Golpo romantic golpo অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪৬


লেখিকাসুমিচৌধুরী

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪৬

শুভ্র তখন পাগলের মতো ঘরভর্তি মানুষের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করছে। তার দুই চোখে রক্তবর্ণ হাহাকার, কণ্ঠে এক তীব্র অবিশ্বাস। সে চি-ৎ-কা-র করে বলতে লাগল।

“রিদির বিয়ে কীভাবে হয়? ও আমার স্ত্রী! একজনের স্ত্রী থাকা অবস্থায় ওর আবার বিয়ে কীভাবে সম্ভব? দয়া করে সবাই এই তামাশা বন্ধ করো। শুধু বলো রিদি কোথায় আছে! ‘জাস্ট টেল মি হোয়্যার ইজ শি’!”

সোহান চৌধুরী পাথরের মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ছেলের এই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য অবস্থা দেখে তিনি খুব শান্ত কিন্তু বিষাক্ত গলায় বললেন।

“কে বলেছে রিদি এখন তোর স্ত্রী?”

শুভ্র যেন আকাশ থেকে পড়ল। তার পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল।

“ম…মানে? মানে কী বলতে চাইছেন আপনি?”

সোহান চৌধুরী ঠোঁটের কোণে এক চিলতে নিষ্ঠুর হাসি ফুটিয়ে বললেন।

“মানে এটাই, রিদি তোর স্ত্রী ছিল। কিন্তু এখন ও অন্য জ।”

পুরো বাক্যটা শেষ করার আগেই শুভ্র আতঙ্কে আর যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। সে নিজের কানে হাত চাপা দিয়ে উন্মাদের মতো মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল।

“আব্বু! প্লিজ! আমার কসম লাগে আপনারা, এসব মিথ্যে কথা বন্ধ করেন ‘জাস্ট স্টপ ইট’!”

সোহান চৌধুরী আর কথা বাড়ালেন না। তার চোখের ইশারা বুঝত রাবেয়া এহসানের এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। তিনি দ্রুত নিজের রুমে চলে গেলেন এবং কিছুক্ষণ পরেই হাতে একটি সাদা খাম আর কিছু কাগজ নিয়ে বেরিয়ে এলেন। কাগজগুলো তিনি সোহান চৌধুরীর হাতে তুলে দিলেন।সোহান চৌধুরী সেই কাগজগুলো শুভ্রের মুখের সামনে মেলে ধরলেন। শুভ্রর চোখের সামনে তখন পৃথিবীটা দুলছে। সোহান চৌধুরী খুব নিস্পৃহ গলায় বললেন।

“বিয়ে যেমন করা যায়, তেমন ডিভোর্সও দেওয়া যায়। নে, এটা ধর। আর সবকিছু পড়ে ভালো ছেলের মতো এখানে একটা সই করে দে।”

শুভ্রর হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে। সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে কাগজটা হাতে নিয়ে মেলে ধরল। কাগজের প্রতিটি অক্ষর যেন একেকটা বিষাক্ত তীরের মতো তার চোখের মণি বিদ্ধ করছে। বিচ্ছেদের লম্বা কাহিনীর শেষে একটা বিশেষ লাইন শুভ্রর বুকের ঠিক মাঝখানে ধারালো ছুরির মতো বিধল যেখানে লেখা আছে, “আমি তাসনিন রিদি, এই সম্পর্ক থেকে স্বেচ্ছায় বের হয়ে আসছি। আমি আমার স্বামী সাইফান শুভ্র চৌধুরীকে ডিভোর্স দিলাম।”কাগজের নিচে রিদির সেই চিরচেনা সইটা আজ যেন বিদ্রূপ করে জ্বলজ্বল করছে। শুভ্রর পায়ের তলা থেকে পৃথিবীটা সরে গেল। সে মুহূর্তেই ধপ করে মেঝের ওপর বসে পড়ল। তার মাথাটা কাজ করছে না। অস্ফুট স্বরে সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল।

“না না… মিথ্যা! সব মিথ্যা! রিদি আমাকে ভালোবাসে, ও আমাকে ডিভোর্স দিতে পারে না। এই সইটা ওর হতে পারে না। এই কাগজ মিথ্যা।”

পরক্ষণেই শুভ্রর ভেতরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মতো জ্বলে উঠল। উন্মাদের মতো হাতের ডিভোর্স পেপারটা খামচে ধরে কুচিকুচি করে ছিঁড়ে বাতাসে উড়িয়ে দিল। তার শরীর কাঁপছে প্রচণ্ড ক্রোধ আর অপমানে। দেয়ালে টানানো ছবিগুলো সে এক ঝটকায় টেনে খুলে মেঝেতে আছাড় মারল। কাঁচ ভাঙার সেই ঝনঝন শব্দকে ছাপিয়ে শুভ্রর গলার গর্জন পুরো বাড়ি থরথর করে কাঁপিয়ে তুলল। সে পৈশাচিক স্বরে চি-ৎ-কা-র করে বলতে লাগল।

“এই পৃথিবীতে রিদি যদি আমার না হয়, তবে অন্য কোনো পুরুষের হওয়ার সাধ্য ওর নেই! যদি সত্যি ও অন্য কারো হয়ে যায়, তবে আমি নিজের হাতে ওর জান কবজ করবো! তারপর ওর লাশের ওপর শুয়ে নিজেকেও শেষ করে দিবো!”

শুভ্র এক ঘায়াল বাঘের মতো ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করতে করতে আরও উগ্র হয়ে উঠল। তার কণ্ঠস্বরে তখন এক মহাধ্বংসের সুর।

“যাকে এত বছর ধরে নিজের আত্মার চেয়েও বেশি ভালোবেসেছি, যাকে প্রতিটা নিশ্বাসের ঘ্রাণে অনুভব করেছি তাকে আমি এই পৃথিবীর অন্য কোনো পুরুষের ছায়া তো দূরের কথা, কোনো পার্থিব আলোও স্পর্শ করতে দেবো না! আমার ভালোবাসা যদি পূর্ণতা না পায়, তবে সেই ভালোবাসার সমাপ্তি হবে এক মহাপ্রলয়ে! যেখানে আমার অধিকার নেই, সেখানে এই পৃথিবীর কারো অধিকার আমি জন্মাতে দেবো না। কক্ষনো না।”

সোহান চৌধুরী বিদ্রূপাত্মক এক হাসি হাসলেন। তার ছেলের এই উন্মাদনা যেন তাকে আনন্দ দিচ্ছে। তিনি তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন।

“রিদিকে খুন করবি তুই? ঠিক আছে, কর। দেখি তোর কত বড় কলিজা!”

শুভ্র এক মুহূর্ত থামল না। তার চোয়াল শক্ত হয়ে ফুলে উঠেছে, চোখ দিয়ে যেন আগুনের হল্কা বের হচ্ছে। সে তার বাবার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাড়কাঁপানো শীতল কণ্ঠে বলল।

“অন্য কারো হয়ে গেলে ওর মৃত্যু নিশ্চিত। পৃথিবীর কোন পাতালপুরীতে ও লুকিয়ে আছে, সেখান থেকে আমি ওকে টেনে বের করবো এবং নিজের হাতে খুন করবো। আপনি শুধু রেডি রাখুন দুইটা কবর একটা আপনার ছেলের, আর অন্যটা আপনার বউমার।”

কথাটা শেষ করেই শুভ্র এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে ঝড়ের গতিতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। সাহেরা চৌধুরী বুক ফাটা আর্তনাদ করে পেছন থেকে ডাকতে নিলেন, “শুভ্র! ওরে খোকা, যাস না!” কিন্তু সোহান চৌধুরী শক্ত হাতে তাকে থামিয়ে দিলেন। তিনি বিরক্ত মুখে বললেন।

“আহ! বিরক্ত করো না তো ওকে। যেতে দাও। থাকতে দাও ওকে ওর মতো। আমিও দেখি ওই রিদিকে ও কোত্থেকে খুঁজে বের করে।”

বাড়ি থেকে বেরিয়েই শুভ্র তার সেই পুরনো ‘মাফিয়া’ রূপ ধারণ করল। তার নির্দেশে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রতিটি কোণ নড়ে উঠল। তার অধীনে থাকা সব গ্যাং মেম্বারদের সে এক কঠোর আল্টিমেটাম দিল রিদিকে চাই, যেভাবেই হোক! এই শহরের প্রতিটি অলিগলি, প্রতিটি অভিজাত ফ্ল্যাট আর সাধারণ বসতি যেন তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়। বিশেষ করে যেখানেই নতুন কোনো স্বামী-স্ত্রী বসবাস শুরু করেছে, সেই জায়গাগুলো যেন নরক বানিয়ে খোঁজা হয়।

শুভ্র নিজেও অস্থির হয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। তার হাতের কবজি ফুলে উঠছে স্টিয়ারিং হুইলটা জোরে চেপে ধরার কারণে। রাস্তার ট্রাফিক বা সিগন্যাল কিছুই তার চোখে পড়ছে না। সে পাগলের মতো গাড়ি চালাতে চালাতে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলতে লাগল।

“রিদি শুধু আমার! ‘শি বিলংস টু মি অ্যান্ড অনলি মি’। ও যদি অন্য কারো হয়ে থাকে, তবে ওকে আমি খুন করে ফেলব।এবং তারপর নিজেও মরে যাবো। আমার অধিকার কেড়ে নেওয়ার সাহস এই পৃথিবীতে আমি কারো হতে দেবো না।”

রানিং…!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply