প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৫৮
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
“সবাইকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে তো ঠিক মতো?”
বাবার প্রশ্নে আয়মান কপাল কুঁচকে আদালের দিকে তাকাল। আদাল এই নিয়ে প্রায় শ’খানিক বার বলেছে সবাইকেই দাওয়াত দেয়া হয়েছে। এমনকি অফিসের লোকেদেরও দাওয়াত করা হয়েছে। মাশফিক চৌধুরী ছেলেদের কথা শুনে শান্ত হলেন। লেগে পড়লেন নিজের কাজে। আয়মান কপালের ঘাম মুছে বলল,
“বাড়ির সবার মাথায় সমস্যা হলো নাকি ভাইয়া? কাউকে স্বাভাবিক আচরণ করতে দেখছি না। বড় ভাইয়ার খবর শুনেছ?”
আদাল কিছুটা কণ্ঠস্বর নিচু করল,
“এসব এখানে বলবি না। মানুষ জানা-জানি হলে সমস্যা হবে।”
আয়মান বলল,
“কিন্তু আমি তো মানুষের কাছ থেকেই শুনেছি। পুরো বাড়ির মানুষ জানে গত রাতের ঘটনা। ভাবিকে নিয়ে কয়েকজন খুব বাজে কথা বলছিল।”
আদাল কপালে ভাঁজ ফেলল।
“ভাবিকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছে? কী বলেছে?”
“মহিলারা কী টাইপ কথা বলতে পারে তোমার ধারণা নেই? খারাপ কিছুই বলছিল।”
আদাল বিরক্ত হলো। বিরক্ত হলো বড় ভাইয়ের বউকে নিয়ে মানুষের এত মাতামাতি দেখে। কায়নাতকে তারা খুব সম্মান করে। বড় ভাইয়ের বউ সে। তার ব্যপারে এমন ধরনের কথা সহ্য করা যায় না।
সময় ঘনিয়ে এলো। শেহেরের বাড়ি থেকে মানুষ এলো। অনেক আত্মীয়। নতুন বউকে হলুদ লাগাতে লাইন লেগে গেছে। রাতে আজ অনুষ্ঠান হবে না। যা হওয়ার এখনই হবে। সব খুব ভালো ভাবেই চলছে। নুসরাতের হলুদ শেষে তাকে গোসল করিয়ে পাঠানো হয়ছে ঘরে। সে আর নামবে না আগামীকাল লাল বউ না সেজে। দুপুর বেলা ছেলের বাড়ির মানুষ খেয়ে গেলেন। সন্ধ্যার সময় আড্ডা বসেছে সবার। অথচ বাড়ির মেয়েরা বসে আছে ড্রয়িংরুমে। হাসান আর দাদাজান নিধির পাশে বসে। তাদের সামনে সোহান। সে গত সপ্তায় আসলেও সাহস করে নিধির সাথে দেখা করেনি। আজ যখন জানতে পারল নুসরাতের বিয়ে, সেই সুযোগ বুঝে চলে এসেছে দেখা করতে। হাতে মাঝারি সাইজের একটা শপিং ব্যাগ। দাদাজান এবং হাসান বেশ কিছুক্ষণ ধরে কথা বলছেন ওর সাথে। সোহান এক পর্যায় নিজের হাতের শপিং ব্যাগ নিধির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আম্মা আপনার জন্য কিছু পাঠিয়েছে। গ্রহণ করলে বেশ খুশি হবেন।”
নিধি ঠোঁট চেপে ভীতু চোখে একবার সবার দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে ব্যাগ টা নিল। সোহান মুচকি হাসল। হাসান বলল,
“তোমার ছোট ভাই আসেনি?”
“এসেছে। ও ওর এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেছে তাই আসতে পারেনি।”
“কাল কিন্তু ভাইকে নিয়ে অবশ্যই আসবে। তোমরা এলে ভীষণ খুশি হব আমরা।”
সোহান উত্তর দিল না। বিনিময়ে মুচকি হাসল। তাকাল একবার মাথা নিচু করে বসে থাকা মেয়েটার দিকে।
দুপুর বেলা সকলেই খাবার শেষে বিশ্রাম নিচ্ছেন। কায়নাত সাঈমার সাথে রান্না ঘরের কাজ শেষ করে মাত্র গরম পানি বসিয়েছে চুলায়। অর্ণ নাকি কফি খাবে। ছোট ভাইকে দিয়ে হকুম পাঠিয়েছে। অনেকটা সময় হয়ে গেছে অর্ণ কফি চেয়েছে। কায়নাত উল্টো ঘুরে কাজে ব্যস্ত ছিল। কখন যে রান্না ঘরের সামনে একজন এসে দাঁড়িয়েছে তার খেয়াল নেই। অর্ণ বুকে হাত গুঁজে দেয়ালের সাথে লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছে। গায়ের সাদা পাঞ্জাবি টা ঘামে প্রায় অর্ধ ভেজা। কায়নাত কফি বানিয়ে পিছু ঘুরতেই চমকে উঠল। পিছিয়ে এলো দুপা। অর্ণকে এই সময় এখানে আশা করেনি সে।
অর্ণ ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“বাপের সাথে প্ল্যান করছেন আমাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য?”
কায়নাত ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী যা-তা বলছেন?”
“তোমার বাপ দেখলাম আমার শাশুড়ির সাথে ফোন আলাপে ব্যস্ত। খুব গম্ভীর গলায় বলছেন, “কায়নাত কে আমি তোমার কাছে পাঠিয়ে দিব মিলি।”
“ভালো কথাই তো বলেছেন।”
“হু? ভালো কথা? সো মিসেস অর্ণ, আপনি ঠিক চাইছেন কী খুলে বলুন তো আমায়।”
কায়নাত উল্টো ঘুরে চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করল। নিজেকে স্বাভাবিক করে কফির কাপ টা নিয়ে এসে এগিয়ে দিল ওর দিকে।
“আমার কাজ আছে। নিন এটা।”
অর্ণ ভ্রু কুঁচকে একবার চায়ের দিকে তাকিয়ে আবার কায়নাতের দিকে তাকাল। আচমকা রান্না ঘরের কাঠের দরজা টা ভেতর থেকে বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াল কায়নাতের দিকে। কায়নাত চোখ বড় বড় করে কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
“কী হচ্ছে? আপনি দরজা বন্ধ করলেন কেন?”
অর্ণ কায়নাতের হাত থেকে কফির কাপ নামিয়ে ওকে উঁচু করে ধরে বসাল কিচেন কাউন্টারে। দুজনের দূরুত্ব খুব একটা নেই। অর্ণ চেপে ধরল ওর সরু কোমর। খানিক ঝুঁকে মেয়েটার অস্থির চোখ খানা দেখে গলা নামিয়ে বলল,
“সেদিন আমার মাথা ঠিক ছিল না। ধ্রুব ছেলেটা তোমার নাম্বার পেল কোথায়? এত এত টেক্সট, কল দিয়ে রেখেছে। সেদিন তোমার কোচিং-এর সামনেও আদাল দেখেছিল ওকে। অফিসের এত চাপ তার মধ্যে তোমাকে নিয়ে এসব দেখে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি।”
অর্ণ চুমু খেল ঘাড়ে। কায়নাত মুখ ফিরিয়ে নিল অন্যদিকে। অর্ণ বেসামাল হচ্ছে। ওকে থামাতে বুকে খানিক ধাক্কা মেরে বলল,
“আপনি কী চাইছেন সেটা ক্লিয়ার করে বলুন। আমার সাথে সংসার করতে এত অনিহা আপনার? তাই কী অন্য নারী খুঁজেছেন নিজের জন্য?”
অর্ণ অবাক হয়ে তাকাল। পর-মুহূর্তে কপালে গাঢ় ভাঁজ ফেলে বলল,
“আর ইউ স্টুপিড? অন্য নারী এলো কোত্থেকে? কী বলছ এসব?”
কায়নাত চুপ রইল। উত্তর দিতে ইচ্ছে করল না। উত্তর দেবে কী? এই কথা তো শুধু মুখের কথা। অর্ণ ভ্রু কুঁচকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল ওর দিকে। উত্তর দিতে না দেখে পাশ থেকে ছু’রি টা নিয়ে ওর গলার সামনে ধরল। হতবুদ্ধির ন্যায় কায়নাত দেয়ালের সাথে লেপ্টে গেল। আতঙ্কিত গলায় বলল,
“আপনি কী পাগল হয়েছেন? সরান এটা!”
অর্ণ দৃষ্টি জোড়া ছোট রেখেই বলল,
“কী হয়েছে তোমার বলো, নাহলে তোমায় মেরে তারপর আমি মরব।”
“সত্যিই জানেন না কী হয়েছে?”
“জানি না। তুমি বলো আমার দোষ কোথায়? কেন এমন করছো?”
কায়নাত হাত বাড়িয়ে অর্ণর প্যান্ট এর পকেটে হাত দিতে গেলে অর্ণ চোখ পাকিয়ে বলে,
“আমি এখন রোমান্স করার মুডে নেই।”
কায়নাত দাঁত চাপল। ওর পকেট থেকে ফোন বের করে একটা কললিস্ট বের করে অর্ণর চোখের সামনে ধরে বলল,
“নিজের দোষ টা কখনো নিজের চোখে পড়ে না তাই না? আপনি কিছু না জেনে, না বুঝে আমার উপর রাগ ঝেড়েছেন। আমাকে কী একটা বার জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজনবোধ হয়নি আসলে হয়েছে টা কী?”
“ওই ছেলে তোমার নাম্বার পাবে কোত্থেকে? কেনোই বা সে আমার বউকে এত টেক্সট করবে? তুমি ওর মেসেজ গুলো দেখেছ কী লিখেছিল?”
“আমি কী করে জানব উনি কোত্থেকে আমার নাম্বার নিয়েছে? আর আমি মেসেজ-ই দেখব কখন? আপনি কী জানেন না আদি আমার ফোন নিয়ে সারাদিন বসে থাকে?”
এই পর্যায় অর্ণ লম্বা শ্বাস টেনে ছু’রি টা নামিয়ে রাখল। অশান্তি যেন পিছু ছাড়ছে না তার। কায়নাত ওকে চোরা চোখে একবার দেখল।
“আমি জানি ওই মেয়ের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই। শুধু মাত্র ব্যবসার খাতিরে সম্পর্ক গড়েছে। প্রথমে ভুল বুঝলেও দেরি হলেও নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আপনি সেদিন অমন বাজে ব্যবহার করেও একটা বার আমার কাছে এসেছে নিজের ভুল স্বীকার করতে? একটাবার বলেছেন আপনার ভুল হয়েছে?”
কায়নাত সেখান থেকে নিচে নামল। রান্না ঘরের দরজা খুলে বাইরে পা বাড়িয়ে বলল,
“কার জন্য কী করি নিজেই বুঝতে পারি না। যার সাথে সংসার করছি সেই মানুষটাই যখন বুঝতে না পারে, তখন…”
বেরিয়ে গেল কায়নাত। এই কদিনে বেশ বিরক্তি বোধ করেছে সংসারের প্রতি। এত আনন্দের মাঝেও শান্তি নেই নিজের মনে। কেন নেই? কীসের কমতি তার? অর্ণর প্রতি তার রাগ হয়েছিল ওর ব্যবহার আর কাজ নিয়ে। লোকটা কেন যেন মাঝে মধ্যে একটু বেশি করে ফেলে। সেদিন রাতে যখন ঝামেলা হলো তখন আব্দুর চৌধুরী অর্ণকে অনেক কথা শুনিয়েছিলেন। মুখে যা এসেছে তাই বলে গেছেন। কায়নাত চাইলেও আব্দুর চৌধুরীর বাড়াবাড়ি নিয়ে কিছু বলতে পারে না। জন্মদাতা না হোক, বাবা তো! বাবারা তো কখনও সন্তানের খারাপ চায় না। কিন্তু কায়নাত ইতোমধ্যে বুঝতে পেরেছে আব্দুর চৌধুরীর মনে যখন যা চায় সেটা তিনি তৎক্ষণাৎ করতে না পারলে শান্তি পান না। এইযে কায়নাতের সাথে ঝগড়া হলো অর্ণর, তিনি পারলে একখনি অর্ণর থেকে ওকে আলাদা করেন। তা কী আর হয়? সম্ভব এসব? যদিও কাহিনি টা ভিন্ন। কায়নাত ঠোঁট টিপে হাসল বোধহয় একটু।
•••
আবাসিক এলাকা থাকায় তেমন কোনো কোলাহল নেই এদিকটায়। এক বিশাল বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে আছেন মাসফিক চৌধুরী। পাশে আছে আদাল। আজ গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান রেখে তারা বাপ-ছেলে কোথায় এসেছে? কোন উদ্দেশ্যেই বা এসেছে? তাদের সামনে দেওয়ান সাহেব বসে আছেন গরুগম্ভীর হয়ে। বয়সে হয়তো মাশফিক চৌধুরীর চেয়ে খানিক বড়ই হবেন। তিনি অবাক হচ্ছেন মাশফিক চৌধুরীকে এই সময়ে এই বাড়ি দেখে। তিনি সিলেটের বাসিন্দা হলেও ঢাকায় আসেন মাস দুয়েক পর-পর।
বিয়ের দাওয়াত দেয়া হয়েছিল তাদের। তাহলে ঘটা করে এভাবে বাড়ি আসার কারণ তিনি বুঝতে পারছেন না।
মাশফিক চৌধুরী জিজ্ঞেস করলেন,
“ঈশা কোথায়?”
দেওয়ান সাহেব বললেন,
“বাড়িতে নেই। গেছে হয়তো কোথাও।”
“আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার খুব ইচ্ছে হলো।”
“হঠাৎ?”
মাশফিক চৌধুরী হাসলেন। আদাল হাতে রাখা কালো রঙের ফাইল টা এগিয়ে দিল সামনে। দেওয়ান সাহেব ভ্রু কুঁচকে ফেললেন। মাশফিক চৌধুরী মুচকি হাসলেন।
“খুলে দেখুন।”
দেওয়ান সাহেব ভ্রু জোড়া কুঁচকে রেখেই ফাইল টা হাতে তুলে নিলেন। কয়েক পাতা উল্টে দেখতেই চোখের রং পরিবর্তন হলো। চোয়াল শক্ত হলো আগের তুলনায় বেশি। তিনি ফাইল টি-টেবিলের উপর ছুড়ে মেরে বললেন,
“আপনি আমার সাথে মস্করা করছেন মি. চৌধুরী?”
“উহুম! আপনি কী আমার বিয়াই লাগেন যে আপনার সাথে রসিকতা করব?”
“এটা রসিকতা ছাড়া আর কী-ই হতে পারে? আপনার আইডিয়া আছে এর পরিমাণ কী হবে?”
মাশফিক চৌধুরী পায়ের উপর পা তুললেন। বুকে দুই হাত ভাঁজ করে শীতল কণ্ঠে বললেন,
“আপনার আইডিয়া আছে আমি এই প্রজেক্ট নিয়ে ঠিক কয় বছর কাজ করেছি? ডিল ক্যান্সেল হলে অবশ্যই আমার থেকে আপনার বেশি ক্ষতি হবে না?”
“আপনি কী নেশা করে এসেছেন? ব্যবসা কী ছেলে-খেলা মনে হচ্ছে?”
এমন সময় ঈশার আগমন ঘটল বাড়িতে। সে মাশফিক চৌধুরীকে দেখে ভ্রু ভাঁজ করে এগিয়ে এলো। আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করল না। মাশফিক চৌধুরীও প্রয়োজন বোধ করলেন না। অলরেডি তিনি এই ডিল নিয়ে কম হয়রানি পোহায়নি। রীতিমত বড় ছেলেকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছেন। এখন আফসোস হচ্ছে। এই একটা কাজের জন্য সংসার নষ্ট হোক এটা তিনি চান না। কোনো ভঙ্গিতা না করে তিনি ঈশার দিকে তাকালেন। বললেন,
“তোমাদের সাথে কাজ করার খুব ইচ্ছে ছিল আমার। এই কাজের জন্য কম সময় নষ্ট করিনি আমি। নিজের চরিত্র ঠিক রাখার চেষ্টা করো ঈশা। নিজের ইজ্জত এভাবে নষ্ট করলে বাইরের মানুষ উপড়ে ফেলতে দুবার ভাববে না।”
ঈশা চোয়াল শক্ত করে বলল,
“আপনি কী বলতে চাইছেন?”
মাশফিক চৌধুরী উত্তর দিলেন না। দেওয়ান সাহেবকে বললেন,
“ক্ষমা করবেন মি. দেওয়ান। এই সময়ে এসে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে আমি বাধ্য হচ্ছি। যদি ব্যবসা ঠিক রাখতে চান তাহলে অনুরোধ করব আগে নিজের মেয়েকে শুধরান। নাহলে এই লাইন আপনার জন্য নয়।”
তিনি বাক্য শেষ করে উঠে যাচ্ছিলেন। দেওয়ান সাহেব আটকালেন তাকে। এত সহজে কী আর ডিল ক্যান্সেল করা যায়? ইতোমধ্যে তার বুকে ব্যথা শুরু হয়েছে এই সংবাদ শুনে। তিনি চোখ গরম করে একবার মেয়ের দিকে তাকালেন।
“আপনি ঠিক কী কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমাকে খুলে বলুন। ঈশার কোথাও ভুল হয়েছে?”
ঈশা কিছুটা অহংকারী গলায় বলল,
“এমন ছোট-খাটো ডিল ক্যান্সেল হলে কিছু হবে না বাবা। যেতে দাও তাদের।”
দেওয়ান সাহেব ধমকে উঠলেন।
“মুখ বন্ধ রাখো তোমার। তোমাকে দায়িত্ব দিয়েছি তার মানে এই নয় যা মন চাইবে তাই করবে। কী করেছো তুমি তাদের সাথে?”
“আশ্চর্য! কী করব আমি?”
মাশফিক চৌধুরী ঠোঁট চেপে হাসলেন ঈশার অভিনয় দেখে।
“বেশি কিছু করনি, আমার মেনেজারকে ঘুষ খাইয়ে কোম্পানির ইনফরমেশন লিক করেছে, আমার কয়েকজন ক্লায়েন্টের কাছে এমন কিছু দেখিয়ে বিশ্বাস করিয়েছ যাতে তারা বাধ্য হয়ে আমার কোম্পানির নামে মাম’লা করতে গেছে। সর্বশেষে কী করেছ জানেন? আমার ছেলের সংসার নষ্ট করতে উঠে-পড়ে লেগেছ। বিবাহিত এক পুরুষের পেছনে লেগেছ। সব কিছুই কি নিজের স্বার্থের জন্য? এসব করে তোমার লাভ টা কী ঈশা?”
হতভম্ব হয়ে গেলেন দেওয়ান সাহেব। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না মেয়ের কাণ্ড-কীর্তির কথা। ঈশার মুখ চুপসে গেছে। হয়তো নিজেই হতবুদ্ধি হয়ে গেছে মাশফিক চৌধুরীর মুখে নিজের করা নোংরা কাজের কথা শুনে। ওর অবস্থা দেখে মাশফিক চৌধুরী ফের হাসলেন।
দেওয়ান সাহেবের লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করল। এত দিনের সন্মান মেয়েটা মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে পুরো। তিনি ক্রোধ সামলে ধরে রাখতে পারলেন না। হুঙ্কার ছেড়ে বললেন,
“উনি যা বলছেন সব সত্য? তুমি এসব করেছ?”
ঈশা উত্তর দিতে পারল না। তিনি নিজের উত্তর পেয়ে গেছেন। লজ্জায় মাথা ঝুঁকিয়ে হাত ঠেকালেন কপালে।
“আমি কাকে দায়িত্ব দিয়েছি ভরসা করে? এই তার প্রতিদান?”
মাশফিক চৌধুরী লম্বা শ্বাস টেনে উঠে দাঁড়ালেন। খুবই নরম গলায় বললেন,
“ভুল মানুষ মাত্রই হয়। সময় থাকতে শুধরে নিন নিজের ভুল, এবং এটা আমার শেষ সিদ্ধান্ত। আপনাদের সাথে আমি কাজ করছি না।”
••••
শেষে ঘনিয়ে এলো মধ্যরাত। কাল দিনের আলো ফুটলেই শুরু হবে বিদায়ের ঘণ্টা। নুসরাত চলে যাবে শেহের নামক পুরুষটার অর্ধাঙ্গিনী হয়ে। চার ভাইয়ের মন ভার। বোনকে কার ইচ্ছে করে বিদায় দিতে? কত যত্নে বড় করেছে দুই বোনকে; অথচ দুজনই চলে যাবে অন্যের বাড়ি, অন্যের বউ হয়ে। বলা হয় মেয়েদের বিয়ে হলে নাকি মেয়েরা বাপের বাড়ি মেহমান হয়ে আসে। আদৌ কথা টা কতটুকু সত্য? অর্ণর ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট। খানিকক্ষণ আগে বাবার সাথে তার কথা হয়েছে। সব কিছুই শুনেছে সে। এখন হয়তো কোম্পানিতে টাকা-পয়সা নিয়ে একটু ঝামেলা হলেও হতে পারে কিন্তু আশা করা যায় কয়েক মাসে তা ঠিকও হয়ে যাবে। এ নিয়ে মাশফিক চৌধুরী আলাপ-আলোচনা করছেন শেহের এবং স্বার্থর বাবার সাথে। অর্ণ ঘরে ফিরে এলো কয়েক মিনিট পরই। কায়নাত বিছানা করছিল। অর্ণকে দেখে আবার নিজের কাজে মনোযোগী হলো। অর্ণ চুপচাপ বিছানার এক কোণায় বসে মাথা ঝুঁকিয়ে বুকের বাম পাশে হাত ডলে বলল,
“বুকে যন্ত্রণা হচ্ছে খুব।”
কায়নাত ঝটফট চোখ তুলে পাশে তাকাল। এগিয়ে এসে ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,
“বুকে ব্যথা হচ্ছে কেন? কী হয়েছে আপনার?”
অর্ণ এক প্রকার মাটিতে বসে পড়ল হাঁটু মুড়ে। কায়নাতের বুক কাঁপছে। অর্ণর বুকে হাত ডলে অস্থির হলো। অর্ণর চোখ মুখ শক্ত হয়ে এসেছে। কায়নাত হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। অর্ণর মাথা বুকে চেপে ধরল।
“আপনার কী হলো? এমন করছেন কেন? বাবাকে ডাকব?”
অর্ণ ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আজ মরে যাব আমি। কত কষ্ট দিয়েছি তোমায়। আমার তো মরে যাওয়াই উচিত।”
কায়নাত ওর মুখ চেপে ধরল।
“এমন কথা কেন বলছেন? আপনার কিছু হবে না।”
কায়নাত ওকে রেখে উঠতে গেলে অর্ণ বাঁধা দেয়।
“তুমি এখন চলে গেলে সত্যি মরে যাব।”
কায়নাত বুঝে উঠতে পারল না কী করবে। কান্নার বেগ বাড়ল। যেখানে অর্ণর অস্থির হওয়ার কথা সেখানে কায়নাত অস্থির কেঁদে-কুটে। অর্ণ ভ্রু কুঁচকে কায়নাতের দিকে তাকাল। অভিনয় কি একটু বেশি-ই হয়ে গেছে? এত জোরে কাঁদলে বাড়ির মানুষ তাকে পাষাণ ভাববে। ইজ্জত তো এমনিতেই খেয়েছে কাল, বাকি যতটুকু আছে সেটাও থাকবে না। অর্ণ নিজেকে সামলে কোনোরকম মিনমিন গলায় বলল,
“ব্যথা কমে গেছে তুমি কান্না থামাও। এমন করে কাঁদছ কেন?”
কায়নাত শক্ত করে ওকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“চলুন হসপিটালে যাই! আপনার কিছু হয়ে গেলে আমি মরে যাব।”
“মরে গেলেই তো বেঁচে যাও। তোমার বাপ তো তোমাকে আমার থেকে ছাড়ানোর জন্যই প্ল্যান করছে।”
কায়নাত গড়গড় করে বলে ফেলল,
“ওসব তো নাটক ছিল। আপনাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য অমন করেছেন উনি। আপনি এত চাপ নিয়েছেন বলেই বুকে ব্যথা উঠেছে। চলুন হসপিটালে যাই।”
অর্ণ হতভম্ব হয়ে কায়নাতকে ছাড়িয়ে নিজের মুখো-মুখী করল। মুখ খানা লাল হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। কায়নাত ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। ভ্রু কুঁচকে আছে কান্নার জন্য। অর্ণ ওর চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
“নাটক করেছে? চাচ্চু আমার সাথে অভিনয় করেছে? আমার সাথে?”
কায়নাত ঘনঘন মাথা নাড়ায়। কায়নাত নিজেও চেয়েছিল অর্ণকে একটু টাইট দিতে কিন্তু কখন যে কী হয়ে গেল নিজেও বুঝতে পারেনি। অর্ণ খাটের সাথে মাথা ঠুকরে হায়হায় করে বলল,
“অমন বজ্জাত শ্বশুর কেন জুটেছে আমার কপালে? উনার জন্য এই আমি ম’দ অব্দি খেয়েছি ভাবা যায়? আর উনি নাকি আমার সাথে নাটক করেছে!”
কায়নাত নাক টেনে কপাল সোজা করে অর্ণর ভাব-ভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করল। সন্দিহান গলায় বলল,
“আপনার না বুকে ব্যথা করছে?”
অর্ণ অসহায় চোখে তাকিয়ে বলল,
“আমিও একটু অভিনয় করেছি বউ। এই অভিনয় না করলে তোমাদের অভিনয় সম্পর্কে জানতেও পারতাম না। তোমরা সবাই এভাবে আমাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরালে আমি যাব কোথায়? এই বয়সে এসে তোমার জ্বালায় আমাকে কী কী করতে হচ্ছে ভাবো একবার।”
কায়নাত দাঁত কটমট করে তাকাল। এটা অভিনয় ছিল? এসব নিয়ে কেউ ফাজলামো করে? কায়নাত হামলে পড়ল ওর উপর। এলোপাথারি অর্ণর বুকে কিল-ঘুষি মেরে এবার আগের চেয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠল।
“খারাপ লোক! এসব মজা করার জিনিস? আমি কত ভয় পেয়েছি ধারণা আছে আপনার?”
অর্ণ ওর দুই হাত নিজের একহাত দিয়ে চেপে ধরে অন্য হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল।
“বাড়ির মানুষ কী ভাববে বলো তো? কিছু না করেও যদি পাষাণ স্বামী বানিয়ে ফেল অন্যদের কাছে তাহলে ব্যাপার টা খারাপ দেখায় না?”
কায়নাত চোখ পাকিয়ে তখনও তাকিয়ে আছে। অর্ণ ওর দৃষ্টি দেখে মুচকি হাসল।
“আসো একটা চুমু খাই। কতদিন তোমায় আদর করি না বলো তো?”
দরজায় শব্দ হচ্ছে। এত রাতে কে এলো বাইরে? অর্ণ কায়নাতকে এক প্রকার কোলে নিয়ে বসেছিল। এমন সময় বিরক্ত হলো বাইরে শব্দ শুনে। কোন ঘিলুহীন এই সময়ে এক বিবাহিত পুরুষের ঘরের দরজায় শব্দ করে? কায়নাত জোর করে অর্ণর বাঁধন থেকে ছুটে দরজার কাছে এগিয়ে গেল মুখ মুছে। দরজা খুলে দিতেই জয়ার মুখ ভেসে উঠল। কায়নাত কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই জয়া চিন্তিত হয়ে বলল,
“তোকে তোর জামাই মারছে নাকি? সেদিক ধাক্কা দিয়ে পেট ভরেনি তার?”
কায়নাতের পেছন থেকে অর্ণ ধীর পায়ে হেঁটে এলো ট্রাউজারের পকেটে হাত গুঁজে।
“তোমার বোনকে ধাক্কা মেরে মন শান্ত হয়নি আমার, তোমাকে আছাড় মারতে পারলে কলিজা টা ঠান্ডা হত।”
জয়া থমথমে মুখে ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল।
“কীসের শালিকা? আমি আপনার বড় ভাইয়ের বউ। সম্মান দিয়ে কথা বলুন। আমাকে আমার জামাই ধমক দিতে যেখানে ভয় পায় সেখানে আপনি আমাকে আছাড় মারতে চাইছেন?”
“সে আপনি বিয়ের পরও জামাইয়ের কাছে আছাড় খেয়েছেন সেটা আমি জানি। কিন্তু কোন আক্কেল নিয়ে আপনি এই মাঝরাতে দুলাভাইয়ের দরজায় নক করলেন বড় আপা?”
জয়া পলক পিটপিট করল। লজ্জা লাগছে তার। অর্ণ জানল কী করে নাজনীন যে আগে দরকার হলে আছাড় মারতেও দ্বিধা করত না।
“তোর জামাই আমাকে অপমান করছে আর তুই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছিস?”
কায়নাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“বাঁদরামি না করে ঘরে যা। আমার কিছু হয়নি।”
জয়া অর্ণকে মুখ বাঁকিয়ে পালিয়ে গেল একপ্রকার। জয়া যাওয়ার পর কায়নাত ঘরের বাইরে পা বাড়ালে অর্ণ হতভম্ব হয়ে ওর হাত চেপে ধরে বলল,
“তুমি কোথায় যাচ্ছ?”
কায়নাত দাঁত চেপে বলল,
“রাত করে আপনার অভিনয় দেখার ইচ্ছে নেই আমার। আমি অন্য ঘরে যাচ্ছি।”
অর্ণ ওকে টেনে এনে উপর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। চোট করে তুলে নিল কোলে। কায়নাত জানে এখন কী হবে। আজ হাজার অজুহাত দিলেও কাজ হবে না।
•••
ঘনিয়ে এলো বিয়ের সময়। পার্লারের মেয়েরা এসে নুসরাতকে সাজাতে শুরু করেছে। বাদ নেই একটা মানুষও। জারা, নিধি, সুহা, মাহি, জয়া, নিশা—সবাই মিলে বসেছে সাজতে। নুসরাতের খুব অদ্ভুত লাগছে। কান্না পাচ্ছে। এমন একটা দিন তার জীবনে এর আগেও এসেছিল। স্বপ্ন হয়ে ধরা দিয়ে আবার দুঃস্বপ্ন হয়ে পালিয়ে গেছে।
সবার মাঝে আজ উপস্থিত নেই কায়নাত। তাকে কাল রাত থেকে বাড়ির মানুষ দেখতেই পায়নি। এদিকে প্রায় দুপুর হতে চলল। ছেলে পক্ষ এলো বলে! ড্রয়িংরুমে গিজগিজ করছে মানুষ। এত মানুষের মধ্যে কায়নাতকে অবশ্য চোখে না পড়ারই কথা।
অর্ণর ঘরের বিছানায় বসে আছে কায়নাত। গায়ে শাশুড়ির দেয়া লাল টুকটুকে রঙের একটা জামদানি। হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি। অর্ণ ভ্রু কুঁচকে মেয়েটার সামনে বসে আছে হাতে কাজল নিয়ে। সে মাথা চুলকে বলল,
“চোখে লেগে যাবে আমি দিয়ে দিলে। এটা বরং তুমি-ই দাও।”
কায়নাতের রাগে নাক ফুলছে সকাল থেকেই। কাজ-বাজ রেখে এভাবে ঘরের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকলে মানুষ কী ভাববে? নিশ্চিত এতক্ষণে নিচে কানা-ঘোষা শুরু হয়েছে। কায়নাত বলল,
“আপনি থামবেন? বোনের ভাই হয়ে কিভাবে বেহায়ার মতো বউকে ঘরে নিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে আছেন? কাজ নেই আপনার?”
অর্ণ ভ্রু জোড়া ভাঁজ ফেলে বলল,
“আছে না? বউকে সাজিয়ে দিচ্ছি এটা কাজ না? এতদিন পর এত কষ্ট করে বউয়ের রাগ ভাঙিয়েছি রাতে, সকাল হতেই ভুলে যাব নাকি? আর একটু আদর-সোহাগ করি তাহলে বাড়ির মানুষও দেখতে পারবে।”
“বেহায়া, বেহায়া আপনি আসলেই একটা বেহায়া।”
অর্ণ ওর গাল টেনে দিয়ে স্বর টেনে বলল,
“আলতা রাঙা গায়ের বরণ দীঘল কালো চুল, লাজুক লাজুক মুখ যেন তার ফোঁটা পদ্ম ফুল।”
(আজ পরীক্ষা ছিল আমার। তবু এত বড় পর্ব দিয়েছি। আমি রিকোয়েস্ট করব পাঠকদের, যারা গল্পটা পড়তে বিরক্তবোধ করছেন তারা এখনই পড়া বন্ধ করুন।)
চলবে…?
বই অর্ডার করুন😒
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৭
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৬