romantic golpo প্রেমবসন্ত প্রেমবসন্ত সিজন ২

প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৫৩


প্রেমবসন্ত_২ ।৫৩।

হামিদাআক্তারইভা_Hayat

স্বার্থ নিজের ঘরে শুয়ে শুয়ে টিভি দেখছিল। পায়ের উপর পা দিয়ে বিছানায় হতচ্ছাড়াটা শুয়ে আছে। শেহের বিরক্ত মাখা চোখে ওকে একবার দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কী করবে সে এখন? না নুসরাতকে ছাড়তে পারবে আর না পরিবার। মা মায়ের জায়গায় ঠিক আছে তবে সে মায়ের মন ভাঙতে বাধ্য। নরুল সৈয়দ অবশ্য কোনও প্রকার রিঅ্যাক্ট করেননি। এতে শেহের বুঝেছে বাবার মতামত। তা-ছাড়া ব্যবসার ক্ষেত্রে চৌধুরী পরিবারের সাথে সৈয়দ বাড়ির ভালো সম্পর্ক।

শেহের সিগারেট ধরাল। জ্বলন্ত সিগারেট ঠোঁটে এঁটে কয়েক টান দিতেই স্বার্থ হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে এসে ওর সিগারেট টেনে নিয়ে নিজের ঠোঁটে রাখল। কিছুটা স্বর টেনে বলল,
“বন্ধুর বুক পুড়ছে কেন?”

শেহের দাঁত চেপে বলল,
“বিয়েটা যখন দিয়েছিস তখন এই সমস্যা তুই সমাধান কর হারামজাদা।”

স্বার্থ বলল,
“কেন? বিয়ে আর বউ কী আমার? বিয়ে তোর, বউও তোর—তাই পুরো সমস্যাটাও তোর। আমার কাজ ছিল বিয়ে দেয়া দিয়ে দিয়েছি। এখন কচু গাছে ফাঁস দিয়ে মরে যা সোনা।”

পরপর মুচকি হেসে বলল,
“আজ স্বপ্নে নিশুকে দেখেছি। বেয়াদবটা আমায় শান্তিতে ঘুমোতেও দেয় না।”

শেহের বিরক্ত হয়ে বলল,
“তুই থামবি? আমিই এখন অব্দি কিছু করতে পারলাম না বড়টার আর তুই ছোটটা নয়ে পড়ে আছিস।”

কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বার্থর ফোন বেজে উঠল। নিশা কল করেছে। স্বার্থ কল রিসিভ করে কানে ধরতেই কপাল কুঁচকে ফেলল।
“কাঁদছিস কেন?”

নিশা ওপাশ থেকে কী বলল বুঝা গেল না। স্বার্থ তাড়াহুড়ো করে কল কেটে বাইকের চাবি নিয়ে দৌঁড়ে বের হলো ঘর থেকে। ওর দেখাদেখি শেহেরও পিছু নিল। চৌধুরী বাড়ি ফিরতে ফিরতে তখন বড্ড রাত। এত রাতে হিনান ভাই স্বার্থদের দেখে খানিক অবাক হলেও দরজা খুলে দিলেন। ওরা ভেতরে গেল তাড়াতাড়ি। ড্রয়িংরুমে তখন মানুষ নেই বললেই চলে। নিশার ঘরের দরজা চাপানো ছিল। স্বার্থ নক না করেই ঢুকে পড়ল ঘরে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন অনেকেই। অর্ণ, কায়নাত, মাশফিক চৌধুরী, আব্দুর চৌধুরী,বেলি বেগম এবং নুসরাত। স্বার্থ দেখল নিশা চুপটি করে দু’পা মেলে দিয়ে বিছানায় হ্যালান দিয়ে বসে আছে। সে আতঙ্কিত হয়ে ছুটে গেল। অস্থির হয়ে বলল,
“পড়েছিস কী করে? কোথায় ব্যথা পেয়েছিস?”

এই রাত করে স্বার্থকে আশা করেননি মাশফিক চৌধুরী। তিনি কপাল কুঁচকে ফেললেন। নিশা শুকনো ঢোক গিলল। এই রাত করে যে স্বার্থ ছুটে আসবে এটা সে ভাবতে পারেনি। আব্দুর চৌধুরী নাক কুঁচকালেন। অর্ণ কপাল কুঁচকে বলল,
“এত রাতে তোরা?”

স্বার্থ উত্তর দিল না। নিশার পায়ে সাদা ব্যান্ডেজ দেখে নিশার শুকিয়ে আসা মুখটার দিকে তাকাল। নিশার ঠোঁট ভেঙে আসছে কান্নায়। ঘর ভর্তি এত মানুষ, চাইলেও কাঁদতে পারছে না। স্বার্থ নিশাকে বলল,
“পড়লি কী করে? তোকে এত ছুটোছুটি করতে বারণ করেছি না?”

নিশা লাজ নিয়ে একবার বাবার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করল। বেলি বেগম ঠোঁট টিপে হাসছেন এক কোণায় বসে বসে। তিনি স্বার্থকে বললেন,
“ সে নাহয় বুঝলাম। তুমি ভাই এত রাতে এভাবে ছুটে এলে যে?”

স্বার্থ ভঙ্গিতা না করে সোজা সহজ গলায় বলল,
“আমার ফিউচার বউয়ের এই অবস্থা আর আমি আসব না? ও পড়ল কী করে নানি?”

মাশফিক চৌধুরী বিরক্ত হলেন যেন। আব্দুর চৌধুরীও চোখ কপালে তুলেছেন। বলে কী এই ছেলে? তিনি বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে বললেন,
“এই বেয়াদব ছেলেকে মেয়ের জামাই বানাতে চলেছ তুমি? দুনিয়ায় কী ছেলের অভাব ভাইজান? সব বেয়াদব ধরে মেয়েদের বিদায় দিচ্ছ কেন?”

স্বার্থর যেন সহ্য হলো না। সে বলে বসল,
“আমাদের কোন দিক থেকে বেয়াদব মনে হয় চাচ্চু শ্বশুর?”

আব্দুর চৌধুরী চোখ গরম করলেন।
“এই ছেলে, চাচ্চু শ্বশুর আবার কী?”

শেহের পেছন থেকে খানিক গলা পরিষ্কার করে বলল,
“দুঃখিত। আপনি দয়া করে মাথা গরম করবেন না।”

ওর কথা শেষ হতেই নিশা মিনমিন গলায় বলল,
“তোমরা এখন যাও। আমি ঠিক আছি।”

স্বার্থ ত্যাড়া গলায় বলব,
“এই ঘর ছেড়ে কোথাও যাব না আমি।”

মাশফিক চৌধুরী বললেন,
“চুপচাপ বাড়ি ফিরে যাও। এত রাতে এখানে এসে তামাশা করার কিছু নেই। আমার মেয়ের জন্য তার পরিবার আছে।”

স্বার্থ ফট করে বলে ফেলল,
“জামাই তো নেই। জামাইয়ের মতো ভালোবাসা কেউ দিতে পারবে না আব্বু।”

নিশা দাঁত চাপল। মাশফিক চৌধুরী চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে রইলেন। যেন এখনই চিবিয়ে খাবেন স্বার্থকে। অর্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গরুগম্ভীর গলায় বলল,
“Guys, get to my room fast.”

অর্ণ বেরোনোর খানিকক্ষণ পর ওরা দুই বন্ধু বের হয়। কায়নাত চোরা চোখে শ্বশুরের দিকে একবার তাকায়। মাশফিক চৌধুরীও ভাইকে নিয়ে বের হন খানিকক্ষণ পরেই। নুসরাত বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। নিশ্চয়ই মেয়েটার পায়ে ভীষণ ব্যথা হচ্ছে! নুসরাত অসহায় চোখে একবার ছোট বোনের পায়ের দিকে তাকাল। আহারে! মেয়েটা খুব কেঁদেছে সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়ার পর। কায়নাত বলল অর্ণদের চা-নাস্তার ব্যবস্থা করতে যাবে। সে বেরিয়ে যাওয়ার পর নুসরাত নিশার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“ঔষুধটা খেয়ে শুয়ে পড়। নানি আজ তোর কাছে থাকুক।”

নিশা লক্ষ্মী মেয়ের মতো মাথা নেড়ে মিনমিন করে বলল,
“তুই কী এখনও রেগে আছিস আপু?”

নুসরাত নরম গলায় বলল,
“না। ওসব নিয়ে আর ভাবতে হবে না। শুয়ে পড় তাড়াতাড়ি।”

ওদিকে অর্ণর ঘরে তিন বন্ধু মিলে কী নিয়ে মিটিং করছে বলা মুশকিল। কায়নাত দরজার সামনে এসে কড়া নাড়ল। ভেতর থেকে অনুমতি আসতেই সে ট্রে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। চায়ের কাপ সবার হাতে দিয়ে সোজা হতেই স্বার্থ নাক কুঁচকে বলল,
“তুমি কেমন করে এই বাড়িতে থাকো বলো তো? তোমার শ্বশুর আর বাপ বড্ড বাটপার। কেমন করে শুধু অপমান করা যায় ওই ধান্দায় থাকে।”

কায়নাত চোখ ছোট ছোট করে বলল,
“আপনি অমন মুখের উপর যা-তা বলেন বলে উনারা এমন করে।”

স্বার্থ মাথা তুলে কায়নাতের দিকে তাকাল। অবাক গলায় বলল,
“তুমি আমাকে এমন কথা বলতে পারলে?”

পরপর অর্ণর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোর বউ কোনো কথা বলল এটা? আমি বেশি কথা বলি বলে তোর মনে হয় সোনা? আমার মতো ছেলে তোর বাপ পাবে মেয়ের জন্য?”

অর্ণ চায়ে চুমুক দিয়ে বলল,
“বেটার পাবে।”

স্বার্থ দাঁত চিবিয়ে বলল,
“তোদের মতো বন্ধু থাকার চেয়ে না থাকা ভালো। যেদিন থাকব না সেইদিন আমার মূল্য বুঝবি।”

কথা খানা অর্ণর পছন্দ হলো না। সোজা কড়া চোখে তাকাল ওর দিকে। ধমক দিয়ে বলল,
“গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখব তোকে। বিয়ে বিয়ে করে সবাই মরে যাচ্ছিস কেন? নিশুর কী বিয়ের বয়স হয়েছে?”

“তোর বউয়ের হয়েছে? ও তো নিশুর থেকেও ছোট।”

“ওর ব্যাপার আলাদা।”

“কেন আলাদা? নিজের বেলায় ষোলো আনা আমার বেলায় চার আনা? “

অর্ণ বিরক্তবোধ করল। চোখ ঘুরিয়ে শেহেরের শান্ত মুখশ্রী দেখে বিছানায় শান্ত হয়ে বসল। কায়নাত ওদের রেখে বেরিয়ে গেছে ততক্ষণে। অর্ণ আড়চোখে শেহেরকে দেখে বলল,
“আম্মুর অনেক ইচ্ছে ছিল একটা মেয়ের। আমার একটা বড় বোন ছিল, নাম ছিল অহনা। বয়স তখন কত হবে, এই ২ বছরের কাছা-কাছি হয়তো। বংশের প্রথম কন্যা সন্তান ছিল আমার বোন। এক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল সে। আম্মুর খুব ইচ্ছে ছিল একটা মেয়ে সন্তানের। আল্লাহ মেয়ে দিয়েও তাকে নিজের কাছে নিয়ে গেছেন। তারপর আমরা চার ভাই হলাম, আম্মু চেয়েছিল তার একটা মেয়ে হবে। আল্লাহ সেই ইচ্ছে পূরণ করেননি। হয়তো মেয়ের কমতি পূরণ করার জন্য দুটো মেয়ে পাঠিয়েছিলেন এই বাড়ি। আমার বয়স তখন ১৩ বোধহয়। একদিন বিকেল বেলা বাইরে থেকে ফিরে দেখি আম্মুর ঘর থেকে ছোট বাচ্চার কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল।”

অর্ণর কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল। শেহের ও স্বার্থ তখন চেয়ে আছে তার দিকে।
নিশা তখন কোলে, সবে ৪ মাস বোধহয়। বেহরুজ বেগমের ঘরে বিছানায় একটা ছোট বাচ্চা মেয়ে দুইপাশে ঝুটি করে বসেছিল তার কাছে। আর কোলে চাদরে মোড়ানো ছিল ছোট্ট নিশা। অর্ণ খালাতো বোনদের দেখে মুখ ভার করে যখন ঘরে এলো তখন বেহরুজ বেগম করুণ চোখে অর্ণর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ওর ফিটারটা আনতে পারবে তুমি?”

অর্ণ কপাল কুঁচকে ভারী গলায় বলল,
“পারব না।”

“তাহলে বোনকে একটু কোলে নিয়ে বসো এখানে।”

অর্ণ চেয়েও যেন পারেনি বারণ করতে।
অর্ণ বিছানায় উঠে বসতেই বেহরুজ বেগম চাদরে মুড়িয়ে রাখা নিশাকে সাবধানে ছেলের কোলে তুলে দিলেন। অর্ণ পলক পিটপিট করে বাচ্চাটার দিকে তাকাতেই তার কান্না থেমে গেল। বড্ড ফরসা মনে হলো নিশাকে। একটু কান্নার কারণেই মুখ লাল টকটকে হয়ে গেছে। অর্ণ কি মনে করে যেন নিশার ছোট্ট নাকে নাক ঘোষল। পাশ থেকে নুসরাত মিনমিন করে বলল,
“তুমি শুধু ওকে আদর করো কেন?”

অর্ণ কপাল কুঁচকে নুসরাতকে দেখল। গোলাপি রঙের ছোট্ট গোল জামা পরা মেয়েটা। বড্ড আদুরে,আদুরে আনন। অর্ণ গম্ভীর গলায় তখন বলল,
“নিশা ছোট।”

“আমিও তো ছোট। তুমি আমায় আদর দাও।”

অর্ণ তখন বোনের টান বোঝে না। বোঝে না বোনের ভালোবাসা কেমন হয়। নুসরাত কথা শেষ করেই পেছন থেকে অর্ণর গলা জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেলো কটা। খিলখিল করে হেসে বলল,
“যাও, আমি আদর করে দিয়েছি।”

সঙ্গে সঙ্গে কোলের নিশা হালকা শব্দ করে হেসে ফেলল। অর্ণ অবাক হয়ে দেখল সেই হাসি। গম্ভীর ছেলেটা যেন পাথর হয়ে দুবোনের কাণ্ড দেখছিল। তার যে কী হয়েছিল জানা নেই। বাচ্চাদের মতো ডুকরে উঠল। নিশার গালে আলতো করে চুমু খেল। বেহরুজ বেগম এসে ছেলেকে কাঁদতে দেখে আশ্চর্য হয়ে বললেন,
“কী হলো তোমার? কাঁদছ কেন?”

অর্ণ উত্তর দেয়নি। বেহরুজ বেগম অর্ণর কোল থেকে নিশাকে নিয়ে বলেন,
“ওরা আজ থেকে এখানেই থাকবে। নিজের বোনের মতো ভালোবাসবে। কোনোদিন যেন বুঝতে না পারে তারা তোমার রক্ত নয়।”

অর্ণ কান্না থামিয়ে মায়ের সব কথা শুনল। গলায় তখনও নুসরাতের হাত জড়িয়ে ধরা। সেই যে দু বোনের যাত্রা শুরু হলো চৌধুরী বাড়ি আজ অব্দি তারা এখানেই আছে। নিশা বড্ড আদরে থাকলেও নুসরাতের জীবনে এসেছিল একটা কালো অধ্যায়। সেই অধ্যায়ে থাকা কালো রং আজ অব্দি লেগে আছে গায়ে। অর্ণ বোনদের খুব ভালোবাসে। নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।

শেহের মাথা নিচু করেছে। অর্ণর ভালো লাগছিল না। কোথায় থেকে যেন সিগারেট বের করে ঠোঁটে ধরল। বারান্দার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“বাড়ির ঘটনা আমি শুনেছি। এমন নয় যে আমি বুঝিনি নুসরাতের প্রতি তোর অনুভূতি। তোর চোখ খুব ভালো ভাবেই পড়তে পারি আমি। কিন্তু কী করব বল? ও যে আঘাতটা পেয়েছে, সেটা আদৌ সহজে ভুলে যাওয়া সম্ভব? সম্ভব এক সন্তান সহ নতুন জীবন শুরু করা? ওর মনের কোণে এখনও ভয় জমে আছে।”

শেহের নীরবতা ভেঙে বলল,
“আমি কখনো দুঃখ দেব না ওকে। আমায় দিবি ওকে?”

অর্ণ পিছু ঘুরে ওর দিকে তাকাল। বলল,
“এত সহজ নয় সব কিছু।”

“আমি সহজ করে নেব।”

“আমার বোনের একটা বাচ্চা আছে।”

“তাকেও চাই।”

“আজীবন নিজের সন্তানের মতো দেখতে হবে।”

“ওকে আমি নিজের সন্তানই মনে করি।”

অর্ণ আরও কিছু বলার আগে শেহের ধমক দিয়ে বলল,
“এখন তোর পায়ে ধরে প্রস্তাব দিতে হবে? শালা বোনের মতোই ঘাড়ত্যাড়া। বিয়ে দিবি নাকি তুলে নিয়ে যাব?”

স্বার্থ ঠোঁট টেনে হেসে শেহেরের কাঁধে চাপড় মেরে বলল,
“এই নাহলে আমার বন্ধু? চল, তুই নুসরাতকে কোলে নিবি আর আমি আদিকে। তারপর দুটোকে নিয়ে দৌঁড়ে পালাব।”

শেহের সোজা হয়ে দাঁড়াল। অর্ণর চোখে চোখ রেখে গম্ভীর স্বরে বলল,
“শেষবার বলব, নুসরাতকে আমার সাথে বিয়ে দিবি নাকি আমি সত্যি-ই তুলে নিয়ে যাব ওকে? দেখ অর্ণ, আমি ফাজলামো করার মানুষ নই। আমার নুসরাতকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে চাই মানে চাই-ই,সে এক বাচ্চার মা হোক কিংবা দশ বাচ্চার মা।”

সঙ্গে সঙ্গে নিজ বাক্য শেষ করে ঘর থেকে গটগট পায়ে বেরিয়ে গেল। স্বার্থও বের হলো দৌঁড়ে। অর্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইরে মেঘলা আকাশের দিকে তাকাল। খানিকক্ষণ পর দরজায় শব্দ হলো। নুসরাত এসেছে ভাইয়ের ঘরে। স্বার্থদের চলে যেতে দেখেই মেয়েটা সময় নষ্ট করেনি। অর্ণ নুসরাতকে দেখে বসতে বলল। নুসরাত বসল না। গুটি গুটি পায়ে বারান্দায় এলো ভাইয়ের কাছে। অর্ণ নুসরাতের ভীতু মুখ দেখে হেসে ফেলল শব্দ করে। মেঝেতে আরাম করে বসে বলল,
“পাশে বোস।”

নুসরাত ওর সামনে বসল ঠান্ডা ফ্লোরে। বারান্দার গ্রিল ভেদ করো ঠান্ডা বাতাস গায়ে আঁচড়ে পড়ছে। নুসরাত শুকনো গলায় বলল,
“তোমাকে কিছু বলার আছে।”

অর্ণ বলল,
“শুনছি।”

“রাগ করবে নাতো?”

“উহুম।”

নুসরাত লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করল। কথা গুলো গুছিয়ে নিল যতটুকু সম্ভব।
“শেহের ভাই আমাকে বিয়ে করতে চাইছে। আমার কী করা উচিত?”

“তোর কী মনে হয়?”

“আমি বুঝতে পারছি না।”

অর্ণ চাপা শ্বাস ফেলে নুসরাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নরম গলায় বলল,
“জীবন মানুষকে বারবার সুযোগ দেয় না নুসরাত। যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করিস শেহের মানুষ হিসেবে কেমন, তাহলে বলব আমার দেখা সেরা পুরুষ সে। যদি বলিস তার হাত ধরে আদৌ জীবন পাড়ি দেয়া সম্ভব? তাহলে বলব শুধু চোখটা বন্ধ করে ওর হাতটা আঁকড়ে ধর, দুঃখ কী জিনিস ভুলতে সময় লাগবে না।”

নুসরাত ছলছল চোখে তাকায়। নাক টেনে বলে,
“আমার আদির কী হবে ভাইয়া? শেহের ভাই যদি পরে ওকে মেনে নিতে না চায়? আমি তো আমার বাচ্চাটাকে ছাড়া বাঁচব না।”

“ওর আচরণে কখনও মনে হয়েছে এমনটা?”

নুসরাত কাতর চোখে তাকাল। অর্ণ লম্বা শ্বাস টেনে বোনকে আলতো করে বুকে জড়িয়ে ধরল। মেঘলা আকাশ আজ দুই ভাই-বোনের এই নরম মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে ধরা দিচ্ছে।
“কোনোদিন কল্পনা করিনি আমার ছোট্ট বোনের ভাগ্য এমন হবে। যেই মেয়ে হাতে সামান্য একটু ব্যথা পেলে পাগল হয়ে যেতাম, সেই মেয়ের জীবনটা আজ বড্ড অগোছালো। বড় ভাই হয়েও কিছু করতে পারিনি তার জন্য। তবে যদি তুই নতুন করে জীবনটা শুরু করতে চাস, তাহলে বলব শেহেরকে বিশ্বাস করে হাতটা ধরাই যায়। অন্তত কখনও সামান্যটুকু অভিযোগ করার সুযোগ পাবি না।”

নুসরাত বলল,
“আমার অতীত জেনেও তার পরিবার মেনে নেবে আমাদের?”

“সেটা শেহের বুঝে নেবে।”

নুসরাত আর কোনো কথা বলল না। চুপটি করে বসে রইল ভাইয়ের বুকে। ওদের পেছনে কায়নাত দাঁড়িয়ে আছে চুপটি করে। সে এসেছে খানিকক্ষণ আগে। দুই ভাই-বোনের কথা শুনে আর পা বাড়ানোর সাহস হয়নি।

পরেরদিন সকাল সকাল মাশফিক চৌধুরী শেহেরকে ডেকেছেন চৌধুরী বাড়ি। সকাল তখন ঘড়ির কাঁটায় ১০:২১ মিনিট। আজ কেউ-ই অফিসে যাননি। কায়নাত শাশুড়িদের সাথে হাতে হাতে কাজ করছিল। রান্নাঘরে নানারকম আয়োজন। প্রেম হেলে-দুলে সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে ড্রয়িংরুমে কাউকে দেখতে না পেয়ে রান্নাঘরের দিকে গেল। রান্নাঘরে কায়নাতদের দেখে বেহরুজ বেগমকে বলল,

“আজ বাড়িতে কিছু আছে নাকি মা? এত আয়োজন কেন?”

বেহরুজ বেগম রান্না ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বললেন,
“তোমার ওই গোবর মাথায় ঢুকবে না এসব।”

মা চলে গেলেন নিজ বাক্য শেষ করে। প্রেম মাথা চুলকে রান্না ঘরে ঢুকল। কায়নাত কপাল কুঁচকে প্রেমকে দেখে আবার কাজে মনোযোগী হলো। প্রেম রান্নাঘরের এক তাকে পা ঝুলিয়ে বসে কায়নাতকে বলল,
“ভাবি, ভালো আছেন?”

কায়নাত বলল,
“হঠাৎ ভাবির খোঁজ নেয়া হচ্ছে কেন?”

“আমি কী আপনার খোঁজ খবর নেই না কখনও? এভাবে বলতে পারলেন?”

“আমার একটা দেবরও দরকার ছাড়া আমার সাথে কথা বলে না, এটা আমার জানা কথা।”

প্রেম হালকা কেঁশে মিনমিন করে বলল,
“ভাইয়া কথা বলতে বারণ করেছে বলেই কথা বলি না।”

কায়নাতের হাত থেমে গেল। অবাক হয়ে প্রেমের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। বলল,
“আপনার ভাই বারণ করেছে?”

প্রেম মাথা নাড়ায়। কায়নাত বলে,
“বারণ কেন করেছেন?”

“ভাইয়াকেই জিজ্ঞাসা করিয়েন। এখন আমার কথা শুনুন।”

কায়নাত সন্দিহান চোখে ওকে দেখে আবার কাজে মন দিয়ে বলল,
“কী চাই?”

“আমি জানি আপনি আপনাদের সম্পর্কের কথা জানেন। আমাকে দিয়ে কিছু ভুল হয়ে গেছে, এখন এটার সমাধান কী করে করব?”

কায়নাত জানে সবটা তবু বলল,
“কী ভুল করেছেন?”

“সেটাও তো জানা আপনার।”

কায়নাত এবার সোজা ঘুরে দাঁড়াল। আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বলল,
“আপনার ভাই কেমন দেখেছেন তো? এই দেখুন, আমার দিকে নিজের ভাইয়েদের নজর অব্দি পড়তে দিতে চাননি সেখানে অন্য এক ছেলের সাথে সহ্য করা তো দূরের কথা। আপুর বিয়ে ঠিক হয়েছে এক ছেলের সাথে তবু আপনি সাহস করে এখনো পরিবারকে নিজের ভালোবাসার কথা জানাননি। উল্টো রাগ দেখিয়েছেন আপুর সাথে।”

প্রেম মাথা নিচু করল। ভুল তো কিছু বলেনি কায়নাত। কায়নাত চাপা নিশ্বাস ফেলল। বলল,
“ভালোবাসলে যত্ন করে আগলে রাখতে হয়, অবহেলা নয়। অবহেলায় দূরুত্ব বাড়ে ভালোবাসা নয়।”

প্রেম বলল,
“বাড়িতে অলরেডি নুসরাতকে নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে। আমার এখন কী করা উচিত? নিধি চাচ্ছে দাদাদের সাথে খুলনা ফিরে যাবে।”

“নুসরাত আপুকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আপনি বরং আজ সুযোগ বুঝে বাবার সাথে কথা বলুন।”

হঠাৎ সঙ্গে সঙ্গে রান্না ঘরের দরজার সামনে থেকে অর্ণর কণ্ঠসুর ভেসে এলো,
“কী হচ্ছে এখানে?”

প্রেম ফট করে বড় ভাইকে দেখে লাভ দিয়ে নিচে নামল। কায়নাত তরকারি নাড়া দিয়ে বলল,
“দেবরের সাথে একটু আড্ডা দিচ্ছিলাম। কী চাই আপনার?”

অর্ণ চোখ ছোট ছোট করে বলল,
“দেবরের সাথে এত কিসের আড্ডা?”

প্রেম শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে রান্না ঘরের বাইরে যেতে যেতে বলল,
“নাটক বন্ধ করো তো! তোমার বউকে তুলে নিয়ে যাচ্ছি না আমি।”

প্রেম চলে যেতেই অর্ণ রান্না ঘরে ঢুকল। ঘামে মেয়েটার শরীর ভিজে গেছে বলতে গেলে। অর্ণ গম্ভীর গলায় বলল,
“তোমাকে রান্না কে করতে বলেছে এই সকাল বেলা? কী হাল হয়েছে দেখছ? তোমার টিচার এসে ঘুরে গেছেন শুনলাম। পড়াশোনা বাদ দিয়ে দিয়েছ নাকি?”

কায়নাত বলল,
“বিরক্ত করবেন না একদম। বাড়িতে এত মানুষ, সাঈমা আপা আর আম্মু কী একা এত কিছু করতে পারবেন? আম্মুর শরীরটার দিকে খেয়াল রাখতে হবে না? কদিন না পড়লে কিছু হবে না।”

অর্ণ কপালে ভাঁজ ফেলে ওর দিকে ঝুঁকে এলো হঠাৎ। কায়নাত ভয়ে পিছিয়ে যাওয়ার আগেই অর্ণ ধরে ফেলল ওকে। ভ্রু নড়িয়ে বলল,
“আজ-কাল একটু বেশিই রাগ দেখানো হচ্ছে না মিসেস? জামাইকে এখন ভালোলাগে না?”

কায়নাত অর্ণর গাল টেনে দিয়ে বলল,
“এই বুড়োকে আমার ভালোলাগে না। ভাবছি জামাই চেঞ্জ করব।”

“কিন্তু এই বুড়ো তো আপনাকে ছাড়বে না।”

হঠাৎ রান্না ঘরের সামনে জয়া এসে গলা তুলে বলল,
“দুলাভাই কী আজকেও লিপস্টিক খেতে এসেছেন?”

অর্ণ ছিঁটকে দূরে সরে দাঁড়াল। জয়াকে দরজার সামনে দাঁত বের করে হাসতে দেখে চোখ রাঙাল সে। কায়নাত চোখ পাকিয়ে বলল,
“মার খাবি কিন্তু।”

অর্ণ বলল,
“তোমার জামাইকে বলে তোমাকে উগান্ডা বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করব আমি। তোমার মতো একটা শালি থাকলে এই জীবনে আমার আর বাপ ডাক শোনা হবে না।”

(কালও গল্প আসবে। আমি দুঃখিত কাল কথা দিয়ে কথা রাখতে পারিনি। রেসপন্স করুন সবাই। আর হ্যা, নতুন জুটি তৈরি হচ্ছে কিন্তু।👀)

চলবে…?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply