Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৯৭(শেষাংশ)


#জাহানারা

#জান্নাত_মুন

পর্ব :৯৭(শেষাংশ)

🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

🔞 সতর্কবার্তা:

এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

মেঠোপথের শো’রগো’লের মাঝেও জাহানারার তী’ক্ষ্ণ কান এড়াল না মেয়ের গলার স্বর। চকিতে তন্নির সাথে কথা বলা থামিয়ে মেয়ের পানে তাকাতেই লক্ষ করল মেয়ের উৎসুক দৃষ্টি রাস্তার ওপাড়ে, নদীর পাড়ে বসা জমজমাট মেলার দিকে। জাহানারা মেলার ভীড়ে তেমন কাউকে দেখতে না পেয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখল তার গম্ভীর চেহারা এখন হাস্যোজ্জ্বল। জাহানারা নিজের কণ্ঠস্বরকে যথাসম্ভব কঠিন ও রাশভারী করে শুধাল,

–“কিছু বললে তুমি? আবার কার সাথে ভাব জমিয়েছ? মানা করেছি না অপরিচিত কারো সাথে মিশবে না।”

ইমি তক্ষুনি মায়ের পানে তাকিয়ে বাইনা ধরল,“মাম্মা, মেলায় নিয়ে যাবে প্লিজ?”

–“একদম না। কোথাও যাবে না তুমি। আর আজকের পর থেকে তো না-ই। এত সেনা হয়েছ যে যেখানে যাচ্ছ সেখানেই একটা গ’ন্ডগো’ল করে বসছ! বিষয়টা এখন আমাকে ভালো করে দেখতে হচ্ছে।”

ইমি ফের মাথা নত করে চেহারা গম্ভীর করে নিল। ঠিক তখনই, মেলার দিক থেকে ভেসে আসা পাহাড়ি মসলা আর সুস্বাদু খাবারের চনমনে গন্ধটা সরাসরি গিয়ে লাগল ব্রুনোর তী’ক্ষ্ণ নাকে। সে লো’ভ সামলাতে না পেরে নিজের পা দুটো হুট করে থামিয়ে দিল। মেলা প্রাঙ্গণের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায়, অনুনয়ের সুরে ‘উঁ উঁ’ করে ডেকে উঠল সে। অমনি জাহানারা ধ’মকে উঠল,

–“একদম চুপচাপ বাসায় চল। না হলে তোমাকে রেখেই বাসায় চলে যাব।”

ব্রুনো বাধ্য হয়ে কান দুটো ঝুলিয়ে ইমির ঠিক পাশ ঘেঁষে বাধ্যগত প্রাণীর মতো হাঁটা ধরল। তবে যেতে যেতেও তার অবোধ মনটা পড়ে রইল ওখানেই। সে বারবার আড়চোখে রাস্তার ওপাশের মেলার দিকে তাকাচ্ছে। সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে জাফরান উৎসবের হকাররা মেলা উপলক্ষে সারি বেঁধে বসে কয়লার আ’গুনে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম হরেক রকম পাহাড়ি খাবার ও কাবাব রান্না করে বিক্রি করছে। সেই সুস্বাদু খাবারের দৃশ্য আর তী’ব্র সুবাসে ব্রুনোর জিভ লকলক করতে লাগল।

______________

দুপুর গড়াতেই আকাশের মুখভার বি’ষ’ণ্ণ ভাবটা কেটে গেল। মেঘ আর কুয়াশার ঘন চাদর ভেদ করে আজ প্রায় বহুদিন পর কাশ্মীরের উপত্যকায় সোনাঝরা মিষ্টি সূর্যের আলোর দেখা মিলল। নিজেদের বাসায় বান্ধবী এসেছে জানতে পেরে অফিসের সব কাজ ফেলে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসল আরিফ। নাদিয়ার তিন মাস হলো একটি ছেলে সন্তান হয়েছে। তন্নি ছলেটিকে কোলে নিয়ে সোফায় পাশে বসে থাকা নাদিয়ার সাথে গল্পগুজব করছে। আরিফ কোঠিতে প্রবেশ করতেই তন্নিকে দেখে খুশিতে চড়া গলায় বলে উঠল,

–“কিরে তইন্না, কি খবর?”

বন্ধুর গলা পেতেই সেদিকে তাকাল তন্নি। তক্ষুনি বাচ্চাটি নাদিয়ার কোলে দিয়ে এগিয়ে এসে আচমকা আরিফের পা’ছা’য় লা’থি মে’রে বলে উঠল,

–“শা”লা তুমি কোনো কথা কইও না আর। আমি নিজে থাইকা আইছি দেইখা এখন ভালো-মন্দ জিগাও। আর এতদিন খবর ছিল না!”

আরিফ তন্নির মাথায় গা’ট্টি মে’রে বলল,“আমি তবুও মাঝেমধ্যে খবর লইছি নিজ থেকে। আর তুই কোনোদিন নিজে থাইকা আমার খবর লইছস?”

তন্নি মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে অভিমানী মুখে নাদিয়ার কাছে আরিফের নামে না’লিশ ঠুকল। বন্ধুদের এহেন কাণ্ড দেখে নাদিয়া হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেল। আরিফ নাদিয়াকে জিজ্ঞেস করল,“জানু, আমার এই মহীয়সী বান্ধবী কি আসার সময় আমাদের খোকার জন্য কিছু নিয়ে আসছে? নাকি খালি হাতেই আসছে?”

তন্নি ফের আরিফের পা’ছা’য় লা’থি মা’রতে নিলেই আরিফ সরে গেল। তন্নি বলে উঠল,“হ, সবাইকে তো তুই তর মতো কিপ্টা মনে করস?”

আরিফ তাকে কিপ্টে বলাতেও রা’গ করল না। বরং গর্ববোধ করে চুলে ব্যাকব্রাশ করল। অতঃপর এগিয়ে এসে শুধাল,“তুই কি একলা আসছস? সুইম্মা, নাইপ্পা আসছে না?”

তন্নি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,“হেতের শুভ বিবাহ হয়ে গিয়ে এখন দুই তিনটা করে কাডলও আছে। সংসার সামলেই পারে না, আবার বেড়াতে আসবে এতদূর!”

–“তাইলে তুই এখনো সিঙ্গেল প্রো-ম্যাক্স রইলি ক্যান?”

তন্নি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এই প্রশ্ন এড়িয়ে গেল। তারপর কিছুক্ষণ খোশগল্প আর হাসিঠাট্টা শেষ করে আরিফ ফ্রেশ হওয়ার জন্য নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। আরিফ চলে যেতেই তন্নি ফের নাদিয়ার কোল থেকে ফুটফুটে বেবিটাকে নিজের কোলে তুলে নিল। তারপর নাদিয়াকে চোখের ইশারায় বলল আরিফের ঘরে যেতে, বরের কী লাগবে না লাগবে তা দেখতে। অতঃপর বেবিকে নিয়ে সে জাহানারার রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল।

—

দুপুরের শাওয়ার নিয়ে যোহরের নামাজ পড়তে বসেছে জাহানারা। মায়ের দেখাদেখি প্রতিদিনের মতো ছোট্ট ইমিও মায়ের জায়নামাজের পাশে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়েছে। জাহানারা নামাজ শেষ করে সিজদাহ্য় লু’টিয়ে পড়েছে। প্রতি ওয়াক্তের মতো এখনো চোখের পানি বি’স’র্জন দিয়ে রবের কাছে মনের সবকথা উগড়ে দিচ্ছে। ছোট্ট ইমির কানে আসছে মায়ের ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ। জাহানারা ফুপিয়ে কেঁ’দে বিড়বিড় করে প্রার্থনা করছে,

–“আল্লাহ্ তুমি তো জান আমার মনের সব কথা। তুমি তো সর্ব জান্তা। দুনিয়ায় আমায় কেউ না বুঝলেও তুমি তো বুঝ। তুমি তো জান আমি উনার ক্ষ’তি চাইনি। নিজের স্বামীর ক্ষ’তি কোন নারী চায়? আমি তো ওকে কখনো এত ক’ঠিন শা’স্তি দিতে চাইনি। হ্যা, আমি চাইতাম ও খা’রাপ পথ থেকে বেরিয়ে আসুক। একটা সুস্থ জীবন পার করুক আমার সাথে। কিন্তু এমনটা আমার সাথে কেন হলো মাবুদ? কেন সে নিজেকে নিজেই এত বড় শা’স্তি দিল? আমি তো সেদিন ওকেই বাঁচাতেই চেয়েছিলাম। আমিতো ঘুনাক্ষরের বুঝতেও পারিনি আমাদের সামনে এত বড় বি’পদ অপেক্ষা করছে। ও কেন এমন করলো? আমার মাথা আজও ওলট-পালট হয়ে যায় সেদিনের দৃশ্য মনে করলে। আমার দম বন্ধ হয়ে যায় ওর চেহারা মনে পড়লে। থমকে যায় আমার পুরো অস্তিত্ব। আমি কেন সেদিন পারলাম না ওকে বাঁচাতে? আমার সামনে কি করে ও নিজেকে শেষ করে দিলো? কেন এত দূ’র্বল বানিয়ে দিয়েছিল সেদিন আমায়! সেদিন কিছু করতে না পারার অনুতা’পে আমি আজও তিলেতিলে ম”রে যাচ্ছি। কেন আল্লাহ, আমার প্রিয় মানুষগুলো আমার চোখের সামনে থেকে এভাবে হারিয়ে যায়? কেন এভাবে কেড়ে নাও তুমি? আমার জন্য কি একটু দয়া হয় না তোমার?”

সিজদাহ্য় লু’টিয়ে থাকা রমণীর সারা দেহ ক’ম্পিত হচ্ছে কা’ন্নার তোড়ে। সে আবারও বলতে শুরু করলো,“ও কি আজও আমার উপর অ’ভিমান করে আছে? ও কোথায় আছে? এখন কেমন আছে? ও কি সত্যিই এই দুনিয়ায় আর কোথাও নেই? ও যদি তোমার কাছে থাকে, তুমি ওর সব অ’পরাধ ক্ষ’মতা করে দিও মাবুদ। আমি জানি আমিও পা’পী, তবুও তো তোমার বান্দা মাবুদ। তুমি তো তোমার বান্দার দোয়া কখনো ফেলে দাও না। তোমার কাছে দু’হাত তুলে চাইলে তুমি তা দাও। হে আমার মাবুদ, আমার সৃষ্টিকর্তা, আমার পরম দয়াময় আল্লাহ, আমার রাব্বুল আলামীন, আমার স্বামীকে ওপারে আর কোনো শা’স্তি দিও না তুমি! ও দুনিয়ায় নিজের থেকে তো খা’রাপ হয়নি। পরিস্থিতি ওকে খা’রাপ করেছে। দুনিয়াতেই ও অনেক শা’স্তি পেয়েছে মাবুদ, মা হারিয়েছে, বোন হারিয়েছে। মা-বাবা, পরিবার থাকতেও অনাথের মতো ছ’ন্নছাড়া জীবন পাড় করেছে। এগুলো কি কম শা’স্তি ছিল? ওকে আর শা’স্তি দিও না। মৃ’ত মানুষ তো ফিরে আসে না, না-হয় আমি তোমার কাছে চাইতাম ওনাকে ফিরিয়ে দিতে। এটা তো অসম্ভব। তাই শেষ এইটুকুই চাওয়া ওপারে তুমি ওনাকে ভালো রাখ। আমার নিষ্পাপ সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও আমার দোয়া কবুল কর, আল্লাহ।”

ছোট্ট ইমি মোনাজাতের ভঙ্গিতে কচি দু-হাত তুলে মায়ের ক’ম্পিত শরীরের দিকে তাকিয়ে রইল। মায়ের অস্পষ্ট কথা তার বোধগম্য না ঠিকই, তবে মায়ের ক’ষ্টটা তার অবুঝ হৃদয়ে গিয়ে বিঁ’ধল। সে নিজের মতো করে মোনাজাতে আল্লাহর কাছে বলতে লাগল,

–“আল্লাহ্, মাম্মা বলে তুমি সব পারো। তোমার কাছে দুই হাত তুলে কিছু চাইলে তুমি তাকে খালি হাতে ফিরাও না। তাহলে আমার পাপাকে কেন ফিরিয়ে দাও না? আমার মাম্মার তো ক’ষ্ট হয়। ইমিরও ক’ষ্ট হয়। ইমির তো খুব ইচ্ছে হয় পাপার কোলে ওঠে পাপার গলা জড়িয়ে ধরতে। জানো, সবার পাপা আছে, শুধু আমার পাপা নেই। মাম্মা বলে আমার পাপা আকাশের তারা হয়ে গেছে, আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। জানো আল্লাহ্, আমি প্রতিদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা দেখি। কিন্তু তুমি জানো, আমি না চিনতে পারি না আকাশের কোন তারাটা আমার পাপা। আল্লাহ, তুমি কি আমাকে চিনিয়ে দিবে আকাশের কোন তারাটা আমার পাপা?”

সেই ছোট্ট বয়স থেকে মায়ের দেখাদেখি প্রতি ওয়াক্তে জায়নামাজে বসা ইমির এক চিরচেনা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অবুঝ মনে মাকে অনুসরণ করে নামাজ আদায় করে এবং তার বাবার জন্য প্রার্থনা করে। এইটুকু নিষ্পাপ সন্তানের আকুল আ’র্তিগুলো যখনই কানে আসে, তখনই বুকটা যেন এক তী’ব্র য”ন্ত্রণায় ছিঁ”ড়ে যায় জাহানারার। এই তো এখনো মেয়ের প্রার্থনা শুনে বুকের য”ন্ত্রণা আরও গাঢ় হলো রমণীর। পরম মমতায় ইমির কপালে, মাথায় আর পেলব গালে চুমু খেয়ে ভরিয়ে দিতে লাগল। কান্না মিশ্রিত গলায় বলল,

–“মা আছে তো সোনা। তোমার মা তো তোমার পাশে আছে। আমিই তোমার মা আর আমিই তোমার বাবা।”

ইমিও মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে উঠল,“ইমি সরি, মাম্মা। আর ইমি বে’য়াদবি করবে না। তুমি প্লিজ কেঁ’দো না। তুমি না বলেছ তুমি আর আমি কা’ন্না করলে, ক’ষ্ট পেলে আকাশের স্টার হয়ে যাওয়া পাপা উপর থেকে দেখে ক’ষ্ট পায়। সেজন্য তো ইমি কখনো কাঁ’দে না। তুমি তাহলে কেন কাঁ’দছ? পাপা তো ক’ষ্ট পাবে।”

জাহানারা কোনো প্রত্যুত্তর করল না। মেয়েকে বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরে সে নিজের চোখের জল আর ভেতরের প্রলয় সামলাতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল।

–

তন্নি কোলজুড়ে নাদিয়ার বাচ্চাটিকে নিয়ে ধীরপায়ে জাহানারার ঘরের ভেতর এসে প্রবেশ করল। ঘরে এসে দেখল জাহানারা পাশের রুম থেকে এখনো বের হয়নি৷ এদিকে জাহানারার ফোনে ভিডিও কল করেছে জুই। তন্নি ফোন রিসিভ করতেই বহু বছর পর জুইকে দেখতে পেল। মেয়েটা সেই ছোটটি আর নেই। চেহারা, দেহের গড়ন এখন বলে দিচ্ছে সে সাবালিকা। তন্নি জুঁইয়ের সাথে পুরোনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করে ভালো-ম’ন্দ কথাবার্তা বলতে লাগল। জুইয়ের পাশেই তার চার বছরের একরত্তি ছেলেটি দু’ষ্টুমি করে চলেছে অনবরত। একদন্ড স্থির হয়ে বসছে না। জুইকেও শান্তিতে ফোন কলে কথা বলতে দিচ্ছে না। তন্নি হেসে বলল,

–“তোমার ছেলে দেখছি ভীষণ চঞ্চল হয়েছে। দেখতেও অনেক কিউট, মাশাআল্লাহ। মনে হয় বাবার মতো দেখতে হয়েছে!”

জুই ত’প্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,“তন্নি আপু, তোমাকে যে কি বলি! আমার বাপের জীবনে এত দু’ষ্টু পোলাপান আমি দেখিনি। একটু আমাকে শান্তি দেয় না। বাসার প্রতিটি মানুষকে পা’গল বানিয়ে ছাড়ে। অথচ তার বাপের চোখে এসব পড়ে না। তার ছেলে নাকি খুব শান্তশিষ্ট,হাহ্!”

তন্নি জুইয়ের নাজেহাল অবস্থা দেখে হেসে ফেলল। বলল,“তুমিও ছোটবেলা অনেক দুষ্ট ছিলে। মনে হয় তোমার মতোই হয়েছে।”

তন্নির কথা নাখোশ করল জুই। সে বলল,“মোটেও না। আমি ছোটবেলা অনেক শান্তশিষ্ট ছিলাম। বরং ছেলে তার বাপটার মতো পা’জিল হয়েছে। কারো কথাই শুনে না।”

তন্নি জুইয়ের কাছে হার মানল। এরইমধ্যে পাশের রুম থেকে জাহানারা বেরিয়ে আসল। তন্নি লক্ষ করল রমণীর শুভ্র পেলব মুখশ্রীখানা র’ক্তি’ম বর্ণ ঠেকছে। চোখমুখ অস্বাভাবিক ফুলে আছে। তবে তা দেখেও তন্নি প্রশ্ন করল না৷ বরং সহাস্যে ডেকে আনল জুই কল করেছে বলে। জাহানারা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এসে বসল তন্নির পাশে৷ দুই বোনের প্রতিদিনই কম বেশি কথাবার্তা হয়। দুই বোনই রোজ একে অপরের ভালো-ম’ন্দ খোঁজ-খবর নেয়। জুই কথাবার্তা বলতে বলতে বোনের চেহারা দেখে শুধাল,

–“আপু কিছু হইছে তোমার?”

–“কই কি হইছে?”

–“তোমার চোখ দুটো ফোলা লা..”

জুই বাক্য শেষ করতে পারল না। অমনি পিছনে গেইম খেলতে থাকা জুইয়ের ছোট্ট ছেলে জিমিন আচমকা ফোনের ক্যামেরার সামনে এসে তুতলে তুতলে চেঁ’চিয়ে বলে উঠল,

–“শিশ্টার ইমি, জিমিন মিশ ইউ।”

সবে মায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ইমি। পরণে টপস,স্কার্ট, তার উপর ওলের পশমি ওমের সোয়েটার এবং গলায় মাফলার পেঁচানো। মাথার সামনের কিছু চুল যত্ন করে ওপরে ছোট্ট খোঁপা করা, আর বাকি রেশমি চুলগুলো পিঠময় আলগা ছড়িয়ে আছে। ইমিকে স্ক্রিনে দেখামাত্রই ছোট্ট জিমিনের চেহারায় আনন্দের এক অভূতপূর্ব উচ্ছ্বাস দেখা গেল। ইমিকে দেখে খুশি যেন তার ঠিকরে পড়ছে। ইমি বরাবরই জমিনকে অপছন্দ করে। কারণ সে ভীষণ গম্ভীর, শান্তশিষ্ট আর ছায়াবৃত এক মেয়ে। তাকে কেউ অযথা বি’রক্ত না করলে সে কখনো মুখ ফুঁড়ে বাড়তি একটা শব্দও বের করে না। এমনকি কোনো আসরে আশেপাশে যে এতটুকু একটা ছোট মেয়ে বসে আছে, কেউ তার অস্তিত্বও সহজে ঠাহর করতে পারে না। কারণ সে ভীষণ গম্ভীর হয়ে থাকে। ইমি বারবারই জিমিনকে এড়িয়ে চলে। বাচাল মানুষ ছোট্ট ইমির একদম পছন্দ নয়। তাই সে এখন বি’রক্তিতে আওড়ালো,

–“ইমি ডোন্ট মিস ইউ। ওকে!’’

জাহানারার চেহারায় অসন্তোষ দেখা দিল। মেয়েকে এত বুঝিয়েও কোনো ফল পায় না। ওদিকে ছোট্ট চঞ্চল জিমিন পাত্তা দিল না ইমির কথা। বরং কচি দন্তপাটি বের করে একগাল মিষ্টি হেসে বলে উঠল,

–“শিশ্টার ইমি, আমি দেখেছি ডেড মমকে আজ কিশ কয়েছে। আমিও টুমাকে কিশ করব।”

আকস্মিক ছেলের এহেন কথায় ল’জ্জা’য় লাল হয়ে ওঠল জুইয়ের পেলব মুখাদল। তন্নি হো হো করে হেসে উঠল। জাহানারা আড়ালে ঠোঁট বাকিয়ে নিঃশব্দে হাসল। এদিকে ইমি ক্রো’ধে দু-হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিয়েছে তক্ষুনি। ক্রু’দ্ধ নয়নে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসতে থাকা জিমিনকে দেখে দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠলো,

–“থা”প্প’ড়ে তোমার সব দাঁত ফেলে দিব ইডিয়ট।”

জাহানারার ঠোঁটের হাসি উবে গেল সহসা৷ চোয়াল শক্ত করে ধ’মকে উঠল,“ইমি, এবার আমার হাতের মা’র খাবে। বড্ড বে’য়াদব হয়েছ তুমি। কতবার বলতে হয় ও তোমার ছোট ভাই হয়। ওর সাথে এধরণের আচরণ করবে না।”

ইমি সপাটে জবাব দিল,“ও আমার ভাই নয়। আই ডোন্ট লাইক হিম।”

–“ইমি!”

ফের ধ’মকে উঠল জাহানারা। ইমির এবার অভিমান হলো। আড়চোখে ফোনের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা জিমিনকে দেখে রা’গ হলো তার৷ এই ছেলেটার জন্যই এখন তাকে মায়ের ব’কা খেতে হয়েছে। জিমিনের মন খা’রাপ হলো মিমি তার ইমি সিস্টারকে বকুনি দিয়েছে বলে। ইমির চুপসে যাওয়া চেহারা দেখে জিমিন ইমিকে খুশি করতে বলল,

–“শিশ্টার ইমি, আই নাভ ইউ।”

ইমি গাল ফুলিয়ে রা’গে গজগজ করতে করতে স্থান ত্যাগ করার আগে জিমিনের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে আওড়াল,

–“আই জাস্ট হেইট ইউ।”

জাহানারা বেজার হয়ে মেয়েকে পিছন থেকে ধ’মকাতে লাগল। তন্নি ব’কতে লাগল জাহানারাকে, বারবার মেয়েকে এভাবে বকা দেওয়ার জন্য। ওদিকে ফোনের ওপাশে ছেলের পিঠে ধুম করে থা”প্প’ড় বসাল জুই। ছেলেটা তার এই বয়সেই এত পা’কনামি কথা বলে যা তার অপছন্দ। এইতো কিছুক্ষণ আগে কি বলল তাকে নিয়ে। চরম ল”জ্জা’র বিষয়! জাহানারা আর তন্নি জুইকে ধ’মক দিল ছেলেকে এভাবে মা”রায়। জুই ল”জ্জা’য় আর বড় বোনদের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না।

____________

অতিথি আসায় আরিফের কোঠিতে নানান ব্যস্থতা চলছে। জাহানারা বান্ধবীর জন্য নিজ হাতে রান্নাবান্না করে তাকে খাইয়েছে। দেখতে দেখতে দিন গড়িয়ে উপত্যকায় এখন অলস বিকেল নেমেছে। বাইরে অদ্ভুত রকমভাবে এই অসময়ে আকাশ আরও কিছুটা পরিষ্কার দেখাচ্ছে। জাহানারা কাজ সেড়ে কোঠি থেকে বেরিয়ে এলো মেয়ের খুঁজে। তার কাজের সুযোগে মেয়েটা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছে। ঘরে ব্রুনোও নেই। নিশ্চয়ই বাগানে খেলছে। যদিও ইমিকে সচরাচর বাইরে বেরিয়ে আর পাঁচজন বাচ্চার সাথে খেলাধুলা করতে দেখা যায় না। মেয়েটা সারাক্ষণ রুমের মধ্যেই ব্রুনোর সাথে থাকে। জাহানারা কোঠি থেকে বেরিয়ে এসে দেখল আপেল গাছটির নিচে যেখানে একটু সূর্যের আলো এসে আঁ’চড়ে পড়ছে, সেখানে বসে আছে ব্রুনো। এত দিন পর সূর্যের আরামদায়ক আলো পেয়ে গায়ে বিকালের রোদ মাখতে মাখতে গাছ থেকে পড়া পাকা লাল টসটসে আপেল আয়েশ করে কুটকুট করে খাচ্ছে সে।

জাহানারা এগিয়ে আশেপাশে পর্যবেক্ষণ করে দেখল মেয়ের টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না। তবুও বাগানের ভেতর এগিয়ে গিয়ে দেখে আসল। কোথাও না পেয়ে ব্রুনোর সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল ইমিকে দেখেছে কিনা? ব্রুনো কয়েকবার ডাকল। জাহানারা ব্রুনোর হাবভাব দেখে বুঝল, ইমি কোথায় আছে ব্রুনো জানে না। এক লহমায় রমণীর ফর্সা চেহারায় এক গাঢ় চি’ন্তার রেখা প্রস্ফুটিত হয়ে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও কালবিলম্ব না করে দ্রুত সেই স্থান ত্যাগ করল। কোঠির সীমানা পেরিয়ে সে হ’ন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল শাহাবুদ্দিনের ঘরের দিকে, একে একে নাদিয়ার ভাই, চাচা ও প্রতিবেশীদের সকলের ঘরসহ পুরো কোঠির আনাচে-কানাচে তন্নতন্ন করে খুঁজল সে। কিন্তু কোথাও তার ছোট্ট মেয়েটির কোনো সন্ধান মিলল না।

বুক ধরফর করছে রমণীর। একটা মাত্র তার কলিজার টুকরো মেয়ে। তার সাত রাজার ধন। তার বেঁচে থাকার একমাত্র সম্ভবল। সে ভ’য়ে কখনো মেয়েকে চোখের আড়াল করে না। সবসময় মেয়ের প্রতি সে বিচক্ষণ। এখন সেই মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে পা’গল প্রায় দশা তার। আরিফসহ নাদিয়ার বাপ-ভাই, চাচারা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল বাড়ির মেয়েকে খুঁজতে। জাহানারাও পা’গ’ল প্রায়, যেভাবে কোঠি থেকে বেরিয়েছিল সেভাবেই মেয়েকে খুঁজতে চলে গেল। মন তার যেখানে যেখানে যেতে বলছে সে উ’ন্মাদের মতো সেদিকে ছুটে যাচ্ছে। এদিকে ব্রুনো এতক্ষণ পরিস্থিতি কিছু না বুঝলেও যখন বুঝল তার একমাত্র খেলার সঙ্গী, তার একমাত্র বোনকে পাওয়া যাচ্ছে না অমনি আধখাওয়া আপেলখানা ফেলে ইমির গায়ের গন্ধ শুকতে শুকতে কোঠির আঙিনা থেকে বেরিয়ে গেল।

মেয়েকে খুঁজতে খুঁজতে জাহানারা তাদের বাসার খুব সন্নিকটের গ্রাম্য বাজারে চলে আসল। রমণী অনুভব করছে তার বুকের বামপাশে বড্ড য”ন্ত্রণা হচ্ছে। মাতৃ-হৃদয়ের গহীনে আ’শ’ঙ্কার কালো মেঘ ক্রমশ দানা বাঁধছে। কারণ এই কয়বছরে বহুবার তার উপর রাস্তাঘাটে অ্যা’টা’ক হয়েছে। ভাগ্যিস রমণী একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কারাতেকা। আ’ত্মরক্ষার সেই কৌশল জানা ছিল বলেই সে বহুবার সাক্ষাৎ মৃ’ত্যু’র দুয়ার থেকে ল’ড়াই করে অক্ষত ফিরে এসেছে। আবার অদ্ভুতররকভাবে সে বেশ কয়েকবার বেঁচে ফিরেছে। হয়তো ভেনম গার্ডরা আড়াল থেকে তাকে রক্ষা করেছে। এই গার্ডগুলো রমণীর জানামতে মাহিন মোতায়েন করেছে তার পিছনে। প্রয়াত মাফিয়া বসের স্ত্রী আর সন্তানের সুরক্ষার জন্য। মাহিনসহ ইনান, পলক কাইসারও বহুবার তলব করেছে তাদের কাছে থাকতে। কিন্তু রমণী রাজি হয়নি। তাই মাহিন তার ভাইয়ের ফেলে যাওয়া দুই রত্মকে দূর থেকেই আগলে রাখার চেষ্টা করে। যদিও এই নিয়ে মাহিনের সাথে জাহানারার ত’র্কাতর্কি হয়েছে বহুবার। মাহিন বলেছে আর গার্ড লাগাবে না। তবুও মাহিন জাহানারার অজান্তে আড়ালে গার্ডদের লাগিয়ে রাখত। কিন্তু আজ জাহানারার মনে এক তী’ব্র, নজিরবিহীন ভয় জাঁ’কিয়ে বসেছে। যদি সেই অযাচিত শ’ত্রু’রা মাফিয়া বসের অংশ হিসেবে ইমির কোনো ক্ষ”তি করে দেয়। তবে রমণী কি নিয়ে বাঁচবে?

ব্যস্ত বাজারের ঠিক মাঝখানে এসে আচমকা থমকে দাঁড়াল জাহানারা। নিজের কাঁ’পতে থাকা বাঁ হাতটি সে শক্ত করে চেপে ধরল বুকের বাঁ পাশে, যেখানে তার হৃদপিণ্ডটা অবাধ্য পাখির মতো ডানা ঝা’পটাচ্ছে। তার বড্ড শ্বাসক’ষ্ট হচ্ছে। কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে চারপাশের খোলা বাতাসেও! ভেতরের বুকটা এক নিমেষে খা খা করে উঠল, মনে হলো পাঁজরের নিচে খুব মূল্যবান কিছু একটা যেন আর নেই। এক চ’রম, হাড়হিম করা শূন্যতা গ্রা’স করছে তাকে। তার খুব ইচ্ছে করছে এই হাজারো মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে চেঁ’চিয়ে কাঁ’দতে। কিন্তু এক অদ্ভুত, অদৃশ্য অজানা শৃঙ্খল আজও তাকে আ’ষ্টেপৃষ্ঠে শক্ত করে আ’বদ্ধ করে রেখেছে। লোকসমক্ষে সে নিজের কা’ন্না প্রকাশ করতে পারে না। চিরকালই নিজের কোনো কাছের মানুষের বিপদ ঘনিয়ে আসলে ওমন করে এই রমণীর সমগ্র অস্তিত্ব উ’লটপালট হয়ে যায়, নিমেষেই সে নিজের সব দিশা হারিয়ে ফেলে।

জাহানারার চোখের কোণ দুটো নোনা জলের তোড়ে বড্ড জ্বা’লা করছে। সে খুব কসরত করে শুকনো ঢোক গিলল। অতলান্তিক বে’দনায় গলাটা পুরোপুরি ধরে আসায় সেই ঢোক গিলতেও তার বড্ড ক’ষ্ট হলো। চাতক পাখির মতো ব্যাকুল চোখে রমণী মাথা তুলে চারপাশের চত্বরে তাকাল। এত এত চেনা-অচেনা মানুষ তার চোখে ধরা দিচ্ছে, অথচ তার সেই বুকজোড়ানো একরত্তি মেয়েটাকে সে কোথাও দেখতে পারছে না। ঠিক তখনই, জাহানারার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি জোড়া হঠাৎ স্থির হলো রাস্তার ওপারে, পাহাড়ি শালিগঙ্গা নদীর পাড়ে বসা সেই জমজমাট জাফরান মেলাটির দিকে। সেখানে এখন হাজারো দোকানদারদের চনমনে হাঁকডাক আর চেনা লোকজ সুরের এক হালকা, মিষ্টি গুঞ্জন বাতাসে ভাসছে, যা এই কাশ্মীরের কনকনে ঠাণ্ডার মাঝেও পুরো উপত্যকায় এক অদ্ভুত ওম আর প্রাণের স্পন্দন ছড়িয়ে দিচ্ছে।

মেলাটির দিকে তাকাতেই জাহানারার হুট করে মনে পড়ে গেল আজ দুপুরের মুহূর্তটির কথা। তার অ’বাধ্য মেয়েটা আজ কত আকুল হয়ে মেলায় আসার জন্য মাম্মার কাছে বায়না ধরেছিল! সচরাচর ইমি কখনো নিজে থেকে কোনো কিছুর জন্য ওমন বায়না ধরে না। ভাবনার এই আকস্মিক মোড়ে জাহানারার মাতৃহৃদয় হুহু করে কেঁ’দে উঠল। এক তী’ব্র অ’পরাধবোধ এসে জাপটে ধরল তাকে। কেন সে দুপুরে মেয়ের ওইটুকুন একটা আবদার রাখল না? কেন আজ সে ওমন করে সবার সামনে বকতে গেল মেয়েকে? অভিমানী মেয়েটা কি তার আজ মায়ের ওপর অভিমান করে কোথাও গিয়ে লুকিয়ে রইল না তো?

মনের কোণে এমন কতশত ভ’য় আর ডরের অন্ধকার ভাবনা অনবরত পাক খেতে লাগল। আর কোনো কিছু না ভেবে, সে সেই আ’শ’ঙ্কার মেঘ বুকে নিয়েই দ্রুত পায়ে ছুটে পিচঢালা রাস্তা মাড়িয়ে মেলার মূল ফটকের দিকে এগিয়ে গেল। মেলায় এখন কতশত মা-বাবার সাথে অনেক হাসিখুশি বাচ্চা ছেলেমেয়েরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। জাহানারা ভিড়ের মাঝে ইমির মতো পোশাক পরা কোনো শিশুকে দেখলেই মাঝেমধ্যে নিজের ভুল বসত অন্য বাচ্চাকে নিজের মেয়ে ভেবে ভুল করে বসছে, চিলতে আশার আলোয় ছুটে যাচ্ছে। উ’ন্মাদের মতো সে মেলার প্রতিটি প্রান্তের মানুষের কাছে তার ইমির খোঁজ করছে। কিন্তু কেউই তার সেই হা’হাকারের সদুত্তর দিতে পারছে না। এমন জমজমাট ও কোলাহলপূর্ণ মেলায় এত এত মানুষের ভিড়ে, কারই বা এইটুকু একটা অচেনা মেয়ের কথা আলাদা করে মাথায় রাখার ঠেকা পড়েছে!

জাহানারার দুই চোখ বেয়ে ত’প্ত অ’শ্রু গড়িয়ে পড়ল। তবুও হাল ছাড়ল না রমণী। আলগোছে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের অশ্রু মুছে এগিয়ে গেল। খোঁজ করতে করতে এখন প্রায় সন্ধ্যা নেমে এলো বলে। জাহানারা তটস্থ, এলোমেলো হয়ে আছে। আরেকটু এগিয়ে গিয়ে দেখল একজন দোকানদার হাওয়ায় মিঠাই বিক্রি করছে। দোকানের সামনে অভিভাবকের সাথে ছোট্ট ছেলেমেয়েরা আছে। জাহানারা এগিয়ে গিয়ে হাওয়ায় মিঠাই বিক্রি করতে থাকা লোকটির ভ্যানের সামনে দাঁড়াল। বিক্রেতাকে উ’দ্বী’গ্ন চেহারায় শুধাল মেয়ের কথা। বিক্রেতা শিশু কাস্টমারদের হাওয়ায় মিঠাই দিয়ে জাহানারার পানে তাকাল। অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে সন্তানের খোঁজ করতে থাকা রমণীরকে দেখে মায়া হলো তার। সে বাচ্চার সম্পর্কে মনযোগ দিয়ে বর্ণনা শুনল। অতঃপর লোকটা কিঞ্চিৎ ভেবে বলল,

–“অ্যায়সি হি এক লড়কি কো ম্যায়নে কুছ দের পহলে এক সজ্জন কে সাথ দেখা থা। মেরি দোকান সে হি উস আদমি নে বাচ্চি কো কটন ক্যান্ডি খরিদকর দি থি।”

এতক্ষণে যেন এক নিভু নিভু অন্ধকারের মাঝে সামান্য এক চিলতে আশার আলো জ্ব’লে উঠল জাহানারার বি’বর্ণ চেহারায়। তবে মন থেকে দু’শ্চি’ন্তার কালো পাহাড়টা একটুও সরল না। বরং আরও উ’দ্বী’গ্ন হয়ে ওঠল মেয়ের পাশে আরেকজন লোকের কথা শুনে। সে বিচলিত গলায় শুধাল,

–“ভাইসাব, বাচ্চি কে সাথ জো আদমি থা, ও কৌন থা? আপ জানতে হ্যায়?”

–“অরে নেহি বহেন। মুঝে ক্যায়সে পতা হো’গা? লেকিন ও ছোটি বাচ্চি উস আদমি কো ‘বাবা আঙ্কল’ কেহকর বুলা রহি থি।”

জাহানারার এক মূহুর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেল। ‘বাবা আংকেল’ এই শব্দ দুটো সে ইমির মুখে আগেও শুনেছে। কিছুদিন আগে ইমি তাকে বলেছিল এই অপরিচিত লোকটির সম্পর্কে। সেদিন জাহানারা ভার্সিটির ক্লাসে ব্যস্ত ছিল, আর ইমি ব্রুনোর সাথে কোঠিতেই ছিল। কোনো এক ফাঁকে চঞ্চল ব্রুনো কোঠি থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় ইমি ব্রুনোকে আনতে কোঠির বাইরে বেরিয়ে যায়। তখন ব্রুনোর পিছনে ছুটতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে পায়ে ব্য’থা পায়। ঠিক তখনই এক পথচারী অপরিচিত লোক রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে ইমিকে তুলে দাঁড় করায়। তারপর ইমির পা মুছে দিয়ে রাস্তার পাশের দোকান থেকে মলম কিনে পায়ে লাগিয়ে দেয়। সেদিন কথায় কথায় লোকটার সাথে ইমির কিছুক্ষণের আলাপেই ভাব জমে। লোকটি যখন জানতে পারে ইমির বাবা নেই তখন তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, তাকেই নাহয় বাবা ডাকতে। কিন্তু ইমি মানা করে। কারণ তার নিজের বাবা থাকতে অন্য কাউকে বাবা ডাকবে না। তারপর সে ঠিক করে লোকটিকে বাবা আংকেল ডাকবে। জাহানারা সব শুনে মেয়েকে তখন বারণ করে আর কখনো অপরিচিত মানুষের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ কিংবা কথাবার্তা না বলতে। এমনকি জাহানারা এরপর থেকে বাইরে একা ছাড়েনি মেয়েকে। আরও বেশি চোখেচোখে রেখেছিল। এসব কথা ভেবে এখন জাহানারা চিন্তিত চেহারায় ঢোক গিলে লোকটিকে জিজ্ঞেস করল,

–“ভাইসাব, ও কিস তরফ গয়ে হ্যায়, বতা সকতে হ্যায়? বড়ি মেহেরবানি হো’গি।

লোকটা হাতের ইশারায় বাম দিকের পথ দেখিয়ে দিল। জাহানারা আর এক মূহুর্ত সময় অপচ না করে সেদিকে ভীড় ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। এখন তার সেই অযাচিত ভ’য়টা আরও গ্রা’স করেছে। বুকে অনবরত চিমচিম ব্যা’থা করছে। জাহানারা সেই পথ ধরে একদম মেলার শেষ প্রান্ত দিয়ে বেড়িয়ে এলো। ছুটে আসতে গিয়ে বেশ কয়েকবার শাড়ির কুচিতেও বাঁধা পেয়েছে। মাথায় খোঁপা করে রাখা দীর্ঘ কেশরাশি এখন খুলে হাঁটুর নিচ নাগাদ অবধি ছড়িয়ে পড়ে আছে। বড্ড এলোমেলো লাগছে রমনীকে। তবুও দুই কাঁধ থেকে খসে পড়া শীতের শালটি ফের কাঁধে টেনে নিয়ে সে সামনের দিকটাতে ম’রিয়া হয়ে ছুটল।

মেলার শেষ প্রান্তের পরই সামনে দিগন্ত বিস্তৃত সেই প্রমত্তা শালিগঙ্গা নদী। লোকালয় থেকে দূরে নদীর এই দিকটা এক নিস্তব্ধ মায়াবী নির্জনতায় ঘেরা। সুদূরে শুভ্র বরফের মুকুট মাথায় পরিধান করে এক প্রাচীন মৌন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে আকাশছোঁয়া পাহাড়গুলো। গোধূলির শেষ লগ্ন, পশ্চিম আকাশে বিদায়ী সূর্যের র”ক্তিম বর্ণের এক ম”রণাপন্ন লা’লিমা রেখা ভেসে আছে। জাহানারা উ’দভ্রা’ন্তের মতো সেদিক দিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে গেল।

–

শালিগঙ্গার বুক চিরে বয়ে চলা শীতল স্বচ্ছ পানির ধারা আর পাহাড়ি ঝরনার দূরন্ত নূপুরনিক্কন চারপাশে মৃদু এক স্নিগ্ধ আবেশ বুনে ভাসছে। এই নদীর তীরেই পড়ে থাকা অসংখ্য পাথরের মধ্যে একটি একখণ্ড প্রকাণ্ড পাথরের ওপর পরিপাটি হয়ে দুই পা ঝুলিয়ে বসে আছে ইমি। তার কচি হাতে এখনও ধরা রয়েছে তুলোর মতো নরম সেই রঙিন হাওয়াই মিঠাই। সে নিশ্চিন্তে একটু একটু করে সেই মিঠাই মুখে তুলছে আর চিবোচ্ছে। আর ঠিক তার সামনে, ধুলোমাটি মাখা জমিনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে আপাদমস্তক নিকষ কালোয় মোড়ানো এক বিশালদেহী, দীর্ঘকায় পুরুষ। অবয়বে তার কালো ওভারকোট, হাতে চামড়ার গ্লাভস, মুখে মাস্ক আর মাথায় শক্ত করে চেপে রাখা ক্যাপ। চারপাশের কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস আর এই নিশ্ছিদ্র পোশাকের বেড়াজালে লোকটির চেহারাসহ দেহের কোনো অংশই বাইরে থেকে দেখার বিন্দুমাত্র জো নেই। ইমি ক্যান্ডি খেতে খেতে নিজের স্বভাবসুলভ গম্ভীর কণ্ঠ কিছুটা নরম করে উৎফুল্ল গলায় বলল,

–“জানেন বাবা আংকেল, আজ ২রা নবেম্বর, আমার অপ্পার বার্থডে। আজ সন্ধ্যাবেলা আমরা বাসার সবাই মিলে অপ্পার বার্থডে সেলিব্রিট করব। আপনিও এ…”

বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারল না ইমি। হঠাৎই তার কর্ণগোচর হলো অতিপরিচিত গলার স্বর। আ’কস্মিক তার নাম ধরে চি’ৎকার করে ডাক শুনে ঘা’বড়ে গেল ইমি। চকিতে সেদিকে দৃষ্টি ঘুরাতেই নজরে পড়ল মাকে। জাহানারা এতক্ষণ খোঁজার পর মেয়েকে দেখতে পেয়ে আর কোনো দিকে হুঁশ নেই তার। এক প্রকার ছুটে গেল সেদিকে। ইমি ভয়ে হাতের কটন ক্যান্ডিটা পাথরের ওপর রেখে দিয়ে ধড়মড় করে নিচে নেমে পড়ল। সে দু-পা এগোতেই জাহানারা মেঠো জমিনে হাঁটু গেড়ে বসে মেয়েকে নিজের বুকের পাঁজরের সাথে শক্ত করে ঝাপটে ধরল। অতঃপর এক উ’ন্মা’দের মতো মেয়ের সারা মুখে, কপালে চুমু খেয়ে, তার ছোট্ট অবয়বখানা হাত দিয়ে পরখ করতে করতে কাঁ’পঝাঁ’ঝরা গলায় বলতে লাগল,

–“মাকে না বলে কেন বেরিয়ে এলে আম্মা আমার? এখন যদি তোমার কিছু হয়ে যেত, তাহলে আমার কি হতো? আমি তো ম”রেই যেতাম।”

–“আমার কিচ্ছু হয়নি মাম্মা। আমি তো বাবা আংকেলের সাথে মেলায় ঘুরতে আসছিলাম।”

এতক্ষণে মস্তিষ্ক সজাগ হলো জাহানারার। মেয়ের কথা শুনেই চকিতে দৃষ্টি ঘুরাল। সহসা তার চোখে ধরা দিল এক আগন্তুককে। যে তার দিকে পিঠ দিয়ে অনড়ভাবে দাঁড়িয়ে। যার সারা দেহ কালোয় মুড়ানো। শুধু মাথার পিছনে ঘাড় চুই চুই চুলগুলোতে ছোট্ট একটি ঝুঁটি করে রাখা। আর কানের লতিতে জ্ব’লজ্ব’ল করছে পিয়ার্সিং করা ব্ল্যাক রোডিয়ামের আভিজাত্যে ঘেরা এক কুচকুচে কালো রিং! আচমকা বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল জাহানারা। চেহারার একটু আগের উ’দ্বি’গ্নতা বিলিন হয়ে এখন স’ন্দিহান দৃষ্টি লোকটির দিকে তাক করে ক’ঠোর গলায় শুধাল,

–“কে আপনি?”

জাহানারার কণ্ঠে সং’শয় আর তী’ক্ষ্ণতা। সুউচ্চ লোকটির মধ্যে তক্ষুনি কোনো বি’চলিত ভাব দেখা গেল না। জাহানারার সূক্ষ্ম নেত্র জোড়া চেয়ে রইল তার পানে। সে আগন্তুকের মতিগতি অনুধাবন করতে চাইল। লোকটা ধীরলয়ে, অত্যন্ত মন্থর গতিতে পিছনে ঘুরে দাঁড়াল। মাথাটা সামান্য নিচু করে রাখায় তার মুখাবয়ব ক্যাপের গভীর আড়ালে ঢাকা। জাহানারা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। এক অ’দ্ভুত, অ’যাচিত আ’শ’ঙ্কায় তার চেহারার বি’চলিত ভাবটা ফের হানা দিয়েছে। আকস্মিক তার বুকটা অনবরত ধরফর করছে।

হঠাৎই লোকটা মাথা তুলল। ক্যাপের ছায়া সরিয়ে চোখ তুলে সামনের রমণীর পানে তাকাতেই থমকে গেল জাহানারার সমগ্র ইহজাগতিক অস্তিত্ব! তার নজরে পড়ল—লোকটার ধনুকের ন্যায় বাঁ-ভ্রুতে নিখুঁত একটি আইব্রো স্লিট। আর সেই অতি পরিচিত সুগভীর, অথচ দীর্ঘদিন অধরা থাকা প্রাণহীন, নিষ্প্রভ ধূসর-বাদামী অক্ষিযুগল! সেই চাহনি দেখে কেঁপে উঠল রমণীর সর্বাঙ্গ। তক্ষুনি এতক্ষণের বাঁধ ভেঙে পেলব গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অবাধ্য অশ্রুকণা।

এতক্ষণে আগন্তুকের সেই পাথুরে অক্ষিপটের চাহনিতে কিছুটা অনুভূতির মৃদু কম্পন দেখা মিলল। লোকটা তার বাম পা কিঞ্চিৎ টেনে এক কদম এগিয়ে এসে রমণীর ঠিক মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াল। সহসা গোধূলির শেষলগ্নের এক টুকরো সোনালি আলো ঠিকরে পড়ল দুই মানব-মানবীর মুখাবয়বের উপর। ঝলঝল করে উঠল দুই জোড়া ব্য’থাতুর নেত্র। লোকটা হাত বাড়ল রমণীর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া ত’প্ত অশ্রু মুছে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তক্ষুনি রমণী কিঞ্চিৎ পিছিয়ে গেল। তার হৃদয়ে যে এখন অভিমানের পাল্লা আকাশচুম্বী! নিষ্পলক দৃষ্টি লোকটির চোখে স্থির রেখে, কণ্ঠে সমস্ত বি’ষা’দ ঢেলে কম্পিত অথচ ক’ঠিন গলায় সে শুধাল,

–“কেন ফিরলেন?”

–“আত্মার টানে।”

কালবিলম্ব না করে তৎক্ষনাৎ আগন্তুকের ওষ্ঠাধর ভেদ করে হাস্কি কণ্ঠে প্রত্যুত্তর ভেসে এলো। অতঃপর তক্ষুনি দ্বিধাহীন চিত্তে মুখের মাস্ক সরিয়ে চেহারা অনাবৃত করল মাফিয়া বস। বহুবছর পর সেই চেনা চেহারাখানা দেখে জাহানারা আর নিজেকে কাঠিন্যের খোলসে ধরে রাখতে পারল না। সহসা মনের কোণে এত বছর ধরে তৈরি হওয়া সব স’ন্দেহ আর অযাচিত প্রশ্নের সমাধান মিলতেই আচমকা ফুপিয়ে উঠল। মাফিয়া বস এবার রমণীর কোনো বারণ বা অভিমানী দূরত্বের তোয়াক্কা করল না। বরং এক ঝ’টকায় রমণীকে নিজের বুকের পাঁজরের সাথে শক্ত করে ঝা’পটে ধরল। জাহানারা অভিমান দূরে ঠেলে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দু’হাতে খা’মচে ধরল মাফিয়া বসের পিঠের কাপড়। বাঁধ ভাঙল দু’জনের চোখের অশ্রুর। কোনো প্রকার বাক্য বিনিময় ছাড়াই এই মূহুর্তে মাফিয়া বস যেন আজ রমণীকে নিজের বুকের অতল গহীনে চিরতরে পুরে ফেলতে ম’রিয়া হয়ে উঠল।

ঠিক তখনই, দূর থেকে ব্রুনোর অবিরাম ডাক ভেসে আসতে লাগল। খুব সন্নিকটের উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ বেয়ে ব্রুনো ইমির গন্ধ শুঁকে শুঁকে এগোচ্ছিল। হঠাৎই তার নজর পড়ল নদীর তীরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চেনা অবয়বটার দিকে। তক্ষুনি ব্রুনো অস্বাভাবিক আর তী’ব্র চি’ৎকারে ডেকে উ’ন্মা’দের মতো ছুট লাগাল। খাড়া ঢাল বেয়ে নামতে গিয়ে এক-দুবার আ’ছাড় খেয়ে পড়ে গেল সে, কিন্তু থামল না। আজ যেন কোনো বাঁধাই তাকে আটকে রাখতে পারবে না। সে ঝড়ের বেগে ছুটে এসে মনিবের পায়ের কাছে লু’টিয়ে পড়ল, লোকটাকে ঘিরে লেজ নেড়ে অ’স্থির আচরণ করতে লাগল।

আশপাশের এই অভূতপূর্ব আলোড়ন কোনো কিছুই কিন্তু এই দুই মানবীর মনে বিন্দুমাত্র ভাবান্তর ঘটাল না। তারা দুজনে এখনো একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, যেন এত বছর সংগোপনে পুষে রাখা অনূভুতির আলাদা দুনিয়ায় হারিয়ে গেছে। ওদিকে পাহাড়ের বাঁক থেকে নেমে মেঠোপথ দিয়ে ধীরলয়ে এগিয়ে চলেছে লাল পোশাক জড়ানো একদল বাউল, লালন ভক্ত। গোধূলির আলো-ছায়ার পটভূমিতে তারা এগিয়ে যেতে যেতে দোতারার তারে এক বৈ’রাগী ঝং’কার তুলেছে, আর সমস্বরে পরম মরমী সুরে সুর মিলিয়েছে,

❝অমবস্যায় পূর্ণিমা হয়,

মহাযোগ সেই দিনে উদয়।

লালন বলে তাহার সময় দণ্ড রয় না

সময় গেলে সাধন হবে না…… ❞

*

*

*

পরিশিষ্ট~

নভেম্বরের সাতাশ তারিখ। বাংলাদেশজুড়ে এখন চলছে এক তুমুল ও প্র’লয়’ঙ্করী ঝড়ের তা’ণ্ডব। কেরানীগঞ্জের আকাশ আজ সারাদিনই ছিল মেঘলা ও ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন। তার ওপর এখন দ্রুত সন্ধ্যা নেমে আসছে। সকাল থেকে থেমে থেমে যে অবিরাম বারিবর্ষণ শুরু হয়েছিল, তা এখন আরও মুষলধারে রূপ নিয়েছে। এমন দু’র্যো’গপূর্ণ ও বৃষ্টিমুখর দিন হওয়ায় শেখ বাড়ির বড় কর্তা মাহবুব শেখ আজ নিজ ঘরে বসেই বই পড়ে দিন পার করে দিলেন। কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই ঝড়ের তী’ব্রতা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। মাগরিবের আজানের সুমধুর সুর, বৃষ্টির শব্দ আর বাতাসের ‘শাই শাই’ গর্জন—সব মিলেমিশে একাকার হয়ে এক অপার্থিব আবহ তৈরি করেছে চারপাশে।

মাহবুব সাহেব হাতের বইটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালেন। ঘরের জানালাটি ঝোড়ো বাতাসের প্র’চণ্ড ঝাপটায় একে অপরের সাথে সংঘ’র্ষ খেয়ে সশব্দে আ’ছাড় খাচ্ছে। তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন জানালার দিকে। জানালার দুই কপাট টেনে বন্ধ করতে যাবেন, অমনি তার নজর আটকে গেল বাড়ির সামনের নির্জন, অন্ধকার রাস্তাটিতে। হঠাৎ এই ঝড়ের সন্ধ্যায় একটি স্পোর্টস মোটরবাই এসে থামল। বাইক স্ট্যান্ড করে সেখান থেকে নেমে পড়ল আঁটসাঁট প্যান্ট আর জ্যাকেট পরিহিত এক দীর্ঘকায় আগন্তুক। মাথায় ফুল-ফেস হেলমেট থাকায় প্রথম নজরে সে ছেলে নাকি মেয়ে তা বোঝা মুশকিল। তবে পায়ে হাই হিল জুতো দেখে মাহবুব শেখ আন্দাজ করলেন আগুন্তক কোনো মেয়ে হবে বোধহয়। কালো পোশাকে মোড়ানো তার সারা শরীর এখনো অবিরাম মুষলধারে ঝরে পড়া বৃষ্টির পানিতে ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। অথচ, সেই প্র’লয়ংক’রী ঝড় আর কনকনে ঠাণ্ডা বৃষ্টিকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে আগন্তুক মেয়েটি মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

মাহবুব সাহেবের চোখে-মুখে বি’স্ময় উপচে পড়ল। এমন প্র’লয়ংক’রী ঝড়ের সময় কোনো স্বাভাবিক মানুষ কি আদৌ ঘর থেকে বের হয়? যেখানে সারা বাংলাদেশের আবহাওয়া বিভাগ প্রতিনিয়ত সতর্কবার্তা দিয়ে চলেছে ঘরের বাইরে না যাওয়ার জন্য! উনার প্রবীণ মনে তী’ব্র কৌতূহল জাগল এই অজ্ঞাত আগন্তুককে নিয়ে। স্মৃতির পাতা হাতড়ে মাহবুব সাহেবের মনে পড়ল, বিগত এগারোটা বছরে তিনি বেশ কয়েকবার লক্ষ করেছেন—ঠিক এই একই জায়গায়, সব ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে এই আগন্তুক তার বাইক নিয়ে এসে দাঁড়ায়। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, সেই কয়েকবারই দিনগুলো ছিল একই রকম তিনটি নির্দিষ্ট তারিখ! তা হলো জানুয়ারির উনিশ তারিখ, এপ্রিলের পাঁচ তারিখ আর আজকের এই নভেম্বরের সাতাশ তারিখ।

মাহবুব সাহেবের মনে কৌতূহলের মেঘ আরও ঘনীভূত হলো। তবে তিনটে তারিখে দুটোর কথা ভাবতেই বুকটা ভার হয়ে আসল তার। পুরোনো কোনো ক্ষ”তের ধা’রা’লো চা’বু’ক যেন উ’থাল-পা’থাল করে দিল উনার ভেতরটা। তিনি এবার মনস্থির করলেন এই আগুন্তকের সাথে কথা বলে জানতে চাইবেন কেন এই তিনটি তারিখে প্রতি বছর এখানে এসে দাড়িয়ে থাকে? কিন্তু বেশিক্ষণ ভাবার অবকাশ পেলেন না মাহবুব শেখ। তার আগেই আকাশের বুক চিরে সজোরে এক ব”জ্রপাতের প্র’চণ্ড আওয়াজে সংবিতে ফিরলেন তিনি। ঝড়ের তা’ণ্ডব যেন এবার রু”দ্রমূর্তি ধারণ করেছে। বাইরের বিশাল বিশাল গাছপালাগুলো বাতাসের উ’ন্ম’ত্ততায় এদিক থেকে ওদিকে ভে’ঙে পড়ার মতো হেলে পড়ছে। জানালার ফাঁক গলে আসা বৃষ্টির ছাঁট আর বাতাসের ঝাপটা মাহবুব সাহেবকে প্রায় ভিজিয়ে দিচ্ছে। আপাতত আর কোনো উপায়ান্তর না দেখে, মাহবুব সাহেব রাস্তার সেই বাইক আর আগন্তুকের ওপর থেকে অনীচ্ছায় দৃষ্টি সরালেন। বুক চিরে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানালার কপাট দুটো টেনে সশব্দে বন্ধ করে দিলেন তিনি।

বাইক স্ট্যান্ড করিয়ে আগন্তুক কিছুক্ষণ নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অতঃপর কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে, সেই প্র’লয়ংক’রী ঝড়ের মাঝেই শ্রান্ত ভঙ্গিতে পিচঢালা রাস্তার ঠিক মাঝখানে দু-হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। তার হেলমেট পরিহিত নিশ্চল দৃষ্টি জোড়া সুদূর প্রসারিত হয়ে স্থির হয়ে রইল সামনের শেখ বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানের দিকে।

আকাশের বুক চিরে এখন অনবরত প্রলয়নাচন তুলে বি’দ্যুৎ চ’মকাচ্ছে। আর সেই ক্ষণস্থায়ী আলোর প্র’খর ঝ’ল’কানিতে বারবার অন্ধকারের বুক চি’রে স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠছে শেখ বাড়ির কবরস্থানের সারিবদ্ধ সমাধির একদম প্রথম কবরটি। আকাশের বি’দ্যুতের আলো যখনই সেই প্রথম কবরের ওপর আ’ছড়ে পড়ছে, তখনই বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যাওয়া শ্বেতপাথরের ভেজা ফলকটিতে খোদাই করে লেখা অক্ষরগুলো জ্ব’লজ্ব’ল করে উঠছে,

নাম: জায়ান শেখ নীরব

পিতা: মাহবুব শেখ

গ্রাম: দক্ষিণ কলাতিয়া, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

জন্ম তারিখ: ০৫ই এপ্রিল ১৯৯৩

মৃত্যু তারিখ: ২৭ই নবেম্বর ২০২০

[সমাপ্ত]

—সময় চলছে তার চিরাচরিত নিয়ম মেনে খরস্রোতা নদীর বাঁকে। আর কিছু হৃদয় প্রকৃতির সব নিয়মকে তুচ্ছ করে আজও থমকে আছে ফেলে আসা কোনো এক স্মৃতির ঘূর্ণিপাকে।

[জান্নাত মুন]

─── ⋆⋅☆⋅⋆ ──

[প্রিয় পাঠক, আমি আপনাদের সেই শুরু থেকেই বলতাম—জাহানারার কোনো সমাপ্তি নেই। আমি মনে করি, একটি সার্থক উপন্যাসের আসলে কখনো চূড়ান্ত সমাপ্তি হয় না। কিন্তু গল্পের খাতিরে কোনো এক বিন্দুতে এসে আমাদের ইতি টানতেই হয়। তাই আজ আমিও ‘জাহানারা’র এই অধ্যায়ের সমাপ্তি টানলাম। এই দীর্ঘ যাত্রায় ধৈর্য ধরে যারা জাহানারার পাশে ছিলেন, তাদের সবাইকে জানাই আমার অন্তহীন ধন্যবাদ, গভীর কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা।

আর একটি বিষয়, এই উপন্যাসের কিছু রহস্য ও সাসপেন্স আমি ইচ্ছাকৃতভাবেই উন্মোচিত করিনি। এর মধ্যে কিছু অ’মী’মাংসিত প্রশ্নের উত্তর সঠিক সময়ে আমি নিজেই আপনাদের জানাব, আর কিছু প্রশ্নের উত্তর চিরকালই আপনাদের কল্পনার আকাশে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন থেকে যাবে। পরিশেষে এটাই বলব—আজকের এই শেষ পর্বটি কেমন লাগল এবং পুরো উপন্যাসটি নিয়ে আপনাদের মনের অনুভূতি কেমন, তা কমেন্ট বক্সে লিখে যেতে ভুলবেন না।💗🌷]

🚫আমার কোনো গল্প আমার এই পেইজ ছাড়া অন্য কোথাও আপলোড দেওয়ার অনুমতি আমি কাউকে দেইনি। তারপরও কয়েকজন অনুমতি না নিয়েই বারবার আপনাদের নিম্ন মন-মা’নসি’কতার পরিচয় দিচ্ছেন! আমি আবারো বলছি, আমার কোনো গল্প অন্য কোথাও আপলোড দিবেন না।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply