Golpo romantic golpo বেলতুলি

বেলতুলি পর্ব ২৮


বেলতুলি পর্ব ২৮

লাবিবা ওয়াহিদ

[কপি অন্যত্র সম্পূর্ণ নিষেধ]

–“বিকালে কামরুলকে পাঠিয়ো। ওর হাতে ধরে পায়েশ পাঠাব আন্টির জন্য। সুসংবাদ বলে কথা। মিষ্টি খাবার খেলে আন্টির প্রেশার কমে আসবে নাহয়।”

–“হাহা, এখনো দুষ্টু থেকে গেছিস। আচ্ছা ঠিক আছে, পাঠাব। তবে আমার ভাগেরটাও দিয়ে দিবি। তুই রাঁধতে পারিস, এটাই তো চরম অবাকের বিষয়। বড়ো হয়ে যাচ্ছিস। কবে জানি আরও কিছুটা বড়ো হয়ে আমার ভাইয়ের বউ হয়ে যাস।”


নাহিয়ান চলে গেছে আজ দুই সপ্তাহ হলো। মৌনো এখন আগের চাইতেও দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে চলাফেরা করছে। ভার্সিটিতে মনোযোগ দিচ্ছে, বাসাতেও সবার সাথে বেশ হাসি-খুশি। তার খুশি এক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে হাফসা, তার প্রিয় বান্ধবী। আশিকের কারণে প্রায় অনেকদিন তাদের মাঝে মন-মালিন্য ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে হাফসা নিজেই হাতে-নাতে প্রমাণ পায় আশিক কত বড়ো চরিত্রহীন। হাফসা থাকতেও আশিকের অন্যান্য মেয়েদের সাথে ফ্লার্টিং বজায় ছিল। শুধু হাফসার অন্ধত্ব সেটা বুঝতে পারেনি, সে নিজের বান্ধবীকেও শত্রু করে ফেলেছিল এই ছেলেটার দোষে! এরপর আর কি, কিছু দিনের মধ্যে দুজন আবারও বন্ধুত্বে চলে আসল। মৌনো যেন তার পুরানো হাফসাকেই ফিরে পেয়েছে।

মৌনো সেদিন তো বাবার কাছে প্রথমবারের মতো বলল তাকে একটা মোবাইল কিনে দিতে। রাজিয়া শেখ মেয়ের আচরণ দেখে আবারও যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। যাক, মেয়েটা এখন অনেকটাই ঠিক আছে। সে কারণ যেটাই হোক না কেন, মায়েরা সন্তানকে খুশি দেখলেই স্বস্তি পায়।

রিমঝিমেরও রাহাতের সাথে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। রাহাত তাকে প্রস্তাব দিয়েছে বিয়ের, তা নিয়েই সে সংসার জীবনের স্বপ্ন দেখতে ব্যস্ত। রাহাত সত্যি বলতে বেশ সভ্য পর্যায়ের পুরুষ। সে প্রতিনিয়ত রিমঝিমের ডাক্তারি পেশা নিয়ে প্রচন্ড সাপোর্ট করে। এ নিয়ে মৌনোও খুশি হয়। তারও অন্তত মনে হয় না রাহাত ভাই খারাপ কেউ। বরং অল্প সময়ের মাঝেই কতটা বিশ্বস্ত হয়ে গেছে। আজকাল তার জন্যই যে বড়ো আপা হাসে, তার মাঝে বিষণ্ণতাও নেই।

প্রণভ এখন আর এখানে নেই। চাকরির কারণে তাকে নারায়ণগঞ্জ শিফট হতে হয়েছে। সেখানেই তার অফিস, আর চাকরি। চাকরি পাওয়ার খুশিতে তো সে সত্যিই রিমঝিমকে মিষ্টি খাইয়েছিল। গত সপ্তাহের ছুটিতে এসেছিল, আবার শনিবারের আগেই আবারও নারায়ণগঞ্জ চলে যায়। এখান থেকে নারায়ণগঞ্জের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। রিয়াজ সাহেব অবশ্য আফসোস করে বলেছিলেন,

–“তুমি চলে গেলে আমাকে সময়ে অসময়ে ভালো মাছ দিয়ে যাবে কে বাবা?”

প্রণভ হেসেছিল রিয়াজ সাহেবের কথায়। ভদ্রলোক বেশ মাছপ্রেমী, তাদের অন্যতম রেগুলার কাস্টমারও বলা যায়। প্রণভ হলফ করে বলতে পারবে এতদিন ডাক্তারবাড়ির মতো মাছ অন্য কেউ নিতে পারেনি। প্রণভ তখন বলেছিল,

–“আমি চলে গেলে রিপ্লেসমেন্ট আসবে চাচা। চিন্তা করবেন না।”

–“আর রিপ্লেসমেন্ট… তুমি তো তুমিই।”

আজ মৌনো তার আকাঙ্খিত মোবাইল পেল। তবে সরাসরি সে নয়, জুনায়েদ পেয়েছিল। মৌনো তখনো ভার্সিটি থেকে ফিরেনি। জুনায়েদ তো ফোন হাতে পেয়েই মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে মোবাইল নিয়ে গেছে ফটোকপির দোকানে। ওখানে কিছু টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন গান মেমোরি কার্ডে বা মোবাইলে শেয়ার করে দেয়। সে হাবিব, ন্যান্সি, বালামের গানগুলোই নিল। আজকাল ওদের গানগুলোই চলছে খুব, টিভি কিংবা রেডিওতে শোনা যায়। কিন্তু মোবাইল থেকে শোনার আনন্দই আলাদা। গান নিয়ে বাড়ি ফিরে সে এক প্লেট ভাত নিল। এরপর চুপিচুপি নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে গান শুনতে শুরু করল৷ গানের সাথে নিজ কণ্ঠের সুর মেলাতে মেলাতে আলুর ভর্তা আর গরম ভাতের বড়ো লোকমা মুখে পুরছে। আহ! অমৃত।

জুনায়েদের এই সুখ বেশিক্ষণ টিকল না। পরমুহূর্তেই তার দরজার উপর ঝড় তুফান শুরু করল এশা।
–“ভাইয়া, দরজা খোলো। আপার নাকি মোবাইল এসেছে। তুমি নিয়েছ না? আমাকে দাও, আমি গেম খেলব। আমি দেখেছি তুষারের আম্মুর মোবাইলে সাপ খেলা আছে। আমি ওটা খেলব আপার মোবাইলে। আমাকে দাও।”

ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে যখন দুই ভাই-বোন মিলে মৌনোর নতুন মোবাইলের চার্জ লাল বাত্তিতে এনে ঠেকিয়েছে, ঠিক তখনই মৌনোর আগমন। রাজিয়া শেখের কাছে শুনে যখন মোবাইল খুঁজতে জুনায়েদের ঘরে এলো.. তখনই দেখল তার মোবাইলের ওপর কী ঝড় যাচ্ছে। মৌনোর এতটাই রাগ হলো যে, দুই ভাই-বোনের পিঠেই শক্ত মাইর পড়ল। মৌনো ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
–“তোদের একটাকেও যেন আমার মোবাইল ধরতে না দেখি, বদমাইশ গুলা।”

জুনায়েদ যেন আকাশ থেকে পড়ল,
–“মানে কি! আমার গানগুলা তোমার মোবাইলে। নিজের জমানো টাকা খরচ করে গান ভরিয়ে এনেছি।”

–“দূর হ তুই, ভুলে যা টাকার কথা।”

সন্ধ্যার পরপর মৌনোর মোবাইলের চার্জ পুরো হলো। সে মোবাইলে নিজের সিম ঢুকাল। একে একে মা, বাবা আর রিমঝিমের নাম্বার চেক করল। সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগামীকাল গিয়ে হাফসার নাম্বারটাও চেয়ে নিবে। মোবাইলে দেখল একটাই গেম, সাপের। এছাড়া কিছু গান। কেন যেন তার সবার আগে নজর একটা গানে গিয়ে পড়ল, বালামের গান এটা। তার বেশ মনে আছে, নিবিড় প্রায়ই এই গানটা শুনত। জুনায়েদের থেকেও বহুবার শুনেছে নিবিড়ের নাকি এই গানটা খুব পছন্দের। মৌনো কোনো দিক না তাকিয়ে সেও গানটা চালু করল।

“রাতেরই আঁধারে,
অজানা ছোঁয়া
মায়াবী চোখে কী মায়া..
যেন গোধূলি আবির মাখা।

কি নেশা, ছড়ালে..
কি মায়ায় জড়ালে।”

সে একই গান পরপর কয়েকবার শুনল, যেন সে ঘোরের মাঝে আছে। রিমঝিম তখন ক্লান্ত দেহ নিয়ে ফিরল হাসপাতাল থেকে। কানে তার এখনো ফোন। মৌনো বুঝল রিমঝিম কারো সাথে কথা বলছে। ওপাশে কে আছে তা জানতেও তার বেশি সময় লাগল না। ইয়ামিন মামা। রিমঝিম তাকে চোখের ইশারায় বোঝাল,
–“ইয়ামিন মামা তোর সাথে কথা বলতে চায়।”

চট্টগ্রাম থেকে চলে আসার পর ইয়ামিন তাদের বেশ কয়েকবার কল করেছেন। বেশ চেঁচামেচিও করেছেন যে কী হয়েছে, কেন হঠাৎ তাদের এভাবে চলে আসা লাগল.. ইত্যাদি। এরপর যখন মৌনোর সাথে কথা বলতে চায় মৌনো তা নানান বাহানায় এড়িয়ে যায়। কিন্তু তার এড়িয়ে যাওয়ার কারণ কেউ ঠিক ভাবে বুঝে উঠতে পারে না। সে প্রতিবারের মতো এবারও ফিসফিস করে বলল,
–“দয়া করে ইয়ামিন মামাকে বোলো না আমি তোমার আশেপাশে আছি। প্লিজ আপা।”

রিমঝিম মামাকে লাইনে রেখে মৌনোকে শাসাতে পারল না। অগত্যা এবারও অযুহাত দেখিয়ে মামার কল কেটে দিল। মৌনোর দিকে চোখা নজর দিয়ে সে চলে গেল গোসলে। যাওয়ার আগে বলে গেল,
–“চিনি ছাড়া দুই কাপ রং চা বানিয়ে আন।”

মৌনো বুঝল আজ রিমঝিম বেশ সিরিয়াস কোনো কথা বলতে যাচ্ছে। এবং তা কি নিয়ে সেটাও সে জানে। চা করে আনতে আনতে দেখল রিমঝিম বারান্দায় বসে অপেক্ষা করছে। বাটনের টুকটাক শব্দ শোনা যাচ্ছে। নিশ্চয়ই রাহাত ভাইকে মেসেজ করছে। মৌনো চা নিয়ে রিমঝিমকে নিয়ে বসতেই হুট করে কারেন্ট চলে গেল। তাদের আলোচনা শুরুর আগেই বিঘ্ন! রিমঝিম দ্রুত ভেতরে গিয়ে রাজিয়া শেখকে হারিকেন খুঁজে দিতে গিয়ে দেখল ওনার হাতের কাছেই আছে। রাজিয়া শেখ আবার সন্ধ্যার পরপর হারিকেন, মোম সব কাছে নিয়ে বসেন। না পেলেই চেঁচামেচি শুরু করে দিবে।

রিমঝিম এসেই সবার আগে মৌনোকে প্রশ্ন করল,
–“তুই চট্টগ্রাম থেকে কী কারণে চলে এসেছিস বল তো? খবরদার বাহানা দিতে যাবি না, আমার তোকে খুব ভালো করেই চেনা আছে। খুব সিরিয়াস কিছু না হলে তুই কখনোই মামার বউভাত মিস দিতি না।”

মৌনোর কিছুটা অস্বস্তি হলো। রিমঝিম তা টের পেয়ে বোনের হাতে হাত রাখল। আশ্বাস দিয়ে বলল,
–“আমাকে তো বলতেই পারিস।”

মৌনো সময় নিয়ে বলতে লাগল,
–“আসলে.. নতুন মামী..”

–“নতুন মামী? কী করেছেন তিনি? তোর সাথে দেখাই বা কখন হলো?”

মৌনো দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে পড়ে গেল তার সেই রাতের কথা। সময় নিয়ে বলতে শুরু করল,
–“আমার পিপাসা পেয়েছিল বলে সেদিন রুম থেকে বের হয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে বধূরূপে মামীকে দেখতে পাই। তিনি করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সম্ভবত ইয়ামিন মামাকে দিয়ে কিছু করতে পাঠিয়েছিলেন। আমি তাকে সালাম দিয়ে পাশ কেটে যেতে নিতেই আমাকে দাঁড় করিয়েছিল।”

রিমঝিম যথাসম্ভব স্বাভাবিক থেকে প্রশ্ন করল,
–“এরপর?”

মৌনো কোলে নিজের নজর স্থির করে মিনমিন করে বলল,
–“আমাকে কথা শুনিয়েছে, বলেছে আমিই নাকি তার বিয়ের ঝামেলার নাটের গুরু। সাকিবকে ইচ্ছাকৃত ফাঁসিয়ে মামার শ্বশুরবাড়ির মানুষকে মামাদের চোখে খারাপ বানিয়েছি, নাটক সাজিয়েছি। সাকিবের বা তার পরিবারের শুধুমাত্র আমার জন্য সম্মানহানি হয়েছে। মামা নাকি ওদের কাউকে এখন আর সম্মানের চোখে দেখে না। তাই বলেছে তিনি আমার মুখও দেখতে চায় না।”

রিমঝিমের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। এগুলো কথা নাকি আঘাত করার অস্ত্র? সে ঢের অনুভব করতে পারছে মৌনোর ভেতর দিয়ে কতটা ঝড় গিয়েছে। যেই মামীর আসা নিয়ে সে এতটা উত্তেজিত, উচ্ছ্বাসে ছিল তার থেকেই চরম আঘাতটা সে পেয়ে বসেছে। তার বোনটা কবে এত বড়ো হয়ে গেল যে একা একা সব সহ্য করে গেল। কাউকে খবরও হতে দেয়নি। সে চাইলেই মাকে সব বলে দিতে পারত। তখন আবারও হিতে-বিপরীত হয়ে যেত। ঝামেলা যে কোন পর্যন্ত এগোত সে ভালো করেই টের পাচ্ছে। কিন্তু মৌনো এই পুরো সময়টাতে চুপ থেকেছে, কাউকে ঘূর্ণাক্ষরেও কিছু টের পেতে দেয়নি।

তাদের দু’বোনের চরম শত্রু যে এই রূপ, তা তো আগে থেকেই জানে। কিন্তু বোনকে কী সে এসব বলতে পারবে? নিজের সময়টা কোনো রকমে পার করে এসেছে। তাই বলে সে মোটেও চায় না তার বোন আত্মবিশ্বাসহীন জীবন কাটাক। সে প্রতিনিয়ত, প্রতিটা পদক্ষেপে বোনের পাশে থাকবে। বোনকে বিন্দুমাত্র আঘাতেও জর্জরিত হতে দিবে না সে।

মুখে কিছু না বলে রিমঝিম বোনকে কাঁধ ধরে জড়িয়ে নিল। ভরসা দিল,
–“ভাবিস না ওসব, ঠিক আছে? দুস্বপ্ন ভেবে ভুলে যা। মামী কাজিন প্রেমে অন্ধ। মানুষ আপন মানুষের অন্যায় দেখে না। তারা পরের ভুল ধরতেই বেশি ভালোবাসে।”

–“তাই চেষ্টা করছি।”

দুই বোনে আকাশের তারা দেখল মনোযোগ দিয়ে। এত বড়ো হয়ে গেছে, অথচ এখনো চাঁদ-তারা দেখলে দুই বোন অস্থির হয়ে যায়। প্রতিযোগিতায় নেমে যায় কে কতগুলা তারা গুণেছে। পাশের বাড়ির ছাদ থেকে শব্দ আসছে। সন্ধ্যার পর কারেন্ট চলে গেলে সবাই ছাদে উঠে। ডাক্তারবাড়িতেও এই উচ্ছ্বাস দেখা যেত। কিন্তু ইদানীং যাওয়া হয় না। তাই নিচতলার ভাড়াটিয়ারা একাই যায়। তবে এশাকে কি আর বেঁধে রাখা সম্ভব? সে পড়া ফেলে ছুটে গেল ছাদে। জুনায়েদও এই সুযোগে মায়ের হাতের ফাঁকা দিয়ে পালিয়েছে। সন্ধ্যার পর কারেন্ট যাওয়াটা ঈদের মতোই, পড়ার থেকে সাময়িক নিস্তার পাওয়া যায়।

রিমঝিম প্রসঙ্গ বদলে বলল,
–“রত্নার তো বিয়ে ভেঙে গেছে।”

–“হুঁ, এখন তো বের হতেই দেখা যায় না তাকে। প্রায়ই ঘরে বন্দী থাকে। যে পর্যায়ের ছড়িয়েছিল এলাকাজুড়ে। নিবিড় ভাইয়ের সাথে বিয়ে হবে, তার সাথে খুব খাতির, আন্টি তাকে খুব আগলে রাখেন, নিবিড় ভাইয়ের সাথে ঘুরতে গিয়েছে ইত্যাদি। এখন সব মিথ্যা কথা ধরা খাওয়ার চক্করে সে ঘরে আটকে।”

–“তোকে এসব আপডেট কে দিল?”

–“কে আবার, আমাদের সাংবাদিক কামরুল। ওর কাছে বেলতুলির অলিগলির সব খবর থাকে। আগে ভাবতাম ছেলেটা কত শান্ত, কারো কথা কাউকে লিক করে না। কিন্তু ইদানীং মনে হচ্ছে দিনকে দিন ছেলেটার দস্যিপনা বেড়ে যাচ্ছে। অবশ্য, আমার ওকে মন্দ লাগে না।”

–“তুই এত খুশি কী তবে নিবিড় ভাইয়ের বিয়ে ভাঙার জন্যেই? তোর আবার নিবিড় ভাইকে কবে থেকে ভালো লাগে? জানালি না যে?”

মৌনো চুরি করে ধরা খাবার মতো মুখ করে ফেলল, ভাগ্যিস অন্ধকার। তাই রিমঝিম তার সেই অভিব্যক্তি সম্পর্কে জানতে পারল না। মৌনো গলা যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে বলল,
–“কিসব যে বলো না! নিবিড় ভাইকে আমার পছন্দ হতে যাবে কেন। আমার রাগটা রত্নার ওপরই। ওর কত শখ ছিল আমাকে বিভিন্ন ভাবে ছোটো করার। কিছুই আর হলো না। উলটো এলাকার জ্যোতি আপা ওকে পেলে মুখের ওপর কালি লেপ্টে দেবে। জ্যোতি আপু যেন ওকে শুধু হাতের নাগালে পাওয়ার অপেক্ষায় আছে।”

রিমঝিম শুনল। সে নিজেও জানে রত্নার চলাফেরা উশৃঙ্খল। তার ব্যক্তিত্ব এবং আচরণও বেশ বাজে। তার চাইতেও বড়ো কথা, মেয়েটা বেশ অহংকারী। আল্লাহ যেখানে বলেছেন অহংকার পতনের মূল, সেখানে ওর এই মাত্রাতিরিক্ত অহংকার নিয়ে তার চিন্তাও ছিল। না জানে কখন কী করে বসে। কিন্তু রত্নার বাবা আবার ব্যতিক্রমধর্মী। ভদ্রলোক খুব আত্মসম্মান পুষেন মনে। তিনি নিজেও জানেন মেয়ের আচরণ সম্পর্কে টুকটাক। তবুও, মেয়ে তো। নিজে তাকে মা(১)রবেন, কা(১)টবেন তা বোঝা যায় কিন্তু মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে এক ফোঁটা সম্মান পাবেন না তা কী করে হয়? এই বিয়ে ভাঙার পেছনে তিনি একা নিবিড়দের দোষ দেননি। নিজের মেয়েকেও সমান দোষ দিয়েছেন। নিশ্চয়ই মেয়ের আচরণেও এমন কিছু কমতি ছিল যা নিবিড়ের পছন্দ হয়নি। তিনি মুরুব্বি হলেও বোকা নন।

রিমঝিম বলল,
–“আমি মনে করি কী জানিস.. আঙ্কেল বিয়েটা ভেঙে কাজের কাজ করেছেন।”

মৌনো মাথা নাড়ায়, সেও একমত। তার মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা। মৌনো সত্যি সত্যি কামরুলের হাত দিয়ে পায়েশ পাঠিয়েছিল। কিন্তু সোফিয়া খানম রাগে সেই পায়েশ ছুঁয়েও দেখেনি। কিন্তু নিবিড়ের বাবা মশিউর সাহেব ঠিকই খেয়েছেন। কামরুলের কাছে প্রশংসাও করেছেন।

কারেন্ট এলো। রিমঝিম মায়ের ডাকে ভেতরে চলে গেল। মৌনোর আচমকা মনে পড়ে গেল নিবিড়ের নাম্বারের কথা। ভাগ্যিস ফোনটা এখানেই ফেলে গেছে। সে দ্রুত নিবিড়ের নাম্বারটা নিজের সদ্য কেনা মোবাইলে টুকে নিল। সুন্দর করে নাম দিল, “লেফটেন্যান্ট কমান্ডার”। এর আগেপিছে আর কিছু দিল না। এটাই তো কতবড়ো শোনাচ্ছে। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিবিড়ের নাম্বারটা সে মুখস্থও করে নিল। নিবিড়ের সাথে জড়িয়ে থাকা সবকিছুই সে সুন্দর করে আগলে নিয়েছে, পরবর্তীতেও নিবে।

তার মাথায় একটা পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিবিড়কে কল করার পোকা। কিন্তু সে কল দিলে নিবিড় ধরবে কেন? নিশ্চয়ই আননোন নাম্বারে কল রিসিভ করবে না। রত্নারই কল রিসিভ করেনি সেখানে সে কোন ক্ষেতের মূলা? তবে সে কিছুটা হলেও আত্নবিশ্বাসী, নিবিড় তাকে চিনলে অবশ্যই কল ধরবে। কিন্তু দেখা গেল, বহু সাহস করে দুবার কল দিয়েও নিবিড়কে পাওয়া গেল না। এজন্য তার এবার রিমঝিমের নাম্বার দিয়ে কল করা লাগল। এটায় আবার ঠিকই কয়েকবার রিং হতেই সে রিসিভ করল। নিবিড়ের শীতল কণ্ঠস্বর শুনে মৌনোর বুকের অস্থিরতা কেমন কেটে গেল। নিঃশ্বাস নিতেও স্বস্তি হচ্ছে।

–” রিমঝিম? কথা বল?”

–“আ-আমি মৌনো।”

পরপর ওপাশ থেকে নীরবতা শোনা গেল। ধীরে-সুস্থে উত্তর এলো,
–“বল, কিছু দরকার?”

দরকার? দরকার ছাড়া কেউ কাউকে কল দিতে পারে না নাকি? মানুষের ইচ্ছে হয় না কেমন আছে, কী অবস্থা জিজ্ঞেস করতে? সব কথা কী দরকারেরই হতে হবে? কিন্তু মৌনো সেসব বলল না।

–“বাবা নতুন মোবাইল কিনে দিয়েছে। আপনাকে কল দিচ্ছি, ধরলেন না।”

নিবিড় তৎক্ষণাৎ কল কেটে দিল। মিনিট দুয়েকের মাঝেই মৌনোর ফোন বেজে উঠল। মৌনোর বুক ধুকপুক করে উঠল। তার নতুন মোবাইলে সবার প্রথমেই নিবিড়ের কল এসেছে। ছোটো স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে “লেফটেন্যান্ট”।

মৌনো কল রিসিভ করতেই নিবিড় বলল,
–” পার্সোনাল নাম্বারে অচেনা নাম্বার রিসিভ করি না আমি।”

–“এজন্যই কী রত্না আপুরটা রিসিভ করতেন না? আপু আপনার জন্য অচেনা ছিল?”

নিবিড় হেয়ালি ছাড়াই বলল,
–“টাইম ওয়েস্ট করা আমার পছন্দ না।”

মৌনো মিটিমিটি হাসল। সে বুঝতে পেরেছে নিবিড় তাকে কী বোঝাতে চেয়েছে।
–“আমি সময় খরচ করাচ্ছি না আপনার?”

–“নো। তোর হিসাব আলাদা।”

–“কেন? আমি আলাদা কেন?”

–“এসব জিজ্ঞেস করতে কল দিয়েছিস?”

–“নাম্বার সেভ করাতে কল করেছি। আমি মোটেও রত্না আপুর মতো নই যে কেউ আমার কল রিসিভ না করলে তাকে কল বারবার করব। আমার সেল্ফ রেসপেক্ট আছে।”

ওপাশ থেকে বোধ হয় সে একটু হাসির শব্দ শুনল। মৌনো অবাক হলো।৷ নিবিড়ের মতো মানুষ, হাসছে? কেন? সে হাসির কী বলেছে? পরপর আবারও নিবিড়ের গম্ভীর গলায় বলল,
–“আই লাইক দ্যাট।”

–“লাইক হু?”

–“সেল্ফ রেসপেক্ট।”

নিবিড় থেমে আবার বলল,
–” নাম্বার সেভ করে নিচ্ছি। এখন কল কাট, বিজি।”

–“সবেই না বললেন ফ্রি?”
–“দরকার হলে অবশ্যই ফ্রি। কিন্তু তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে না তুই দরকারি কিছু বলছিস। কুকিং করছি, ডোন্ট ডিস্টার্ব।”

মৌনোর মেজাজ খারাপ হলো। সে টের পেল নিবিড় কল কাটবে কাটবে। প্রতিবার যেই কাজটা নিবিড় করে সেই কাজটা আজ মৌনো করল। নিবিড়ের মুখের ওপর কল কেটে দিল। সে জানে না কেন, এই কাণ্ড ঘটিয়ে তার বেশ পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছে। প্রেমে পড়লে কত ধরণের মিশ্র অনুভূতি হয় তা নিয়ে বেশ ভালোই অভিজ্ঞতা হচ্ছে তার।


মাস পেরিয়েছে। আজ কামরুলের জন্মদিন। না, কেউ মনে রাখেনি। তবে কামরুল জায়গায় জায়গায় গিয়ে সবাইকে মনে করিয়ে দিচ্ছে আজ তার জন্মদিন। মে’র ত্রিশ তারিখে তার জন্মদিন। ভিখারি যখন প্রতিদিনের মতো চাল নিতে এলো, কামরুল তাকে বলল..

–“আজকে আমার জন্মদিন দাদী। আইজকা চাইলডা একটু কমই লও?”

ভিখারি চমকে গেল। মানুষ বিশেষ দিনগুলোতে সদকা বেশি বেশি করে, দোয়া চায় সেখানে এই ছেলে উলটো কথা বলছে। তবুও সে তো ভিখারি। রোজ চাল পাচ্ছে এই অনেক। একদিন কম পেলে আর ক্ষতি কি?
–“দেও তইলে।”

কামরুল চাল এনে দিল। চাল দেওয়া শেষে বলল,
–“অল্প চাইল দিতেছি বইলা অল্প দোয়া দিবা হেইয়া কিন্তু অইব না দাদী।”

–“এহন দোয়াও কি তুমার গলায় পাড়া দিয়া লওন লাগব?”

কামরুল তওবা করার ভান করে বলল,
–“ছ্যা, ছ্যা.. নাউজুবিল্লাহ কি কন। খাওন গলায় পাড়া দিয়া লওন যায় দোয়া তো না। দোয়া অইল রিজিক। তুমারে দোয়া দিতে কইছি যাতে আগামী জনমদিনে আল্লায় আমার রিজিক বাড়াইয়া দেয় আর তুমারে যাতে বেশি বেশি চাইল দিতে পারি।”

কামরুলের চালাকি কথা-বার্তার টোপ ভিখারি গিলে ফেলল। কামরুলকে দোয়া দিতে দিতে চলে গেল। কামরুল তখনই আরেকটা চক্কর দিতে গেল এলাকা।

মৌনো তখন ভার্সিটির জন্য বাসা থেকে বের হয়েছে। এমন সময়ে তার কামরুলের সাথে দেখা। মৌনোকে দেখতে পেতেই কামরুল ছুটে এলো। কেন যেন সে মৌনোকে বেশ ভালো পায়। হয়তো মৌনো তাকে যত্ন করে বলে।

–“আপা, আইজকা কিন্তু আমার জনমদিন। আমারে রোদচশমা না কিন্না দিলে ছাড়মু না।”

মৌনো ভ্রু কুচকে বলল,
–“ঠিক আছে, শুভ জন্মদিন। কিন্তু তুমি তো রোদচশমার কথা বলে বলে কতজনের টাকা মেরেছ। এখনো রোদচশমা কিনতে পারোনি?”

–“কসম আপা, আপনে দিলেই আইজকা যাইয়া কিন্না আনুম।”

–“ঘুষ?”

–“জনমদিনের উপহার দিলে ওডারে ঘুষ কয় নাকি?”

–“তোমাকে বিশ্বাস হচ্ছে না।”

কামরুল চিপায় পড়ে গেল। ধ্যাত, এক্কেবারে শুরুতেই রোদচশমার কথা বলা উচিত হয়নি। রোদচশমা কেনার কথা বলাটা তার পুরানো টেকনিক হয়ে গেছে। নতুন কিছু ভাবতে হবে। এবার সে যে করেই হোক, রোদচশমা কিনে নেওয়ার নিয়্যত করল। মিনমিন করে বলল,
–“আল্লাহ এবার যদি রোদচশমা কিনার ট্যাকা ভাঙছি তইলে তুমি আমার লুঙ্গি উড়াই নিয়ো। ইজ্জতের ফালুদা মানে মহাবিপদ। খালি ট্যাকাডা যাতে পাইয়া যাই।”

কিন্তু মুখে বলল,
–“আপা গো, আমারে আপনে বিশ্বাস করেন না? এই কথা আমার জনমদিনেই হুনা লাগল?”

মৌনোকে এতেও টলানো গেল না। কামরুল তখনই আরেক পরিকল্পনায় চলে গেল।
–“যদি রোদ-চশমার ট্যাকা দেন তইলে আমি আপনেরে একটা ভালো খবর দিমু। এক্কেবারে ট্যাকা উশুলের মতোন খবর।”

–“সেটা কী?”

–“আগে ট্যাকা!”

–“আগে খবর।”

কামরুল না পেরে বলল,
–“সামনের মাসে নিবিড় ভাই আইতেছে। কিন্তু কয় তারিখ এডা কইতে পারমু না, কয় নাই কিছু।”

মৌনো অবাক হলো। নিবিড়ের সাথে কথা হয়নি তার মাসখানেক। পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল সে। সেখানে এরকম একটা খবর খুবই অনাকাঙ্খিত ছিল। নিবিড়ের কী তবে ট্রেনিং শেষ হতে চলেছে?

কামরুল এক ধ্যানে মৌনোর দিকে তাকিয়ে আছে। সে এখনো বুঝে উঠতে পারছে না মৌনো খুশি হয়েছে নাকি দুঃখী। চিন্তায় পড়ে গেল সে, ঘটনা তো ভালো লক্ষণ না। এমন হলে তার এবারের জন্মদিন সবচেয়ে খারাপ হতে যাচ্ছে। কামরুলকে চমকে দিয়ে মৌনো বলল,

–“আমার সাথে মার্কেটে চলো। আমি নিজে দেখে রোদ-চশমা কিনে দিব। তাও টাকা দিচ্ছি না।”

®লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে~~

[যারা যারা পড়ছেন তারা সাড়া দিবেন যেন বাকি পাঠকদের ফিডেও পর্বটা পৌঁছাতে পারে। আশা রাখছি আজ আপনারা তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারবেন, প্রায় তিন হাজার শব্দ।]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply