Golpo কষ্টের গল্প পরগাছা

পরগাছা পর্ব ২৮


পরগাছা |২৮|

ইসরাত_তন্বী

(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)

সময় খরস্রোতা নদীর মতোই বহমান। আমাদের দিন ভালো-মন্দ যেমনই কাটুক, শ্বাস চলুক কিংবা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাক না কেন সময় তার নিজের মতোই চলবে। কখনো থেমে রবে না। কারোর পরোয়া সময় কখনো করে নাকি? উঁহু, একদমই নয়। এবার যেন ঝড়ের গতিতে জীবন থেকে একটা মাস কেটে গেছে। সবকিছুর মধ্যে দিয়ে নানান গল্পের বাহক জীবনী গুলো টেনেটুনে চলছে। আরুষ নগরে গিয়েছিল পাসপোর্ট সহ হজের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু কাজে। আট দিন সেখানে অবস্থান করে গত সপ্তাহে গ্রামে ফিরেছে।

রমজান মাস চলছে। আজ পঞ্চম রোযা। সময় দিনের শেষ প্রহর। গুঞ্জরিকা চুলোর পাশে বসে আছে। হাঁড়িতে ভাত হচ্ছে। পুঁইশাক আর লাউয়ের তরকারি রান্না করেছে ইতোমধ্যে। ইফতারে ভাত খাওয়ার অভ্যাস আছে গুঞ্জরিকার। এটা অবশ্য পুরোনো অভ্যাসই বলা চলে। আড়তের সেখানেই কাজ নিয়েছে। এক মাসের পারিশ্রমিক ও পেয়েছে। সেই দিয়েই প্রথম রোযার দিনে বাজার সদাই করে এনেছে। রোযা মুখে বাজারে যাওয়া কষ্টের বটে। এছাড়া রোজ কাজে যেতে হয়। সময়ের ও অভাব। এরমধ্যে মনের মধ্যে অন্য পরিকল্পনা এঁটে রেখেছে। আজ থেকে পনেরো দিন আগে শাহরিয়ার এর হাত ধরে আরুষের একখানা চিঠি এসেছিল। মানুষটা দেখা না দিলেও নিজের মনের অব্যক্ত কথাটা ঠিকই চিঠিতে লিখেছিল। নিজের কথা রেখে, নিজের অনুপস্থিতিতে গুঞ্জরিকাকে এলোমেলো করে দেওয়ার ক্ষমতা সে রাখে। এর দায়ভার অবশ্য গুঞ্জরিকার নিজে। কারণ সে নিজেকে ফিরিয়ে নিলেও অবাধ্য মনটাকে ফিরিয়ে নিতে পারেনি ওই মানুষটা থেকে।

‘আমার ভুলটা কি পৃথিবীর সব ঘৃণার ঊর্ধ্বে ছিল গুঞ্জন? তুমি সব ভুলে কেন পারলে না আমার হতে?’

                                           ইতি 
                            কারোর অপ্রিয় শেখ বাবু

বড়ো একখানা পৃষ্ঠার চিঠিতে শুধু এই দুটো বাক্য লেখা ছিল। অথচ শেষ সম্বোধনটুকুতে গুঞ্জরিকার পুরো পৃথিবী বিষাদের ছায়ায় ছেয়েছিল। চোখের পানিতে স্নানিত হয়েছিল চিঠিখানা। নিজের মনেই তাচ্ছিল্য হাসল গুঞ্জরিকা। ঠিক সেইসময় ওকে অবাক করে দিয়ে শাহরিয়ার এসে উপস্থিত হলো কুঠিরের সামনে। সাইকেলের হর্নের শব্দে গুঞ্জরিকা পিছন ফিরে চেয়েছে ততক্ষণে। বেড়ার কাছটাই শাহরিয়ার এসে দাঁড়িয়েছে। গুঞ্জরিকা হাসিমুখে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে গেল‌ সেদিকে। শাহরিয়ার ঠোঁটের কোণে সবসময়ের মতোই মুচকি হাসি ছড়িয়ে আছে। গুঞ্জরিকা সালাম দিয়ে জানতে চাইল,
“ভালো আছেন ভাইজান? ভাবী, চাচী সবাই ভালো আছে?”
শাহরিয়ার হাসিমুখে সালামের জবাব দিল। সাথে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ ভাবী, আমরা সবাই ভালো আছি।”
কথাগুলো বলেই থামল শাহরিয়ার। ছেলেটার মুখে লাজুক হাসি ছড়িয়ে আছে। গুঞ্জরিকার নজর এড়াল না সেটা। শুধাল,
“কোনো ভালো সংবাদ আছে ভাইজান?”
শাহরিয়ার হ্যাঁ বুঝিয়ে মাথা নাড়ল। প্রত্যুত্তর করল,
“ভাবী, আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি বাবা হতে চলেছি। আপনার দোয়ায় রাখবেন আমাদের। এই খুশির সংবাদটা আজ সকালে জানার সুযোগ হয়েছে কিন্তু আপনাকে না জানিয়ে শান্তি পাচ্ছিলাম না। তাই এই অসময়ে ছুটে এসেছি।”
সাইকেলের হাতলে ঝুলিয়ে রাখা একটা থলে গুঞ্জরিকার দিকে এগিয়ে দিল শাহরিয়ার। গুঞ্জরিকা বিড়বিড় করে আলহামদুলিল্লাহ পড়ল। বলল,
“আপনারা সবসময় আমার দোয়ায় থাকবেন ভাইজান। এই পৃথিবীর কেউ আপনার মতো করে এমন নিঃস্বার্থভাবে আমাকে এতটা সাহায্য করেনি।”
পরপরই থলের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করল গুঞ্জরিকা,
“এটাতে কী আছে ভাইজান?”
শাহরিয়ার এর মুখের হাসি বাড়ল,
“মিষ্টি আছে ভাবী। এত খুশির খবর খালি হাতে কীভাবে আনি?”

গুঞ্জরিকা মুচকি হাসল,
“নিতে পারি তবে একটা শর্ত আছে আমার।”
শাহরিয়ার এর ভ্রু জোড়া গুটিয়ে এল। মুখের চওড়া হাসিটা কমল। উচ্ছুক চোখে চেয়ে রইল। হয়ত বিষয়টা একটু বুঝতে চেষ্টা করল। জানতে চাইল,
“কী শর্ত ভাবী?”
“আজকের পর থেকে আর কখনো আমাকে ভাবী বলে ডাকবেন না ভাইজান। আমাকে বোন সম্বোধন করলেই খুশি হব।”
শাহরিয়ার এর কুঁচকে যাওয়া কপাল সমান হয়ে এল। মৃদু আওয়াজে হেসে উঠল। মিষ্টির থলেটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“তবে তাই ডাকব আপনাকে। আপনি শাহরিয়ার এর একমাত্র বোন। এই অধমের ক্ষমতা নেই আপনার আবদার ফিরিয়ে দেওয়ার।”
গুঞ্জরিকা সন্তুষ্ট হলো জবাবে। মিষ্টির থলেটা নিজের হাতে নিল। থলের ভেতরে আলগোছে চোখ পড়তেই একটা চিঠির খাম নজরে এল। ঘটনা আঁচ করতে পারল মেয়েটা। তবুও প্রশ্ন ছুঁড়ল শাহরিয়ার এর উদ্দেশে,
“ভাইজান চিঠি কে পাঠিয়েছে?”
শাহরিয়ার এর হাসিমুখটা ম্লান হয়ে উঠল। দৃষ্টি নামিয়ে নিল। নতমুখে উত্তর দিল,
“আরুষ পাঠিয়েছে। তাকে ত্যাগ করলেও চিঠিখানা ফেরত দিবেন না বোন। ভাইজানের এই আবদার টুকু রাখুন।”

গুঞ্জরিকা চিঠিখানা এমনিতেও ফিরিয়ে দিত না। তার উপর শাহরিয়ার এর আবদার। কিয়ৎসময় নীরব রইল। বড়ো একটা শ্বাস ফেলে বলল,
“আমি এখানে থাকছি না ভাইজান। কোথায় যাচ্ছি সেটা আপাতত না বলি। তবে ঠিকমতো পৌঁছে ঠিকানা দিয়ে আপনাকে চিঠি লিখব ইন শা আল্লাহ। কিন্তু সেই ঠিকানা গোপন রাখা আপনার কর্তব্য ভাইজান।”
শাহরিয়ার চকিতে চোখ তুলে তাকাল। অবিশ্বাস্য নেত্রে চেয়ে রইল। মুখ ফুটে কিছু বলতেও ভুলে গেল ছেলেটা। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। গুঞ্জরিকা বুঝল সবটা। নিজ থেকেই পুনরায় বলল,
“এখানে থাকলে আমি ভালো থাকতে পারব না ভাইজান। ওই বাড়ির বিষাক্ত বাতাস এখানে এসেও আমাকে ধাওয়া করে বেড়ায়। আমি এই হাওয়া, এই বিষব্যথা থেকে মুক্তি চাই। তাদের থেকে ততটা দূরে যেতে চায় যতদূর গেলে আর কোনো পিছুটান থাকবে না। আর কখনো এখানে আসিয়েন না ভাইজান।”

শাহরিয়ার তখনো হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেমন অদ্ভুত অনুভূত হচ্ছে। মেয়েটা যার থেকে পালিয়ে বেড়াতে চাইছে আদৌও কখনো মুক্তি মিলবে তার থেকে? বড্ড জটিল প্রশ্ন বোধহয়। চারপাশ হাতড়েও উত্তর মিলল না। ছলছল আঁখিতে তাকিয়ে আছে শাহরিয়ার। এতক্ষণে ছোট্ট করে বলল,
“যেটাতে আপনি ভালো থাকবেন সেটাই করুন বোন।”
গুঞ্জরিকা উলটো ঘুরে কুঠিরের দিকে হাঁটা ধরল। উঁচু গলায় বলল,
“একটু দাঁড়ান ভাইজান আমি আসছি।”
দ্রুত পায়ে কুঠিরে প্রবেশ করল। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে কিছু কাগজপত্রের একটা থলে নিয়ে ফিরে এল। নিঃশব্দে শাহরিয়ার হাতে ধরিয়ে দিল। নিজ থেকেই বলতে শুরু করল,
“এটা এই জমির কাগজপত্র ভাইজান। ওটার উপর লিখে দিয়েছি এই জমি আমি আপনাকে দিয়েছি। এর বেশি কিছুই করার সময় হাতে নেই আমার। এখন আপনার দায়িত্ব আমার মতো অভাগী গুঞ্জদের জন্য এখানে এই নদীর পাড়ে একটা আলাদা জগৎ বানিয়ে দেওয়া। এতটুকু এই অভাগীর জন্য, এই তুচ্ছ মানবকুলের জন্য করবেন ভাইজান?”

প্রত্যুত্তরে শাহরিয়ার নিশ্চুপ রইল। সত্যিই ছেলেটার সাধ্য হলো না ফিরিয়ে দেওয়ার। হাতে থাকা কাগজপত্রগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। বেশখানিকটা সময় নিয়ে রয়ে সয়ে বলল,
“আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি আপনার কথা রাখব বোন।”
গুঞ্জরিকার গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। খুশিতে নাকি এক পৃথিবীসময় দুঃখে কে জানে? শাহরিয়ার মলিন হাসল। দিব্যি আশ্বাস দিল বোন সমতূল্য গুঞ্জরিকাকে। হায়রে মানবজীবন! কত বর্ণে, কত রঙে, কত সাজে তুমি মানুষের মাঝে ধরা দাও।
.

ইফতারের পরে আজ শেখ বাড়ির চিত্র ভিন্ন। যেখানে গ্রামবাসী বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে সেখানে শেখ পরিবারে কান্না কাটির জোয়ার বয়ে চলেছে। ইফতারের পরে বিছানায় একটু শরীর না ছোয়ালে ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসে। হাড় মাংসে গড়া দেহটা আর সায় দেয় না। তারাবীহ এর নামাজ পড়া থাকে। কিন্তু আজ কারোর সেই সুযোগ নেই। আয়েশা শেখের অবস্থা ভালো না। রোকেয়া শেখ নিজেও এসে বসে আছেন শাশুড়ির কক্ষে। রোকেয়া শেখ নিজেও কোমরের ব্যথায় চলাফেরা করতে পারেন না তেমন। লাঠির সাহায্যে টুকটাক হাঁটাহাঁটি করেন। নিজের প্রয়োজনীয় কাজগুলো করেন। অন্যদের উপর আর কতটুকুই নির্ভর করা যায়? পাঁচবার হাসিমুখে সাহায্য করলে একবার ঠিকই মুখ ঝামটা দিবে। একজীবনে কখনোই কারোর উপর পুরোটা ভরসা করা যায় না। মানুষ এতটা ভরসার স্থল কখনো হয়ে ওঠেনি।

আয়েশা শেখের শরীর ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে। পুরোপুরি বিছানা বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। সেই যে জ্বরে বিছানায় পড়ল আর ওঠা হলো না। কবিরাজ এসে নিয়ম করে ঝাড়ফুঁক করে যাচ্ছেন। ডাক্তার ও এসে নাড়ি পরীক্ষা করে ঔষধ দিয়ে গেছেন। কোনোটাতে কোনো কাজ হচ্ছে না। একভাবে বিছানায় পড়ে থেকে শরীরের ভাঁজের চামড়া গুলোতে পচন ধরেছে। এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার পরেও রক্ষা হয়নি। আজ দুইদিন মুখের ভেতরে ঘা দেখা দিয়েছে। হয়ত কথাবার্তা বলতে পারছেন না বলেই এমনটা হয়েছে। কিন্তু আজ সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই সেখানে বেশকিছু পোকার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চোয়াল কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। পঁচা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আয়েশা শেখের পাশে থাকা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। মানুষটার রাত যাবে কি-না সেই নিয়ে চিন্তিত পরিবারের সদস্যদেরা। আরুষ সাইকেল নিয়ে ছুটেছে ডাক্তারের কাছে। আসমান শেখ মায়ের একপাশে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। একখণ্ড পাথরে পরিণত হয়েছেন। সালেহা শেখ সারথীকে নিয়ে দিন তিনেক হলো এসেছেন। মায়ের উদরে বসে সূরা ইয়াসিন পড়ছেন তিনি। ক্ষণে ক্ষণে ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদছেন। মা শব্দটার কাছে সব ফিকে হয়ে আসে। সেখানে ভালো মন্দের বিভেদ থাকে না। সারথী নিজের মাকে বুঝ দিচ্ছে। রোকেয়া শেখ একপাশে বসে তসবিহ গুনছেন। মুখটা পাণ্ডুর বর্ণ ধারণ করেছে। কিসের চিন্তায় যেন মগ্ন হয়ে আছেন। হয়ত নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করছেন। অদিতি নিজের কক্ষে আছে। অদূরে দুয়ারের নিকট থমকে দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রা। এক চিত্তে তাকিয়ে আছে আয়েশা শেখের ফ্যাকাসে বদনে। ওই মুখটার অপব্যবহারের জন্যই কি আল্লাহ প্রদত্ত এই কঠিন শাস্তি? এই পৃথিবীর বুকে স্বচক্ষে দেখিয়ে দিচ্ছেন? সতর্ক করছেন মানবকুলকে? কিন্তু মানুষ কি একটুও শুধরাচ্ছে নিজেদের? এত সুযোগ পেয়েও আল্লাহর পথে ফিরে আসছে কি? পরকাল ভুলে ইহকালের আনন্দে মেতে আছে সকলে। ক্ষমতা, সম্পদের কত বড়াই তাদের। মৃত্যুর চিন্তা কেউ করে না। ভবিষ্যতের চিন্তায় বিভোর সকলে। অথচ মানবকুলের মৃত্যুই একমাত্র ভবিষ্যৎ। আয়েশা শেখের যন্ত্রনায় চন্দ্রার বুকটা শান্তির পরশে জুড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে নিজেও তো একই রাস্তার পথিক। তার মুখনিঃসৃত জুবানে একটা পরিবার নিঃশেষ হয়ে গেছে। তবে তার শাস্তি কি এর চেয়েও ভয়ানক হবে? হঠাৎ করেই চন্দ্রার বুকটা হাঁসফাঁস করে উঠল। ওখানে আর দাঁড়াল না। হনহনিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।

অদিতি নিজের কক্ষে বসে আছে। নিজের প্রিয় থেকে ঘৃণায় রুপান্তরিত হওয়া পরিবারটার ধ্বংসের হিসেব নিকেশ খুব করে কষছে। কেমন যেন পরিবারটা একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আগের সেই হাসিখুশি পরিবারটা এখন বিষের বেড়াজাল। এখানে কেউ কোথাও ভালো নেই। নিজেদের করা পাপে নিজেরাই পুড়ে ভস্ম হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির বিচার বড়ো কঠিন। এখানে বিন্দু পরিমাণ ছাড় নেই। অদিতির নিগূঢ় কল্পনা জল্পনার মাঝেই দরজায় করাঘাতের শব্দ ভেসে এল। অদিতি ভাবনা থেকে বেরিয়ে এল। উঁচু গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“কে?”
দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এল চন্দ্রার ক্ষীণ গলা,
“আমি, ভেতরে আসতে পারি?”
এই অসময়ে চন্দ্রার আগমনে অদিতি একটু অবাক হলো বৈকি। মুখে বলল,
“এসো।”
অদিতি অনুমতি দেওয়ার পরপরই দরজাটা মৃদু শব্দে খুলে গেল। শ্লথগতিতে ভেতরে প্রবেশ করল চন্দ্রা। এগিয়ে এসে অদিতির মুখোমুখি দাঁড়াল। আগেপিছে কিছু না বলে সোজাসাপ্টা জানতে চাইল,
“নবনীতা তালুকদারের সাথে তোমার দাদী আয়েশা শেখ কী করেছিল অদিতি? অনুরোধ মিথ্যে বলবে না।”

অদিতি কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল চন্দ্রার উদাসীন আননে। এতদিনে চন্দ্রার আচরণগত পরিবর্তন সে ঠিকই লক্ষ্য করেছে। বিচক্ষণ মস্তিষ্ক কেমন যেন দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে ফেলল। অদিতি বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। চন্দ্রার সম্মুখে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে জানতে চাইল,
“অদিতি শেখ কখনো মিথ্যার আশ্রয় নেয় না। কিন্তু তুমি কে বলোতো ভাবী? আমি যতদূর জানি তোমার সত্য বলার অভ্যাস কম।”
অদিতির তেরছা কথায় প্রথমবারের মতো অধর এলিয়ে হাসল চন্দ্রা। একটুও রাগ করল না। মুখটা কিঞ্চিৎ এগিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“নবনীতা তালুকদারের একমাত্র কন্যা চন্দ্রা শেখ। উঁহু চন্দ্রা তালুকদার। শেখ বংশকে আম্মা নিজেই ত্যাগ করেছেন। চন্দ্রা তালুকদারই ঠিক আছে।”
অদিতি ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল,
“আমার ধারণাই সঠিক তবে। তোমার আচরণ, চলাফেরায় সবসময় নিজেদের মতো একটা তেজ খেয়াল করেছি আমি। বারান্দায় চলো। আজ তোমার সাথে আড্ডা দেই। বিভৎস সময় হয়ত কিছুটা কেটে যাবে।”
কথাগুলো বলেই বারান্দার দিকে অগ্রসর হলো অদিতি। ওর পিছু পিছু চন্দ্রাও এগিয়ে গেল।

প্রকৃতির বুকে শীতল হাওয়ার রাজত্ব। আসমানে সরু একটুকরো চাঁদের অস্তিত্ব উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। শশীর নিয়ন আলোয় চারপাশ আলোকিত। বারান্দায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে অদিতি এবং চন্দ্রা। দুজনের দৃষ্টি নিবদ্ধ অদূরের কিছু নারিকেল গাছে। সেখানে দুটো পাখি বসে আছে। কিন্তু কী পাখি ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তাদের ভিতরে হয়ত মান-অভিমানের পর্ব চলছে। একজন খুব করে অপরজনকে মানানোর চেষ্টা করছে। ভীষণ সুন্দর একটা দৃশ্য। চারদিকে নীরব নিস্তব্ধ পরিবেশ বিদ্যমান। নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ শোনা গেল অদিতির গলা,

“ভাবীজানের মুখে শুনেছিলাম আমার জন্মের আগে এই পরিবারে আরও দুজন সদস্য ছিল। আমার ছোট চাচা আকবর শেখ এবং ছোট চাচী নবনীতা তালুকদার। ছোট চাচা ব্যবসায়িক কাজে নগরে যেতেন। তো একদিন নগর থেকে ফেরার পথে এক দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন। ওনার স্ত্রী তখন অন্তঃসত্ত্বা। নবনীতা তালুকদারের ভাগ্যের করুণ পরিণতিতে গ্রামের সকলে ভীষণ ব্যথিত হয়। দাদী নাকি তাকে ভীষণ অত্যাচার করতেন। তাকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানো দাদী পছন্দ করতেন না। অথচ দাদীর টাকার অভাব ছিল না। তাঁর টাকা পোকায় খেত। উঠতে বসতে কটুকথা শোনাত নবনীতা তালুকদারকে। তো একদিন এইভাবেই রাগের মাথায় অন্তঃসত্ত্বা নবনীতা তালুকদারের পেটে লাথি মেরে বসেন দাদী। সেইবার আল্লাহর রহমতে বাচ্চাটা বেঁচে গেলেও ওনার শরীর ক্রমশ খারাপের দিকে যেতে থাকে। মানুষে বলত বেশিদিন বাঁচবে না। দাদী সেইসময়ে ঠিকমতো খেতেও দিতেন না। তখন বাবা বেশিরভাগ সময় ব্যবসায়িক কাজে নগরে থাকত। এইসবের কিছুই জানতেন না। আর আম্মা! তিনি ছিলেন দাদীর হাতে বানানো পুতুল। ভাইজান পড়ার জন্য গ্রাম ছেড়েছিলেন ততদিনে। তার নিকট ও সবটা অজানা ছিল। এত অত্যাচার সয়েও এই পরিবারে মুখ থুবড়ে পড়েছিলেন নবনীতা তালুকদার। এরমধ্যে একদিন ছোট্ট একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান জন্ম দেন তিনি। এই নিয়েও দাদী ঝামেলা করতেন। তার বংশের প্রদীপ নেভাতে নাকি কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছেন নবনীতা তালুকদার। হাতে ছুঁয়েও মারতেন। তো এত কষ্ট সহ্য করতে না পেরে এক ঝড়বৃষ্টির রাতে এই শেখ বাড়ি থেকে নবনীতা তালুকদার নিখোঁজ হয়ে যান তার ছোট্ট শিশু নিয়ে। কোথায় গেছেন কেউ জানে না। মানুষ বলে হয়ত শাশুড়ির অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। নয়ত এতবছরেও কেউ তাকে কেন দেখল না?”

একদমে কথাগুলো বলে থামল অদিতি। চন্দ্রার দৃষ্টি সরে দূরাকাশে নিবদ্ধ হয়েছে। এক দমকা পবন এসে দুজনের কায়া ছুঁয়ে গেল। শিরশির করে উঠল সর্বাঙ্গ। চারপাশ যখন পুনরায় নীরবতা গ্রাস করে নিবে তখন চন্দ্রা বলতে শুরু করল,
“আম্মা আমাকে পৃথিবীর আলো দেখাতে তাঁর শখের সংসার এই শেখ পরিবার ত্যাগ করেছিল। কারণ আয়েশা শেখ কখনোই আমাকে বাঁচতে দিতেন না। আম্মা আমার এক দুঃসম্পর্কের মামার কাছে আশ্রয় নিয়েছিল। আম্মা সাহস করেনি নিজের বাবার বাড়িতে ফিরে যেতে। কারণ পরিবারের বিপরীতে যেয়ে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন তিনি। মামার কাছে ছিলেন ছয়মাস। আমার জন্মের সাতমাস তখন। হঠাৎ করেই একদিন আম্মা কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন। আর কখনো ফিরে আসেননি। তার কয়েকদিন পরে নদীতে লাশ মেলে একজন নারীর। মুখ সহ সম্পূর্ণ শরীর ফুলে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। সবার ধারণা ওটাই হয়ত আম্মা ছিলেন।”

শেষের দিকে চন্দ্রার কণ্ঠস্বর ধরে এল। গাল বেয়ে নীরবে বারিধারা নামল। অদিতি পাশ ফিরে তাকাল। এই প্রথম বারের মতো চন্দ্রার কাঁধে হাত রাখল। মুখে কিছুই বলল না। কেবল বুকচিরে ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। অকস্মাৎ কিছু স্মরণ হতেই অদিতি বলে উঠল,
“তুমি যে নবনীতা সেজে দাদীকে নিয়ম করে ভয় দেখাতে আমি জানি ভাবী।”
তৎক্ষণাৎ চন্দ্রার কান্না থেমে গেল। ঝড়ের গতিতে ফিরল অদিতির দিকে। চাহনিতে বিস্ময় ফুটে উঠেছে। অদিতি মুচকি হাসল,
“ভয় নেই। কাউকে বলার হলে এতদিনে বলতাম। যার যেটা প্রাপ্য সে সেটা পাবেই। কারোর সাথে অবিচার করে কখনো শান্তি পাওয়া যায় না। অন্ততপক্ষে ভালো থাকা যায় না। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ তুমি।”
চন্দ্রা সবগুলো কথা শুনল। মস্তিষ্কের প্রতিটা নিউরনে সেই যাতনা মিশ্রিত অতীত উঁকি দিল। এই পর্যায়ে ফুঁপিয়ে উঠল মেয়েটা,
“আমার জীবন ধ্বংস করেছে এই শেখ পরিবার। তোমাদের মতো সুন্দর একটা জীবন আমার ও প্রাপ্য ছিল। সব থেকেও আমি কিচ্ছু পাইনি অদিতি। যেদিন মামী আমাকে মারতে মারতে সব সত্য বলছিলেন সেদিন আমার বুকটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছিল। যেই আমি নিজেকে জাতপাতহীন ভাবতাম সেই আমি একটা বিত্তশালী পরিবারের সন্তান ছিলাম। এত অবহেলা, এত দুঃখ এত অবিচার আমার প্রাপ্য ছিল না অদিতি। অতঃপর জেদ ধরেই এই বাড়িতে আসা। মামা পেল বড়ো অংকের টাকা আর আমি পেলাম ক্ষণিকের মানসিক শান্তি।”

অদিতি আর কিছু বলল না। মনটা কেমন তিক্ততায় ছেয়ে গেল। একটা মানুষের হাত ধরে এই পরিবারের সবার জীবনে দুঃখের আগমন ঘটেছে। কারোর ভালো থাকা হয়ে ওঠেনি। হঠাৎ কক্ষে আরও একজনের উপস্থিতি অনুভব করতেই দুজন পিছনে ফিরে দেখল। দুজনের চোখের পর্দায় ভাসল ভীষণ পরিচিত একটা মুখ। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাক করা ওদের দিকেই। পুরুষালী চোয়াল শাণিত দেখাচ্ছে। অদিতি নির্লিপ্ত রইল। অপরদিকে চন্দ্রার মুখটা আতঙ্ক, শঙ্কায় একটুখানি হয়ে এল। এখন কি এই বাড়ি, শেষ আশ্রয়স্থল ও হারাতে হবে? কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? ওর তো নিজের বলতে কেউই নেই এই সুবিশাল ধরণিতে। পরক্ষণেই ভাবল যেখানে তার অধিকার আছে সেখান থেকে একপাও নড়বে না। দুজনকে অবাক করে দিয়ে ভেসে এল আরুষের গুরুগম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠস্বর,

“সবার দাবার বোর্ডের অবহেলিত গুটি হলো আরুষ শেখ। জন্মদাত্রী বিষের পাত্র হাতে নিয়ে নিজের মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে দ্বিতীয় বিয়েতে রাজি করাল। প্রিয়তমা হাসিমুখে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দিল। একজন অসহায়ত্বের নাটক করে পিঠ পিছে ছুরি বসাল। দিনশেষে বোকা আরুষ শেখ কেবল শূন্যের খাতায় পূর্ণতা পেল।”

চলবে

(আজও রিচেক নেই। লিখেই পোস্ট করে দিয়েছি। ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। প্রিয় পাঠক, আপনাদের সকলের গঠনমূলক মন্তব্য ও রেসপন্সের আশা রাখি।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply