাভিয়ান তোমার ঠিকমতো খেয়াল রাখছেনা তাইনা তান্বী? দেখো, তোমার শরীরটা কত দুর্বল, অথচ সে তোমাকে এই অবস্থায় না খাইয়ে রেখেই ফোনের ওপারে অন্য জগতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বোধহয় ওর মধ্যে একটু বেশি তাই না?”
তান্বী মাথা নিচু করে নিজের ওরনাটা আঙুলে জড়াচ্ছে। ইভানের কণ্ঠস্বরে এক ধরণের অদ্ভুত মায়া, যা কি না তীব্র কোনো বিষের চেয়েও ভয়ংকর। সে আবার বলতে শুরু করল—”আমি হলে তোমাকে এক সেকেন্ডের জন্যও এভাবে একা ফেলে রাখতাম না। খুব আদর-যত্নে আগলে রাখতাম, বিশ্বাস করো। আমার এই প্রাসাদে তোমার জন্য সুখের নহর বয়ে যেত। তুমি যা চাইতে, চোখের পলকে তা তোমার পায়ের কাছে এসে লুটোপুটি খেত। জাভিয়ান তোমাকে কেবল ভয় আর অনিশ্চয়তা দিচ্ছে, কিন্তু আমি তোমাকে দিতে পারতাম এক অজেয় সম্রাজ্ঞীর জীবন।”
তান্বী কোনোমতে অস্ফুট স্বরে বলল, “আমার এসবের কোনো প্রয়োজন নেই… জাভিয়ান আমার জন্য যথেষ্ট।”
ইভান হো হো করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে কেবল এক ধরণের উন্মাদনা। সে তার দীর্ঘ আঙুল দিয়ে তান্বীর সামনে থাকা দুধের গ্লাসটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল। “যথেষ্ট নয় তা ন্বী, তোমার ভেতরের ওই অনাগত ভবিষ্যৎটাকে নষ্ট হতে দিও না। জাভিয়ানের সাথে থাকা মানে সারাজীবন ইঁদুর-বেড়ালের মতো গর্তে লুকিয়ে পালিয়ে বেড়ানো। আর আমার কাছে আসা মানে তুমি হবে এই শহরের অপ্রতিরোধ্য রানী।” ঠিক সেই মুহূর্তে জাভিয়ান ডাইনিং রুমে পা রাখল। ইভানের হাত তান্বীর গ্লাসের কাছে দেখে জাভিয়ানের মাথায় রক্ত চড়ে গেল। সে বিদ্যুৎবেগে এগিয়ে এসে ইভানের হাতটি এক ঝটকায় সরিয়ে দিল। “ওর কাছ থেকে দূরে থাক ইভান! আমি আগেই বলেছি, ওর ওপর তোর ওই বিষাক্ত নজর আর কোনোদিন দিবি না।”
ইভান বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে শান্তভাবে চেয়ার থেকে উঠল। মুখে সেই চিরচেনা বক্র হাসি। সে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক পলক তান্বীকে দেখে নিল। “শান্ত হ। আমি তো কেবল ওকে ব্রেকফাস্ট করতে বলছিলাম। তুই তো ফোনে মত্ত ছিলি, তাই ভাবলাম বড় ভাই হিসেবে আমিই ওর যত্ন নিই। ভাইয়ের স্ত্রীর যত্ন নেওয়া তো আর অপরাধ নয়, তাই না?” ইভান প্রস্থান করার আগে খুব নিচু স্বরে বলে গেল— “মনে রেখো তন্বী, সুযোগ কিন্তু বারবার আসে না।”
ইভান চলে যেতেই তান্বী কাঁপতে কাঁপতে জাভিয়ানের হাতটা শক্ত করে ধরল। জাভিয়ান বুঝতে পারল, ইভান এখন শুধু অস্ত্র বা শক্তি দিয়ে নয়, বরং তান্বীর মনস্তত্ত্ব নিয়ে এক কুৎসিত খেলা শুরু করেছে। সে তান্বীকে নিজের বুকের মাঝে আগলে নিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করল ঠিকই, কিন্তু তার নিজের বুকের ভেতরে তখন প্রতিহিংসার দাবানল জ্বলছে।
স্ট্রোম হাউসের রাতটা আজ অন্যদিনের চেয়েও বেশি রহস্যময় আর অন্ধকার। গেস্ট রুমের ভেতরে জাভিয়ানের শোবার ঘরের বাতিগুলো নেভানো; কেবল জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের ফ্যাকাসে আলো মেঝেতে আছড়ে পড়ছে। জাভিয়ান তান্বীকে নিজের বুকের মাঝে আগলে রেখে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে আছে। তান্বী চোখ বন্ধ করে থাকলেও তার মনের ভেতরটা কু ডাকছে। বারবার মনে হচ্ছে, এই অন্ধকার ঘরের কোনো এক কোণ থেকে কেউ একজন তাকে একদৃষ্টে পর্যবেক্ষণ করছে। একটা অদৃশ্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার চামড়া ভেদ করে অস্তিত্বের অতলে ঢুকে যাচ্ছে। তান্বী ভয়ে জাভিয়ানের শার্টের হাতাটা শক্ত করে খামচে ধরল। জাভিয়ান ঘুমের ঘোরেই তাকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল, যেন কোনো বিপদকেই সে তার প্রিয়তমার ধারেকাছে ঘেঁষতে দেবে না। কিন্তু তান্বীর সেই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সংকেত মোটেও ভুল ছিল না।
হাউসের অন্য প্রান্তে, ইভানের সেই গোপন কন্ট্রোল রুমে তখন এক ভয়ংকর নীরবতা। বড় বড় মনিটরের নীল আলোয় ইভানের মুখটা কোনো প্রেতাত্মার মতো দেখাচ্ছে। গেস্ট রুমের কোণে লুকানো অতি সূক্ষ্ম নাইট-ভিশন ক্যামেরার ফুটেজটা বড় স্ক্রিনে জীবন্ত হয়ে আছে। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে—জাভিয়ান পরম মমতায় তান্বীকে জড়িয়ে ধরে আছে। তান্বীর মাথায় জাভিয়ানের হাত, আর তান্বী জাভিয়ানের আশ্রয়ে নিশ্চিন্তে মুখ লুকিয়ে রেখেছে।
এই দৃশ্য দেখে ইভানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তার দুচোখে তখন প্রতিহিংসার দাবানল জ্বলছে। তান্বীর প্রতি তার সেই বিকৃত আসক্তি আর জাভিয়ানের প্রতি আজন্ম ঘৃণা মিলেমিশে তাকে উন্মাদ করে তুলছে। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ইভান দাঁত কিড়মিড় করে উঠল। তান্বী ওই জাভিয়ানের বাহুডোরে এতটা শান্তিতে আছে—এই দৃশ্যটি তার সহ্যশক্তির বাইরে চলে যাচ্ছে। ইভানের শরীরের শিরাগুলো রাগে ফুলে উঠছে। তার তীব্র ইচ্ছা হচ্ছে এখনই গিয়ে ওই ঘর থেকে তান্বীকে ছিনিয়ে নিয়ে আসতে। কিন্তু পরক্ষণেই পাশে রাখা মায়ের সেই হৃৎপিণ্ডভর্তি জারটির দিকে নজর পড়তেই সে নিজেকে শান্ত করার জন্য অস্থির হয়ে উঠল। তার এই অস্থিরতা কোনো স্বাভাবিক মানুষের নয়, বরং এক চরম মানসিক বিকারের বহিঃপ্রকাশ। সে ড্রয়ার থেকে একটি সিরিঞ্জ বের করে তাতে কড়া ডোজের একটি সিডেটিভ ভরে নিল। কাঁপতে কাঁপতে নিজের হাতের শিরায় সেই সুঁইটি ফুটিয়ে দিল সে। নীল তরলটি রক্তে মিশে যেতেই তার স্নায়ুগুলো ঝিমঝিম করে উঠল। স্ক্রিনে তখনও জাভিয়ান আর তান্বীর সেই নিবিড় দৃশ্য ভাসছে। ইভান নেশাচ্ছন্ন চোখে সেই দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল— “জাভিয়ান… ভোগ করে নে আজকের রাতটা। জড়িয়ে ধরে রাখ যত পারিস। কারণ এই পরম সুখ খুব বেশিদিন তোর কপালে নেই।”ইনজেকশনের প্রভাবে ইভানের চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। চেয়ারে হেলান দিয়ে সে ঢলে পড়ল এক কৃত্রিম অন্ধকারে। কিন্তু তার অবচেতন মনে তখনও তান্বীর সেই ভয়ার্ত মুখ আর সিসিটিভির ওই নীল ফ্রেমটি লেপ্টে রইল।
সকাল হতেই স্ট্রোম হাউসে এক গুমোট অস্থিরতা শুরু হলো। জাভিয়ান আর তান্বী প্রস্তুত; তাদের ব্যাগ গুছিয়ে তারা নিচে নেমে এসেছে। এই বিভীষিকাময় প্রাসাদ থেকে তারা যে কোনো মূল্যে আজই মুক্তি চায়। গতরাতের সেই অদৃশ্য নজরদারির আতঙ্ক তান্বীর মনে এখনো গেঁথে আছে; সে জাভিয়ানের হাতটা এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়ছে না।
নিচে বিশাল হলঘরে সাইফ চৌধুরী স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নিজের অর্ধাঙ্গিনী ইসাবেলার আকস্মিক মৃত্যু আর পরিবারের এই অভ্যন্তরীণ ভাঙন তাকে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে। তিনি অনুভব করতে পারছেন, তার তিল তিল করে গড়া এই দম্ভ আজ তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ছে। বিশেষ করে ইভানের কালকের ওই বিধ্বংসী এবং বিকারগ্রস্ত রূপ দেখে তিনি প্রথমবারের মতো নিজের ভেতরে ভয়ের অস্তিত্ব টের পাচ্ছেন। ঠিক যখন জাভিয়ানরা গেটের দিকে এগোচ্ছিল, ইভান ওপরের খিলান থেকে ধীর পায়ে নেমে এল। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ; গতরাতের সেই সিডেটিভ ইনজেকশনের নেশা আর অনিদ্রার ছাপ সেখানে স্পষ্ট। তাকে দেখাচ্ছিল কোনো এক পরাজিত অথচ প্রচণ্ড হিংস্র এক জানো/য়ারের মতো। সাইফ চৌধুরী ইভানের দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেলেন। হয়তো শেষবারের মতো কোনো সান্ত্বনা দিতে চেয়েছিলেন, কিংবা চেয়েছিলেন এই দীর্ঘ বিবাদের একটি অবসান ঘটাতে। তিনি কাঁপা গলায় ডাকলেন—”ইভান… , শোনো। যা হওয়ার তা তো হয়ে গেছে —” কথাটা শেষ করার সুযোগ পেলেন না তিনি। ইভান স্থির হয়ে দাঁড়াল। তার চোখে পিতার প্রতি কোনো শ্রদ্ধা নেই, নেই কোনো নূন্যতম আবেগ। সে সাইফ চৌধুরীর দিকে এমন এক অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাল, যেন সামনে কোনো অতি তুচ্ছ অস্তিত্ব দাঁড়িয়ে আছে।
ইভান খুব ঠান্ডা এবং নিচু স্বরে কেবল দুটি শব্দ উচ্চারণ করল— “গেট লস্ট!” সাইফ চৌধুরী পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। নিজের জন্মদাতার প্রতি এই চরম অপমান যেন তার সত্তায় সপাটে এক চড়। তিনি কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু ইভানের ওই হিমশীতল ও পাথুরে চাহনি দেখে তার কণ্ঠরোধ হয়ে এল। ইভান তাকে পাশ কাটিয়ে গটগট করে ভেতরের দিকে চলে গেল। জাভিয়ান দেখল তার চাচার সেই অসহায় মুখটি। কিন্তু তার মনে কোনো সহানুভূতির উদয় হলো না; সে জানে, এই বিষাক্ত আগুনের বীজ তার চাচাই বুনেছিলেন বহু বছর আগে। জাভিয়ান তান্বীকে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসল।
গাড়ি যখন স্ট্রোম হাউসের প্রধান ফটক পার হচ্ছিল, তান্বী একবার জানালা দিয়ে পেছনের দিকে তাকাল। সে দেখল, ওপরের ব্যালকনিতে ইভান দাঁড়িয়ে আছে, তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে তাদের গাড়ির ওপর। তান্বী দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। তার মনে হলো, তারা এই শৃঙ্খল থেকে সাময়িকভাবে বের হতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু মেইলস্ট্রোমের ওই অভিশপ্ত নজর থেকে বোধহয় এখনো মুক্তি মেলেনি। মেক্সিকোর রাস্তা ধরে গাড়ি ছুটে চলল তাদের নীড়ের দিকে, যেখানে অন্তত কিছুটা হলেও শান্তির নিঃশ্বাস নেওয়া সম্ভব।
স্ট্রোম হাউসের সেই বিভীষিকা থেকে মুক্তি পেয়ে নিজেদের নীড়ে ফেরার পর মাত্র একটি দিন পার হয়েছে। জাভিয়ান ভেবেছিল, এই চেনা ছাদের নিচে অন্তত তান্বী একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে পারবে; মুছে যাবে গত কয়েক দিনের দুঃস্বপ্ন। কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস সম্ভবত পর্দার আড়ালে অন্য কোনো পাণ্ডুলিপি লিখে রেখেছিল। গভীর রাতে হঠাৎ তান্বীর এক আর্তনাদে জাভিয়ানের ঘুম ভেঙে গেল। সে দেখল, তান্বী পেটে অসহ্য ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে, তার কপাল আর ঘাড় ঘামে ভিজে একাকার। জাভিয়ান যখন তাকে আগলে ধরার জন্য দু-হাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেল, তখন তার রক্ত হিম হয়ে এল। বিছানার সেই ধবধবে সাদা চাদরটি রক্তে লাল হয়ে গেছে। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে জাভিয়ান তান্বীকে পাজাকোলা করে গাড়িতে তুলে হাসপাতালের দিকে ছুটল। মেক্সিকোর জনশূন্য রাস্তা দিয়ে গাড়ি ছোটানোর সময় তার পুরো শরীর কাঁপছিল এক চরম ও অজানা আশঙ্কায়। হাসপাতালে নেওয়ার দীর্ঘ এক ঘণ্টা পর যখন ডাক্তার কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন, তাঁর মুখ ছিল মেঘলা আকাশের মতো অন্ধকার। তিনি জাভিয়ানের আর্তনাদমাখা চোখের দিকে তাকাতে পারছিলেন না। মাথা নিচু করে খুব ধীর স্বরে বললেন— “আই অ্যাম স্যরি মিস্টার জাভিয়ান। প্রচুর ইন্টারনাল ব্লিডিং হওয়ার কারণে আমরা বাচ্চাটাকে বাঁচাতে পারিনি। ওনার মিসক্যারিজ হয়ে গেছে। আমরা ওনাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু শিশুটিকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি।” জাভিয়ানের মনে হলো, তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে এবং মাথার ওপরের আকাশটা ভেঙে তার ওপর আছড়ে পড়েছে। যে অনাগত প্রাণকে ঘিরে সে হাজারো রঙিন স্বপ্ন বুনেছিল, সেই ছোট্ট প্রাণটা পৃথিবীর আলো দেখার আগেই নিভে গেল? জাভিয়ান হাসপাতালের করিডোরের দেয়াল ধরে ধপ করে বসে পড়ল। তার চোখের সামনে তখন কেবল অন্ধকার। যে সন্তানটি হওয়ার কথা ছিল তাদের নতুন জীবনের শুরু, সে কি তবে স্ট্রোম হাউসের ওই বিষাক্ত বাতাসের বলি হলো? জাভিয়ানের ভেতরের হাহাকার কোনো শব্দ হয়ে বের হতে পারল না, কেবল এক তীব্র অপরাধবোধ আর শূন্যতা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।
অনেকক্ষন পর কেবিনে ঢোকার পর তান্বী জাভিয়ানকে দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার সেই কান্না যেন হাসপাতালের নিথর বাতাসের বুক চিরে যাচ্ছিল। সে জাভিয়ানের শার্টের কলার খামচে ধরে উন্মত্তের মতো চিৎকার করে বলতে লাগল—”জাভিয়ান, এটা ঝড়তুফান করেছে! ওই বাড়ির কোনো খাবারে সমস্যা ছিলো।ও আমার বাচ্চাটাকে মেরে ফেলেছে জাভিয়ান!ও আজ আমার কলিজাটা ছিঁড়ে নিয়েছে!” জাভিয়ান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তান্বীর প্রতিটি শব্দ তীরের মতো তার হৃদপিণ্ড বিদীর্ণ করে দিচ্ছে। কিন্তু সে নিজেকে প্রচণ্ড কষ্টে সামলে নিয়ে তান্বীর কাঁপতে থাকা হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরল। “অসম্ভব তান্বী! আমি ওই বাড়ির এক ফোঁটা পানিও তোমাকে পান করতে দিইনি। রায়হানকে দিয়ে বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তোমাকে খাইয়েছি। ইভান তোমার ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারেনি। এটা স্রেফ এক নির্মম দুর্ঘটনা তান্বী, নিজেকে শান্ত করো…” কিন্তু তন্বী থামল না; হারানো সন্তানের শোক তাকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে দিয়েছে। সে সমানে কেঁদেই চলল। জাভিয়ান আর কোনো যুক্তি বা তর্কে গেল না। সে পাথরের মূর্তির মতো শিয়রে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে জল নেই, কিন্তু বুকের ভেতরটা এক অজানা দহনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না—এটা কি সত্যিই ইভানের কোনো অদৃশ্য চাল, নাকি তার অতীতের কোনো পাপের চরম দণ্ড?
বাসায় ফেরার পর তান্বীকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে জাভিয়ান কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তান্বী তখনো বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। জাভিয়ান গাড়ি নিয়ে সোজা চলে এল মেক্সিকোর সেই নির্জন ব্রিজের ওপর—যেখানে শৈশব থেকে মন খারাপ থাকলে সে একা এসে দাঁড়ায়। নিচে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউগুলো আক্রোশে পাথরে আছড়ে পড়ছে। জাভিয়ান রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ঝাপসা আকাশের দিকে তাকাল। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে সে যেন তার অনাগত সন্তানের কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল; দুচোখে এখন কেবল অন্ধকারের রাজত্ব।
জাভিয়ান ব্রিজের রেলিংটা সজোরে আঁকড়ে ধরল; ধাতব স্পর্শে তার হাতের শিরাগুলো নীল হয়ে ফুলে উঠছে। তার বিষাদমাখা হাসিতে আজ কোনো আনন্দ নেই, আছে কেবল এক বুক হাহাকার আর তীব্র দহন।সে শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপের সুরে হাসতে হাসতে চিৎকার করে উঠল— “বাঃ! দারুণ খেললে তুমি। আমার কাছ থেকে সব কেড়ে নিলে? একে একে আমার নিজের ভাইকে কেড়ে নিলে, আমার চাচিকে সরিয়ে দিলে, আর আজ আমার অনাগত সন্তানকেও কেড়ে নিলে? যাদের আমি পৃথিবীতে সবথেকে বেশি ভালোবেসেছি, তারাই চলে যায়! এটাই কি তবে আমার নিয়তি?” জাভিয়ান থামল না। তার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে আসছে, মহাকাশের বিশালতার কাছে নিজের জীবনের সব হাহাকার ছুড়ে দিয়ে বললো “তাহলে কি এবার তান্বীর পালা? ওকেও তো আমি আমার জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। যাকে যাকে আমি ভালোবাসব, সবাই কি এভাবেই চলে যাবে? আমার অস্তিত্বে আর কী-ই বা অবশিষ্ট রইল তবে?”
চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন বিদ্রূপের মতো তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। জাভিয়ানের মনে হলো, তান্বী যদি চলে যায়, তবে তার এই শরীরটা কেবল একটা চলন্ত কবরে পরিণত হবে। সে ব্রিজের রেলিংয়ের ওপর সজাগ হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার দুচোখে তখন এক প্রলয়ংকরী সংকল্প। যদি ভালোবাসা কেড়ে নেওয়াই বিধাতার লিখন হয়, তবে সে সেই নিয়তির বিরুদ্ধেই মরণপণ যুদ্ধে নামবে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলতে লাগল— “না, তান্বীকে আমি যেতে দেব না। ওর শরীরে এক বিন্দু রক্ত থাকা পর্যন্ত আমি মেইলস্ট্রোমের ছায়াকেও ওর ধারেকাছে ঘেঁষতে দেব না।”
এদিকে পুরো রাতটা তান্বীর কাছে মনে হয়েছে একেকটি অনন্তকালের সমান। বালিশে মুখ গুঁজে সে ডুকরে কেঁদেছে; প্রতিবার শ্বাস নিতে গিয়ে তার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। সে ভাবছিল জাভিয়ানের সেই অপূর্ণ স্বপ্নগুলোর কথা। জাভিয়ান ঠিক করেছিল, তাদের ঘর আলো করে যদি পুত্রসন্তান আসে, তবে তার নাম রাখবে ‘রাহিয়ান’—শৈশবে হারিয়ে যাওয়া তার সেই ভাইটির স্মৃতিতে। জাভিয়ান চেয়েছিল রাহিয়ানের অকালমৃত্যুর যে বিশাল শূন্যতা তাকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে, তা নিজের সন্তানের স্পর্শে পূর্ণ করতে। কিন্তু আজ সেই আশার প্রদীপ পৃথিবীর আলো দেখার আগেই নিভে গেল। ভোরবেলা যখন আকাশের গায়ে ফ্যাকাসে নীল আলো ফুটছে, তখন জাভিয়ান ধীর পায়ে ঘরে ফিরল। তার চোখের নিচে গভীর কালি, অবিন্যস্ত চুল আর বিধ্বস্ত অবয়ব। তান্বী তখনও বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে নিথর হয়ে বসে ছিল; কান্নায় তার দুচোখ ফুলে রক্তবর্ণ হয়ে আছে।
জাভিয়ানকে ঘরে ঢুকতে দেখেই তান্বী ধরা গলায় আর্তনাদ করে উঠল— “সারারাত কোথায় ছিলেন আপনি? এই অসহ্য যন্ত্রণার মাঝে আমাকে একা ফেলে কোথায় গিয়েছিলেন?”
জাভিয়ান তান্বীর চোখের দিকে তাকানোর সাহস পেল না। সে দেয়াল ধরে কোনোমতে দাঁড়িয়ে শান্ত অথচ নির্জীব স্বরে বলল, “কোথাও না… এই তো একটু নির্জনে গিয়েছিলাম। তুমি এখনও জেগে আছো? শরীরটা আরও খারাপ করবে, একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো।”
তান্বী এক বুক হাহাকার নিয়ে চিৎকার করে উঠল— “ঘুমানো যায়? সন্তান হারিয়ে কোনো মা কি ঘুমাতে পারে জাভিয়ান? আমাদের রাহিয়ান আসার আগেই চলে গেল, আর তুমি বলছ আমাকে শান্ত হয়ে ঘুমানোর কথা?” জাভিয়ান তান্বীর পাশে বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল। তার শরীরের প্রতিটি কোষ যেন আজ অবসন্ন; তান্বীর হাতটা ছুঁয়ে দেওয়ার মতো শক্তিটুকুও তার নেই। সে শূন্য দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল—”কী করব বলো? আমি বোধহয় অভিশপ্ত জিন্নীয়া। যাকে আমি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসব, তাকেই নিয়তি কেড়ে নেবে—এটাই বোধহয় আমার কপালের লিখন। ভাইয়া গেল, পরম আশ্রয়ের চাচি গেল, এমনকি অনাগত সন্তান রাহিয়ানও আসার আগেই হারিয়ে গেল। এখন আমার খুব ভয় হয় তান্বী… আমি তোমাকেও অনেক বেশি ভালোবাসি। তোমাকেও কি শেষ পর্যন্ত আমার এই দুর্ভাগ্যের গ্রাস কেড়ে নেবে?” জাভিয়ানের এই নগ্ন অসহায়ত্ব দেখে তান্বীর কান্নার বাঁধ ভেঙে গেল। সে জাভিয়ানকে সজোরে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল।
তান্বী জাভিয়ানকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। জাভিয়ানের শরীরের সেই হিমশীতল ভাবটা তার উষ্ণতায় ধীরে ধীরে গলতে শুরু করল। তান্বী নিজের চোখের জল মুছে জাভিয়ানের মুখের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে তখন শোকের চেয়েও বড় এক সংকল্পের সুর। জাভিয়ানের দুহাত নিজের গালের ওপর রেখে তান্বী ধীর স্বরে বলল— “ওভাবে বলবেন না জাভিয়ান। আপনি অভিশপ্ত নন, আপনি পরিস্থিতির শিকার। আর শুনুন, মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনো শক্তি আমাকে আপনার থেকে আলাদা করতে পারবে না।”
জাভিয়ান কোনো কথা বলতে পারল না। তান্বীই এখন তার ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র ধ্রুবতারা। সে তান্বীর কপালে নিজের মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল— “আমি তোমাকে হারাতে পারব না জিন্নীয়া। তোমার প্রাণের বিনিময়ে যদি আমাকে লড়তে হয়, তবে আমি পুরো মেক্সিকো জ্বালিয়ে ছাই করে দেব।”
জাভিয়ান তান্বীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে, কিন্তু তার চোখ দুটো স্থির। তান্বী দেখল, জাভিয়ানের চোয়াল পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। তান্বী নিজে হাউমাউ করে কেঁদেছে বলে তার মনের ভার কিছুটা হালকা হয়েছে, চোখের জল তার হাহাকারকে কিছুটা ধুয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু জাভিয়ান কাঁদতে পারেনি। এক ফোঁটা জলও তার চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়েনি। জাভিয়ানের এই ‘না কাঁদাটাই’ তান্বীকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। জাভিয়ানের বুকটা এক গভীর অভিমানে আর যন্ত্রণায় পাথরের মতো ভারী হয়ে আছে। তান্বী খুব আলতো করে জাভিয়ানের চুলে বিলি কাটতে লাগল তারপর খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল— “কেঁদে ফেলুন জাভিয়ান… এভাবে পাথর হয়ে থাকলে আপনি শেষ হয়ে যাবেন। রাহিয়ান তো আপনারই অংশ ছিল, ওর জন্য হলেও একবার কাঁদুন।” জাভিয়ান পাথরের মতোই নিথর রইল। সে কেবল তান্বীর গায়ের ঘ্রাণটুকু ফুসফুস ভরে টেনে নিচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে যদি সে কেঁদে ফেলে, তবে সে আর কোনোদিন উঠে দাঁড়াতে পারবে না। ইভানের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য যে কাঠিন্য প্রয়োজন, চোখের জলে তা ধুয়ে যাবে—এই ভয় তাকে তাড়া করে ফিরছে। তান্বী জাভিয়ানের কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে তাকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। জাভিয়ানের বিধ্বস্ত শরীরটা অবশেষে তান্বীর স্নেহে শিথিল হয়ে এল। ঘুমের ঘোরেও সে তান্বীর হাতটা মরণপণে আঁকড়ে ধরে রাখল—যেন চোখ খুললেই দেখবে তান্বীও হারিয়ে গেছে। তান্বী জেগে রইল পাহারাদারের মতো, আর জাভিয়ান তার কোলে মাথা রেখে ডুবে গেল এক দুঃস্বপ্নের অতল গহ্বরে, যেখানে কেবল দহনের আগুন জ্বলছে।
চলবে……
নোট: আগামীকাল নাইট রেভেনের রহস্য রিভিল করবো। এবার যেহেতু গল্প শেষের দিকে সবাই রেসপন্স করবেন প্লিজ।
Share On:
TAGS: ডিজায়ার আনলিশড, সাবিলা সাবি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৭
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৬
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩২
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৫
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪৩
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪২
-
ডিজায়ার আনলিশড গল্পের লিংক
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩৪
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব- ৪১ (শেষাংশ)