বেলতুলি – [২৯]
লাবিবা ওয়াহিদ
[অন্যত্র কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]
সোফিয়া খানম ঘণ্টাখানেক যাবৎ কামরুলের ওপর চেঁচাচ্ছেন। দুইদিন আগে পরিষ্কার করা ফ্যান কামরুলকে দিয়ে আবারও মোছালেন তিনি। শুধু তাই করেই ক্ষান্ত হলেন না। কামরুলকে দিয়ে নিজস্ব গাছের কিছু আম পাড়িয়ে আনলেন, চায়ে চিনি বেশি হয়েছে বলে বকলেন আবার মাছ ঠিক মতো কাটা হয়নি বলেও বকলেন। কামরুলের খুব সম্ভবত আজকে দিন খারাপ যাচ্ছে। কিন্তু সে এখনো এটাই ধরতে পারছে না, সোফিয়া খানম কী মনে করে এতটা ক্ষেপে গেল? গিয়েছিল তো খুশিমনেই.. থ্রিপিছ কিনতে। এই মুহূর্তে কি এমন হলো যে সব ঝাল কামরুলের ওপর দিয়ে যাচ্ছে। সে মুখ গোমড়া করে বড়ো পাতিল মাজতে মাজতে বলল,
–“জীবনে কি পাপ করছিলাম এই খালার বাড়িত আইসা। খালু আর মহিলা পায় নাই বিয়া করার লেইজ্ঞা?”
পরপর নিজে নিজেই আবার তওবা পড়ে বলল,
–“হায় হায়! হেরে বিয়া না করলে নিবিড় ভাই, নাহিয়ান ভাইয়ে আর শেইনায় আইত কইত্তে? না না আল্লা, আমার এসব মাতলামি হুইন্নো না, আমি খালারে কিচ্ছু কই নাই।”
কামরুল বাড়ির পেছন থেকেই শুনতে পাচ্ছে এবারের বলির পাঠা শেইনা। সে আজ কোচিং করতে যায়নি। এখন কোচিং কেন করেনি এ নিয়ে নিজের রাগ ঝাড়ছেন। সামনে এসএসসি পরীক্ষা আর মেয়ে কোচিং বাদ দেয় কীভাবে?
সোফিয়া খানম ক্ষেপেছেন মূলত দূর থেকে রত্নাকে দেখে। পুরানো ঘা তাজা হয়ে গেছে এতদিন পর মেয়েটাকে দেখে। রাগ করে ছেলের সাথে এক মাস কথা বলেননি তিনি। ওনার বারবার মনে হচ্ছে উনি তার ছেলের কাছে হেরে গেছেন, তার জেদ হেরে গেছে। রাজিয়া শেখ জিতে গেছে। ভাসা ভাসা শুনেছেন রিমঝিমেরও কার সাথে যেন বিয়ে ঠিক.. ছেলেপক্ষ রিমঝিমকে দেখেও গেছে সেদিন হঠাৎ। সবকিছু এত দ্রুত হয়েছে যে মশিউর সাহেবকে বলারও সু্যোগ পাননি। তার ছেলে কেন বিয়েটা ভাঙল? রত্নার কোন দিক থেকে কমতি ছিল? তার শাসনে আসলে এই মেয়ের তার মুখের ওপর কথা বলার সাহস থাকত?
শেইনাকে বকতে বকতে বললেন,
–“পাপ করেছি তোদের জন্ম দিয়ে। তোরা ভাই-বোন একটাও ভালো না। বুড়োটা তো আমার অবাধ্য হলো, লেজ ধরে বাকিগুলাও একই দিকে ছুটছে। মায়ের কষ্ট তোরা কেউ বুঝিস না।”
–“মায়ের কষ্ট বুঝি দেখেই তো ফিরে এলাম, তবে প্লিজ.. এবারও বিয়ে নিয়ে ঘ্যানঘ্যান কোরো না।”
সোফিয়া খানম আঁতকে উঠে পিছে ফিরে তাকালেন। ভুল শোনেননি, তার অবাধ্য বড়ো পুত্র আসলেই তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে। নিবিড় পরনে নীল শার্ট, সাদা জিন্স। লম্বাটে ছেলেটার চোখে-মুখে ক্লান্তি লেপ্টে আছে, যেন লং জার্নির কারণে ঠিকঠাক ঘুমোতে পারেনি। নিবিড়ের পিঠে এক বিরাট ব্যাগ। সোফিয়া হিসাব করলেন, কয়েক মাস পর তার ছেলে ফিরেছে। সোফিয়া খানমের চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে। শেইনা মায়ের বকাঝকা ভুলে উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল,
–“ভাইয়া!”
সোফিয়া খানম ছেলের দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে আবারও অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। পাহাড়সম অভিমান তার, ছেলের সাথে তিনি একদমই কথা বলবেন না। ছেলেকে কাছেও টানবেন না।
–“আসতে কে বলেছে? ফিরে যা!”
কিন্তু নিবিড় মায়ের দিকে এগিয়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল। এবার সোফিয়া খানমের চোখের পানি ছুটল। নিবিড় মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
–“তাহলে কাঁদছ কেন মা?”
সোফিয়া খানম কাঁদতে কাঁদতে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।
–“কই, আমি একদমই কাঁদছি না। ওগুলা তোর মনের ভুল। তোর জন্য কাঁদতে যাব কেন?”
মায়ের অভিমান, পরাণ সব একসাথে থেমেছে। ভদ্রমহিলা ছেলেকেও ছাড়ছেন না, আবার অভিমানকেও ছাড়ছেন না। রাগ-অভিমানের মাঝে নিবিড় তার সন্তানকে ছাড়া শূন্য মাকে নিজ উদ্যোগে খুঁজে নিল।
–“তুমি না স্ট্রং মা আমার, আর কাঁদে না।”
কামরুল দূর থেকে সোফিয়া খানম আর নিবিড়কে দেখল। তার মুখে হাসি। মিনমিন করে বলল,
–“নাহ৷ আমাগো খালাম্মায় অবশ্য এতডাও খারাপ না। খালি মাঝেমধ্যে ওই একটু চেইত্যা যায়, এডি আর কিছু না।”
বাজারের কাছাকাছি মশিউর সাহেবের সাথে দেখা হলো মৌনোর। আজকাল সে ভীষণ ব্যস্ত বোনের বিয়ে নিয়ে। কিছুদিন আগেই রাহাত তার পরিবার নিয়ে রিমঝিমকে দেখে আংটি পরিয়ে গেছে। বিয়ে আগামী শুক্রবার, আজ শনিবার চলছে। বিয়ের কার্ড ছাপাতে দিয়ে দিয়েছে। প্রথম মেয়ের বিয়েতে কোনো প্রকার কমতি রাখছেন না রিয়াজ সাহেব। কেনাকাটা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই টুকটাক হাতে হাতে সাহায্য করছে সে বাবা-মাকে। জুনায়েদের প্রথম সাময়িক পরীক্ষার চলার দরুণ সে সেভাবে সময় পাচ্ছে না। তবুও আনন্দ করতে এক বিন্দু কার্পণ্য নেই। পরীক্ষাও দিচ্ছে, আনন্দও করছে।
মশিউর সাহেব তার পুরানো গাড়ি টয়োটা কোরোলা এক্সআইতে বসা। এই গাড়ি চলে কম থামে বেশি, তবুও তার ভীষণ শখের এই গাড়িটা। গাড়ি থেকেই মৌনোকে ডাকলেন তিনি। রোদ মাথায় নিয়ে মৌনোও তাকে সালাম দিল। মশিউর সাহেব চোখ-মুখ বেশ উজ্জ্বল করে বললেন,
–“আসো, বাড়ি পৌঁছে দেই?”
–“আমি যেতে পারব আঙ্কেল।”
–“না, এসো, লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই মা। নিশ্চয়ই বিয়ে-শাদি দিয়ে ক্লান্ত? গাড়িতে এসো। পৌঁছে দেই বাড়ি।”
এত আদর করে ডাকায় মৌনো তাকে নিষেধ করতে পারল না। সে পেসেঞ্জার সিটে উঠে বসল। মশিউর সাহেব বেশ খুশিমনে গাড়ি স্টার্ট দিলেন। প্রথমে কয়েকবার স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু কাজের কাজ হলো না। তিনিও তো থেমে থাকার পাত্র নন, আরও কয়েকবার চাবি ঘুরিয়ে চেষ্টা করতেই অবশেষে সফল হলেন। এরপর গুণগুণ করতে করতে স্টিয়ারিং এ হাত স্থির করলেন।
–“ছেলে কী করে? রিমঝিম পছন্দ করেছে?”
–“জি, রাহাত ভাই একটা কোম্পানিতে চাকরি করছেন, আগে চট্টগ্রামে চাকরিতে ছিল.. ইদানীং ঢাকায় এলেন। ঢাকায় এসেই প্রস্তাব দিলেন। হ্যাঁ, আপুও বিয়েতে রাজি।”
–“যাক, এবার ইনশাআল্লাহ বিয়েটাও হয়ে যাক। মেয়েটার একটা সুন্দর ফুটফুটে সংসার হোক।”
মৌনো মাথা নাড়ায়। সেও চায় রিমঝিমের একটা মিষ্টি সংসার হোক। সে মশিউর সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,
–“আপনি হঠাৎ এই দুপুরবেলা গাড়ি নিয়ে বের হলেন যে?”
–“রিপেয়ারে দিয়েছিলাম। এই গাড়ি আমার কাছে থাকে কম ম্যাকানিক্যালদের কাছে থাকে বেশি। ঘণ্টাখানেক আগে কল করে জানাল গাড়ি ঠিক আছে, আমি তাই চলে এলাম নিয়ে যেতে। ভালোই হলো, তোমাকে লিফট দিতে পারছি।”
মৌনো হাসল। ভদ্রলোককে দেখলে কে বলবে একসময়ের সবচেয়ে কঠোর পুলিশ অফিসার ছিলেন তিনি? যেই চাকরি থেকে ছুটি নিলেন, ওমনি মানুষটা হাসি-খুশি ব্যক্তিতে চলে এলেন। অবশ্য, এত লম্বা সময়ের চেহারার গাম্ভীর্য ভাব তো আর কাটবে না। এখনো তাকে দেখলে তেমনই গম্ভীর এবং কঠোর দেখায়, তবে মানুষ্টা স্বচ্ছ। কী সুন্দর করে হাসেন, কথা বলেন। তার কেন যেন হঠাৎ নিবিড়ের কথা মনে পড়ে গেল। আচ্ছা, নিবিড় হাসলে কেমন লাগবে তাকে? নিবিড় কী কখনো হেসেছিল? নাকি সেই হাসির চিত্র তার স্মৃতি থেকে মুছে গেছে?
এমন সময়েই মশিউর সাহেবের মোবাইলটা বেজে উঠল। তিনি রাস্তায় সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে মৌনোর উদ্দেশে বললেন,
–“একটু মোবাইলটা দেখো তো মা। গাড়ি চালানোর সময়ে আমি অন্যদিকে তাকাতে পারি না।”
মৌনো তাই করল। মোবাইল ধরে দেখল কামরুল কল করেছে।
–“এটা কামরুল।”
–“রিসিভ করো।”
মৌনো কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসল কামরুলের গলা।
–“খালু, খালু। যেহানেই থাহেন না ক্যান তাত্তাড়ি বাড়িত আইয়েন। নিবিড় ভাইয়ে আইয়া আমাগো সাপ্পাইজ দিছে।”
মৌনো বিস্মিত। মশিউর সাহেব কিছুটা চমকে গেলেও খুব সুন্দর একটা হাসি দিয়ে বললেন,
–“দ্রুত বাপ-বেটার জন্য দুই কাল চা কর। খবরদার নিবিড়ের চায়ে চিনি দিবি না। ছেলে পরে চা খাবে না। বুঝাতে পেরেছি?”
–“এই দুপুরবেইল্লায় চা?”
–“হ্যাঁ। এখনই কর, ভাত পরে খাব।”
মৌনো নিজের অজান্তেই জেনে ফেলল, নিবিড়ের চায়ের পছন্দ সম্পর্কে। রিয়াজ সাহেবের এক নিয়মিত রোগী সিলেট গিয়েছিলেন। সম্পর্ক ভালো বলে রিয়াজ সাহেবের জন্যেও এক কেজি এনেছেন। চায়ের ঘ্রাণটা অনেক জীবন্ত এবং আকর্ষণীয়। ঘ্রাণেই যেন পেট ভরে যায়। তার খুব ইচ্ছে হলো সেই চাপাতি দিয়ে নিবিড়কে চা করে দিতে। কিন্তু সেই সাহস তার নেই।
–“আঙ্কেল, আমাদের বাড়িতে সিলেটি চা এসেছে। খেয়ে যাবেন।”
মশিউর সাহেব হেসে বললেন,
–“কী ব্যাপার, সবাই যে একের পর এক সুসংবাদ দিচ্ছ। নিশ্চয়ই আসব।”
দুইদিন কেটে গেল। নিবিড় এসেছে অথচ মৌনো তাকে চোখের দেখাও দেখেনি। অথচ এই দুটো মাস সে কতটা উদগ্রীব ছিল এই ভেবে, কবে আবার নিবিড়ের সাথে তার দেখা হবে। কবে কথা বলবে। নিবিড় ধমক দিলেও মানুষটার কণ্ঠ তো শুনতে পেত সে। কিন্তু না, সে এই দু’দিনে ঘর থেকেও বেরোয়নি। লুকোচুরি করে মানুষটাকে দেখাও হয়নি বিভিন্ন ব্যস্ততায়। সে এই ভেবেই শান্তি পাচ্ছে, কয়েক বিল্ডিং পরেই নিবিড় আছে। সে এখন কাছেই আছে, দূরে নেই।
সন্ধ্যার দিকে মৌনো তালিকা করছিল বিয়েশাদির। রিমঝিম হাসপাতালে, এখনো ফেরেনি। এমন সময়ই দেখল জুনায়েদ তাড়াহুড়ো করে কোথাও যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মৌনো ভ্রু কুঁচকে বলল,
–“কোথায় যাচ্ছিস?”
–“বাজারে আপা। আজকে বাংলাদেশ আর ইন্ডিয়ার খেলা। আমরা আশেপাশের সবাই যাচ্ছি খেলা দেখতে।”
–“ঘরে বসে দেখা যায় না?”
–“ধুর, কি যে বলো না আপা। এসব খেলা একা দেখে মজা আছে? আমরা সব ছেলেরাই যাচ্ছি। নিবিড় ভাইও যাচ্ছে। আমি যাই আপা, ভাইয়া অপেক্ষা করছে।”
বলেই জুনায়েদ তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল। মৌনো কী যেন ভেবে তালিকা ফেলেই সে ছুটে গেল তার বারান্দায়। খুঁজল নিবিড়কে। ওইতো, নিবিড় আসছে। মুহূর্তেই মানুষটাকে দেখে তার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল, গলা শুকিয়ে কাঠ কাঠ। নিবিড় বাড়ির কাছাকাছি আসতেই কী ভেবে উপরে তাকাল। সন্ধ্যার ল্যাম্পপোস্টর আলোয় স্পষ্ট দুজনকেই দেখা যাচ্ছে। মুহূর্তেই দুজনের চোখে চোখ পড়ল। কিন্তু সেই মুহূর্ত দীর্ঘক্ষণ হলো না। জুনায়েদ নিবিড়ের কাছে যেতেই হুট করে কারেন্ট চলে গেল। আলোতে ভরপুর সন্ধ্যার বেলতুলি আচমকাই অন্ধকারে ছেঁয়ে গেল। রাস্তা-ঘাটে ছেলেপেলের আহাজারি শোনা যাচ্ছে, তাও এক দুটো গলা নয়। অনেক গলা দূর দূর থেকেও ভেসে আসছে।
কেউ একজন বলে উঠল,
–“ধ্যাত! শালারা আর সময় পাইল না? খেলা তো শুরু হয়ে গেছে। এমন সময়ে কোন শালায় কারেন্ট নেয়?”
আর মৌনোর আফসোস হলো, সে কেন আরেকটু নিবিড়কে দেখতে পেল না। অন্তত এক মিনিট? বেশি হয়ে যেত কী?
®লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে~~
[যারা গল্পটা পড়ছেন তারা রেসপন্স করবেন যেন অন্যান্য পাঠকদের ফিডেও পর্বটা পৌঁছায়। সত্যি বলি, আমি কেন যেন এই পর্বটা লিখে শান্তি শান্তি অনুভব করছি। ২০১০ সালের নস্টালজিক ভাইব। ছোটো পর্ব হোক, তবুও আমার কেমন নেশা ধরে আছে। আপনাদের কেমন লেগেছে জানান তোওও।]
Share On:
TAGS: বেলতুলি, লাবিবা ওয়াহিদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বেলতুলি পর্ব ৪
-
বেলতুলি পর্ব ২৫
-
বেলতুলি পর্ব ২৬
-
বেলতুলি পর্ব ২৪
-
বেলতুলি পর্ব ১০
-
বেলতুলি পর্ব ২৩
-
বেলতুলি পর্ব ২৭
-
বেলতুলি পর্ব ১
-
বেলতুলি পর্ব ২২
-
বেলতুলি পর্ব ১৩