#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে (১২)
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
গোধূলির স্নিগ্ধতা ভরা সন্ধ্যায় নৌমি ছাঁদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে পশ্চিমের লালচে আকাশ দেখছে। উপন্যাসের বিক্ষিপ্ত ছন্দের মতো তালহীন জীবনটাও আজকাল বড্ড ছন্দহীন মনে হচ্ছে। ঘনিয়ে আসা আঁধারে মধুমালতীর ঘ্রাণে নিসর্গ ডুবে যাচ্ছে। শুভ্র ও তাজ কারোর কথাতেই নৌমির বিশেষ মনোযোগ নেই। শুভ্রর কথা শুনে তাজ আড়চোখে একবার নৌমির দিকে তাকাল। নৌমিকে অন্যমনস্ক থাকতে দেখে ধীর কন্ঠে বলল,
” আমি স্পেশাল ভাবে কখনো কারো দায়িত্ব নেয় নি। মুসকানের তো না ই। আশা করি, ভবিষ্যতেও কখনো মুসকানের দায়িত্ব কাউকে নিতে হবে না। আর যদি অনুমতির কথা বলিস তাহলে আমি জোর গলায় বলতে পারি, আমি চাইলে তোকে আমার থেকে অনুমতি নিতেই হবে। আমি কেন, আমার জায়গায় তুই থাকলে তুইও একই কাজ করতি। সুমি যদি আমাদের বাসায় থাকত ওর প্রতি আমার যেই কনসার্নটা থাকত সেই কনসার্নটা মুসকানের প্রতিও আছে। এমনকি ভবিষ্যতে আন্নির প্রতিও থাকবে। হয়তো মুসকানের সাথে আমার অন্যরকম বন্ডিং তাই এটা অন্যভাবে প্রকাশ পায়। তুই এটাকে দায়িত্ব, কর্তব্য নাকি অধিকার বলবি তা সম্পূর্ণ তোর ব্যাপার।”
শুভ্র মৃদু হেসে বলল,
” তোর জীবনে নীলু আছে তো নাকি?”
“হ্যাঁ, আছে। কেন?”
” তুই তাহলে নীলুকে নিয়েই ভাব।”
” আমার ভাবনা, চিন্তা নিয়ে তোর কথা না বললেও চলবে। “
নৌমি দু’জনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শক্ত গলায় বলল,
” কিছুই বুঝলাম না! আমাকে থামিয়ে দিয়ে এখন নিজেরাই ঝগড়া করছ। এটা কি ঠিক?”
তাজ বলল,
” আমরা ঝগড়া করছি না। আমাদের কথা বলার স্টাইলই এমন।”
“বাব্বাহ! কালে কালে কত কি দেখতে হবে।”
শুভ্র ঠাট্টার স্বরে বলল,
” সবে তো শুরু। বাড়িতে বউ আসলে ভাইকে আর চেনায় যাবে না।”
তাজ রাগী স্বরে বলল,
” বউ বউ করে একদম মাথা খাবি না।”
নৌমি হেসে বলল, ” আমি তো এখন থেকেই ঠিক করে রেখেছি। ভাবি বাসায় আসলে আমি এই বাসায় আর আসবোই না। আসলেও ভাবির থেকে অনুমতি নিয়ে আসবো।”
শুভ্র তাজকে এক নজর দেখে বলল,
” কখনোই না। এই বাড়িতে তোমার অধিকার সর্বদা সর্বোচ্চ থাকবে। তাজ যদি কখনো নিষেধও করে তবুও তুমি আসবে। কারণ বাড়িটা তাজের একা না। আমারও সমান অধিকার আছে। নৌমির মতো ভদ্র একটা মেয়ের সাথে তুই যে অসভ্য আচরণ করিস এটা এক প্রকার অন্যায়।”
তাজ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
” আহারে ভালোবাসা! থাকিস তো দূরে। বুঝেও বুঝিস না কিছু। মাস তিনেক বাসায় থাকলে বুঝবি কত ধানে কত মুড়ি হয়। তখন নিজেই বলবি, ছাইড়া দে বইন কাইন্দা বাঁচি।”
নৌমি দু’হাতে নিজের কোমড়ে হাত রেখে গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলল,
” শুভ্র ভাইয়া কি বুঝবে? ৪২৭ টা ধানে ৩৮৯ টা মুড়ি হয়। এটা দেড় বছরের বাবুও বলতে পারবে।”
” তুই গুনে দেখেছিলি?”
” আমি জন্মগত জ্ঞানী। এসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে গবেষণা করার প্রয়োজনই হয় না আমার। বিশ্বাস না করলে তুমি গুনে মিলিয়ে নিও। কম-বেশি হলে প্রমাণ সহ আমার এসিস্ট্যান্টের সাথে যোগাযোগ করো।”
“তোর এসিস্ট্যান্ট কে?”
” আজব মানুষ! তোমার কাজ ধান, চাল আর মুড়ি গুনা। আমার এসিস্ট্যান্ট দিয়ে তোমার কি কাজ?”
তাজ শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ” নৌমি খুব ভদ্র মেয়ে তাই না? তুই আমার জায়গায় থাকলে ওরে মাথায় তুলে রাখতি। তাই তো?”
” অবশ্যই৷ কারণ আমি তোর মতো না। তোর মনে অন্য কারো বসবাস তাই তোর মস্তিষ্ক সর্বক্ষণ তার ভাবনায় ব্যস্ত থাকে। আমি এখানে থাকলে নৌমি তোর সাথে কথায় বলত না! বুঝলি?”
নৌমি শুভ্রর দিকে চেয়ে এক গাল হেসে বলল, “তোমাকে আমার খুব ভাল্লাগছে। কালকে তোমার জন্য স্পেশাল পুডিং বানাব।”
তাজ ফোঁস করে ওঠল, ” আমার আগে শুভ্রকে পুডিং খাওয়ালে তোর খবর আছে।”
নৌমি ভেঙচি কেটে বলল, “তোমাকে সব ফ্লেভারের পুডিং খাওয়ানো শেষ। অথচ প্রশংসার নামে শুধু বকা খেয়েছি। এখন থেকে শুভ্র ভাইয়াকে খাওয়াব। তোমরা থাকো, আমি চলে যাচ্ছি।”
★
উত্তপ্ত দুপুরের থমকে যাওয়া এক পহর। নিসর্গের হাওয়ায় শিউলির সুঘ্রাণ। ক্লাস শেষে ভার্সিটির সামনে দাঁড়িয়ে নৌমি ও তার দু’জন বান্ধবী গল্প করছে। অকস্মাৎ কেউ একজন নৌমির দুচোখ চেপে ধরেছে। হঠাৎ চোখ ধরায় খানিক ভড়কে গেল। থতমত খেয়ে বলল,
” কে?”
উত্তর আসছে না দেখে নৌমি ফের বলল,
” কে আপনি?”
নৌমি ধীরস্থির গতিতে হাত স্পর্শ করল। শক্তপোক্ত হাতের বাঁধনেই বুঝতে পারল এটা একটা ছেলের হাত। হাতের ঘড়িটা ছুঁয়ে কিছুটা সময় নিয়ে ডাকল,
” শুভ্র ভাইয়া।”
শুভ্র সহসা চোখ ছেড়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
” তুমি আমাকে চিনতে পারবে এটা তো ভাবতেই পারি নি আমি।”
“তুমি হঠাৎ কলেজে?”
” বাসায় ভালো লাগছিল না তাই তোমাকে দেখতে চলে এসেছি।”
শোভা, লিমা দু’জনেই স্পষ্ট চোখে শুভ্র ও নৌমিকে দেখছে। নৌমি উত্তর দিতে যাবে হঠাৎ শোভার সঙ্গে চোখাচোখি হলো। ওদের নজরদারি দেখে নৌমি কিঞ্চিৎ কপাল কুঁচকাল। শুভ্রর হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দেখে মৃদু হাসল। শোভা ও লিমার দিকে তাকিয়ে মেকি স্বরে বলল,
” তোরা এভাবে দেখিস না। তোদের জ্বালায় ভাইয়াকে নজর ফোঁটা দিতে হবে।”
নৌমির কথা শুনে শোভা নির্বোধ বনে গেল। হিমশীতল কন্ঠে শুধাল, ” ওনি তোর কেমন ভাই?”
“মামাতো ভাই। “
“তাজ ভাইয়ার ভাই?”
“চাচাতো ভাই।”
“ওনাকে তো কখনো দেখিনি।”
নৌমি শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, “এই যে শোভা আর ও লিমা। দু’জনই আমার কাছের বান্ধবী। তোমরা পরিচিত হও। আমি আসতেছি একটু।”
“এই নৌমি! কোথায় যাচ্ছ তুমি?”
“২ মিনিট। এখুনি আসতেছি।”
মিনিট দুয়েকের মধ্যে নৌমি চারটা আইসক্রিম নিয়ে আসছে৷ শোভা ও লিমাকে আইসক্রিম দিয়ে ওদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে। শুভ্র গুরুতর কন্ঠে বলল,
” দুইটা মেয়ের সামনে আমাকে একা ফেলে চলে যাওয়াটা কি ঠিক হয়েছে তোমার?”
” কেন? ওরা তোমার সাথে কিছু করেছে?”
“কিছু করে নি তারপরও।”
নৌমি অকস্মাৎ বিমর্ষ গলায় বলল,
“শুনো।”
” বলো।”
” আমার ক্লাসের অর্ধেকের বেশি মানুষ মন প্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করে আমি তামজিদ ভাইয়ার গার্লফ্রেন্ড। কলিজা চিঁড়ে দেখালেও ওদের অন্য কিছু বিশ্বাস করাতে পারব না। আজ হঠাৎ তোমাকে দেখল। তাই ওরা তোমাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছিল । এজন্য তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি।”
” ওহ আচ্ছা৷ তাজের গার্লফ্রেন্ড নিলুর সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছে কখনো?”
” দুই একবার দেখা হয়েছে। আপনিও চিনেন ওনাকে?”
শুভ্র থমথমে কন্ঠে জবাব দিল, ” খুব ভালো করে চিনি। বাদ দাও, এখন চলো।”
” কোথায় যাব? আর তুমি একা আসলে কেন? তামজিদ ভাইয়াকে নিয়ে আসলে না কেন?”
” তাজকে নিয়ে আসার অবস্থা থাকলে তো নিয়ে আসবো। সকালে খেয়ে সেই যে বাসা থেকে বেরিয়েছে আর কোনো খবর নেই। বাসায় বোরিং লাগছিল। তোমাদের বাসায় গিয়ে শুনি তুমি কলেজে। তাই কোনোকিছু না ভেবেই কলেজে চলে এসেছি।”
” আচ্ছা। এখন চলো বাসায় যায়।”
” এত তাড়া কিসের তোমার? কোথাও থেকে ঘুরে আসি চলো।”
” তাজ ভাইয়াকে কল দেয় তাহলে?”
” আমার সঙ্গে একা গেলে সমস্যা আছে কোনো?”
” সমস্যা হবে কেন! আমার কখনোই কোনো সমস্যা হয় না। তবে আমার কারণে অন্যদের সমস্যা হয়। “
” যেমন?”
“এই যেমন আমি তামজিদ ভাইয়ার মাথা নষ্টের কারণ। দু’দিন পর তোমারও হবো।”
” কখনোই না। তোমার কোনো কাজেই বিরক্ত হবো না আমি। গভীর রাতে ঘুম ভাঙিয়েও যদি বলো, চলো ঘুরে আসি। আমি একটা প্রশ্ন করব না। চুপচাপ তোমার সঙ্গে বেড়িয়ে আসব।”
” সত্যি বলছো?”
” আজ রাতে প্রমাণ হয়ে যাক!”
” জি না। আজ রাতে বললে দেখা যাবে তুমি সারারাত না ঘুমিয়ে বসে আছো৷ এটা তো হতে দেয়া যায় না! যেকোনো একদিন মাঝরাতে হুট করে কল দিয়ে বলল, চলো।”
চলবে……
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৩১
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৫
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২২+বর্ধিতাংশ
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে সূচনা পর্ব
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৬
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১১
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৩
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১০