Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৪৮


#নূর_এ_সাহাবাদ

#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ৪৮

সুনেহেরার নিস্তেজ দেহটা দুহাতে আকড়ে নিলো মাহাদি। হাত ভিজে উঠছে। হাত সামনে এনে দেখলো রক্ত। অনেক রক্ত।

মিরান হাঁপাতে হাঁপাতে সামনে এসে দাঁড়ালো। চোখ দুটো এখনও লাল হয়ে আছে বালির জন্য। কাঁপা গলায় বলল

“বাঁচান ওকে… দয়া করুন। ওকে বাঁচান…”

মাহাদি নিচে তাকাতেই দেখলো সুনেহেরার পেট থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছে। তার বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। বেশ কিছুক্ষণ আগে এক সৈন্য খবর দিয়েছিলো সুনেহেরা কবরের পাশে কাঁদছে। খাওয়া দাওয়া শেষ করে সৈনিক দের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে আসতে আসতে সময় লাগলো। কিন্তু এই অবস্থায় তাকে দেখতে হবে ভাবেও নি মাহাদি। কপাল কুচকে আসে। সুনেহেরা কে আঘাত করে পার পায় সে কে?

দূর থেকে দৌড়ে আসা লোকগুলোর শব্দ পেতেই মাহাদি মুখ তুলে তাকালো। অঙ্কুরের সৈন্য।

মাহাদিকে দেখেই তারা থমকে দাঁড়ালো। চাঁদের আলোয় বর্ম পরিহিত মাহাদিকে যেন আরও ভয়ংকর লাগছে। তার চোখদুটো জ্বলছে ক্রোধে। সৈন্যদের একজন ফিসফিস করে বলল “সেনাপ্রধান মাহাদি?”

পরের মুহূর্তেই তারা পিছিয়ে যেতে শুরু করলো।

কারও সাহস হলো না সামনে এগোনোর।

কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল সবাই।

মাহাদি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। সুনেহেরাকে দুই হাতে তুলে নিল বুকের কাছে।

মেয়েটার মাথাটা নিস্তেজ হয়ে ঝুলে পড়েছে তার বাহুর ওপর। কোলে তুলে নিয়েই দৌড় শুরু করলো। মিরানকেও বলল

“আপনিও আসুন সাথে”

মিরান এর গলা ভাঙা

“না না, আ..আপনি যান। আমি চিকিৎসক নিয়ে আসছি”

মিরান ছুটলো উল্টো পথে। যে করেই হোক উত্তরের প্রাসাদ থেকে একজন চিকিৎসক নিয়ে যেতেই হবে। মাহাদি দৌড়ে মহলের সামনে আসে। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। গর্জে উঠে বলল

“মহলের দরজা খোলো!”

মহলের প্রহরীরা এত রাতে সেনাপ্রধানকে এভাবে দেখে হতবাক হয়ে গেল। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সুনেহেরার পোশাক। চারদিকে মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। দাসীরা চিৎকার করে উঠলো এ দৃশ্য দেখে। হইচই পড়ে গেল এক মুহূর্তে। রত্নপ্রভা ছুটে এসে সুনেহেরাকে দেখে প্রায় জ্ঞান হারাতে বসলো।

“সুনেহেরা!”

মাহাদি কাউকে কিছু বললো না। সোজা নিয়ে গেল ভিতরের কক্ষে। পালঙ্কে শুইয়ে দিতেই সাদা বিছানা রক্তে লাল হয়ে উঠলো। বাইজিদও খবর পেয়ে ছুটে এলো। সুনেহেরার অবস্থা দেখে তার চোখ কঠিন হয়ে উঠলো।

“কে করেছে? কে দেখিয়েছে এই দুঃসাহস?”

মাহাদি দাঁতে দাঁত চেপে বলল

“ওনার মা। মারজান বেগম”

সবার মুখটা তখন আশ্চর্য জিনিস দেখার মত অবস্থা হয়েছে। মেহেরুন্নেসা হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তখনই মিরান দ্রুত ভিতরে ঢুকলো। তার সঙ্গে একজন বৃদ্ধ চিকিৎসক। উত্তরের প্রাসাদের চিকিৎসকদের একজন। লোকটার হাতে বড় চামড়ার থলে। প্রহরীরা বাধা হয়ে দাড়ালো। তাদের মধ্যে একজন বলল

“এরা অঙ্কুরের লোক। এদের মহলপ ঢোকানো নিরাপদ নয় শাহজাদা”

মিরান হাঁপাতে হাঁপাতে বলল

“না না। এরা অঙ্কুরের লোক হতে পারে কিন্তু এরা অসৎ না। কেবলই পরিস্থিতির শিকার। আমি নিশ্চিত হয়েই এনেছি।”

বাইজিদ কিছু বলার আগে মাহাদি গর্জে উঠলো

“ওকে আসতে দাওওও”

চিকিৎসক আর সময় নষ্ট করলো না। দ্রুত সুনেহেরার ক্ষত পরীক্ষা করতে লাগলো।

পেটের দুই পাশেই গভীর ছুরিকাঘাত। রক্ত থামছেই না। চিকিৎসক ব্যাগ থেকে ছোট ছোট কাঁচের শিশি বের করলো। কিছু ভেষজ গুঁড়ো, কিছু ঘন তরল। একটা পাত্রে মিশিয়ে ক্ষতের ওপর লাগাতেই সুনেহেরা যন্ত্রণায় কেঁপে উঠলো অল্প। মাহাদির বুকটা ধক করে উঠলো প্রিয় নারীর চিৎকারে। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা করছে। চিকিৎসক পুরুষদের কে কক্ষ থেকে বের হতে বলল। একে একে বেড়িয়ে গেল বাইজিদ মাহাদি প্রত্যেকে। চিকিৎসক গম্ভীর গলায় বলল

“রক্ত অনেক বেরিয়েছে। তবে এখনও শ্বাস চলছে। সৃষ্টিকর্তা চাইলে বাঁচানো সম্ভব।”

মাহাদি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে।

তার হাতের মুঠোশক্ত হয়ে গেছে যে। শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। এত যুদ্ধ এত রক্তারক্তি কোনো কিছু তাকে ঘাবড়াতে পারেনি কখনো। অথচ প্রিয়জন এর আর্তনাদ তাকে ঠিক থাকতে দিচ্ছে না। এই প্রথমবার সত্যিকারের ভয় পাচ্ছে সুনেহেরার পাথর মানব টা। মেয়েটা সব সময় বলে মাহাদি নাকি ভালোবাসা বোঝে না। তার নাকি অনুভূতি নেই। আজ যদি মেয়েটা দেখতো তার যন্ত্রণায় তার পাথর মানব কতটা কষ্ট পাচ্ছে।

সকাল হতেই পুরো সাহাবাদ প্রাসাদ অস্থির হয়ে উঠলো। মারজান মহলে নেই কাল থেকে। বাকের শাহ্ এর মাথা খারাপ হয়ে আছে। সিপাহীদের ফিসফাস পেরিয়ে খবর ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে।

শাহজাদী সুনেহেরাকে ছুরি মারা হয়েছে। আর সেই কাজ করেছে স্বয়ং মারজান বেগম।

কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না। মহলের নারীরা ভীত হয়ে আছে। তাদের মধ্যে অনেকেই জানে মারজান এর রুপ। কেউ কেউ তো বলছে অঙ্কুরের সাথে তার সম্পর্ক বহু পুরোনো। নইলে এতদিন ধরে সাহাবাদ এর ভেতরের খবর বাইরে যেত কিভাবে? নিশ্চয়ই ভিতরের কেউ দিচ্ছিল। দরবার প্রাঙ্গণ জুড়ে থমথমে পরিবেশ। প্রহরীদের সংখ্যা দ্বিগুণ করা হয়েছে। বাইজিদ রীতিমতো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। তার চোখমুখ শক্ত। সকাল থেকেই একের পর এক লোক পাঠাচ্ছে মারজানকে খুঁজে আনার জন্য। কিন্তু কোথাও নেই সে। অবশেষে খবর এলো মারজান উত্তর প্রাসাদে উঠেছে। অঙ্কুরের সাথেই আছে এখন। খবরটা শুনে বাইজিদ ক্রোধে সামনে থাকা ধাতব পাত্রটা ছুড়ে মেরে ভেঙে ফেললো।

“আমার আগেই বোঝা উচিৎ ছিল। এই মহিলা একটা কালসাপ। আমার আম্মার হত্যা ও ই করেছে”

পাশেই দাঁড়ানো মেহেরুন্নেসা। সারারাত ঘুম হয়নি তার। সুনেহেরার কক্ষেই ছিল এতক্ষণ।

চিকিৎসকের পাশ থেকে সরে নি। আসলে কাউকেই সেভাবে ভরসা করতে পারছে না তারা। রাত জাগায় মাথাটা ভার হয়ে আছে। তার ওপর মারজানের এই রূপ যেন পুরো মহলটাই কাঁপিয়ে দিয়েছে।

মেহেরুন্নেসা সুনেহেরার কক্ষের সামনে এগিয়ে এসে বলল

“সুনেহেরা আপা কেমন আছে এখন?”

মাহাদি নিচু স্বরে উত্তর দিল

“জ্ঞান ফেরে নি এখনো।”

মেহেরুন্নেসা কদিন ধরে একটু একটু খেয়াল করছে মাহাদি আর সুনেহেরার সখ্যতা। বোধহয় ধরে ফেলেছে তাদের অনুভূতি। আর আজকের ঘটনার ওর তো নিশ্চিত তাদের মধ্যে কিছু চলে।

“চিন্তা করবেন না। আপা ঠিক হয়ে যাবে। আপনি সেনামহলে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিন। খাবার খান। আমরা আ……”

কথা শেষ করার আগেই মেহেরুন্নেসার মাথদয় চক্কর দিল। চারপাশ কেমন ঝাপসা লাগতে শুরু করলো। কানের ভেতর ভোঁ ভোঁ শব্দ হচ্ছে। নিজের কপালে হাত রাখলো। বাইজিদ সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এলো।

“মেহের? কি হয়েছে তোমার? খারাপ লাগছে?”

মেহেরুন্নেসা কিছু বলতে গিয়েও পারলো না।

চোখের সামনে সব কেমন অন্ধকার হয়ে এলো।

ঢলে পড়লো নিচে।

“মেহের!”

বাইজিদ দ্রুত ধরে ফেললো তাকে। মহলে আবার হুলস্থুল পড়ে গেল। দাসীরা দৌড়ে এলো। রত্নপ্রভা আতঙ্কিত হয়ে পানি আনতে গেল। বাইজিদ এর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। বারবার ডাকছে

“মেহের… চোখ খোলো।”

তৎক্ষনাৎ মহিলা হেকিম ডেকে আনা হলো।

বয়সী মহিলা। মাথায় সাদা ওড়না পেঁচানো।

তিনি কিছুক্ষণ মেহেরুন্নেসার নাড়ি পরীক্ষা করলেন। কপালে হাত রাখলেন।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মুখ তুলে তাকালেন বাইজিদ এর দিকে। তার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠলো।

“ভয়ের কিছু নেই শাহজাদা।”

বাইজিদ উৎকণ্ঠিত গলায় বলল

“তাহলে হঠাৎ জ্ঞান হারালো কেন?”

হেকিম উৎফুল্ল স্বরে বললেন

“সম্রাজ্ঞী মা হতে চলেছেন।”

হেকিম এর কথা শুনে বাইজিদ বাইজিদ পাথর হয়ে গেল নিমেষেই। চোখ জোড়া চিক চিক করে উঠলো। আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠে পুরুষটা। রত্নপ্রভার চোখ বড় বড় হয়ে উঠলো। দাসীরা একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে আঁচলে মুখ ঢেকে। এ তো ভারি খুশির সংবাদ।

বাইজিদ স্থির চোখে তাকিয়ে আছে মেহেরুন্নেসার দিকে। তার চোখ ভিজে উঠলো। কাঁপা হাতে মেহেরুন্নেসার কপাল ছুঁয়ে দিল। তার বুকের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত এক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে।

তাদের ভালোবাসার একটা অংশ পৃথিবীতে আসছে। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর থেকে একের পর এক বিরোধ লেগেই আছে মহলে। সময় ই হয় নি তাদের সন্তান নিয়ে পরিকল্পনা করার। তার ভালোবাসা, তার মেহের এর মধ্যে থেকে আরেক টুকরো সুখ দুনিয়ায় আসছে। এই খুশি বাইজিদ রাখবে কোথায় আজ। মেহেরুন্নেসা নিভু নিভু চোখে তাকায়। সামনে এত লোকজন দেখে একটু ঘাবড়ায়। আচমকা বাইজিদ সকলের সামনে হুড়মুড়িয়ে জড়িয়ে ধরে মেহেরুন্নেসা কে। উপস্থিত সকলেই হতভম্ব শাহজাদার এমন কান্ডে। দাসীরা আঁচলে মুখ ঢেকে সরে যায় হাসতে হাসতে। হেকিম মহিলাও হাসে। রত্নপ্রভাকে বলে

“সম্রাজ্ঞীর খেয়াল রাখবেন শাহজাদী। আসছি আমি”

“হুম”

সকলের মুখে খুশির ঝিলিক দেখা গেলেও চন্দ্রার মুখে কোনো খুশির লেশ মাত্র দেখা গেল না। আলগোছে সরে গেল সেখান থেকে।

****

সকাল হতেই সাহাবাদ প্রাসাদের সেনা উদ্যানের নিচের গোপন কক্ষটায় আলোচনা শুরু হয়েছে। পাথরের দেয়ালে ঝোলানো বড় মানচিত্র। উত্তরের প্রাসাদ, তার আশেপাশের জঙ্গল, পাহাড়ি পথ, গোপন সুড়ঙ্গ সব চিহ্ন আঁকা তাতে। কক্ষের মাঝখানে বড় কাঠের টেবিল। সেখানে ছড়িয়ে রাখা অস্ত্র, তীর, ছোট ছোট পতাকা আর সৈন্যদের অবস্থান বোঝানোর চিহ্ন। বাইজিদ দুহাত টেবিলে ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখেমুখে কঠিন ভাব। তার পাশে মাহাদি। আর চারপাশে সেনাপ্রধান, নায়েব, বিশ্বস্ত সৈনিকেরা।

মাহাদি কাঠের দণ্ড দিয়ে মানচিত্রের এক পাশ দেখিয়ে বলল

“উত্তরের পূর্ব দিকের পাহাড়ি পথটা সবচেয়ে দুর্গম। ওরা ভেবেই রেখেছে এদিক দিয়ে কেউ আসবে না। তাই প্রথম আঘাতটা সেখান থেকেই হবে।”

সে একটা লাল চিহ্ন বসিয়ে দিল মানচিত্রে।

“মাহাদি, তুমি চল্লিশ জন অশ্বারোহী নিয়ে পূর্ব দিক ভাঙবে। ফটক খোলার আগেই প্রহরীদের শেষ করতে হবে।”

মাহাদি মাথা নত করলো।

“জ্বি শাহজাদা।”

বাইজিদ মঈন কে বলল

“তুমি দক্ষিণ পাশ ঘিরে রাখবে। কেউ যেন পালাতে না পারে।”

সিপাহী মঈন দৃঢ় গলায় বলল

“প্রাণ থাকতে একটা লোকও বের হতে পারবে না।”

বাইজিদ এবার ধীরে ধীরে মানচিত্রের মাঝখানে আঙুল রাখলো। উত্তরের প্রাসাদ। তার পাশে আরেকটা ছোট্ট দালান। তার যতদূর মনে আছে এই দালান টা তারা বানায় নি। তার চোখ সরু হয়ে এলো।

“এই দালান টা দেখো মাহাদি”

মাহাদি চিত্রটার দিকে মনোযোগ দিল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো তার।

“শাহজাদা এই দালান টা জমিদার কতৃক বানানো নয়। এটা অঙ্কুর গড়েছে। খবর আছে ওখানেই রাখা হতো আমাদের প্রজাদের বিকৃত করার পর”

“অনেক রক্ত ঝরেছে। এবার হিসাব হবে। উচ্ছেদ করবো ওই নরপিশাচ গোষ্ঠী। প্রত্যেক চিকিৎসা বিজ্ঞানী বাড়ি ফিরবে। তারা নিজেদের প্রতিভায় মানবজাতির উন্নয়ন করবে তারা।”

তখনই দরজার পাশে দাঁড়ানো মেহেরুন্নেসার দিকে চোখ গেল বাইজিদের। কালো পোশাকে আবৃত। মুখে ক্লান্তি বোঝাই যায়। বাইজিদ ব্যাস্ত হয়ে বলল

“তুমি আবার এখানে কেন এসেছো?”

মেহেরুন্নেসা শান্ত স্বরে বলল

“যুদ্ধের পরিকল্পনা শুনতে।”

“তোমার বিশ্রাম প্রয়োজন।”

“আমার প্রয়োজন যুদ্ধক্ষেত্র।”

বাইজিদ রেগে উঠলো এবার।

“মেহের, জেদ করো না। তুমি এখন একা নও। আমাদের সন্তান বড় হচ্ছে তোমার মধ্যে। এদিকের সবটা আমি সামলে নিব”

কয়েক মুহূর্ত চুপ রইলো মেহেরুন্নেসা। তারপর বলল

“জানি। তবুও আমি যাব।”

বাইজিদ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকালো। মেহেরুন্নেসা এগিয়ে এলো টেবিলের কাছে।

“এই যুদ্ধ শুধু আপনার না শাহজাদা। আমারও। আমার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য হলেও আমাকে এই যুদ্ধ করতে হবে। যা আমরা ভোগ করছি। তা আমাদের সন্তান কে করতে দিব না”

কক্ষের সবাই নিঃশব্দে শুনলো সম্রাজ্ঞীর কথা। মেহেরুন্নেসা মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে বলল “অঙ্কুর বেঁচে থাকলে না আমার প্রজারা নিরাপদ থাকবে আর না আমার সন্তান নিরাপদ থাকবে।”

বাইজিদ ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়লো।

সে অনেকবার বুঝিয়েছে। গত রাতেও অনেকবার বলেছে মেহেরুন্নেসা যেন মহলেই থাকে। কিন্তু এ মেয়েকে থামানো অসম্ভব। শেষমেশ বিরক্ত গলায় বলল

“ঠিক আছে। তবে তুমি আমার পাশ ছাড়া এক পা সরবে না।”

মেহেরুন্নেসার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটলো।

“চেষ্টা করবো শাহজাদা।”

বাইজিদ কপাল কুচকালো। পরক্ষনেই তা শিথিল হলে। যুদ্ধক্ষেত্রে যদি মৃত্যু আসে, তবে তারা একসাথেই তার মুখোমুখি হবে। বাচলে একসাথে বাচবে। শহীদ হলেও এক সাথে। না হয় পাশাপাশি দুটো কবর হবে।

গোপন কক্ষ থেকে বের হয়েই সোজা অন্দরমহলের দিকে গেল মেহেরুন্নেসা। দাসীরা তাকে দেখেই মাথা নিচু করে সরে দাঁড়ালো।

বড় সভাকক্ষটায় তখন রত্নপ্রভা, নেওয়াজে আবিদ, রত্নপ্রভার কয়েকজন সখী আর মহলের কিছু নারী বসে ছিল। সুনেহেরার ঘটনার পর থেকে পুরো মহলই ভারী হয়ে আছে। কেউ ঠিকমতো হাসে না। কথাও বলে নিচু স্বরে।

মেহেরুন্নেসা ভিতরে ঢুকতেই সবাই উঠে দাঁড়ালো।

সে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর শান্ত গলায় বলল

“আজ একটা ঘোষণা দেওয়ার আছে আমার।”

মেহেরুন্নেসা রত্নপ্রভার দিকে তাকিয়ে বলল “আগামী যুদ্ধ শেষ হলেই শাহজাদী রত্নপ্রভার সাথে নায়েব নেওয়াজে আবিদের বিবাহ অনুষ্ঠিত হবে।”

মুহূর্তেই পুরো কক্ষ নিস্তব্ধ। কেউ যেন ঠিক শুনতে পারেনি প্রথমে। আবিদ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। কিন্তু তার চোখদুটো হঠাৎ কেঁপে উঠেছে।

চন্দ্রার মনে হলো পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। চোখ বড় বড় হয়ে উঠলো তার।

“কি…?”

অবিশ্বাস নিয়ে তাকালো মেহেরুন্নেসার দিকে।

মেহেরুন্নেসা শান্ত কণ্ঠেই বলল

“আমি অনেক ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নায়েব মশাই এই রাজ্যের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত। আর তুমি…”

মেহেরুন্নেসা হালকা হাসলো।

“তুমি ওকে ছাড়া অন্য কারও সাথে সুখী হবে না।”

চন্দ্রপ্রভার গলা শুকিয়ে এলো। মুখ লাল হয়ে উঠেছে ইতোমধ্যে। চট করে আবিদের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিলো। আবিদ এখনও চুপ। মনে হচ্ছে এত বড় সংবাদ শুনেও কথা খুঁজে পাচ্ছে না। মহলের নারীরা তখন চাপা হাসাহাসি শুরু করেছে। রত্নপ্রভা অপ্রস্তুত হয়ে বলল

“মেহের! এসব কি বলছো তুমি!”

মেহেরুন্নেসা এবার ভ্রু কুচকে বলল

“ওহ? তাহলে আমি ভুল বুঝেছি?”

চন্দ্রা কিছু বলতে যাবে তার আগে মেহেরুন্নেসা হাত উঁচু করে তাকে থামিয়ে দিল।

“প্রথমত আমাকে মেহের নয় সম্রাজ্ঞী সম্বোধন করো। আর দ্বিতীয় আমার সিদ্ধান্তঃ ই চূড়ান্ত। নেওয়াজ আপনার কিছু বলার আছে?”

নেওয়াজ না সূচক মাথা নেড়ে বলল

“সম্রাজ্ঞীর সিদ্ধান্তের জয় হোক”

চন্দ্রপ্রভার কথা আটকে যাচ্ছে।পাশ থেকে এক দাসী মুখ চেপে হেসে ফেললো। তা দেখে চন্দ্রার রোধ যেন দ্বিগুন বৃদ্ধি পেল। আবিদ আবারো নিচু গলায় বলল

“ সম্রাজ্ঞী, আপনি যা সিদ্ধান্ত নিবেন… সেটাই আমার জন্য সম্মানের।”

মেহেরুন্নেসা মৃদু হেসে বলল

“তাহলে ঠিক ওই কথাই রইলো। আগামী যুদ্ধ শেষে সাহাবাদে আরেকটা উৎসব হবে।”

চন্দ্রপ্রভা চকিতে তাকালো। চোখ সরু করে ভাবলো

“কি বলল? যুদ্ধ? আবার কিসের যুদ্ধ? আর কবে যুদ্ধ হচ্ছে? কই ভাইজান তো কিছু বলে নি?”

মেহেরুন্নেসা নিজের ঘরে চলে গেল। মা হওয়ার আনন্দ টা সীমা হীন। ভাবলেই কেমন অদ্ভুদ সুন্দর অনুভুতি হয়। সেও মা হচ্ছে।

***

রাত আরও গভীর হতেই আবার গোপন কক্ষে জড়ো হলো সবাই। দেয়ালে জ্বলতে থাকা মশালের আলোতে প্রত্যেকের মুখ অস্বাভাবিক কঠিন লাগছে। মাহাদি মানচিত্রে শেষবারের মত সৈন্যদের অবস্থান দেখিয়ে দিচ্ছে। নেওয়াজে আবিদ অস্ত্র আর গোলাবারুদের হিসাব মিলাচ্ছে।

বাইজিদ নিচু গলায় বলল

“এই পরিকল্পনার কথা কক্ষের বাইরে যেন না যায়।”

সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। ঠিক তখনই মেহেরুন্নেসা ধীরে বলল

“আমি চাই রত্নপ্রভাও যেন কিছু জনে”

আবিদ কপাল কুঁচকালো।

“কিন্তু শাহজাদী তো….”

মেহেরুন্নেসা থামিয়ে দিলো।

“আমি জানি তিনি কে। তিনি এই মহলের মেয়ে। আমাদের আপনজন। নারজান বেগম কি আমাদের আপন জন ছিলেন না?”

বাইজিদ বলল

“তবুও…”

মেহেরুন্নেসা বাইজিদ কেও থামিয়ে দিয়ে বলল

“রক্ত কখনো পুরোপুরি মিথ্যে হয় না।”

বাইজিদ স্থির চোখে তাকিয়ে আছে মেহেরুন্নেসার দিকে। মেহেরুন্নেসা শক্ত কন্ঠে বলল

“যতই নাম পরিচয় পাল্টাক…সে চন্দ্রাই। অঙ্কুরের বংশের রক্ত তার শরীরে।”

আবিদ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলো

“মারজান এর মত শাহজাদিও এমন না সম্রাজ্ঞী।”

“আমি জানি।”

মেহেরুন্নেসা শান্ত গলায় বলল।

“আমিও বিশ্বাস করতে চাই তিনি নির্দোষ। কিন্তু আগামীকালের যুদ্ধে ভুলের কোনো সুযোগ দেবে না। নয়তো সাহাবদ এর সূর্য চিরকালের মত নিভে যেতে পারে। কথাটা সবাই মনে রাখবেন।”

মাহাদি নিচু স্বরে বলল

“ সম্রাজ্ঞীর কথায় যুক্তি আছে। যদি অঙ্কুর কোনোভাবে তার মাধ্যমে খবর পেয়ে যায়…”

বাকিটা আর বললো না। কারও বলার প্রয়োজনও হলো না। সবাই বুঝে গেছে। মেহেরুন্নেসা এবার আবিদের দিকে তাকালো।

“রাজ্যের ভালোর জন্যই তাকে এই পদক্ষেপ থেকে দীরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। আশা করি আপনারা বুঝবেন”

আবিদ চুপ করে গেল বাইজিদ অবশেষে বলল

“ঠিক আছে। কাল ভোরের আগে কেউ কক্ষ ছাড়বে না। আর যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত রত্নপ্রভা কিছু জানতে পারবে না।”

সকল সৈন্য একে একে বেড়িয়ে যেতেই বাইজিদ মেহেরুন্নেসার কাছে গেলো। বাচ্চাদের মত করে জড়িয়ে ধরলো মেহেরুন্নেসা কে। গলায় মুখ গুঁজে বলল

“শোনো না সম্রাজ্ঞী। আমাদের পুঁচকে শাহজাদির কথা ভেবে হলেও তুমি মহলে থাকো। যেও না ওখানে। আমি কথা দিচ্ছি, বিজয় নিয়েই ফিরবো”

মেহেরুন্নেসা বাইজিদ কে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে বলল

“একটা শাহজাদা আসবে বুঝলেন। একদম আপনার মত। ওর নাম রাখবে বীর”

বাইজিদ ফের মেহেরকে এক টানে নিজের কাছে নিয়ে এলো। থুতনি তে মৃদু কামড় দিয়ে বলল

“আমাদের একটা পুঁচকে পুতুলের মত শাহজাদি আসবে। একদম তোমার মত। তার নাম রাখবো জান্নাত।”

“ইশশশশ সেদিন না বললেন সুনেহেরা আপার মত দেখতে হবে”

“উমমমম, তাহলে দুইটা শাহজাদি হোক”

নন ফলোয়ার পাঠকের সংখ্যাই দেখি বেশি। আপনাদের যদি মনে হয় লেখাটা ভালো, আপনাদের পড়তে ভালো লাগছে। তবে পেইজ ফলো দিতে আপত্তি কোথায়? আর অবশ্যই রিয়্যাক্ট পূরণ করবেন। সুন্দর একটি কমেন্ট করবেন 🥹🫶

আমি এত কষ্ট করে এতগুলো শব্দ লিখি। আপনারা সুন্দর একটা লাইন লিখতে পারেন না? আর রিভিউ উইনার ঘোষনা করার কথা ছিল আজ। সম্ভবত গ্রুপে পোস্ট করবো কাল। আমি না করলেও এডমিন করবে। যারা যারা গ্রুপ জয়েন হোন নি। হয়ে নিন, কমেন্টে লিংক থাকবে। ভালোবাসা সবাইকে ☺️

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply