বেলতুলি – [৩২]
লাবিবা ওয়াহিদ
[অন্যত্র কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]
রিমঝিমের বিয়ের কথা শুনে প্রণভ হলুদের দিন সন্ধ্যায় এসে পৌঁছায়। ছেলেটাকে খুব বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। কিন্তু কেউ তার এই শুকিয়ে কাঠ কাঠ হয়ে মুখটার কারণ খুঁজে পেল না। সবাই ভেবেই নিল হয়তো কাজের অনেক চাপ। কিন্তু সত্যিটা এমন নয়।
প্রণভ নিজের মনে অনেক গোপন এক অনুভূতি যত্ন করে আগলে এসেছে। এই গোপন অনুভূতির মালকিন হচ্ছে রিমঝিম। যাকে সে ভালোবাসে ঠিক কত বছর, নিজেও জানে না। কিন্তু সে রিমঝিমের যোগ্য নয়। এজন্য তাকে কখনো সাহস করে বলা হয়নি, “ঝিম, তোমাকে আমি ভালোবাসি।”
যতবার রিমঝিমের জন্য পাত্রপক্ষ দেখতে আসত, তার হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হতো। সে প্রতিবার প্রচণ্ড ভয়ে কাতর হয়ে থাকত। দোয়া করত যেন রিমঝিমকে সে হারিয়ে না ফেলে। সে কখনো রিমঝিমকে মনের কথা বলতে পারেনি দুটো কারণে। এক, সে মা-হারা ছেলে। আর দুই, চাকরি হারিয়েছিল। কে এক বেকার ছেলেকে মেয়ে দিবে? সে যতই বাবার বড়ো ব্যবসা হোক না কেন, এই সমাজে সবার আগে ছেলের ইনকামটাই দেখে। প্রণভ নিজেও কখনো আত্মসম্মান খুইয়ে খালি হাতে রিমঝিমকে চাইতে পারত না। রিমঝিম খুব দামি তার জন্য, দামী জিনিসকে সে কোন আক্কেলে ঘরে তোলার মতো চিন্তা করত? অন্তত রিমঝিমের প্রয়োজন মেটানোর মতো হলেও তার সামর্থ্য থাকতে হবে৷ সেটুকু সামর্থ্যও তার ছিল না। মেয়েটাকে খালি পকেটে কী করে সে রানি করে রাখত?
সে পাগলের মতো ইন্টারভিউ দিয়েছিল যেখানে সেখানে। শুধু একটা চাকরি, একটা! সাথে সাথে সে রিয়াজ সাহেবের কাছে বাবাকে পাঠাবে। কিন্তু সেই চাকরির দেখে পেতেও যেন সময় লেগে গেল। ইন্টারভিউর পর তাকে বাতিল করলে সর্বপ্রথম সান্ত্বনাটা রিমঝিমই তাকে দিত। অথচ রিমঝিম কখনো টেরও পায়নি, তাকে ঘিরেই প্রণভের এত আয়োজন। শেষমেষ যখন এই চাকরি পেল, সে রিমঝিমের থেকে দূরে যেতে হলেও গেল। নিজেকে কয়েক মাসের সময় দিয়েছিল, পরিকল্পনা ছিল কিছুদিনের মধ্যে প্রস্তাব দিয়ে তাকে চমকে দিবে। কিন্তু রিমঝিমের বিয়ের কথা শুনে সে নিজেই চমকে গেল। তার ভালোবাসা আজীবনের জন্য মনেতেই দলা পাকিয়ে রইলো, প্রকাশ করার সুযোগ পেল না। ভালোবাসা, সময় এত পাষাণ কেন? ‘কেন’?
কোনো রকমে অফিসের পোশাক পরেই সে রিমঝিমদের বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়। সে একটু দেখবে, হলুদের সাজে রিমঝিমকে কেমন লাগবে? নিশ্চয়ই মেয়েটার মুখের রং ফিরে এসেছে?আগামীকাল সে রিমঝিমের বিয়েতে আসবে না। তার বুকে মোটেও এতটা সাহস নেই, যে রিমঝিমকে অন্য কারো বউ রূপে দেখবে। যেখানে নিজের হতেই দেখল না, সেখানে অন্যকারো হয়ে যেতে কী করে দেখবে?
বাড়ির কাছাকাছি আসতেই দেখল গান-বাজনার কোনো শব্দ নেই। উলটো বাড়ির কিছু পুরুষ হন্তদন্ত, উদ্ভ্রান্তের মতো রিকশা, সিএনজি করে কোথায় যেন যাচ্ছে। প্রণভ এর কারণ বুঝল না। সে পথিমধ্যে জুনায়েদকে দেখল, সে নিজেও কোথাও যাওয়ার জন্য রিকশা খুঁজছে। প্রণভ তাকে আটকাল। ছেলেটার চোখ-মুখ অস্বাভাবিক লাল। প্রণভের কেন যেন বুক শিউরে উঠল অজানা আতঙ্কে। কী হচ্ছে এসব?
–“জুনায়েদ, কী হয়েছে? সবাই কোথায় যাচ্ছে অনুষ্ঠান ফেলে?”
এবার জুনায়েদ কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,
–“আর বিয়ে! আপার বিয়ে ভেঙে গেছে। তার চাইতেও বড়ো কথা— আপার এক্সিডেন্ট হয়েছে। হাসপাতালে..”
কান্নার দমকে জুনায়েদ আর কিছু বলতে পারল না। প্রণভের মনে হলো বুক থেকে কেউ হৃদপিণ্ডটাকে ছিঁড়ে নিচ্ছে। প্রণভ কোনো মতে বলল,
–“আমিও যাব, চল।”
কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। হাসপাতালের করিডোরে পিনপতন নীরবতা। কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবার মুখেই শঙ্কা, ভয় এবং বিধ্বস্ত ভাব। করিডোরে বসে থাকার এই সময়টা সবচেয়ে কঠিন। রিমঝিমের এখনো জ্ঞান ফিরেনি। আল্লাহর অশেষ রহমতে বড়ো কিছু হয়নি। তবে কিছু তো ড্যামেজ অবশ্যই হয়েছে। হাত ভেঙেছে তার, মাথাতেও আঘাত পেয়েছে। তবে গুরুতর নয়। তবে হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরী হলে বড়ো কিছু হবার সম্ভাবনা ছিল। এছাড়া বাদ-বাকি টুকটাক আঘাত। মাথা থেকে অনেক রক্ত গেছে, এজন্য তাকে রক্তও দিতে হয়েছে। অবস্থা সেভাবে বিস্তারিত বলেনি ডাক্তাররা। তবে বোঝা যাচ্ছে, এখনো অবস্থা আশঙ্কাজনক। রিমঝিমের জ্ঞান ফেরানোটা জরুরি। আল্লাহর উপর ভরসা করা ছাড়া সবাই উপায়হীন। ডাক্তার তো শুধু উছিলা।
রাজিয়া শেখ, মৌনো আসেনি। মেয়েরা বাড়িতে থেকেই রাজিয়া শেখকে সামলাচ্ছে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে চোখ-মুখ ফুলিয়ে ফেলেছেন। রিয়াজ সাহেব শক্ত হয়ে বসা। তার পাশে ছায়ার মতো সঙ্গ দিচ্ছে ইয়ামিন, ইয়াসিন এবং মশিউর সাহেব। ইয়াসিন আজকেই এসেছে। ইয়ামিন তো নিজেকে দোষারোপ করছেন এই ঘটনার জন্য। যতই হোক, রাহাত তার বন্ধু.. তার বিয়েতেই তো রাহাত আর রিমঝিমের দেখা হয়েছিল। ইয়াসিন এতে ছোটো ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখলেন,
–“তোর কোনো দোষ নেই। যা হয়েছে সবটা ভাগ্যক্রমে।”
ইয়ামিন তাও শুনল না। সে ভাবতেই পারছে না এমন অকৃতজ্ঞ বন্ধুর সাথে এতদিন সে চলাফেরা করেছে। যার কারণে তার পরিবারের মানুষ আজ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এই দোষে নিজের ভুল ছাড়া সে কিছুই চোখে দেখছে না। ইয়ামিনের চোখ-মুখের রং দেখলেই বোঝা যায়, যদি ভুলক্রমেও রাহাত তার সামনে চলে আসে, ওকে সে ছাড়বে না। কিছুতেই না। একপাশে প্রণভ দাঁড়িয়ে। নিবিড় তার কাঁধে হাত রাখল। প্রণভ এতে আরও আবেগী হয়ে পড়ে। ভাঙা গলায় বলল,
–“আ-আমি কী বেশি দেরী করে ফেললাম, নিবিড়?”
নিবিড় আশ্বাস দেয়,
–“না। রিমঝিম ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা কোরো না। আল্লাহ এতটাও নির্দয় নন।”
রিমঝিমের এক্সিডেন্টের কথা শুনে রাহাত ছুটে আসে। সে রিয়াজ সাহেবকে বারবার বলে,
–“আমার ভুল হয়েছে আঙ্কেল। আমি রিমঝিমকে ছাড়ব না, ওকে আমি বিয়ে করব।”
রিয়াজ সাহেব মুখ ফিরিয়ে নিলেন। রাহাতকে তিনি দেখতেও ইচ্ছুক না। রাহাত এদিকে অপরাধবোধে ভুগছে। সে তো ভাবেইনি তার সামান্য বিয়ে ভাঙা রিমঝিমের ওপরে এত ঝড় তুলবে যে তার এক্সিডেন্ট হয়ে যাবে। তার বারবার রিমঝিমের হাস্যোজ্জ্বল মুখটা মনে আসছে। সে রিমঝিমকে বিয়ে করবে বলেই ঠিক করে নেয়, নয়তো এই অপরাধবোধ তার কখনোই ঘুচবে না। ইয়ামিন রাহাতকে দেখে রেগে গেল। নিঃশব্দ করিডোরে সে অকাজ করে বসল। রাহাতের কলার ধরে তাকে একপাশে টেনে নিল।
–“কু*র বাচ্চা! তোর সাহস কী করে হয় হাসপাতালে আসার? আমার ভাগনিকে পুরোদমে মে(১)রে ফেলতে আসছিস? এতকিছুতে তোর মন ভরে নাই?”
বিরাট ঝামেলা পাকানোর আগেই মশিউর সাহেব, নিবিড় এবং ইয়াসিন ইয়ামিনকে দূরে সরিয়ে আনল। প্রণভ দূর থেকে আগুন চোখে রাহাতকে দেখছে। তার সেই ক্রোধ যদি রাহাত তাকিয়ে দেখত। সেই চোখের চাহনি তাকে পুরোদমে ভষ্ম করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু প্রণভ রিমঝিমের দুশ্চিন্তায় রাহাতের দিকে এক ধাপও এগোলো না।
মশিউর সাহেব শক্ত গলাতেই রাহাতকে বলল,
–“তুমি এখন এখান থেকে যাও। রিমঝিমের হুঁশ ফিরলে ও যা চাইবে তাই হবে। আপাতত তোমাকে আমরা কেউই দেখতে চাইছি না।”
মশিউর সাহেবের এমন প্রত্যাখানে রাহাতের মুখ ছোটো হয়ে গেল। কল কাটার আগে রিমঝিম তাকে বলেছিল যেন তাদের আর কখনো যোগাযোগ না হয়, রাহাত তাও নির্লজ্জের মতো ফিরেছে। কোথাও একটা এখনো তার আশা আছে, রিমঝিম তাকে এত সহজে ফেরাতে পারবে না। ভালোবাসে মেয়েটা তাকে। সেই ক্ষুদ্র আশা নিয়েই রাহাত চলে গেল। রাহাত যেতেই প্রণভ এক মুহূর্ত দেরী করল না। উদ্ভ্রান্তের মতো রিয়াজ সাহেবের পায়ের কাছে বসল। এতে উপস্থিত সবাই অবাক। রিয়াজ সাহেব চোখ কপালে তুলে প্রণভের দিকে তাকাল।
প্রণভ খুবই কাতর গলায় বলল,
–“আঙ্কেল, প্লিজ রিমঝিমকে আমার করে দেন.. আমি ওকে আর দুঃখ পেতে দিব না, ওকে হারাতে পারব না। ও সেরে উঠলেই আমি কাজী ডাকব.. আমাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিবেন না আঙ্কেল প্লিজ.. দয়া করুন আমার ওপর।”
শেষ রাতের দিকে রিমঝিমের জ্ঞান ফিরল। জ্ঞান ফিরতেই দেখল প্রণভ বসা। রিমঝিমকে পিটপিট করে তাকাতে দেখে প্রণভ যেন প্রাণ ফিরে পেল। বড্ড সাহস নিয়ে রিমঝিমের হাতের ওপর নিজের বড়ো হাতটা রেখে বলল,
–“ঝিম, আমাকে দেখতে পারছ? কেমন লাগছে এখন?”
রিমঝিম প্রণভের দিকে তাকাল। যেন সে আশা করেনি প্রণভকে প্রথমে দেখতে পারবে। চারপাশে তাকিয়ে সবকিছু বোঝার চেষ্টা করল। ধাতস্থ হয়ে আবারও প্রণভের দিকে তাকাল।।প্রণভ ততক্ষণে ডাক্তার ডাকতে ব্যস্ত।
রিমঝিম আরো কিছুটা সুস্থ হয়ে এলো সকাল দশটার পর। রাজিয়া শেখ, মৌনো সবাই এসেছে তাকে দেখতে। রাজিয়া শেখই নাস্তা বানিয়ে আনলেন মেয়ের জন্য। তিনি বেশ শক্ত নারী, কিন্তু মেয়ের সামনে এসে বারবার চোখ ভিজে উঠছে। ব্যান্ডেজে আবৃত তার সন্তানকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। রিমঝিমকে বসতে সাহায্য করল নার্স। নার্সের পাশাপাশি মৌনোও সাহায্য করল। রিমঝিম ধীরে ধীরে বলল,
–“আত্নীয়রা..”
মৌনো বুঝল রিমঝিম এখনো বিয়েবাড়ি নিয়ে, আত্নীয়দের নিয়ে চিন্তিত। ওটাকে অবশ্য এখন বিয়েবাড়িও বলা চলে না। মৌনো বলল,
–“সব ঠিক আছে। তুমি চিন্তা-মুক্ত থাকো আপা। নিজের শরীরের আগে খেয়াল রাখতে হবে।”
পরপর কয়েকজন এলো। রিয়াজ সাহেব মেয়েকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। ভোর রাতে মেয়ের দুশ্চিন্তায় নিজেও কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তবে এখন তিনি ঠিক আছেন। রাহাতের অনবরত বিরক্ত তাকে অতীষ্ঠ করে তুলেছে। এজন্য রিয়াজ সাহেব মেয়েকে সোজা-সাপটা জিজ্ঞেস করলেন,
–“তুমি কি রাহাতকে বিয়ে করতে চাও মা?”
রিমঝিম বাবার দিকে তাকাল। সময় নিয়ে বলল,
–“ওর মুখটাও আমি দেখতে চাই না। বিয়ে তো দূরের বিষয়, বাবা। দয়া দেখাতে বিয়ে করতে চাইছে, ওর দয়ার দরকার নেই আমার। সে আজ আমাকে অসম্মান করেছে, বিয়ের পর করবে না তার গ্যারান্টি কী?”
রিয়াজ সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তার ভরসা ছিল রিমঝিমের উত্তর এমনই হবে। পেছন থেকে হঠাৎ প্রণভ এগিয়ে এলো। এখানে সকলে উপস্থিত। প্রণভ কারো দিকে না ফিরে রিমঝিমের চোখে চোখ রেখে বলল,
–“ঝিম, এতদিন আমার চাকরির জন্য একটা কথা বলতে পারিনি তোমায়। আমি তোমাকে ছোটো থেকে দেখেছি, চিনি। তোমাকে আলাদা করে চেনার প্রয়োজন নেই আমার। আমি জানি এগুলো বলার পরিস্থিতি নেই এখন, আবার এর থেকে ভালো সময়ও নেই কথাটা বলার। ঝিম, আমাকে বিয়ে করবে? এই অযোগ্য ছেলেটাকে তোমার হাসবেন্ড হওয়ার সুযোগ করে দিবে?”
সকলে বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে প্রণভের এমন প্রস্তাবে। রিমঝিম নিজেও। ওরা নিজেরা কথা বলুক ভেবে বাকিরা ধীরে-সুস্থে বেরিয়ে গেল। রিমঝিম অস্ফুট স্বরে বলল,
–“প্রণভ ভাই, আপনি সজ্ঞানে আছেন?”
–“আছি ঝিম, আছি। স্ব-জ্ঞানে, সম্পূর্ণ মন থেকেই বলছি।”
–“আমার সবকিছু জেনে-শুনেও? আপনি সেই ঘটনায় নিজে উপস্থিত ছিলেন।”
–“চাঁদের গায়েও দাগ আছে ঝিম, তাই বলে কি সে অসুন্দর? তাকে আমরা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করি? না, তাকে আমরা প্রতিদিন মুগ্ধ চোখে দেখি। তুমিও আমার এমনই একজন ঝিম। ভুল-চুক তোমার, আমার সবারই আছে। কেউ দুনিয়াতে পার্ফেক্ট হয় না। আমি নিজেই যে তোমার যোগ্য নই!”
রিমঝিমের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। আজ অবধি সবাই শুধু তার খুঁত বের করেছে। এই প্রথম, প্রণভ তার এতকিছু জেনেও সে নিজেকে রিমঝিমের অযোগ্য দাবী করছে। প্রণভ আবারও বলল,
–“আমি জানি আমার মা নেই, বাবার সাথে মিলে একা একা ভাই-বোনদের মানুষ করেছি। চাকরি করছি, সেই বেতনও খুবই কম। কিন্তু তবুও আমার তোমাকে লাগবে ঝিম.. আমি আর নিতে পারব না তুমি অন্য কারো হয়ে যাবে। প্লিজ ফিরিয়ে দিয়ো না। অপেক্ষা করতে পারব, তবু প্রত্যাখান শুনতে পারব না। যদি ভাবো জোর করছি, তবে তাই। তোমার কাছে আমার সুখ চাইছি, দিবে না?”
রিমঝিম প্রণভের দিকে তাকাল। এক রাতের মধ্যেই চেহারার কী হাল করেছে সে। চোখ-ভর্তি আকুতি, এই আকুতিকে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো শব্দ ডিকশিনারির কোনো পৃষ্ঠায় আছে? রিমঝিম ভাঙা গলায় বলল,
–“আমার প্রতি আপনার কোনো অভিযোগ নেই প্রণভ ভাই?”
–“উহু, নেই। একবার আমাকে সুযোগ দিয়েই দেখো না রিমঝিম.. আমাদের কাপল হিসেবে খুব সুন্দর লাগবে। আমার কল্পনাকে বাস্তবে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত তোমার, ঝিম।”
আবেগে কিনা কে জানে, ঘণ্টাখানেকের মাঝেই রিমঝিম তার মতামত জানাল। অতঃপর প্রণভের পিড়াপিড়িতে জুম্মার পর হাসপাতালেই দুজনের বিয়ে হয়ে গেল। এতে একশো শতাংশ বড়োদের সায় ছিল। প্রণভের বাবা তো চোখ মুছে বললেন,
–“আল্লাহ অবশেষে আমার ছেলেটার দিকে মুখ ফিরে তাকিয়েছেন। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাও রিমঝিম মা। ধুমধাম করে তোমাকে আমার বাড়িতে তুলব।”
হাসপাতালে রিমঝিমের আরও দুইদিন কেটে গেল। এই দুইদিন কেউ থাকুক বা না থাকুক.. প্রণভ সবসময় তার পাশে ছায়ার মতো থেকেছে। বউয়ের যতটুকু যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন, সে প্রতিনিয়ত তাই করছে। যখন রিমঝিমের খুব বোরিং সময় কাটে তখন প্রণয় তাকে বই থেকে গল্প পড়ে শোনাচ্ছে। মৌনোর কাছে শুনেছে রিমঝিম গল্পের বই পড়তে পছন্দ না করলেও তাকে কেউ পড়ে শোনালে ভালো হয়। প্রণভ সেটাই বাস্তবায়ন করছে। রিমঝিম হতভম্ভ, বিমূঢ় হয়ে প্রণভকে দেখে যাচ্ছে। পুরানো ক্ষত তার এখনো সেভাবে সারেনি, অনেকটা সময় লেগে যেতে পারে। কিন্তু প্রণভের প্রচেষ্টা, তার প্রতি যত্ন তাকে বড্ড মুগ্ধ করে যাচ্ছে। মানুষটা একবারও বলেনি রাহাতকে ভুলে যেতে। বরঞ্চ প্রতিনিয়ত রাহাতের দেওয়া ক্ষতগুলোকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। বহিরাগত ক্ষতর সাথে তার ভেতরটারও যত্ন নিচ্ছে। জীবনে কী কোনো ভালো কাজ করেছিল, যার জন্য আল্লাহ এত উত্তম প্রতিদান দিলেন? এটাকেই কী বলে, ধৈর্যের ফল মিষ্টি হয়?
হাসপাতালের পাঁচদিনের মাথায় আবারও প্রণভের চাকরি চলে যায়। কারণ, সে অফিস যায়নি পাঁচদিন। সর্বোচ্চ দুইদিন ছুটি নেওয়া যেতে পারে, তাই বলে পরপর পাঁচদিন ডিউটিতে না আসাটা কোনো অফিসই মেনে নিবে না। ওটা কর্মক্ষেত্র, মামা বাড়ির আবদার নয়। রিমঝিম এতে চিন্তিত হয়ে পড়ল, কিছুটা ব্যস্তও হলো। প্রণভ তার কপালে আলতো করে অধর ছুঁয়ে দিল। মেয়েটা মুহূর্তেই শান্ত হয়ে গেল। প্রণভ রিমঝিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
–“আমার জন্য, তুমি সবার আগে ইম্পোর্টেন্ট.. ঝিম। তুমি ভাবতেও পারবে না কতশত দোয়ার ফল তুমি। সেখানে এই এক দুটো চাকরি কী করে তোমার থেকে দূরে রাখবে বলো তো? আমার এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি, তুমি। তোমার সঙ্গ। চাকরি একটা গেলে আরেকটা পাওয়া যাবে। কিন্তু এই মুহূর্তগুলো বারবার ফিরে আসবে না।”
®লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে~~
[যারা গল্পটি পড়ছেন তারা সাড়া দিবেন যেন অন্যান্য পাঠকদের ফিডেও গল্পটি পৌঁছায়। আর এত সুন্দর পর্বে মন্তব্য তো অবশ্যই চাইইই।]
Share On:
TAGS: বেলতুলি, লাবিবা ওয়াহিদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বেলতুলি পর্ব ২৩
-
বেলতুলি পর্ব ২২
-
বেলতুলি পর্ব ২১
-
বেলতুলি পর্ব ২৪
-
বেলতুলি পর্ব ৩১
-
বেলতুলি পর্ব ৬
-
বেলতুলি পর্ব ২৬
-
বেলতুলি পর্ব ১৯
-
বেলতুলি পর্ব ২৫
-
বেলতুলি পর্ব ১০