Golpo romantic golpo বেলতুলি

বেলতুলি পর্ব ৩১


বেলতুলি – [৩১]

লাবিবা ওয়াহিদ

[অন্যত্র কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]

সারা দিন সূর্যের প্রকাণ্ড উত্তাপে মানুষের ভোগান্তি হলেও সেই ভোগান্তি কমে আসল যখন বিকাল নাগাদ আকাশ ঘন মেঘে ছেয়ে গেল, যেন কালবৈশাখি। অথচ এটা সবে বর্ষাকালের শুরু। তীব্র ঝড়ে রাস্তা-ঘাটের ধুলোবালি উড়ছে। বাতাস উপভোগ করার অবস্থা নেই। মৌনোর ছুটতে হলো ছাদে, কাপড় আনতে। বহু যুদ্ধ সেরে অবশেষে সে সব কাপড় নিয়ে ফিরে এসেছে। বিকাল হলেও বাহিরে অন্ধকার, যেন মাগরিবের সময়। অবশ্য মাগরিব হতে আধঘণ্টা বাকি। মৌনো ঘরে প্রবেশ করতেই বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি নামল। সঙ্গে সঙ্গে কারেন্টও চলে গেল। এমনিতে মোটেই তো কারেন্ট থাকতে চায় না তার ওপর পেয়েছে ঝড়-বৃষ্টির বাহানা।

মৌনোর মামী আর রাজিয়া ভেতরের ঘরে কথা বলছে। মামীর সাথে এখনো তার সম্পর্ক ঠিক নেই। ওরা রিমঝিমের বিয়ে উপলক্ষেই এসেছে। আগামীকাল অন্যান্য আত্নীয়রাও ধীরে ধীরে আসতে শুরু করবে। কাজও আরও বেড়ে যাবে। এশা আপাতত তার ঘরে ঘুমোচ্ছে, এজন্য বাড়ি এখনো শান্তই লাগছে।

রিমঝিমের বিয়েতে কার্ড ছাপাতে দিলেও সেই কাজ স্থগিত করতে হয়েছে রিয়াজ সাহেবের। হাতে সময় কম, কার্ড ছাপানোর লোকেরা সরাসরি বলেছেন এত দ্রুত তারা কার্ড দিতে পারবেন না। তাদের দিতে দিতে বিয়ের দুইদিন আগে। যদি বিয়ের দুইদিন আগেই কার্ড দেয় তাহলে তিনি আত্নীয়দের কাছে কার্ড পাঠাবেন কখন? আকস্মিক বিয়ের এই এক জ্বালা, কোনোদিকই খাপ খাওয়ানো যায় না। মনের মতো হওয়া তো দূর। তাই রিমঝিম তাকে উপায় দিল, মোবাইলে ভালো রকম ব্যালেন্স নিয়ে রিয়াজ সাহেবের নোটবুক সাথে নিয়ে বসে পড়তে। রিয়াজ সাহেবের একটা ছোটো নোটবুক আছে, তিনি সেটাতেই সবার নাম্বার লিখে রাখেন। পাছে যদি মোবাইল থেকে কারো নাম্বার হারিয়ে যায়? ভদ্রলোক এই রিস্ক কিছুতেই নিতে চাননি। অগত্যা, সবাইকে কল করে করে দাওয়াত দিতে হয়েছে। কার্ড ছাড়া দাওয়াতের কারণও জানাতে হলো। মোটামুটি সবাই এতে আশাহত হতে বারণ করেছেন। বলেছেন মেয়ের বিয়ে হওয়াটাই বড়ো কথা। তারা সময় মতো চলে আসবেন বলে কথা দেন।

সালমার সাথে এখনো মৌনোর ভাব হয়নি। সালমা খুব সূক্ষ্মভাবে তাকে এড়িয়ে চলে। আবার ইয়ামিন বা অন্যদের সামনে সে বেশ ভালো আচরণ করে। কিন্তু সেই চোখের অসন্তোষ চাহনি অন্তত মৌনোর চিনতে ভুল হয় না। সে হতাশ হলেও চায় না, আর তার জন্য কোথাও ঝামেলা হোক। এজন্য নিজে যত যাই হোক, সহ্য করে যাচ্ছে। সে বুঝে, তখন সালমার সদ্য বিয়ে হয়েছে। প্রতিটা মেয়েরই বিয়ে নিয়ে স্বপ্ন থাকে, শখ থাকে। কিন্তু তার সেই সমস্ত শখ, স্বপ্নকে ভেস্তে দিয়েছে মৌনো। সবাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল, এমন কি তার সদ্য বিবাহিত বরও। এমন পরিস্থিতিতে যে কারো মন-মানসিকতা খারাপ হবে সেটাই স্বাভাবিক।

মৌনো ভেবে নিল, এক সুযোগে মামীর থেকে মাফ চেয়ে নিবে। নয়তো মামীরও দিনকে দিন আরও নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে, যা মৌনো চায় না।

মৌনোর ভাবনার মাঝে দিয়েই তিন বান্দা কিছুটা ভেজা অবস্থায় ঘরে ঢুকল। ইয়ামিন মামা, জুনায়েদ আর নিবিড়। নিবিড়কে দেখে মৌনো চমকালই বটে। এই মুহূর্তে তাকে কিছুতেই আশা করেনি। ইয়ামিন মামা চাটগাঁইয়া ভাষায় বৃষ্টিকে গা(১)লি দিতে ব্যস্ত। বিকাল বেলায় কোথায় ভাবল নিবিড়কে নিয়ে ঘুরতে যাবে আহসান মঞ্জিলের দিকে। কিন্তু না, তারা গলির মাথা অবধিও যেতে পারেনি ওমনি বৃষ্টি নেমে গেছে। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে যেই একটু বৃষ্টির চাপ কমল ওমনি ছুটে আগে এই বাড়িতে এসেছেন, নিবিড়কেও তার বাড়ি যেতে দেননি। ছোটাছুটির মাঝেই তাদের জুনায়েদের সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিল। বেচারা গিয়েছিল খেলতে, কিন্তু যেই হারে বাজ পড়ছিল এতে মাঠে আর থাকতে পারেনি। এমনিতেই কয়েক দিনের মাথায় বড়ো বোনের বিয়ে। অসুস্থ হলে তো চলবে না।

মোমবাতির আলোয় নিবিড়ও মৌনোকে দেখল। মৌনো তখনো চিন্তিত চোখে নিবিড়কে দেখতে লাগল। খুব বেশি ভিজে গেছে বুঝি? ইয়ামিন মামা ততক্ষণে চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় তুলেছেন। রাজিয়া শেখ এবং সালমা ছুটে এসেছেন। সালমা স্বামীকে গামছা এগিয়ে দিল। মামা জুনায়েদকে আদেশ দিলেন নিবিড়ের জন্য গামছা এনে দিতে। জুনায়েদ কাকভেজা হয়ে পুরো বাড়িতে তন্নতন্ন করে খুঁজেও কেন যেন গামছা খুঁজে পেল না। তা নিয়ে রাজিয়া শেখ রেগে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
–“গাধা একটা জন্ম দিয়েছি।”

ইয়ামিন ততক্ষণে সালমার সাথে রুমে চলে গেলেন। তিনি আবার বেশিক্ষণ ভেজা কাপড়ে থাকতে পারেন না। মৌনো বোকার মতো কি করল কে জানে, নিজের ধোঁয়া গামছাটা অন্ধকারের মাঝে দিয়ে দিল। ভেবেছিল এটা জুনায়েদের বা রিয়াজ সাহেবের গামছা হবে। কিন্তু যখন নিবিড় মাথা মুছতে ব্যস্ত তখন ভালো করে খেয়াল করল সেটা তারই গামছা। মৌনো জমে গেল এই কাণ্ডে। এর মাঝেই রাজিয়া শেখের ভেতরের ঘর থেকে মোবাইল বেজে ওঠে। তিনি মৌনোর হাতে চায়ের দায়িত্ব দিয়ে চলে গেলেন। যেহেতু ইয়ামিন চলেই আসবে, সেহেতু সমস্যা নেই। কিন্তু ভদ্রমহিলা ব্যস্ততায় খেয়ালই করলেন না, এই সোফার ঘরে জুনায়েদও অনুপস্থিত। থেকে গেছে নিবিড় আর মৌনো। এতে মৌনোর অস্বস্তি আরও বাড়ল। নিবিড় তখনো সোফায় বসা, তার থেকে কয়েক হাত দূরে। মৌনো পরিস্থিতি অনুকূলে আনতে মিনমিন করে জিজ্ঞেস করল,
–“ক..ক-কয় কাপ চিনি? ক-কড়া লিকারের?”

নিবিড় মৌনোর দিকে তাকিয়ে বলল,
–“আমার টেস্ট ভুলে গেছিস? আগেও না বানিয়ে দিতি?”

মৌনো সত্যিই ভুলে গেছে। সে এই অস্বস্তিদায়ক পরিস্থিতিতে সবই ভুলে যাচ্ছে। চায়ের কথা ভাবা তো দূরে থাক। নিবিড় যেন কিছুটা হলেও মৌনোর অস্বস্তি ধরতে পারল।
–“এটা কার গামছা?”

মৌনো শুরুতে কিছুটা গাইগুই করল, সরাসরি সত্য বলতে চাইল না। সত্যি শুনলে নিশ্চয়ই নিবিড় তাকে খুব ধমকাবে? যদি রাজিয়া শেখকে ডেকে এনে তাকে কথা শোনায়? এই চরম সম্মানহানির কথা ভাবতেই মৌনোর চোখ ঝাপসা হয়ে আসতে চাইল, কিন্তু সে শক্ত থাকল। ধ্যান ভাঙল নিবিড়ের চাপা, শক্ত ধমকে।
–“খবরদার মিথ্যে বলবি না। এটা কার?”

–“আ-আমার। চিন্তা করবেন না৷ এটা ধোঁয়া ছিল। সরি নিবিড় ভাই, অন্ধকারে আমি ভেবেছিলাম এটা বাবার নয়তো জুনায়েদের হবে। দেখুন, বাবারটা এখনো আমার হাতে।”

নিবিড় দেখল, বুঝল মৌনো মিথ্যে বলছে না। সে দ্রুত গামছাটা সরিয়ে নিল। সে নিজেও এই প্রসঙ্গে অস্বস্তিতে পড়ে গেছে। কথা এড়াতে বলল,
–“দুই চামচ চিনি, গোরুর দুধের সাথে চা হলে ভালো হয়।”

মৌনো এক মুহূর্তও দেরী করল না, হারিকেন নিয়েই ছুটল রান্নাঘরে। কিছুক্ষণের মাঝেই সোফার-ঘর থেকে কথা-বার্তার শব্দ ভেসে এলো। নির্ঘাত ইয়ামিন মামা ফিরেছে। রাজিয়া শেখ তাকে বলে গেছিলেন ইয়ামিন চা খাবে না, তাই যেন এক কাপ শুধু নিবিড়ের জন্যই বানায়। মৌনো এক কাপ না বানিয়ে দুই কাপ বানালো, খুবই যত্নের সাথে। তার খুব আনন্দ হচ্ছে, তার এত বড়ো ভুলেও নিবিড় তাকে ধমকায়নি.. বরং অস্বস্তি হবে জেনে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছে। হঠাৎ মানুষটা কেন এতটা নরম হচ্ছে তার সাথে? নিবিড়ের কখনোই তার সাথে নিরিবিলি সম্পর্ক ছিল না। বরঞ্চ প্রতিটা দিনই তাদের মাঝে ঝগড়া-ঝাটি, গলাবাজি চলতই। ইদানীং মনে হচ্ছে, যেন নিবিড় উপলব্ধি করতে পারছে মৌনো এখন আর ছোটো নেই। সে কিছুদিন পর যুবতীতে পা ফেলবে। একজন ব্যক্তিত্ববান পুরুষ হিসেবে কিছুতেই মেয়েদের সাথে ওরকম আচরণ করা ঠিক হয়। এটা বড্ড অনুচিত। তাই হয়তো নিবিড় বদলেছে, কিছুটা হলেও।

দুই কাপ চায়ের এক কাপ নিবিড়ের জন্য, তো আরেক কাপ নিজের জন্য বানালো মৌনো। তারা একসাথে বসে চা খেতে না পারুক, অন্তত একই পাতিলের চা তো দূর থেকে হলেও খেতেই পারে তাই না? এটুকু চিন্তাও যেন মৌনোর নিবিড়ের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। কে বলেছে দূর থেকে ভালোবাসা যায় না? মৌনো তো দিব্যি নিবিড়কে নিয়ে সুখ সুখ অনুভূতিগুলো উপভোগ করছে। দূর থেকেই চেয়ে যায় নিবিড় যেন ভালো থাকে, সুস্থ থাকে। কোনো প্রকার বিপদ যেন তাকে না ছুঁতে পারে। এটুকু চাওয়াটা নিশ্চয়ই ভুল নয়।

মৌনো নিজ হাতে নিবিড়কে চা পরিবেশন করল। সিলেটি চায়ের ঘ্রাণ পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। এতক্ষণে হঠাৎ কারেন্টও চলে এলো। আবারও দুজনের সাথে চোখে চোখ পড়ল। মৌনো দ্রুত পালাল। যখন চায়ে চুমুক দিচ্ছিল তখনই সালমা তার ঘরে এলো।
–“আসব?”

–“আরে মামি, আসুন।”

সালমা নীরবে এলো। বিছানায় মৌনোর পাশে বসল। মৌনোর এই পর্যায়ে বেশ অস্বস্তি হচ্ছে। এই প্রথম সালমা নিজে থেকে কথা বলছে তার সাথে। কেমন অদ্ভুত লাগছে। কিছু হয়েছে কি?

সালমা সময় নিয়ে বলল,
–“কালকেও বের হবে?”
–“জি। আব্বুর পাশাপাশি আমিও কিছুটা সাহায্য করার চেষ্টা করছি।”

–“ওহ।”

আবারও তাদের মধ্যে নীরবতা। সালমা থেমে আবারও বলল,
–“আমি দুঃখিত, মৌনো। সেই রাতের জন্য আমি লজ্জিত। প্লিজ কখনো ইয়ামিনকে বোলো না আমি সেদিন তোমাকে কী বলেছিলাম। আমি জানি সেদিন তুমি আমার জন্যই ফিরে এসেছিলে, আমার জন্যই তুমি এতদিন ইয়ামিনের সাথে যোগাযোগ করোনি। পালিয়ে বেড়িয়েছ।”

মৌনো তাকাল সালমার দিকে। সালমা মাথা নিচু করে বলল,
–“রিমঝিম গতরাতে আমাকে সব বলেছে৷ যেহেতু আমরা দুজনই কাছাকাছি বয়সের সেহেতু ও আমার সাথে বন্ধুর মতোই মিশেছে। আমাকে জানিয়েছে তুমি ভেতরে ভেতরে কতটা স্ট্রাগল করেছ যাতে কেউ ঘূর্ণাক্ষরেও কিছু টের না পায়। কেন এত ভালো হতে গেলে আমার জন্য? আমি তো তোমাকে তোমার মামার থেকে দূর করে দিচ্ছিলাম।”

মৌনো শুকনো করে হাসল। মামীর হাতে হাত রেখে বলল,
–“এখানে আপনারও দোষ নেই মামী। আমি বুঝি, সব মেয়েদেরই বিয়ে নিয়ে নিজস্ব স্বপ্ন থাকে। কিন্তু আমার জন্য আপনাদের বিয়েতে শুধু ঝামেলাই হয়েছে। এজন্য আর কিছু যাতে না হয় এজন্য আমি চলে এসেছি।”

–“এভাবে বোলো না। সাকিবের ব্যাপারটা আমি জেনেছি আমাদেরই আত্নীয়দের থেকে৷ ওরা আমাকে জানিয়েছে ও তোমাকে সরাসরি হয়রানি করেছে। হয়তো তোমার জায়গায় থাকলে আমিও বিষয়টা নিতে পারতাম না। সেখানে আমি ভেবেছি.. আমি অত্যন্ত দুঃখিত মৌনো। আমি সত্যিই মানুষ চিনতে ভুল করেছি।”

সালমার চোখ-জোড়ায় আজ কোনো প্রকার বিদ্বেষ নেই। সে যেন প্রতিনিয়ত অনুশোচনায় ভুগছে। নিজের অজান্তেই কত বড়ো আঘাত করেছে সে মৌনোকে। সেখানে তার অনুশোচনা ভার হবে না তো কি হবে? মৌনো অনেকটাই নরম হয়ে গেল। সালমাকে জড়িয়ে ধরল। ধীরে ধীরে দুজনই সহজ হয়ে এলো। সালমা একসময় হেসে বলল,
–“তোমার মামার সাথে শুনেছি তুমি আমার হাতের রান্না খেতে চাইতে। কি খেতে ইচ্ছে করে আমাকে জানাবে। তাহলেই আমি বুঝব তুমি সত্যিকার অর্থে সেই তিক্ত ঘটনাগুলো ভুলে গেছ। ঠিক আছে?”

মৌনোও হাসল, “অবশ্যই জানাব। বিরক্ত হয়ে গেলে কিন্তু আমার কোনো দোষ নেই।”


সেই রাতের পর থেকে রাহাতের সাথে রিমঝিমের সেভাবে কথা হয়নি। তার কেন যেন মনে হচ্ছিল রাহাত তাকে এড়িয়ে চলছে। যে কিনা অত্যন্ত ব্যস্ত সময়েও রিমঝিমকে খুঁজত সেই আজকাল ব্যস্ততার বাহানা দিচ্ছে। বলছে বিয়ের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। রিমঝিম মেনে নিয়েছে, সে পরিণত বয়সের মানুষ। ছোটো মেয়েদের মতো এই ছোটোখাটো বিষয়ে অস্থিরতা খাটে না। তবুও আজকাল তার বুকে ব্যথা করে, নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনা আসে। সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে, বুঝ দেয় রাহাত ভালো মানুষ। রাহাত তাকে একা ছাড়বে না। রাহাতকে সে শুরু থেকেই জানত রিমঝিমের পাস্ট আছে, সেটা জেনে-বুঝেই রিমঝিমকে সে বিয়ের কথা বলেছে— বাড়ি অবধি সম্পর্কের কথা এসেছে। রিমঝিম প্রায়ই বলত রাহাত যেন তার অতীত সম্পর্কে শুনে। কিন্তু রাহাত প্রায়ই তা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলত বিয়ের পর একসময় বসে শুনে নিবে। কিন্তু সে বিষয়ে রিমঝিমের মন সায় দেয়নি। তার বারবার মনে হচ্ছিল সে রাহাতকে ঠকাচ্ছে। চায়নি মিথ্যে দিয়ে তাদের নতুন জীবন শুরু হোক। এজন্য যা হওয়ার হোক, বিয়ের আগেই সে রাহাতকে সবটা জানিয়ে দেয়। সে চেয়েছিল রাহাত তাকে জেনে-শুনেই বিয়ে করুক। বিয়ের পর অন্তত রাহাত এটা বলতে না পারে রিমঝিম তার কাছে কোনো কিছু লুকিয়েছে।

আজ রিমঝিমের গায়ে হলুদ। অথচ সে সন্ধ্যার দিকে হাসপাতাল থেকে বাড়ির দিকে ফিরছে। আজ থেকে তার ছুটি শুরু, সপ্তাহখানেকের জন্য। কিন্তু তাতেও সে খুশি নয়। মনটা বিষণ্ণ তার। কেন যেন রাহাতের সূক্ষ্ম অবহেলা নিতে পারছে না সে। রাস্তা পার হওয়ার আগে আরও একবার রাহাতকে কল দিল সে। কয়েকবার কল দেয়ার পর রাহাত কল রিসিভ করল। রিমঝিম গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল,
–“কী করছ?”

ওপাশ থেকে সরাসরি জবাব এলো না। বেশ খানিকটা সময় পর রাহাত আমতা আমতা করে বলল,
–“রিমঝিম, আমি বিয়েটা ভেঙে দিতে চাচ্ছি। তোমাকে আমার বিয়ে করা সম্ভব না।”

রিমঝিমের মনে হলো তার আশেপাশের পুরো দুনিয়া থমকে গেছে। রাহাত আবার বলল,
–“আমি এই কয়েকদিন অনেক ভেবেছি, অনেক চিন্তা করেছি। কিন্তু কিছুতেই তোমার দিকে আমার মন টানছে না। আমি ভেবেছিলাম হয়তো তুমি সর্বোচ্চ প্রেমই করেছ অতীতে। কিন্তু.. সেদিন শোনার পর..। তুমি আরও ভালো কাউকে ডিজার্ভ করো রিমঝিম। আমি বিয়েটা ভেঙে দিচ্ছি। সরি।”

রিমঝিম কিছুটা সময় চুপ থাকল। বিশ্বাস ভাঙার পর মেয়েটা শক্ত হয়ে দাঁড়ানো। কোনো প্রকার নড়চড় নেই। বাড়ির ছাদে তার হলুদের অনুষ্ঠানের প্যান্ডেল করা হয়েছে। লোকভর্তি মেহমান। পুরো এলাকা জানে তার বিয়ে সম্পর্কে। রিয়াজ সাহেব মেয়ের বিয়ের কোনো প্রকার কমতি রাখেননি। এমনকি জামাইকে স্বর্ণের চেইন দিবেন বলে স্বর্ণকার থেকে সেদিন এক ভরির চেইনও বানিয়ে আনলেন। বাড়ির সবাই কত খুশি রিমঝিমের জন্য। আর সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে শুনছে তার হবু বর তাকে বিয়ে করতে আগ্রহী নয়, রিমঝিম আরও বেটার কাউকে ডিজার্ভ করে?

রিমঝিম সময় নিয়ে বেশ অস্বাভাবিক শীতল গলায় বলল,
–“আমার একটা কথা রাখবে? শেষবারের মতো?”

রাহাত পাষাণের মতো জবাব দিল,
–“বলো।”

–“আমার সাথে কখনো যোগাযোগ করবে না। আমি নিজেই এই মুহূর্তে এই সম্পর্কের ইতি টানছি। ভালো থেকো।”

বলেই রিমঝিম কল কেটে রাস্তা পার হতে নিল। কিন্তু বারবার তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। সে রাস্তার ওপার দেখল। এই তো, আরেকটু হাঁটলেই ওপারে পৌঁছে যাবে। তার দ্রুত বাড়ি ফিরতে হবে। এখন নিশ্চয়ই বাড়িতেও বিয়ে ভাঙার খবর যাবে। বাবা-মা ভেঙে পড়লে তাকেই তো সব সামলাতে হবে। সে বাড়ির বড়ো মেয়ে। আজীবন তাদের আগলে রাখার নিয়্যত করেছে সে। সে মোটেও সে রকম মেয়ে নয় যে পরের ছেলের জন্য তার পরিবারকে বিপদের মুখে ঠেলবে। জীবনে একবার ভুল করেছিল সে, আর নয়। অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত যদি জীবন দিয়ে দিতে হয়, তাও সে দিবে। তাও তার হাসি-খুশি পরিবারকে কোনো প্রকার দুঃখ পেতে দিবে না।

কিন্তু আফসোস, তার রাস্তার ওপার অবধি পৌঁছানো হলো না। বেখেয়ালে লক্ষ্যই করেনি এক গাড়ি তার দিকে ছুটে আসছে। মুহূর্তেই এক প্রাইভেট কারের সাথে ধাক্কা খেয়ে রাস্তার এক পাশে গিয়ে পড়ল রিমঝিম।

®লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে~~

[যারা যারা গল্পটি পড়ছেন তারা সবাই রেসপন্স করবেন যেন অন্যান্য পাঠকদের ফিডেও পর্বটি পৌঁছে যায়। কেমন লেগেছেন জানাবেন কিন্তু, এটা বিরাট এক পর্ব। ঘুম চোখে নিয়ে লিখেছি।]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply