Golpo romantic golpo প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে

প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৩


#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে

#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী

(০৩)

সন্ধ্যার পর থেকে দুই বাসার মানুষ গল্পে মেতে আছে। কানাডা থেকে নৌমির মামা ভিডিও কল দিয়েছেন, মামী, মামাতো ভাই শুভ্র, মামাতো বোন হিয়া সবার সাথে কথা বলছে। শুভ্র কথা বলতে বলতে হঠাৎ ই জিজ্ঞেস করল,

“নৌমি কোথায়?”

” ও পাস্তা খাচ্ছে।”

“কতদিন কথা হয় না, ফোনটা দাও তো।”

নৌমি ফোন নিয়ে এক পাশে সোফায় গিয়ে বসে সালাম দিল। শুভ্র সালামের উত্তর দিয়ে আবেগান্বিত কন্ঠে বলল,

” কি ব্যাপার কিউটি?”

“এইতো। তোমরা কেমন আছো?”

“ভালো আছি। তোমাদের খুব মিস করি। “

“তাহলে চলে আসো, এবার তোমরা আসলে পাহাড়ে ঘুরতে যাব। ঠিক আছে?”

” তুমি যেখানে বলবে সেখানেই যাব, আমার কোনো আপত্তি নেই।”

নৌমি সোফায় বসে ছিল, তাজ শুভ্রর কথা শুনে নৌমির পাশে গিয়ে বসলো। নৌমির হাতে থাকা ফোনটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,

” আমাকে না নিয়ে কোথায় যাওয়ার প্ল্যান হচ্ছে শুনি?”

“আরে ভাই তুই! কেমন আছিস? বাসায় কখন আসলি?”

“মাত্রই আসছি, তোর কন্ঠ শুনে ছুটে আসলাম। তা কবে আসছিস?”

তাজ নৌমির দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,

“একা একা কত খাবি? খুব খুদা লাগছে আমায় দে। “

ড্রয়িংরুমে বাকিরা নিজেদের মধ্যে গল্প করছেন। শুভ্র শুধু বলল,

” আমার কোর্স…”

বলতেই চোখে পড়ল নৌমি নিজের হাতে তাজকে পাস্তা খাওয়াচ্ছে। খেতে খেতে তাজ আবারও বলল,

“কি যেন বলছিলি?”

শুভ্র আস্তে করে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

” আমার কোর্স শেষ হতে আর ২ মাস বাকি। কোর্স শেষ করে কাগজপত্র রেডি করে দেশে আসবো।”

“ওয়েলকাম ডিয়ার”

শুভ্র মলিন হাসল। তাজ শান্ত গলায় বলল,

” নৌমি, পানি নিয়ে আয়।”

” এটা মোটেই ঠিক না। আমার পাস্তা খেয়ে আবার আমার কাছেই পানি চাইছো?”

” তুই আমার লক্ষী বোন না?”

” আসছে আমার লক্ষী বোন৷ এত করে বলছি একটা ফোন কিনে দিতে কথায় শুনছো না। টাকা তোমার দেয়া লাগবে না শুধু আব্বুকে হ্যাঁ বলবে।”

“যা না!”

“যাচ্ছি।”

শুভ্র ঠান্ডা কন্ঠে বলল,

” নৌমিকে বল, আমি আসার সময় নৌমির জন্য একটা ফোন কিনে নিয়ে আসবো।”

তাজ সঙ্গে সঙ্গে হুঙ্কার দিল,

“কোনো প্রয়োজন নেই। ফোন দেয়ার হলে আমি কালকেই ওকে ফোন কিনে দিতে পারি। ফোন দিতে চাচ্ছি না তারমানে এর পেছনে কোনো কারণ আছে। আলগা মাতবরি করে নিজের ক্ষতি ডেকে আনিস না।”

” এখন তো সবার হাতেই ফোন আছে তাহলে নৌমিকে দিলে সমস্যা কোথায়?”

“আমি না করেছি মানে না।”

শুভ্র গম্ভীর কন্ঠে বলল,

” তুই কাছে থাকিস বলে অধিকারটা একটু বেশিই দেখাস, তাই না?”

তাজ হেসে বলল,

” তুই আয়, কাছে এসে অধিকার দেখা।”

“খুব শীঘ্রই আসবো।”

“দেখা যাবে। “

সকালের দিকে তাজ বাসা থেকে বের হতে যাবে ওমনি নৌমির সাথে দেখা৷ তাজকে দেখেই নৌমি আহ্লাদী কন্ঠে ডাকল,

” লিপাত ফাইয়া…”

তাজ সহসা চিৎকার করল,

“তোকে কিন্তু লিপাত ডাকতে নিষেধ করেছি।”

নৌমি কয়েক পা পিছিয়ে আবারও বলল,

“লিপাত ভাইয়া। “

তাজ অকস্মাৎ সামনে পড়ে থাকা একটা লাঠি হাতে নিল। লাঠি দেখেই চমকে উঠল নৌমি। দৌড় দিয়ে পালাবে নাকি দাঁড়িয়ে থাকবে বুঝে উঠতে পারছে না। তাজ ফের বলে উঠল,

” আজকের পরে কোনোদিন লিপাত বলবি?”

নৌমি ভয়ে ভয়ে বলল,

” না, বলবো না।”

“কি বলবি?”

” তুমি বলো।”

“তাজ বলবি।”

“আচ্ছা, ঠিক আছে।”

“কি বলবি?”

“তাজ”

“ভাই কোথায়?”

“তুমিই না বললে তাজ বলতে। তাছাড়া তাজের সাথে ভাইটা বেমানান লাগে। লিপাতের সাথে ভাইয়াটা সুন্দর মানায়। তাহলে লিপাত ভাইয়া বলি?”

“না। তুই তাজ ই বলবি প্রয়োজনে তামজিদ ভাইয়া বলবি তবুও লিফাত/ লিপাত নাম যাতে আর না শুনি। “

“ঠিক আছে।”

” আর একদিন যদি যদি শুনেছি তাহলে এক পায়ে কানে ধরিয়ে সারাদিন দাঁড় করিয়ে রাখবো। মনে থাকবে?”

“থাকবে।”

” কি বলতে চাইছিলি বল।”

“ভুলে গেছি।”

“ভালো হয়েছে। “

তাজ বেড়িয়ে গেছে, নৌমি বিড়বিড় করে বকছে।

আজ নিলুকে আবারও দেখতে আসছে, তাজের মেজাজ খুব খারাপ। নিলুদের বাসা থেকে কিছুটা দূরে চায়ের স্টলে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে আর নিলুর জন্য অপেক্ষা করছে। ঘন্টাখানেক পর নিলু বেড়িয়েছে। পড়নে নীল আর সাদা রঙের একটা শাড়ি, চোখে কাজল দেয়া, কোমড় পর্যন্ত চুলগুলো ছাড়া। অপরূপার ন্যায় নিলুকে দেখেই তাজ মুচকি হাসলো। রাগ, অভিমান ভুলতে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। নিলু সামনে এসেই প্রশ্ন করল,

“হাসছো কেন? আমাকে ভালো লাগছে না?”

” খুব সুন্দর লাগছে। শুধু ভাবছি, বিয়ে করবে না জেনেও কত সুন্দর সাজগোছ করে বার বার পাত্রপক্ষের সামনে বসছো। তোমার জায়গায় নৌমি হলে দু একটার নাকমুখ ফাটিয়ে ঘরবাড়ি ঠান্ডা করে ফেলতো। “

” আমি নৌমির মতো সাহসী হলে বোধহয় খুব ভালো হতো। দু’দিন পর পর পাত্রপক্ষের সামনে বসতে আমারও ভালো লাগে না। আম্মু আজকেও বলছিল, তোমাকে বলার জন্য। “

” আমি কি করবো?”

” তোমার আব্বুকে নিয়ে আসতে। আমার আব্বুর সাথে কথা বলাতে। তারপর না হয় যা হোক সিদ্ধান্ত নেয়া যেত।”

তাজ নিরবে ঢোক গিলল। বাসায় যে নৌমির সাথে বিয়ের কথা হয়ে আছে। এমতাবস্থায় চাকরি ছাড়া বাড়িতে জোরগলায় কিছু বলতে পারবে না তাজ। অপেক্ষা আর চেষ্টা ব্যতীত তাজের কিছুই করার নেই। নৌমির সাথে বিয়ের কথা শুনলে নিলু কষ্ট পাবে তাই হালকা করে কেশে শীতল কন্ঠে বলল,

” তুমি তো জানো আব্বু অসুস্থ আর আমিও বেকার। এ অবস্থায় বাসায় বিয়ের কথা বলা কোনোভাবেই সম্ভব না। যদি আমি একা কথা বললে কোনো সমাধান হয় তাহলে চলো আজই তোমার আব্বুর সাথে দেখা করবো।”

” তুমি একা কথা বললে কিছুই হবে না।”

” আপাতত বিয়েটা কিছুদিনের জন্য আটকাও। প্রতিনিয়ত এত প্যারা নিয়ে পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছি না।”

নিলু মলিন হেসে বলল,

” তুমি আমার জন্য চিন্তা করো তাহলে?”

” তোমার জন্য চিন্তা করবো না তো কার জন্য করবো? তুমি জানো, নৌমি আমাদের বিয়ের প্ল্যানিংও করে ফেলেছে।”

“কেমন প্ল্যানিং?”

“আমার চাকরি হলে প্রথমে আমাদের বাসায় জানাবো। যদি সহজে মেনে নেয় তাহলে আলহামদুলিল্লাহ। তোমাদের বাসায় আসবো, বিয়ের কথাবার্তা বলবো। আর যদি আমার আর তোমার পরিবার না মানে তাহলে বিয়ে করে রাঙামাটি পোস্টিং নিয়ে সংসার শুরু করে দিতাম৷ কয়েকবছর চাকরি করে একটা বাচ্চা নিয়ে বাসায় আসলে ঠিক মেনে নিবে।”

“ওর মাথায় এসব প্ল্যান আসে কোথা থেকে?”

“সিনেমা আছে না? তবে যাই বলো, প্ল্যান কিন্তু খারাপ না “

“এসব সম্ভব না। আব্বু না মানলে বিয়ে করা সম্ভব না।”

” তাই বলে সময় দিবে না আমাকে?”

“তিনমাসের বেশি সময় দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। যা করার এই তিনমাসের মধ্যে করো।”

” আমি চেষ্টা করবো।”

নিলু আর তাজ হাঁটছে আর টুকটাক কথা বলছে। হঠাৎ নৌমির নাম্বার থেকে কল আসছে। কল রিসিভ করতেই নৌমি বলল,

” কোথায় আছো?”

“কেনো?”

“খাতা লাগতো, তুমি নিয়ে আসবে নাকি আমরা বের হবো?”

“তোদের বের হতে হবে না। আমি আসার সময় নিয়ে আসবো।”

“আচ্ছা।”

“আর কিছু লাগবে?”

” মনে হয় না। “

“মনে হয় না আবার কি?”

” লাগবে আবার লাগবেও না।”

পরিবার এক অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ। মায়া তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। দিন কাটছে মন্থরগতিতে, নৌমি আর আন্নির চঞ্চলতায় দুই বাড়ি মেতে থাকে সর্বক্ষণ। সঙ্গী হিসেবে ছোট মামার দুই ছেলে তো আছেই৷

এক সন্ধ্যায় তাজ আন্নিকে পড়াতে বসছে। আন্নি পড়তে পড়তে হঠাৎ ই বলে উঠল,

” ভাইয়া, তোমার আর নৌমি আপুর নাকি বিয়ে?”

” হ্যাঁ তো। তুই জানতিস না?”

“শুনেছি৷ কিন্তু এটা কি সত্যি? “

” স্বপ্নে সত্যি হতেও পারে। “

চলবে….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply